দৃষ্টিদান
Stories
শুনিয়াছি, আজকাল অনেক বাঙালির মেয়েকে নিজের চেষ্টায় স্বামী সংগ্রহ করিতে হয়। আমিও তাই করিয়াছি, কিন্তু দেবতার সহায়তায়। আমি ছেলেবেলা হইতে অনেক ব্রত এবং অনেক শিবপূজা করিয়াছিলাম।
আমার আটবৎসর বয়স উত্তীর্ণ না হইতেই বিবাহ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু পূর্বজন্মের পাপবশত আমি আমার এমন স্বামী পাইয়াও সম্পূর্ণ পাইলাম না। মা ত্রিনয়নী আমার দুইচক্ষু লইলেন। জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীকে দেখিয়া লইবার সুখ দিলেন না।
আরো দেখুন
অনসূয়া
Verses
কাঁঠালের ভূতি-পচা, আমানি, মাছের যত আঁশ,
               রান্নাঘরের পাঁশ,
     মরা বিড়ালের দেহ, পেঁকো নর্দমায়
বীভৎস মাছির দল ঐকতান-বাদন জমায়।
          শেষরাত্রে মাতাল বাসায়
স্ত্রীকে মারে, গালি দেয় গদ্‌গদ ভাষায়,
          ঘুমভাঙা পাশের বাড়িতে
পাড়াপ্রতিবেশী থাকে হুংকার ছাড়িতে।
               ভদ্রতার বোধ যায় চলে,
     মনে হয় নরহত্যা পাপ নয় ব'লে।
          কুকুরটা, সর্ব অঙ্গে ক্ষত,
     বিছানায় শোয় এসে, আমি নিদ্রাগত।
নিজেরে জানান দেয় তীব্রকণ্ঠে আত্মশ্লাঘী সতী
               রণচন্ডা চন্ডী মূর্তিমতী।
          মোটা সিঁদুরের রেখা আঁকা,
                  হাতে মোটা শাঁখা,
          শাড়ি লাল-পেড়ে,
               খাটো খোঁপা-পিন্ডটুকু ছেড়ে
       ঘোমটার প্রান্ত ওঠে টাকের সীমায়--
অস্থির সমস্ত পাড়া এ মেয়ের সতী-মহিমায়।
এ গলিতে বাস মোর, তবু আমি জন্ম-রোমান্টিক--
          আমি সেই পথের পথিক
     যে-পথ দেখায়ে চলে দক্ষিণে বাতাসে,
পাখির ইশারা যায় যে-পথের অলক্ষ্য আকাশে।
          মৌমাছি যে-পথ জানে
               মাধবীর অদৃশ্য আহ্বানে।
          এটা সত্য কিংবা সত্য ওটা
               মোর কাছে মিথ্যা সে তর্কটা।
          আকাশকুসুম-কুঞ্জবনে,
                   দিগঙ্গনে
          ভিত্তিহীন যে-বাসা আমার
     সেখানেই পলাতকা আসা-যাওয়া করে বার-বার।
          আজি এই চৈত্রের খেয়ালে
               মনেরে জড়ালো ইন্দ্রজালে।
                   দেশকাল
          ভুলে গেল তার বাঁধা তাল।
     নায়িকা আসিল নেমে আকাশপ্রদীপে আলো পেয়ে।
                   সেই মেয়ে
               নহে বিংশ-শতকিয়া
     ছন্দোহারা কবিদের ব্যঙ্গহাসি-বিহসিত প্রিয়া।
          সে নয় ইকনমিক্‌স্‌-পরীক্ষাবাহিনী
আতপ্ত বসন্তে আজি নিশ্বসিত যাহার কাহিনী।
               অনসূয়া নাম তার, প্রাকৃতভাষায়
কারে সে বিস্মৃত যুগে কাঁদায় হাসায়,
          অশ্রুত হাসির ধ্বনি মিলায় সে কলকোলাহলে
                   শিপ্রাতটতলে।
     পিনদ্ধ বল্কলবন্ধে যৌবনের বন্দী দূত দোঁহে
               জাগে অঙ্গে উদ্ধত বিদ্রোহে।
          অযতনে এলায়িত রুক্ষ কেশপাশ        
বনপথে মেলে চলে মৃদুমন্দ গন্ধের আভাস।
               প্রিয়কে সে বলে, "পিয়',
                   বাণী লোভনীয়--
               এনে দেয় রোমাঞ্চ-হরষ
                   কোমল সে ধ্বনির পরশ।
               সোহাগের নাম দেয় মাধবীরে
                    আলিঙ্গনে ঘিরে,
               এ মাধুরী যে দেখে গোপনে
                   ঈর্ষার বেদনা পায় মনে।
     যখন নৃপতি ছিল উচ্ছৃঙ্খল উন্মত্তের মতো
          দয়াহীন ছলনায় রত
               আমি কবি অনাবিল সরল মাধুরী
                   করিতেছিলাম চুরি
                  এলা-বনচ্ছায়ে এক কোণে,
             মধুকর যেমন গোপনে
