মেঘমালা
Verses
আসে অবগুণ্ঠিতা প্রভাতের অরুণ দুকূলে
                   শৈলতটমূলে,
               আত্মদান অর্ঘ্য আনে পায়।
                   তপস্বীর ধ্যানে ভেঙে যায়,
               গিরিরাজ কঠোরতা যায় ভুলি,
          চরণের প্রান্ত হতে বক্ষে লয় তুলি
                   সজল তরুণ মেঘমালা।
          কল্যাণে ভরিয়া উঠে মিলনের পালা।
                   অচলে চঞ্চলে লীলা,
                   সুকঠিন শিলা
                   মত্ত হয় রসে।
          উদার দাক্ষিণ্য তার বিগলিত নির্ঝরে বরষে,
                   গায় কলোচ্ছল গান।
               সে দাক্ষিণ্য গোপনের দান
                   এ মেঘমালারই।
                             এ বর্ষণ তারই
                   পর্বতের বাণী হয়ে উঠে জেগে--
                             নৃত্যবন্যাবেগে
                                      বাধাবিঘ্ন চূর্ণ ক'রে
                   তরঙ্গের নৃত্যসাথে যুক্ত হয় অনন্ত সাগরে।
                                      নির্মমের তপস্যা টুটিয়া
                                           চলিল ছুটিয়া
                                      দেশে দেশে প্রাণের প্রবাহ,
                                           জয়ের উৎসাহ--
                                      শ্যামলের মঙ্গল-উৎসবে
                   আকাশে বাজিল বীণা অনাহত রবে।
                                      লঘুসুকুমার স্পর্শ ধীরে ধীরে
                   রুদ্রসন্ন্যাসীর স্তব্ধ নিরুদ্ধ শক্তিরে
                                      দিল ছাড়া; সৌন্দর্যের বীর্যবলে
                   স্বর্গেরে করিয়া জয় মুক্ত করি দিল ধরাতলে।
আরো দেখুন
47
Verses
আঘাতসংঘাত-মাঝে দাঁড়াইনু আসি।
অঙ্গদ কুণ্ডল কণ্ঠী অলংকাররাশি
খুলিয়া ফেলেছি দূরে। দাও হস্তে তুলি
নিজহাতে তোমার অমোঘ শরগুলি,
তোমার অক্ষয় তূণ। অস্ত্রে দীক্ষা দেহো
রণগুরু। তোমার প্রবল পিতৃস্নেহ
ধ্বনিয়া উঠুক আজি কঠিন আদেশে।
করো মোরে সম্মানিত নববীরবেশে,
দুরূহ কর্তব্যভারে, দুঃসহ কঠোর
বেদনায়; পরাইয়া দাও অঙ্গে মোর
ক্ষতচিহ্ন-অলংকার। ধন্য করো দাসে
সফল চেষ্টায় আর নিষ্ফল প্রয়াসে।
ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন
কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।
আরো দেখুন
পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে
Verses
পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে,
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া।
যাত্রাপথের আনন্দগান যে গাহে
তারি কণ্ঠে তোমারি গান গাওয়া।
চায় না সে জন পিছন-পানে ফিরে,
বায় না তরী কেবল তীরে তীরে,
তুফান তারে ডাকে অকূল নীরে
যার পরানে লাগল তোমার হাওয়া।
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া।
পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে,
পথিক-চিত্তে তোমার তরী বাওয়া।
দুয়ার খুলে সমুখ-পানে যে চাহে
তার চাওয়া যে তোমার পানে চাওয়া।
বিপদ বাধা কিছুই ডরে না সে,
রয় না পড়ে কোনো লাভের আশে,
যাবার লাগি মন তারি উদাসে--
যাওয়া সে যে তোমার পানে যাওয়া।
পথে চলাই সেই তো তোমায় পাওয়া।
আরো দেখুন
মেঘ
Verses
আদি অন্ত হারিয়ে ফেলে
সাদা কালো আসন মেলে
     পড়ে আছে আকাশটা খোশ-খেয়ালি,
আমরা যে সব রাশি রাশি
