প্রজাপতির নির্বন্ধ
Novels
অক্ষয়কুমারের শ্বশুর হিন্দুসমাজে ছিলেন, কিন্তু তাঁহার চালচলন অত্যন্ত নব্য ছিল। মেয়েদের তিনি দীর্ঘকাল অবিবাহিত রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইতেছিলেন। লোকে আপত্তি করিলে বলিতেন, আমরা কুলীন, আমাদের ঘরে তো চিরকালই এইরূপ প্রথা।
তাঁহার মৃত্যুর পর বিধবা জগত্তারিণীর ইচ্ছা, লেখাপড়া বন্ধ করিয়া মেয়েগুলির বিবাহ দিয়া নিশ্চিন্ত হন। কিন্তু তিনি ঢিলা প্রকৃতির স্ত্রীলোক, ইচ্ছা যাহা হয় তাহার উপায় অন্বেষণ করিয়া উঠিতে পারেন না। সময় যতই অতীত হইতে থাকে আর পাঁচজনের উপর দোষারোপ করিতে থাকেন।
কী জানি কী ভেবেছ মনে,
খুলে বলো ললনে!
কী কথা হায় ভেসে যায়
ওই ছলছল নয়নে!
পাছে চেয়ে বসে আমার মন
আমি তাই ভয়ে ভয়ে থাকি,
পাছে চোখে চোখে পড়ে বাঁধা
আমি তাই তো তুলি নে আঁখি।
বড়ো থাকি কাছাকাছি
তাই ভয়ে ভয়ে আছি।
নয়ন বচন কোথায় কখন বাজিলে বাঁচি না বাঁচি।
ওগো হৃদয়-বনের শিকারি!
মিছে তারে জালে ধরা যে তোমারি ভিখারি;
সহস্রবার পায়ের কাছে আপনি যে জন মরে আছে,
নয়নবাণের খোঁচা খেতে সে যে অনধিকারী।"
স্বয়ং বিশীর্ণদ্রুমপর্ণবৃত্তিতা
পরা হি কাষ্ঠা তপসস্তয়া পুনঃ।
তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং
বদন্ত্যপর্ণেতি চ তাং পুরাবিদঃ॥
আমি কেবল ফুল জোগাব
তোমার দুটি রাঙা হাতে,
বুদ্ধি আমার খেলে নাকো
পাহারা বা মন্ত্রণাতে।
দেখব কে তোর কাছে আসে!
তুই রবি একেশ্বরী, একলা আমি রইব পাশে।
তুমি আমায় করবে মস্ত লোক!
দেবে লিখে রাজার টিকে প্রসন্ন ওই চোখ!
অভয় দাও তো বলি আমার wish কী,
একটি ছটাক সোডার জলে পাকি তিন পোয়া হুইস্কি!
কত কাল রবে বলো ভারত রে
শুধু ডাল ভাত জল পথ্য করে।
দেশে অন্নজলের হল ঘোর অনটন,
ধরো হুইস্কি সোডা আর মুর্গিমটন।
যাও ঠাকুর চৈতন চুটকি নিয়া,
এসো দাড়ি নাড়ি কলিমদ্দি মিঞা!
যাও ঠাকুর চৈতন চুটকি নিয়া,
এসো দাড়ি নাড়ি কলিমদ্দি মিঞা!
চির-পুরানো চাঁদ!
চিরদিবস এমনি থেকো আমার এই সাধ।
পুরানো হাসি পুরানো সুধা, মিটায় মম পুরানো ক্ষুধা--
নূতন কোনো চকোর যেন পায় না পরসাদ!
কোপো যত্র ভ্রূকুটিরচনা নিগ্রহো যত্র মৌনং।
যত্রান্যোন্যস্মিতমনুনয় যত্র দৃষ্টিঃ প্রসাদঃ।
"পোড়া মনে শুধু পোড়া মুখখানি জাগে রে!
এত আছে লোক, তবু পোড়া চোখে
আর কেহ নাহি লাগে রে!
যারে মরণ দশায় ধরে
সে যে শতবার করে মরে।
পোড়া পতঙ্গ যত পোড়ে তত
আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সকলি ভুলেছে ভোলা মন
ভোলে নি ভোলে নি শুধু ওই চন্দ্রানন।
গান। পরজ
স্বর্গে তোমায় নিয়ে যাবে উড়িয়ে,
পিছে পিছে আমি চলব খুঁড়িয়ে।
ইচ্ছা হবে টিকির ডগা ধরে
গান। কাফি
কার হাতে যে ধরা দেব প্রাণ;
তাই ভাবতে বেলা অবসান।
ডান দিকেতে তাকাই যখন, বাঁয়ের লাগি কাঁদে রে মন
বাঁয়ের লাগি ফিরলে তখন দক্ষিণেতে পড়ে টান।
বিরহ-যামিনী কেমনে যাপিবে,
বিচ্ছেদতাপে যখন তাপিবে
এপাশ ওপাশ বিছানা মাপিবে,
মকরকেতনে কেবলি শাপিবে--
(সাড়ম্বরে)বাষ্পীয় শকটে চড়ি নারীচূড়ামণি
পুরবালা চলি যবে গেলা কাশীধামে
বিকালে, কহ হে দেবী অমৃতভাষিণী
কোন্‌ বরাঙ্গনে বরি বরমাল্যদানে
যাপিলা বিচ্ছেদমাস শ্যালীত্রয়ীশালী
শ্রীঅক্ষয়!
