মেঘলা দিনে
Stories
রোজই থাকে সমস্তদিন কাজ, আর চার দিকে লোকজন। রোজই মনে হয়, সেদিনকার কাজে, সেদিনকার আলাপে সেদিনকার সব কথা দিনের শেষে বুঝি একেবারে শেষ করে দেওয়া হয়। ভিতরে কোন্‌ কথাটি যে বাকি রয়ে গেল তা বুঝে নেবার সময় পাওয়া যায় না।
আজ সকালবেলা মেঘের স্তবকে স্তবকে আকাশের বুক ভরে উঠেছে। আজও সমস্ত দিনের কাজ আছে সামনে, আর লোক আছে চার দিকে। কিন্তু, আজ মনে হচ্ছে, ভিতরে যা-কিছু আছে বাইরে তা সমস্ত শেষ করে দেওয়া যায় না।
আরো দেখুন
সহসা ডালপালা তোর
Songs
    সহসা    ডালপালা তোর উতলা-যে    ও চাঁপা, ও করবী!
        কারে তুই    দেখতে পেলি আকাশে-মাঝে জানি না যে॥
কোন্‌ সুরের মাতন হাওয়ায় এসে  বেড়ায় ভেসে   ও চাঁপা, ও করবী!
        কার নাচনের নূপুর বাজে    জানি না যে॥
                তোরে     ক্ষণে ক্ষণে চমক লাগে।
            কোন্‌ অজানার ধেয়ান তোমার মনে জাগে।
কোন্‌    রঙের মাতন উঠল দুলে  ফুলে ফুলে  ও চাঁপা, ও করবী!
            কে সাজালে রঙিন সাজে    জানি না যে॥
আরো দেখুন
স্বর্ণমৃগ
Stories
আদ্যানাথ এবং বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী দুই শরিক। উভয়ের মধ্যে বৈদ্যনাথের অবস্থাই কিছু খারাপ। বৈদ্যনাথের বাপ মহেশচন্দ্রের বিষয়বুদ্ধি আদৌ ছিল না, তিনি দাদা শিবনাথের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া থাকিতেন। শিবনাথ ভাইকে প্রচুর স্নেহবাক্য দিয়া তৎপরিবর্তে তাঁহার বিষয়সম্পত্তি সমস্ত আত্মসাৎ করিয়া লন। কেবল খানকতক কোম্পানির কাগজ অবশিষ্ট থাকে। জীবনসমুদ্রে সেই কাগজ-কখানি বৈদ্যনাথের একমাত্র অবলম্বন।
শিবনাথ বহু অনুসন্ধানে তাঁহার পুত্র আদ্যানাথের সহিত এক ধনীর একমাত্র কন্যার বিবাহ দিয়া বিষয়বৃদ্ধির আর-একটি সুযোগ করিয়া রাখিয়াছিলেন। মহেশচন্দ্র একটি সপ্তকন্যাভারগ্রস্ত দরিদ্র ব্রাহ্মণের প্রতি দয়া করিয়া এক পয়সা পণ না লইয়া তাহার জ্যেষ্ঠা কন্যাটির সহিত পুত্রের বিবাহ দেন। সাতটি কন্যাকেই যে ঘরে লন নাই তাহার কারণ, তাঁহার একটিমাত্র পুত্র এবং ব্রাহ্মণও সেরূপ অনুরোধ করে নাই। তবে, তাহাদের বিবাহের উদ্দেশে সাধ্যাতিরিক্ত অর্থসাহায্য করিয়াছিলেন।
আরো দেখুন
সদর ও অন্দর
Stories
বিপিনকিশোর ধনীগৃহে জন্মিয়াছিলেন, সেইজন্যে ধন যে পরিমাণে ব্যয় করিতে জানিতেন তাহার অর্ধেক পরিমাণেও উপার্জন করিতে শেখেন নাই। সুতরাং যে গৃহে জন্ম সে গৃহে দীর্ঘকাল বাস করা ঘটিল না।
সুন্দর সুকুমারমূর্তি তরুণ যুবক, গানবাজনায় সিদ্ধহস্ত, কাজকর্মে নিরতিশয় অপটু; সংসারের পক্ষে সম্পূর্ণ অনাবশ্যক। জীবনযাত্রার পক্ষে জগন্নাথদেবের রথের মতো অচল; যেরূপ বিপুল আয়োজনে চলিতে পারেন সেরূপ আয়োজন সম্প্রতি বিপিনকিশোরের আয়ত্তাতীত।
আরো দেখুন
মেঘ ও রৌদ্র
Stories
পূর্বদিনে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আজ ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতঃকালে ম্লান রৌদ্র ও খণ্ড মেঘে মিলিয়া পরিপক্কপ্রায় আউশ ধানের ক্ষেত্রের উপর পর্যায়ক্রমে আপন আপন সুদীর্ঘ তুলি বুলাইয়া যাইতেছিল; সুবিস্তৃত শ্যাম চিত্রপট একবার আলোকের স্পর্শে উজ্জ্বল পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করিতেছিল আবার পরক্ষণেই ছায়াপ্রলেপে গাঢ় স্নিগ্ধতায় অঙ্কিত হইতেছিল।
যখন সমস্ত আকাশরঙ্গভূমিতে মেঘ এবং রৌদ্র, দুইটি মাত্র অভিনেতা, আপন আপন অংশ অভিনয় করিতেছিল তখন নিম্নে সংসাররঙ্গভূমিতে কত স্থানে কত অভিনয় চলিতেছিল তাহার আর সংখ্যা নাই।
