খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
Stories
রাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ ছিপ্‌ছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ। বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন-কার্যে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল।
সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাড়িয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুন্‌সেফিতে প্রবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনো তাঁহার ভৃত্য।
আরো দেখুন
বাণী
Stories
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব'লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।
তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই-- আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।
আরো দেখুন
চিত্রকর
Stories
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায়। বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল। কিন্তু, সব-চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে। সে ঠিক করেছিল, 'পয়সা' করবই, সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে।' সর্বদাই তার ভাষায় ধনকে সে উল্লেখ করত 'পয়সা' বলে। অর্থাৎ, তার মনে খুব একটা দর্শন স্পর্শন ঘ্রাণের যোগ্য প্রত্যক্ষ পদার্থ ছিল; তার মধ্যে বড়ো নামের মোহ ছিল না; অত্যন্ত সাধারণ পয়সা, হাটে হাটে হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে যাওয়া, মলিন হয়ে যাওয়া পয়সা, তাম্রগন্ধী পয়সা, কুবেরের আদিম স্বরূপ, যা রুপোয় সোনায় কাগজে দলিলে নানা মূর্তি পরিগ্রহ করে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
নানা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে নানা পঙ্কে আবিল হতে হতে আজ গোবিন্দ তার পয়সাপ্রবাহিণীর প্রশস্তধারার পাকা বাঁধানো ঘাটে এসে পৌঁচেছে। গানিব্যাগ্‌ওয়ালা বড়োসাহেব ম্যাক্‌ডুগালের বড়োবাবুর আসনে তার ধ্রুব প্রতিষ্ঠা। সবাই তাকে নাম দিয়েছিল ম্যাক্‌দুলাল।
আরো দেখুন
বোঝাপড়া
Verses
       মনেরে আজ কহ যে,
ভালো মন্দ যাহাই আসুক
       সত্যেরে লও সহজে।
             কেউ বা তোমায় ভালোবাসে
                  কেউ বা বাসতে পারে না যে,
             কেউ বিকিয়ে আছে, কেউ বা
                  সিকি পয়সা ধারে না যে,
             কতকটা যে স্বভাব তাদের
                  কতকটা বা তোমারো ভাই,
             কতকটা এ ভবের গতিক--
                  সবার তরে নহে সবাই।
             তোমায় কতক ফাঁকি দেবে
                  তুমিও কতক দেবে ফাঁকি,
             তোমার ভোগে কতক পড়বে
                  পরের ভোগে থাকবে বাকি,
             মান্ধাতারই আমল থেকে
                  চলে আসছে এমনি রকম--
             তোমারি কি এমন ভাগ্য
                  বাঁচিয়ে যাবে সকল জখম!
                                  মনেরে আজ কহ যে,
                            ভালো মন্দ যাহাই আসুক
                                  সত্যেরে লও সহজে।
              অনেক ঝঞ্ঝা কাটিয়ে বুঝি
                   এলে সুখের বন্দরেতে,
              জলের তলে পাহাড় ছিল
                   লাগল বুকের অন্দরেতে,
              মুহূর্তেকে পাঁজরগুলো  
                   উঠল কেঁপে আর্তরবে--
              তাই নিয়ে কি সবার সঙ্গে
                   ঝগড়া করে মরতে হবে?
              ভেসে থাকতে পার যদি
                   সেইটে সবার চেয়ে শ্রেয়,
              না পার তো বিনা বাক্যে
                   টুপ করিয়া ডুবে যেয়ো।
              এটা কিছু অপূর্ব নয়,
                   ঘটনা সামান্য খুবই--
              শঙ্কা যেথায় করে না কেউ
                   সেইখানে হয় জাহাজ-ডুবি।
                                           মনেরে তাই কহ যে,
                                      ভালো মন্দ যাহাই আসুক
                                           সত্যেরে লও সহজে।
              তোমার মাপে হয় নি সবাই
                   তুমিও হও নি সবার মাপে,
              তুমি মর কারো ঠেলায়
                   কেউ বা মরে তোমার চাপে--
              তবু ভেবে দেখতে গেলে
                   এমনি কিসের টানাটানি?
