Home > Others > আলোচনা > ধর্ম্ম

ধর্ম্ম    


প্রেমের যোগ্যতা

 

একেবারেই প্রেমের যোগ্য নহে এমন জীব কোথায়! যত বড়ই পাপী অসাধু কুশ্রী সে হউক না কেন, তাহার মা ত তাহাকে ভালবাসে। অতএব দেখিতেছি, তাহাকেও ভালবাসা যায়, তবে আমি ভালবাসিতে না পারি সে আমার অসম্পূর্ণতা।  

 

পথ

 

যেমন, জড়ই বল আর প্রাণীই বল সকলেরই মধ্যে এক মহা চৈতন্যের নিয়ম কার্য্য করিতেছে, যাহাতে করিয়া উত্তরোত্তর প্রাণ অভিব্যক্ত হইয়া উঠিতেছে, তেমনি পাপীই বল আর সাধুই বল সকলেরই মধ্যে অসীম পুণ্যের এক আদর্শ বর্ত্তমান থাকিয়া কার্য্য করিতেছে। স্বর্গের পাথেয় সকলেরই কাছে রহিয়াছে, কেহই তাহা হইতে বঞ্চিত নহে। তবে কেহ বা সোজা রাজপথে চলিয়াছে, কেহ বা নির্ব্বুদ্ধিতাবশতঃই হউক, কৌতূহলবশতঃই হউক, একবার মোড় ফিরিয়া গলির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে, অবশেষে বহুক্ষণ ধরিয়া এ-গলি ও-গলি সে-গলি করিয়া পুনশ্চ সেই রাজপথে বাহির হইয়া পড়িতেছে, মাঝের হইতে পথ ও পথের কষ্ট বিস্তর বাড়িয়া যাইতেছে। কিন্তু জগতের সমুদয় পথই একই দিকে চলিয়াছে, তবে কোনটার বা ঘোর বেশী, কোনটার বা ঘোর কম এই যা তফাৎ।

 

পাপ পুণ্য

 

অতএব পাপ বলিয়া যে একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে তাহা নহে। পাপীর যে ধার্ম্মিকের চেয়ে বেশী কিছু আছে তাহা নহে, ধার্ম্মিকের যতটা আছে পাপীর ততটা নাই এই পর্য্যন্ত। পাপীর ধর্ম্মবুদ্ধি অচেতন অপরিণত। পাপ অভাব, পাপ মিথ্যা, পাপ মৃত্যু। অতএব আর সকলই থাকিবে, কেবল পাপ থাকিবে না -- যেমন অন্ধকার-ঈথর কম্পনপ্রভাবে উত্তরোত্তর আলোক হইয়া উঠে, তেমনি পাপ চৈতন্যের প্রভাবে উত্তরোত্তর পুণ্যে পরিণত হইতে থাকিবে।

 

চেতনা

 

যাহা ধ্রুব তাহাই ধর্ম্ম। এই ধ্রুবের আশ্রয়ে আছে বলিয়াই জগতের মৃত্যুভয় নাই। একটি ধ্রুবসূত্রে এই সমস্ত বিশ্বচরাচর মালার মতন গাঁথা রহিয়াছে। ক্ষুদ্রতম হইতে বৃহত্তম কিছুই সেই সূত্র হইতে বিচ্ছিন্ন নহে, অতএব সকলেই ধর্ম্মের বাঁধনে বাঁধা। তবে, সেই বন্ধন সম্বন্ধে কেহ বা সচেতন কেহ বা অচেতন। অচেতনের বন্ধনই দাসত্ব, আর সচেতনের বন্ধনই প্রেম।

 

অচৈতন্য

 

আমরা যতখানি অচেতন, ততখানি সচেতন নহি ইহা নিশ্চয়ই। আমাদের শরীরের মধ্যে কোথায় কোন্‌ যন্ত্র কিরূপে কাজ করিতেছে, তাহার কিছুই আমরা জানি না। একটুখানি যেখানে জানি, সেখানে অনেকখানিই জানি না। শরীরের সম্বন্ধে যাহা খাটে, মনের সম্বন্ধেও ঠিক তাহাই খাটে। আমাদের মনে যে কি আছে তাহা অতি যৎসামান্য পরিমাণে আমরা জানি মাত্র, যাহা জানি না তাহাই অগাধ। কিন্তু যাহা জানি না তাহাও যে আছে, ইহা অনেকেই বিশ্বাস করিতে চাহেন না। তাঁহারা বলেন, মনের কার্য্য জানা, মনে আছে অথচ জানিতেছি না, এ কথাটাই স্বতোবিরুদ্ধ কথা -- এমন স্থলে না-হয় বলাই গেল যে তাহা নাই।