আরো দেখুন
গাব তোমার সুরে
Songs
গাব তোমার সুরে    দাও সে বীণাযন্ত্র,
শুনব তোমার বাণী    দাও সে অমর মন্ত্র।
করব তোমার সেবা     দাও সে পরম শক্তি,
চাইব তোমার মুখে    দাও সে অচল ভক্তি ॥
সইব তোমার আঘাত    দাও সে বিপুল ধৈর্য,
বইব তোমার ধ্বজা    দাও সে অটল স্থৈর্য ॥
নেব সকল বিশ্ব    দাও সে প্রবল প্রাণ,
করব আমায় নিঃস্ব    দাও সে প্রেমের দান ॥
যাব তোমার সাথে     দাও সে দখিন হস্ত,
লড়ব তোমার রণে     দাও সে তোমার অস্ত্র ॥
জাগব তোমার সত্যে     দাও সেই আহ্বান।
ছাড়ব সুখের দাস্য,     দাও দাও কল্যাণ ॥
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
নারীর উক্তি
Verses
      মিছে তর্ক-- থাক্‌ তবে থাক্‌।
                   কেন কাঁদি বুঝিতে পার না?
        তর্কেতে বুঝিবে তা কি?          এই মুছিলাম আঁখি--
              এ শুধু চোখের জল, এ নহে ভর্ৎসনা।
              আমি কি চেয়েছি পায়ে ধরে
                   ওই তব আঁখি-তুলে চাওয়া,
        ওই কথা, ওই হাসি,           ওই কাছে আসা-আসি,
              অলক দুলায়ে দিয়ে হেসে চলে যাওয়া?
              কেন আন বসন্তনিশীথে
                   আঁখিভরা আবেশ বিহ্বল
        যদি বসন্তের শেষে                 শ্রান্তমনে ম্লান হেসে
              কাতরে খুঁজিতে হয় বিদায়ের ছল?
              আছি যেন সোনার খাঁচায়
                   একখানি পোষ-মানা প্রাণ।
        এও কি বুঝাতে হয়                প্রেম যদি নাহি রয়
              হাসিয়ে সোহাগ করা শুধু অপমান?
              মনে আছে সেই এক দিন
                   প্রথম প্রণয় সে তখন।
        বিমল শরৎকাল,                     শুভ্র ক্ষীণ মেঘজাল,
              মৃদু শীতবায়ে স্নিগ্ধ রবির কিরণ।
              কাননে ফুটিত শেফালিকা,
                   ফুলে ছেয়ে যেত তরুমূল।
        পরিপূর্ণ সুরধুনী,                  কুলুকুলু ধ্বনি শুনি,
              পরপারে বনশ্রেণী কুয়াশা-আকুল।
আমা-পানে চাহিয়ে, তোমার
                   আঁখিতে কাঁপিত প্রাণখানি।
        আনন্দে বিষাদে মেশা              সেই নয়নের নেশা
              তুমি তো জান না তাহা, আমি তাহা জানি।
              সে কি মনে পড়িবে তোমার--
                   সহস্র লোকের মাঝখানে
        যেমনি দেখিতে মোরে           কোন্‌ আকর্ষণডোরে
              আপনি আসিতে কাছে জ্ঞানে কি অজ্ঞানে।
              ক্ষণিক বিরহ-অবসানে
                   নিবিড় মিলন-ব্যাকুলতা।
        মাঝে মাঝে সব ফেলি           রহিতে নয়ন মেলি,
              আঁখিতে শুনিতে যেন হৃদয়ের কথা।
              কোনো কথা না রহিলে তবু
                   শুধাইতে নিকটে আসিয়া।
        নীরবে চরণ ফেলে             চুপিচুপি কাছে এলে
              কেমনে জানিতে পেতে, ফিরিতে হাসিয়া।
              আজ তুমি দেখেও দেখ না,
                   সব কথা শুনিতে না পাও।
        কাছে আস আশা ক'রে        আছি সারাদিন ধরে,
              আনমনে পাশ দিয়ে তুমি চলে যাও।
              দীপ জ্বেলে দীর্ঘ ছায়া লয়ে
                   বসে আছি সন্ধ্যায় ক'জনা--
        হয়তো বা কাছে এস,           হয়তো বা দূরে বস,
              সে সকলি ইচ্ছাহীন দৈবের ঘটনা।
এখন হয়েছে বহু কাজ,
                   সতত রয়েছ অন্যমনে।
        সর্বত্র ছিলাম আমি--              এখন এসেছি নামি
