ও জান না কি
Songs
                      জান না কি
    পিছনে তোমার রয়েছে রাজার চর।
         জানি জানি, তাই তো আমি
                 চলেছি দেশান্তর।
এ মানিক পেলেম আমি অনেক দেবতা পূজে,
              বাধার সঙ্গে যুঝে--
এ মানিক দেব যারে অমনি তারে পাব খুঁজে,
              চলেছি দেশ-দেশান্তর॥
আরো দেখুন
তারাপ্রসন্নের কীর্তি
Stories
লেখকজাতির প্রকৃতি অনুসারে তারাপ্রসন্ন কিছু লাজুক এবং মুখচোরা ছিলেন। লোকের কাছে বাহির হইতে গেলে তাঁহার সর্বনাশ উপস্থিত হইত। ঘরে বসিয়া কলম চালাইয়া তাঁহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, পিঠ একটু কুঁজা, সংসারের অভিজ্ঞতা অতি অল্প। লৌকিকতার বাঁধি বোলসকল সহজে তাঁহার মুখে আসিত না, এইজন্য গৃহদুর্গের বাহিরে তিনি আপনাকে কিছুতেই নিরাপদ মনে করিতেন না।
লোকেও তাঁহাকে একটা উজবুক রকমের মনে করিত এবং লোকেরও দোষ দেওয়া যায় না। মনে করো, প্রথম পরিচয়ে একটি পরম ভদ্রলোক উচ্ছ্বসিত কন্ঠে তারাপ্রসন্নকে বলিলেন, "মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হয়ে যে কী পর্যন্ত আনন্দ লাভ করা গেল, তা একমুখে বলতে পারি নে"-- তারাপ্রসন্ন নিরুত্তর হইয়া নিজের দক্ষিণ করতল বিশেষ মনোযোগপূর্বক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ সে নীরবতার অর্থ এইরূপ মনে হয়, "তা, তোমার আনন্দ হয়েছে সেটা খুব সম্ভব বটে, কিন্তু আমার-যে আনন্দ হয়েছে এমন মিথ্যা কথাটা কী করে মুখে উচ্চারণ করব তাই ভাবছি।"
আরো দেখুন
গানভঙ্গ
Verses
গাহিছে কাশীনাথ নবীন যুবা,   ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি,
কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর   সাতটি যেন পোষা পাখি।
শানিত তরবারি গলাটি যেন   নাচিয়া ফিরে দশ দিকে--
কখন কোথা যায় না পাই  দিশা,   বিজুলি-হেন ঝিকিমিকে।
আপনি গড়ি তোলে বিপদজাল,   আপনি কাটি দেয় তাহা--
সভার লোকে শুনে অবাক মানে,   সঘনে বলে "বাহা বাহা'।
কেবল বুড়া রাজা প্রতাপ রায়   কাঠের মতো বসি আছে,
বরজলাল ছাড়া কাহারো গান    ভালো না লাগে তার কাছে।
বালকবেলা হতে তাহারি গীতে   দিল সে এতকাল যাপি--
বাদল-দিনে কত মেঘের গান,   হোলির দিনে কত কাফি।
গেয়েছে আগমনী শরৎপ্রাতে,    গেয়েছে বিজয়ার গান--
হৃদয় উছসিয়া অশ্রুজলে   ভাসিয়া গিয়াছে দুনয়ান।
যখনি মিলিয়াছে বন্ধুজনে   সভার গৃহ গেছে পূরে,
গেয়েছে গোকুলের গোয়াল-গাথা   ভূপালি মূলতানি সুরে।
ঘরেতে বারবার এসেছে কত    বিবাহ-উৎসবরাতি,
পরেছে দাসদাসী লোহিত বাস,  জ্বলেছে শত শত বাতি--
বসেছে নব বর সলাজ মুখে   পরিয়া মণি-আভরণ,
করিছে পরিহাস কানের কাছে    সমবয়সী প্রিয়জন,
সামনে বসি তার বরজলাল  ধরেছে শাহানার সুর--
সে-সব দিন আর সে-সব গান   হৃদয়ে আছে পরিপূর।
সে ছাড়া কারো গান শুনিলেই তাই   মর্মে গিয়ে নাহি লাগে,
অতীত প্রাণ যেন মন্ত্রবলে   নিমেষে প্রাণে নাহি জাগে।
প্রতাপ রায় তাই দেখিছে শুধু   কাশীর বৃথা মাথা নাড়া
সুরের পরে সুর ফিরিয়া যায়,   হৃদয়ে নাহি পায় সাড়া।
থামিল গান যবে, ক্ষণেক-তরে   বিরাম মাগে কাশীনাথ--
বরজলাল-পানে প্রতাপ রায়   হাসিয়া করে আঁখিপাত।
কানের কাছে তার রাখিয়া মুখ   কহিল, "ওস্তাদজি,
গানের মতো গান শুনায়ে দাও,   এরে কি গান বলে! ছি!
