অনাবশ্যকের আবশ্যকতা
Verses
কী জন্যে রয়েছ, সিন্ধু তৃণশষ্যহীন--
অর্ধেক জগৎ জুড়ি নাচো নিশিদিন।
সিন্ধু কহে, অকর্মণ্য না রহিত যদি
ধরণীর স্তন হতে কে টানিত নদী?
আরো দেখুন
35
Verses
            ভোরের বেলায় কখন এসে
            পরশ ক'রে গেছ হেসে।
আমার ঘুমের দুয়ার ঠেলে
কে সেই খবর দিল মেলে,
জেগে দেখি আমার আঁখি
            আঁখির জলে গেছে ভেসে।
মনে হল আকাশ যেন
            কইল কথা কানে কানে।
মনে হল সকল দেহ
            পূর্ণ হল গানে গানে।
হৃদয় যেন শিশিরনত
ফুটল পূজার ফুলের মতো
জীবননদী কূল ছাপিয়ে
            ছড়িয়ে গেল অসীম দেশে।
আরো দেখুন
42
Verses
আলো নাই, দিন শেষ হল, ওরে
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
      ঘন্টা বাজিল দূরে
      ও পারের রাজপুরে,
এখনো যে পথে চলেছিস তুই
      হায় রে পথশ্রান্ত
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
দেখ্‌ সবে ঘরে ফিরে এল, ওরে
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
      পূজা সারি দেবালয়ে
      প্রসাদী কুসুম লয়ে,
এখন ঘুমের কর্‌ আয়োজন
      হায় রে পথশ্রান্ত
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
রজনী আঁধার হয়ে আসে, ওরে
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
      ওই-যে গ্রামের 'পরে
      দীপ জ্বলে ঘরে ঘরে--
দীপহীন পথে কী করিবি একা
      হায় রে পথশ্রান্ত
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
এত বোঝা লয়ে কোথা যাস, ওরে
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
      নামাবি এমন ঠাঁই
      পাড়ায় কোথা কি নাই।
কেহ কি শয়ন রাখে নাই পাতি
      হায় রে পথশ্রান্ত
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
পথের চিহ্ন দেখা নাহি যায়
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
      কোন্‌ প্রান্তরশেষে
      কোন্‌ বহুদূর দেশে
কোথা তোর রাত হবে যে প্রভাত
      হায় রে পথশ্রান্ত
      পান্থ, বিদেশী পান্থ।
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
Stories
রাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ ছিপ্‌ছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ। বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন-কার্যে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল।
সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাড়িয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুন্‌সেফিতে প্রবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনো তাঁহার ভৃত্য।
আরো দেখুন
আমার সকল কাঁটা
Songs
আমার  সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে   ফুল ফুটবে।
আমার  সকল ব্যথা রঙিন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে ॥
আমার  অনেক দিনের আকাশ-চাওয়া   আসবে ছুটে দখিন-হাওয়া,
                   হৃদয় আমার আকুল করে সুগন্ধধন লুটবে ॥
আমার  লজ্জা যাবে যখন পাব দেবার মতো ধন,
যখন    রূপ ধরিয়ে বিকশিবে প্রাণের আরাধন।
আমার  বন্ধু যখন রাত্রিশেষে   পরশ তারে করবে এসে,
                   ফুরিয়ে গিয়ে দলগুলি সব চরণে তার লুটবে ॥
আরো দেখুন
27
Verses
     আমার কাছে রাজা আমার রইল অজানা।
          তাই সে যখন তলব করে খাজানা
     মনে করি পালিয়ে গিয়ে দেব তারে ফাঁকি,
              রাখব দেনা বাকি।
     যেখানেতেই পালাই আমি গোপনে
     দিনে কাজের আড়ালেতে, রাতে স্বপনে,
              তলব তারি আসে
              নিশ্বাসে নিশ্বাসে।
     তাই জেনেছি, আমি তাহার নইকো অজানা।
              তাই জেনেছি ঋণের দায়ে
                       ডাইনে বাঁয়ে
     বিকিয়ে বাসা নাইকো আমার ঠিকানা।
              তাই ভেবেছি জীবন-মরণে
     যা আছে সব চুকিয়ে দেব চরণে।
              তাহার পরে
                    নিজের জোরে
                           নিজেরি স্বত্বে
     মিলবে আমার আপন বাসা তাঁহার রাজত্বে।
আরো দেখুন
পাত্র ও পাত্রী
Stories
ইতিপূর্বে প্রজাপতি কখনো আমার কপালে বসেন নি বটে, কিন্তু একবার আমার মানসপদ্মে বসেছিলেন। তখন আমার বয়স ষোলো। তার পরে কাঁচা ঘুমে চমক লাগিয়ে দিলে যেমন ঘুম আর আসতে চায় না, আমার সেই দশা হল। আমার বন্ধুবান্ধবরা কেউ কেউ দারপরিগ্রহ ব্যাপারে দ্বিতীয়, এমন-কি তৃতীয় পক্ষে প্রোমোশন পেলেন; আমি কৌমার্যের লাস্ট বেঞ্চিতে বসে শূন্য সংসারের কড়িকাঠ গণনা করে কাটিয়ে দিলুম।
আমি চোদ্দ বছর বয়সে এনট্রেন্স পাস করেছিলুম। তখন বিবাহ কিম্বা এনট্রেন্স পরীক্ষায় বয়সবিচার ছিল না। আমি কোনোদিন পড়ার বই গিলি নি, সেইজন্যে শারীরিক বা মানসিক অজীর্ণ রোগে আমাকে ভুগতে হয় নি। ইঁদুর যেমন দাঁত বসাবার জিনিস পেলেই সেটাকে কেটে-কুটে ফেলে, তা সেটা খাদ্যই হোক আর অখাদ্যই হোক, শিশুকাল থেকেই তেমনি ছাপার বই দেখলেই সেটা পড়ে ফেলা আমার স্বভাব ছিল। সংসারে পড়ার বইয়ের চেয়ে না-পড়ার বইয়ের সংখ্যা ঢের বেশি, এইজন্য আমার পুঁথির সৌরজগতে স্কুল-পাঠ্য পৃথিবীর চেয়ে বেস্কুল-পাঠ্য সূর্য চোদ্দ লক্ষগুণে বড়ো ছিল। তবু, আমার সংস্কৃত-পণ্ডিতমশায়ের নিদারুণ ভবিষ্যদ্‌বাণী সত্ত্বেও, আমি পরীক্ষায় পাস করেছিলুম।
আরো দেখুন
পুনরাবৃত্তি
Stories
সেদিন যুদ্ধের খবর ভালো ছিল না। রাজা বিমর্ষ হয়ে বাগানে বেড়াতে গেলেন।
দেখতে পেলেন, প্রাচীরের কাছে গাছতলায় বসে খেলা করছে একটি ছোটো ছেলে আর একটি ছোটো মেয়ে।
আরো দেখুন
প্রতিবেশিনী
Stories
আমার প্রতিবেশিনী বালবিধবা। যেন শরতের শিশিরাশ্রুপ্লুত শেফালির মতো বৃন্তচ্যুত; কোনো বাসরগৃহের ফুলশয্যার জন্য সে নহে, সে কেবল দেবপূজার জন্যই উৎসর্গ-করা।
তাহাকে আমি মনে মনে পূজা করিতাম। তাহার প্রতি আমার মনের ভাবটা যে কী ছিল পূজা ছাড়া তাহা অন্য কোনো সহজ ভাষায় প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করি না -- পরের কাছে তো নয়ই, নিজের কাছেও না।
আরো দেখুন