                   ফুলমধু লয় হরি
             নিভৃত ভান্ডার ভরি ভরি
                   মালতীর স্মিত সম্মতিতে।
             ছিল সে গাঁথিতে
                   নতশিরে পুষ্পহার
             সদ্য-তোলা কুঁড়ি মল্লিকার।
          বলেছিনু, আমি দেব ছন্দের গাঁথুনি
                   কথা চুনি চুনি।
                    অয়ি মালবিকা
অভিসার-যাত্রাপথে কখনো বহ নি দীপশিখা।
     অর্ধাবগুণ্ঠিত ছিলে কাব্যে শুধু ইঙ্গিত-আড়ালে,
               নিঃশবদে চরণ বাড়ালে
          হৃদয়প্রাঙ্গণে আজি স্পষ্ট আলোকে--
                 বিস্মিত চাহনিখানি বিস্ফারিত কালো দুটি চোখে,
                   বহু মৌনী শতাব্দীর মাঝে দেখিলাম--
                             প্রিয় নাম
                   প্রথম শুনিলে বুঝি কবিকণ্ঠস্বরে
                             দূর যুগান্তরে।
                        বোধ হল, তুলে ধ'রে ডালা
                   মোর হাতে দিলে তব আধফোটা মল্লিকার মালা।
সুকুমার অঙ্গুলির ভঙ্গীটুকু মনে ধ্যান ক'রে
       ছবি আঁকিলাম বসে চৈত্রের প্রহরে।
    স্বপ্নের বাঁশিটি আজ ফেলে তব কোলে
                         আর-বার যেতে হবে চ'লে  
                  সেথা, যেথা বাস্তবের মিথ্যা বঞ্চনায়
                             দিন চলে যায়।
আরো দেখুন
বলাই
Stories
মানুষের জীবনটা পৃথিবীর নানা জীবের ইতিহাসের নানা পরিচ্ছেদের উপসংহারে, এমন একটা কথা আছে। লোকালয়ে মানুষের মধ্যে আমরা নানা জীবজন্তুর প্রচ্ছন্ন পরিচয় পেয়ে থাকি, সে কথা জানা। বস্তুত আমরা মানুষ বলি সেই পদার্থকে যেটা আমাদের ভিতরকার সব জীবজন্তুকে মিলিয়ে এক করে নিয়েছে-- আমাদের বাঘ-গোরুকে এক খোঁয়াড়ে দিয়েছে পুরে, অহি-নকুলকে এক খাঁচায় ধরে রেখেছে। যেমন রাগিনী বলি তাকেই যা আপনার ভিতরকার সমুদয় সা-রে-গা-মা-গুলোকে সংগীত করে তোলে, তার পর থেকে তাদের আর গোলমাল করবার সাধ্য থাকে না। কিন্তু, সংগীতের ভিতরে এক-একটি সুর অন্য সকল সুরকে ছাড়িয়ে বিশেষ হয়ে ওঠে-- কোনোটাতে মধ্যম, কোনোটাতে কোমলগান্ধার, কোনোটাতে পঞ্চম।
আমার ভাইপো বলাই-- তার প্রকৃতিতে কেমন করে গাছপালার মূল সুরগুলোই হয়েছে প্রবল। ছেলেবেলা থেকেই চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখাই তার অভ্যাস, নড়ে-চড়ে বেড়ানো নয়। পুবদিকের আকাশে কালো মেঘ স্তরে স্তরে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ায়, ওর সমস্ত মনটাতে ভিজে হাওয়া যেন শ্রাবণ-অরণ্যের গন্ধ নিয়ে ঘনিয়ে ওঠে; ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে, ওর সমস্ত গা যেন শুনতে পায় সেই বৃষ্টির শব্দ। ছাদের উপর বিকেল-বেলাকার রোদ্‌দুর পড়ে আসে, গা খুলে বেড়ায়; সমস্ত আকাশ থেকে যেন কী একটা সংগ্রহ করে নেয়। মাঘের শেষে আমের বোল ধরে, তার একটা নিবিড় আনন্দ জেগে ওঠে ওর রক্তের মধ্যে, একটা কিসের অব্যক্ত স্মৃতিতে; ফাল্গুনে পুষ্পিত শালবনের মতোই ওর অন্তর-প্রকৃতিটা চার দিকে বিস্তৃত হয়ে ওঠে, ভরে ওঠে, তাতে একটা ঘন রঙ লাগে। তখন ওর একলা বসে বসে আপন মনে কথা কইতে ইচ্ছে করে, যা-কিছু গল্প শুনেছে সব নিয়ে জোড়াতাড়া দিয়ে; অতি পুরানো বটের কোটরে বাসা বেঁধে আছে যে একজোড়া অতি পুরানো পাখি, বেঙ্গমা বেঙ্গমী, তাদের গল্প। ওই ড্যাবা-ড্যাবা-চোখ-মেলে-সর্বদা-তাকিয়ে-থাকা ছেলেটা বেশি কথা কইতে পারে না। তাই ওকে মনে মনে অনেক বেশি ভাবতে হয়। ওকে একবার পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলুম। আমাদের বাড়ির সামনে ঘন সবুজ ঘাস পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে পর্যন্ত নেবে গিয়েছে, সেইটে দেখে আর ওর মন ভারি খুশি হয়ে ওঠে। ঘাসের আস্তরণটা একটা স্থির পদার্থ তা ওর মনে হয় না; ওর বোধ হয়, যেন ওই ঘাসের পুঞ্জ একটা গড়িয়ে-চলা খেলা, কেবলই গড়াচ্ছে; প্রায়ই তারই সেই ঢালু বেয়ে ও নিজেও গড়াত-- সমস্ত দেহ দিয়ে ঘাস হয়ে উঠত-- গড়াতে গড়াতে ঘাসের আগায় ওর ঘাড়ের কাছে সুড়সুড়ি লাগত আর ও খিলখিল করে হেসে উঠত।
