আজি বসন্ত জাগ্রত
Songs
আজি   বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।        
তব     অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে      
কোরো না বিড়ম্বিত তারে॥
আজি   খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,  
আজি   ভুলিয়ো আপন-পর ভুলিয়ো,
এই      সংগীতমুখরিত গগনে          
তব     গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো।        
এই      বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে    
দিয়ো   ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।  
অতি    নিবিড় বেদনা বনমাঝে রে  
আজি   পল্লবে পল্লবে বাজে রে।      
দূরে     গগনে কাহার পথ চাহিয়া  
আজি   ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজে রে।  
মোর    পরানে দখিনবায়ু লাগিছে--  
কারে   দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে।
এই      সৌরভবিহ্বলা রজনী        
কার     চরণে ধরণীতলে জাগিছে।  
ওগো    সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,        
তব     গম্ভীর আহ্বান কারে॥      
আরো দেখুন
রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা
Stories
যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝালচচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল, তখন স্তূপাকৃতি চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, "দুটো পান্তাভাত-যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।"
এ দিকে ডাক্তার যখন জবাব দিয়া গেল তখন গুরুচরণের ভাই রামকানাই রোগীর পার্শ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, "দাদা, যদি তোমার উইল করিবার ইচ্ছা থাকে তো বলো!" গুরুচরণ ক্ষীণস্বরে বলিলেন, "আমি বলি, তুমি লিখিয়া লও।" রামকানাই কাগজকলম লইয়া প্রস্তুত হইলেন। গুরুচরণ বলিয়া গেলেন, "আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি আমার ধর্মপত্নী শ্রীমতী বরদাসুন্দরীকে দান করিলাম।" রামকানাই লিখিলেন- কিন্তু লিখিতে তাঁহার কলম সরিতেছিল না। তাঁহার বড়ো আশা ছিল, তাঁহার একমাত্র পুত্র নবদ্বীপ অপুত্রক জ্যাঠামহাশয়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হইবে। যদিও দুই ভাইয়ে পৃথগন্ন ছিলেন, তথাপি এই আশায় নবদ্বীপের মা নবদ্বীপকে কিছুতেই চাকরি করিতে দেন নাই-- এবং সকাল-সকাল বিবাহ দিয়াছিলেন, এবং শত্রুর মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করিয়া বিবাহ নিষ্ফল হয় নাই। কিন্তু তথাপি রামকানাই লিখিলেন এবং সই করিবার জন্য কলমটা দাদার হাতে দিলেন। গুরুচরণ নির্জীব হস্তে যাহা সই করিলেন, তাহা কতকগুলা কম্পিত বক্ররেখা কি তাঁহার নাম, বুঝা দুঃসাধ্য।
আরো দেখুন
আমার নাইবা হল
Songs
                   আমার   নাইবা হল পারে যাওয়া।
যে হাওয়াতে চলত তরী   অঙ্গেতে সেই লাগাই হাওয়া ॥
          নেই যদি বা জমল পাড়ি   ঘাট আছে তো বসতে পারি।
আমার   আশার তরী ডুবল যদি   দেখব তোদের তরী-বাওয়া ॥
হাতের কাছে কোলের কাছে   যা আছে সেই অনেক আছে।
আমার   সারা দিনের এই কি রে কাজ-- ওপার-পানে কেঁদে চাওয়া।
          কম কিছু মোর থাকে হেথা   পুরিয়ে নেব প্রাণ দিয়ে তা।
আমার   সেইখানেতেই কল্পলতা   যেখানে মোর দাবি-দাওয়া ॥
আরো দেখুন
106
Verses
BEHIND AN infinite secrecy of the dark
from which the world of prying lights was shut out
there walked in the Destroyer,
and underneath the pall of an ominous hush
rehearsed reparation in the deep of my being.
At last the stage was made vacant
for the new act of life's play,
when a fiery finger from the sky touched a fringe of the darkness
and a lightning thrill
pierced the immensity of sleep
breaking it to pieces.
A stream of awakening began to course through the veins of a
blind inertness
as the first flood of the rainy June pursues its branching path
amidst the emptiness of a dry river-bed.
