উপসংহার
Stories
ভোজরাজের দেশে যে মেয়েটি ভোরবেলাতে দেবমন্দিরে গান গাইতে যায় সে কুড়িয়ে-পাওয়া মেয়ে।
আচার্য বলেন, 'একদিন শেষরাত্রে আমার কানে একখানি সুর লাগল। তার পরে সেইদিন যখন সাজি নিয়ে পারুলবনে ফুল তুলতে গেছি তখন এই মেয়েটিকে ফুলগাছতলায় কুড়িয়ে পেলেম।'
আরো দেখুন
পুরোনো বাড়ি
Stories
অনেক কালের ধনী গরিব হয়ে গেছে, তাদেরই ঐ বাড়ি।
দিনে দিনে ওর উপরে দুঃসময়ের আঁচড় পড়ছে।
আরো দেখুন
মাটি
Verses
বাঁখারির বেড়া দেওয়া ভূমি; হেথা করি ঘোরাফেরা
          সারাক্ষণ আমি-দিয়ে ঘেরা
               বর্তমানে।
                    মন জানে
                    এ মাটি আমারি,
                   যেমন এ শালতরুসারি
বাঁধে নিজ তলবীথি শিকড়ের গভীর বিস্তারে
          দূর শতাব্দীর অধিকারে।
   হেথা কৃষ্ণচূড়াশাখে ঝরে শ্রাবণের বারি
          সে যেন আমারি--
   ভোরে ঘুমভাঙা আলো, রাত্রে তারাজ্বলা অন্ধকার,
          যেন সে আমারি আপনার
             এ মাটির সীমাটুকু মাঝে।
          আমার সকল খেলা, সব কাজে,
               এ ভূমি জড়িত আছে শাশ্বতের যেন সে লিখন।
                   হঠাৎ চমক ভাঙে নিশীথে যখন
সপ্তর্ষির চিরন্তন দৃষ্টিতলে,
     ধ্যানে দেখি, কালের যাত্রীর দল চলে
                   যুগে যুগান্তরে।
                 এই ভূমিখণ্ড-'পরে
                   তারা এল, তারা গেল কত।
             তারাও আমারি মতো
                 এ মাটি নিয়েছে ঘেরি--
             জেনেছিল, একান্ত এ তাহাদেরি।
                 কেহ আর্য কেহ বা অনার্য তারা,
             কত জাতি নামহীন, ইতিহাসহারা।
          কেহ হোমাগ্নিতে হেথা দিয়েছিল হবির অঞ্জলি,
                কেহ বা দিয়েছে নরবলি।
          এ মাটিতে একদিন যাহাদের সুপ্তচোখে
             জাগরণ এনেছিল অরুণ-আলোকে
                   বিলুপ্ত তাদের ভাষা।
          পরে পরে যারা বেঁধেছিল বাসা,
               সুখে দুঃখে জীবনের রসধারা
          মাটির পাত্রের মতো প্রতি ক্ষণে ভরেছিল যারা
                   এ ভূমিতে,
             এরে তারা পারিল না কোনো চিহ্ন দিতে।
               আসে যায়
                   ঋতুর পর্যায়,
               আবর্তিত অন্তহীন
                   রাত্রি আর দিন;
               মেঘরৌদ্র এর 'পরে
          ছায়ার খেলেনা নিয়ে খেলা করে
               আদিকাল হতে।
                   কালস্রোতে
          আগন্তুক এসেছি হেথায়
               সত্য কিম্বা দ্বাপরে ত্রেতায়
