রাজটিকা
Stories
নবেন্দুশেখরের সহিত অরুণলেখার যখন বিবাহ হইল, তখন হোমধূমের অন্তরাল হইতে ভগবান প্রজাপতি ঈষৎ একটু হাস্য করিলেন। হায়, প্রজাপতির পক্ষে যাহা খেলা আমাদের পক্ষে তাহা সকল সময়ে কৌতুকের নহে।
নবেন্দুশেখরের পিতা পূর্ণেন্দুশেখর ইংরাজরাজ-সরকারে বিখ্যাত। তিনি এই ভবসমুদ্রে কেবলমাত্র দ্রুতবেগে সেলাম-চালনা দ্বারা রায়বাহাদুর পদবীর উৎতুঙ্গ মরুকূলে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন; আরো দুর্গমতর সম্মানপথের পাথেয় তাঁহার ছিল, কিন্তু পঞ্চান্ন বৎসর বয়ঃক্রমকালে অনতিদূরবর্তী রাজখেতাবের কুহেলিকাচ্ছন্ন গিরিচূড়ার প্রতি করুণ লোলুপ দৃষ্টি স্থিরনিবদ্ধ করিয়া এই রাজানুগৃহীত ব্যাক্তি অকস্মাৎ খেতাববর্জিত লোকে গমন করিলেন এবং তাঁহার বহু-সেলাম-শিথিল গ্রীবাগ্রন্থি শ্মশানশয্যায় বিশ্রাম লাভ করিল।
আরো দেখুন
দুরাশা
Stories
দার্জিলিঙে গিয়া দেখিলাম, মেঘে বৃষ্টিতে দশ দিক আচ্ছন্ন। ঘরের বাহির হইতে ইচ্ছা হয় না, ঘরের মধ্যে থাকিতে আরো অনিচ্ছা জন্মে।
হোটেলে প্রাতঃকালের আহার সমাধা করিয়া পায়ে মোটা বুট এবং আপাদমস্তক ম্যাকিন্টশ পরিয়া বেড়াইতে বাহির হইয়াছি। ক্ষণে ক্ষণে টিপ্‌ টিপ্‌ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে এবং সর্বত্র ঘন মেঘের কুজ্ঝটিকায় মনে হইতেছে, যেন বিধাতা হিমালয়পর্বতসুদ্ধ সমস্ত বিশ্বচিত্র রবার দিয়া ঘষিয়া ঘষিয়া মুছিয়া ফেলিবার উপক্রম করিয়াছেন।
আরো দেখুন
মুনশি
Stories
আচ্ছা দাদামশায়, তোমাদের সেই মুনশিজি এখন কোথায় আছেন।
এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব তার সময়টা বুঝি কাছে এসেছে, তবু হয়তো কিছুদিন সবুর করতে হবে।
আরো দেখুন
কর্মফল
Stories
আজ সতীশের মাসি সুকুমারী এবং মেসোমশায় শশধরবাবু আসিয়াছেন-- সতীশের মা বিধুমুখী ব্যস্তসমস্তভাবে তাঁহাদের অভ্যর্থনায় নিযুক্ত। 'এসো দিদি, বোসো। আজ কোন্‌ পুণ্যে রায়মশায়ের দেখা পাওয়া গেল! দিদি না আসলে তোমার আর দেখা পাবার জো নেই।'
শশধর। এতেই বুঝবে তোমার দিদির শাসন কিরকম কড়া। দিনরাত্রি চোখে চোখে রাখেন।
আরো দেখুন
মণিহারা
Stories
সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে।
বোটের ছাদের উপরে মাঝি নমাজ পড়িতেছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত আকাশপটে তাহার নীরব উপাসনা ক্ষণে ক্ষণে ছবির মতো আঁকা পড়িতেছিল। স্থির রেখাহীন নদীর জলের উপর ভাষাতীত অসংখ্য বর্ণচ্ছটা দেখিতে দেখিতে ফিকা হইতে গাঢ় লেখায়, সোনার রঙ হইতে ইস্পাতের রঙে, এক আভা হইতে আর-এক আভায় মিলাইয়া আসিতেছিল।
আরো দেখুন
ললাটের লিখন
Stories
