Home > Others > অনুবাদ চর্চা > অনুবাদ-চর্চ্চা

অনুবাদ-চর্চ্চা    


বাংলা হইতে ইংরাজি

 

 

বহুকাল পূর্ব্বে Rhodopis নামে একটি সুন্দরী বালিকা তাহার সঙ্গীদের সঙ্গে নীল নদের জলে স্নান করিতেছিল; এমন সময় হঠাৎ একটি ঈগল্‌ আকাশ হইতে দ্রুত নামিয়া তাহার ছোটো চটি জুতাজোড়ার একপাটি ছোঁ মারিয়া লইয়া মরুভূমির উপর দিয়া উড়িয়া গেল। মেয়েটি মনের খেদে বলিয়া উঠিল, "মাগো! আমার বিমাতা কী না জানি বলিবেন!" সেই মুহূর্ত্তেই অত্যন্ত রুষ্টমুখে তাহার বিমাতা স্বয়ং সেইখানে আসিলেন। তিনি বলিলেন, "চলিয়া এস। তুমি হুই কুম্ভকারের কাছ হইতে যে কলসী কিনিয়াছিলে, সেটা ফাটা; রাজার কাছে নালিশ করিতে যাইতে হইবে।" ঈজিপ্টের মহারাজ সে সময়ে মেম্ফিস-নামক প্রচীন নগরে তাঁহার দরবার করিতেছিলেন এবং সেখানে সকলেই বড়ো আমোদে ছিল, কারণ রাজা তখন যুদ্ধ হইতে সদ্য ফিরিয়া আসিয়াছেন। তিনি তাঁহার বাগানে একটি বৃদ্ধ পুরোহিতের সহিত কথা কহিতেছিলেন, এমন সময়ে শেষোক্ত ব্যক্তি কহিলেন, "যুদ্ধ যখন শেষ হইয়া গেল, তখন এবার তুমি সুস্থির হইয়া বিবাহ করিতে পারো।"

 

 

রাজা উত্তর করিলেন, "আমার মতো একজন সাদাসিধা সৈনিক কী করিয়া যোগ্য কন্যা বাছিয়া লইবার আশা করিতে পারে? আহা, যদি দেবতা একটা কোনো নিদর্শন দিতেন!" ঠিক সেই সময়ে ঈগলটি আসিল এবং চটিজুতা রাজার কোলের উপর ফেলিয়া দিল। ইহা তাঁহার প্রার্থনার উত্তর মনে করিয়া রাজা বলিলেন, "আমি যদি সত্যই ফেরেয়ো (ঙবতক্ষতষব) হই, তবে যে কুমারী এই জুতাটি পরিতে পারে তাহাকে আমি বিবাহ করিব।" রাজদরবারের সকল মহিলা চেষ্টা করিল, কিন্তু চেষ্টা ব্যর্থ হইল, কেহই সফলকাম হইল না। যখন এই সম্মানের জন্য শেষ প্রার্থিনী হতাশ হইয়া চেষ্টা ত্যাগ করিতে উদ্যত হইয়াছে এমন সময়ে একটি স্ত্রীলোক ভীড়ের মধ্য দিয়া ঠেলিয়া পথ করিয়া ভিতরে উপস্থিত হইল এবং তাহার সঙ্গে একটি ছোটো বালিকা আসিল। অবশ্য তাহারাই রডপিস এবং তাহার বিমাতা।

 

 

রডপিস বলিয়া উঠিল, "কেন, মা, ঐ তো আমার হারানো জুতা!" সভাসদের দল একেবারে নিঃশব্দ; কেননা তাহারা ভাবিতে লাগিল, ইহার পরে না জানি কী ঘটে! ইহার মধ্যে অসামান্য কিছু আছে, এ কথা একটুও না ভাবিয়া ঐ চারুমুখী কন্যাটি নিতান্ত সহজে জুতার মধ্যে পা গলাইয়া দিল এবং ইহার সঙ্গে জুড়ি মেলে এমন একটি পাটি তাহার জেব হইতে বাহির করিল। যখন রডপিসের হাত ধরিয়া রাজা বলিলেন "ফেরেয়োর বাক্য কখনো ব্যর্থ হইতে পারে না", তখন অন্য সুন্দরী কন্যাদের মধ্যে একটি ক্রুদ্ধ গুঞ্জনধ্বনি ফিরিতে লাগিল। যথাসময়ে ইহাকেই রাজা পত্নীরূপে গ্রহণ করিলেন। গল্প চলিত আছে যে, রডপিস মাধুর্য্য ও সাধ্বীতার জন্য তাঁহার স্বামীর এত একান্ত প্রিয় হইয়াছিলেন যে, তৃতীয় পিরামিড নামে বিদিত পিরামিডটি একদা রডপিসের সমাধিরূপে ব্যবহৃত হইবে বলিয়া, মহিষীর জীবিতকালেই রাজা তাহা নির্ম্মাণ করাইয়াছিলেন।

 

 

আফ্রিকাতে এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার কোনো কোনো অংশে সিংহ পাওয়া যায়। পুরুষ সিংহ লাঙ্গুলের তিন ফুট সমেত, প্রায় ১০ ফুট হয়; সিংহী তাহার চেয়ে প্রায় এক ফুট ছোটো হয়। সিংহ বৃক্ষারোহণ করিতে পারে না, তাহারা বালুময় ও শিলাময় স্থানে এবং অনেক সময়ে নদী ও ঝরণার নিকটবর্ত্তী গুল্মাবৃত ঝোপঝাপের মধ্যে বাস করে এবং সেই স্থানে শিকারের অপেক্ষায় ওৎ পাতিয়া বসিয়া থাকে। রাত্রেই তাহাদের সচেষ্টতা সর্ব্বাপেক্ষা বাড়িয়া ওঠে, যদিও দিনেও অনেক সময়ে তাহারা দৃষ্টিগোচর হয়। সিংহের সাহস ও তাহার  গর্জ্জনের প্রচণ্ডতা সম্বন্ধে বহুল পরিমাণে মতভেদ আছে, ঐ দুই বিষয়েই যথেষ্ট অত্যুক্তি হইয়াছে। কিন্তু ক্ষুধার্ত্ত বা উত্তেজিত সিংহ অতি ভয়ানক, বিশেষতঃ রাত্রিকালে; মার্জ্জারের ন্যায় গোপনে ও অতর্কিতভাবে শিকারের উপর লাফাইয়া পড়িবার অভ্যাসের গুণে সিংহ অনেক সময়ে আপনার অপেক্ষা বৃহত্তর অনেক পশুকে পরাভূত করে। সে মহিষ জেব্রা এবং এমন-কি অল্পবয়স্ক হস্তী শিকার করে। পুরুষ সিংহ শাবকদের লালনপালনে ও আহারদানে সাহায্য করিয়া থাকে।

 

 

এইরূপ প্রকাশ যে, গগন মণ্ডল বলিয়া কোনো একজন বজবজের চালের ব্যবসায়ী এক দেশী নৌকায় একটা বড়ো রকমের চালের চালান লইয়া কলিকাতায় আসিতেছিল এবং পোজালি খাল বলিয়া হুগলী নদীর এক খালের মধ্যে রাত্রের মতো নোঙর করিয়া ছিল। মালিক এবং দাঁড়ির মাঝিরা যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন, এমন সময় কে একজন আগুন চাহিতেছে শুনিয়া তাহারা জাগিয়া উঠিল। এইরূপে হঠাৎ ঘুম হইতে জাগিয়া উঠিয়া মাল্লাদের ধাঁধা লাগিয়া গেল এবং তাহারা প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে পারিল না। ইতিমধ্যে বিপরীত দিক হইতে অন্য দুটি নৌকা উপস্থিত হইল এবং তাহাদের আরোহীরা চালের নৌকার লোকদিগকে মারিতে আরম্ভ করিল এবং ইহারা ভয়ে জলে ঝাঁপ দিয়া পড়িল; ডাকাতেরা সমস্ত মাল তাহাদের নৌকায়  তুলিয়া লইল এবং দ্রুতবেগে দাঁড় বাহিয়া চলিয়া গেল।

 

 

প্রিয় --

 

তোমার শেষ চিঠিখানি আমাকে অত্যন্ত সন্তুষ্ট করিয়াছে। কী আনন্দেই তুমি শরৎকাল যাপন করিয়াছ এবং তোমার হিমালয়বাসের কথা তুমি কেমন চিত্তাকর্ষকরূপে বর্ণনা করিয়াছ! তোমার সঙ্গে যদি থাকিতে পারিতাম তবে বেশ হইত; কিন্তু তাহা একেবারেই সম্ভব হইতে পারে নাই। কেননা, তুমি তো জানই, মা পীড়িত। এখন তিনি অপেক্ষাকৃত অনেকটা ভাল আছেন, কিন্তু তাঁহার মনে হয় যে দেহে বল ফিরিয়া আসিতে বিলম্ব হইতেছে। আমরা দুই জনেই আশা করিতেছি শীতকালের পূর্ব্বেই তুমি আমাদের সহিত সাক্ষাৎ করিতে পারিবে। কখন তুমি আসিতে পার সে কথা অনুগ্রহ করিয়া যত শীঘ্র আমাদিগকে জানাইবে।

 

ভরসা করি তোমরা সকলেই বেশ ভালো আছ।

 

আমি তোমার চিরদিনের ভালোবাসার বন্ধু

 

আ--

 

 

গতকল্য রাণী গ্রেট অর্মণ্ড্‌ ষ্ট্রীটে শিশুদের হাঁসপাতালে গিয়াছিলেন এবং যে বিভাগে রাজকুমারী মেরী শুশ্রূষাকারিণীর কার্য্যে নিযুক্ত আছেন, সেই বিভাগে এক ঘন্টার উপর অতিবাহন করিয়াছিলেন। সচরাচর মঙ্গলবার ও শুক্রবারেই হাঁসপাতালে রাজকুমারী কাজ করিয়া থাকেন। কিন্তু শুক্রবারে রাণীর সহিত তিনি ব্রাইটনে গিয়াছিলেন বলিয়া, তৎপরিবর্ত্তে গতকল্য অর্মণ্ড্‌ ষ্ট্রীটে কাজ করিতে আসিয়াছিলেন। কন্যাকে আপন বিভাগের কর্ত্তব্যসাধনে নিযুক্ত থাকিতে দেখিয়া রাজ্ঞী সন্তোষ লাভ করিয়াছিলেন। গৃহকর্ত্রী Miss Gertrude Payne এবং চিকিৎসাবিভাগের তত্ত্বাবধায়ক Dr. Pirie রাণীকে অভ্যর্থনা করিয়াছিলেন। শ্রীশ্রীমতী শুনিলেন যে, রাজকুমারী মেরী তাঁহার হাঁসপাতালের কার্য্যে যথেষ্ট নৈপুণ্য ও কৃতিত্ব লাভ করিতে পারিয়াছেন। যে বিভাগ তিনি দেখিতে গিয়াছিলেন তাহার নাম আলেকজাণ্ড্রা বিভাগ (রাণী আলেকজাণ্ড্রার নামানুসারে ইহার নামকরণ হয়); সেখানে ছাব্বিশটি শিশু চিকিৎসাধীনে ছিল। রাজকুমারী অস্ত্রচিকিৎসা-মতে ক্ষতসজ্জায় ব্যস্ত ছিলেন, তাঁহার মা উহার প্রণালীটি নিরীক্ষণ করিলেন।

 

 

এই বিশেষ বিভাগে রাজবংশীয়া শুশ্রূষাকারিণীর ভাগে কাল ডিনার পরিবেষণের ভার পড়িয়াছিল এবং রাণী তাঁহার এই কার্য্যে যোগ দিতে ইচ্ছা করিয়াছিলেন। প্রায় দুই বৎসর বয়সের পেলব-আকৃতি একটি শিশুকে বাছিয়া লইয়া সাবধানে ছিন্ন-করা খাদ্যের পথ্য তাহাকে খাওয়াইয়াছিলেন। ইহার পরে এক-পদ মিষ্টান্নের পালা ছিল; কিন্তু শ্রীশ্রীমতী উহা যথানির্দ্দিষ্ট পরিবেষকদের হাতে দিয়া হাসিয়া বলিয়াছিলেন যে, এমন খর্ব্বদেহ রোগীটির পক্ষে যেটুকু খাদ্য উৎকৃষ্ট এবং যথেষ্ট বলিয়া তাঁহার কাছে প্রতীয়মান হইয়াছে, তাহার উপর আরো অধিক যোগ করিবার দায়িত্ব তিনি লইতে ইচ্ছা করেন না।

 

রাজকুমারীর সেদিনকার কার্য্য শেষ না হওয়া পর্য্যন্ত রাণী অপেক্ষা করিয়াছিলেন ও পরে সেই রাজবংশীয়া শুশ্রূষাকারিণী হাঁসপাতালের উর্দ্দি পরিয়াই মাতার সহিত গাড়ীতে করিয়া বাকিংহাম প্রাসাদে ফিরিয়া গিয়াছিলেন।

 

 