এ যেন পাখি লয়ে বিবিধ ছলে   শিকারী বিড়ালের খেলা।
সেকালে গান ছিল, একালে হায়   গানের বড়ো অবহেলা।'
বরজলাল বুড়া শুক্লকেশ,   শুভ্র উষ্ণীষ শিরে,
বিনতি করি সবে সভার মাঝে   আসন নিল ধীরে ধীরে।
শিরা-বাহির-করা শীর্ণ করে   তুলিয়া নিল তানপুর,
ধরিল নতশিরে নয়ন মুদি   ইমনকল্যাণ সুর।
কাঁপিয়া ক্ষীণ স্বর মরিয়া যায়   বৃহৎ সভাগৃহকোণে,
ক্ষুদ্র পাখি যথা ঝড়ের মাঝে   উড়িতে নারে প্রাণপণে।
বসিয়া বাম পাশে প্রতাপ রায়   দিতেছে শত উৎসাহ--
"আহাহা, বাহা বাহা!' কহিছে কানে, "গলা ছাড়িয়া গান গাহ।'
সভার লোকে সবে অন্যমনা--কেহ বা কানাকানি করে,
কেহ বা তোলে হাই, কেহ বা ঢোলে, কেহ বা চলে যায় ঘরে।
"ওরে রে আয় লয়ে তামাকু পান'  ভৃত্যে ডাকি কেহ কয়।
সঘনে পাখা নাড়ি কেহ বা বলে, "গরম আজি অতিশয়।'
করিছে আনাগোনা ব্যস্ত লোক,   ক্ষণেক নাহি রহে চুপ।
নীরব ছিল সভা, ক্রমশ সেথা   শব্দ ওঠে শতরূপ।
বুড়ার গান তাহে ডুবিয়া যায়,   তুফান-মাঝে ক্ষীণ তরী--
কেবল দেখা যায় তানপুরায়   আঙুল কাঁপে থরথরি।
হৃদয়ে যেথা হতে গানের সুর    উছসি উঠে নিজসুখে
হেলার কলরব শিলার মতো   চাপে সে উৎসের মুখে।
কোথায় গান আর কোথায় প্রাণ   দু দিকে ধায় দুই জনে,
তবুও রাখিবারে প্রভুর মান   বরজ গায় প্রাণপণে।
গানের এক পদ মনের ভ্রমে   হারায়ে গেল কী করিয়া--
আবার তাড়াতাড়ি ফিরিয়া গাহে,   লইতে চাহে শুধরিয়া।
আবার ভুলে যায় পড়ে না মনে,   শরমে মস্তক নাড়ি
আবার শুরু হতে ধরিল গান--  আবার ভুলি দিল ছাড়ি।
দ্বিগুণ থরথরি কাঁপিছে হাত,   স্মরণ করে গুরুদেবে।
কণ্ঠ কাঁপিতেছে কাতরে, যেন   বাতাসে দীপ নেবে-নেবে।
গানের পদ তবে ছাড়িয়া দিয়া   রাখিল সুরটুকু ধরি--
সহসা হাহারবে উঠিল কাঁদি    গাহিতে গিয়া হা-হা করি।
কোথায় দূরে গেল সুরের খেলা,   কোথায় তাল গেল ভাসি,
গানের সুতা ছিঁড়ি পড়িল খসি   অশ্রুমুকুতার রাশি।
কোলের সখী তানপুরার 'পরে   রাখিল লজ্জিত মাথা--
ভুলিল শেখা গান, পড়িল মনে   বাল্যক্রন্দনগাথা।
নয়ন ছলছল, প্রতাপ রায়   কর বুলায় তার দেহে--
"আইস হেথা হতে আমরা যাই'   কহিল সকরুণ স্নেহে।
শতেক-দীপ-জ্বালা নয়ন-ভরা   ছাড়ি সে উৎসবঘর
বাহিরে গেল দুটি প্রাচীন সখা   ধরিয়া দুঁহু দোঁহা-কর।
বরজ করজোড়ে কহিল, "প্রভু,   মোদের সভা হল ভঙ্গ!
এখন আসিয়াছে নূতন লোক, ধরায় নব নব রঙ্গ!