Big boulders of shadows barricaded the passage of light
and created confusion
till they were swept away,
and the spirit of new life unbared herself
in a luminous horizon of peace.
This body of mine
the carrier of the burden of a past
seemed to me like an exhausted cloud
slipping off from the listless arm of the morning.
I felt freed from its clasp
in the heart of an incorporeal light
at the furthest shore
of evanescent things.
আরো দেখুন
করুণা
Stories
গ্রামের মধ্যে অনুপকুমারের ন্যায় ধনবান আর কেহই ছিল না। অতিথিশালানির্মাণ, দেবালয়প্রতিষ্ঠা, পুষ্করিণীখনন প্রভৃতি নানা সৎকর্মে তিনি ধনব্যয় করিতেন। তাঁহার সিন্ধুক-পূর্ণ টাকা ছিল, দেশবিখ্যাত যশ ছিল ও রূপবতী কন্যা ছিল। সমস্ত যৌবনকাল ধন উপার্জন করিয়া অনুপ বৃদ্ধ বয়সে বিশ্রাম করিতেছিলেন। এখন কেবল তাঁহার একমাত্র ভাবনা ছিল যে, কন্যার বিবাহ দিবেন কোথায়। সৎপাত্র পান নাই ও বৃদ্ধ বয়সে একমাত্র আশ্রয়স্থল কন্যাকে পরগৃহে পাঠাইতে ইচ্ছা নাই--তজ্জন্যও আজ কাল করিয়া আর তাঁহার দুহিতার বিবাহ হইতেছে না।
সঙ্গিনী-অভাবে করুণার কিছুমাত্র কষ্ট হইত না। সে এমন কাল্পনিক ছিল, কল্পনার স্বপ্নে সে সমস্ত দিন-রাত্রি এমন সুখে কাটাইয়া দিত যে, মুহূর্তমাত্রও তাহাকে কষ্ট অনুভব করিতে হয় নাই। তাহার একটি পাখি ছিল, সেই পাখিটি হাতে করিয়া অন্তঃপুরের পুষ্করিণীর পাড়ে কল্পনার রাজ্য নির্মাণ করিত। কাঠবিড়ালির পশ্চাতে পশ্চাতে ছুটাছুটি করিয়া, জলে ফুল ভাসাইয়া, মাটির শিব গড়িয়া, সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটাইয়া দিত। এক-একটি গাছকে আপনার সঙ্গিনী ভগ্নী কন্যা বা পুত্র কল্পনা করিয়া তাহাদের সত্য-সত্যই সেইরূপ যত্ন করিত, তাহাদিগকে খাবার আনিয়া দিত, মালা পরাইয়া দিত, নানাপ্রকার আদর করিত এবং তাদের পাতা শুকাইলে, ফুল ঝরিয়া পড়িলে, অতিশয় ব্যথিত হইত। সন্ধ্যাবেলা পিতার নিকট যা-কিছু গল্প শুনিত, বাগানে পাখিটিকে তাহাই শুনানো হইত। এইরূপে করুণা তাহার জীবনের প্রত্যুষকাল অতিশয় সুখে আরম্ভ করিয়াছিল। তাহার পিতা ও প্রতিবাসীরা মনে করিতেন যে, চিরকালই বুঝি ইহার এইরূপে কাটিয়া যাইবে।
আরো দেখুন
দুই বোন
Novels
মেয়েরা দুই জাতের, কোনো কোনো পণ্ডিতের কাছে এমন কথা শুনেছি।
এক জাত প্রধানত মা, আর-এক জাত প্রিয়া।
আরো দেখুন
ইচ্ছাপূরণ
Stories
সুবলচন্দ্রের ছেলেটির নাম সুশীলচন্দ্র। কিন্তু সকল সময়ে নামের মতো মানুষটি হয় না। সেইজন্যই সুবলচন্দ্র কিছু দুর্বল ছিলেন এবং সুশীলচন্দ্র বড়ো শান্ত ছিলেন না।
ছেলেটি পাড়াসুদ্ধ লোককে অস্থির করিয়া বেড়াইত, সেইজন্য বাপ মাঝে মাঝে শাসন করিতে ছুটিতেন; কিন্তু বাপের পায়ে ছিল বাত, আর ছেলেটি হরিণের মতো দৌড়িতে পারিত; কাজেই কিল চড়-চাপড় সকল সময় ঠিক জায়গায় গিয়া পড়িত না। কিন্তু সুশীলচন্দ্র দৈবাৎ যেদিন ধরা পড়িতেন সেদিন তাঁহার আর রক্ষা থাকিত না।
আরো দেখুন
শেষের কবিতা
Novels
অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী "রয়" ও "রে" রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন্তু সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামান্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-- অমিট রায়ে।
অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্‌বিজয়ী ব্যারিস্টার। যে পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তির সাংঘাতিক সংঘাতেও অমিত বিনা বিপত্তিতে এ যাত্রা টিঁকে গেল।
                         আনিলাম
               অপরিচিতের নাম
                                   ধরণীতে,
               পরিচিত জনতার সরণীতে।
                                   আমি আগন্তুক,
               আমি জনগণেশের প্রচণ্ড কৌতুক।
                                   খোলো দ্বার,
               বার্তা আনিয়াছি বিধাতার।
                         মহাকালেশ্বর
               পাঠায়েছে দুর্লক্ষ্য অক্ষর,
                         বল্‌ দুঃসাহসী কে কে
                         মৃত্যু পণ রেখে
               দিবি তার দুরূহ উত্তর।
               শুনিবে না।
                         মূঢ়তার সেনা
                                   করে পথরোধ।
                             ব্যর্থ ক্রোধ
                         হুংকারিয়া পড়ে বুকে,
                                   তরঙ্গের নিষ্ফলতা
                                            নিত্য যথা
                                   মরে মাথা ঠুকে
                                   শৈলতট-'পরে
                                            আত্মঘাতী দম্ভভরে।
                         পুষ্পমাল্য নাহি মোর, রিক্ত বক্ষতল,
                                   নাহি বর্ম অঙ্গদ কুণ্ডল।
                         শূন্য এ ললাটপট্টে লিখা।
                                   গূঢ় জয়টিকা।
                         ছিন্ন কন্থা দরিদ্রের বেশ।
                                   করিব নিঃশেষ
                                            তোমার ভাণ্ডার।
                                   খোলো খোলো দ্বার।
                                                অকস্মাৎ
                                   বাড়ায়েছি হাত,
