মাতা
Verses
কুয়াশার জাল
               আবরি রেখেছে প্রাতঃকাল--
                   সেইমতো ছিনু আমি কতদিন
                             আত্মপরিচয়হীন।
               অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো করেছিনু অনুভব
          কুমারীচাঞ্চল্যতলে আছিল যে সঞ্চিত গৌরব,
               যে নিরুদ্ধ আলোকের মুক্তির আভাস,
                   অনাগত দেবতার আসন্ন আশ্বাস,
          পুষ্পকোরকের বক্ষে অগোচর ফলের মতন।
                   তুই কোলে এলি যবে অমূল্য রতন,
                             অপূর্ব প্রভাতরবি,
                   আশার অতীত যেন প্রত্যাশার ছবি--
                             লভিলাম আপনার পূর্ণতারে
                                      কাঙাল সংসারে।
                   প্রাণের রহস্য সুগভীর
                             অন্তরগুহায় ছিল স্থির,
          সে আজ বাহির হল দেহ লয়ে উন্মুক্ত আলোতে
                             অন্ধকার হতে;
                   সুদীর্ঘকালপথে
                        চলিল সুদূর ভবিষ্যতে।
          যে আনন্দ আজি মোর শিরায় শিরায় বহে
                   গৃহের কোণের তাহা নহে।
                   আমার হৃদয় আজি পান্থশালা,
                   প্রাঙ্গণে হয়েছে দীপ জ্বালা।
                  হেথা কারে ডেকে আনিলাম
          অনাদিকালের পান্থ কিছুকাল করিবে বিশ্রাম।
               এ বিশ্বের যাত্রী যারা চলে অসীমের পানে
                   আকাশে আকাশে নৃত্যগানে--
                আমার শিশুর মুখে কলকোলাহলে
                   সে-যাত্রীর গান আমি শুনিব এ বক্ষতলে।
               অতিশয় নিকটের, দূরের তবু এ--
          আপন অন্তরে এল, আপনার কহে তো কভু এ।
              বন্ধনে দিয়েছে ধরা শুধু ছিন্ন করিতে বন্ধন;
          আনন্দের ছন্দ টুটে উচ্ছ্বসিছে এ মোর ক্রন্দন।
                             জননীর
                   এ বেদনা, বিশ্বধরণীর
                             সে যে আপনার ধন--
          না পারে রাখিতে নিজে, নিখিলেরে করে নিবেদন।
আরো দেখুন
মুক্তকুন্তলা
Stories
আমার খুদে বন্ধুরা এসে হাজির তাদের নালিশ নিয়ে। বললে, দাদামশায় তুমি কি আমাদের ছেলেমানুষ মনে কর।
তা, ভাই, ঐ ভুলটাই তো করেছিলুম। আজকাল নিজেরই বয়েসটার ভুল হিসেব করতে শুরু করেছি।
আরো দেখুন
সম্পত্তি-সমর্পণ
Stories
বৃন্দাবন কুণ্ড মহা ক্রুদ্ধ হইয়া আসিয়া তাহার বাপকে কহিল, "আমি এখনই চলিলাম।"
বাপ যজ্ঞনাথ কুণ্ড কহিলেন, "বেটা অকৃতজ্ঞ, ছেলেবেলা হইতে তোকে খাওয়াইতে পরাইতে যে ব্যয় হইয়াছে তাহার পরিশোধ করিবার নাম নাই, আবার তেজ দেখোনা।"
আরো দেখুন
গর্ব করে নিই নে ও নাম
Verses
       গর্ব করে নিই নে ও নাম, জান অন্তর্যামী,
              আমার মুখে তোমার নাম কি সাজে।
       যখন সবাই উপহাসে তখন ভাবি আমি
              আমার কণ্ঠে তোমার নাম কি বাজে।
                    তোমা হতে অনেক দূরে থাকি
