স্ত্রীর পত্র
Stories
শ্রীচরণকমলেষু
আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে,আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি -- মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি;চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায় নি।
আরো দেখুন
আমি হৃদয়েতে পথ কেটেছি
Verses
আমি          হৃদয়েতে পথ কেটেছি,
                     সেথায় চরণ পড়ে,
তোমার            সেথায় চরণ পড়ে।
         তাই তো আমার সকল পরান
                 কাঁপছে ব্যথার ভরে গো
                               কাঁপছে থরথরে।
  ব্যথা-পথের পথিক তুমি,
  চরণ চলে ব্যথা চুমি,
  কাঁদন দিয়ে সাধন আমার
                     চিরদিনের তরে গো
                               চিরজীবন ধ'রে।
  নয়নজলের বন্যা দেখে
                    ভয় করি নে আর,
    আমি           ভয় করি নে আর।
     মরণ-টানে টেনে আমায়
                   করিয়ে দেবে পার,
    আমি           তরব পারাবার!
     ঝড়ের হাওয়া আকুল গানে
   বইছে আজি তোমার পানে,
   ডুবিয়ে তরী ঝাঁপিয়ে পড়ি
             ঠেকব চরণ-'পরে,
             আমি           বাঁচব চরণ ধ'রে।
আরো দেখুন
ভুল স্বর্গ
Stories
লোকটি নেহাত বেকার ছিল।
তার কোনো কাজ ছিল না, কেবল শখ ছিল নানা রকমের।
আরো দেখুন
আমাদের শান্তিনিকেতন
Songs
আমাদের    শান্তিনিকেতন   আমাদের   সব হতে আপন।
তার         আকাশ-ভরা কোলে   মোদের   দোলে হৃদয় দোলে,
মোরা        বারে বারে দেখি তারে নিত্যই নূতন॥
মোদের      তরুমূলের মেলা,   মোদের খোলা মাঠের খেলা,
মোদের      নীল গগনের সোহাগ-মাখা সকাল-সন্ধ্যাবেলা।
মোদের      শালের ছায়াবীথি   বাজায়   বনের কলগীতি,
সদাই        পাতার নাচে মেতে আছে আম্‌লকী-কানন॥
আমরা       যেথায় মরি ঘুরে   সে যে   যায় না কভু দূরে,
মোদের      মনের মাঝে প্রেমের সেতার বাঁধা যে তার সুরে।
মোদের      প্রাণের সঙ্গে প্রাণে   সে যে   মিলিয়েছে এক তানে,
মোদের      ভাইয়ের সঙ্গে ভাইকে সে যে করেছে এক-মন॥
আরো দেখুন
জয়পরাজয়
Stories
রাজকন্যার নাম অপরাজিতা। উদয়নারায়ণের সভাকবি শেখর তাঁহাকে কখনো চক্ষেও দেখেন নাই। কিন্তু যেদিন কোনো নূতন কাব্য রচনা করিয়া সভাতলে বসিয়া রাজাকে শুনাইতেন, সেদিন কণ্ঠস্বর ঠিক এতটা উচ্চ করিয়া পড়িতেন যাহাতে তাহা সেই সমুচ্চ গৃহের উপরিতলের বাতায়নবর্তিনী অদৃশ্য শ্রোত্রীগণের কর্ণপথে প্রবেশ করিতে পারে। যেন তিনি কোনো-এক অগম্য নক্ষত্রলোকের উদ্দেশে আপনার সংগীতোচ্ছ্বাস প্রেরণ করিতেন যেখানে জ্যোতিষ্ক-মণ্ডলীর মধ্যে তাঁহার জীবনের একটি অপরিচিত শুভগ্রহ অদৃশ্য মহিমায় বিরাজ করিতেছেন।
কখনো ছায়ার মতন দেখিতে পাইতেন, কখনো নূপুরশিঞ্জনের মতন শুনা যাইত; বসিয়া বসিয়া মনে মনে ভাবিতেন, সে কেমন দুইখানি চরণ যাহাতে সেই সোনার নূপুর বাঁধা থাকিয়া তালে তালে গান গাহিতেছে। সেই দুইখানি রক্তিম শুভ্র কোমল চরণতল প্রতি পদক্ষেপে কী সৌভাগ্য কী অনুগ্রহ কী করুণার মতো করিয়া পৃথিবীকে স্পর্শ করে। মনের মধ্যে সেই চরণদুটি প্রতিষ্ঠা করিয়া কবি অবসরকালে সেইখানে আসিয়া লুটাইয়া পড়িত এবং সেই নূপুরশিঞ্জনের সুরে আপনার গান বাঁধিত।
