ভালোমানুষ
Stories
ছিঃ, আমি নেহাত ভালোমানুষ।
কুসমি বললে, কী যে তুমি বল তার ঠিক নেই। তুমি যে ভালোমানুষ সেও কি বলতে হবে। কে না জানে, তুমি ও পাড়ার লোটনগুণ্ডার দলের সর্দার নও। ভালোমানুষ তুমি বল কাকে।
আরো দেখুন
সন্ধ্যা ও প্রভাত
Stories
এখানে নামল সন্ধ্যা। সূর্যদেব, কোন্‌ দেশে, কোন্‌ সমুদ্রপারে, তোমার প্রভাত হল।
অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠছে রজনীগন্ধা, বাসরঘরের দ্বারের কাছে অবগুণ্ঠিতা নববধূর মতো; কোন্‌খানে ফুটল ভোরবেলাকার কনকচাঁপা।
আরো দেখুন
চিত্রকর
Stories
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায়। বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল। কিন্তু, সব-চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে। সে ঠিক করেছিল, 'পয়সা' করবই, সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে।' সর্বদাই তার ভাষায় ধনকে সে উল্লেখ করত 'পয়সা' বলে। অর্থাৎ, তার মনে খুব একটা দর্শন স্পর্শন ঘ্রাণের যোগ্য প্রত্যক্ষ পদার্থ ছিল; তার মধ্যে বড়ো নামের মোহ ছিল না; অত্যন্ত সাধারণ পয়সা, হাটে হাটে হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে যাওয়া, মলিন হয়ে যাওয়া পয়সা, তাম্রগন্ধী পয়সা, কুবেরের আদিম স্বরূপ, যা রুপোয় সোনায় কাগজে দলিলে নানা মূর্তি পরিগ্রহ করে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
নানা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে নানা পঙ্কে আবিল হতে হতে আজ গোবিন্দ তার পয়সাপ্রবাহিণীর প্রশস্তধারার পাকা বাঁধানো ঘাটে এসে পৌঁচেছে। গানিব্যাগ্‌ওয়ালা বড়োসাহেব ম্যাক্‌ডুগালের বড়োবাবুর আসনে তার ধ্রুব প্রতিষ্ঠা। সবাই তাকে নাম দিয়েছিল ম্যাক্‌দুলাল।
আরো দেখুন
ললাটের লিখন
Stories
ছেলেবেলায় পৃথ্বীশের ডান দিকের কপালে চোট লেগেছিল ভুরুর মাঝখান থেকে উপর পর্যন্ত। সেই আঘাতে ডান চোখটাও সংকুচিত। পৃথ্বীশকে ভালো দেখতে কি না সেই প্রশ্নের উত্তরটা কাটা দাগের অবিচারে সম্পূর্ণ হতে পারল না। অদৃষ্টের এই লাঞ্ছনাকে এত দিন থেকে প্রকাশ্যে পৃথ্বীশ বহন করে আসছে তবুও দাগও যেমন মেলায় নি তেমনি ঘোচে নি তার সংকোচ। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় হবার উপলক্ষে প্রত্যেকবার ধিক্‌কারটা জেগে ওঠে মনে। কিন্তু বিধাতাকে গাল দেবার অধিকার তার নেই। তার রচনার ঐশ্বর্যকে বন্ধুরা স্বীকার করছে প্রচুর প্রশংসায়, শত্রুরা নিন্দাবাক্যের নিরন্তর কটুক্তিতে। লেখার চারি দিকে ভিড় জমছে। দু টাকা আড়াই টাকা দামের বইগুলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। সম্পাদকরা তার কলমের প্রসাদ ছুটোছাঁটা যা-ই পায় কিছুই ছাড়ে না। পাঠিকারা বলে, পৃথ্বীশবাবু মেয়েদের মন ও চরিত্র যেমন আশ্চর্য বোঝেন ও বর্ণনা করেন এমন সাধ্য নেই আর কোনো লেখকের। পুরুষ-বন্ধুরা বলে, ওর লেখায় মেয়েদের এত-যে স্তুতিবাদ সে কেবল হতভাগার ভাঙা কপালের দোষে। মুখশ্রী যদি অক্ষুণ্ন হত তা হলে মেয়েদের সম্বন্ধে সত্য কথা বাধত না মুখে। মুখের চেহারা বিপক্ষতা করায় মুখের অত্যুক্তিকে সহায় করেছে মনোহরণের অধ্যবসায়।
