কঙ্কাল
Stories
আমরা তিন বাল্যসঙ্গী যে ঘরে শয়ন করিতাম তাহার পাশের ঘরের দেয়ালে একটি আস্ত নরকঙ্কাল ঝুলানো থাকিত। রাত্রে বাতাসে তাহার হাড়গুলা খট্‌খট্‌ শব্দ করিয়া নড়িত। দিনের বেলায় আমাদিগকে সেই হাড় নাড়িতে হইত। আমরা তখন পণ্ডিত-মহাশয়ের নিকট মেঘনাদবধ এবং ক্যাম্বেল স্কুলের এক ছাত্রের কাছে অস্থিবিদ্যা পড়িতাম। আমাদের অভিভাবকের ইচ্ছা ছিল আমাদিগকে সহসা সর্ববিদ্যায় পারদর্শী করিয়া তুলিবেন। তাঁহার অভিপ্রায় কতদূর সফল হইয়াছে যাঁহারা আমাদিগকে জানেন তাঁহাদের নিকট প্রকাশ করা বাহুল্য এবং যাঁহারা জানেন না তাঁহাদের নিকট গোপন করাই শ্রেয়।
তাহার পর বহুকাল অতীত হইয়াছে। ইতিমধ্যে সেই ঘর হইতে কঙ্কাল এবং আমাদের মাথা হইতে অস্থিবিদ্যা কোথায় স্থানান্তরিত হইয়াছে অন্বেষণ করিয়া জানা যায় না।
আরো দেখুন
মেঘ ও রৌদ্র
Stories
পূর্বদিনে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আজ ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতঃকালে ম্লান রৌদ্র ও খণ্ড মেঘে মিলিয়া পরিপক্কপ্রায় আউশ ধানের ক্ষেত্রের উপর পর্যায়ক্রমে আপন আপন সুদীর্ঘ তুলি বুলাইয়া যাইতেছিল; সুবিস্তৃত শ্যাম চিত্রপট একবার আলোকের স্পর্শে উজ্জ্বল পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করিতেছিল আবার পরক্ষণেই ছায়াপ্রলেপে গাঢ় স্নিগ্ধতায় অঙ্কিত হইতেছিল।
যখন সমস্ত আকাশরঙ্গভূমিতে মেঘ এবং রৌদ্র, দুইটি মাত্র অভিনেতা, আপন আপন অংশ অভিনয় করিতেছিল তখন নিম্নে সংসাররঙ্গভূমিতে কত স্থানে কত অভিনয় চলিতেছিল তাহার আর সংখ্যা নাই।
আরো দেখুন
বিদূষক
Stories
কাঞ্চীর রাজা কর্ণাট জয় করতে গেলেন। তিনি হলেন জয়ী। চন্দনে, হাতির দাঁতে, আর সোনামানিকে হাতি বোঝাই হল।
দেশে ফেরবার পথে বলেশ্বরীর মন্দির বলির রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে রাজা পুজো দিলেন।
আরো দেখুন
পরী
Stories
কুসমি বললে, তুমি বড্ড বানিয়ে কথা বল। একটা সত্যিকার গল্প শোনাও-না।
আমি বললুম, জগতে দুরকম পদার্থ আছে। এক হচ্ছে সত্য, আর হচ্ছে--আরও-সত্য। আমার কারবার আরও-সত্যকে নিয়ে।
আরো দেখুন
চার অধ্যায়
Novels
এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে। তার মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার-বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না। বেহিসাবি মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে তিনি যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, শাসন করতেন অন্যায় করে, সন্দেহ করতেন অকারণে। মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ অবিমিশ্র সত্যকথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়। এজন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সব-চেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা তার স্বভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। তার মার কাছে মনে হয়েছে, এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।
একটা কথা সে বাল্যকাল থেকে বুঝেছে যে, দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন। ওদের পরিবারে যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী ছিল, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্পবয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।
প্রহরশেষের আলোয় রাঙা
সেদিন চৈত্রমাস,
তোমার চোখে দেখেছিলাম
আমার সর্বনাশ।"
Upwards
Towards the peaks,
Towards the stars,
Towards the vast silence."