                   যেখানে পড়ে নি লেখা
          রাজকীয় স্বাক্ষরের একটিও স্থায়ী রেখা।
                   হায় আমি,
                        হায় রে ভূস্বামী,
          এখানে তুলিছ বেড়া--উপাড়িছ হেথা যেই তৃণ
               এই মাটিতে সে-ই রবে লীন
          পুনঃ পুনঃ বৎসরে বৎসরে। তারপরে!--
               এই ধূলি রবে পড়ি আমি-শূন্য চিরকাল-তরে।
আরো দেখুন
দানপ্রতিদান
Stories
বড়োগিন্নি যে কথাগুলা বলিয়া গেলেন, তাহার ধার যেমন তাহার বিষও তেমনি। যে-হতভাগিনীর উপর প্রয়োগ করিয়া গেলেন, তাহার চিত্তপুত্তলি একেবারে জ্বলিয়া জ্বলিয়া লুটিতে লাগিল।
বিশেষত, কথাগুলা তাহার স্বামীর উপর লক্ষ্য করিয়া বলা-- এবং স্বামী রাধামুকুন্দ তখন রাত্রের আহার সমাপন করিয়া অনতিদূরে বসিয়া তাম্বুলের সহিত তাম্রকূটধূম সংযোগ করিয়া খাদ্যপরিপাকে প্রবৃত্ত ছিলেন। কথাগুলো শ্রুতিপথে প্রবেশ করিয়া তাঁহার পরিপাকের যে বিশেষ ব্যাঘাত করিল, এমন বোধ হইল না। অবিচলিত গাম্ভীর্যের সহিত তাম্রকূট নিঃশেষ করিয়া অভ্যাসমত যথাকালে শয়ন করিতে গেলেন।
আরো দেখুন
উৎসর্গ
Stories
শেষ পারানির খেয়ায় তুমি
    দিনশেষের নেয়ে
আরো দেখুন
শুভদৃষ্টি
Stories
কান্তিচন্দ্রের বয়স অল্প, তথাপি স্ত্রীবিয়োগের পর দ্বিতীয় স্ত্রীর অনুসন্ধানে ক্ষান্ত থাকিয়া পশুপক্ষী-শিকারেই মনোনিবেশ করিয়াছেন। দীর্ঘ কৃশ কঠিন লঘু শরীর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, অব্যর্থ লক্ষ্য, সাজসজ্জায় পশ্চিমদেশীর মতো; সঙ্গে সঙ্গে কুস্তিগির হীরা সিং, ছক্কনলাল, এবং গাইয়ে বাজিয়ে খাঁসাহেব, মিঞাসাহেব অনেক ফিরিয়া থাকে; অকর্মণ্য অনুচর-পরিচরেরও অভাব নাই।
দুই-চারিজন শিকারী বন্ধুবান্ধব লইয়া অঘ্রানের মাঝামাঝি কান্তিচন্দ্র নৈদিঘির বিলের ধারে শিকার করিতে গিয়াছেন। নদীতে দুইটি বড়ো বোটে তাঁহাদের বাস, আরো  গোটা-তিনচার নৌকায় চাকরবাকরের দল গ্রামের ঘাট ঘিরিয়া বসিয়া আছে। গ্রামবধূদের জল তোলা, স্নান করা প্রায় বন্ধ। সমস্ত দিন বন্দুকের আওয়াজে জলস্থল কম্পমান, সন্ধ্যাবেলায় ওস্তাদি গলায় তানকর্তবে পল্লীর নিদ্রাতন্দ্রা তিরোহিত।
আরো দেখুন
বড়ো খবর
Stories
কুসমি বললে, তুমি যে বললে এখনকার কালের বড়ো বড়ো সব খবর তুমি আমাকে শোনাবে, নইলে আমার শিক্ষা হবে কী রকম ক'রে, দাদামশায়।
দাদামশায় বললে, বড়ো খবরের ঝুলি বয়ে বেড়াবে কে বলো, তার মধ্যে যে বিস্তর রাবিশ।
আরো দেখুন
ভিতরে ও বাহিরে
Verses
খোকা থাকে জগৎ-মায়ের
     অন্তঃপুরে --
তাই সে শোনে কত যে গান