তুমি জান আমার গাছে ফল কেন না ফলে!
যেমনি ফুলটি ফুটে ওঠে আনি চরণতলে।
মুগ্ধস্নিগ্ধবিদগ্ধমধুরৈর্লালৈঃ কটাক্ষৈরলং
চেতঃ সম্প্রতি চন্দ্রচূড়চরণধ্যানামৃতে বর্ততে।
ইয়মধিকমনোজ্ঞা চাপ্‌ কানেনাপি তন্বী।
কিমিব হি মধুরাণাং মণ্ডনং নাকৃতীনাম॥
গান। ভৈরবী
ওগো দয়াময়ী চোর, এত দয়া মনে তোর!
বড়ো দয়া করে কণ্ঠে আমার জড়াও মায়ার ডোর!
বড়ো দয়া করে চুরি করে লও শূন্য হৃদয় মোর!
গান। বাহার
চলেছে ছুটিয়া পলাতকা হিয়া,
বেগে বহে শিরা ধমনী--
হায় হায় হায়, ধরিবারে তায়
পিছে পিছে ধায় রমণী।
বায়ুবেগভরে উড়ে অঞ্চল,
লটপট বেণী দুলে চঞ্চল--
এ কী রে রঙ্গ, আকুল-অঙ্গ
ছুটে কুরঙ্গগমনী!
গান। সিন্ধুকাফি
মনোমন্দিরসুন্দরী,
মণিমঞ্জীরগুঞ্জরী,
স্খলদঞ্চলা চলচঞ্চলা
অয়ি মঞ্জুলা মঞ্জরী।
রোষারুণরাগরঞ্জিতা
বঙ্কিম-ভুরু-ভঞ্জিতা,
গোপনহাস্য -কুটিল-আস্য
কপটকলহগঞ্জিতা।
সংকোচনত-অঙ্গিণী,
ভয়ভঙ্গুরভঙ্গিনী,
চকিতচপল নবকুরঙ্গ
যৌবনবনরঙ্গিণী।
অয়ি খল, ছলগুন্ঠিতা,
মধুকরভরকুন্ঠিতা,
লুব্ধপবন -ক্ষুব্ধ-লোভন
মল্লিকা অবলুন্ঠিতা।
চুম্বনধনবঞ্চিনী,
দুরূহগর্বমঞ্চিনী
রুদ্ধকোরক -সঞ্চিত-মধু
কঠিনকনককঞ্জিনী।
অলিন্দে কালিন্দীকমলসুরভৌ কুঞ্জবসতের্‌-
বসন্তীং বাসন্তীনবপরিমলোদ্‌গারচিকুরাং।
ত্বদুৎসঙ্গে লীনাং মদমুকুলিতাক্ষীং পুনরিমাং
কদাহং সেবিষ্যে কিসলয়কলাপব্যজনিনী।
কুঞ্জকুটিরের স্নিগ্ধ অলিন্দের 'পর
কালিন্দীকমলগন্ধ ছুটিবে সুন্দর।
লীনা রবে মদিরাক্ষী তব অঙ্কতলে,
বহিবে বাসন্তীবাস ব্যাকুল কুন্তলে।
তাঁহারে করিব সেবা, কবে হবে হায়--
কিশলয়-পাখাখানি দোলাইব গায়?
বীথীষু বীথীষু বিলাসিনীনাং
মুখানি সংবীক্ষ্য শুচিস্মিতানি
জালেষু জালেষু করং প্রসার্য
লাবণ্যভিক্ষামটতীব চন্দ্রঃ।
কুঞ্জ পথে পথে চাঁদ উঁকি দেয় আসি,
দেখে বিলাসিনীদের মুখভরা হাসি,
কর প্রসারণ করি ফিরে সে জাগিয়া
বাতায়নে বাতায়নে লাবণ্য মাগিয়া।
দিন গেল রে, ডাক দিয়ে নে পারের খেয়া,
চুকিয়ে হিসেব মিটিয়ে দে তোর দেয়া নেয়া।
নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া,
তোমার অনল দিয়া।
কবে যাবে তুমি সমুখের পথে
দীপ্ত শিখাটি বাহি
আছি তাই পথ চাহি!
পুড়িবে বলিয়া রয়েছে আশায়
আমার নীরব হিয়া
আপন আঁধার নিয়া।
নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!
নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!
নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!
নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!
নিশি না পোহাতে জীবনপ্রদীপ
জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া!
