প্রলয়
Verses
আকাশের দূরত্ব যে, চোখে তারে দূর বলে জানি,
          মনে তারে দূর নাহি মানি।
কালের দূরত্ব সেও যত কেন হোক-না নিষ্ঠুর
          তবু সে দুঃসহ নহে দূর।
আঁধারের দূরত্বই কাছে থেকে রচে ব্যবধান,
চেতনা আবিল করে, তার হাতে নাই পরিত্রাণ
          শুধু এই মাত্র নয়--
     সে-যে সৃষ্টি করে নিত্যভয়।
ছায়া দিয়ে রচি তুলে আঁকাবাঁকা দীর্ঘ উপছায়া,
জানারে অজানা করে--ঘেরে তারে অর্থহীনা মায়া।
পথ লুপ্ত করে দিয়ে যে পথের করে সে নির্দেশ
          নাই তার শেষ।
সে পথ ভুলায়ে লয় দিনে দিনে দূর হতে দূরে
          ধ্রুবতারাহীন অন্ধপুরে।
অগ্নিবীণা বিস্তারিয়া যে প্রলয় আনে মহাকাল,
চন্দ্রসূর্য লুপ্ত করে আবর্তে-ঘূর্ণিত জটাজাল,
          দিব্য দীপ্তিচ্ছটায় সে সাজে,
বজ্রের ঝঞ্ঝনামন্দ্রে বক্ষে তার রুদ্রবীণা বাজে।
যে বিশ্বে বেদনা হানে তাহারি দাহনে করে তার
          পবিত্র সৎকার।
জীর্ণ জগতের ভস্ম যুগান্তের প্রচণ্ড নিশ্বাসে
          লুপ্ত হয় ঝঞ্ঝার বাতাসে।
          অবশেষে তপস্বীর তপস্যাবহ্নির শিখা হতে
          নবসৃষ্টি উঠে আসে নিরঞ্জন নবীন আলোতে।
দানব বিলুপ্তি আনে, আঁধারের পঙ্কিল বুদ্‌বুদে
          নিখিলের সৃষ্টি দেয় মুদে;
কণ্ঠ দেয় রূদ্ধ করি, বাণী হতে ছিন্ন করে সুর,
          ভাষা হতে অর্থ করে দূর;
উদয়দিগন্তমুখে চাপা দেয় ঘন কালো আঁখি,
          প্রেমেরে সে ফেলে বাঁধি
          সংশয়ের ডোরে;
ভক্তিপাত্র শূন্য করি শ্রদ্ধার অমৃত লয় হরে।
          মূক অন্ধ মৃত্তিকার স্তর,
জগদ্দল শিলা দিয়ে রচে সেথা মুক্তির কবর।
আরো দেখুন
যাত্রী
Verses
        আছে, আছে স্থান!
একা তুমি, তোমার শুধু
        একটি আঁটি ধান।
নাহয় হবে, ঘেঁষাঘেঁষি,
এমন কিছু নয় সে বেশি,
নাহয় কিছু ভারী হবে
     আমার তরীখান--
            তাই বলে কি ফিরবে তুমি
                  আছে, আছে স্থান!
            এসো, এসো নায়ে!
ধুলা যদি থাকে কিছু
            থাক্‌-না ধূলা পায়ে।
তনু তোমার তনুলতা,
চোখের কোণে চঞ্চলতা,
সজলনীল-জলদ-বরন
            বসনখানি গায়ে--
                 তোমার তরে হবে গো ঠাঁই--    
                              এসো এসো নায়ে।
            যাত্রী আছে নানা,
নানা ঘাটে যাবে তারা
            কেউ কারো নয় জানা।
তুমিও গো ক্ষণেক-তরে
বসবে আমার তরী-'পরে,
যাত্রা যখন ফুরিয়ে যাবে,
          মান্‌বে না মোর মানা--
                এলে যদি তুমিও এসো,
                       যাত্রী আছে নানা।
       কোথা তোমার স্থান?