     কতই সুরে।
নানান রঙে রাঙিয়ে দিয়ে
     আকাশ পাতাল
মা রচেছেন খোকার খেলা-
     ঘরের চাতাল।
তিনি হাসেন, যখন তরু -
     লতার দলে
খোকার কাছে পাতা নেড়ে
     প্রলাপ বলে।
সকল নিয়ম উড়িয়ে দিয়ে
     সূর্য শশী
খোকার সাথে হাসে, যেন
     এক-বয়সী।
সত্যবুড়ো নানা রঙের
     মুখোশ প'রে
শিশুর সনে শিশুর মতো
     গল্প করে।
চরাচরের সকল কর্ম
     ক'রে হেলা
মা যে আসেন খোকার সঙ্গে
     করতে খেলা।
খোকার জন্যে করেন সৃষ্টি
     যা ইচ্ছে তাই --
কোনো নিয়ম কোনো বাধা-
     বিপত্তি নাই।
বোবাদেরও কথা বলান
     খোকার কানে,
অসাড়কেও জাগিয়ে তোলেন
     চেতন প্রাণে।
খোকার তরে গল্প রচে
     বর্ষা শরৎ ,
খেলার গৃহ হয়ে ওঠে
     বিশ্বজগৎ।
খোকা তারি মাঝখানেতে
     বেড়ায় ঘুরে,
খোকা থাকে জগৎ-মায়ের
     অন্তঃপুরে।
আমরা থাকি জগৎ-পিতার
     বিদ্যালয়ে --
উঠেছে ঘর পাথর-গাঁথা
     দেয়াল লয়ে।
জ্যোতিষশাস্ত্র-মতে চলে
     সূর্য শশী,
নিয়ম থাকে বাগিয়ে ল'য়ে
    রশারশি।
এম্‌নি ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে
     বৃক্ষ লতা,
যেন তারা বোঝেই নাকো
     কোনোই কথা।
চাঁপার ডালে চাঁপা ফোটে
     এম্‌নি ভানে
যেন তারা সাত ভায়েরে
     কেউ না জানে।
মেঘেরা চায় এম্‌নিতরো
     অবোধ ভাবে,
যেন তারা জানেই নাকো
     কোথায় যাবে।
ভাঙা পুতুল গড়ায় ভুঁয়ে
     সকল বেলা,
যেন তারা কেবল শুধু
     মাটির ঢেলা।
দিঘি থাকে নীরব হয়ে
     দিবারাত্র,
নাগকন্যের কথা যেন
     গল্পমাত্র।
সুখদুঃখ এম্‌নি বুকে
     চেপে রহে,
যেন তারা কিছুমাত্র
     গল্প নহে।
যেমন আছে তেম্‌নি থাকে
     যে যাহা তাই--
আর যে কিছু হবে এমন
     ক্ষমতা নাই।
বিশ্বগুরু-মশায় থাকেন
     কঠিন হয়ে,
আমরা থাকি জগৎ-পিতার
     বিদ্যালয়ে।
আরো দেখুন
রথযাত্রা
Stories
রথযাত্রার দিন কাছে।
তাই রানী রাজাকে বললে, 'চলো, রথ দেখতে যাই।'
আরো দেখুন
রাজর্ষি
Novels
রাজর্ষি সম্বন্ধে কিছু বলবার জন্যে অনুরোধ পেয়েছি। বলবার বিশেষ কিছু নেই। এর প্রধান বক্তব্য এই যে, এ আমার স্বপ্নলব্ধ উপন্যাস।
বালক পত্রের সম্পাদিকা আমাকে ঐ মাসিকের পাতে নিয়মিত পরিবেশনের কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তার ফল হল এই যে, প্রায় একমাত্র আমিই হলুম তার ভোজের জোগানদার। একটু সময় পেলেই মনটা "কী লিখি' "কী লিখি' করতে থাকে।
হরি তোমায় ডাকি-- বালক একাকী,
আঁধার অরণ্যে ধাই হে।
গহন তিমিরে নয়নের নীরে
পথ খুঁজে নাহি পাই হে।
সদা মনে হয় কী করি কী করি,