              তেমন করে হাত বাড়ালে
                   সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি।
              আকাশ তবু সুনীল থাকে,
                   মধুর ঠেকে ভোরের আলো,
              মরণ এলে হঠাৎ দেখি
                   মরার চেয়ে বাঁচাই ভালো।
              যাহার লাগি চক্ষু বুজে
                   বহিয়ে দিলাম অশ্রুসাগর
              তাহারে বাদ দিয়েও দেখি  
                    বিশ্বভুবন মস্ত ডাগর।
                                        মনেরে তাই কহ যে,
                                    ভালো মন্দ যাহাই আসুক
                                        সত্যেরে লও সহজে।
              নিজের ছায়া মস্ত করে
                   অস্তাচলে বসে বসে
              আঁধার করে তোল যদি
                   জীবনখানা নিজের দোষে,
              বিধির সঙ্গে বিবাদ করে
                   নিজের পায়েই কুড়ুল মার,
              দোহাই তবে এ কার্যটা
                   যত শীঘ্র পার সারো।
              খুব খানিকটে কেঁদে কেটে
                   অশ্রু ঢেলে ঘড়া ঘড়া
              মনের সঙ্গে এক রকমে
                    করে নে ভাই, বোঝাপড়া।
              তাহার পরে আঁধার ঘরে
                   প্রদীপখানি জ্বালিয়ে তোলো--
              ভুলে যা ভাই, কাহার সঙ্গে
                   কতটুকুন তফাত হল।
                                      মনেরে তাই কহ যে,
                                 ভালো মন্দ যাহাই আসুক
                                      সত্যেরে লও সহজে।
আরো দেখুন
আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু
Verses
       আমার এ প্রেম নয় তো ভীরু,
              নয় তো হীনবল,
       শুধু  কি এ ব্যাকুল হয়ে
              ফেলবে অশ্রুজল।
       মন্দমধুর সুখে শোভায়
       প্রেমকে কেন ঘুমে ডোবায়।
       তোমার সাথে জাগতে সে চায়
              আনন্দে পাগল।
                           নাচো যখন ভীষণ সাজে
                           তীব্র তালের আঘাত বাজে,
                           পালায় ত্রাসে পালায় লাজে
                                         সন্দেহ-বিহ্বল।
                           সেই প্রচণ্ড মনোহরে
                           প্রেম যেন মোর বরণ করে,
                           ক্ষুদ্র আশার স্বর্গ তাহার
                                         দিক সে রসাতল।
আরো দেখুন
শেষের রাত্রি
Stories
'মাসি !'
'ঘুমোও,যতীন,রাত হল যে ।'
আরো দেখুন
রয় যে কাঙাল
Songs
রয় যে কাঙাল শূন্য হাতে, দিনের শেষে
দেয় সে দেখা নিশীথরাতে স্বপনবেশে॥
     আলোয় যারে মলিনমুখে মৌন দেখি
     আঁধার হলে আঁখিতে তার দীপ্তি একি--
          বরণমালা কে যে দোলায় তাহার কেশে॥
দিনের বীণায় যে ক্ষীণ তারে ছিল হেলা
ঝঙ্কারিয়া ওঠে যে তাই রাতের বেলা।
     তন্দ্রাহারা অন্ধকারের বিপুল গানে
     মন্দ্রি ওঠে সারা আকাশ কী আহ্বানে--
          তারার আলোয় কে চেয়ে রয় নির্নিমেষে॥
আরো দেখুন
নৈবেদ্য
Verses
তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি
রজনীর শুভ্র অবসানে; কিছু আর নাহি বাকি,
নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি,
নাই অভিমান, নাই দীনকান্না, নাই গর্বহাসি,
নাই পিছে ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি
ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।
আরো দেখুন
উলুখড়ের বিপদ
Stories
বাবুদের নায়েব গিরিশ বসুর অন্তঃপুরে প্যারী বলিয়া একটি নূতন দাসী নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহার বয়স অল্প; চরিত্র ভালো। দূর বিদেশ হইতে আসিয়া কিছুদিন  কাজ করার পরেই একদিন সে বৃদ্ধ নায়েবের অনুরাগদৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষার জন্য গৃহিণীর নিকট কাঁদিয়া গিয়া পড়িল। গৃহিণী কহিলেন, "বাছা, তুমি অন্য কোথাও যাও; তুমি ভালোমানুষের মেয়ে, এখানে থাকিলে তোমার সুবিধা হইবে না।" বলিয়া গোপনে কিছু অর্থ দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন।
কিন্তু পালানো সহজ ব্যাপার নহে, হাতে পথ-খরচও সামান্য, সেইজন্য প্যারী গ্রামে হরিহর ভট্টাচার্য মহাশয়ের নিকটে গিয়া আশ্রয় লইল। বিবেচক ছেলেরা কহিল, "বাবা, কেন বিপদ ঘরে আনিতেছেন।" হরিহর কহিলেন, "বিপদ স্বয়ং আসিয়া আশ্রয় প্রার্থনা করিলে তাহাকে ফিরাইতে পারি না।"
গিরিশ বসু সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া কহিল, "ভট্টাচার্যমহাশয়, আপনি আমার ঝি ভাঙাইয়া আনিলেন কেন। ঘরে কাজের ভারি অসুবিধা হইতেছে।" ইহার উত্তরে হরিহর    দু-চারটে সত্য কথা খুব শক্ত করিয়াই বলিলেন। তিনি মানী লোক ছিলেন, কাহারো খাতিরে কোনো কথা ঘুরাইয়া বলিতে জানিতেন না। নায়েব মনে মনে উদ্‌গতপক্ষ পিপীলিকার সহিত তাঁহার তুলনা করিয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময় খুব ঘটা করিয়া পায়ের ধুলা লইল। দুই-চারি দিনের মধ্যেই ভট্টাচার্যের বাড়িতে পুলিসের সমাগম হইল। গৃহিণীঠাকুরানীর বালিশের নীচে হইতে নায়েবের স্ত্রীর একজোড়া ইয়ারিং বাহির হইল। ঝি প্যারী চোর সাব্যস্ত হইয়া জেলে গেল। ভট্টাচার্যমহাশয় দেশবিখ্যাত প্রতিপত্তির জোরে চোরাই-মাল রক্ষার অভিযোগ হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন। নায়েব পুনশ্চ ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল। ব্রাহ্মণ বুঝিলেন, হতভাগিনীকে তিনি আশ্রয় দেওয়াতেই প্যারীর সর্বনাশ ঘটিল। তাঁহার মনে শেল বিঁধিয়া রহিল। ছেলেরা কহিল, "জমিজমা বেচিয়া কলিকাতায় যাওয়া যাক, এখানে বড়ো মুশকিল দেখিতেছি।" হরিহর কহিলেন, "পৈতৃক ভিটা ছাড়িতে পারিব না, অদৃষ্টে থাকিলে বিপদ কোথায় না ঘটে।"ইতিমধ্যে নায়েব গ্রামে অতিমাত্রায় খাজনা বৃদ্ধির চেষ্টা করায় প্রজারা বিদ্রোহী হইল। হরিহরের সমস্ত ব্রহ্মোত্তর জমা, জমিদারের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ নাই। নায়েব তাহার প্রভুকে জানাইল, হরিহরই প্রজাদিগকে প্রশ্রয় দিয়া বিদ্রোহী করিয়া তুলিয়াছে। জমিদার কহিলেন, "যেমন করিয়া পার ভট্টাচার্যকে শাসন করো।" নায়েব ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া কহিল,  "সামনের ঐ জমিটা পরগনার ভিটার মধ্যে পড়িতেছে; ওটা তো ছাড়িয়া দিতে হয়।" হরিহর কহিলেন, "সে কী কথা। ও যে আমার বহুকালের ব্রহ্মত্র।" হরিহরের গৃহপ্রাঙ্গণের সংলগ্ন পৈতৃক জমি জমিদারের পরগনার অন্তর্গত বলিয়া নালিশ রুজু হইল। হরিহর বলিলেন,"এ জমিটা তো তবে ছাড়িয়া দিতে হয়, আমি তো  বৃদ্ধ বয়সে আদালতে সাক্ষী দিতে পারিব না।" ছেলেরা বলিল, "বাড়ির সংলগ্ন জমিটাই যদি ছাড়িয়া দিতে হয় তবে ভিটায় টিঁকিব কী করিয়া।"