 

বিজ্ঞান-গ্রন্থে নিম্নলিখিত ঘটনা অনেকেই পড়িয়া থাকিবেন। একজন মূর্খ দাসী বিকারের অবস্থায় অনর্গল লাটিন আওড়াইতে লাগিল। সহজ-অবস্থায় লাটিনের বিন্দুবিসর্গও সে জানে না। ক্রমে অনুসন্ধান করিয়া জানা গেল, পূর্ব্বে সে একজন লাটিন পণ্ডিতের নিকট দাসী ছিল। যদিও লাটিন শিখে নাই ও জাগ্রত অবস্থায় তাহার লাটিনের স্মৃতি সম্পূর্ণ নিদ্রিত থাকে, তথাপি উক্ত পণ্ডিতকর্ত্তৃক উচ্চারিত লাটিন পদগুলি তাহার মনের মধ্যে সমস্তই বাস করিতেছিল। সকলেই জানেন বিজ্ঞান-গ্রন্থে এরূপ উদাহরণ বিস্তর আছে।

 

বিস্মৃতি

 

আমাদের স্মরণশক্তি অতি ক্ষুদ্র, বিস্মৃতি অতিশয় বৃহৎ। কিন্তু বিস্মৃতি অর্থে ত বিনাশ বুঝায় না। স্মৃতি বিস্মৃতি একই জাতি। একই স্থানে বাস করে। বিস্মৃতির বিকাশকেই বলে স্মৃতি, কিন্তু স্মৃতির অভাবকেই যে বিস্মৃতি বলে তাহা নহে। এই অতি বিপুল বিস্মৃতি আমাদের মনের মধ্যে বাস করিতেছে। বাস করিতেছে মানে কি নিদ্রিত আছে, তাহা নহে। অবিশ্রাম কাজ করিতেছে, এবং কোন কোনটা স্মৃতিরূপে পরিস্ফুট হইয়া উঠিতেছে। আমাদের রক্তচলাচল অনুভব করিতেছি না বলিয়া যে রক্ত চলিতেছে না, তাহা বলিতে পারি না। পুরুষানুক্রমবাহী কতশত গুণ আমাদের মধ্যে অজ্ঞাতসারে বাস করিতেছে। তাহার অনেকগুলিই হয়ত আমাতে বিকশিত হইল না, আমার উত্তর পুরুষে বিকশিত হইয়া উঠিবে। এইগুলি, এই অতি নিকটের সামগ্রীগুলিই যদি আমরা না জানিতে পারিলাম, তবে সমস্ত জগতের আত্মা যে আমার মধ্যে গূঢ়ভাবে বিরাজ করিতেছে তাহা আমি জানিব কি করিয়া! জগতের হৃদয়ের মধ্য দিয়া আমার হৃদয়ে যে একই সূত্র চলিয়া গিয়াছে তাহা অনুভব করিব কি করিয়া! কিন্তু সে অবিশ্রাম তাহার কার্য্য করিতেছে। আমি কি জানি বিশ্ব-সংসারের প্রত্যেক পরমাণু অহর্নিশি আমাকে আকর্ষণ করিতেছে এবং আমিও বিশ্ব-সংসারের প্রত্যেক পরমাণুকে অবিশ্রাম আকর্ষণ করিতেছি? কিন্তু জানি না বলিয়া কোন্‌ কাজটা বন্ধ রহিয়াছে!