আরো দেখুন
যাও তবে প্রিয়তম সুদূর সেথায়
Verses

যাও তবে প্রিয়তম সুদূর সেথায়,
লভিবে সুযশ কীর্তি গৌরব যেথায়,
কিন্তু গো একটি কথা, কহিতেও লাগে ব্যথা,
উঠিবে যশের যবে সমুচ্চ সীমায়,
তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমায়--
সুখ্যাতি অমৃত রবে, উৎফুল্ল হইবে যবে,
তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমায়।
               ২
কত যে মমতা-মাখা, আলিঙ্গন পাবে সখা,
পাবে প্রিয় বান্ধবের প্রণয় যতন,
এ হতে গভীরতর, কতই উল্লাসকর,
কতই আমোদে দিন করিবে যাপন,
কিন্তু গো অভাগী আজি এই ভিক্ষা চায়,
যখন বান্ধব-সাথ, আমোদে মাতিবে নাথ,
তখন অভাগী বলে স্মরিয়ো আমায়।
               ৩
সুচারু সায়াহ্নে যবে ভ্রমিতে ভ্রমিতে,
তোমার সে মনোহরা, সুদীপ্ত সাঁজের তারা,
সেখানে সখা গো তুমি পাইবে দেখিতে--
মনে কি পড়িবে নাথ, এক দিন আমা সাথ,
বনভ্রমি ফিরে যবে আসিতে ভবনে--
ওই সেই সন্ধ্যাতারা, দুজনে দেখেছি মোরা,
আরো যেন জ্বল জ্বল জ্বলিত গগনে।
               ৪
নিদাঘের শেষাশেষি, মলিনা গোলাপরাশি,
নিরখি বা কত সুখী হইতে অন্তরে,
দেখি কি স্মরিবে তায়, সেই অভাগিনী হায়
গাঁথিত যতনে তার মালা তোমা তরে!
যে-হস্ত গ্রথিত বলে তোমার নয়নে
হত তা সৌন্দর্য-মাখা, ক্রমেতে শিখিলে সখা
গোলাপে বাসিত ভালো যাহারি কারণে--
তখন সে দুঃখিনীকে কোরো নাথ মনে।
               ৫
বিষণ্ণ হেমন্তে যবে, বৃক্ষের পল্লব সবে
শুকায়ে পড়িবে খসে খসে চারি ধারে,
তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমারে।
নিদারুণ শীত কালে, সুখদ আগুন জ্বেলে,
নিশীথে বসিবে যবে অনলের ধারে,
তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমারে।
সেই সে কল্পনাময়ী সুখের নিশায়,
বিমল সংগীত তান, তোমার হৃদয় প্রাণ।
নীরবে সুধীরে ধীরে যদি গো জাগায়--
আলোড়ি হৃদয়-তল, এক বিন্দু অশ্রুজল,
যদি আঁখি হতে পড়ে সে তান শুনিলে,
তখন করিয়ো মনে, এক দিন তোমা সনে,
যে যে গান গাহিয়াছি হৃদি প্রাণ খুলে,
তখন স্মরিয়ো হায় অভাগিনী বলে।
আরো দেখুন
প্রায়শ্চিত্ত
Stories
মণীন্দ্র ছেলেটির বয়স হবে চোদ্দ। তার বুদ্ধি খুব তীক্ষ্ণ কিন্তু পড়াশুনায় বিশেষ মনোযোগ নেই। তবু সে স্বভাবতই মেধাবী বলে বৎসরে বৎসরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু অধ্যাপকেরা তার কাছে যতটা প্রত্যাশা করেন সে-অনুরূপ ফল হয় না। মণীন্দ্রের পিতা দিব্যেন্দু ছিলেন এই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ। কর্তব্যে ছেলের শৈথিল্য দেখে তাঁর মন উদ্‌বিগ্ন ছিল।
অক্ষয় মণীন্দ্রের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে। সে বড়ো দরিদ্র। ছাত্রবৃত্তির 'পরেই তার নির্ভর। মা বিধবা। বহু কষ্টে অক্ষয়কে মানুষ করেছেন। তার পিতা প্রিয়নাথ যখন জীবিত ছিলেন তখন যথেষ্ট উপার্জন করতেন। লোকের কাছে তাঁর সম্মানও ছিল খুব বেশি। কিন্তু ব্যয় করতেও তিনি মুক্ত হস্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা গেল যত তাঁর ঋণ, সম্পত্তি তার অর্ধেকও নয়। অক্ষয়ের মা সাবিত্রী তাঁর যত কিছু অলংকার, গাড়ি ঘোড়া বাড়ি গৃহসজ্জা প্রভৃতি সমস্ত বিক্রয় করে ক্রমে ক্রমে স্বামীর ঋণ শোধ করেছেন।