প্রাণাধিক পৈতৃক ভিটার মায়ায় বৃদ্ধ কম্পিতপদে আদালতের সাক্ষ্যমঞ্চে গিয়া দাঁড়াইলেন। মুন্সেফ নবগোপালবাবু তাঁহার সাক্ষ্যই প্রামাণ্য করিয়া মকদ্দমা ডিস্‌মিস্‌ করিয়া দিলেন। ভট্টাচার্যের খাস প্রজারা ইহা লইয়া গ্রামে ভারি উৎসবসমারোহ আরম্ভ করিয়া দিল। হরিহর তাড়াতাড়ি তাহাদিগকে থামাইয়া দিলেন। নায়েব আসিয়া পরম আড়ম্বরে ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া গায়ে মাথায় মাখিল এবং আপিল রুজু করিল। উকিলরা হরিহরের নিকট হইতে টাকা লন না। তাঁহারা ব্রাহ্মণকে বারম্বার আশ্বাস দিলেন, এ মকদ্দমায় হারিবার কোনো সম্ভাবনা নাই। দিন কি কখনো রাত হইতে পারে। শুনিয়া হরিহর নিশ্চিন্ত হইয়া ঘরে বসিয়া রহিলেন।
একদিন জমিদারি কাছারিতে ঢাকঢোল বাজিয়া উঠিল, পাঁঠা কাটিয়া নায়েবের বাসায় কালীপূজা হইবে। ব্যাপারখানা কী। ভট্টাচার্য খবর পাইলেন, আপিলে তাঁহার হার হইয়াছে।
ভট্টাচার্য মাথা চাপড়াইয়া উকিলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বসন্তবাবু, করিলেন কী। আমার কী দশা হইবে।"
দিন যে কেমন করিয়া রাত হইল, বসন্তবাবু তাহার নিগূঢ় বৃত্তান্ত বলিলেন, "সম্প্রতি যিনি নূতন অ৻াডিশনাল জজ হইয়া আসিয়াছেন তিনি মুন্সেফ থাকা কালে মুন্সেফ নবগোপালবাবুর সহিত তাঁহার ভারি খিটিমিটি বাধিয়াছিল। তখন কিছু করিয়া উঠিতে পারেন নাই; আজ জজের আসনে বসিয়া নবগোপালবাবুর রায় পাইবামাত্র উলটাইয়া দিতেছেন; আপনি হারিলেন সেইজন্য।"  ব্যাকুল হরিহর কহিলেন, "হাইকোর্টে ইহার কোনো আপিল নাই?" বসন্ত কহিলেন, জজবাবু আপিলেফল পাইবার সম্ভাবনা মাত্র রাখেন নাই। তিনি আপনাদের সাক্ষীকে সন্দেহ করিয়া বিরুদ্ধ পক্ষের সাক্ষীকেই বিশ্বাস করিয়া গিয়াছেন। হাইকোর্টে তো সাক্ষীর বিচার হইবে না।"
বৃদ্ধ সাশ্রুনেত্রে কহিলেন, "তবে আমার উপায়?"
উকিল কহিলেন, "উপায় কিছুই দেখি না।"
গিরিশ বসু পরদিন লোকজন সঙ্গে লইয়া ঘটা করিয়া ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল এবং বিদায়কালে উচ্ছ্বসিত দীর্ঘনিশ্বাসে কহিল, "প্রভু, তোমারই ইচ্ছা।"
আরো দেখুন
প্রকৃতির প্রতি
Verses
শত শত প্রেমপাশে টানিয়া হৃদয়
                      একি খেলা তোর?
               ক্ষুদ্র এ কোমল প্রাণ, ইহারে বাঁধিতে
                      কেন এত ডোর?
                    ঘুরে ফিরে পলে পলে
                    ভালোবাসা নিস ছলে,
                    ভালো না বাসিতে চাস
                      হায় মনচোর।
               হৃদয় কোথায় তোর খুঁজিয়া বেড়াই
                      নিষ্ঠুরা প্রকৃতি!
               এত ফুল, এত আলো, এত গন্ধ গান,
                      কোথায় পিরিতি!
আপন রূপের রাশে
               আপনি লুকায়ে হাসে,
               আমরা কাঁদিয়া মরি
                 এ কেমন রীতি!