                                            যা দিবার দাও অচিরাৎ।
                                  বক্ষ তব কেঁপে উঠে, কম্পিত অর্গল,
                                            পৃথ্বী টলমল।
                         ভয়ে আর্ত উঠিছে চীৎকারি
                                   দিগন্ত বিদারি,
                                            "ফিরে যা এখনি,
                                   রে দুর্দান্ত দুরন্ত ভিখারি,
                                            তোর কণ্ঠধ্বনি
                                   ঘুরি ঘুরি
                         নিশীথনিদ্রার বক্ষে হানে তীব্র ছুরি।"
                                   অস্ত্র আনো।
                         ঝঞ্ঝনিয়া আমার পঞ্জরে হানো।
                                   মৃত্যুরে মারুক মৃত্যু, অক্ষয় এ প্রাণ
                                            করি যাব দান।
                                          শৃঙ্খল জড়াও তবে,
                                   বাঁধো মোরে, খণ্ড খণ্ড হবে,
                                          মুহূর্তে চকিতে,
                                   মুক্তি তব আমারি মুক্তিতে।
                                            শাস্ত্র আনো।
                                        হানো মোরে, হানো।
                                            পণ্ডিতে পণ্ডিতে
                         ঊর্ধ্বস্বরে চাহিব খণ্ডিতে
                                            দিব্য বাণী।
                                            জানি জানি
                                            তর্কবাণ
                                   হয়ে যাবে খান খান।
                         মুক্ত হবে জীর্ণ বাক্যে আচ্ছন্ন দু চোখ--
                                   হেরিবে আলোক।
                                            অগ্নি জ্বালো।
                         আজিকার যাহা ভালো
                                   কল্য যদি হয় তাহা কালো,
                                    যদি তাহা ভস্ম হয়
                                           বিশ্বময়,
                                   ভস্ম হোক।
                                 দূর করো শোক।
                               মোর অগ্নিপরীক্ষায়
                         ধন্য হোক বিশ্বলোক অপূর্ব দীক্ষায়।
                                   আমার দুর্বোধ বাণী
                                 বিরুদ্ধ বুদ্ধির 'পরে মুষ্টি হানি
                                   করিবে তাহারে উচ্চকিত,
                                            আতঙ্কিত।
                                   উন্মাদ আমার ছন্দ
                                             দিবে ধন্দ
                                   শান্তিলুব্ধ মুমুক্ষুরে,
                                   ভিক্ষাজীর্ণ বুভুক্ষুরে।
                                      শিরে হস্ত হেনে
                                   একে একে নিবে মেনে
                                            ক্রোধে ক্ষোভে ভয়ে
                                                      লোকালয়ে
                                            অপরিচিতের জয়,
                                            অপরিচিতের পরিচয়--
                                                যে অপরিচিত
                                বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
                                              হানি বজ্রমুঠি
                                            মেঘের কার্পণ্য টুটি
                                            সংগোপন বর্ষণসঞ্চয়
                                   ছিন্ন ক'রে মুক্ত করে সর্বজগন্ময়॥
               পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
               আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
                         রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
                         পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
                                   ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
                                       দিগঙ্গনার নৃত্য;
                         হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
                                ঝলমল করে চিত্ত।
               নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
               বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
                         হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
                         নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
                         প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
                                   অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ
                   উদ্ধত যত শাখার শিখরে
                         রডোডেনড্রনগুচ্ছ।
               নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