                 হৃদয়ের প্রান্তদেশে, ক্ষুদ্র গৃহকোণে।
                 দিয়েছিলে হৃদয় যখন
                        পেয়েছিলে প্রাণমন দেহ--
        আজ সে হৃদয় নাই,                 যতই সোহাগ পাই
                 শুধু তাই অবিশ্বাস বিষাদ সন্দেহ।
                 জীবনের বসন্তে যাহারে
                        ভালোবেসেছিলে একদিন,
        হায় হায় কী কুগ্রহ,           আজ তারে অনুগ্রহ--
                 মিষ্ট কথা দিবে তারে গুটি দুই-তিন।
                 অপবিত্র ও করপরশ
                        সঙ্গে ওর হৃদয় নহিলে।
        মনে কি করেছ বঁধু,                 ও হাসি এতই মধু
                 প্রেম না দিলেও চলে, শুধু হাসি দিলে।
                 তুমিই তো দেখালে আমায়
                       ( স্বপ্নেও ছিল না এত আশা )
        প্রেমে দেয় কতখানি           কোন্‌ হাসি কোন্‌ বাণী,
                 হৃদয় বাসিতে পারে কত ভালোবাসা।
                 তোমারি সে ভালোবাসা দিয়ে
                      বুঝেছি আজি এ ভালোবাসা--
        আজি এই দৃষ্টি হাসি,          এ আদর রাশি রাশি,
                এই দূরে চলে-যাওয়া, এই কাছে আসা।
বুক ফেটে কেন অশ্রু পড়ে
                      তবুও কি বুঝিতে পার না?
        তর্কেতে বুঝিবে তা কি?          এই মুছিলাম আঁখি--
                 এ শুধু চোখের জল, এ নহে ভর্ৎসনা।
আরো দেখুন
গোরা
Novels
শ্রাবণ মাসের সকালবেলায় মেঘ কাটিয়া গিয়া নির্মল রৌদ্রে কলিকাতার আকাশ ভরিয়া গিয়াছে। রাস্তায় গাড়িঘোড়ার বিরাম নাই, ফেরিওয়ালা অবিশ্রাম হাঁকিয়া চলিয়াছে, যাহারা আপিসে কালেজে আদালতে যাইবে তাহাদের জন্য বাসায় বাসায় মাছ-তরকারির চুপড়ি আসিয়াছে ও রান্নাঘরে উনান জ্বালাইবার ধোঁওয়া উঠিয়াছে--কিন্তু তবু এত বড়ো এই-যে কাজের শহর কঠিন হৃদয় কলিকাতা, ইহার শত শত রাস্তা এবং গলির ভিতরে সোনার আলোকের ধারা আজ যেন একটা অপূর্ব যৌবনের প্রবাহ বহিয়া লইয়া চলিয়াছে।
এমন দিনে বিনা-কাজের অবকাশে বিনয়ভূষণ তাহার বাসার দোতলার বারান্দায় একলা দাঁড়াইয়া রাস্তায় জনতার চলাচল দেখিতেছিল। কালেজের পড়াও অনেক দিন চুকিয়া গেছে, অথচ সংসারের মধ্যেও প্রবেশ করে নাই, বিনয়ের অবস্থাটা এইরূপ। সভাসমিতি চালানো এবং খবরের কাগজ লেখায় মন দিয়াছে-- কিন্তু তাহাতে সব মনটা ভরিয়া উঠে নাই। অন্তত আজ সকালবেলায় কী করিবে তাহা ভাবিয়া না পাইয়া তাহার মনটা চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল। পাশের বাড়ির ছাতের উপরে গোটা-তিনেক কাক কী লইয়া ডাকাডাকি করিতেছিল এবং চড়ুই-দম্পতি তাহার বারান্দার এক কোণে বাসা-নির্মাণ-ব্যাপারে পরস্পরকে কিচিমিচি শব্দে উৎসাহ দিতেছিল-- সেই সমস্ত অব্যক্ত কাকলি বিনয়ের মনের মধ্যে একটা কোন্‌ অস্পষ্ট ভাবাবেগকে জাগাইয়া তুলিতেছিল।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়,
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়
"বোলো না কাতর স্বরে না করি বিচার
জীবন স্বপনসম মায়ার সংসার।"
দুখনিশীথিনী হল আজি ভোর।
কাটিল কাটিল অধীনতা ডোর।
চাঁদের অমিয়া-সনে চন্দন বাঁটিয়া গো
কে মাজিল গোরার দেহখানি--
আরো দেখুন
সুয়োরানীর সাধ
Stories
সুয়োরানীর বুঝি মরণকাল এল।
তার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠছে, তার কিছুই ভালো লাগছে না। বদ্দি বড়ি নিয়ে এল। মধু দিয়ে মেড়ে বললে, 'খাও।' সে ঠেলে ফেলে দিলে।
আরো দেখুন