শ্রীমতী বাঁশরি সরকার ব্যারিস্টারি চক্রের মেয়ে-- বাপ ব্যারিস্টার, ভাইরা ব্যারিস্টার। দু বার গেছে য়ুরোপে ছুটি উপলক্ষে। সাজে সজ্জায় ভাষায় ভঙ্গিতে আছে আধুনিক যুগের সুনিপুণ উদ্দামতা। রূপসী বলতে যা বোঝায় তা নয়, কিন্তু আকৃতিটা যেন ফ্রেঞ্চ পালিশ দিয়ে ঝকঝকে করা।
আরো দেখুন
কঙ্কাল
Stories
আমরা তিন বাল্যসঙ্গী যে ঘরে শয়ন করিতাম তাহার পাশের ঘরের দেয়ালে একটি আস্ত নরকঙ্কাল ঝুলানো থাকিত। রাত্রে বাতাসে তাহার হাড়গুলা খট্‌খট্‌ শব্দ করিয়া নড়িত। দিনের বেলায় আমাদিগকে সেই হাড় নাড়িতে হইত। আমরা তখন পণ্ডিত-মহাশয়ের নিকট মেঘনাদবধ এবং ক্যাম্বেল স্কুলের এক ছাত্রের কাছে অস্থিবিদ্যা পড়িতাম। আমাদের অভিভাবকের ইচ্ছা ছিল আমাদিগকে সহসা সর্ববিদ্যায় পারদর্শী করিয়া তুলিবেন। তাঁহার অভিপ্রায় কতদূর সফল হইয়াছে যাঁহারা আমাদিগকে জানেন তাঁহাদের নিকট প্রকাশ করা বাহুল্য এবং যাঁহারা জানেন না তাঁহাদের নিকট গোপন করাই শ্রেয়।
তাহার পর বহুকাল অতীত হইয়াছে। ইতিমধ্যে সেই ঘর হইতে কঙ্কাল এবং আমাদের মাথা হইতে অস্থিবিদ্যা কোথায় স্থানান্তরিত হইয়াছে অন্বেষণ করিয়া জানা যায় না।
আরো দেখুন
ব্যবধান
Stories
সম্পর্ক মিলাইয়া দেখিতে গেলে বনমালী এবং হিমাংশুমালী উভয়ে মামাতো পিসতুতো ভাই; সেও অনেক হিসাব করিয়া দেখিলে তবে মেলে। কিন্তু ইহাদের দুই পরিবার বহুকাল হইতে প্রতিবেশী, মাঝে কেবল একটা বাগানের ব্যবধান, এইজন্য ইহাদের সম্পর্ক নিতান্ত নিকট না হইলেও ঘনিষ্ঠতার অভাব নাই।
বনমালী হিমাংশুর চেয়ে অনেক বড়ো। হিমাংশুর যখন দন্ত এবং বাক্যস্ফূর্তি হয় নাই, তখন বনমালী তাহাকে কোলে করিয়া এই বাগানে সকালে সন্ধ্যায় হাওয়া খাওয়াইয়াছে, খেলা করিয়াছে, কান্না থামাইয়াছে, ঘুম পাড়াইয়াছে এবং শিশুর মনোরঞ্জন করিবার জন্য পরিণতবুদ্ধি বয়স্ক লোকদিগকে সবেগে শিরশ্চালন, তারস্বরে প্রলাপভাষণ প্রভৃতি যে-সকল বয়সানুচিত চাপল্য এবং উৎকট উদ্যম প্রকাশ করিতে হয়, বনমালী তাহাও করিতে ত্রুটি করে নাই।
আরো দেখুন
প্রস্তরমূর্তি
Verses
হে নির্বাক্‌ অচঞ্চল পাষাণসুন্দরী,
দাঁড়ায়ে রয়েছ তুমি কত বর্ষ ধরি
অনম্বরা অনাসক্তা চির-একাকিনী
আপন সৌন্দর্যধ্যানে দিবসযামিনী
তপস্যামগনা। সংসারের কোলাহল
তোমারে আঘাত করে নিয়ত নিষ্ফল--
জন্মমৃত্যু দুঃখসুখ অস্ত-অভ্যুদয়
তরঙ্গিত চারি দিকে চরাচরময়,
তুমি উদাসিনী। মহাকাল পদতলে
মুগ্ধনেত্রে ঊর্ধ্বমুখে রাত্রিদিন বলে
"কথা কও, কথা কও, কথা কও প্রিয়ে!