৩১এ অক্টোবরে সমাপিত সপ্তাহে অল্পকয়েক স্থানে লঘুবৃষ্টিপাত হইয়াছে। সমস্ত প্রদেশে আরও অধিক বৃষ্টির আশু প্রয়োজন। কোনো কোনো জিলায় আমন ধান শুকাইতেছে বলিয়া প্রতিবেদন করা হইয়াছে। উত্তর এবং পশ্চিম বাংলায় শষ্যের ভাবী অবস্থা সাধারণত আশাজনক নহে। অন্যত্র ভাবী অবস্থা মাঝামাঝি রকম। রবিশষ্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা চলিতেছে। বৃষ্টির অভাবে বীজবপনের ব্যাঘাত ঘটিতেছে। এই প্রদেশে মোটা চালের গড়মূল্য পূর্ব্বসপ্তাহের তুলনায় প্রায় শতকরা হারে দুই মাত্রা বাড়িয়াছে।

 

১০

 

আমাদের অরণ্যের এবং ফলের বাগানের গাছসকল তাহাদের বৃদ্ধির প্রত্যেক অবস্থায় কীটশত্রুদের আক্রমণের বিষয়; এই কীটশত্রুগণ বাধাপ্রাপ্ত না হইলে শীঘ্রই বৃক্ষসকলকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করিত। আমাদের আরণ্যবৃক্ষ এবং ছায়াতরুগুলির বিনাশে আমাদের যে কী হইত, তাহা বর্ণনা করার চেয়ে কল্পনা করা সহজ। কাঠ আমাদের এত প্রকার সামগ্রীতে লাগে যে, ইহাকে বাদ দিয়া সভ্য মানুষের কথা চিন্তা করা কঠিন। এ দিকে আমাদের ফলবাগানের ফলসকলও যার-পর-নাই প্রয়োজনীয়। সৌভাগ্যক্রমে বৃক্ষদের কীটশত্রুসকলেরও নিজেদের নিত্যনিযুক্ত শত্রু যে নাই তাহা নহে; এই শত্রুদের মধ্যে অনেকজাতীয় পক্ষী আছে, যাহাদের অস্ত্রসজ্জা এবং অভ্যাসসকল কীট-আক্রমণ-ব্যাপারে তাহাদিগকে বিশেষরূপে যোগ্যতা দান করে, এবং তাহাদের সমস্ত জীবন এই কীটের অনুধাবনে ব্যয়িত হয়।

 

১১

 

আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট এবং প্রাচীনকালের পূর্ব্বদেশীয় অনেক রাজাও সিংহ পুষিতেন। ঐসকল পোষা সিংহ তাঁহাদের প্রাসাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে ঘুরিয়া বেড়াইত। বর্ত্তমানকাল পর্য্যন্ত আবিসিনিয়ার রাজগণ ঐ রীতি রক্ষা করিয়া আসিতেছেন এবং আলজিরিয়ার কোনো কোনো অংশে এখনো সিংহদিগকে অন্ধ করিয়া ও পোষ মানাইয়া ভূতছাড়ানোর কাজে লাগানো হইয়া থাকে। মধ্যযুগের শেষ-অংশে মিলানে ও ইটালির অন্যান্য নগরে সিংহ এবং চিতাবাঘকে অপরাধী ব্যক্তির প্রাণসংহারের কার্য্যে ব্যবহার করা হইত।

 

১২

 

একজন ফরাসী সৈনিক, এমব্রোজ পেরিশঁ, আপন জীবন-রক্ষার জন্য একটি ঘোড়ার কাছে ঋণী। তাহার দুই পা জর্ম্মান কামানের দ্বারা চূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। যখন রাত হইল, তখন সে তার কাছে একটা বড়ো সাদা ঘোড়ার গুরুশ্বাসের শব্দ শুনিতে পাইল, সেই ঘোড়াটি ছোটো ছোটো ঘাস চিবাইয়া খাইতেছিল। জন্তুটির আরোহী ছিল না; সৈনিক তাহাকে শিস দিয়া ডাকিল। ঘোড়াটি আনন্দে মৃদু হ্রেষাধ্বনি করিয়া উঠিল। নিজের জন্য স্বল্পমাত্র চেষ্টা করাও পেরিশঁর পক্ষে অসাধ্য ছিল। ঘোড়াটা যেন তাহা বুঝিতে পারিল, কেন না সে হাঁটু গাড়িয়া তাহার পাশে আসিয়া পড়িল এবং তাহার বক্ষের ঊর্দ্ধে মাথা রাখিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিল। তাহার পরে সে উঠিল এবং সৈনিকের চারি দিকে ঘুরিয়া বেড়াইল। অবশেষে থামিল, আহত ব্যক্তিকে আগাগোড়া ঘ্রাণ করিল এবং তাহার পর সেই সৈনিকের চামড়ার কোমরবন্ধ দাঁতে করিয়া ধরিয়া সে তাহাকে মাটি হইতে তুলিল এবং ছুটিয়া চলিয়া গেল।

 

১৩

 

চীনে ম্যাজিষ্ট্রেট, কয়েকবার অভিযোগ-শুনানির পরেও হত্যাপরাধে অভিযুক্ত আসামীদলের মধ্যে প্রকৃত কোন্‌ ব্যক্তি স্বহস্তে সাংঘাতিক আঘাত করিয়াছে তাহা স্থির করিতে না পারিয়া, বন্দীদিগকে জানাইলেন যে, তিনি সত্যনির্ণয়ের জন্য অশরীরী সত্তার সাহায্য লইতে যাইতেছেন। তদনুসারে তিনি অপরাধীর কৃষ্ণবেশ পরিহিত ঐ অভিযুক্ত ব্যক্তিদিগকে একটি গোলাবাড়িতে লইয়া গিয়া, দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরাইয়া ঘরের চারি ধারে সন্নিবেশিত করিলেন। শীঘ্রই একজন অভিযোক্তা দিব্যদূত তাহাদের মধ্যে আসিয়া অপরাধীর পৃষ্ঠদেশ চিহ্নিত করিয়া যাইবেন, এই কথা তাহাদিগকে বলিয়া তিনি বাহির হইয়া গেলেন এবং দরজা বন্ধ করাইয়া ঘর অন্ধকার করিয়া দিলেন। অল্পক্ষণ পরে যখন দরজা খুলিয়া দিয়া ঐ লোকগুলিকে  বাহিরে আসিতে আহ্বান করা হইল, তখন অবিলম্বেই দেখা গেল যে, তাহাদের মধ্যে একজনের পৃষ্ঠে একটি সাদা চিহ্ন রহিয়াছে। দেওয়ালে সম্প্রতি চুণকাম হইয়াছে, তাহা না জানিয়া ঐ ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে নিজেকে আপদ হইতে বাঁচাইবার ইচ্ছায় দেওয়ালের দিকে পিঠ ফিরাইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

 

১৪

 

মুসার আইনে এবং প্রথম খৃষ্টীয় যুগে সুদ লওয়ার বিরুদ্ধে অতি বদ্ধমূল আপত্তি ছিল। তখনকার দিনের শিল্প ও উৎপন্ন দ্রব্যাদি অতিশয় সাদাসিধা ধরণের ছিল বলিয়াই প্রতীয়মান হয় এবং তাহাদের নির্ম্মাণের ব্যাপারে ধারে কারাবারের প্রয়োজন ছিল না। যাহা কিছু ধারে নেওয়া হইত, তাহা কেবল সদ্য ব্যবহার এবং দুঃখলাঘব করিবার জন্যই। এই কারণেই এই ধারণার উৎপত্তি হইয়াছিল যে, যে কেহ অপরের দুঃখক্লেশে লাভবান্‌ হয় সে নিন্দনীয়। এমন কি, গ্রীক্‌ ও রোমীয় দার্শনিকগণও কোনো সঙ্গত কারণ না দেখাইয়াই উচ্চকণ্ঠে সুদ গ্রহণ করার নিন্দা করিয়াছিলেন। কিন্তু গ্রীক ও রোমীয় আইনে সুদ-গ্রহণে সম্মতি দেওয়া হইয়াছিল, এবং মধ্যযুগ পর্য্যন্ত যতদিন না খৃষ্টীয় সঙ্ঘ ইহার বিরুদ্ধে ধর্ম্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন তাবৎকাল ইহা সাধারণতঃ গ্রাহ্যই ছিল।

 

১৫

 

ধনুষ্কোডি হইতে যে "থ্রু" প্যাসেঞ্জার ট্রেন মাদ্রাজের অভিমুখে গত কল্য রওনা হইয়াছিল তাহা রাত্রে যথানিয়মে তিরুপুরনম্‌ পার হইয়াছিল, কিন্তু সেই ষ্টেশনের প্রায় দেড় মাইল দূরে তাহা রেলচ্যুত হয়। প্রকাশ পায় যে কে একজন দুষ্ট অভিপ্রায়ে একখানি ত্রিশ ফুট লম্বা রেল তুলিয়া রাস্তার বাহিরে ফেলিয়া দিয়াছিল এবং তাহার ফলে সমস্ত এঞ্জিনটি সেই ফাঁকের উপর দিয়া চলিয়া গিয়াছিল এবং টেণ্ডর গাড়িটি তাহার অব্যবহিত পশ্চাদ্বর্ত্তী তিনটি থার্ড্‌ ক্লাস গাড়ি টানিয়া লইয়া লাইনের একেবারে বাহিরে গিয়া পড়িয়াছিল; তাহাদের মধ্যে দুইটি গাড়ি উল্টাইয়া গিয়াছিল এবং তৃতীয়টি অল্প পরিমাণে এক পাশে কাত হইয়াছিল। যাহা হউক ভাগ্যক্রমে রেলওয়ে-কর্ম্মচারী অথবা যাত্রীদের মধ্যে কাহারো কোনো অনিষ্ট ঘটে নাই। ট্রাফিক ইন্‌স্পেক্টরের জিম্মায় মাদুরা হইতে প্রায় বারোটা দশ মিনিটের সময় তৎক্ষণাৎ একটি রিলীফ ট্রেন চালানো হইয়াছিল এবং প্যাসেঞ্জারদিগকে অন্য গাড়িতে তুলিয়া আজ ভোর-সকালে মাদুরায় আনা হইয়াছে। আশা করা যাইতেছে, আজ সন্ধ্যা নাগাদ অবিচ্ছিন্ন যাতায়াত পুনঃস্থাপিত হইবে।

 

১৬

 

প্রায় মধ্যাহ্নে শ্রীনগর ছাড়িলাম এবং নদীর প্রধান ধারাটি বাহিয়া অবাধে ভাসিতে ভাসিতে নগরীর মধ্য দিয়া চলিলাম। অসংখ্য বিপণি, চিত্রার্পিতবৎ সেতুসকল এবং তীরবেগে চতুর্দ্দিকে ধাবমান বহুসংখ্যক ক্ষুদ্র নৌকা চারি দিক হইতে মনোযোগ আকর্ষণ করিতেছিল। সন্ধ্যায় নদীতীরের সাদিপুর-নামক একটি গ্রামে আমরা নৌকা বাঁধিলাম; পরদিন প্রাতে প্রায় ছয়টায় ছাড়িয়া সম্বলে এবং মানসবল সরোবরের প্রবেশমুখে প্রায় বেলা নয়টার সময় পৌঁছিলাম। মাঝিরা ঝড়ঝঞ্ঝার সময়ে এই সরোবরকে বড়ো ভয় করে এবং সাধারণতঃ তাহারা তীরের কাছ ঘুরিয়া মন্দগতিতে যাওয়াই পছন্দ করে। সরোবরের দূরতর প্রান্তে একটি উৎসের নিকট আমরা নৌকা বাঁধিলাম এবং সকল সরোবরের মধ্যে সুন্দরতম এই সরোবরের সর্ব্বোৎকৃষ্ট দৃশ্যটি দেখিতে পাইলাম। ইহার গভীরতাকে যে অতলস্পর্শ বলিয়া অনুমান করা হয় তৎসম্বন্ধে অনেক গল্প প্রচলিত আছে এবং শুনা যায় একজন লোক ইহার তলদেশে পৌঁছিতে পারে এমন একগাছি দড়ি তৈয়ারি করিতেই সারাজীবন কাটাইয়াছে, কিন্তু কোনো ফল পায় নাই।

 

১৭

 

সেখানে আমরা এক সপ্তাহ কাটাইলাম, একদিন ঘোড়ায় চড়িয়া সিন্ধ্‌ উপত্যকার মুখে অবস্থিত গান্ধর্ব্বল দেখিতে বাহির হইলাম। সরোবরের পার্শ্ব বাহিয়া উচ্চ ভূমির উপরে ঘোড়া ছুটাইবার জন্য একটি অতি সুন্দর খোলা জায়গা দেখিতে পাইলাম -- এমন সুযোগ ছাড়িবার নয়। উলার সরোবর আমাদের তৎপরবর্ত্তী লক্ষ্য ছিল; এইটি সকল সরোবরের চেয়ে বড়ো, সভ্যদেশ হইতে সকলের চেয়ে দূরে অবস্থিত। এই সঙ্গে এখানে এই কথাটিও জুড়িয়া দিই যে, ময়দা সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছিলাম বলিয়া এবং নিজেদের রুটি নিজেরা তৈয়ারি করিয়াছিলাম বলিয়া দেখা গেল আমাদের অধিক সুবিধা হইয়াছে। দুগ্ধসম্বন্ধে আমরা গ্রামগুলির উপরে নির্ভর করিয়াছিলাম।

 

১৮

 