 

জগতের বন্ধন

 

বিশ্ব-জগতের মধ্য দিয়া আমাদের মধ্যে যে দৃঢ়সূত্র প্রবাহিত হইয়া গিয়াছে ইহাই ছিন্ন করিয়া ফেলা মুক্তি, এইরূপ কথা শুনা যায়। কিন্তু ছিন্ন করে কাহার সাধ্য! আমি আর জগৎ কি স্বতন্ত্র? কেবল একটা ঘরগড়া বাঁধনে বাঁধা? সেইটে ছিঁড়িয়া ফেলিলেই আমি বাহির হইয়া যাইব? আমি ত জগৎ-ছাড়া নই, জগৎ আমা-ছাড়া নয়; আমরা সকলেই জগৎকে গণনা করিবার সময়, আমাকে ছাড়া আর সকলকেই জগতের মধ্যে গণ্য করি, কিন্তু জগৎ ত সে গণনা মানে না।

 

জগৎ দিনরাত্রি অনন্তের দিকে ধাবমান হইতেছে, কিন্তু তথাপি অনন্ত হইতে অনন্ত দূরে। তাহাই দেখিয়া অধীর হইয়া আমি যদি মনে করি, জগতের হাত এড়াইতে পারিলেই আমি অনন্ত লাভ করিব, তাহা হয়ত ভ্রম হইতে পারে। অনন্তের উপরে লাফ দেওয়া ত চলে না। আমাদের সমস্ত লম্ফঝম্প এইখানেই। এই জগতের উপরেই লাফাইতেছি, এই জগতের উপরেই পড়িতেছি। আর, এই জগতের হাত হইতে অব্যাহতিই বা পাই কি করিয়া? ক'ড়ে আঙ্গুলটা হঠাৎ যদি একদিন এমনতর স্থির করে যে, অসুস্থ শরীরের প্রান্তে বাস করিয়া আমিও অসুস্থ হইয়া পড়িতেছি, অতএব এ শরীরটা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া আামি আলাদা ঘরকন্না করিগে -- সে কিরূপ ছেলেমানুষের মত কথাটা হয়! সে যতই বাঁকিতে থাকুক, যতই গা-মোড়া দিক, খানিকটা পর্য্যন্ত তাহার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু তাই বলিয়া একেবারে বিচ্ছিন্ন হইবার ক্ষমতা তাহার হাতে নাই। সমস্ত শরীরের স্বাস্থ্য তাহার সহিত লিপ্ত, এবং তাহার স্বাস্থ্য সমস্ত শরীরের সহিত লিপ্ত। জগতের এই পরমাণুরাশি হইতে একটি পরমাণু যদি কেহ সরাইতে পারিত তবে আর এ জগৎ কোথায় থাকিত! তেমনি এক জনের খেয়ালের উপরে মাত্র নির্ভর করিয়া জগতের হিসাবে একটি জীবাত্মা কম পড়িতে পারে এমন সম্ভাবনা যদি থাকে, তাহা হইলে সমস্ত জগৎটা "ফেল' হইয়া যায়। কিন্তু জগতের খাতায় এরূপ বিশৃঙ্খলা এরূপ ভুল হইবার কোন সম্ভাবনা নাই। অতএব আমাদের বুঝা উচিত জগতের বিরোধী হওয়াও যা, নিজের বিরোধী হওয়াও তা, জগতের সহিত আমাদের এতই ঐক্য।

 

যে পথে তপন শশী আলো ধরে আছে,

সে পথ করিয়া তুচ্ছ, সে আলো ত্যজিয়া,

ক্ষুদ্র এই আপনার খদ্যোত-আলোকে

কেন অন্ধকারে মরি পথ খুঁজে খুঁজে!

...

পাখী যবে উড়ে যায় আকাশের পানে,

সেও ভাবে এনু বুঝি পৃথিবী ত্যজিয়া।

যত ওড়ে, যত ওড়ে, যত ঊর্দ্ধে যায়

কিছুতে পৃথিবী তবু পারে না ত্যজিতে

অবশেষে শ্রান্ত দেহে নীড়ে ফিরে আসে।

 

 

জগতের ধর্ম্ম

 

অতএব প্রকৃতির মধ্যে যে ধ্রুব বর্ত্তমান, স্বেচ্ছাপূর্ব্বক সচেতনে সেই ধ্রুবের অনুগামী হওয়াই ধর্ম্ম। ধর্ম্ম শব্দের অর্থই দেখ না কেন। যাহাতে আবরণ বা নিবারণ করে তাহাই ধর্ম্ম, যাহাতে ধারণ করে তাহাই ধর্ম্ম। দ্রব্যবিশেষের ধর্ম্ম কি? যাহা অভ্যন্তরে বিরাজ করিয়া সেই দ্রব্যকে ধারণ করিয়া আছে; অর্থাৎ যাহার প্রভাবে সেই দ্রব্যের দ্রব্যত্ব খাড়া হইয়াছে। জগতের ধর্ম্ম কি? জগৎ যে অচল নিয়মের উপর আশ্রয় করিয়া বর্ত্তমান রহিয়াছে তাহাই জগতের ধর্ম্ম, এবং তাহাই জগতের প্রত্যেক অণুকণার ধর্ম্ম।