ওরে সাবধানী পথিক, বারেক
পথ ভুলে মর্‌ ফিরে।
খোলা আঁখি দুটো অন্ধ করে দে
আকুল আঁখির নীরে।
সে ভোলা পথের প্রান্তে রয়েছে
হারানো হিয়ার কুঞ্জ,
ঝরে পড়ে আছে কাঁটাতরুতলে
রক্তকুসুমপুঞ্জ--
সেথা দুই বেলা ভাঙা-গড়া খেলা
অকূলসিন্ধুতীরে।
ওরে সাবধানী পথিক, বারেক
পথ ভুলে মর্‌ ফিরে।
বরমসৌ দিবসো ন পুনর্নিশা
ননু নিশৈব বরং ন পুনর্দিনম্‌।
উভয়মেতদুপৈত্বথবা ক্ষয়ং
প্রিয়জনেন ন যত্র সমাগমঃ।
আসে তো আসুক রাতি, আসুক বা দিবা,
যায় যদি যাক নিরবধি।
তাহাদের যাতায়াতে আসে যায় কিবা
প্রিয় মোর নাহি আসে যদি।
মন্দং নিধেহি চরণৌ পরিধেহি নীলং
বাসঃ পিধেহি বলয়াবলিমঞ্চলেন।
মা জল্প সাহসিনি শারদচন্দ্রকান্ত-
দন্তাংশবস্তব তমাংসি সমাপয়ন্তি।
ধীরে ধীরে চলো তন্বী, পরো নীলাম্বর,
অঞ্চলে বাঁধিয়া রাখো কঙ্কণ মুখর।
কথাটি কোয়ো না, তব দন্ত-অংশুরুচি
পথের তিমিররাশি পাছে ফেলে মুছি।
কবীন্দ্রাণাং চেতঃকমলবনমালাতপরুচিং
ভজন্তে যে সন্তঃ কতিচিদরুণামেব ভবতীং
বিরিঞ্চিপ্রেয়স্যাস্তরুণতরশৃঙ্গারলহরীং
গভীরাভির্বাগ্‌ভির্বিদধাতি সভারঞ্জনময়ীম্‌।
In such a night as this,
When the sweet wind did gently kiss the trees,
And they did make no noise, in such a night
Troilus methinks mounted the Troyan walls
and sighed his soul toward the Grecian tents,
Where Cressid lay that night.
অপসরতি ন চক্ষুষো মৃগাক্ষী
রজনিরিয়ং চ ন যাতি নৈতি নিদ্রা।
চক্ষু'পরে মৃগাক্ষীর চিত্রখানি ভাসে--
রজনীও নাহি যায়, নিদ্রাও না আসে।
নিঃসীমশোভাসৌভাগ্যং নতাঙ্গ্যা নয়নদ্বয়ং
অন্যোহন্যালোকনানন্দবিরহাদিব চঞ্চলং--
আনতাঙ্গী বালিকার শোভাসৌভাগ্যের সার নয়নযুগল
না দেখিয়া পরস্পরে তাই কি বিরহভরে হয়েছে চঞ্চল?
প্রিয়চক্ষু-দেখাদেখি যে আনন্দ তাই সে কি খুঁজিছে চঞ্চল?
প্রিয়চক্ষু-দেখাদেখি যে আনন্দ তাই সে কি খুঁজিছে চঞ্চল?
হত্বা লোচনবিশিখৈর্গত্বা কতিচিৎ পদানি পদ্মাক্ষী
জীবতি যুবা ন বা কিং ভূয়ো ভূয়ো বিলোকয়তি।
বিঁধিয়া দিয়া আঁখিবাণে
যায় সে চলি গৃহপানে,
জনমে অনুশোচনা--
বাঁচিল কি না দেখিবারে
চায় সে ফিরে বারে বারে
কমলবরলোচনা!
লোচনে হরিণগর্বমোচনে
মা বিদূষয় নতাঙ্গি কজ্জলৈঃ।
সায়কঃ সপদি জীবহারকঃ
কিং পুনর্হি গরলেন লেপিতঃ?
হরিণগর্বমোচন লোচনে
কাজল দিয়ো না সরলে!
এমনি তো বাণ নাশ করে প্রাণ,
কী কাজ লেপিয়া গরলে?
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়
কোন্‌ পাথারে কোন্‌ পাষাণের ঘায়।
নবীন তরী নতুন চলে,
দিই নি পাড়ি অগাধ জলে,
বাহি তারে খেলার ছলে কিনার-কিনারায়।
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়।
ভেসেছিল স্রোতের ভরে,
একা ছিলেন কর্ণ ধ'রে--
লেগেছিল পালের 'পরে মধুর মৃদু বায়।
সুখে ছিলেম আপন মনে,
মেঘ ছিল না গগনকোণে--
লাগবে তরী কুসুমবনে ছিলেন সে আশায়।
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়।
তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়
কোন্‌ পাথারে কোন্‌ পাষাণের ঘায়।
গান। পিলু
বিরহে মরিব বলে ছিল মনে পণ।
কে তোরা বাহুতে বাঁধি করিলি বারণ?