               নাই রে ঘরের লালন ললিত যত্ন।
                         পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
                         বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
                                   ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
                                           কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
                             আমরা চকিত অভাবনীয়ের
                                   ক্কচিৎ-কিরণে দীপ্ত।
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্‌।
                         ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।"
               রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
                         যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?
                                   কোন্‌ অন্ধক্ষণে
                                বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
                           রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
                                   মুখ দেখিলাম তোর।
               চক্ষু'পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
                           আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।
                                   তোর সাথে চেনা
                                   সহজে হবে না--
                              কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।
                                   করে নেব জয়
                              সংশয়কুণ্ঠিত তোর বাণী--
                                   দৃপ্ত বলে লব টানি
                              শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
                                   নির্দয় আলোতে।
                              জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
                              মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
                                   ছিন্ন হবে ডোর--
                               তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।
                                   "হে অচেনা,
                             দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
                                   তীব্র আকস্মিক
                                বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
                         তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
                                  দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।"
                         হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,
                         আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা।"
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         "ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের
                                   স্বচ্ছ ধারা--
                         তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
                                   সূর্য তারা।
               "আজি মাঝে মাঝে আমার ছায়ারে
               দুলায়ে খেলায়ো তারি এক ধারে,
               সে ছায়ারি সাথে হাসিয়া মিলায়ো
                         কলধ্বনি--
               দিয়ো তারে বাণী যে বাণী তোমার
                         চিরন্তনী।
               "আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
                         মিলিত ছবি,
               তাই নিয়ে আজি পরানে আমার
                         মেতেছে কবি।
               পদে পদে তব আলোর ঝলকে
               ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
               মোর বাণীরূপ দেখিলাম আজি,
                         নির্ঝরিণী।
               তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
                         নিজেরে চিনি।"
                         পূর্ণপ্রাণে চাবার যাহা
                         রিক্ত হাতে চাস নে তারে;
                         সিক্ত চোখে যাস নে দ্বারে।
                         রত্নমালা আনবি যবে
                         মাল্যবদল তখন হবে,
                         পাতবি কি তোর দেবীর আসন
                         শূন্য ধুলায় পথের ধারে।
                         পুষ্প-উদার চৈত্রবনে
                         বক্ষে ধরিস নিত্যধনে
                         লক্ষ শিখায় জ্বলবে যখন
                         দীপ্ত প্রদীপ অন্ধকারে।
For we are bound where mariner has not yet dared to go,
And we will risk the ship, ourselves and all।
            আমরা যাব যেখানে কোনো
                যায় নি নেয়ে সাহস করি,
            ডুবি যদি তো ডুবি-না কেন--
                ডুবুক সবই, ডুবুক তরী।
                        O, what is this?