                    সে যেন মোর জানতে না রয় বাকি,
       নামগানের এই ছদ্মবেশে দিই পরিচয় পাছে
              মনে মনে মরি যে সেই লাজে।
       অহংকারের মিথ্যা হতে বাঁচাও দয়া করে
              রাখো আমায় যেথা আমার স্থান।
       আর-সকলের দৃষ্টি হতে সরিয়ে দিয়ে মোরে
              করো তোমার নত নয়ন দান।
                    আমার পূজা দয়া পাবার তরে,
                    মান যেন সে না পায় করো ঘরে,
       নিত্য তোমায় ডাকি আমি ধুলার 'পরে বসে
              নিত্যনূতন অপরাধের মাঝে।
আরো দেখুন
পত্র
Verses
নৌকাযাত্রা হইতে ফিরিয়া আসিয়া লিখিত
সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত প্রিয়নাথ সেন স্থলচরবরেষু
জলে বাসা বেঁধেছিলেম, ডাঙায় বড়ো কিচিমিচি।
সবাই গলা জাহির করে, চেঁচায় কেবল মিছিমিছি।
সস্তা লেখক কোকিয়ে মরে, ঢাক নিয়ে সে খালি পিটোয়,
ভদ্রলোকের গায়ে প'ড়ে কলম নেড়ে কালি ছিটোয়।
এখেনে যে বাস করা দায় ভনভনানির বাজারে,
প্রাণের মধ্যে গুলিয়ে উঠে হট্টগোলের মাঝারে।
কানে যখন তালা ধরে, উঠি যখন হাঁপিয়ে--
কোথায় পালাই, কোথায় পালাই--জলে পড়ি খাঁপিয়ে
গঙ্গাপ্রাপ্তির আশা করে গঙ্গাযাত্রা করেছিলেম।
তোমাদের না বলে কয়ে আস্তে আস্তে সরেছিলেম।
দুনিয়ার এ মজলিসেতে এসেছিলেম গান শুনতে;
আপন মনে গুনগুনিয়ে রাগ-রাগিণীর জাল বুনতে।
গান শোনে সে কাহার সাধ্যি, ছোঁড়াগুলো বাজায় বাদ্যি,
বিদ্যেখানা ফাটিয়ে ফেলে থাকে তারা তুলো ধুনতে।
ডেকে বলে, হেঁকে বলে, ভঙ্গি করে বেঁকে বলে--
"আমার কথা শোনো সবাই, গান শোনো আর নাই শোনো!
গান যে কাকে বলে সেইটে বুঝিয়ে দেব, তাই শোনে।"
টীকে করেন ব্যখ্যা করেন, জেঁকে ওঠে বক্তিমে,
কে দেখে তার হাত-পা নাড়া, চক্ষু দুটোর রক্তিমে!
চন্দ্র সূর্য জ্বলছে মিছে আকাশখানার চালাতে--
তিনি বলেন, "আমিই আছি জ্বলতে এবং জ্বালাতে।"
কুঞ্জবনের তানপুরোতে সুর বেঁধেছে বসন্ত,
সেটা শুনে নাড়েন কর্ণ, হয় নাকো তাঁর পছন্দ।
তাঁরি সুরে গাক-না সবাই টপ্পা খেয়াল ধুরবোদ--
গায় না যে কেউ, আসল কথা নাইকো কারো সুর-বোধ!
কাগজওয়ালা সারি সারি নাড়ছে কাগজ হাতে নিয়ে--
বাঙলা থেকে শান্তি বিদায় তিনশো কুলোর বাতাস দিয়ে।
কাগজ দিয়ে নৌকা বানায় বেকার যত ছেলেপিলে,
কর্ণ ধরে পার করবেন দু-এক পয়সা খেয়া দিলে।
সস্তা শুনে ছুটে আসে যত দীর্ঘকর্ণগুলো--
বঙ্গদেশের চতুর্দিকে তাই উড়ছে এত ধুলো।
খুদে খুদে "আর্য' গুলো ঘাসের মতো গজিয়ে ওঠে,
ছুঁচোলো সব জিবের ডগা কাঁটার মতো পায়ে ফোটে।
তাঁরা বলেন, "আমি কল্কি" গাঁজার কল্কি হবে বুঝি!
অবতারে ভরে গেল যত রাজ্যের গলিঘুঁজি।
পাড়ার এমন কত আছে কত কব তার,
বঙ্গদেশে মেলাই এল বরা-অবতার।
দাঁতের জোরে হিন্দুশাস্ত্র তুলবে তারা পাঁকের থেকে,
দাঁতকপাটি লাগে  তাদের দাঁত-খিঁচুনির ভঙ্গি দেখে।
আগাগোড়াই মিথ্যে কথা, মিথ্যেবাদীর কোলাহল,
জিব নাচিয়ে বেড়ায় যত জিহ্বাওয়ালা সঙের দল।
বাক্যবন্যা ফেনিয়ে আসে, ভাসিয়ে নে যায় তোড়ে--
কোনোক্রমে রক্ষে পেলাম মা-গঙ্গারি ক্রোড়ে।
হেথায় কিবা শান্তি-ঢালা কুলুকুলু তান!