প্রত্যূষে আমরা মানসবল সরোবর ছাড়িলাম এবং সম্বল গ্রামে ঘোড়ায় চড়িয়া যাওয়াই পছন্দ করিয়া নৌকাগুলিকে আমাদের অনুসরণ করিতে বলিলাম। বৃহৎ সম্বল সেতুটির উপর দিয়া আমরা নদী পার হইলাম এবং ঘোড়ায় চড়িয়া তীর বাহিয়া আশামের দিকে চলিলাম ও সেইখানেই আমরা নৌকায় চড়িলাম। এখানে স্রোত প্রখর এবং আমরা অনায়াসেই ভাসিতে ভাসিতে সন্ধ্যা নাগাদই বন্যারে আসিলাম। উলার সরোবর পার হওয়া সে এক ব্যাপার; কারণ কাশ্মীরী মাল্লারা অনেক প্রকারের ভয়ে ও অন্ধসংস্কারে পূর্ণ। ঝড়ের ভয়ে তাহারা মধ্যাহ্নে ও অন্ধকারের ভয়ে সন্ধ্যার সময়ে পার হইবে না; একমাত্র ভোরে নির্বাত সময়ে যাইতে সম্মত হয়। প্রায় আড়াই ঘন্টায় পার হইয়া আমরা কুইনকুশে আসিলাম, ইহা হরিমঞ্জের ছায়াতলে সরোবরতীরবর্ত্তী একটি ক্ষুদ্র গ্রাম; এই হরিমঞ্জ পর্ব্বতটি সরোবরের পার্শ্বদেশ হইতে খাড়া উঠিয়াছে এবং উহার শীর্ষদেশে কোনো ফকিরের মন্দির মুকুটের ন্যায় বিরাজ করিতেছে।

 

১৯

 

গত মাস আমার পক্ষে যেমন দুঃখদায়ক হইয়াছিল, এমন আর কোনো কালে হয় নাই। বস্তুত কাতর হওয়া যে কাহাকে বলে ইহার পূর্ব্বে কখনো জানিতাম না। জানুয়ারির গোড়ার দিকে ইংলণ্ড হইতে পত্রযোগে আমার কনিষ্ঠ ভগিনীর মৃত্যু-সংবাদ আসে। সে যে আমার কী ছিল, তাহা কোনো বাক্য প্রকাশ করিতে পারে না। আমি এ কথা বলিব না যে, জগতের যে কোন পদার্থের চেয়ে সে আমার প্রিয় ছিল; কারণ যে ভগিনী আমার সঙ্গে ছিল সে তাহার সমতুল্য প্রিয়; কিন্তু এক মানুষ আর এক মানুষের যত প্রিয় হইতে পারে সে আমার তাহাই ছিল। এমন কি মহাকাল যদিও বেদনামোচনের কার্য্য আরম্ভ করিয়াছে, তথাপি এখনো  তাহার কথা বলিতে গেলে একেবারে অপুরুষোচিতভাবে বিচলিত না হইয়া থাকিতে পারি না। আমি যে এই আঘাতের ব্যথায় সম্পূর্ণ তলাইয়া যাই নাই, সে জন্য প্রধানত সাহিত্যের কাছে আমি ঋণী।

 

২০

 

পর্ব্বতের চূড়া, সমুদ্র এবং মেরুপ্রদেশীয় তুষারক্ষেত্রের উপরিভাগের বায়ুমণ্ডল সর্ব্বত্রই ধূলিভারাক্রান্ত। অণুবীক্ষণযন্ত্রে প্রকাশ পায় যে, পুষ্পের পরাগ, উদ্ভিদ্‌তন্তুর অংশ, লোম, ধাতু ও প্রস্তরের কণা, জীবাণু ও রোগবীজের দ্বারা বায়ুমণ্ডলস্থ ধূলিরাশি গঠিত। বাতাসের ধূলিকণাসকল ছায়াশূন্য স্থানে আলোক প্রতিফলিত করে; এইগুলি না থাকিলে সমস্ত ছায়াময় স্থান কৃষ্ণবর্ণ হইত। ধূলিকণা অব্যবহিত সূর্য্যালোকের প্রখরতা হ্রাস করে, কারণ তাহা না থাকিলে, কৃষ্ণবর্ণ আকাশে সূর্য্য দুর্দ্দর্শতর উজ্জ্বলতা লাভ করিত এবং সেই আকাশে দিবাভাগেও নক্ষত্রেরা  দৃশ্যমান হইত। আকাশের নীলিমা এবং সূর্য্যাস্ত-সূর্য্যোদয়-কালীন মহাপ্রভ বর্ণসমূহের হেতু তাহারাই ঐ ধূলিকণাকে বায়ুমধ্যস্থ জলীয় বাষ্প আবৃত করে, তাহার সংহতি মেঘ উৎপাদন করে ও তাহা হইতে বৃষ্টি হয়। অতএব বৃষ্টি-উৎপাদন সম্বন্ধে ধূলি অবশ্য-প্রয়োজনীয় না হইলেও, একটি প্রধান উপাদান বটে।

 

২১

 

এইরূপ কথিত যে, নিউইয়র্ক-সমাজে ভাজা কুমীর সর্ব্বাপেক্ষা অধুনাতন সুখাদ্য বলিয়া প্রচলিত হইয়াছে। এই সরীসৃপকে খাদ্যরূপে ব্যবহারের প্রস্তাব ইতঃপূর্ব্বেই য়ুনাইটেড ষ্টেট্‌সের মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছিল এবং একটি বৃহৎ বোর্ডিংগৃহের সভ্যেরা একত্র মিলিয়া চাঁদা করিয়া এক জোড়া অল্প বয়সের কুম্ভীর কোনো একটি কুম্ভীরপালন-শালা হইতে কিনিয়াছিল ও দেখিয়াছিল তাহা অত্যন্ত উত্তম। কিন্তু কুমীরের মাংস কিসের মতো খাইতে লাগে, ইহা যখন তাহারা বাহির করিতে চেষ্টা করিল তখন মুস্কিল বাধিল। ত্রিশ জন লোক ভোজে যোগ দিয়াছিল এবং তাহাদের প্রত্যেকের মত স্বতন্ত্র হইল। কেহ মনে করিল শূকরমাংসের সহিত ইহার সাদৃশ্য আছে; কেহ ভাবিল ইহা মাছের মতো; একজন বলিল ইহা চিংড়ির কথা মনে করাইয়া দেয়; কিন্তু সকলেই বলিল ইহা অত্যন্ত মুখরোচক।

 

২২

 

ধর্ম্মমঠগুলি সকলেরই পক্ষে খোলা। যে কোনো অজানা লোক মঠের মধ্যে প্রবেশ করিয়া আশ্রয় লইতে পারে। সন্ন্যাসীরা সকল সময়েই আতিথ্যপরায়ণ। বোধ করি, আমার ব্রহ্মদেশে বাসের সিকিভাগ আমি মঠে কিংবা তৎসংলগ্ন ধর্ম্মশালায় কাটাইয়াছি। আমরা তাঁহাদের সকল নিয়মই লঙ্ঘন করি; আমরা মঠের পবিত্র অবরোধের মধ্যেই ঘোড়ায় চড়ি এবং বুট পরিয়া বেড়াই; যেখানে সকল জীবের প্রাণ রক্ষা করা হয় সেখানে আমাদের ভৃত্যেরা আমাদের ডিনারের জন্য মুর্গি মারে; সমস্ত প্রাচ্যদের প্রতি আমাদের যেরূপ আচরণ, স্বজাতিকর্ত্তৃক পূজিত এই ধর্ম্মাচার্য্যদের প্রতি আমরা অনেকটা সেইরূপ উপেক্ষাপূর্ণ অবিনীত ব্যবহার করিয়া থাকি; আমরা অনেক সময়ে প্রকাশ্যভাবে তাঁহাদের ধর্ম্মকে পরিহাস করিয়া থাকি; তথাপি তাঁহাদের বিশ্বাস ও অভ্যাসের প্রতি আমাদের অবজ্ঞার পরিবর্ত্তে তাঁহাদের নিকট হইতে অনুরূপ আচরণ আমরা নিতান্তই কদাচিৎ পাই।

 

২৩

 

চীফ কমিশনর মাননীয় মিষ্টার হেলি ইন্‌ফ্লুয়েঞ্জা সংক্রামক সম্বন্ধে এক নিবন্ধে লিখিতেছেন যে, যদিচ এই সংক্রামক দিল্লীতে এখনও বহুসংখ্যক মৃত্যু ঘটাইতেছে, তথাপি এরূপ আশা করিবার কারণ আছে যে, ইহা এক্ষণে স্পষ্টতই হ্রাসের দিকে গিয়াছে। অক্টোবরের আরম্ভ হইতে মৃত্যুর হার কিছু প্রবল হইয়া উঠিয়াছিল। গত তিন বৎসরের গড় মৃত্যুসংখ্যা ২৪টির তুলনায় বর্ত্তমান অক্টোবরের প্রথম বারো দিনের গড় মৃত্যুসংখ্যা  ৪৮টি হইয়াছিল। ১৩ই এবং ১৪ই তারিখে হিসাবের তালিকায় প্রতিদিন ৭৭ সংখ্যা পাওয়া গিয়াছে। সংক্রামকের প্রবলতাবশত ম্যুনিসিপাল স্বাস্থ্যবিভাগ, স্থানীয় হাঁসপাতাল এবং ঔষধালয়ের উপরে অত্যন্ত কঠিন চাপ পড়িয়াছিল। ইন্দ্রপ্রস্থ-সেবকমণ্ডল, সেন্ট ষ্টীফেন কলেজ এবং আর্য্যসেবক-সভার স্বয়ংব্রতীদের নিকট হইতে স্বাস্থ্যসচিব ম্যানিং ষ্ট্রীট ঔষধালয়ে মূল্যবান আনুকূল্য লাভ করিয়াছেন। হাজি মহম্মদ রফি একটি ঔষধালয়ের সমগ্র খরচ জোগাইয়াছেন এবং বহুসংখ্যক বেসরকারী ডাক্তার আপন উদ্‌বৃত্ত সময় তাঁহার কাজে অর্পণ করিয়াছে। ডাক্তার আন্‌সারি এবং অনেকগুলি হাকিম ও বৈদ্য বহুসহস্র রোগীর ঘরে ঘরে ফিরিয়া আনুকূল্য করিয়াছেন।

 

২৪

 

দক্ষিণ মেসোপোটেমিয়া যখন তাহার সমৃদ্ধির মধ্যাহ্নকালে অবস্থিত, তখনকার সম্বন্ধে লিখিতে গিয়া হেরোডোটস বলিয়াছেন, "যত দেশ আমি জানি, ইহাই তাহাদের সকলের চেয়ে উত্তম ফসলের দেশ; ইহা এতই চমৎকার যে, সব চেয়ে ভালো বছরে গড়ে ইহার উৎপন্ন ফসল দুই-তিন-শ গুণ হইয়া থাকে।" প্রথম খলিফাদের রাজত্বের একটি তালিকায় দেখা যায় যে, প্রায় এক কোটি পঁচিশ লক্ষ একর জমি কৃষির অধীনে আছে। এ| জে| টয়ন্‌বি লিখিতেছেন, "প্রাচীনকালে উত্তর মেসোপোটেমিয়া প্রদেশটি এমন প্রজাবহুল এবং ধনশালী ছিল যে, ইহার অধিকার লইয়া রোমের সহিত ইরানের শাসনকর্ত্তৃগণের সাত শতাব্দী ধরিয়া লড়াই চলিয়াছিল; অবশেষে আরবেরা উভয়ের নিকট হইতে ইহা জিতিয়া লয়।" ঐ গ্রন্থকারই দেখাইয়া দিয়াছেন যে, নবম খৃষ্টশতাব্দীতে হারুন-অল্‌রশীদকে ইজিপ্ট যত বেশি খাজনা দিত, উত্তর মেসোপোটেমিয়া তত বেশি খাজনাই দিত এবং সেখানকার তুলা পৃথিবীর সকল হাটে প্রাধান্য লাভ করিয়াছিল। ইহা সুবিদিত যে আমাদের মস্‌লিন শব্দ উত্তর মেসোপোটেমিয়ার মোসল নগরের নাম হইতে উদ্ভূত।

 

২৫

 

এই ভূমি দশ শতাব্দী পূর্ব্বে যেরূপ শস্য উৎপাদন করিয়াছে এখন সেরূপ না করিবে কেন? মাটি এবং আবহাওয়ার পরিবর্ত্তন ঘটে নাই। বৃষ্টিপাত এবং সেচনযোগ্য জল পুরাতন কালের মতোই প্রচুর আছে। তখন যে জনসমূহ দেশে বাস করিত এখনও তাহারাই বাস করে; ইহারাও তাহাদের মতো শ্রমশীল এবং মিতব্যয়ী। প্রাচ্যদেশের সুন্দরতম শস্যভূমিতে গত চারি শতাব্দী কেন এমন সর্ব্বনাশ আনয়ন করিল? উত্তর হইতে দক্ষিণ, পূর্ব্ব হইতে পশ্চিম, সর্ব্বত্রই এই দেশে চাষীর মহা সুযোগ; অথচ এই ভূমির অধিকাংশই অনাবাদী অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। জলসংগ্রহের জন্য জলাশয় এবং অন্য যে সকল সেচনব্যবস্থার উপকরণ এই মরুময় একরগুলিকে শস্যপ্রসূ ক্ষেত্রে পরিণত করিতে পারিত তাহা নির্ম্মিত হয় নাই। অত্যন্ত-আদিমকাল-প্রচলিত কৃষিপ্রণালী এখনও এখানে ব্যবহৃত হয়; বাইবেল-কথিত কালের সেই বলদবাহিত লাঙল, সেই কাস্তে দিয়া বড়ো বড়ো খেতের ফসল কাটা, সেই ফসল মাড়াই করিবার মেঝে যেখানে পশুদের খুরের দ্বারা গোধূম দলিত হয়, সেই ক্লেশদায়ক মন্থরগতি হাতের খাটুনি -- সেও এমনতরো অনিপুণ যন্ত্র-সহযোগে যে যন্ত্রে প্রয়াসপ্রয়োগের অনুপাতে ফললাভ সর্ব্বাপেক্ষা স্বল্প।