               Mysterious and uncapturable bliss
               That I have known, yet seems to be
               Simple as breath and easy as a smile,
                      And older than the earth।
                  একি রহস্য, একি আনন্দরাশি!
               জেনেছি তাহারে, পাই নি তবুও পেয়ে।
                    তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি,
                    তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি,
                         পুরানো সে যেন এই ধরণীর চেয়ে।
                    বিদ্যাপতি কহে, কৈসে গোঙায়বি
                        হরি বিনে দিন রাতিয়া।
                         চলি যবে গেলা যমপুরে
                         অকালে!
           "Blow gently over my garden
                     Wind of the southern sea
           In the hour my love cometh
                     And calleth me।
           চুমিয়া যেও তুমি
           আমার বনভূমি
                 দখিন-সাগরের সমীরণ,
           যে শুভখনে মম
           আসিবে প্রিয়তম,
                 ডাকিবে নাম ধরে অকারণ।"
         "মিতা, ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং,
                   ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্‌।"
               ছাদের উপরে বহিয়ো নীরবে
               ওগো দক্ষিণ-হাওয়া
               প্রেয়সীর সাথে যে নিমেষে হবে
               চারি চক্ষুতে চাওয়া।
                 "তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি
                 রজনীর শুভ্র অবসানে। কিছু আর নাই বাকি,
                 নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি,
                 নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্ব-হাসি,
                 নাই পিছু ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি
                 ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।"
                 সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া
                           এনেছ  অশ্রুজল।
                 এনেছ তোমার বক্ষে ধরিয়া
                          দুঃসহ হোমানল।
                 দুঃখ যে তার উজ্জ্বল হয়ে উঠে,
                 মুগ্ধ প্রাণের আবেশ-বন্ধ টুটে।
                 এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া
                            বিচ্ছেদশতদল।"
                 "সুন্দরী তুমি শুকতারা
                       সুদূর শৈলশিখরান্তে,
                 শর্বরী যবে হবে সারা
                       দর্শন দিয়ো দিক্‌ভ্রান্তে।
                     ধরা যেথা অম্বরে মেশে
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     আঁধারের বক্ষের 'পরে
                          আধেক আলোক-রেখা-রন্ধ্র।
                     আমার আসন রাখে পেতে
                          নিদ্রাগহন মহাশূন্য।
                     তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে
                          তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ণ।
                     মন্দচরণে চলি পারে,
                          যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ।
                     সুর থেমে আসে বারে বারে,
                          ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।
                     সুন্দরী ওগো শুকতারা,
                          রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ
                     স্বপ্নে যে বাণী হল হারা
                          জাগরণে করো তারে পূর্ণ।
                     নিশীথের তল হতে তুলি
                          লহো তারে প্রভাতের জন্য।
                     আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি,
                          আলোকে তাহারে করো ধন্য।
                     যেখানে সুপ্তি হল লীনা,
                          যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,
                     অর্পিনু সেথা মোর বীণা
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     "কত ধৈর্য ধরি
                 ছিলে কাছে দিবসশর্বরী।
                     তব পদ-অঙ্কনগুলিরে
                 কতবার দিয়ে গেছ মোর ভাগ্যপথের ধূলিরে।
                       আজ যবে
                 দূরে যেতে হবে
                     তোমারে করিয়া যাব দান
                       তব জয়গান।
                 কতবার ব্যর্থ আয়োজনে
                     এ জীবনে
                 হোমাগ্নি উঠে নি জ্বলি,
                     শূন্যে গেছে চলি
                 হতাশ্বাস ধূমের কুণ্ডলী।
                 কতবার ক্ষণিকের শিখা
                       আঁকিয়াছে ক্ষীণ টিকা
                     নিশ্চেতন নিশীথের ভালে।
                 লুপ্ত হয়ে গেছে তাহা চিহ্নহীন কালে।
                     এবার তোমার আগমন
                          হোমহুতাশন
                              জ্বেলেছে গৌরবে।
                          যজ্ঞ মোর ধন্য হবে।
                     আমার আহুতি দিনশেষে
                 করিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে।
                          লহো এ প্রণাম
                     জীবনের পূর্ণপরিণাম।
                              এ প্রণতি'পরে
                          স্পর্শ রাখো স্নেহভরে,
                     তোমার ঐশ্বর্য-মাঝে
                       সিংহাসন যেথায় বিরাজে
                          করিয়ো আহ্বান,
                       সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান।"
       তোমারে ছাড়িয়া যেতে হবে
          রাত্রি যবে
     উঠিবে উন্মনা হয়ে প্রভাতের রথচক্ররবে।
          হায় রে বাসরঘর,
    বিরাট বাহির সে যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ংকর।