ভেবেছিনু অশ্রুজলে, ডুবিব অকূল তলে,
কাহার সোনার তরী করিল তারণ?
গান
অলকে কুসুম না দিয়ো,
শুধু শিথিলকবরী বাঁধিয়ো।
কাজলবিহীন সজলনয়নে
হৃদয়দুয়ারে ঘা দিয়ো।
আকুল আঁচলে পথিকচরণে
মরণের ফাঁদ ফাঁদিয়ো।
না করিয়া বাদ মনে যাহা সাধ
নিদয়া নীরবে সাধিয়ো।
কেন সারাদিন ধীরে ধীরে
বালু নিয়ে শুধু খেল তীরে!
চলে গেল বেলা, রেখে মিছে খেলা
ঝাঁপ দিয়ে পড়ো কালো নীরে।
অকূল ছানিয়ে যা পাস তা নিয়ে
হেসে কেঁদে চলো ঘরে ফিরে।
নাহি জানি মনে কী বাসিয়া
পথে বসে আছে কে আসিয়া।
কী কুসুমবাসে ফাগুনবাতাসে
হৃদয় দিতেছে উদাসিয়া।
চল্‌ ওরে এই খেপা বাতাসেই
সাথে নিয়ে সেই উদাসীরে।
সখা, কী মোর করমে লেখি!
তপত বলিয়া তপনে ডরিনু,
চাঁদের কিরণ দেখি!
গান
ভুলে ভুলে আজ ভুলময়!
ভুলের লতায় বাতাসের ভুলে
ফুলে ফুলে হোক ফুলময়!
আনন্দ-ঢেউ ভুলের সাগরে
উছলিয়া হোক কূলময়।
গতং তদ্‌গাম্ভীর্যং তটমপি চিতং জালিকশতৈঃ।
সখে হংসোত্তিষ্ঠ, ত্বরিতমমুতো গচ্ছ সরসঃ॥
সে গাম্ভীর্য গেল কোথা, নদীতটে হেরো হোথা
জালিকেরা জালে ফেলে ঘিরে--
সখে হংস, ওঠো ওঠো, সময় থাকিতে ছোটো
হেথা হতে মানসের তীরে।
অয়ি কুরঙ্গ তপোবনবিভ্রমাৎ
উপগতাসি কিরাতপুরীমিমাম্॥
সর্বস্তরতু দুর্গাণি সর্বো ভদ্রাণি পশ্যতু।
সর্বঃ কামানবাপ্নোতু সর্বঃ সর্বত্র নন্দতু॥
আরো দেখুন
চোখের বালি
Novels
বিনোদিনীর মাতা হরিমতি মহেন্দ্রের মাতা রাজলক্ষ্মীর কাছে আসিয়া ধন্না দিয়া পড়িল। দুইজনেই এক গ্রামের মেয়ে, বাল্যকালে একত্রে খেলা করিয়াছেন।
রাজলক্ষ্মী মহেন্দ্রকে ধরিয়া পড়িলেন, "বাবা মহিন, গরিবের মেয়েটিকে উদ্ধার করিতে হইবে। শুনিয়াছি মেয়েটি বড়ো সুন্দরী, আবার মেমের কাছে পড়াশুনাও করিয়াছে-- তোদের আজকালকার পছন্দর সঙ্গে মিলিবে।"
"চরণতরণী দে মা, তারিণী তারা।'
আরো দেখুন
শেষের কবিতা
Novels
অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী "রয়" ও "রে" রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন্তু সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামান্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-- অমিট রায়ে।
অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্‌বিজয়ী ব্যারিস্টার। যে পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তির সাংঘাতিক সংঘাতেও অমিত বিনা বিপত্তিতে এ যাত্রা টিঁকে গেল।
                         আনিলাম
               অপরিচিতের নাম
                                   ধরণীতে,
               পরিচিত জনতার সরণীতে।
                                   আমি আগন্তুক,
               আমি জনগণেশের প্রচণ্ড কৌতুক।
                                   খোলো দ্বার,
               বার্তা আনিয়াছি বিধাতার।
                         মহাকালেশ্বর
               পাঠায়েছে দুর্লক্ষ্য অক্ষর,
                         বল্‌ দুঃসাহসী কে কে
                         মৃত্যু পণ রেখে
               দিবি তার দুরূহ উত্তর।
               শুনিবে না।
                         মূঢ়তার সেনা
                                   করে পথরোধ।
                             ব্যর্থ ক্রোধ
                         হুংকারিয়া পড়ে বুকে,
                                   তরঙ্গের নিষ্ফলতা
                                            নিত্য যথা
                                   মরে মাথা ঠুকে
                                   শৈলতট-'পরে
                                            আত্মঘাতী দম্ভভরে।
                         পুষ্পমাল্য নাহি মোর, রিক্ত বক্ষতল,
                                   নাহি বর্ম অঙ্গদ কুণ্ডল।
                         শূন্য এ ললাটপট্টে লিখা।
                                   গূঢ় জয়টিকা।
                         ছিন্ন কন্থা দরিদ্রের বেশ।
                                   করিব নিঃশেষ
                                            তোমার ভাণ্ডার।
                                   খোলো খোলো দ্বার।
                                                অকস্মাৎ
                                   বাড়ায়েছি হাত,
                                            যা দিবার দাও অচিরাৎ।
                                  বক্ষ তব কেঁপে উঠে, কম্পিত অর্গল,
                                            পৃথ্বী টলমল।
                         ভয়ে আর্ত উঠিছে চীৎকারি
                                   দিগন্ত বিদারি,
                                            "ফিরে যা এখনি,
                                   রে দুর্দান্ত দুরন্ত ভিখারি,
                                            তোর কণ্ঠধ্বনি
                                   ঘুরি ঘুরি
                         নিশীথনিদ্রার বক্ষে হানে তীব্র ছুরি।"
                                   অস্ত্র আনো।
                         ঝঞ্ঝনিয়া আমার পঞ্জরে হানো।
                                   মৃত্যুরে মারুক মৃত্যু, অক্ষয় এ প্রাণ
                                            করি যাব দান।
                                          শৃঙ্খল জড়াও তবে,
                                   বাঁধো মোরে, খণ্ড খণ্ড হবে,