আরো দেখুন
100
Verses
            তুমি আমার আঙিনাতে ফুটিয়ে রাখ ফুল।
আমার    আনাগোনার পথখানি হয় সৌরভে আকুল।
                     ওগো ওই তোমারি ফুল।
            ওরা আমার হৃদয়পানে মুখ তুলে যে থাকে।
ওরা       তোমার মুখের ডাক নিয়ে যে আমারি নাম ডাকে।
                     ওগো ওই তোমারি ফুল।
            তোমার কাছে কী যে আমি সেই কথাটি হেসে
ওরা       আকাশেতে ফুটিয়ে তোলে, ছড়ায় দেশে দেশে।
                     ওগো ওই তোমারি ফুল।
            দিন কেটে যায় অন্যমনে,ওদের মুখে তবু
প্রভু,     তোমার মুখের সোহাগবাণী ক্লান্ত না হয় কভু।
                     ওগো ওই তোমারি ফুল।
            প্রাতের পরে প্রাতে ওরা, রাতের পরে রাতে
তোমার   অন্তবিহীন যতনখানি বহন করে মাথে।
                     ওগো ওই তোমারি ফুল।
            হাসিমুখে আমার যতন নীরব হয়ে যাচে।
তোমার   অনেক যুগের পথ-চাওয়াটি ওদের মুখে আছে।
                     ওগো ওই তোমারি ফুল।
আরো দেখুন
না গো, এই যে ধুলা আমার না এ
Verses
না গো,    এই যে ধুলা আমার না এ,
       তোমার ধুলার ধরার 'পরে
             উড়িয়ে যাব সন্ধ্যাবায়ে।
       দিয়ে মাটি আগুন জ্বালি'
       রচলে দেহ পূজার থালি,
       শেষ আরতি সারা করে
             ভেঙে যাব তোমার পায়ে।
      
             ফুল যা ছিল পূজার তরে,
       যেতে পথে ডালি হতে
             অনেক যে তার গেছে পড়ে।
       কত প্রদীপ এই থালাতে
       সাজিয়েছিলে আপন হাতে,
       কত যে তার নিবল হাওয়ায়--
             পৌঁছোল না চরণ-ছায়ে।
আরো দেখুন
সরিয়ে দিয়ে আমার ঘুমের
Verses
সরিয়ে দিয়ে আমার ঘুমের
                       পর্দাখানি
ডেকে গেল নিশীথরাতে
                       কে না জানি।
কোন্‌ গগনের দিশাহারা
তন্দ্রাবিহীন একটি তারা?
কোন্‌ রজনীর দুঃস্বপনের
                        আর্তবাণী?
ডেকে গেল নিশীথরাতে
                        কে না জানি।
আঁধার রাতে ভয় এসেছে
                        কোন্‌ সে নীড়ে?
বোঝাই তরী ডুবল কোথায়
                        পাষাণ-তীরে?
এই ধরণীর বক্ষ টুটে
এ কী রোদন এল ছুটে
আমার বক্ষে বিরামহারা
                         বেদন হানি?
ডেকে গেল নিশীথরাতে
                          কে না জানি।
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
মালঞ্চ
Novels
পিঠের দিকে বালিশগুলো উঁচু-করা। নীরজা আধ-শোওয়া পড়ে আছে রোগ শয্যায়। পায়ের উপরে সাদা রেশমের চাদর টানা, যেন তৃতীয়ার ফিকে জ্যোৎস্না হালকা মেঘের তলায়। ফ্যাকাশে তার শাঁখের মতো রঙ, ঢিলে হয়ে পড়েছে চুড়ি, রোগা হাতে নীল শিরার রেখা, ঘনপক্ষ্ণ চোখের পল্লবে লেগেছে রোগের কালিমা।
মেঝে সাদা মারবেলে বাঁধানো, দেয়ালে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ছবি, ঘরে পালঙ্ক, একটি টিপাই, দুটি বেতের মোড়ার আর এক কোণে কাপড় ঝোলাবার আলনা ছাড়া অন্য কোনো আসবার নেই; এক কোণে পিতলের কলসীতে রজনীগন্ধার গুচ্ছ, তারই মৃদু গন্ধ বাঁধা পড়েছে ঘরের বন্ধ হাওয়ায়।
আরো দেখুন