আরো দেখুন
সন্ধ্যা ও প্রভাত
Stories
এখানে নামল সন্ধ্যা। সূর্যদেব, কোন্‌ দেশে, কোন্‌ সমুদ্রপারে, তোমার প্রভাত হল।
অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠছে রজনীগন্ধা, বাসরঘরের দ্বারের কাছে অবগুণ্ঠিতা নববধূর মতো; কোন্‌খানে ফুটল ভোরবেলাকার কনকচাঁপা।
আরো দেখুন
90
Verses
LOVE PUNISHES when it forgives,
and injured beauty by its awful silence.
আরো দেখুন
অপরিচিতা
Stories
আজ আমার বয়স সাতাশ মাত্র। এ জীবনটা না দৈর্ঘ্যের হিসাবে বড়ো, না গুণের হিসাবে। তবু ইহার একটু বিশেষ মূল্য আছে। ইহা সেই ফুলের মতো যাহার বুকের উপরে ভ্রমর আসিয়া বসিয়াছিল, এবং সেই পদক্ষেপের ইতিহাস তাহার জীবনের মাঝখানে ফলের মতো গুটি ধরিয়া উঠিয়াছে।
সেই ইতিহাসটুকু আকারে ছোটো, তাহাকে ছোটো করিয়াই লিখিব। ছোটোকে যাঁহারা সামান্য বলিয়া ভুল করেন না তাঁহারা ইহার রস বুঝিবেন।
আরো দেখুন
মধ্যাহ্নে
Verses
হেরো ওই বাড়িতেছে বেলা,
     বসে আমি রয়েছি একেলা।
ওই হোথা যায় দেখা,     সুদূরে বনের রেখা
     মিশেছে আকাশনীলিমায়।
দিক হতে দিগন্তরে        মাঠ শুধু ধূ ধূ করে,
     বায়ু কোথা বহে চলে যায়।
সুদূর মাঠের পারে         গ্রামখানি এক ধারে
     গাছ দিয়ে ছায়া দিয়ে ঘেরা।
কাননের গায়ে যেন       ছায়াখানি বুলাইয়া
     ভেসে চলে কোথায় মেঘেরা।
মধুর উদাস প্রাণে চাই    চারি দিক পানে,
     স্তব্ধ সব ছবির মতন।
সব যেন চারিধারে অবশ আলস-ভারে
     স্বর্ণময় মায়ায় মগন।
গ্রামখানি, মাঠখানি,      উঁচুনিচু পথখানি,
     দু-একটি গাছ মাঝে মাঝে,
আকাশ-সমুদ্রে-ঘেরা       সুবর্ণ দ্বীপের পারা
     কোথা যেন সুদূরে বিরাজে।
কনকলাবণ্য লয়ে          যেন অভিভূত হয়ে
     আপনাতে আপনি ঘুমায়,
নিঝুম পাদপ-লতা,        শ্রান্তকায় নীরবতা
     শুয়ে আছে গাছের ছায়ায়।
শুধু অতি মৃদু স্বরে         গুন গুন গান করে
     যেন সব ঘুমন্ত ভ্রমর,
যেন মধু খেতে খেতে       ঘুমিয়েছে কুসুমেতে
     মরিয়া এসেছে কণ্ঠস্বর।
নীল শূন্যে ছবি আঁকা         রবির কিরণ মাখা,
     সেথা যেন বাস করিতেছি।
জীবনের আধখানি             যেন ভুলে গেছি আমি,
     কোথা যেন ফেলিয়ে এসেছি।
আনমনে ধীরি ধীরি            বেড়াইতেছি ফিরি ফিরি
     ঘুমঘোর ছায়ায় ছায়ায়--
কোথা যাব কোথা যাই         সে কথা যে মনে নাই,
     ভুলে আছি মধুর মায়ায়।
মধুর বাতাসে আজি           যেন রে উঠিছে বাজি
     পরানের ঘুমন্ত বীণাটি,
ভালোবাসা আজি কেন        সঙ্গীহারা পাখি যেন
     বসিয়া গাহিছে একেলাটি।
কে জানে কাহারে চায়,      প্রাণ যেন উভরায়
     ডাকে কারে "এসো এসো' ব'লে,
কাছে কারে পেতে চায়,      সব তারে দিতে চায়,
     মাথাটি রাখিতে চায় কোলে।
স্তব্ধ তরুতলে গিয়া            পা দুখানি ছড়াইয়া
     নিমগন মধুময় মোহে,
আনমনে গান গেয়ে              দূর শূন্যপানে চেয়ে
     ঘুমায়ে পড়িতে চায় দোঁহে।