ছেলেবেলায় পৃথ্বীশের ডান দিকের কপালে চোট লেগেছিল ভুরুর মাঝখান থেকে উপর পর্যন্ত। সেই আঘাতে ডান চোখটাও সংকুচিত। পৃথ্বীশকে ভালো দেখতে কি না সেই প্রশ্নের উত্তরটা কাটা দাগের অবিচারে সম্পূর্ণ হতে পারল না। অদৃষ্টের এই লাঞ্ছনাকে এত দিন থেকে প্রকাশ্যে পৃথ্বীশ বহন করে আসছে তবুও দাগও যেমন মেলায় নি তেমনি ঘোচে নি তার সংকোচ। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় হবার উপলক্ষে প্রত্যেকবার ধিক্‌কারটা জেগে ওঠে মনে। কিন্তু বিধাতাকে গাল দেবার অধিকার তার নেই। তার রচনার ঐশ্বর্যকে বন্ধুরা স্বীকার করছে প্রচুর প্রশংসায়, শত্রুরা নিন্দাবাক্যের নিরন্তর কটুক্তিতে। লেখার চারি দিকে ভিড় জমছে। দু টাকা আড়াই টাকা দামের বইগুলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। সম্পাদকরা তার কলমের প্রসাদ ছুটোছাঁটা যা-ই পায় কিছুই ছাড়ে না। পাঠিকারা বলে, পৃথ্বীশবাবু মেয়েদের মন ও চরিত্র যেমন আশ্চর্য বোঝেন ও বর্ণনা করেন এমন সাধ্য নেই আর কোনো লেখকের। পুরুষ-বন্ধুরা বলে, ওর লেখায় মেয়েদের এত-যে স্তুতিবাদ সে কেবল হতভাগার ভাঙা কপালের দোষে। মুখশ্রী যদি অক্ষুণ্ন হত তা হলে মেয়েদের সম্বন্ধে সত্য কথা বাধত না মুখে। মুখের চেহারা বিপক্ষতা করায় মুখের অত্যুক্তিকে সহায় করেছে মনোহরণের অধ্যবসায়।
শ্রীমতী বাঁশরি সরকার ব্যারিস্টারি চক্রের মেয়ে-- বাপ ব্যারিস্টার, ভাইরা ব্যারিস্টার। দু বার গেছে য়ুরোপে ছুটি উপলক্ষে। সাজে সজ্জায় ভাষায় ভঙ্গিতে আছে আধুনিক যুগের সুনিপুণ উদ্দামতা। রূপসী বলতে যা বোঝায় তা নয়, কিন্তু আকৃতিটা যেন ফ্রেঞ্চ পালিশ দিয়ে ঝকঝকে করা।
আরো দেখুন
লহো লহো তুলে
Songs
          লহো লহো তুলে লহো নীরব বীণাখানি।
তোমার নন্দননিকুঞ্জ হতে সুর দেহো তায় আনি
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর ॥
আমি    আঁধার বিছায়ে আছি রাতের আকাশে
                        তোমারি আশ্বাসে।
          তারায় তারায় জাগাও তোমার আলোক-ভরা বাণী
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর ॥
          পাষাণ আমার কঠিন দুখে তোমায় কেঁদে বলে,
          "পরশ দিয়ে সরস করো, ভাসাও অশ্রুজলে,
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর।'
          শুষ্ক যে এই নগ্ন মরু নিত্য মরে লাজে
                        আমার চিত্তমাঝে,
          শ্যামল রসের আঁচল তাহার বক্ষে দেহো টানি
                   ওহে    সুন্দর হে সুন্দর ॥
আরো দেখুন
মুক্তকুন্তলা
Stories
আমার খুদে বন্ধুরা এসে হাজির তাদের নালিশ নিয়ে। বললে, দাদামশায় তুমি কি আমাদের ছেলেমানুষ মনে কর।
তা, ভাই, ঐ ভুলটাই তো করেছিলুম। আজকাল নিজেরই বয়েসটার ভুল হিসেব করতে শুরু করেছি।