 

২৬

 

মেরুপ্রদেশের চুক্‌চিস্‌গণ যদিও প্রকৃতির শিশু এবং সভ্যতার সকলপ্রকার প্রভাব হইতে সম্পূর্ণ মুক্তভাবে বরফ তুষার এবং শীতের মধ্যে বর্দ্ধিত, তথাপি তাহারা ভালোমানুষ, অবঞ্চকস্বভাব এবং আতিথ্যপরায়ণ।

 

যদিও দীর্ঘ শীতকাল ধরিয়া প্রত্যহই অন্তত কুড়ি জন করিয়া মেরুবাসী ভেগা জাহাজ দেখিতে আসিত, কিন্তু দুই তিনবার-মাত্র তাহারা অসদুপায়ে কিছু আত্মসাৎ করিবার অপরাধে ধরা পড়িয়াছিল এবং ঐ চৌর্য্যগুলিও অতিসামান্য প্রকারের।

 

চুক্‌চিস্‌গণ খর্ব্বকায় জাতি, যদিও তাহাদের মধ্যেও অতিকায় মানুষ দেখা যায়; যেমন আমরা একটি স্ত্রীলোককে দেখিয়াছিলাম, সে লম্বায় ছয় ফুট তিন ইঞ্চি। তাহাদের দেহের বর্ণ অনুজ্জ্বল পীত, পুরুষদের রঙ সাধারণত মেয়েদের চেয়ে আরো কিছু ঘোর। মাঝে মাঝে উত্তর য়ুরোপের অধিবাসীদিগের ন্যায় স্বচ্ছ ও গৌরবর্ণ দেখিতে পাওয়া যায়, বিশেষত স্ত্রীলোকদিগের মধ্যে।

 

২৭

 

তাহাদের চক্ষু কৃষ্ণবর্ণ এবং অনেক সময় চীনদেশীয়দিগের ন্যায় তির্য্যগ্‌ভাবে সন্নিবিষ্ট। তাহাদের কেশ অঙ্গারকৃষ্ণ; পুরুষেরা উহা খুব ছোটো করিয়া কাটিয়া রাখে; স্ত্রীলোকেরা উহা যথেচ্ছ বাড়িতে দেয় এবং কপালের মাঝখানে সিঁথি কাটিয়া বারো হইতে আঠারো ইঞ্চি লম্বা বিনানী রাখে, তাহা দুই কানের কাছ দিয়া ঝুলিয়া থাকে। মেরু-অধিবাসীদের প্রধান খাদ্য সীলের মাংস ও চর্ব্বি; তদুপরি যখন পক্ষী ভালুক ও বল্‌গা হরিণ পাওয়া যায় তখন তাহারও মাংস ব্যবহার করে। সমুদ্র-তীরজাত কোনো কোনো উদ্ভিদের মূল, উইলো গাছের পাতা প্রভৃতিও যথেষ্ট প্রচুর পরিমাণে তাহাদের খাদ্যশ্রেণীভুক্ত। পাতাগুলি গ্রীষ্মকালের শেষভাগে সংগ্রহ করা হয় এবং শীতকালে আহার করা হয়।

 

২৮

 

শীতকালে যখন অন্য খাদ্য শেষ হইয়া আসে, তখন গ্রীষ্মকালে যেসকল সীল ও সিন্ধুঘোটক ধরা হইয়াছিল তাহাদের অস্থি চূর্ণ করিয়া তাহার দ্বারা ঝোল প্রস্তুত হয়, উহা মানুষ ও কুকুর উভয়েই আহার করে। ঐ শেষোক্ত প্রাণী প্রতি গ্রামেই বহুসংখ্যায় বাস করে; চক্রহীন গাড়ীতে করিয়া স্বীয় প্রভুদিগকে এক স্থান হইতে অন্য স্থানে টানিয়া বেড়ানোর কার্য্যেই তাহাদিগকে প্রধানত নিয়োজিত করা হয়। এই কুকুরগুলি  বৃহদাকার না হইলেও অনায়াসে তিন-চারিটিতে মিলিয়া  একজন মানুষকে বহুদূরে বহন করিয়া লইয়া যাইতে পারে। কোনো চুক্‌চিস্‌ যখন তিন শত হইতে পাঁচ শত মাইল-ব্যাপী দীর্ঘভ্রমণে বাহির হয়, তখন অনেক সময়ে সে আপনার চক্রহীন যানে আঠারোটা পর্য্যন্ত কুকুর জুতিয়া লয়; উহাদের সাহায্যে সে দিনে সত্তর হইতে আশী মাইল পর্য্যন্ত পথ অতিক্রম করিতে পারে।

 

২৯

 

[ রোম-সেনাপতি মার্‌সেলাস তাঁহার বিরুদ্ধপক্ষের কার্থেজীয় সেনানায়ক হানিবালের সম্মুখে আহত-অবস্থায় শয়ান ]

 

হানিবাল। মার্‌সেলাস, ওহে মার্‌সেলাস! নড়িতেছেন না, ইনি মৃত। একবার ইঁহার আঙুলগুলি নড়াইলেন না কি? ফাঁক করিয়া দাঁড়াও, সৈন্যগণ-- চল্লিশ পা তফাতে-- উহাঁর কাছে বাতাস আসিতে দাও-- জল আনো-- চলা ক্ষান্ত করো; ঐ যে চওড়া পাতাগুলো এবং বাকি যাহা কিছু ব্রশউড গাছের তলায় গজাইয়াছে সমস্ত সংগ্রহ করিয়া আনো, উঁহার বর্ম্ম উন্মুক্ত করো। প্রথমে শিরস্ত্রাণ আল্‌গা করো-- উহাঁর বক্ষতল স্ফীত হইতেছে। আমার মনে হইল উঁহার চক্ষুদ্বয় আমার উপরে নিবদ্ধ হইয়াছিল, আবার উল্টাইয়া গেল। কে স্পর্দ্ধাপূর্ব্বক আমার স্কন্ধ স্পর্শ করিল? এই ঘোড়া? এ ঘোড়া নিশ্চয়ই মার্‌সেলাসের ছিল। কোনো লোক যেন উহার উপরে না চড়ে। হা, হা, রোমীয়রাও বিলাসে ডুবিয়াছে, এই যুদ্ধাশ্বের গায়ে সোনা দেখিতেছি!

 

গলীয় সৈন্যনায়ক। জঘন্য চোর! আমাদের রাজার স্বর্ণহার একটা পশুর দাঁতের তলায়! দেবতাদের প্রতিহিংসা অপবিত্রদিগকে আক্রমণ করিয়াছে।

 

৩০

 

হানিবাল ।  যখন রোমে প্রবেশ করিব তখন প্রতিহিংসার কথা বলিব এবং ধর্ম্মযাজকদের কাছে গিয়া পবিত্রতার কথা বলিব, যদি তাহারা আমাদের কথা শোনে। শল্যবৈদ্যের কাছে লোক পাঠাও। গভীরনিহিত হইলেও কুক্ষী হইতে এই তীর বাহির করা যাইতে পারিবে। সাইরাক্যুস-বিজয়ী আমার সম্মুখে পতিত। কার্থেজে একটা জাহাজ পাঠাইয়া দাও। বোলো, হানিবাল রোমের দ্বারে; মার্‌সেলাস, যিনি একলা উভয় পক্ষের মাঝখানে দাঁড়াইয়াছিলেন, তিনি পতিত। বীর বটে! আমার আনন্দ করা উচিত, কিন্তু পারিতেছি না। কী সম্ভ্রমজনক প্রশান্ত মুখশ্রী, কী মহিমান্বিত আকৃতি এবং প্রাংশুতা!

 

গলীয় সৈন্যনায়ক । আমার দল উঁহাকে মারিয়াছে, বস্তুত আমার বোধ হয় আমিই উঁহাকে মারিয়াছি। ঐ হারটি আমি দাবী করি, ইহা আমার রাজার -- গল্‌'এরগৌরবের জন্য ইহার প্রয়োজন। আর কেহ ইহা লইলে সে সহিবে না, বরঞ্চ সে তাহার শেষ মানুষটিকে পর্য্যন্ত খোয়াইবে -- এই আমরা শপথ করিতেছি, আমরা শপথ করিতেছি।

 

৩১

 

হানিবাল ।  বন্ধু মার্‌সেলাস আপন গৌরবের জন্য ইহা নিজে পরিধান করার প্রয়োজন বোধ করেন নাই। তোমাদের বীররাজার অস্ত্রগুলি যখন তিনি মন্দিরে টাঙাইয়াছিলেন তখন এই সামান্য গহনাটিকে তিনি নিজের এবং জুপিটরের অযোগ্য বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। যে ঢালটি তিনি ভাঙিয়াছেন, যে উরস্ত্রাণ তিনি তাঁহার তরবারির দ্বারা বিদ্ধ করিয়াছেন, তাহাই তিনি জনগণকে এবং দেবতাদিগকে দেখাইয়াছেন। এইটি তাঁহার ঘোড়াকে পরাইবার আগে তাঁহার স্ত্রী এবং তাঁহার শিশুসন্তানেরা দেখে নাই।

 

গলীয় নায়ক। আমার কথা শোনো হানিবাল!

 

হানিবাল। কী! যখন মার্‌সেলাস আমার সম্মুখে শয়ান, হয়তো যখন তাঁহার প্রাণ ফিরাইয়া আনা যাইতে পারে, হয়তো যখন আমি তাঁহাকে জয়গৌরবে কার্থেজে লইয়া যাইতে পারি, যখন ইটালি সিসিলি গ্রীস্‌ এসিয়া আমার শাসন মানিবার জন্য অপেক্ষা করিয়া! সন্তুষ্ট থাকো! আমার নিজের জিন লাগাম তোমাকে দিব, তাহার দাম ইহার দশটার সমান।

 

৩২

 

গলীয় নায়ক। আমারই জন্য?

 

হানিবাল। তোমারই জন্য।

 

গলীয় নায়ক। এই চুনি, পান্না এবং ঐ রক্তবর্ণ --

 

হানিবাল। হাঁ, হাঁ।

 

গলীয় নায়ক। হে মহামহিম হানিবাল! অপরাজেয় বীর! হে আমার সৌভাগ্যবান্‌ দেশ, এমনতরো সহায় এবং রক্ষক তুমি পাইয়াছ! আমি শপথ করিয়া অক্ষয় কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি -- হাঁ, এমন কৃতজ্ঞতা, প্রীতি, নিষ্ঠা, যাহা অসীমকালকেও অতিক্রম করে!

