অতিথি
Stories
কাঁঠালিয়ার জমিদার মতিলালবাবু নৌকা করিয়া সপরিবারে স্বদেশে যাইতেছিলেন। পথের মধ্যে মধ্যাহ্নে নদীতীরের এক গঞ্জের নিকট নৌকা বাঁধিয়া পাকের আয়োজন করিতেছেন এমন সময় এক ব্রাহ্মণবালক আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'বাবু, তোমরা যাচ্ছ কোথায়?'
প্রশ্নকর্তার বয়স পনেরো-ষোলোর অধিক হইবে না।
আরো দেখুন
গলি
Stories
আমাদের এই শানবাঁধানো গলি, বারে বারে ডাইনে বাঁয়ে এঁকে বেঁকে একদিন কী যেন খুঁজতে বেরিয়েছিল। কিন্তু, সে যে দিকেই যায় ঠেকে যায়। এ দিকে বাড়ি, ও দিকে বাড়ি, সামনে বাড়ি।
উপরের দিকে যেটুকু নজর চলে তাতে সে একখানি আকাশের রেখা দেখতে পায়-- ঠিক তার নিজেরই মতো সরু, তার নিজেরই মতো বাঁকা।
আরো দেখুন
ডিটেকটিভ
Stories
আমি পুলিসের ডিটেকটিভ কর্মচারী।  আমার জীবনের দুটিমাত্র লক্ষ্য ছিল-- আমার স্ত্রী এবং আমার ব্যবসায়। পূর্বে একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে ছিলাম, সেখানে আমার স্ত্রীর প্রতি সমাদরের অভাব হওয়াতেই আমি দাদার সঙ্গে ঝগড়া করিয়া বাহির হইয়া আসি। দাদাই উপার্জন করিয়া আমাকে পালন করিতেছিলেন, অতএব সহসা সস্ত্রীক তাঁহার আশ্রয় ত্যাগ করিয়া আসা আমার পক্ষে দুঃসাহসের কাজ হইয়াছিল।
কিন্তু কখনো নিজের উপরে আমার বিশ্বাসের ত্রুটি ছিল না। আমি নিশ্চয় জানিতাম, সুন্দরী স্ত্রীকে যেমন বশ করিয়াছি বিমুখ অদৃষ্টলক্ষ্মীকেও তেমনি বশ করিতে পারিব। মহিমচন্দ্র এ সংসারে পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না।
আরো দেখুন
অতীতের ছায়া
Verses
মহা-অতীতের সাথে আজ আমি করেছি মিতালি--
     দিবালোক-অবসানে তারালোক জ্বালি
          ধ্যানে সেথা বসেছে সে
               রূপহীন দেশে;
     যেথা অস্তসূর্য হতে নিয়ে রক্তরাগ
          গুহাচিত্রে করিছে সজাগ
               তার তুলি
     ম্রিয়মাণ জীবনের লুপ্ত রেখাগুলি;
     নিমীলিত বসন্তের ক্ষান্তগন্ধে যেখানে সে
গাঁথিয়া অদৃশ্যমালা পরিছে নিবিড় কালোকেশে;
          যেখানে তাহার কণ্ঠহারে
               দুলায়েছে সারে সারে
     প্রাচীন শতাব্দীগুলি শন্ত-চিত্তদহন বেদনা
               মাণিক্যের কণা।
        সেথা বসে আছি কাজ ভুলে
          অস্তাচলমূলে
               ছায়াবীথিকায়।
        রূপময় বিশ্বধারা অবলুপ্তপ্রায়
          গোধূলিধূসর আবরণে,
অতীতের শূন্য তার সৃষ্টি মেলিতেছে মোর মনে।
       এ শূন্য তো মরুমাত্র নয়,
               এ যে চিত্তময়;
          বর্তমান যেতে যেতে এই শূন্যে যায় ভ'রে রেখে
                   আপন অন্তর থেকে
                       অসংখ্য স্বপন;
               অতীত এ শূন্য দিয়ে করেছি বপন