আরো দেখুন
খেলনার মুক্তি
Verses
এক আছে মণিদিদি,
আর আছে তার ঘরে জাপানি পুতুল
           নাম হানাসান।
        পরেছে জাপানি পেশোয়াজ
ফিকে সবুজের 'পরে ফুলকাটা সোনালি রঙের।
        বিলেতের হাট থেকে এল তার বর;
সেকালের রাজপুত্র কোমরেতে তলোয়ার বাঁধা,
        মাথার টুপিতে উঁচু পাখির পালখ--
           কাল হবে অধিবাস, পশু হবে বিয়ে।
        সন্ধে হল।
    পালঙ্কেতে শুয়ে হানাসান।
           জ্বলে ইলেক্‌ট্রিক বাতি।
    কোথা থেকে এল এক কালো চামচিকে,
           উড়ে উড়ে ফেরে ঘুরে ঘুরে,
               সঙ্গে তার ঘোরে ছায়া।
           হানাসান ডেকে বলে,
    "চামচিকে, লক্ষ্মী ভাই, আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাও
           মেঘেদের দেশে।
জন্মেছি খেলনা হয়ে--
        যেখানে খেলার স্বর্গ
           সেইখানে হয় যেন গতি
               ছুটির খেলায়।'
মণিদিদি এসে দেখে পালঙ্কে তো নেই হানাসান।
        কোথা গেল! কোথা গেল!
    বটগাছে আঙিনার পারে
           বাসা ক'রে আছে ব্যাঙ্গমা;
        সে বলে, "আমি তো জানি,
               চামচিকে ভায়া
        তাকে নিয়ে উড়ে চলে গেছে।'
মণি বলে, "হেই দাদা, হেই ব্যাঙ্গমা,
        আমাকেও নিয়ে চলো,
           ফিরিয়ে আনি গে।'
ব্যাঙ্গমা মেলে দিল পাখা,
           মণিদিদি উড়ে চলে সারা রাত্রি ধ'রে।
    ভোর হল, এল চিত্রকূটগিরি--
               সেইখানে মেঘেদের পাড়া।
মণি ডাকে, "হানাসান! কোথা হানাসান!
        খেলা যে আমার প'ড়ে আছে।'
        নীল মেঘ বলে এসে,
"মানুষ কী খেলা জানে?
    খেলা দিয়ে শুধু বাঁধে যাকে নিয়ে খেলে।'
মণি বলে, "তোমাদের খেলা কিরকম।'
        কালো মেঘ ভেসে এল
           হেসে চিকিমিকি,
               ডেকে গুরু গুরু
    বলে, "ওই চেয়ে দেখো, হানাসান হল নানাখানা--
           ওর ছুটি নানা রঙে
               নানা চেহারায়,
                   নানা দিকে
                       বাতাসে বাতাসে
                          আলোতে আলোতে।'
মণি বলে, "ব্যাঙ্গমা দাদা,
    এ দিকে বিয়ে যে ঠিক--
        বর এসে কী বলবে শেষে।'
ব্যাঙ্গমা হেসে বলে,
    "আছে চামচিকে ভায়া,
        বরকেও নিয়ে দেবে পাড়ি।
           বিয়ের খেলাটা সেও
        মিলে যাবে সূর্যাস্তের শূন্যে এসে
           গোধূলির মেঘে।'
        মণি কেঁদে বলে, "তবে,
           শুধু কি রইবে বাকি কান্নার খেলা।'
        ব্যাঙ্গমা বলে, "মণিদিদি,
           রাত হয়ে যাবে শেষ,
    কাল সকালের ফোটা বৃষ্টি-ধোওয়া মালতীর ফুলে
           সে খেলাও চিনবে না কেউ।'
আরো দেখুন