 

উদাহরণ

 

একটি উদাহরণ দিই। জগতের একটি প্রধান ধর্ম্ম পরার্থপরতা। স্বার্থপরতা জগতের ধর্ম্ম-বিরুদ্ধ। এই নিমিত্ত জগতের কোথাও স্বার্থপর নাই। পরের জন্য কাজ করিতেই হইবে তা ইচ্ছা কর আর না কর। জগতের প্রত্যেক পরমাণু তাহার পরবর্ত্তী ও তাহার নিকটবর্ত্তীর জন্য, তাহার নিজের মধ্যে তাহার বিরাম নাই। তাহার প্রত্যেক কার্য্য অনন্ত জগতের লক্ষকোটি স্নায়ুর মধ্যে তরঙ্গিত হইতেছে। একটি বালুকণা যদি কেহ ধ্বংস করিতে পারে তবে নিখিল ব্রক্ষ্ণাণ্ডের পরিবর্ত্তন হইয়া যায়। তুমি স্বার্থপরভাবে বিদ্যা উপার্জ্জন ও মনের উন্নতি সাধন করিলে, কিন্তু জানিতেও পারিলে না, সে বিদ্যার ও সে উন্নতির লক্ষকোটি উত্তরাধিকারী আছে। তুমি দাও না-দাও তোমার সন্তানশ্রেণীর মধ্যে সে উন্নতি প্রবাহিত হইবে। তোমার আশে-পাশে চারি দিকে সেই উন্নতির ঢেউ লাগিবে। তুমি ত দুই দিনে পৃথিবী হইতে সরিয়া পড়িবে, কিন্তু তোমার জীবনের সমস্তটাই পৃথিবীর জন্য রাখিয়া যাইতে হইবে -- তুমি মরিয়া গেলে বলিয়া তোমার জীবনের এক মুহূর্ত্ত হইতে ধরণীকে বঞ্চিত করিতে পারিবে না, প্রকৃতির আইন এমনি কড়াক্কড়।

 

সচেতন ধর্ম্ম

 

অতএব এ জগতে স্বার্থপর হইবার যো নাই। পরার্থপরতাই এ জগতের ধর্ম্ম। এই নিমিত্তই মানুষের সর্ব্বোৎকৃষ্ট ধর্ম্ম পরের জন্য আত্মোৎসর্গ করা। জগতের ধর্ম্ম আমাদিগকে আগে হইতেই পরের জন্য উৎসৃষ্ট করিয়া রাখিয়াছে, সে বিষয়ে আমরা জগতের জড়াদপি জড়ের সমতুল্য। কিন্তু আমরা যখন স্বেচ্ছায় সচেতনে সেই মহাধর্ম্মের অনুগমন করি তখনই আমাদের মহত্ত্ব, তখনই আমরা জড়ের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। কেবল তাহাই নয়, তখনই আমরা মহৎ সুখ লাভ করি। তখনই আমরা দেখিতে পাই যে, স্বার্থপরতায় সমস্ত জগৎকে এক পার্শ্বে ঠেলিয়া তাহার স্থানে অতি ক্ষুদ্র আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাই। কিন্তু পারিব কেন? অহর্নিশি অশান্তি, অসুখ, হৃদয় ক্লান্ত হইয়া পড়ে, কিছুতেই তাহার আরাম থাকে না। যতই সে উপার্জ্জন করিতে থাকে, যতই সে সঞ্চয় করিতে থাকে, ততই তাহার ভার বৃদ্ধি হইতে থাকে মাত্র। কিন্তু যখনি আপনাকে ভুলিয়া পরের জন্য প্রাণপণ করি তখনি দেখি সুখের সীমা নাই। তখনি সহসা অনুভব করিতে থাকি সমস্ত জগৎ আমার স্বপক্ষে। আমি ছিলাম ক্ষুদ্র, হইলাম অত্যন্ত বৃহৎ। চন্দ্র সূর্য্যের সহিত আমার বন্ধুত্ব হইল।

 

জগতস্রোতে ভেসে চল

যে যেথা আছ ভাই,

চলেছে যেথা রবিশশী

চল রে সেথা যাই!