 

৩৩

 

প্রিয় --

 

তোমার চিঠি এইমাত্র পাইলাম এবং এত দিনে পাইয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলাম। চিঠির জন্য আমি বহুদিন ধরিয়া অপেক্ষা করিতেছিলাম, কিন্তু ইংলণ্ডে চিঠি আসিতে আজকাল যুগযুগান্তর লাগে। তুমি যে আমার স্ত্রী ও সন্তানদের খবর পাঠাইয়াছ, তাহাতে বড়ো সুখী হইলাম। ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হইয়াছে বলিয়া বোধ হইল এবং সেজন্য আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ; কিন্তু যদিও আমার স্ত্রীর শরীর অপেক্ষাকৃত একটু ভালো হইয়াছে, তবু তাহাতে আমি একটুও সন্তুষ্ট নই। ইংলণ্ডে ফিরিয়া না আসা পর্য্যন্ত তাঁর শরীর প্রকৃতপক্ষে ভালো হইবে না বলিয়া আশঙ্কা করি।

 

৩৪

 

তাঁর পক্ষে দরকার-- শান্তিময় গৃহের আরাম; কিন্তু এই যে যুদ্ধ এখনো চলিতেছে, তাহাতে কেবল ভগবানই জানেন সে সময় কখন আসিবে। তোমার নিজের শরীরের কথা তুমি কিছুই লেখ নাই। আমি একান্ত আশা করি গরমে তুমি অতিমাত্র ক্লিষ্ট হও নাই। গরমে যে কেমন করিয়া প্রাণ বাহির করিয়া দেয় এবং ভিজা ন্যাকড়াখানার মতো নেতাইয়া ফেলে, তাহা আমি জানি। এখানে আমি বড়ো একা-একা বোধ করিতেছি এবং আলাপ করিতে পারি আমার এমন অন্তরঙ্গ বন্ধু নাই। ভাবী আশাও অন্ধকারাবৃত। সেই সব-সুদ্ধ জড়াইয়া আমি বিশেষ প্রফুল্লতা অনুভব করিতেছি না। ভারতবর্ষে আমার শরীর যেমন ছিল তাহার চেয়ে অনেক ভালো হইলেও, আমার শরীর এখনও ভালো হয় নাই। ভালোবাসা জানিয়ো, আশা করি শীঘ্রই তোমার চিঠি পাইব।

 

তোমার স্নেহের--

 

৩৫

 

আমাদের পক্ষিশাবকরা ডিম্ব হইতে বাহির হইবার পর, অধিকাংশই প্রথম কয়েক সপ্তাহ কীট ছাড়া আর কিছুই খায় না এবং তাহাদের অনেকেই সারা জীবন কীটখাদক। শাবকেরা ভূরিভোজী এবং তাহাদের পিতামাতারা সমস্ত দিন তাহাদিগকে গড়ে প্রতি পাঁচ ছয় মিনিট অন্তর খাওয়াইয়া থাকে; এ দিকে দিবালোকের সূচনা হইতেই তাহাদের দিন সুরু হয় আর অন্ধকার না হওয়া পর্য্যন্ত তাহা শেষ হয় না। এই প্রত্যেক বারে বৃদ্ধ পাখীরা একটি হইতে বারোটি কীট লইয়া আসে, ইতিমধ্যে তাহারা নিজে যাহা খায় সেটাকে আমরা ইহার মধ্যে ধরিতেছি না। এইরূপে দেখা যাইবে একটিমাত্র পক্ষীপরিবার দিনে বহু শত কীট ভক্ষণ করে। বস্তুত সতর্ক পর্যবেক্ষণের সাহায্যে হিসাব করিয়া দেখা গেছে-- একটি পক্ষীপরিবার দিনে পাঁচ শত হইতে বারো শত কীট বিনাশ করে। ঠিক সেই কীটগুলি ছাড়াও অনেক পাখী রাশি রাশি কীটডিম্ব ধ্বংস করে, অনেক সময়েই তাহার পরিমাণ দিনে বহুসহস্র হইয়া থাকে।

 

৩৬

 

আমি অধিক দূর অগ্রসর হইতে না হইতেই সূর্য্য অস্ত গেল এবং গোধূলির আলোকে আমি দুইটি পশুকে বন হইতে বাহির হইয়া পথের উপর আমার এক শত গজ আন্দাজ সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইতে দেখিলাম। দ্বীপের ঐ অংশে যে বহুসংখ্যক বন্য মহিষ বাস করে, আমি প্রথমে অস্পষ্ট আলোকে এই দুইটিকে তাহাদেরই অপূর্ণ-বয়স্ক শাবক ভাবিয়াছিলাম। আমাকে যে পথ অতিক্রম করিয়া যাইতে হইবে তাহারই পার্শ্ববর্ত্তী একটি বৃহৎ বৃক্ষের অভিমুখে তাহারা মস্তক নত করিয়া অগ্রসর হইল এবং সেইখানে গাছের শিকড়ের চারি ধারে ঘ্রাণ করিয়া বেড়াইতে লাগিল। আমি এখন তাহাদের যথেষ্ট নিকটবর্ত্তী হওয়াতে দেখিতে পাইলাম যে, তাহারা অতি বৃহদাকার ভল্লুক। পার্শ্বে সরিয়া যাওয়া অসম্ভব ছিল, কারণ বনটি মহিষকণ্টক নামে খ্যাত একপ্রকার অতিদীর্ঘ কন্টক পূর্ণ হওয়াতে মনুষ্যের দুর্ভেদ্য ছিল। ফিরিয়া যাওয়ার কথা একবারও আমার মনে আসে নাই, বাস্তবপক্ষে আমার চিন্তা করিবার সময়ই ছিল না, কারণ, আমি এক্ষণে তাহাদের ত্রিশ পদের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিলাম।

 

৩৭

 

তাহারা মস্তক উত্তোলন করিল এবং একটি হ্রস্ব গর্জ্জনে আপনাদের ক্রেধের পরিচয় দিল, উহার পরিবর্ত্তে আমি তাহাদের দিকে ধাবিত হইয়া উহাদের তিন গজের মধ্যে গিয়া পড়িলাম; তাহারা তবুও সরিয়া যাইবার কোন লক্ষণ প্রকাশ করিল না; তাহারা আমার দিকে অগ্রসর হইয়া আসিল। আমি তাহাদের দিকেই মুখ করিয়া এমন আড়ভাবে ঘুরিয়া চলিলাম, যাহাতে তাহাদের যে পার্শ্ব দিয়া আমাকে পথ অনুসরণ করিতে হইবে সেই দিকে পৌঁছিতে পারি। এমন সময়ে তাহারা আমার দিকে এক লম্ফ প্রদান করিল, আমি তাহাদের অভিমুখেই মুখ করিয়া পশ্চাতে লম্ফ দিয়া রক্ষা পাইলাম; ঐরূপে তাহারা পুনশ্চ একবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হইল; কিন্তু দেখিলাম তৃতীয় বারই আমার শেষবার হইবে।

 

৩৮

 

আমার এইটুকু কেবল মনে আছে যে, আমি গর্জ্জন ও আর্ত্তনাদের মাঝামঝি একটি ভীতধ্বনি করিয়াছিলাম এবং যখন পুরোবর্ত্তী প্রাণীটি আমার অভিমুখে উত্থিত হইল তখন আমার হাতে একটিমাত্র যে জিনিষ ছিল সেই ব্রাণ্ডির বোতলটি লইয়া আমার দেহের সমস্ত শক্তি দিয়া তাহার নাক ও দাঁতের উপর মারিলাম। বলা বাহুল্য, বোতলটি চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া ভাঙিয়া গেল এবং তাহার নাকের উপরে সেই আঘাতটিই হউক, অথবা চক্ষে ও মুখে ব্রাণ্ডি প্রবিষ্ট হইয়া তাহাকে বিস্মিত করিয়া দিল তাহাই হউক, অথবা এক সঙ্গে এই দুইটাতে মিলিয়াই হউক, তাহাকে ঘুরাইয়া দূরীভূত করিয়া দিল এবং তাহার সঙ্গী তাহার অনুসরণ করিল। বলিতে পারি, এই সমস্ত ব্যাপার এক মিনিটও সময় লয় নাই। উহার মধ্যে আমি একবারও উপস্থিত-বুদ্ধি হারাই নাই; বোধ হয় সময়ের অল্পতাই তাহার হেতু।

 

৩৯

 

আমাদের এখানে য়ুরোপ হইতে যেসকল আগন্তুক সব প্রথমে আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে স্পেনদেশীয় কন্সলবিভাগীয় কর্ম্মচারী Adolfo Rivadeneyra একজন। ইনি পারস্য দেশের ভিতর দিয়া ভ্রমণ করিতেছিলেন এবং জেরুজিলেমের কন্সল ছিলেন। তিনি আরবী ভাষা উত্তমরূপেই বলিতে পারিতেন; তিনি অত্যন্ত শ্যামবর্ণ ছিলেন এবং সহজেই আপনাকে আরব বলিয়া চালাইয়া দিতে পারিতেন। আমি যত মানুষ দেখিয়াছি তাহার মধ্যে নিকোলাস সম্ভবত সর্ব্বাপেক্ষা কুৎসিত, এই কথা আমি কয়েক মিনিট আগে বলিয়াছিলাম। রিভাডিনেইরা এই বিষয়ে প্রায় তাঁহার কাছ ঘেঁষিয়া গিয়াছিলেন। একদিন, সন্ধ্যাবেলায় আমাদের ভারী মজা লাগিল; দেখিলাম যে তিনি এবং নিকোলাস হাত ধরাধরি করিয়া আমাদের বসিবার ঘরে প্রবেশ করিলেন ও Madame Krebel-নাম্নী এক রুশীয় সেক্রেটারির পত্নীর সম্মুখে নতজানু হইয়া, তাঁহাদের উভয়ের মধ্যে কে বেশি কুৎসিত তাহাই স্থির করিয়া দিতে অনুরোধ করিলেন। মহিলাটি প্রস্তাব করিলেন যে, তাঁহারা উভয়েই এক সঙ্গে নিকটতম দর্পণের নিকটে দরখাস্ত পেশ করুন।

 

৪০

 

কয়েক বৎসর পূর্ব্বে  Carl Schol।তাঁহার পরিবারবর্গকে চিকাগোতে সরাইয়া আনেন, তৎপূর্ব্বে তিনি পশ্চিম ভার্জ্জিনিয়াতে বাস করিতেন। তাঁহারা বাষ্পদ্বারা উত্তাপিত একটি কক্ষ লইয়াছিলেন। প্রথম কয়েক বৎসর তিনি লক্ষ্য করিয়া দেখিলেন যে শীতের সময় সর্ব্বদাই সর্দ্দিকাশিতে তাঁহার স্ত্রী ও কন্যা ভুগিয়া হয়রান হইতেছে। ইহাও দেখিলেন যে, অন্যপ্রকার আবহাওয়ার মধ্যে তাঁহার যেসকল আসবাব মজবুত এবং শক্ত ছিল, তাহা টুক্‌রা টুক্‌রা হইয়া পড়িতেছে। বৈজ্ঞানিক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন বলিয়া তিনি স্থির করিলেন যে, এই দুই প্রাকৃতিক ঘটনার মূল কারণ একই। তাঁহার বিশ্বাস হইল যে, তাঁহার কক্ষের বাতাস শীতের সময় অতিরিক্ত শুষ্ক থাকে। তিনি তাঁহার তাপসঞ্চার-যন্ত্রের পশ্চাতে কয়েকটি জলপূর্ণ তাম্রপাত্র জুড়িয়া দিলেন। তিনি শীঘ্রই আবিষ্কার করিলেন যে, প্রতিদিন প্রতিঘরে বাতাস এক কোয়ার্টের অধিক জল শোষণ করে। তিনি ইহাও লক্ষ্য করিলেন যে, বাড়িটির উত্তাপ আরামের ব্যাঘাতজনক হইয়া উঠিল এবং সর্দ্দিকাশির প্রবণতা দূর হইল।

 

৪১

 

স্বাস্থ্যবান্‌ থাকিতে হইলে, বাসকক্ষে প্রতি ঘন্টায় বায়ুর পরিবর্ত্তন আবশ্যক। বাতাসটা তো কোনো জায়গা হইতে আসা চাই'ই। স্বভাবতই ইহা বাহির হইতে পাওয়া যায়; অতএব বাসার মধ্যে ইহা ঠাণ্ডা শুষ্ক অবস্থায় প্রবেশ করে। যদি তাজা বাতাস প্রবেশ করে, তবে বাসি হাওয়াকে বাহির হইয়া যাইতে হয়। এই হাওয়া গরম এবং আর্দ্র হইয়া যায়। প্রথমে ইহা ঘরের বাতাসের সমস্ত আর্দ্রতা গ্রহণ করে। ইহাও যথেষ্ট নহে, পরে ইহা আমাদের চর্ম্মকে আক্রমণ করে। তখন আমাদের চর্ম্ম হইতে ভাপ উঠিতেছে বোধ করি। তখন আমরা বলি, আমাদের শীত লাগিতেছে। তৎক্ষণাৎ আমরা আরও বেশি উত্তাপ চাই। কাজেই আমরা বড়ো করিয়া আগুন জ্বালাই। বাতাসকে আমাদের চর্ম্ম হইতে জলপান করিতে না দিয়া যদি জলপাত্র হইতে দিই, তবে অবিকল একই ফল পাওয়া যায়।

 

৪২

 

আর মাস কয়েকের মধ্যেই টিনের পাত্রে রক্ষিত তিমিমাংস ইংলণ্ডের বাজারে উঠিবে। যেমন করিয়া স্যামন মাছ সংরক্ষণ করা হয়, ঠিক তেমনি করিয়া ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কীউকাউট দ্বীপে এই প্রকাণ্ড সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী জন্তুর মাংস টিনে ভরা হইতেছে। এই একটিমাত্র কারখানা হইতে আগামী মরসুমের সময় ত্রিশ হাজার বাক্স মাল প্রস্তুত হইবে; ইহার প্রত্যেকটিতে তিমিমাংসের এক পাউণ্ড টিন চব্বিশটি করিয়া থাকিবে। এই টিনে রক্ষিত তিমিমাংসের বড়ো এক অংশ শরৎকাল নাগাইদ এ দেশে আসিয়া পৌঁছিবে এরূপ আশা আছে। ক্যানেডা এবং ইউনাইটেড ষ্টেট্‌স্‌ এই উভয় দেশেই আজ এই অতিকায় জন্তুর মাংস লোকে নিয়মিতভাবে আহার করিতেছে।

 

৪৩

 

এইখানে একটি কথা মনে রাখিতে হইবে যে, তিমি মৎস্যই নহে, উষ্ণশোণিত জীব। সে নির্ম্মলখাদ্য-ভোজী। কাঁকড়া, গলদাচিংড়ী, বাইন প্রভৃতি যাহা সাধারণতঃ আমরা পছন্দ করিয়া থাকি, তাহার সম্বন্ধে কিন্তু এ কথা বলা চলে না। ইহার মাংস স্বাদু এবং ক্ষুধাবর্দ্ধক দুইই। আমরা খাবার জিনিষের মতোই যে কেবল তিমির ব্যবহার করিতেছি তাহা নহে, উহার ত্বক্‌কে খুব মজবুত চামড়ায় পরিণত করা যাইতে পারে, ইহাও আবিষ্কার করা হইয়াছে। একটিমাত্র তিমি হইতে, তিন হইতে চারি হাজার বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়।

