ঘাটের কথা
Stories
পাষাণে ঘটনা যদি অঙ্কিত হইত তবে কতদিনকার কত কথা আমার সোপানে সোপানে পাঠ করিতে পারিতে। পুরাতন কথা যদি শুনিতে চাও, তবে আমার এই ধাপে বইস; মনোযোগ দিয়া জলকল্লোলে কান পাতিয়া থাকো, বহুদিনকার কত বিস্মৃত কথা শুনিতে পাইবে।
আমার আর-একদিনের কথা মনে পড়িতেছে। সেও ঠিক এইরূপ দিন। আশ্বিন মাস পড়িতে আর দুই-চারি দিন বাকি আছে। ভোরের বেলায় অতি ঈষৎ মধুর নবীন শীতের বাতাস নিদ্রোত্থিতের দেহে নূতন প্রাণ আনিয়া দিতেছে। তরু-পল্লব অমনি একটু একটু শিহরিয়া উঠিতেছে।
আরো দেখুন
ছাড়্ গো তোরা
Songs
            ছাড়্‌ গো তোরা ছাড়্‌ গো,
            আমি    চলব সাগর-পার গো॥
    বিদায়-বেলায় একি হাসি,    ধরলি আগমনীর বাঁশি--
    যাবার সুরে আসার সুরে করলি একাকার গো।
সবাই আপন-পানে    আমায়    আবার কেন টানে।
    পুরানো শীত পাতা-ঝরা,    তারে এমন নূতন-করা?
    মাঘ মরিল ফাগুন হয়ে খেয়ে ফুলের মার গো॥
রঙের খেলার ভাই রে,    আমার  সময় হাতে নাই রে।
    তোমাদের ওই সবুজ ফাগে    চক্ষে আমার ধাঁদা লাগে--
আমায় তোদের প্রাণের দাগে    দাগিস নে, ভাই, আর গো॥
আরো দেখুন
রাজরানী
Stories
কাল তোমার ভালো লাগে নি চণ্ডীকে নিয়ে বকুনি। ও একটা ছবি মাত্র। কড়া কড়া লাইনে আঁকা, ওতে রস নাই। আজ তোমাকে কিছু বলব, সে সত্যিকার গল্প।
কুসমি অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই বলো। তুমি তো সেদিন বললে, বরাবর মানুষ সত্যি খবর দিয়ে এসেছে গল্পের মধ্যে মুড়ে। একেবারে ময়রার দোকান বানিয়ে রেখেছে। সন্দেশের মধ্যে ছানাকে চেনাই যায় না।
আরো দেখুন
রবিবার
Stories
আমার গল্পের প্রধান মানুষটি প্রাচীন ব্রাহ্মণপণ্ডিত-বংশের ছেলে। বিষয়ব্যাপারে বাপ ওকালতি ব্যবসায়ে আঁটি পর্যন্ত পাকা, ধর্মকর্মে শাক্ত আচারের তীব্র জারক রসে জারিত। এখন আদালতে আর প্র্যাকটিস করতে হয় না। এক দিকে পূজা-অর্চনা আর-এক দিকে ঘরে বসে আইনের পরামর্শ দেওয়া, এই দুটোকে পাশাপাশি রেখে তিনি ইহকাল পরকালের জোড় মিলিয়ে অতি সাবধানে চলেছেন। কোনো দিকেই একটু পা ফসকায় না।
এইরকম নিরেট আচারবাঁধা সনাতনী ঘরের ফাটল ফুঁড়ে যদি দৈবাৎ কাঁটাওয়ালা নাস্তিক ওঠে গজিয়ে, তা হলে তার ভিত-দেয়াল-ভাঙা মন সাংঘাতিক ঠেলা মারতে থাকে ইঁটকাঠের প্রাচীন গাঁথুনির উপরে। এই আচারনিষ্ঠ বৈদিক ব্রাহ্মণের বংশে দুর্দান্ত কালাপাহাড়ের অভ্যুদয় হল আমাদের নায়কটিকে নিয়ে।
আরো দেখুন
106
Verses
এরে      ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে?