কোন্‌ গোলাতে রাখতে যাবে
       একটি আঁটি ধান?
বলতে যদি না চাও তবে
শুনে আমার কী ফল হবে,
ভাবব ব'সে খেয়া যখন
       করব অবসান--
               কোন্‌ পাড়াতে যাবে তুমি,
                    কোথা তোমার স্থান?
আরো দেখুন
বাঁশি
Stories
বাঁশির বাণী চিরদিনের বাণী--শিবের জটা থেকে গঙ্গার ধারা, প্রতি দিনের মাটির বুক বেয়ে চলেছে; অমরাবতীর শিশু নেমে এল মর্ত্যের ধূলি দিয়ে স্বর্গ-স্বর্গ খেলতে।
পথের ধারে দাঁড়িয়ে বাঁশি শুনি আর মন যে কেমন করে বুঝতে পারি নে। সেই ব্যথাকে চেনা সুখদুঃখের সঙ্গে মেলাতে যাই, মেলে না। দেখি, চেনা হাসির চেয়ে সে উজ্জ্বল, চেনা চোখের জলের চেয়ে সে গভীর।
আরো দেখুন
লহো লহো তুলে
Songs
          লহো লহো তুলে লহো নীরব বীণাখানি।
তোমার নন্দননিকুঞ্জ হতে সুর দেহো তায় আনি
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর ॥
আমি    আঁধার বিছায়ে আছি রাতের আকাশে
                        তোমারি আশ্বাসে।
          তারায় তারায় জাগাও তোমার আলোক-ভরা বাণী
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর ॥
          পাষাণ আমার কঠিন দুখে তোমায় কেঁদে বলে,
          "পরশ দিয়ে সরস করো, ভাসাও অশ্রুজলে,
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর।'
          শুষ্ক যে এই নগ্ন মরু নিত্য মরে লাজে
                        আমার চিত্তমাঝে,
          শ্যামল রসের আঁচল তাহার বক্ষে দেহো টানি
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর ॥
আরো দেখুন
ত্যাগ
Stories
ফাল্গুনের প্রথম পূর্ণিমায় আম্রমুকুলের গন্ধ লইয়া নব বসন্তের বাতাস বহিতেছে। পুষ্করিণীতীরের একটি পুরাতন লিচুগাছের ঘন পল্লবের মধ্য হইতে একটি নিদ্রাহীন অশ্রান্ত পাপিয়ার গান মুখুজ্যেদের বাড়ির একটি নিদ্রাহীন শয়নগৃহের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিতেছে। হেমন্ত কিছু চঞ্চলভাবে কখনো তার স্ত্রীর একগুচ্ছ চুল খোঁপা হইতে বিশ্লিষ্ট করিয়া লইয়া আঙুলে জড়াইতেছে, কখনো তাহার বালাতে চুড়িতে সংঘাত করিয়া ঠুং ঠুং শব্দ করিতেছে, কখনো তাহার মাথার ফুলের মালাটা টানিয়া স্বস্থানচ্যুত করিয়া তাহার মুখের উপর আনিয়া ফেলিতেছে। সন্ধ্যাবেলাকার নিস্তব্ধ ফুলের গাছটিকে সচেতন করিয়া তুলিবার জন্য বাতাস যেমন একবার এপাশ হইতে একবার ওপাশ হইতে একটু-আধটু নাড়াচাড়া করিতে থাকে, হেমন্তের কতকটা সেই ভাব।