                   বস্তুহীন সৃষ্টি যত,
নিত্যকাল-মাঝে তারি ফলশস্য ফলিছে নিয়ত।
আলোড়িত এই শূন্য যুগে যুগে উঠিয়াছে জ্বলি,
          ভরিয়াছে জ্যোতির অঞ্জলি।
     বসে আছি নির্নিমেষ চোখে
          অতীতের সেই ধ্যানালোকে--
নি:শব্দ তিমিরতটে জীবনের বিস্মৃত রাতির।
হে অতীত,
       শান্ত তুমি নির্বাণ-বাতির
          অন্ধকারে,
     সুখদুখনিষ্কৃতির পারে।
   শিল্পী তুমি, আঁধারের ভূমিকায়
নিভৃতে রচিছ সৃষ্টি নিরাসক্ত নির্মম কলায়,
স্মরণে ও বিস্মরণে বিগলিত বর্ণ দিয়া লিখা
          বর্ণিতেছ আখ্যায়িকা;
পুরাতন ছায়াপথে নূতন তারার মতো
          উজ্জ্বলি উঠিছে কত,
     কত তার নিভাইছ একেবারে
          যুগান্তের অশান্ত ফুৎকারে।
     আজ আমি তোমার দোসর,
আশ্রয় নিতেছি সেথা যেথা আছে মহা-অগোচর।
   তব অধিকার আজি দিনে দিনে ব্যাপ্ত হয়ে আসে
          আমার আয়ুর ইতিহাসে।
     সেথা তব সৃষ্টির মন্দিরদ্বারে
আমার রচনাশালা স্থাপন করেছি একধারে
          তোমারি বিহারবনে ছায়াবীথিকায়।
                   ঘুচিল কর্মের দায়,
ক্লান্ত হল লোকমুখে খ্যাতির আগ্রহ;
     দুঃখ যত সয়েছি দুঃসহ
           তাপ তার করি অপগত
               মূর্তি তারে দিব নানামতো
                   আপনার মনে মনে।
কলকোলাহলশান্ত জনশূন্য তোমার প্রাঙ্গণে,
     যেখানে মিটেছে দ্বন্দ্ব মন্দ ও ভালোয়,
                   তারার আলোয়
সেখানে তোমার পাশে আমার আসন পাতা--
     কর্মহীন আমি সেথা বন্ধহীন সৃষ্টির বিধাতা।
আরো দেখুন
31
Verses
কল্যাণীয় শ্রীমান কনক ও কল্যাণীয়া লীলার
         শুভ পরিণয় উপলক্ষে আশীর্বাদ--
     দুর্গম সংসার-পথে আজ হতে, হে যুগল যাত্রী,
     প্রেমের পাথেয় নিয়ে পূর্ণপ্রাণে চলো দিনরাত্রি।
     দুঃখে মিলাক দাহ, সুখের ঘুচুক মোহধন্ধ,
     আঘাতে সংঘাতে থাক অবিচ্ছিন্ন মিলনের বন্ধ।
আরো দেখুন
বিহ্বলতা
Verses
অপরিচিতের দেখা বিকশিত ফুলের উৎসবে
পল্লবের সমারোহে।
                   মনে পড়ে, সেই আর কবে
দেখেছিনু শুধু ক্ষণকাল।
                   খর সূর্যকরতাপে
নিষ্ঠুর বৈশাখবেলা ধরণীর রুদ্র অভিশাপে
বন্দী করেছিল তৃষ্ণাজালে।
                   শুষ্ক তরু,
                             ম্লান বন,
অবসন্ন পিককণ্ঠ,
                 শীর্ণচ্ছায়া অরণ্য নির্জন।
          সেই তীব্র আলোকেতে দেখিলাম দীপ্ত মূর্তি তার--
জ্বালাময় আঁখি,
                   বর্ণচ্ছটাহীন বেশ,
                                      নির্বিকার,
মুখচ্ছবি।
          বিরলপল্লব স্তব্ধ বনবীথি 'পরে
নিঃশব্দ মধ্যাহ্নবেলা দূর হতে মুক্তকণ্ঠ স্বরে
করেছি বন্দনা।