                হাসিতে আকাশ ভরিলে।
  পথে পথে ফেরে, দ্বারে দ্বারে যায়,
  ঝুলি ভরি রাখে যাহা-কিছু পায়,
  কতবার তুমি পথে এসে হায়
                 ভিক্ষার ধন হরিলে।
  ভেবেছিল চির-কাঙাল সে এই ভুবনে।
                  কাঙাল মরণে জীবনে।
  ওগো মহারাজা, বড়ো ভয়ে ভয়ে
  দিনশেষে এল তোমার আলয়ে,
  আধেক আসনে তারে ডেকে লয়ে
                   নিজ মালা দিয়ে বরিলে।
আরো দেখুন
সন্ধ্যা ও প্রভাত
Stories
এখানে নামল সন্ধ্যা। সূর্যদেব, কোন্‌ দেশে, কোন্‌ সমুদ্রপারে, তোমার প্রভাত হল।
অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠছে রজনীগন্ধা, বাসরঘরের দ্বারের কাছে অবগুণ্ঠিতা নববধূর মতো; কোন্‌খানে ফুটল ভোরবেলাকার কনকচাঁপা।
আরো দেখুন
রথযাত্রা
Stories
রথযাত্রার দিন কাছে।
তাই রানী রাজাকে বললে, 'চলো, রথ দেখতে যাই।'
আরো দেখুন
ললাটের লিখন
Stories
ছেলেবেলায় পৃথ্বীশের ডান দিকের কপালে চোট লেগেছিল ভুরুর মাঝখান থেকে উপর পর্যন্ত। সেই আঘাতে ডান চোখটাও সংকুচিত। পৃথ্বীশকে ভালো দেখতে কি না সেই প্রশ্নের উত্তরটা কাটা দাগের অবিচারে সম্পূর্ণ হতে পারল না। অদৃষ্টের এই লাঞ্ছনাকে এত দিন থেকে প্রকাশ্যে পৃথ্বীশ বহন করে আসছে তবুও দাগও যেমন মেলায় নি তেমনি ঘোচে নি তার সংকোচ। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় হবার উপলক্ষে প্রত্যেকবার ধিক্‌কারটা জেগে ওঠে মনে। কিন্তু বিধাতাকে গাল দেবার অধিকার তার নেই। তার রচনার ঐশ্বর্যকে বন্ধুরা স্বীকার করছে প্রচুর প্রশংসায়, শত্রুরা নিন্দাবাক্যের নিরন্তর কটুক্তিতে। লেখার চারি দিকে ভিড় জমছে। দু টাকা আড়াই টাকা দামের বইগুলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। সম্পাদকরা তার কলমের প্রসাদ ছুটোছাঁটা যা-ই পায় কিছুই ছাড়ে না। পাঠিকারা বলে, পৃথ্বীশবাবু মেয়েদের মন ও চরিত্র যেমন আশ্চর্য বোঝেন ও বর্ণনা করেন এমন সাধ্য নেই আর কোনো লেখকের। পুরুষ-বন্ধুরা বলে, ওর লেখায় মেয়েদের এত-যে স্তুতিবাদ সে কেবল হতভাগার ভাঙা কপালের দোষে। মুখশ্রী যদি অক্ষুণ্ন হত তা হলে মেয়েদের সম্বন্ধে সত্য কথা বাধত না মুখে। মুখের চেহারা বিপক্ষতা করায় মুখের অত্যুক্তিকে সহায় করেছে মনোহরণের অধ্যবসায়।
শ্রীমতী বাঁশরি সরকার ব্যারিস্টারি চক্রের মেয়ে-- বাপ ব্যারিস্টার, ভাইরা ব্যারিস্টার। দু বার গেছে য়ুরোপে ছুটি উপলক্ষে। সাজে সজ্জায় ভাষায় ভঙ্গিতে আছে আধুনিক যুগের সুনিপুণ উদ্দামতা। রূপসী বলতে যা বোঝায় তা নয়, কিন্তু আকৃতিটা যেন ফ্রেঞ্চ পালিশ দিয়ে ঝকঝকে করা।
আরো দেখুন
নাটক
Verses
নাটক লিখেছি একটি।
        বিষয়টা কী বলি।
অর্জুন গিয়েছেন স্বর্গে,
        ইন্দ্রের অতিথি তিনি নন্দনবনে।
উর্বশী গেলেন মন্দারের মালা হাতে
        তাঁকে বরণ করবেন ব'লে।
অর্জুন বললেন, দেবী, তুমি দেবলোকবাসিনী,
    অতি সম্পূর্ণ তোমার মহিমা,
        অনিন্দিত তোমার মাধুরী,
           প্রণতি করি তোমাকে।
    তোমার মালা দেবতার সেবার জন্যে।
উর্বশী বললেন, কোনো অভাব নেই দেবলোকের,
           নেই তার পিপাসা।
        সে জানেই না চাইতে,
    তবে কেন আমি হলেম সুন্দর!