জগতে আমাদের বিজন সভা,   কেবল তুমি আর আমি--
সেথায় আনিয়ো না নূতন শ্রোতা   মিনতি তব পদে স্বামী!
একাকী গায়কের নহে তো গান,   মিলিতে হবে দুই জনে--
গাহিবে একজন খুলিয়া গলা,   আরেক জন গাবে মনে।
তটের বুকে লাগে জলের ঢেউ   তবে সে কলতান উঠে,
বাতাসে বনসভা শিহরি কাঁপে   তবে সে মর্মর ফুটে।
জগতে যেথা যত রয়েছে ধ্বনি   যুগল মিলিয়াছে আগে--
যেখানে প্রেম নাই, বোবার সভা,   সেখানে গান নাহি জাগে।'
আরো দেখুন
মহামায়া
Stories
মহামায়া এবং রাজীবলোচন উভয়ে নদীর ধারে একটা ভাঙা মন্দিরে সাক্ষাৎ করিল।
মহামায়া কোনো কথা না বলিয়া তাহার স্বাভাবিক গম্ভীর দৃষ্টি ঈষৎ ভর্ৎসনার ভাবে রাজীবের প্রতি নিক্ষেপ করিল। তাহার মর্ম এই, তুমি কী সাহসে আজ অসময়ে আমাকে এখানে আহ্বান করিয়া আনিয়াছ। আমি এ পর্যন্ত তোমার সকল কথা শুনিয়া আসিতেছি বলিয়াই তোমার এতদূর স্পর্ধা বাড়িয়া উঠিয়াছে?
আরো দেখুন
ল্যাবরেটরি
Stories
নন্দকিশোর ছিলেন লণ্ডন য়ুনিভার্সিটি থেকে পাস করা এঞ্জিনীয়ার। যাকে সাধুভাষায় বলা যেতে পারে দেদীপ্যমান ছাত্র অর্থাৎ ব্রিলিয়ান্ট, তিনি ছিলেন তাই। স্কুল থেকে আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার তোরণে তোরণে ছিলেন পয়লা শ্রেণীর সওয়ারী।
ওঁর বুদ্ধি ছিল ফলাও, ওঁর প্রয়োজন ছিল দরাজ, কিন্তু ওঁর অর্থসম্বল ছিল আঁটমাপের।
আরো দেখুন
ঘোড়া
Stories
সৃষ্টির কাজ প্রায় শেষ হয়ে যখন ছুটির ঘণ্টা বাজে ব'লে, হেনকালে ব্রহ্মার মাথায় একটা ভাবোদয় হল।
ভাণ্ডারীকে ডেকে বললেন, 'ওহে ভাণ্ডারী, আমার কারখানাঘরে কিছু কিছু পঞ্চভূতের জোগাড় করে আনো, আর-একটা নতুন প্রাণী সৃষ্টি করব।'
আরো দেখুন
ভাইফোঁটা
Stories
শ্রাবণ মাসটা আজ যেন এক রাত্রে একেবারে দেউলে হইয়া গেছে। সমস্ত আকাশে কোথাও একটা ছেঁড়া মেঘের টুকরোও নাই।
আশ্চর্য এই যে, আমার সকালটা আজ এমন করিয়া কাটিতেছে। আমার বাগানের মেহেদি-বেড়ার প্রান্তে শিরীষগাছের পাতাগুলো ঝল্‌মল্‌ করিয়া উঠিতেছে, আমি তাহা তাকাইয়া দেখিতেছি। সর্বনাশের যে মাঝ-দরিয়ায় আসিয়া পৌঁছিয়াছি এটা যখন দূরে ছিল তখন ইহার কথা কল্পনা করিয়া কত শীতের রাত্রে সর্বাঙ্গে ঘাম দিয়াছে,কত গ্রীষ্মের দিনে হাত-পায়ের তেলো ঠাণ্ডা হিম হইয়া গেছে। কিন্তু আজ সমস্ত ভয়ভাবনা হইতে এমনি ছুটি পাইয়াছি যে, ঐ যে আতাগাছের ডালে একটা গিরগিটি স্থির হইয়া শিকার লক্ষ্য করিতেছে,সেটার দিকেও আমার চোখ রহিয়াছে।
আরো দেখুন
এক-তরফা হিসাব
Verses
সাতাশ, হলে না কেন এক-শো সাতাশ,
থলিটি ভরিত, হাড়ে লাগিত বাতাস।
সাতাশ কহিল, তাহে টাকা হত মেলা,
কিন্তু কী করিতে বাপু বয়সের বেলা?
আরো দেখুন