কখন আসিবে কাল-বিভাবরী,
তাই ভয়ে মরি ডাকি "হরি হরি'--
হরি বিনা কেহ নাই হে।
নয়নের জল হবে না বিফল,
তোমায় সবে বলে ভকতবৎসল,
সেই আশা মনে করেছি সম্বল--
বেঁচে আছি আমি তাই হে।
আঁধারেতে জাগে তোমার আঁখিতারা,
তোমার ভক্ত কভু হয় না পথহারা,
ধ্রুব তোমায় চাহে তুমি ধ্রুবতারা--
আর কার পানে চাই হে।
"মা আমার পাষাণের মেয়ে
সন্তানে দেখলি নে চেয়ে।"
কলহ কটকটাং কাঠ কাঠিন্য কাঠ্যং
কটন কিটন কীটং কুট্‌নলং খট্টমট্টং।
আমায় ছ-জনায় মিলে পথ দেখায় ব'লে
পদে পদে পথ ভুলি হে।
নানা কথার ছলে নানান মুনি বলে,
সংশয়ে তাই দুলি হে।
তোমার কাছে যাব এই ছিল সাধ,
তোমার বাণী শুনে ঘুচাব প্রমাদ,
কানের কাছে সবাই করিছে বিবাদ
শত লোকের শত বুলি হে।
কাতর প্রাণে আমি তোমায় যখন যাচি
আড়াল করে সবাই দাঁড়ায় কাছাকাছি,
ধরণীর ধুলো তাই নিয়ে আছি--
পাই নে চরণধূলি হে।
শত ভাগ মোর শত দিকে ধায়,
আপনা-আপনি বিবাদ বাধায়,
কারে সামালিব এ কী হল দায়
একা যে অনেকগুলি হে।
আমায় এক করো তোমার প্রেমে বেঁধে,
এক পথ আমায় দেখাও অবিচ্ছেদে,
ধাঁধার মাঝে পড়ে কত মরি কেঁদে--
চরণেতে লহ তুলি হে।
আরো দেখুন
ত্যাগ
Stories
ফাল্গুনের প্রথম পূর্ণিমায় আম্রমুকুলের গন্ধ লইয়া নব বসন্তের বাতাস বহিতেছে। পুষ্করিণীতীরের একটি পুরাতন লিচুগাছের ঘন পল্লবের মধ্য হইতে একটি নিদ্রাহীন অশ্রান্ত পাপিয়ার গান মুখুজ্যেদের বাড়ির একটি নিদ্রাহীন শয়নগৃহের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিতেছে। হেমন্ত কিছু চঞ্চলভাবে কখনো তার স্ত্রীর একগুচ্ছ চুল খোঁপা হইতে বিশ্লিষ্ট করিয়া লইয়া আঙুলে জড়াইতেছে, কখনো তাহার বালাতে চুড়িতে সংঘাত করিয়া ঠুং ঠুং শব্দ করিতেছে, কখনো তাহার মাথার ফুলের মালাটা টানিয়া স্বস্থানচ্যুত করিয়া তাহার মুখের উপর আনিয়া ফেলিতেছে। সন্ধ্যাবেলাকার নিস্তব্ধ ফুলের গাছটিকে সচেতন করিয়া তুলিবার জন্য বাতাস যেমন একবার এপাশ হইতে একবার ওপাশ হইতে একটু-আধটু নাড়াচাড়া করিতে থাকে, হেমন্তের কতকটা সেই ভাব।
কিন্তু কুসুম সম্মুখের চন্দ্রালোকপ্লাবিত অসীম শূন্যের মধ্যে দুই নেত্রকে নিমগ্ন করিয়া দিয়া স্থির হইয়া বসিয়া আছে। স্বামীর চাঞ্চল্য তাহাকে স্পর্শ করিয়া প্রতিহত হইয়া ফিরিয়া যাইতেছে। অবশেষে হেমন্ত কিছু অধীরভাবে কুসুমের দুই হাত নাড়া দিয়া বলিল, 'কুসুম, তুমি আছ কোথায়? তোমাকে যেন একটা মস্ত দুরবীন কষিয়া বিস্তর ঠাহর করিয়া বিন্দুমাত্র দেখা যাইবে এমনি দূরে গিয়া পড়িয়াছ। আমার ইচ্ছা, তুমি আজ একটু কাছাকাছি এসো। দেখো দেখি কেমন চমৎকার রাত্রি।'
আরো দেখুন