 

৪৪

 

আমি এইমাত্র তোমার নিকট হইতে একখানি দীর্ঘ ও চিত্তগ্রাহী পত্র পাইলাম এবং অবিলম্বে তাহার উত্তর দিতে বসিয়াছি। দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকার পর G-- এখানে ফিরিয়া আসিয়াছেন। তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ লইবার জন্য J-তে গিয়াছিলেন। স্থানপরিবর্ত্তনের কারণে তিনি অনেক সুস্থ হইয়াছেন, কিন্তু ভারতবর্ষে যে ভয়ানক ম্যালেরিয়া জ্বরে তাঁহাকে অমন শয্যাগত করিয়া ফেলিয়াছিল, তাহার পরিণাম-ফল হইতে তাঁহাকে কখনও যথার্থরূপে মুক্ত বলিয়া বোধ হয় না। আমি তোমার কথা প্রায়ই চিন্তা করি, এবং B-তে তোমার জীবনযাত্রা কিরূপ, সেই বিষয়ে আরও অধিক কিছু জানিতে ও শুনিতে ইচ্ছা করি।

 

৪৫

 

৪ঠা এপ্রিল তারিখে K-- রণক্ষেত্রের পুরঃসীমায় মহাযুদ্ধে নিযুক্ত ছিলেন। আজ ২৬শে জুন, কিন্তু আমি ঐ পূর্ব্বের তারিখের পর আর কোনো সংবাদ পাই নাই। বহির্জ্জগৎ হইতে এমন সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হইয়া বাস করা অতিশয় পীড়াদায়ক। মাসে বারেকমাত্র-যাতায়াতকারী একটি পালের তরণী ভিন্ন বাহিরের সঙ্গে যোগরক্ষার আমাদের আর কোনো উপায় নাই, উহাও এই যুদ্ধের সময় প্রায়ই অত্যন্ত দেরিতে আসে। ইহা নিদারুণ উদ্‌বেগের সময়। W-- এবং H--ও ফ্রান্সে আছেন বলিয়াই বোধ করি। সংবাদপত্রের মারফতে আমি সর্ব্বশেষ যে সংবাদ পাইয়াছি তাহা ২রা জুনের; অবস্থা তখন অত্যন্তই আশঙ্কাজনক দেখাইতেছিল।

 

৪৬

 

বোধ করি তুমি জান যে, W-- টাইগ্রিস্‌ তীরে হত হইয়াছেন এবং G-- হাঁসপাতালে আছেন। তিনি ও E-- একজন নৌবায়ুরথী সৈনিক হইয়াছেন। তিনিও হাঁসপাতালে। তিনি সমুদ্রে পড়িয়া গিয়াছিলেন এবং অনেক ঘন্টা ধরিয়া তাঁহাকে তোলা হয় নাই। কবে যে এই সকলের অবসান হইবে!

 

-- তোমাকে তাঁহার ভালোবাসা জানাইবার জন্য আমাকে অনুরোধ করিতেছেন। আজ সকালে ডাক লওয়া বন্ধ হইবে এবং তিনি স্বয়ং পত্র না লিখিয়া আমাকেই লিখিতে অনুরোধ করিয়াছেন। ঠিক এখনই তাঁহার সময়ের অত্যন্ত টানাটানি।

 

৪৭

 

কুব্লেই খাঁর অধীনে মোগলগণ যখন সেই পূর্ব্বতন গৌরবান্বিত এবং প্রতাপশালী সুং-বংশকে নিয়তই অধিকারচ্যুত করিয়া চীন সাম্রাজ্যকে বিদেশী শাসনের অধীন করিতেছিল, তখন ত্রয়োদশ শতাব্দী শেষ হইতেছে। দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা ঘটিয়া অবশেষে সুংদিগের প্রায় সৈন্যদলও খণ্ড-বিখণ্ড হইয়া গেল এবং সেই বিখ্যাত রাষ্ট্রনীতিবিদ্‌ এবং প্রধান সেনাপতি ইয়ান টীয়েন শিয়াঙ্গ মোগলদের হস্তে পতিত হইলেন। আত্মসমপর্ণের নিয়মপত্র লিখিবার এবং সে সম্বন্ধে স্বদলকে পরামর্শ দিবার জন্য তাঁহাকে আদেশ করা হইল, কিন্তু তিনি আদেশ পালন করিতে অস্বীকার করিলেন। বিজয়ীদিগের নিকট তাঁহাকে নিষ্ঠা স্বীকার করাইবার জন্য পরে যথাসম্ভব চেষ্টা করা হইয়াছিল। তাঁহাকে তিনবৎসর কারগারে রাখা হয়।

 

৪৮

 

তিনি লিখিয়াছিলেন-- "আমার কারাগার কেবলমাত্র আলেয়া-দ্বারা আলোকিত; যে তিমিরাবৃত নির্জ্জনতায় আমি বাস করি, বসন্তের নিশ্বাস তাহাকে একবারও নন্দিত করে না। শিশির ও কুয়াসার মধ্যে খোলা পড়িয়া থাকিয়া আমার অনেক সময় মরিতে ইচ্ছা হইয়াছে, কিন্তু দুইটি আবর্ত্তমান বৎসরের সকল কয়টি ঋতু ধরিয়া ব্যাধি বৃথাই আমার চারি দিকে ঘুরিয়া বেড়াইল। ঐ আর্দ্র অস্বাস্থ্যকর ভূমি আমার কাছে স্বর্গই হইয়া উঠিল; কারণ আমার মধ্যে এমন কিছু ছিল যাহা দুর্ভাগ্য কখনও অপহরণ করিতে পারিত না। সেই জন্য আমি আমার মাথার উপরে ভাসমান শ্বেতবর্ণ মেঘের দিকে তাকাইয়া এবং আকাশেরই মতো অসম দুঃখভার হৃদয়ে বহন করিয়া দৃঢ় হইয়া রহিলাম।"

 

৪৯

 

অবশেষে তিনি কুব্লেই খাঁর সম্মুখে আহূত হইলে কুব্লেই খাঁ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি চাও কী?" তিনি উত্তর দিলেন, "শ্রীল শ্রীযুক্ত সুং সম্রাটের অনুগ্রহে আমি তাঁহার মন্ত্রী হইয়াছিলাম। আমি দুই প্রভুর সেবা করিতে পারিব না; আমি কেবল মৃত্যু ভিক্ষা করি।" তদনুসারে তাঁহার প্রাণদণ্ড হইল। পুরাতন রাজধানীর অভিমুখে নমস্কার করিয়া তিনি অবিচলিত-ভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করিলেন। তাঁহার শেষ কথা-- "আমার কাজ সমাপ্ত হইয়াছে।"

 

৫০

 

জ্বরে শরীর যে পরিমাণ জল চায়, এমন আর কখনও চায় না। ইহার অনেক কারণ আছে। একটা আংশিক কারণ এই যে, ঘামের দ্বারা অনেক বেশি ক্ষয় হইতে থাকে বলিয়া অনেক বেশি জলের দরকার হয়; আর একটি কারণ এই যে, জ্বরে শরীর বিষাক্ত হইতে থাকে এবং জল সেই বিষকে পাতলা করিয়া দেয়। সুরাসার পান করার পরে জল পান করিবার প্রয়োজন ঠিক অনুরূপ কারণেই ঘটিয়া থাকে। জ্বরে জিহ্বা মুখ এবং কণ্ঠ শুকাইয়া যায়; তাহার কারণ এই যে, বিষ যেখানে মর্ম্মস্থানগুলিকে আক্রমণ করে সেখানে তাহাকে গুলিয়া পাতলা করার জন্য প্রাপ্তিযোগ্য সমস্ত জলের প্রয়োজন ঘটে। জ্বরের সময়ে রোগী জল চায়, তাহার আর একটা কারণ এই যে, তখন সে গরম হইয়া উঠে এবং ঠাণ্ডা জলের সংযোগে তাহার দেহতাপ কমিয়া যায়। ভিতরে যে বিষ আছে জল কেবল যে তাহাকে পাতলা করে তাহা নহে, তাহা দূর করিয়াও দেয়।

 

৫১

 

এইরূপ কথিত আছে যে, ফ্রান্সে প্রথম পারস্যদেশীয় দৌত্য প্রেরিত হয়, তখন একদিন বয়সের এবং রূপবত্তার নানা অবস্থায় বিরাজিত ফরাসী মহিলাবৃন্দ-দ্বারা তাঁহার ঘর পূর্ণ দেখিয়া, রাজদূত আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া যান। ইহার অর্থ জিজ্ঞাসা করিলে তাঁহাকে বলা হইল যে, অজ্ঞাতপ্রায় দেশের প্রতিনিধিকে দেখিবার জন্য কৌতূহলী হইয়া তাঁহারা আসিয়াছেন। আরও এরূপ গল্প শুনা যায় যে মহামান্য মন্ত্রী তাঁহাদের কাহারও সহিত কথা বলিলেন না, তাঁহাদের প্রত্যেককে দেখিয়া দেখিয়া ঘরের চারি দিকে বেড়াইতে লাগিলেন ও তাঁহার সহচর দোভাষীর নিকটে মন্তব্য প্রকাশ করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। একটি বর্ষীয়সী ও অতিভূষিতা মহিলা নিজেকে অতিপ্রকট করিয়াছিলেন; তিনি দোভাষীকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, মন্ত্রী কী বলিলেন। তিনি উত্তর দিলেন, "মহামাননীয় কেবল আপনাদের কাহার সৌন্দর্য্যের কত মূল্য, তাহাই নির্দ্ধারণ করিয়া দিলেন।" সেই মহিলা একজনকে নির্দ্দেশ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "ভালো, ঐ যুবতীর সম্বন্ধে তিনি কী বলিলেন?"

 

৫২

 

মন্ত্রী বলিলেন, "উনি পাঁচ হাজার ক্রাউনের যোগ্য।"

 

আর একজনকে দেখাইয়া মহিলাটি জিজ্ঞাসা করিলেন, "আর ইনি?"

 

"দুই হাজার।"

 

"আর ঐ যে উনি?"

 

মন্ত্রী বলিলেন, "উঁহার জন্য তিনি আটশত ক্রাউন দিতে পারেন।"

 

"আর আমার সম্বন্ধে তিনি কী বলিলেন?"-- দোভাষী ইতস্তত করিতে লাগিলেন, কিন্তু উত্তর দিবার জন্য পীড়াপীড়ি করাতে বলিলেন যে, তিনি কিছু বলিতে পারেন না। সেই মহিলা জেদ করিয়া বলিতে লাগিলেন, "কিন্তু আমি জানি যে তিনি কিছু বলিয়াছেন।" দোভাষী অবশেষে হয়রান হইয়া হঠাৎ বলিয়া ফেলিলেন, "সত্য কথা বলিতে কী, মহামান্য মন্ত্রী আপনার নিকটে যখন আসিলেন তখন বলিলেন যে, এ দেশের আধপয়সা পাইপয়সা প্রভৃতি তাঁহার জানা নাই।"

 

৫৩

 

উত্তর মেরুপ্রদেশে প্রথম আগমনে যে ছবি মনে মুদ্রিত হয় তাহা স্মৃতিপথে অনেক কাল লাগিয়া থাকে। কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া হয়ত তুমি সমুদ্রের মাঝখানে এক দিক হইতে অন্য দিকে ভাসিয়া বেড়াইতেছ; ক্রমশ জাহাজ শান্ততর জলরাশির মধ্যে আসিয়া পৌঁছিল। কিছু দিন ধরিয়া যে কুয়াসা জাহাজের কয়েক গজ মাত্র দূরের সমস্ত দৃশ্য অস্পষ্ট করিয়া রাখিয়াছিল তাহা পরিষ্কার হইয়া গেল, ডাঙার উপরকার ঝাপসাভাব (land haze) দেখা গেল, সূর্য্য সীসকবর্ণ আকাশ হইতে বাহির হইয়া আসিল।

 

৫৪

 

একখণ্ড বরফ জাহাজের পার্শ্বদেশ ঘর্ষণ করিল এবং এক মাইল দূরে সমুদ্রের মধ্যে দোলায়িত একটি সাদা জিনিষের প্রতি তোমার মনোযোগ আকৃষ্ট হইল। ইহাই প্রথম ভাসমান তুষারপর্ব্বত। তুমি আরো নিকটে আসিলে তুষারগিরি-সকল এত বহুসংখ্যক হইল যে, অসুখজনক হইয়া উঠিল; শীতলজলতল হইতে কৌতূহলী সীলগুলি তাহাদের মাথা উপরে তুলিতেছে। একটা সাদা তিমি বা ছোটো একঝাঁক নর্‌হ্বল তিমি গুরুশ্বাস ফেলিয়া জাহাজের চারি দিকে বেড়াইতেছে।

 

৫৫

 