                                          মুহূর্তে চকিতে,
                                   মুক্তি তব আমারি মুক্তিতে।
                                            শাস্ত্র আনো।
                                        হানো মোরে, হানো।
                                            পণ্ডিতে পণ্ডিতে
                         ঊর্ধ্বস্বরে চাহিব খণ্ডিতে
                                            দিব্য বাণী।
                                            জানি জানি
                                            তর্কবাণ
                                   হয়ে যাবে খান খান।
                         মুক্ত হবে জীর্ণ বাক্যে আচ্ছন্ন দু চোখ--
                                   হেরিবে আলোক।
                                            অগ্নি জ্বালো।
                         আজিকার যাহা ভালো
                                   কল্য যদি হয় তাহা কালো,
                                    যদি তাহা ভস্ম হয়
                                           বিশ্বময়,
                                   ভস্ম হোক।
                                 দূর করো শোক।
                               মোর অগ্নিপরীক্ষায়
                         ধন্য হোক বিশ্বলোক অপূর্ব দীক্ষায়।
                                   আমার দুর্বোধ বাণী
                                 বিরুদ্ধ বুদ্ধির 'পরে মুষ্টি হানি
                                   করিবে তাহারে উচ্চকিত,
                                            আতঙ্কিত।
                                   উন্মাদ আমার ছন্দ
                                             দিবে ধন্দ
                                   শান্তিলুব্ধ মুমুক্ষুরে,
                                   ভিক্ষাজীর্ণ বুভুক্ষুরে।
                                      শিরে হস্ত হেনে
                                   একে একে নিবে মেনে
                                            ক্রোধে ক্ষোভে ভয়ে
                                                      লোকালয়ে
                                            অপরিচিতের জয়,
                                            অপরিচিতের পরিচয়--
                                                যে অপরিচিত
                                বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
                                              হানি বজ্রমুঠি
                                            মেঘের কার্পণ্য টুটি
                                            সংগোপন বর্ষণসঞ্চয়
                                   ছিন্ন ক'রে মুক্ত করে সর্বজগন্ময়॥
               পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
               আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
                         রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
                         পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
                                   ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
                                       দিগঙ্গনার নৃত্য;
                         হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
                                ঝলমল করে চিত্ত।
               নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
               বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
                         হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
                         নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
                         প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
                                   অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ
                   উদ্ধত যত শাখার শিখরে
                         রডোডেনড্রনগুচ্ছ।
               নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
               নাই রে ঘরের লালন ললিত যত্ন।
                         পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
                         বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
                                   ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
                                           কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
                             আমরা চকিত অভাবনীয়ের
                                   ক্কচিৎ-কিরণে দীপ্ত।
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্‌।
                         ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।"
               রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
                         যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?