দূর মরীচিকা-সম                ওই বন-উপবন,
     ওরি মাঝে পরান উদাসী--
বিজন বকুলতলে               পল্লবের মরমরে
     নাম ধরে বাজাইছে বাঁশি।
সে যেন কোথায় আছে,        সুদূর বনের পাছে
     কত নদী-সমুদ্রের পারে,
নিভৃত নির্ঝর-তীরে লতায় পাতায় ঘিরে
     বসে আছে নিকুঞ্জ-আঁধারে।
সাধ যায় বাঁশি করে            বন হতে বনান্তরে
     চলে যাই আপনার মনে,
কুসুমিত নদীতীরে            বেড়াইব ফিরে ফিরে
     কে জানে কাহার অন্বেষণে।
সহসা দেখিব তারে,           নিমেষেই একেবারে
     প্রাণে প্রাণে হইবে মিলন,
এই মরীচিকা-দেশে           দুজনে বাসরবেশে
     ছায়ারাজ্যে করিব ভ্রমণ।
বাঁধিবে সে বাহুপাশে,         চোখে তার স্বপ্ন ভাসে,
     মুখে তার হাসির মুকুল--
কে জানে বুকের কাছে        আঁচল আছে না আছে,
     পিঠেতে পড়েছে এলো চুল।
মুখে আধখানি কথা,         চোখে আধখানি কথা,
     আধখানি হাসিতে জড়ানো
দুজনেতে চলে যাই,         কে জানে কোথায় যাই--
     পদতলে কুসুম ছড়ানো।
বুঝি রে এমনি বেলা         ছায়ায় করিত খেলা
     তপোবনে ঋষিবালিকারা,
পরিয়া বাকলবাস,            মুখেতে বিমল হাস,
     বনে বনে বেড়াইত তারা।
হরিণশিশুরা এসে            কাছেতে বসিত ঘেঁষে,
     মালিনী বহিত পদতলে--
দু-চারি সখীতে মেলি       কথা কয় হাসি খেলি
     তরুতলে বসি কুতূহলে।
কারো কোলে কারো মাথা,     সরল প্রাণের কথা
     নিরালায় কহে প্রাণ খুলি--
লুকিয়ে গাছের আড়ে           সাধ যায় শুনিবারে
     কী কথা কহিছে মেয়েগুলি।
লতার পাতার মাঝে,           ঘাসের ফুলের মাঝে
     হরিণশিশুর সাথে মিলি,
অঙ্গে আভরণ নাই,              বাকল-বসন পরি
     রূপগুলি বেড়াইছে খেলি।
ওই দূর বনছায়া            ও যে কী জানে রে মায়া,
     ও যেন রে রেখেছে লুকায়ে--
সেই স্নিগ্ধ তপোবন,     চিরফুল্ল তরুগণ,
     হরিণশাবক তরুছায়ে।
হোথায় মালিনী নদী       বহে যেন নিরবধি,
     ঋষিকন্যা কুটিরের মাঝে--
কভু বসি তরুতলে       স্নেহে তারে ভাই বলে,
     ফুলটি ঝরিলে ব্যথা বাজে।
কত ছবি মনে আসে,     পরানের আশেপাশে
     কল্পনা কত যে করে খেলা--
বাতাস লাগায়ে গায়ে      বসিয়া তরুর ছায়ে
     কেমনে কাটিয়া যায় বেলা।
আরো দেখুন
আপদ
Stories
সন্ধ্যার দিকে ঝড় ক্রমশ প্রবল হইতে লাগিল। বৃষ্টির ঝাপট, বজ্রের শব্দ এবং বিদ্যুতের ঝিকমিকিতে আকাশে যেন সুরাসুরের যুদ্ধ বাধিয়া গেল। কালো কালো মেঘগুলো মহাপ্রলয়ের জয়পতাকার মতো দিগ্‌বিদিকে উড়িতে আরম্ভ করিল, গঙ্গার এপারে ওপারে বিদ্রোহী ঢেউগুলো কলশব্দে নৃত্য জুড়িয়া দিল, এবং বাগানের বড়ো বড়ো গাছগুলো সমস্ত শাখা ঝট্‌পট্‌ করিয়া হাহুতাশ সহকারে দক্ষিণে বামে লুটোপুটি করিতে লাগিল।
তখন চন্দননগরের বাগানবাড়িতে একটি দীপালোকিত রুদ্ধকক্ষে খাটের সম্মুখবর্তী নীচের বিছানায় বসিয়া স্ত্রী-পুরুষে কথাবার্তা চলিতেছিল।
আরো দেখুন