-- তাহার পীড়িত ভ্রাতা চার্ল্‌সের সেবা করিতেছিল, ঐ ভাইটি পরে মারা গিয়াছে, ঐ ঘটনা আমাকে অত্যন্তই ব্যথিত করিয়াছে। S-- অপেক্ষা চার্লি ছোটো ছিল, সে অতি মনোহরস্বভাবের যুবক ছিল। সে আমার পিতার নিকট কাজ করিত, দুই বৎসর ধরিয়াই কাজ করিয়াছে। যতগুলিকে আমি জানি তাহাদের মধ্যে সেই"ই অল্পবয়স্ক গ্রাম্য কৃষিমজুরের সর্ব্বোৎকৃষ্ট নমুনা। তুমি তাহাকে দেখিলে ভালোবাসিতে। সে তোমারই একটি কবিতার মতো ছিল। বিপুল শারীরিক বল, প্রফুল্লতা ও সন্তোষ, সর্ব্বজনীন মঙ্গলেচ্ছা এবং নিঃশব্দ পুরুষোচিত ব্যবহারে ঐ যুবকের তুলনা মেলা দুষ্কর ছিল। একটা বৃদ্ধ চিকিৎসক তাহাকে হত্যা করিল। তাহার টাইফয়েড জ্বর হইয়াছিল, কিন্তু ঐ বৃদ্ধ নির্ব্বোধ দুইবার তাহার রক্তমোক্ষণ করিল।

 

৫৬

 

জ্বরাবসান অতিক্রম করিয়াও বাঁচিয়া ছিল, কিন্তু আপদ কাটাইয়া উঠিবার মতো শক্তি তাহার ছিল না। সকালবেলা S-- যখন দাঁড়াইয়া ছিল চার্লি তখন দুই বাহুদ্বারা S-- এর কণ্ঠালিঙ্গন করিয়া, তাহার মুখ টানিয়া নামাইয়া চুম্বন করিল। S-- বলে সে তখনই জানিতে পারিল যে, শেষাবস্থা নিকটে। S-- শেষ পর্য্যন্ত দিবারাত্রি তাহার সঙ্গে লাগিয়া ছিল। সে তোমার ধরণের মানুষ ছিল বলিয়া আমি এত করিয়া তোমাকে তাহার কথা লিখিলাম। তাহার সহিত তোমার যদি পরিচয় হইত, আমি সুখী হইতাম। তাহার মধ্যে শিশুর মাধুর্য্য এবং তরুণ বাইকিঙের সাহস শক্তি এবং সদাতৎপরভাব ছিল। তাহার পিতামাতা দরিদ্র। অধিক কাজের তাড়া পড়িলে তাহার মাতাও স্বামীর সহিত ক্ষেত্রে কাজ করেন।

 

৫৭

 

সেদিন অপরাহ্নে ভারী গরম ছিল; আর জাহাজ তখন কেপ্‌টাউনের প্রায় ১৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে। ছায়াতেই উত্তাপ তখন ১০৫ ডিগ্রী, আকাশ তাম্রবর্ণ, সাগর ফুটন্ত তেলের মতো। হঠাৎ আমি ডেকের উপর হইতে একটা বিকট চীৎকার শুনিতে পাইলাম এবং দেখিলাম আতঙ্কগ্রস্ত কাফ্রিরা ছুটিয়া পালাইবার চেষ্টা করিতেছে।  জাহাজের তটান্তিক ভাগের উপর দিয়া তাকাইয়া আমি এমন একটি জীবকে দেখিতে পাইলাম যাহার চেয়ে বিকটমূর্ত্তি জলচর বা স্থলচর প্রাণী কল্পনা করার সম্ভাবনামাত্র নাই। যদি আমি শান্তভাবে এমন কথা বলি যে, ঐ যে জীবটিকে দেখিয়াই প্রাচীনকালের বর্ণিত সমুদ্রের সর্প বলিয়া বুঝিয়াছিলাম তাহার মাথাটা একটা বড়ো আয়তনের পিপার মতো, তবে মনে করিয়ো না আমি অত্যুক্তি করিতেছি।

 

৫৮

 

ঐ সামুদ্রিক সর্পের মাথাটা ছিল জলের উপরিতল ছাড়িয়া প্রায় আধ ফুট উঁচু এবং তাহার সব চেয়ে চওড়া অংশে এক ধার হইতে আর এক ধার পর্য্যন্ত প্রায় তিন ফুট। শক্ত লোমওয়ালা কাঁটা-সকল তাহার মুখ আবৃত করিয়া কোণাকুণি ভাবে বাহির হইয়াছে এবং তাহার বড়ো বড়ো গোল চোখ জাহাজটার দিকে কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টিতে এবং তিরস্কারসূচক-ভাবে তাকাইয়া আছে, জাহাজের চাকার শব্দ যেন তাহার বৈকালিক নিদ্রার ব্যাঘাত করিয়াছে। তাহার স্কন্ধটা বেড়ে বারো ইঞ্চির বেশি হইবে না। দৈর্ঘ্যে সেই সামুদ্রিক সাপটি কতখানি ছিল, তাহা আমি ঠিক বলিতে পারি না, তবে তাহার নড়াচড়ার জন্য যে হিল্লোলের সৃষ্টি হয়, তাহার শেষ হিল্লোলটি হইতে আন্দাজ করিলে বোধ হয় সে একশত পঞ্চাশ ফুটের কাছাকাছি হইবে।

 

৫৯

 

কাপ্তেন Van Den Woof অত্যন্ত উত্তেজিতভাবে জাহাজের সেতুর উপরে দাঁড়াইয়া তাঁহার দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা সেই সামুদ্রিক অতিকায় জীবটি দেখিতে লাগিলেন। তিনি চীৎকার করিয়া বলিলেন, এই সর্পের খবরই ডেনমার্ক্‌ দেশীয় একটি ছোটো জাহাজের বৃদ্ধ কাপ্তেন জ্যান্‌সেন তিন মাস আগে কেপ্‌টাউনে দিয়াছিলেন; লোকে তখন বলিল, তিনি পাগল। তখন যাহার পাহারার পালা সেই কর্ম্মচারীকে কাপ্তেন আদেশ দিলেন যে, সাবধানে ঐ জাহাজ সর্পের চারি দিকে ঘুরাইয়া লওয়া হউক এবং অনাবশ্যক বিপদের মুখে না ছুটিয়া গিয়া তাহার যত কাছে যাইতে পারা যায় তাহাই হউক।

 

৬০

 

জাহাজ পাঁচ বার সেই সামুদ্রিক অতিকায়ের চারি পাশ ঘুরিয়া আসিল; সাপটা ধীরে ধীরে আপনার বিশাল মাথা ফিরাইয়া জাহাজটার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল, যেন সে আমাদের সঙ্গে কথা বলিতে এবং তাহার পৃথিবীভ্রমণের কাহিনী বর্ণনা করিতে চায়। জাহাজে কাহারো ফোটোগ্রাফের যন্ত্র ছিল না; কাজেই সামুদ্রিক সর্পের ছবি তুলিবার সর্ব্বোৎকৃষ্ট সুযোগটা নষ্ট হইল।

 

৬১

 

প্রিয়--

 

লণ্ডন কিংবা পারিসের তুলনায় রোমের সাধারণ অবস্থা কী তাহার একটা আভাস পাইলে তুমি আনন্দিত হইবে, আমি জানি; কিন্তু তাহা দিতে পারা কী করিয়া আমার পক্ষে সম্ভবপর? আমি তোমাকে ইমারতগুলির কথা বলিতে পারি কারণ সেগুলি আমি দেখি-- কিন্তু মানুষের কথা সম্পূর্ণ আলাদা, কেন না প্রকৃতপক্ষে তাহাদের আমি দেখি না-- অর্থাৎ আমি বাহ্য আকৃতি মাত্রই দেখি, এবং জীবনপথে যতই অগ্রসর হইতে থাকি ততই এই বাহ্য আকৃতি হইতে মত গড়িয়া তোলা সম্বন্ধে আমরা সতর্ক হইতে শিখি। যাহা আমার সামনে আসে তাহাই আমি বর্ণনা করিব; কিন্তু তোমার উপরে ভার রহিল তাহা হইতে আপনার সিদ্ধান্ত আপনি করিয়া লইবে।

 

৬২

 

প্রথমেই ভিক্ষুকেরা আমার চোখে পড়ে; আমি যতটা চিত্র করিতে পারি বা তুমি যতটা কল্পনা করিতে পার ইহারা তদপেক্ষাও হীন এবং রুগ্নাকৃতি। তাহারা রাস্তায় রাস্তায় সর্ব্বদা ঘুরিয়া বেড়ায়,দ্বারে দ্বারে উত্ত্যক্ত করে এবং গাড়ীর চারি দিকে ভিড় করিয়া দাঁড়ায়; ইহাতে বিস্মিত হইবার কথা নাই, কেননা রোমে ভিক্ষাবৃত্তি একটা উপজীবিকা। ভিক্ষুকেরা বিশেষ কয়েকটি আড্ডা অধিকার করিবার অনুমতির জন্য গবর্ণমেন্ট্‌কে টাকা দেয়! Piazza Di Spagna হইতে Trinita পর্য্যন্ত যাইবার জন্য যে সোপান উঠিয়াছে, তাহার সর্ব্বোচ্চ পৈঁঠায় দাঁড়াইবার স্থলের জন্য আনসসষটাকা দিয়া থাকে। কোনো একজন শ্রমশীল শিল্পী কারিগর যেমন তাহার দোকান ও আয়-সম্বন্ধে গর্ব্ব করিতে পারে, নিজের স্থান ও লভ্য-সম্বন্ধে ইহারাও সেইরূপ গর্ব্ব করে।

 

৬৩

 

সেদিন এক ভদ্রলোক-সম্বন্ধে আমি এক গল্প শুনিয়াছি; তিনি কিছুকাল রোমে থাকিবার পরে একজন ইটালীয় ভৃত্য ভাড়া করিলেন; সে খুব ভদ্র ও কার্য্যদক্ষ। তাহার মনিব যখন নগর ছাড়িয়া চলিয়া গেলেন, কেবল তখনই লোকটি তাহার সে চাকরী পরিত্যাগ করিল। কিছুকাল পরে ভদ্রলোকটি রোমে ফিরিয়া আসিলেন এবং দেখিলেন তাঁহার সেই পূর্ব্বতন ভৃত্য পথে পথে ভিক্ষা করিতেছে। ইহা তাঁহার কাছে শোচনীয় হীনতা বলিয়া মনে হইল এবং আনুকূল্যযোগ্য ব্যক্তিকে সাহায্য করিতে ইচ্ছুক হইয়া তিনি তাহার পদ পুনর্‌গ্রহণ করিতে লোকটির নিকট প্রস্তাব করিলেন এবং সেইরূপ চুক্তি হইল। ভৃত্যটি তাহার কার্য্যে ফিরিয়া আসিয়া বেশ ভালো ব্যবহারই করিতে লাগিল। কিন্তু অল্পকালের অভিজ্ঞতার পরে সে তাহার প্রভুর কাছে আসিয়া বলিল যে, তাহার প্রতি মনিবের অনুগ্রহের জন্য সে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এবং এই স্থানে সে বেশ স্বচ্ছন্দেও আছে, কিন্তু সে বুঝিতে পারিয়াছে যে, ঐখানে থাকা তাহার পোষাইবে না; ভিক্ষা করার মতো ইহা লাভজনক নহে এবং সেই জন্য সে চলিয়া যাইতে ইচ্ছা করে।

 

৬৪

 

প্রায় একটার সময় জনতা দুর্দ্দমনীয় হইয়া উঠিল এবং দোকানসকল লুণ্ঠন ও পথিকদিগকে পীড়ন করিতে লাগিল। পুলিসদলের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হইয়াছিল এবং প্রায় সকল পুলিস কর্ম্মচারীই সামান্য-পুলিস ও অস্ত্রধারী-পুলিসের সহিত রাস্তায় রাস্তায় টহল দিয়া ফিরিতে লাগিল। দাঙ্গাকারীরা তখন পুলিসের উপর লোষ্ট্রখণ্ড নিক্ষেপ করিতে লাগিল, পরন্তু পুলিস বিশেষ কৌশল ও ধৈর্য্য প্রদর্শন করিয়াছিল বলিয়া রক্তপাত বাঁচিয়া গিয়াছিল। এক সময় দাঙ্গাকারিগণ পুলিসের দিকে অগ্রসর হইল এবং লাঠি ঘুরাইয়া বহু লোককে আঘাত করিল। সৈনিকগণ তখন পুলিসের সাহায্যার্থে আসিয়া নানা চতুষ্পথে স্থান গ্রহণ করিল। দুর্ভাগ্যবশত ইহাও ঈপ্সিত ফল-উৎপাদনে ব্যর্থ হইল। জনতার লোকে পুলিসকে ইষ্টকখণ্ড ছুঁড়িয়া মারিতে লাগিল এবং আক্রমণের ভয় দেখাইল।

 

৬৫

 