                                   কোন্‌ অন্ধক্ষণে
                                বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
                           রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
                                   মুখ দেখিলাম তোর।
               চক্ষু'পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
                           আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।
                                   তোর সাথে চেনা
                                   সহজে হবে না--
                              কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।
                                   করে নেব জয়
                              সংশয়কুণ্ঠিত তোর বাণী--
                                   দৃপ্ত বলে লব টানি
                              শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
                                   নির্দয় আলোতে।
                              জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
                              মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
                                   ছিন্ন হবে ডোর--
                               তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।
                                   "হে অচেনা,
                             দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
                                   তীব্র আকস্মিক
                                বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
                         তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
                                  দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।"
                         হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,
                         আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা।"
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         "ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের
                                   স্বচ্ছ ধারা--
                         তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
                                   সূর্য তারা।
               "আজি মাঝে মাঝে আমার ছায়ারে
               দুলায়ে খেলায়ো তারি এক ধারে,
               সে ছায়ারি সাথে হাসিয়া মিলায়ো
                         কলধ্বনি--
               দিয়ো তারে বাণী যে বাণী তোমার
                         চিরন্তনী।
               "আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
                         মিলিত ছবি,
               তাই নিয়ে আজি পরানে আমার
                         মেতেছে কবি।
               পদে পদে তব আলোর ঝলকে
               ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
               মোর বাণীরূপ দেখিলাম আজি,
                         নির্ঝরিণী।
               তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
                         নিজেরে চিনি।"
                         পূর্ণপ্রাণে চাবার যাহা
                         রিক্ত হাতে চাস নে তারে;
                         সিক্ত চোখে যাস নে দ্বারে।
                         রত্নমালা আনবি যবে
                         মাল্যবদল তখন হবে,
                         পাতবি কি তোর দেবীর আসন
                         শূন্য ধুলায় পথের ধারে।
                         পুষ্প-উদার চৈত্রবনে
                         বক্ষে ধরিস নিত্যধনে
                         লক্ষ শিখায় জ্বলবে যখন
                         দীপ্ত প্রদীপ অন্ধকারে।
For we are bound where mariner has not yet dared to go,
And we will risk the ship, ourselves and all।
            আমরা যাব যেখানে কোনো
                যায় নি নেয়ে সাহস করি,
            ডুবি যদি তো ডুবি-না কেন--
                ডুবুক সবই, ডুবুক তরী।
                        O, what is this?
               Mysterious and uncapturable bliss
               That I have known, yet seems to be
               Simple as breath and easy as a smile,
                      And older than the earth।
                  একি রহস্য, একি আনন্দরাশি!
               জেনেছি তাহারে, পাই নি তবুও পেয়ে।
                    তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি,
                    তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি,
                         পুরানো সে যেন এই ধরণীর চেয়ে।
                    বিদ্যাপতি কহে, কৈসে গোঙায়বি
                        হরি বিনে দিন রাতিয়া।
                         চলি যবে গেলা যমপুরে
                         অকালে!
           "Blow gently over my garden
                     Wind of the southern sea
           In the hour my love cometh
                     And calleth me।
           চুমিয়া যেও তুমি
           আমার বনভূমি
                 দখিন-সাগরের সমীরণ,
           যে শুভখনে মম
           আসিবে প্রিয়তম,
                 ডাকিবে নাম ধরে অকারণ।"
         "মিতা, ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং,
                   ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্‌।"
               ছাদের উপরে বহিয়ো নীরবে
               ওগো দক্ষিণ-হাওয়া
               প্রেয়সীর সাথে যে নিমেষে হবে
               চারি চক্ষুতে চাওয়া।
                 "তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি
                 রজনীর শুভ্র অবসানে। কিছু আর নাই বাকি,
                 নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি,
                 নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্ব-হাসি,
                 নাই পিছু ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি
                 ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।"
                 সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া
                           এনেছ  অশ্রুজল।
                 এনেছ তোমার বক্ষে ধরিয়া
                          দুঃসহ হোমানল।
                 দুঃখ যে তার উজ্জ্বল হয়ে উঠে,
                 মুগ্ধ প্রাণের আবেশ-বন্ধ টুটে।