কথা কও, মৌন বধূ, রয়েছি চাহিয়ে।'
তুমি চির  বাক্যহীনা, তব মহাবাণী
পাষাণে আবদ্ধ ওগো সুন্দরী পাষাণী।
আরো দেখুন
রাজরানী
Stories
কাল তোমার ভালো লাগে নি চণ্ডীকে নিয়ে বকুনি। ও একটা ছবি মাত্র। কড়া কড়া লাইনে আঁকা, ওতে রস নাই। আজ তোমাকে কিছু বলব, সে সত্যিকার গল্প।
কুসমি অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই বলো। তুমি তো সেদিন বললে, বরাবর মানুষ সত্যি খবর দিয়ে এসেছে গল্পের মধ্যে মুড়ে। একেবারে ময়রার দোকান বানিয়ে রেখেছে। সন্দেশের মধ্যে ছানাকে চেনাই যায় না।
আরো দেখুন
দুঃখী
Verses
দুঃখী তুমি একা,
                   যেতে যেতে কটাক্ষেতে পেলে দেখা--
          হোথা দুটি নরনারী নববসন্তের কুঞ্জবনে
                         দক্ষিণ পবনে।
                   বুঝি মনে হল, যেন চারি ধার
                  সঙ্গীহীন তোমারেই দিতেছে ধিক্কার।
          মনে হল, রোমাঞ্চিত অরণ্যের কিশলয়
                   এ তোমার নয়।
               ঘনপুঞ্জ অশোকমঞ্জরী
             বাতাসের অন্দোলনে ঝরি ঝরি
                   প্রহরে প্রহরে
                          যে নৃত্যের তরে
          বিছাইছে আস্তরণ বনবীথিময়,
                   সে তোমার নয়।
          ফাল্গুনের এই ছন্দ, এই গান,
                   এই মাধুর্যের দান,
                             যুগে যুগান্তরে
                শুধু মধুরের তরে
          কমলার আশীর্বাদ করিছ সঞ্চয়,
                   সে তোমার নয়।
          অপর্যাপ্ত ঐশ্বর্যের মাঝখান দিয়া
                   অকিঞ্চনহিয়া
                  চলিয়াছ দিনরাতি,
                   নাই সাথি,
                পাথেয় সম্বল নাই প্রাণে,
                   শুধু কানে
                চারি দিক হতে সবে কয়--
                   "এ তোমার নয়'।
                   তবু মনে রেখো, হে পথিক,
                দুর্ভাগ্য তোমার চেয়ে অনেক অধিক
                             আছে ভবে।
                   দুই জনে পাশাপাশি যবে
          রহে একা তার চেয়ে একা কিছু নাই এ ভুবনে।
                      দুজনার অসংলগ্ন মনে
                   ছিদ্রময় যৌবনের তরী
               অশ্রুর তরঙ্গে ওঠে ভরি--
          বসন্তের রসরাশি সেও হয় দারুণ দুর্বহ,
                   যুগলের নিঃসঙ্গতা নিষ্ঠুর বিরহ।
          তুমি একা, রিক্ত তব চিত্তাকাশে কোনো বিঘ্ন নাই;
                             সেথা পায় ঠাঁই
                   পান্থ মেঘদল--
               লয়ে রবিরশ্মি লয়ে অশ্রুজল
                   ক্ষণিকের স্বপ্নস্বর্গ করিয়া রচনা
          অস্তসমুদ্রের পারে ভেসে তারা যায় অন্যমনা।
               চেয়ে দেখো, দোঁহে যারা হোথা আছে
                             কাছে-কাছে
                   তবু যাহাদের মাঝে
                             অন্তহীন বিচ্ছেদ বিরাজে--
কুসুমিত এ বসন্ত, এ আকাশ, এই বন,
                   খাঁচার মতন
          রুদ্ধদ্বার, নাহি কহে কথা--
তারাও ওদের কাছে হারালো অপূর্ব অসীমতা।
          দুজনের জীবনের মিলিত অঞ্জলি,
তাহারি শিথিল ফাঁকে দুজনের বিশ্ব পড়ে গলি।
আরো দেখুন