মেঘের পুঞ্জ ভেসে আসি,
     আমার তারি খেয়াল, তারি হেঁয়ালি।
মোদের কিছু ঠিক-ঠিকানা নাই,
আমরা আসি, আমরা চলে যাই।
ওই-যে সকল জ্যোতির মালা
গ্রহতারা রবির ডালা
     জুড়ে আছে নিত্যকালের পসরা,
ওদের হিসেব পাকা খাতায়
আলোর লেখা কালো পাতায়,
     মোদের তরে আছে মাত্র খসড়া--
রঙ-বেরঙের কলম দিয়ে এঁকে
যেমন খুশি মোছে আবার লেখে।
আমরা কভু বিনা কাজে
ডাক দিয়ে যাই মাঝে মাঝে,
     অকারণে মুচকে হাসি হামেশা।
তাই বলে সব মিথ্যে নাকি।
বৃষ্টি সে তো নয়কো ফাঁকি,
     বজ্রটা তো নিতান্ত নয় তামাশা।
শুধু আমরা থাকি নে কেউ ভাই,
হাওয়ায় আসি হাওয়ায় ভেসে যাই।
আরো দেখুন
স্বর্ণমৃগ
Stories
আদ্যানাথ এবং বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী দুই শরিক। উভয়ের মধ্যে বৈদ্যনাথের অবস্থাই কিছু খারাপ। বৈদ্যনাথের বাপ মহেশচন্দ্রের বিষয়বুদ্ধি আদৌ ছিল না, তিনি দাদা শিবনাথের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিয়া থাকিতেন। শিবনাথ ভাইকে প্রচুর স্নেহবাক্য দিয়া তৎপরিবর্তে তাঁহার বিষয়সম্পত্তি সমস্ত আত্মসাৎ করিয়া লন। কেবল খানকতক কোম্পানির কাগজ অবশিষ্ট থাকে। জীবনসমুদ্রে সেই কাগজ-কখানি বৈদ্যনাথের একমাত্র অবলম্বন।
শিবনাথ বহু অনুসন্ধানে তাঁহার পুত্র আদ্যানাথের সহিত এক ধনীর একমাত্র কন্যার বিবাহ দিয়া বিষয়বৃদ্ধির আর-একটি সুযোগ করিয়া রাখিয়াছিলেন। মহেশচন্দ্র একটি সপ্তকন্যাভারগ্রস্ত দরিদ্র ব্রাহ্মণের প্রতি দয়া করিয়া এক পয়সা পণ না লইয়া তাহার জ্যেষ্ঠা কন্যাটির সহিত পুত্রের বিবাহ দেন। সাতটি কন্যাকেই যে ঘরে লন নাই তাহার কারণ, তাঁহার একটিমাত্র পুত্র এবং ব্রাহ্মণও সেরূপ অনুরোধ করে নাই। তবে, তাহাদের বিবাহের উদ্দেশে সাধ্যাতিরিক্ত অর্থসাহায্য করিয়াছিলেন।
আরো দেখুন
সত্য - ১
Verses
ভয়ে ভয়ে ভ্রমিতেছি মানবের মাঝে
হৃদয়ের আলোটুকু নিবে গেছে ব'লে!
কে কী বলে তাই শুনে মরিতেছি লাজে,
কী হয় কী হয় ভেবে ভয়ে প্রাণ দোলে!
"আলো' "আলো' খুঁজে মরি পরের নয়নে,
"আলো' "আলো' খুঁজে খুঁজে কাঁদি পথে পথে,
অবশেষে শুয়ে পড়ি ধূলির শয়নে--
ভয় হয় এক পদ অগ্রসর হতে!
বজ্রের আলোক দিয়ে ভাঙো অন্ধকার,
হৃদি যদি ভেঙে যায় সেও তবু ভালো।
যে গৃহে জানালা নাই সে তো কারাগার--
ভেঙে ফেলো, আসিবেক স্বরগের আলো।
হায় হায় কোথা সেই অখিলের জ্যোতি!
চলিব সরল পথে অশঙ্কিত গতি!
                                      
আরো দেখুন
গুপ্তধন
Stories
অমাবস্যার নিশীথ রাত্রি। মৃত্যুঞ্জয় তান্ত্রিক মতে তাহাদের বহুকালের গৃহদেবতা জয়কালীর  পূজায় বসিয়াছে। পূজা সমাধা করিয়া যখন  উঠিল তখন  নিকটস্থ  আমবাগান হইতে প্রত্যুষের প্রথম কাক ডাকিল।
মৃত্যুঞ্জয়  পশ্চাতে ফিরিয়া  চাহিয়া দেখিলেন মন্দিরের দ্বার রূদ্ধ রহিয়াছে।  তখন সে একবার দেবীর চরণতলে মস্তক  ঠেকাইয়া তাঁহার  আসন সরাইয়া দিল।  সেই আসনের নীচে হইতে  একটি  কাঁঠালকাঠের বাক্স  বাহির হইল।  পৈতায়  চাবি  বাঁধা  ছিল।  সেই চাবি লাগাইয়া  মৃত্যুঞ্জয়  বাক্সটি খুলিল।   খুলিবামাত্রই  চমকিয়া  উঠিয়া  মাথায়ে  করাঘাত করিল।
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
বিজ্ঞানী
Stories
দাদামশায়, নীলমণিবাবুকে তোমার এত কেন ভালো লাগে আমি তো বুঝতে পারি নে।
এই প্রশ্নটা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত প্রশ্ন, এর ঠিক উত্তর ক'জন লোকে দিতে পারে।
আরো দেখুন