পট
Stories
যে শহরে অভিরাম দেবদেবীর পট আঁকে, সেখানে কারো কাছে তার পূর্বপরিচয় নেই। সবাই জানে, সে বিদেশী, পট আঁকা তার চিরদিনের ব্যাবসা।
সে মনে ভাবে, 'ধনী ছিলেম, ধন গিয়েছে, হয়েছে ভালো। দিনরাত দেবতার রূপ ভাবি, দেবতার প্রসাদে খাই, আর ঘরে ঘরে দেবতার প্রতিষ্ঠা করি। আমার এই মান কে কাড়তে পারে।'
আরো দেখুন
রায়ঠাকুরানী অম্বিকা
Verses
       রায়ঠাকুরানী অম্বিকা।
দিনে দিনে তাঁর বাড়ে বাণীটার লম্বিকা।
অবকাশ নেই    তবুও তো কোনো গতিকে
নিজে ব'কে যান,  কহিতে না দেন    পতিকে।
নারীসমাজের তিনি তোরণের স্তম্ভিকা।
সয় নাকো তাঁর    দ্বিতীয় কাহারো   দম্ভিকা।
আরো দেখুন
সওগাত
Stories
পুজোর পরব কাছে। ভাণ্ডার নানা সামগ্রীতে ভরা। কত বেনারসি কাপড়, কত সোনার অলংকার; আর ভাণ্ড ভ'রে ক্ষীর দই, পাত্র ভ'রে মিষ্টান্ন।
মা সওগাত পাঠাচ্ছেন।
আরো দেখুন
দর্পহরণ
Stories
কী করিয়া গল্প লিখিতে হয়, তাহা সম্প্রতি শিখিয়াছি। বঙ্কিমবাবু এবং সার্‌ ওয়াল্‌টার স্কট পড়িয়া আমার বিশেষ ফল হয় নাই। ফল কোথা হইতে কেমন করিয়া হইল, আমার এই প্রথম গল্পেই সেই কথাটা লিখিতে বসিলাম।
আমার পিতার মতামত অনেকরকম ছিল; কিন্তু বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কোনো মত তিনি কেতাব বা স্বাধীনবুদ্ধি হইতে গড়িয়া তোলেন নাই। আমার বিবাহ যখন হয় তখন সতেরো উত্তীর্ণ হইয়া আঠারোয় পা দিয়াছি; তখন আমি কলেজে থার্ডইয়ারে পড়ি-- এবং তখন আমার চিত্তক্ষেত্রে যৌবনের প্রথম দক্ষিণবাতাস বহিতে আরম্ভ করিয়া কত অলক্ষ্য দিক হইতে কত অনির্বচনীয় গীতে এবং গন্ধে, কম্পনে এবং মর্মরে আমার তরুণ জীবনকে উৎসুক করিয়া তুলিতেছিল, তাহা এখনো মনে হইলে বুকের ভিতরে দীর্ঘনিশ্বাস ভরিয়া উঠে।
আরো দেখুন
নষ্টনীড়
Stories
ভূপতির কাজ করিবার কোনো দরকার ছিল না। তাঁহার টাকা যথেষ্ট ছিল, এবং দেশটাও গরম। কিন্তু গ্রহবশত তিনি কাজের লোক হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এইজন্য তাঁহাকে একটা ইংরেজি খবরের কাগজ বাহির করিতে হইল। ইহার পরে সময়ের দীর্ঘতার জন্য তাঁহাকে আর বিলাপ করিতে হয় নাই।
ছেলেবেলা হইতে তাঁর ইংরেজি লিখিবার এবং বক্তৃতা দিবার শখ ছিল। কোনোপ্রকার প্রয়োজন না থাকিলেও ইংরেজি খবরের কাগজে তিনি চিঠি লিখিতেন, এবং বক্তব্য না থাকিলেও সভাস্থলে দু-কথা না বলিয়া ছাড়িতেন না।
আরো দেখুন
রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা
Stories
যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝালচচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল, তখন স্তূপাকৃতি চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, "দুটো পান্তাভাত-যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।"
এ দিকে ডাক্তার যখন জবাব দিয়া গেল তখন গুরুচরণের ভাই রামকানাই রোগীর পার্শ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, "দাদা, যদি তোমার উইল করিবার ইচ্ছা থাকে তো বলো!" গুরুচরণ ক্ষীণস্বরে বলিলেন, "আমি বলি, তুমি লিখিয়া লও।" রামকানাই কাগজকলম লইয়া প্রস্তুত হইলেন। গুরুচরণ বলিয়া গেলেন, "আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি আমার ধর্মপত্নী শ্রীমতী বরদাসুন্দরীকে দান করিলাম।" রামকানাই লিখিলেন- কিন্তু লিখিতে তাঁহার কলম সরিতেছিল না। তাঁহার বড়ো আশা ছিল, তাঁহার একমাত্র পুত্র নবদ্বীপ অপুত্রক জ্যাঠামহাশয়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হইবে। যদিও দুই ভাইয়ে পৃথগন্ন ছিলেন, তথাপি এই আশায় নবদ্বীপের মা নবদ্বীপকে কিছুতেই চাকরি করিতে দেন নাই-- এবং সকাল-সকাল বিবাহ দিয়াছিলেন, এবং শত্রুর মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করিয়া বিবাহ নিষ্ফল হয় নাই। কিন্তু তথাপি রামকানাই লিখিলেন এবং সই করিবার জন্য কলমটা দাদার হাতে দিলেন। গুরুচরণ নির্জীব হস্তে যাহা সই করিলেন, তাহা কতকগুলা কম্পিত বক্ররেখা কি তাঁহার নাম, বুঝা দুঃসাধ্য।
আরো দেখুন
কবির প্রতি নিবেদন
Verses
হেথা কেন দাঁড়ায়েছ, কবি,
                যেন কাষ্ঠপুত্তলছবি?