আরো দেখুন
মাল্যদান
Stories
সকালবেলায় শীত-শীত ছিল। দুপুরবেলায় বাতাসটি অল্প-একটু তাতিয়া উঠিয়া দক্ষিণ দিক হইতে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যতীন যে বারান্দায় বসিয়া ছিল সেখান হইতে বাগানের এক কোণে এক দিকে একটি কাঁঠাল ও আর-এক দিকে একটি শিরীষগাছের মাঝখানের ফাঁক দিয়া বাহিরের মাঠ চোখে পড়ে। সেই শূন্য মাঠ ফাল্গুনের রৌদ্রে ধুধু করিতেছিল। তাহারই একপ্রান্ত দিয়া কাঁচা পথ চলিয়া গেছে -- সেই পথ বাহিয়া বোঝাই-খালাস গোরুর গাড়ি মন্দগমনে গ্রামের দিকে ফিরিয়া চলিয়াছে, গাড়োয়ান মাথায় গামছা ফেলিয়া অত্যন্ত বেকারভাবে গান গহিতেছে।
আরো দেখুন
সুরের গুরু, দাও
Songs
         সুরের গুরু, দাও গো সুরের দীক্ষা--
মোরা   সুরের কাঙাল, এই আমাদের ভিক্ষা ॥
         মন্দাকিনীর ধারা,উষার শুকতারা,
         কনকচাঁপা কানে কানে যে সুর পেল শিক্ষা ॥
         তোমার সুরে ভরিয়ে নিয়ে চিত্ত
         যাব যেথায় বেসুর বাজে নিত্য।
         কোলাহলের বেগে    ঘুর্ণি উঠে জেগে,
         নিয়ো তুমি আমার বীণার সেইখানেই পরীক্ষা ॥
আরো দেখুন
মুক্তকুন্তলা
Stories
আমার খুদে বন্ধুরা এসে হাজির তাদের নালিশ নিয়ে। বললে, দাদামশায় তুমি কি আমাদের ছেলেমানুষ মনে কর।
তা, ভাই, ঐ ভুলটাই তো করেছিলুম। আজকাল নিজেরই বয়েসটার ভুল হিসেব করতে শুরু করেছি।
আরো দেখুন
কথিকা
Stories
এবার মনে হল, মানুষ অন্যায়ের আগুনে আপনার সমস্ত ভাবী কালটাকে পুড়িয়ে কালো করে দিয়েছে, সেখানে বসন্ত কোনোদিন এসে আর নতুন পাতা ধরাতে পারবে না।
মানুষ অনেক দিন থেকে একখানি আসন তৈরি করছে। সেই আসনই তাকে খবর দেয় যে, তার দেবতা আসবেন, তিনি পথে বেরিয়েছেন।
আরো দেখুন
গহনে গহনে যে রে তোরা
Songs
               গহনে গহনে যা রে তোরা,
                      নিশি ব'হে যায় যে!
               তন্ন তন্ন করি অরণ্য
                      করী বরাহ খোঁজ্‌ গে!
                      এই বেলা যা রে!
                      নিশাচর পশু সবে
                      এখনি বাহির হবে--
            ধনুর্ব্বাণ নে রে হাতে, চল্‌ ত্বরা চল্‌।
                      জ্বালায়ে মশাল আলো
                           এই বেলা আয় রে!
আরো দেখুন
প্রথম শোক
Stories
বনের ছায়াতে যে পথটি ছিল সে আজ ঘাসে ঢাকা।
সেই নির্জনে হঠাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠল, 'আমাকে চিনতে পার না?'
আরো দেখুন
খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
Stories
রাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ ছিপ্‌ছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ। বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন-কার্যে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল।
সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাড়িয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুন্‌সেফিতে প্রবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনো তাঁহার ভৃত্য।
আরো দেখুন