কিন্তু কুসুম সম্মুখের চন্দ্রালোকপ্লাবিত অসীম শূন্যের মধ্যে দুই নেত্রকে নিমগ্ন করিয়া দিয়া স্থির হইয়া বসিয়া আছে। স্বামীর চাঞ্চল্য তাহাকে স্পর্শ করিয়া প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া যাইতেছে। অবশেষে হেমন্ত কিছু অধীরভাবে কুসুমের দুই হাত নাড়া দিয়া বলিল, 'কুসুম, তুমি আছ কোথায়? তোমাকে যেন একটা মস্ত দুরবীন কষিয়া বিস্তর ঠাহর করিয়া বিন্দুমাত্র দেখা যাইবে এমনি দূরে গিয়া পড়িয়াছ। আমার ইচ্ছা, তুমি আজ একটু কাছাকাছি এসো। দেখো দেখি কেমন চমৎকার রাত্রি।'
আরো দেখুন
ঘরে বাইরে
Novels
মা গো, আজ মনে পড়ছে তোমার সেই সিঁথের সিঁদুর, চওড়া সেই লাল-পেড়ে শাড়ি, সেই তোমার দুটি চোখ-- শান্ত, স্নিগ্ধ, গভীর। সে যে দেখেছি আমার চিত্তাকাশে ভোরবেলাকার অরুণরাগরেখার মতো। আমার জীবনের দিন যে সেই সোনার পাথেয় নিয়ে যাত্রা করে বেরিয়েছিল। তার পরে? পথে কালো মেঘ কি ডাকাতের মতো ছুটে এল? সেই আমার আলোর সম্বল কি এক কণাও রাখল না? কিন্তু জীবনের ব্রাহ্মমুহূর্তে সেই-যে উষাসতীর দান, দুর্যোগে সে ঢাকা পড়ে, তবু সে কি নষ্ট হবার?
আমাদের দেশে তাকেই বলে সুন্দর যার বর্ণ গৌর। কিন্তু যে আকাশ আলো দেয় সে যে নীল। আমার মায়ের বর্ণ ছিল শামলা, তাঁর দীপ্তি ছিল পুণ্যের। তাঁর রূপ রূপের গর্বকে লজ্জা দিত।
এসো পাপ, এসো সুন্দরী!
তব চুম্বন-অগ্নি-মদিরা রক্তে ফিরুক সঞ্চরি।
অকল্যাণের বাজুক শঙ্খ,
ললাটে, লেপিয়া দাও কলঙ্ক,
নির্লাজ কালো কলুষপঙ্ক
    বুকে দাও প্রলয়ংকরী!
      রাই আমার    চলে যেতে ঢলে পড়ে।
               অগাধ জলের মকর যেমন,
                         ও তার    চিটে চিনি জ্ঞান নেই!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
বিদ্যাপতি কহে কৈসে গোয়াঁয়বি
হরি বিনে দিনরাতিয়া?
আমার নিকড়িয়া রসের রসিক কানন ঘুরে ঘুরে
      নিকড়িয়া বাঁশের বাঁশি বাজায় মোহন সুরে।
আমার ঘর বলে, তুই কোথায় যাবি,
বাইরে গিয়ে সব খোয়াবি--
আমার প্রাণ বলে, তোর যা আছে সব
যাক-না উড়ে পুড়ে।
ওগো,যায় যদি তো যাক-না চুকে,
সব হারাব হাসিমুখে,
আমি এই চলেছি মরণসুধা
নিতে পরান পূরে।
ওগো, আপন যারা কাছে টানে
এ রস তারা কেই বা জানে,
আমার বাঁকা পথের বাঁকা সে যে
ডাক দিয়েছে দূরে।
এবার বাঁকার টানে সোজার বোঝা
পড়ুক ভেঙে-চুরে।
যখন দেখা দাও নি, রাধা, তখন বেজেছিল বাঁশি।
এখন চোখে চোখে চেয়ে সুর যে আমার গেল ভাসি।
তখন নানা তানের ছলে
ডাক ফিরেছে জলে স্থলে,
এখন আমার সকল কাঁদা রাধার রূপে উঠল হাসি।
বঁধুর লাগি কেশে আমি পরব এমন ফুল
স্বর্গে মর্তে তিন ভুবনে নাইকো যাহার মূল।
বাঁশির ধ্বনি হাওয়ায় ভাসে,
সবার কানে বাজবে না সে--
দেখ্‌ লো চেয়ে যমুনা ওই ছাপিয়ে গেল কূল।
She should never have looked at me,
If she meant I should not love her!