           তার মধ্যে মন্দ নেই,
        তবে ভালো হওয়া কার জন্যে!
আমার মালার মূল্য নেই তার গলায়।
        মর্তকে প্রয়োজন আমার,
           আমাকে প্রয়োজন মর্তের।
        তাই এসেছি তোমার কাছে,
তোমার আকাঙক্ষা দিয়ে করো আমাকে বরণ,
        দেবলোকের দুর্লভ সেই আকাঙক্ষা
           মর্তের সেই অমৃত-অশ্রুর ধারা।
        ভালো হয়েছে আমার লেখা।
"ভালো হয়েছে' কথাটা কেটে দেব কি চিঠি থেকে?
        কেন, দোষ হয়েছে কী?
    সত্য কথাই বেরিয়েছে কলমের মুখে।
        আশ্চর্য হয়েছ আমার অবিনয়ে--
      বলছ, ভালো যে হয়েইছে জানলে কী করে?
    আমার উত্তর এই, নিশ্চিত নাই বা জানলেম।
এক কালের ভালোটা
    হয়তো হবে না অন্য কালের ভালো।
তাই তো এক নিশ্বাসে বলতে পারি
        "ভালো হয়েছে'।
চিরকালের সত্য নিয়ে কথা হত যদি
               চুপ করে থাকতেম ভয়ে।
কত লিখেছি কতদিন,
           মনে মনে বলেছি "খুব ভালো'।
আজ পরম শত্রুর নামে
        পারতেম যদি সেগুলো চালাতে
           খুশি হতেম তবে।
    এ লেখারও একদিন হয়তো হবে সেই দশা--
           সেইজন্যেই, দোহাই তোমার,
    অসংকোচে বলতে দাও আজকের মতো
           "এ লেখা হয়েছে ভালো'।
        এইখানটায় একটুখানি তন্দ্রা এল।
হঠাৎ-বর্ষণে চারি দিক থেকে ঘোলা জলের ধারা
        যেমন নেমে আসে, সেইরকমটা।
তবু ঝেঁকে ঝেঁকে উঠে টলমল করে কলম চলছে,
        যেমনটা হয় মদ খেয়ে নাচতে গেলে।
           তবু শেষ করব এ চিঠি,
        কুয়াশার ভিতর দিয়েও জাহাজ যেমন চলে,
               কল বন্ধ করে না।
বিষয়টা হচ্ছে আমার নাটক।
        বন্ধুদের ফর্মাশ, ভাষা হওয়া চাই অমিত্রাক্ষর।
               আমি লিখেছি গদ্যে।
        পদ্য হল সমুদ্র,
           সাহিত্যের আদিযুগের সৃষ্টি।
               তার বৈচিত্র৻ ছন্দতরঙ্গে,
                   কলকল্লোলে!
গদ্য এল অনেক পরে।
        বাঁধা ছন্দের বাইরে জমালো আসর।
           সুশ্রী-কুশ্রী ভালোমন্দ তার আঙিনায় এল
                       ঠেলাঠেলি করে।
ছেঁড়া কাঁথা আর শাল-দোশালা
           এল জড়িয়ে মিশিয়ে,
    সুরে বেসুরে ঝনাঝন ঝংকার লাগিয়ে দিল।
গর্জনে ও গানে, তাণ্ডবে ও তরল তালে
    আকাশে উঠে পড়ল গদ্যবাণীর মহাদেশ।
        কখনো ছাড়লে অগ্নিনিশ্বাস,
           কখনো ঝরালে জলপ্রপাত।
কোথাও তার সমতল, কোথাও অসমতল;
        কোথাও দুর্গম অরণ্য, কোথাও মরুভূমি।
একে অধিকার যে করবে তার চাই রাজপ্রতাপ;
        পতন বাঁচিয়ে শিখতে হবে
           এর নানারকম গতি অবগতি।
বাইরে থেকে এ ভাসিয়ে দেয় না স্রোতের বেগে,
        অন্তরে জাগাতে হয় ছন্দ
           গুরু লঘু নানা ভঙ্গিতে।
সেই গদ্যে লিখেছি আমার নাটক,
        এতে চিরকালের স্তব্ধতা আছে
               আর চলতি কালের চাঞ্চল্য।
আরো দেখুন