      শূন্যক্ষেত্রে নিশিদিন আপনার মনে
                 কৌতুকের খেলা।
      বুঝিতে পারি নে তোর কারে ভালোবাসা
                 কারে অবহেলা।
               প্রভাতে যাহার 'পর
               বড়ো স্নেহ সমাদর,
               বিস্মৃত সে ধূলিতলে
                 সেই সন্ধ্যাবেলা।
      তবু তোরে ভালোবাসি, পারি নে ভুলিতে
                 অয়ি মায়াবিনী।
      স্নেহহীন আলিঙ্গন জাগায় হৃদয়ে
                 সহস্র রাগিণী।
               এই সুখে দুঃখে শোকে
               বেঁচে আছি দিবালোকে,
               নাহি চাহি হিমশান্ত
                 অনন্ত যামিনী।
      আধো-ঢাকা আধো-খোলা ওই তোর মুখ
                 রহস্যনিলয়
      প্রেমের বেদনা আনে হৃদয়ের মাঝে,
                 সঙ্গে আনে ভয়।
               বুঝিতে পারি নে তব
               কত ভাব নব নব,
               হাসিয়া কাঁদিয়া প্রাণ
                 পরিপূর্ণ হয়।
প্রাণমন পসারিয়া ধাই তোর পানে,
                     নাহি দিস ধরা।
           দেখা যায় মৃদু মধু কৌতুকের হাসি,
                     অরুণ-অধরা।
                  যদি চাই দূরে যেতে
                  কত ফাঁদ থাক পেতে--
                  কত ছল, কত বল
                     চপলা-মুখরা।
           আপনি নাহিক জান আপনার সীমা,
                     রহস্য আপন।
           তাই, অন্ধ রজনীতে যবে সপ্তলোক
                     নিদ্রায় মগন,
                  চুপি চুপি কৌতূহলে
                  দাঁড়াস আকাশতলে,
                  জ্বালাইয়া শত লক্ষ
                     নক্ষত্র-কিরণ।
           কোথাও বা বসে আছ চির-একাকিনী,
                     চিরমৌনব্রতা।
           চারি দিকে সুকঠিন তৃণতরুহীন
                     মরুনির্জনতা।
                  রবি শশী শিরোপর
                  উঠে যুগ-যুগান্তর
                  চেয়ে শুধু চলে যায়,
                     নাহি কয় কথা।
           কোথাও বা খেলা কর বালিকার মতো,
                     উড়ে কেশবেশ--
           হাসিরাশি উচ্ছ্বসিত উৎসের মতন,
                     নাহি লজ্জালেশ।
রাখিতে পারে না প্রাণ
                 আপনার পরিমাণ,
                 এত কথা এত গান
                     নাহি তার শেষ।
           কখনো বা হিংসাদীপ্ত উন্মাদ নয়ন
                     নিমেষনিহত,
           অনাথা ধরার বক্ষে অগ্নি-অভিশাপ
                     হানে অবিরত।
                 কখনো বা সন্ধ্যালোকে
                 উদাস উদার শোকে
                 মুখে পড়ে ম্লান ছায়া
                     করুণার মতো।
           তবে তো করেছ বশ এমনি করিয়া
                     অসংখ্য পরান।
           যুগ-যুগান্তর ধরে রয়েছে নূতন
                     মধূর বয়ান।
                 সাজি শত মায়াবাসে
                 আছ সকলেরই পাশে,
                 তবু আপনারে কারে
                     কর নাই দান।
           যত অন্ত নাহি পাই তত জাগে মনে
                     মহা রূপরাশি।
           তত বেড়ে যায় প্রেম যত পাই ব্যথা,
                     যত কাঁদি হাসি।
                 যত তুই দূরে যাস
                 তত প্রাণে লাগে ফাঁস,
                 যত তোরে নাহি বুঝি
                     তত ভালোবাসি।
আরো দেখুন
তুমি এ-পার ও-পার
Songs
তুমি    এ-পার ও-পার কর কে গো ওগো খেয়ার নেয়ে?
আমি    ঘরের দ্বারে  বসে বসে দেখি যে সব চেয়ে ॥
          ভাঙিলে হাট দলে দলে   সবাই যাবে ঘরে চলে
          আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে ॥
দেখি    সন্ধ্যাবেলা ও পার-পানে তরণী যাও বেয়ে।
দেখে    মন যে আমার কেমন করে, ওঠে যে গান গেয়ে
                   ওগো খেয়ার নেয়ে ॥
          কালো জলের কলকলে   আঁখি আমার ছলছলে,
          ও পার হতে সোনার আভা পরান ফেলে ছেয়ে।
দেখি    তোমার মুখে কথাটি নাই ওগো খেয়ার নেয়ে--
কী যে তোমার চোখে লেখা আছে দেখি যে সব চেয়ে
                   ওগো খেয়ার নেয়ে।
          আমার মুখে ক্ষণতরে   যদি তোমার আঁখি পড়ে
          আমি তখন মনে ভাবি আমিও যাই ধেয়ে
                   ওগো খেয়ার নেয়ে ॥
আরো দেখুন