There are plenty... men you call such,
I suppose... she may discover
All her soul to, if she pleases,
And yet leave much as she found them:
But I'm not so, and she knew it
When she fixed me, glancing round them.
আমায় ভালো বাসবে না সে এই যদি তার ছিল জানা,
তবে কি তার উচিত ছিল আমার-পানে দৃষ্টি হানা?
তেমন-তেমন অনেক মানুষ আছে তো এই ধরাধামে
(যদিচ ভাই, আমি তাদের গণি নেকো মানুষ নামে)--
যাদের কাছে সে যদি তার খুলে দিত প্রাণের ঢাকা,
তবু তারা রইত খাড়া যেমন ছিল তেমনি ফাঁকা।
আমি তো নই তাদের মতন সে কথা সে জানত মনে
যখন মোরে বাঁধল ধ'রে বিদ্ধ ক'রে নয়নকোণে।
মধুঋতু নিত্য হয়ে রইল তোমার মধুর দেশে।
যাওয়া-আসার কান্নাহাসি হাওয়ায় সেথা বেড়ায় ভেসে।
যার যে জনা সেই শুধু যায়, ফুল ফোটা তো ফুরোয় না হায়--
ঝরবে যে ফুল সেই কেবলি ঝরে পড়ে বেলাশেষে।
যখন আমি ছিলেম কাছে তখন কত দিয়েছি গান;
এখন আমার দূরে যাওয়া, এরও কি গো নাই কোনো দান?
পুষ্পবনের ছায়ায় ঢেকে এই আশা তাই গেলেম রেখে--
আগুন-ভরা ফাগুনকে তোর কাঁদায় যেন আষাঢ় এসে॥
আরো দেখুন
সিদ্ধি
Stories
স্বর্গের অধিকারে মানুষ বাধা পাবে না, এই তার পণ। তাই, কঠিন সন্ধানে অমর হবার মন্ত্র সে শিখে নিয়েছে। এখন একলা বনের মধ্যে সেই মন্ত্র সে সাধনা করে।
বনের ধারে ছিল এক কাঠকুড়নি মেয়ে। সে মাঝে মাঝে আঁচলে ক'রে তার জন্যে ফল নিয়ে আসে, আর পাতার পাত্রে আনে ঝরনার জল।
আরো দেখুন
আমার নয়ন-ভুলানো এলে
Songs
              আমার  নয়ন-ভুলানো এলে,
          আমি    কী হেরিলাম হৃদয় মেলে॥
     শিউলিতলার পাশে পাশে   ঝরা ফুলের রাশে রাশে
          শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে   অরুণরাঙা চরণ ফেলে
                   নয়ন-ভুলানো এলে॥
আলোছায়ার আঁচলখানি লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,
     ফুলগুলি ওই মুখে চেয়ে কী কথা কয় মনে মনে॥
          তোমায় মোর করব বরণ,   মুখের ঢাকা করো হরণ,
     ওইটুকু ওই মেঘাবরণ   দু হাত দিয়ে ফেলো ঠেলে॥
বনদেবীর দ্বারে দ্বারে শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,
     আকাশবীণার তারে তারে জাগে তোমার আগমনী।
          কোথায় সোনার নূপুর বাজে,   বুঝি আমার হিয়ার মাঝে
সকল ভাবে সকল কাজে   পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে--
                   নয়ন-ভুলানো এলে॥
আরো দেখুন
বড়ো খবর
Stories
কুসমি বললে, তুমি যে বললে এখনকার কালের বড়ো বড়ো সব খবর তুমি আমাকে শোনাবে, নইলে আমার শিক্ষা হবে কী রকম ক'রে, দাদামশায়।
দাদামশায় বললে, বড়ো খবরের ঝুলি বয়ে বেড়াবে কে বলো, তার মধ্যে যে বিস্তর রাবিশ।
আরো দেখুন