                 এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া
                            বিচ্ছেদশতদল।"
                 "সুন্দরী তুমি শুকতারা
                       সুদূর শৈলশিখরান্তে,
                 শর্বরী যবে হবে সারা
                       দর্শন দিয়ো দিক্‌ভ্রান্তে।
                     ধরা যেথা অম্বরে মেশে
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     আঁধারের বক্ষের 'পরে
                          আধেক আলোক-রেখা-রন্ধ্র।
                     আমার আসন রাখে পেতে
                          নিদ্রাগহন মহাশূন্য।
                     তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে
                          তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ণ।
                     মন্দচরণে চলি পারে,
                          যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ।
                     সুর থেমে আসে বারে বারে,
                          ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।
                     সুন্দরী ওগো শুকতারা,
                          রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ
                     স্বপ্নে যে বাণী হল হারা
                          জাগরণে করো তারে পূর্ণ।
                     নিশীথের তল হতে তুলি
                          লহো তারে প্রভাতের জন্য।
                     আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি,
                          আলোকে তাহারে করো ধন্য।
                     যেখানে সুপ্তি হল লীনা,
                          যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,
                     অর্পিনু সেথা মোর বীণা
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     "কত ধৈর্য ধরি
                 ছিলে কাছে দিবসশর্বরী।
                     তব পদ-অঙ্কনগুলিরে
                 কতবার দিয়ে গেছ মোর ভাগ্যপথের ধূলিরে।
                       আজ যবে
                 দূরে যেতে হবে
                     তোমারে করিয়া যাব দান
                       তব জয়গান।
                 কতবার ব্যর্থ আয়োজনে
                     এ জীবনে
                 হোমাগ্নি উঠে নি জ্বলি,
                     শূন্যে গেছে চলি
                 হতাশ্বাস ধূমের কুণ্ডলী।
                 কতবার ক্ষণিকের শিখা
                       আঁকিয়াছে ক্ষীণ টিকা
                     নিশ্চেতন নিশীথের ভালে।
                 লুপ্ত হয়ে গেছে তাহা চিহ্নহীন কালে।
                     এবার তোমার আগমন
                          হোমহুতাশন
                              জ্বেলেছে গৌরবে।
                          যজ্ঞ মোর ধন্য হবে।
                     আমার আহুতি দিনশেষে
                 করিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে।
                          লহো এ প্রণাম
                     জীবনের পূর্ণপরিণাম।
                              এ প্রণতি'পরে
                          স্পর্শ রাখো স্নেহভরে,
                     তোমার ঐশ্বর্য-মাঝে
                       সিংহাসন যেথায় বিরাজে
                          করিয়ো আহ্বান,
                       সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান।"
       তোমারে ছাড়িয়া যেতে হবে
          রাত্রি যবে
     উঠিবে উন্মনা হয়ে প্রভাতের রথচক্ররবে।
          হায় রে বাসরঘর,
    বিরাট বাহির সে যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ংকর।
        তবু সে যতই ভাঙে-চোরে,
     মালাবদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন করে,
         তুমি আছ ক্ষয়হীন
           অনুদিন;
          তোমার উৎসব
      বিচ্ছিন্ন না হয় কভু, না হয় নীরব।
      কে বলে তোমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল
         শূন্য করি তব শয্যাতল।
         যায় নাই, যায় নাই,
     নব নব যাত্রী-মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তারাই
          তোমার আহ্বানে
        উদার তোমার দ্বার-পানে।
           হে বাসরঘর,
       বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর।
              Tender is the night
And haply the queen moon is on her throne।
           তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।
           অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার অন্তিম আগমন।
               লভিয়াছি চিরস্পর্শমণি;
           আমার শূন্যতা তুমি পূর্ণ করি গিয়েছ আপনি।
           জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান
           সন্ধ্যার দেউলদীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান।
               বিচ্ছেদের হোমবহ্নি হতে
           পূজামূর্তি ধরি প্রেম দেখা দিল দুঃখের আলোতে।
                                                            মিতা।
      কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
             তারি রথ নিত্যই উধাও
         জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
      চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
                 ওগো বন্ধু,
             সেই ধাবমান কাল
      জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল--
             তুলে নিল দ্রুতরথে
      দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
         তোমা হতে বহু দূরে।
             মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
         পার হয়ে আসিলাম
      আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়--
         রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
             আমার পুরানো নাম।
         ফিরিবার পথ নাহি;
             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                 পারিবে না চিনিতে আমায়।
                         হে বন্ধু, বিদায়।
      কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
             বসন্তবাতাসে
      অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
             ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
      সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--কিছু মোর পিছে রহিল সে
             তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
                 হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
      হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