অপক্ষপাত

 

 

জগৎ ত কাহাকেও একঘরে করে না, কাহারো ধোপা নাপিত বন্ধ করে না। চন্দ্র সূর্য্য রৌদ্র বৃষ্টি, জগতের সমস্ত শক্তি সমগ্রের এবং প্রত্যেক অংশের অবিশ্রাম সমান দাসত্ব করিতেছে। তাহার কারণ এই জগতের মধ্যে যে কেহ বাস করে কেহই জগতের বিরোধী নহে। পাপী অসাধুরা জগতের নীচের ক্লাসে পড়ে মাত্র, কিন্তু তাই বলিয়া ত তাহাদিগকে ইস্কুল হইতে তাড়াইয়া দিতে পারা যায় না। বাইবেলের অনন্ত নরক একটা সামাজিক জুজু বই ত আর কিছু নয়। পাপ নাকি একটা অভাব মাত্র, এই নিমিত্ত সে এত দুর্ব্বল যে তাহাকে পিষিয়া মারিয়া ফেলিবার জন্য একটা অনন্ত জাঁতার আবশ্যক করে না। সমস্ত জগৎ তাহার প্রতিকূলে তাহার সমস্ত শক্তি অহর্নিশি প্রয়োগ করিতেছে। পাপ পুণ্যে পরিণত হইতেছে, আত্মম্ভরিতা বিশ্বম্ভরিতার দিকে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িতেছে।

 

সকলে আত্মীয়

 

নিতান্ত ঘৃণা করিয়া আর কাহাকেও একেবারে পর মনে করা শোভা পায় না। সকলেরই মধ্যে এত ঐক্য আছে। ঘুঁটে মহাশয় মস্ত লোক হইতে পারেন, তাই বলিয়া যে গোবরের সঙ্গে আদান প্রদান একেবারেই বন্ধ করিয়া দিবেন ইহা তাঁহার মত উন্নতিশীলের নিতান্ত অনুপযুক্ত কাজ।

 

জড় ও আত্মা

 

পূর্ব্বেই ত বলিয়াছি আমাদের অধিকাংশই অচেতন, একটুখানি সচেতন মাত্র। তবে আর জড়কে দেখিয়া নাসা কুঞ্চিত করা কেন? আমরা একটা প্রকাণ্ড জড়, তাহারই মধ্যে একরত্তি চেতনা বাস করিতেছে। আত্মায় ও জড়ে যে বাস্তবিক জাতিগত প্রভেদ আছে তাহা নহে। অবস্থাগত প্রভেদ মাত্র। আলোক ও অন্ধকারে এতই প্রভেদ যে মনে হয় উভয়ে বিরোধীপক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞান বলে, আলোকের অপেক্ষাকৃত বিশ্রামই অন্ধকার এবং অন্ধকারের অপেক্ষাকৃত উদ্যমই আলোক। তেমনি আত্মার নিদ্রাই জড়ত্ব এবং জড়ের চেতনাই আত্মার ভাব।

 

বিজ্ঞান বলে, সূর্য্যকিরণে অন্ধকার-রশ্মিই বিস্তর, আলোক-রশ্মি তাহার তুলনায় ঢের কম; একটুখানি আলোক অনেকটা অন্ধকারের মুখপাতের স্বরূপ। তেমনি আমাদের মনেও একটুখানি চৈতন্যের সহিত অনেকখানি অচেতনতা জড়িত রহিয়াছে। জগতেও তাহাই। জগৎ একটি প্রকাণ্ড গোলাকার কুঁড়ি, তাহার মুখের কাছটুকুতে একটুখানি চেতনা দেখা দিয়াছে। সেই মুখটুকু যদি উদ্ধত হইয়া বলে আমি মস্তলোক, জগৎ অতি নীচ, উহার সংসর্গে থাকিব না, আমি আলাদা হইয়া যাইব, তবে সে কেমনতর শোনায়?