    চারি দিকে লোকজন                 চলিতেছে সারাখন,
               আকাশে উঠিছে খর রবি।
               কোথা তব বিজন ভবন,
               কোথা তব মানসভুবন?
    তোমারে ঘেরিয়া ফেলি          কোথা সেই করে কেলি
               কল্পনা, মুক্ত পবন?
               নিখিলে আনন্দধাম
               কোথা সেই গভীর বিরাম?
    জগতের গীতধার                 কেমনে শুনিবে আর?
               শুনিতেছ আপনারি নাম।
               আকাশের পাখি তুমি ছিলে,
               ধরণীতে কেন ধরা দিলে?
    বলে সবে বাহা-বাহা,                  সকলে পড়ায় যাহা
               তুমি তাই পড়িতে শিখিলে!
               প্রভাতের আলোকের সনে
               অনাবৃত প্রভাতগগনে
    বহিয়া নূতন প্রাণ                  ঝরিয়া পড়ে না গান
               ঊর্ধ্বনয়ন এ ভুবনে।
               পথ হতে শত কলরবে
               "গাও গাও' বলিতেছে সবে।
    ভাবিতে সময় নাই--              গান চাই, গান চাই,
              থামিতে চাহিছে প্রাণ যবে।
            থামিলে চলিয়া যাবে সবে,
            দেখিতে কেমনতর হবে!
উচ্চ আসনে লীন                      প্রাণহীন গানহীন
            পুতলির মতো বসে রবে।
            শ্রান্তি লুকাতে চাও ত্রাসে,
            কন্ঠ শুষ্ক হয়ে আসে।
শুনে যারা যায় চলে                 দু-চারিটা কথা ব'লে
            তারা কি তোমায় ভালোবাসে?
            কত মতো পরিয়া মুখোশ
            মাগিছ সবার পরিতোষ।
মিছে হাসি আনো দাঁতে,        মিছে জল আঁখিপাতে,
            তবু তারা ধরে কত দোষ।
            মন্দ কহিছে কেহ ব'সে,
            কেহ বা নিন্দা তব ঘোষে।
তাই নিয়ে অবিরত                তর্ক করিছ কত,
            জ্বলিয়া মরিছ মিছে রোষে।
            মূর্খ, দম্ভ-ভরা দেহ,
            তোমারে করিয়া যায় স্নেহ।
হাত বুলাইয়া পিঠে               কথা বলে মিঠে মিঠে,
            "শাবাশ' "শাবাশ' বলে কেহ।
            হায় কবি, এত দেশ ঘুরে
            আসিয়া পড়েছ কোন্‌ দূরে!
এ যে কোলাহলমরু--        নাই ছায়া, নাই তরু,
            যশের কিরণে মরো পুড়ে।
দেখো, হোথা নদী-পর্বত,
            অবারিত অসীমের পথ।
প্রকৃতি শান্ত মুখে                    ছুটায় গগনবুকে
            গ্রহতারাময় তার রথ।
            সবাই আপন কাজে ধায়,
            পাশে কেহ ফিরিয়া না চায়।
ফুটে চিররূপরাশি                  চিরমধুময় হাসি,
            আপনারে দেখিতে না পায়।
            হোথা দেখো একেলা আপনি
            আকাশের তারা গণি গণি
ঘোর নিশীথের মাঝে        কে জাগে আপন কাজে,
            সেথায় পশে না কলধ্বনি।
            দেখো হোথা নূতন জগৎ--
            ওই কারা আত্মহারাবৎ
যশ-অপযশ-বাণী              কোনো কিছু নাহি মানি
            রচিছে সুদূর ভবিষ্যৎ।
            ওই দেখো না পুরিতে আশ
            মরণ করিল কারে গ্রাস।
নিশি না হইতে সারা             খসিয়া পড়িল তারা,
            রাখিয়া গেল না ইতিহাস।
            ওই কারা গিরির মতন
            আপনাতে আপনি বিজন--
হৃদয়ের স্রোত উঠি            গোপন আলয় টুটি
            দূর দূর করিছে মগন।
ওই কারা বসে আছে দূরে
            কল্পনা-উদয়াচল-পুরে--
অরুণপ্রকাশ-প্রায়               আকাশ ভরিয়া যায়
            প্রতিদিন নব নব সুরে।
            হোথা উঠে নবীন তপন,
            হোথা হতে বহিছে পবন।
হোথা চির ভালোবাসা--      নব গান, নব আশা--
            অসীম বিরামনিকেতন।
হোথা মানবের জয়                উঠিছে জগৎময়,
            ওইখানে মিলিয়াছে নরনারায়ণ।
            হেথা, কবি, তোমারে কি সাজে
            ধূলি আর কলরোল -মাঝে?
আরো দেখুন