                 তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
      সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                 সে আমার প্রেম।
         তারে আমি রাখিয়া এলেম
      অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
         পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
             কালের যাত্রায়।
                 হে বন্ধু, বিদায়।
                  তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
   মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
           যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
             হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
                 পূজার সে খেলা
      ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
             তৃষার্ত আবেগ-বেগে
      ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
             তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
      যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
             তার সাথে দিব না মিশায়ে
      যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
             আজো তুমি নিজে
             হয়তো-বা করিবে রচন
      মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
      ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
             হে বন্ধু, বিদায়।
             মোর লাগি করিয়ো না শোক,
      আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
             মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
      শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
      উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
             সেই ধন্য করিবে আমাকে।
             শুক্লপক্ষ হতে আনি
             রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                      যে পারে সাজাতে
             অর্ঘ্যথালা  কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
             যে আমারে দেখিবারে পায়
                 অসীম ক্ষমায়
             ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
      এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                 তোমারে যা দিয়েছিনু তার
                 পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                 হেথা মোর তিলে তিলে দান,
      করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
             হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
                 ওগো তুমি নিরুপম,
                       হে ঐশ্বর্যবান,
             তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--
                 গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                       হে বন্ধু, বিদায়।
                                          বন্যা
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
মাস্টারমশায়
Stories
রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তাহার পাশে একটি কোট-হ্যাট-পরা বাঙালি বিলাতফের্তা যুবা সম্মুখের আসনে দুই পা তুলিয়া দিয়া একটু মদমত্ত অবস্থায় ঘাড় নামাইয়া ঘুমাইতেছিল। এই যুবকটি নূতন বিলাত হইতে আসিয়াছে। ইহারই অভ্যর্থনা উপলক্ষে বন্ধুমহলে একটা খানা হইয়া গেছে। সেই খানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্য নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, 'মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।'
মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন।
আরো দেখুন
শাস্তি
Stories
দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই দুই ভাই সকালে যখন দা হাতে লইয়া জন খাটিতে বাহির হইল তখন তাহাদের দুই স্ত্রীর মধ্যে বকাবকি চেঁচামেচি চলিতেছে। কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য নানাবিধ নিত্য কলরবের ন্যায় এই কলহ-কোলাহলও পাড়াসুদ্ধ লোকের অভ্যাস হইয়া গেছে। তীব্র কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র লোকে পরস্পরকে বলে--'ওই রে বাধিয়া গিয়াছে,' অর্থাৎ যেমনটি আশা করা যায় ঠিক তেমনিটি ঘটিয়াছে, আজও স্বভাবের নিয়মের কোনোরূপ ব্যত্যয় হয় নাই। প্রভাতে পূর্বদিকে সূর্য উঠিলে যেমন কেহ তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ নির্ণয়ের জন্য কাহারও কোনোরূপ কৌতূহলের উদ্রেক হয় না।
অবশ্য এই কোন্দল আন্দোলন প্রতিবেশীদের অপেক্ষা দুই স্বামীকে বেশি স্পর্শ করিত সন্দেহ নাই, কিন্তু সেটা তাহারা কোনোরূপ অসুবিধার মধ্যে গণ্য করিত না। তাহারা দুই ভাই যেন দীর্ঘ সংসারপথ একটা এক্কাগাড়িতে করিয়া চলিয়াছে, দুই দিকের দুই স্প্রিংবিহীন চাকার অবিশ্রাম ছড়ছড় খড়খড় শব্দটাকে জীবনরথযাত্রার একটা বিধিবিহিত নিয়মের মধ্যেই ধরিয়া লইয়াছে।
আরো দেখুন
রাজার বাড়ি
Stories
কুসমি জিগেস করলে, দাদামশায়, ইরুমাসির বোধ হয় খুব বুদ্ধি ছিল।
ছিল বই-কি, তোর চেয়ে বেশি ছিল।
আরো দেখুন
প্রগতিসংহার
Stories
এই কলেজে ছেলেমেয়েদের মেলামেশা বরঞ্চ কিছু বাড়াবাড়ি ছিল। এরা প্রায় সবাই ধনী ঘরের--এরা পয়সার ফেলাছড়া করতে ভালোবাসে। নানা রকম বাজে খরচ করে মেয়েদের কাছে দরাজ হাতের নাম কিনত। মেয়েদের মনে ঢেউ তুলত, তারা বুক ফুলিয়ে বলত--'আমাদেরই কলেজের ছেলে এরা'। সরস্বতী পুজো তারা এমনি ধূম করে করত যে, বাজারে গাঁদা ফুলের আকাল পড়ে যেত। এ ছাড়া চোখটেপাটেপি ঠাট্টা তামাসা চলেইছে। এই তাদের মাঝখানে একটা সংঘ তেড়েফুঁড়ে উঠে মেলামেশা ছারখার করে দেবার জো করলে।
সংঘের হাল ধরে ছিল সুরীতি। নাম দিল 'নারীপ্রগতিসংঘ'। সেখানে পুরুষের ঢোকবার দরজা ছিল বন্ধ। সুরীতির মনের জোরের ধাক্কায় এক সময়ে যেন পুরুষ-বিদ্রোহের একটা হাওয়া উঠল। পুরুষরা যেন বেজাত, তাদের সঙ্গে জলচল বন্ধ। কদর্য তাদের ব্যায়ভার।
আরো দেখুন
ডিটেকটিভ
Stories
আমি পুলিসের ডিটেকটিভ কর্মচারী।  আমার জীবনের দুটিমাত্র লক্ষ্য ছিল-- আমার স্ত্রী এবং আমার ব্যবসায়। পূর্বে একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে ছিলাম, সেখানে আমার স্ত্রীর প্রতি সমাদরের অভাব হওয়াতেই আমি দাদার সঙ্গে ঝগড়া করিয়া বাহির হইয়া আসি। দাদাই উপার্জন করিয়া আমাকে পালন করিতেছিলেন, অতএব সহসা সস্ত্রীক তাঁহার আশ্রয় ত্যাগ করিয়া আসা আমার পক্ষে দুঃসাহসের কাজ হইয়াছিল।
কিন্তু কখনো নিজের উপরে আমার বিশ্বাসের ত্রুটি ছিল না। আমি নিশ্চয় জানিতাম, সুন্দরী স্ত্রীকে যেমন বশ করিয়াছি বিমুখ অদৃষ্টলক্ষ্মীকেও তেমনি বশ করিতে পারিব। মহিমচন্দ্র এ সংসারে পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না।
আরো দেখুন