 

মৃত্যু

 

ধর্ম্মকে আশ্রয় করিলে মৃত্যুভয় থাকে না। এখানে মৃত্যু অর্থে ধ্বংসও নহে, মৃত্যু অর্থে অবস্থাপরিবর্ত্তনও নহে, মৃত্যু অর্থে জড়তা। অচেতনতাই অধর্ম্ম। ধর্ম্মকে যতই আশ্রয় করিতে থাকিব, ততই চেতনা লাভ করিতে থাকিব, ততই অনুভব করিতে থাকিব, যে মহাচৈতন্যে সমস্ত চরাচর অনুপ্রাণিত হইয়াছে, আমার মধ্য দিয়া এবং আমাকে প্লাবিত করিয়া সেই চৈতন্যের স্রোত প্রবাহিত হইতেছে। যথার্থ জগৎকে জ্ঞানের দ্বারা জানিবার কোন সম্ভাবনা নাই, চৈতন্য দ্বারা জানিতে হইবে।

 

জগতের সহিত ঐক্য

 

জগৎকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়া সওয়াল-জবাব করাইলে সে খুব অল্প কথাই বলে, জগতের ঘরে বাস করিলে তবে তাহার যথার্থ খবর পাওয়া যায়। তাহা হইলে জগতের হৃদয় তোমার হৃদয়ে তরঙ্গিত হইতে থাকে; তখন তুমি যে কেবল মাত্র তর্ক-দ্বারা জ্ঞানকে জান তাহা নহে, হৃদয়ের দ্বারা জ্ঞানকে অনুভব কর। আমরা যে কিছুই জানিতে পারি না তাহার প্রধান কারণ আমরা নিজেকে জগৎ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখি; যখনি হৃদয়ের উন্নতি-সহকারে জগতের সহিত অনন্ত ঐক্য মর্ম্মের মধ্যে অনুভব করিতে থাকিব, তখনি জগতের হৃদয়-সমুদ্র সমস্ত বাঁধ ভাঙ্গিয়া আমার মধ্যে উথলিত হইয়া উঠিবে, আমি কতখানি জানিব কতখানি পাইব তাহার সীমা নাই। একটুখানি বুদ্‌বুদের মত অহঙ্কারে ফুলিয়া উঠিয়া স্বাতন্ত্র্য-অভিমানে জগতের তরঙ্গে তরঙ্গে ভাসিয়া বেড়াইলে মহত্ত্বও নাই, সুখও নাই। জগতের সহিত এক হইবার উপায় জগতের অনুকূলতা করা, অর্থাৎ ধর্ম্ম আশ্রয় করা। ধর্ম্ম, জগতের প্রাণগত চেতনা; তিনি নহিলে তোমার অসাড়তা কে দূর করিবে?

 

মূল ধর্ম্ম

 

একজন বলিতেছেন, যখন প্রকৃতির মধ্যে সর্ব্বত্রই নৃশংসতা দেখিতেছি, তখন নিষ্ঠুরতা যে জগতের ধর্ম্ম নহে এ কে বলিতেছে? জগতের অস্তিত্বই স্বয়ং বলিতেছে। নিষ্ঠুরতাই যদি জগতের মূলগত নিয়ম হইত, হিংসাই যদি জগতের আশ্রয়স্থল হইত, তবে জগৎ এক মুহূর্ত্ত বাঁচিত না। উপর হইতে যাহা দেখি তাহা ধর্ম্ম নহে। উপর হইতে আমরা ত চতুর্দ্দিকে পরিবর্ত্তন দেখিতেছি, কিন্তু জগতের মূল ধর্ম্ম কি অপরিবর্ত্তনীয়তা নহে? আমরা চারি দিকেই ত অনৈক্য দেখিতেছি, কিন্তু তাহার মূলে কি ঐক্য বিরাজ করিতেছে না? তাহা যদি না করিত, তাহা হইলে এ জগৎ বিশৃঙ্খলার নরকরাজ্য হইত, সৌন্দর্য্যের স্বর্গরাজ্য হইত না। তাহা হইলে কিছু হইতেই পারিত না, কিছু থাকিতেই পারিত না।

 

একটি রূপক

 