        তবু সে যতই ভাঙে-চোরে,
     মালাবদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন করে,
         তুমি আছ ক্ষয়হীন
           অনুদিন;
          তোমার উৎসব
      বিচ্ছিন্ন না হয় কভু, না হয় নীরব।
      কে বলে তোমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল
         শূন্য করি তব শয্যাতল।
         যায় নাই, যায় নাই,
     নব নব যাত্রী-মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তারাই
          তোমার আহ্বানে
        উদার তোমার দ্বার-পানে।
           হে বাসরঘর,
       বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর।
              Tender is the night
And haply the queen moon is on her throne।
           তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।
           অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার অন্তিম আগমন।
               লভিয়াছি চিরস্পর্শমণি;
           আমার শূন্যতা তুমি পূর্ণ করি গিয়েছ আপনি।
           জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান
           সন্ধ্যার দেউলদীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান।
               বিচ্ছেদের হোমবহ্নি হতে
           পূজামূর্তি ধরি প্রেম দেখা দিল দুঃখের আলোতে।
                                                            মিতা।
      কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
             তারি রথ নিত্যই উধাও
         জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
      চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
                 ওগো বন্ধু,
             সেই ধাবমান কাল
      জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল--
             তুলে নিল দ্রুতরথে
      দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
         তোমা হতে বহু দূরে।
             মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
         পার হয়ে আসিলাম
      আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়--
         রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
             আমার পুরানো নাম।
         ফিরিবার পথ নাহি;
             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                 পারিবে না চিনিতে আমায়।
                         হে বন্ধু, বিদায়।
      কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
             বসন্তবাতাসে
      অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
             ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
      সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--কিছু মোর পিছে রহিল সে
             তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
                 হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
      হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
                 তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
      সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                 সে আমার প্রেম।
         তারে আমি রাখিয়া এলেম
      অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
         পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
             কালের যাত্রায়।
                 হে বন্ধু, বিদায়।
                  তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
   মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
           যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
             হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
                 পূজার সে খেলা
      ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
             তৃষার্ত আবেগ-বেগে
      ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
             তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
      যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
             তার সাথে দিব না মিশায়ে
      যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
             আজো তুমি নিজে
             হয়তো-বা করিবে রচন
      মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
      ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
             হে বন্ধু, বিদায়।
             মোর লাগি করিয়ো না শোক,
      আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
             মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
      শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
      উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
             সেই ধন্য করিবে আমাকে।
             শুক্লপক্ষ হতে আনি
             রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                      যে পারে সাজাতে
             অর্ঘ্যথালা  কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
             যে আমারে দেখিবারে পায়
                 অসীম ক্ষমায়
             ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
      এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                 তোমারে যা দিয়েছিনু তার
                 পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                 হেথা মোর তিলে তিলে দান,
      করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
             হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
                 ওগো তুমি নিরুপম,
                       হে ঐশ্বর্যবান,
             তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--
                 গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                       হে বন্ধু, বিদায়।
                                          বন্যা
আরো দেখুন