সাগর-পানে বহন করে গিরিরাজের গান।
ধীরি ধীরি বাতাসটি দেয় জলের গায়ে কাঁটা।
আকাশেতে আলো-আঁধার খেলে জোয়ারভাঁটা।
তীরে তীরে গাছের সারি পল্লবেরি ঢেউ।
সারা দিবস হেলে দোলে, দেখে না তো কেউ।
পূর্বতীরে তরুশিরে অরুণ হেসে চায়--
পশ্চিমেতে কুঞ্জ-মাঝে সন্ধ্যা নেমে যায়।
তীরে ওঠে শঙ্খধ্বনি, ধীরে আসে কানে,
সন্ধ্যাতারা চেয়ে থাকে ধরণীর পানে।
ঝাউবনের আড়ালেতে চাঁদ ওঠে ধীরে,
ফোটে সন্ধ্যাদীপগুলি অন্ধকার তীরে।
এই শান্তি-সলিলেতে দিয়েছিলেম ডুব,
হট্টগোলটা ভুলেছিলেম, সুখে ছিলেম খুব।
জান তো ভাই আমি হচ্ছি জলচরের জাত,
আপন মনে সাঁতরে বেড়াই--ভাসি যে দিনরাত।
রোদ পোহাতে ডাঙায় উঠি, হাওয়াটি খাই চোখ বুজে,
ভয়ে ভয়ে কাছে এগোই তেমন তেমন লোক বুঝে।
গতিক মন্দ দেখলে আবার ডুবি অগাধ জলে,
এমনি করেই দিনটা কাটাই লুকোচুরির ছলে।
তুমি কেন ছিপ ফেলেছ শুকনো ডাঙায় বসে?
বুকের কাছে বিদ্ধ করে টান মেরেছ কষে।
আমি তোমায় জলে টানি, তুমি ডাঙায় টানো,
অটল হয়ে বসে আছ, হার তো নাহি মানো।
আমারি নয় হার হয়েছে, তোমারি নয় জিৎ--
খাবি খাচ্ছি ডাঙায় পড়ে হয়ে পড়ে চিৎ।
আর কেন ভাই, ঘরে চলো, ছিপ গুটিয়ে নাও,
"রবীন্দ্রনাথ পড়ল ধরা' ঢাক পিটিয়ে দাও।
আরো দেখুন
নতুন পুতুল
Stories
এই গুণী কেবল পুতুল তৈরি করত; সে পুতুল রাজবাড়ির মেয়েদের খেলার জন্যে।
বছরে বছরে রাজবাড়ির আঙিনায় পুতুলের মেলা বসে। সেই মেলায় সকল কারিগরই এই গুণীকে প্রধান মান দিয়ে এসেছে।
আরো দেখুন
ইচ্ছাপূরণ
Stories
সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। কিন্তু সকল সময়ে নামের মতো মানুষটি হয় না। সেইজন্যই সুবলচন্দ্র কিছু দুর্বল ছিলেন এবং সুশীলচন্দ্র বড়ো শান্ত ছিলেন না।
ছেলেটি পাড়াসুদ্ধ লোককে অস্থির করিয়া বেড়াইত, সেইজন্য বাপ মাঝে মাঝে শাসন করিতে ছুটিতেন; কিন্তু বাপের পায়ে ছিল বাত, আর ছেলেটি হরিণের মতো দৌড়িতে পারিত; কাজেই কিল চড়-চাপড় সকল সময় ঠিক জায়গায় গিয়া পড়িত না। কিন্তু সুশীলচন্দ্র দৈবাৎ যেদিন ধরা পড়িতেন সেদিন তাঁহার আর রক্ষা থাকিত না।
আরো দেখুন
পণরক্ষা
Stories
বংশীবদন তাহার ভাই রসিককে যেমন ভালোবাসিত এমন করিয়া সচরাচর মাও ছেলেকে ভালোবাসিতে পারে না। পাঠশালা হইতে রসিকের আসিতে যদি কিছু বিলম্ব হইত তবে সকল কাজ ফেলিয়া সে তাহার সন্ধানে ছুটিত। তাহাকে না খাওয়াইয়া সে নিজে খাইতে পারিত না। রসিকের অল্প কিছু অসুখবিসুখ হইলেই বংশীর দুই চোখ দিয়া ঝর্‌ঝর্‌ করিয়া জল ঝরিতে থাকিত।
রসিক বংশীর চেয়ে ষোলো বছরের ছোটো। মাঝে যে কয়টি ভাইবোন জন্মিয়াছিল সবগুলিই মারা গিয়াছে। কেবল এই সব-শেষেরটিকে রাখিয়া, যখন রসিকের এক বছর বয়স, তখন তাহার মা মারা গেল এবং রসিক যখন তিন বছরের ছেলে তখন সে পিতৃহীন হইল। এখন রসিককে মানুষ করিবার ভার একা এই বংশীর উপর।
আরো দেখুন
পরী
Stories
কুসমি বললে, তুমি বড্ড বানিয়ে কথা বল। একটা সত্যিকার গল্প শোনাও-না।
আমি বললুম, জগতে দুরকম পদার্থ আছে। এক হচ্ছে সত্য, আর হচ্ছে--আরও-সত্য। আমার কারবার আরও-সত্যকে নিয়ে।
আরো দেখুন