অনেক লোক আছেন, তাঁহারা জগতের সর্ব্বত্রই অমঙ্গল দেখেন। তাঁহাদের মুখে জগতের অবস্থা যেরূপ শুনা যায়, তাহাতে তাহার আর এক মুহূর্ত্ত টিঁকিয়া থাকিবার কথা নহে। সর্ব্বত্রই যে শোক-তাপ দুঃখ-যন্ত্রণা দেখিতেছি এ কথা অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু তবুও ত জগতের সঙ্গীত থামে নাই। তাহার কারণ, জগতের প্রাণের মধ্যে গভীর আনন্দ বিরাজ করিতেছে। সে আনন্দ-আলোক কিছুতেই আচ্ছন্ন করিতে পারিতেছে না, বরঞ্চ যত কিছু শোক তাপ সেই দীপ্ত আনন্দে বিলীন হইয়া যাইতেছে। শিবের সহিত জগতের তুলনা হয়। অসীম অন্ধকার-দিক্‌-বসন পরিয়া ভূতনাথ-পশুপতি জগৎ কোটি কোটি ভূত লইয়া অনন্ত তাণ্ডবে উন্মত্ত। কণ্ঠের মধ্যে বিষ পূর্ণ রহিয়াছে, তবু নৃত্য। বিষধর সর্প তাঁহার অঙ্গের ভূষণ হইয়া রহিয়াছে, তবু নৃত্য। মরণের রঙ্গভূমি শ্মশানের মধ্যে তাঁহার বাস, তবু নৃত্য। মৃত্যুস্বরূপিনী কালী তাঁহার বক্ষের উপর সর্ব্বদা বিচরণ করিতেছেন, তবু তাঁহার আনন্দের বিরাম নাই। যাঁহার প্রাণের মধ্যে অমৃত ও আনন্দের অনন্ত প্রস্রবণ, এত হলাহল এত অমঙ্গল তিনিই যদি ধারণ করিতে না পারিবেন তবে আর কে পারিবে। সর্পের ফণা, হলাহলের নীলদ্যুতি বাহির হইতে দেখিয়া আমরা শিবকে দুঃখী মনে করিতেছি, কিন্তু তাঁহার জটাজালের মধ্যে প্রচ্ছন্ন চিরস্রোত অমৃতনিস্যন্দিনী পুণ্যভাগীরথীর আনন্দ-কল্লোল কি শুনা যাইতেছে না? নিজের ডমরুধ্বনিতে, নিজের অস্ফুট হর্ষগানে উন্মত্ত হইয়া নিজে যে অবিশ্রাম নৃত্য করিতেছেন, তাহার গভীর কারণ কি দেখিতে পাইতেছি? বাহিরের লোকে তাঁহাকে দরিদ্র বলিয়া মনে করে বটে, কিন্তু তাঁহার গৃহের মধ্যে দেখ দেখি, অন্নপূর্ণা চিরদিন অধিষ্ঠান করিতেছেন। আর ঐ যে মলিনতা দেখিতেছ, শ্মশানের ভস্ম দেখিতেছ, মৃত্যুর চিহ্ন দেখিতেছ, ও কেবল উপরে -- ঐ শ্মশানভস্মের মধ্যে আচ্ছন্ন রজতগিরিনিভ চারুচন্দ্রাবতংস অতি সুন্দর অমর বপু দেখিতেছ না কি? উনি যে মৃত্যুঞ্জয়। আর, মৃত্যুকে কি আমরা চিনি? আমরা মৃত্যুকে করাল-দশনা লোলরসনা মূর্ত্তিতে দেখিতেছি, কিন্তু ঐ মৃত্যুই ইঁহার প্রিয়তমা, ঐ মৃত্যুকে বক্ষে ধরিয়া ইনি আনন্দে বিহ্বল হইয়া আছেন। কালীর যথার্থ স্বরূপ আমাদের জানিবার কোন সম্ভাবনা নাই, আমাদের চক্ষে তিনি মৃত্যু-আকারে প্রতিভাত হইতেছেন, কিন্তু ভক্তেরা জানেন কালীও যা গৌরীও তাই। আমরা তাঁহার করালমূর্ত্তি দেখিতেছি, কিন্তু তাঁহার মোহিনীমূর্ত্তি কেহ কেহ বা দেখিয়া থাকিবেন। শিবকে সকলে যোগী বলে। ইনি কাহার যোগে নিমগ্ন রহিয়াছেন?

 

যোগী হে, কে তুমি হৃদি-আসনে,

বিভূতিভূষিত শুভ্রদেহ, নাচিছ দিক্‌-বসনে!

মহা আনন্দে পুলককায়,

গঙ্গা উথলি উছলি যায়,

ভালে শিশু শশী হাসিয়া চায়,

জটাজূট ছায় গগনে।