          জানি, সে না-শোনা সুর গেছে ভেসে
শূন্যতলে।
          সেও ভালো, তবু সে তো তাহারই উদ্দেশে
একদা অর্পিয়াছিনু স্পষ্টবাণী, সত্য নমস্কার,
অসংকোচে পূজা-অর্ঘ্য
                   --সেই জানি গৌরব আমার।
আজ ক্ষুব্ধ ফাল্গুনের কলস্বরে মত্ততাহিল্লোলে
মদির আকাশ।
                   আজি মোর এ অশান্ত চিত্ত দোলে
উদ্‌ভ্রান্ত পবনবেগে।
                   আজি তারে যে বিহ্বল চোখে
হেরিলাম, সে যে হায় পুষ্পরেণু-আবিল আলোকে
মাধুর্যের ইন্দ্রজালে রাঙা।
                             তাই মোর কণ্ঠস্বর
আবেগে জড়িত রুদ্ধ।
                   পাই নাই শান্ত অবসর
চিনিবারে, চেনাবারে।
                   কোনো কথা বলা হল না যে,
মোহমুগ্ধ ব্যর্থতার সে বেদনা চিত্তে মোর বাজে।
আরো দেখুন
জীবিত ও মৃত
Stories
রানীহাটের জমিদার শারদাশংকরবাবুদের বাড়ির বিধবা বধূটির পিতৃকুলে কেহ ছিল না; সকলেই একে একে মারা গিয়াছে। পতিকুলেও ঠিক আপনার বলিতে কেহ নাই, পতিও নাই পুত্রও নাই। একটি ভাশুরপো, শারদাশংকরের ছোটো ছেলেটি, সেই তাহার চক্ষের মণি। সে জন্মিবার পর তাহার মাতার বহুকাল ধরিয়া শক্ত পীড়া হইয়াছিল, সেইজন্য এই বিধবা কাকি কাদম্বিনীই তাহাকে মানুষ করিয়াছে। পরের ছেলে মানুষ করিলে তাহার প্রতি প্রাণের টান আরো যেন বেশি হয়, কারণ তাহার উপরে অধিকার থাকে না; তাহার উপরে কোনো সামাজিক দাবি নাই, কেবল স্নেহের দাবি-- কিন্তু কেবলমাত্র স্নেহ সমাজের সমক্ষে আপনার দাবি কোনো দলিল অনুসারে সপ্রমাণ করিতে পারে না এবং চাহেও না, কেবল অনিশ্চিত প্রাণের ধনটিকে দ্বিগুণ ব্যাকুলতার সহিত ভালোবাসে।
বিধবার সমস্ত রুদ্ধ প্রীতি এই ছেলেটির প্রতি সিঞ্চন করিয়া একদিন শ্রাবণের রাত্রে কাদম্বিনীর অকস্মাৎ মৃত্যু হইল। হঠাৎ কী কারণে তাহার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হইয়া গেল-- সময় জগতের আর-সর্বত্রই চলিতে লাগিল, কেবল সেই স্নেহকাতর ক্ষুদ্র কোমল বক্ষটির ভিতর সময়ের ঘড়ির কল চিরকালের মতো বন্ধ হইয়া গেল।
আরো দেখুন
মাল্যদান
Stories
সকালবেলায় শীত-শীত ছিল। দুপুরবেলায় বাতাসটি অল্প-একটু তাতিয়া উঠিয়া দক্ষিণ দিক হইতে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যতীন যে বারান্দায় বসিয়া ছিল সেখান হইতে বাগানের এক কোণে এক দিকে একটি কাঁঠাল ও আর-এক দিকে একটি শিরীষগাছের মাঝখানের ফাঁক দিয়া বাহিরের মাঠ চোখে পড়ে। সেই শূন্য মাঠ ফাল্গুনের রৌদ্রে ধুধু করিতেছিল। তাহারই একপ্রান্ত দিয়া কাঁচা পথ চলিয়া গেছে -- সেই পথ বাহিয়া বোঝাই-খালাস গোরুর গাড়ি মন্দগমনে গ্রামের দিকে ফিরিয়া চলিয়াছে, গাড়োয়ান মাথায় গামছা ফেলিয়া অত্যন্ত বেকারভাবে গান গহিতেছে।
আরো দেখুন