২০শে হইতে ২৭শে আগষ্ট পর্য্যন্ত উত্তর বঙ্গের সকল জিলাতে স্বভাবাতিরিক্ত বৃষ্টি পড়িয়াছে এবং তাহাতে দূরবিস্তৃত বন্যা ঘটিয়াছে। রাজসাহী জিলার নওগাঁ মহকুমায় এবং ঐ কয়দিনে যেখানে প্রায় বিশ ইঞ্চি পরিমাণ বৃষ্টিপাত হইয়াছে সেই বগুড়া জিলায় ইহার ফল সর্ব্বাপেক্ষা প্রবলভাবে অনুভূত হইয়াছিল। বগুড়া জিলার পূর্ব্বভাগ প্রায়ই প্লাবিত হয় বলিয়া সেখানে নৌকা রাখা হয়, কিন্তু পশ্চিম ভাগে এবং নওগাঁ মহকুমায় প্লাবন বিরল বলিয়া অত্যল্পসংখ্যক নৌকা থাকে; এই জন্য প্লাবন-পরিমিত ভূভাগের অধিবাসিগণ তাহাদের গৃহ হইতে নিরাপদ স্থানে গমন করিতে বড়োই অসুবিধা ভোগ করিয়াছিল এবং সংবাদ পাওয়া ও সাহায্য প্রেরণ করারও বাধা ঘটিয়াছিল।

 

৬৬

 

দেওয়ালগুলি কাদায় প্রস্তুত বলিয়া এবং জলের বৃদ্ধিতে অতি শীঘ্র ধসিয়া যাওয়ায় বাসগৃহের ধ্বংস অত্যন্ত ব্যাপক হইয়াছিল। বিভাগীয় কমিশনার ও কালেক্টরগণ তৎক্ষণাৎ উপহত স্থানগুলি পরিদর্শন করেন এবং তাঁহারা গবর্ণমেন্টের সকল বিভাগের কর্ম্মচারিগণের ও বহুসংখ্যক বেসরকারী কর্ম্মীর সহায়তায় লোকের আনুকূল্যের জন্য যথাসম্ভব পন্থা অবলম্বন করিতে কালক্ষেপ করেন নাই। যাহারা গৃহ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছে, তাহাদের জন্য ক্ষণিক-ব্যবহার্য্য বাসা তুলিয়া দেওয়া হয়, দূরবর্ত্তী স্থানসমূহে দুঃখমোচন-দল পাঠানো যায়, এবং বিতরণের পক্ষে অনুকূল কেন্দ্রসমূহে ট্রেণে করিয়া খাদ্য আনীত হয়। ৩১শে আগষ্ট নাগাদ বন্যা কমিতে আরম্ভ করে, কিন্তু ফসলের কী পরিমাণ ক্ষতি হইয়াছে তাহা এখন পর্য্যন্ত নির্ণয় করিতে পারা যায় নাই।

 

৬৭

 

আমরা অবশেষে সাদা বাড়ি, বীথিকা, প্রশস্ত রাস্তা ও দোকান-পাটে পূর্ণ রুশীয় সহর নূতন বোখারায় পৌঁছিলাম এবং প্রাচীন বোখারায় যাওয়ার জন্য আমরা একটি শাখা লাইনে গাড়ী বদলাইলাম। সুখদৃশ্য প্রান্তর ও শস্যক্ষেত্র-সমূহের মধ্য দিয়া গাড়ী চলিল। সেগুলি দক্ষিণ-ইংলণ্ডের ন্যায় সমুজ্জ্বল ও উর্ব্বর। রৌদ্রালোকিত বারো ভর্‌স্‌ট্‌ পথ চলার পর মুসলমানী এসিয়ার সকলের চেয়ে সেরা এই সহরের মেটে রঙের কাদার দেওয়াল আমাদের দৃষ্টিগোচর হইল। এমন স্থান কেবল মায়াবলে আমাদের জন্য প্রস্তুত হইতে পারিত। আলাদিনের যে প্রাসাদকে যাদুকর মরুভূমিতে স্থানান্তরিত করিয়াছিল নিশ্চয়ই তাহা যেরূপ প্রতীয়মান হইয়াছিল ইহা আমাদিগকে তাহাই স্মরণ করাইয়া দিল। দন্তুরাকৃতি প্রাচীরবেষ্টনের অন্তর্ভাগে সঙ্কীর্ণ রথ্যায়, আচ্ছাদিত গলিতে, অবরোধকারী দেয়ালের পশ্চাতে দেড় লক্ষ মুসলমান সম্পূর্ণ নিজের নিজের মনের মতো করিয়া বাস করিতেছে-- ইহাদের উপরে অনুভবযোগ্য কোনো বহিঃপ্রভুত্ব নাই।

 

৬৮

 

লিখিতে পড়িতে পারে না এমন একজন ব্রহ্মিককে পাওয়া দুঃসাধ্য। শিক্ষা খুব গভীর নহে-- ব্রহ্মিক ভাষা পড়া ও লেখা; সরল, খুবই সরল গণিত; মাস তারিখের জ্ঞান, এবং হয়তো অল্প কিছু ভূগোল এবং ইতিহাস। কিন্তু তাহাদের ধর্ম্ম-সম্বন্ধে তাহারা অনেকটা শিক্ষা করে। তাহাদের ধর্ম্মশাস্ত্রের বহুলাংশ, তাহার আখ্যায়িকা এবং উপদেশভাগ, তাহাদিগকে মুখস্থ করিতে হয়। যখন ভোর হইয়া আসিতেছে তখন ছেলেরা এবং সন্ন্যাসীরা অনাবৃত ভূমির উপরে হাঁটু গাড়িয়া গান গাইতেছে-- এই দৃশ্যটি, পৃথিবীতে যত সুন্দর দৃশ্য কল্পনা করা যাইতে পারে তাহার মধ্যে একটি। কেবলমাত্র উপদেশ নহে, কাজে তাহাদের ধর্ম্মশিক্ষা অত্যন্ত ভালো, অত্যন্ত সম্পূর্ণ; কেন না, যদিবা কেহ স্কুলের ছেলেমাত্রও হয়, তথাপি মঠে সন্ন্যাসীরা যেমন করিয়া বাস করেন তাহাকেও সেইরূপ পবিত্র জীবন যাপন করিতে হয়।

 

৬৯

 

একটি শূকরশাবককে জন্মমুহূর্ত্তেই একটি থলির মধ্যে পুরিয়া সাত ঘন্টা ধরিয়া অন্ধকারে রাখিয়াছিলেন, এবং তাহার পরে শূকরাঙ্গনের কাছে শূকরী যেখানে প্রচ্ছন্ন হইয়া ছিল তাহার দশ ফুট তফাতে তাহাকে স্থাপন করিয়াছিলেন। শূকরশাবক তাহার মাতার মৃদু ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ শীঘ্রই চিনিতে পারিল, এবং বেড়ার নিম্নতর বাতার নীচে দিয়া কিংবা উপর দিয়া ভিতরে প্রবেশ করিবার প্রয়াস করিতে করিতে শূকরাঙ্গনের বাহিরে বাহিরে চলিতে লাগিল। অল্প যে কয়টা জায়গা দিয়া প্রবেশ করা সম্ভব, তাহারি মধ্যে একটা জায়গার বেড়ার বাতার নীচে দিয়া পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সে জোর করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে পারিল। যেমনি ভিতরে প্রবেশ করা, অমনি কিছুমাত্র না থামিয়া শূকরগৃহের মধ্যে তাহার মাতার কাছে সে গেল এবং তখন তাহার ব্যবহার অন্যদের মতোই হইল।

 

৭০

 

বোধ হয় স্পানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের সময়েই এই কথাটি স্পষ্টরূপে স্বীকৃত হইতে আরম্ভ হয় যে, মাছি আন্ত্রিক জ্বরের বাহন এবং সেই জন্য বিপৎসঙ্কুল। এক্ষণে ইহা সাধারণত স্বীকৃত হইয়াছে যে, কেবলমাত্র আন্ত্রিক জ্বর নহে, পরন্তু সান্নিপাতিক জ্বর এবং ওলাউঠার বীজ এবং সম্ভবত শিশু-উদরাময় প্রভৃতি অন্যান্য রোগের বীজও মাছি ছড়াইয়া দিতে পারে। ইহাও জানা গিয়াছে যে, মাছি যক্ষ্ণাবীজাণুও বহন করে। যেখানে ইহাদের জননযোগ্য স্থান এবং রোগবীজের সংস্পর্শ-সম্ভাবনা আছে, মাছি সেখানেই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর রোগবিস্তারক হইয়া উঠে। Dr। Hindleদেখিয়াছেন বাতাসের উজানে যাইবার অথবা তাহা পার হইয়া যাইবার দিকেই মাছির ঝোঁক। বৃষ্টিহীন দিন এবং উত্তাপ তাহাদের ছড়াইয়া পড়িবার পক্ষে অনুকূল, এবং খোলা পাড়াগাঁয়ে মাছিরা সহরের চেয়ে বেশি দূরে ভ্রমণ করে, সম্ভবত তাহার কারণ এই যে, সহরে বাড়িগুলি তাহাদিগকে খাদ্য এবং আশ্রয় দিয়া থাকে।

 

৭১

 

পীত নদীর তীরবর্ত্তী হোনান শান্‌টুং এবং শান্সিতে যাহাদের আদি বাসস্থান সেই উত্তরদেশীয় চৈনিকেরা ক্কান্‌টুং এবং ফুকিয়েন-নিবাসী দক্ষিণচৈনিকদের হইতে সম্পূর্ণ পৃথক্‌ জীব। উত্তরদেশীয়েরা সাধারণত বৃহদায়তন; ইহারা সকল ঘটনাই অবিচলিতভাবে গ্রহণ করে, এবং গার্হস্থ্য কিম্বা রাষ্ট্র-সম্বন্ধীয় কোনো বাঁধা নিয়মের পরিবর্ত্তনের বিরোধী। দক্ষিণদেশীয়েরা সাধারণত আয়তনে খাটো, উত্তরের লোকদের চেয়ে তাহাদের বর্ণ কালো, এবং তাহারা সহজে উদ্‌বেজিত হয়। ইহারা পুরাতন প্রথা-সম্বন্ধে অসহিষ্ণু এবং তাহাদের উদীচ্য স্বজাতীয়েরা যে সতর্ক গণ্ডির মধ্যে সন্তুষ্ট ইহারা তাহা ভেদ করিয়া আপনাদিগকে অভিব্যক্ত করিয়া তুলিতে চেষ্টা করিতেছে।

 

৭২

 

এ দিকে আহার সম্বন্ধে ইহাদের উভয়ের রুচি স্পষ্টতই পৃথক্‌। উত্তরচৈনিকেরা প্রবল-শীতপ্রধান-দেশীয় লোক, এই জন্য যে তণ্ডুল দক্ষিণদেশীয়দের পক্ষে অত্যাবশ্যক তাহাকে তাহারা উপেক্ষা করে এবং ময়দা ও গোধূমজাত অন্যান্য পদার্থ খাইয়াই প্রধানত বাঁচিয়া থাকে। দক্ষিণদেশীয়দের দেশ এত গরম যে, গুরুপাক খাদ্যে তাহাদের বিতৃষ্ণা; তাহারা ভুট্টা এবং স্নিগ্ধকর শাক-সবজি কিছুতেই ছাড়িতে চায় না। কিন্তু দক্ষিণদেশীয়দের প্রতি উত্তরদেশীয়দের ঈর্ষাই বিরোধের সকলের চেয়ে প্রধান কারণ। দক্ষিণ প্রদেশগুলি অপেক্ষাকৃত অধিক পরিমাণে আধুনিক অবস্থার সংস্পর্শে আনীত হইয়াছে এবং এই জন্য যে যথেচ্ছচারী শাসন উদীচ্যদের প্রায় প্রকৃতিগত, তাহার বিরুদ্ধে ইহারা উদ্‌বেজিত হইয়া উঠে।

 

৭৩

 

দক্ষিণদেশীয়েরা বাণিজ্যে তাহাদের চেষ্টা সন্নিবিষ্ট করিয়া ধনী হইয়া উঠিয়াছে, তাহারা বিদেশে ভ্রমণ করিয়া তাহাদের উদীচ্য প্রতিবেশীদের চেয়ে অধিকতর আধুনিক ভাবাপন্ন হইয়াছে, এভং উত্তরদেশীয় যে স্বৈরশাসকগণ তাহাদের আকাঙক্ষা-সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ ও সংশয়পর তাহাদের কর্ত্তৃক উত্তরের রাজধানী হইতে শাসিত হওয়া, ইহারা ঘৃণার সহিত দেখে। তাহা ছাড়া, তাহারা চারি দিকে তাকাইলে দেখিতে পায় যে, উত্তর প্রদেশে প্রভূত পরিমাণে রেলোয়ে পাতা হইয়াছে, অথচ যে দক্ষিণ প্রদেশ সর্ব্বাপেক্ষা বহুপ্রসূ সেখানে রেলোয়ে অল্প এবং বাণিজ্যব্যবসা সেকেলে বহুশ্রমসাধ্য এবং যাতায়াতের অব্যবস্থাবশত প্রতিহত।

 

৭৪

 

একদিন এরূপ ঘটিল যে, প্রায় মধ্যাহ্নকালে আমার নৌকার অভিমুখে যাইতে যাইতে সাগরতটে একটি মানুষের নগ্নপদের চিহ্নে আমি অতিমাত্র বিস্মিত হইয়া উঠিলাম; এই চিহ্ন বালুকার উপর অত্যন্ত স্পষ্ট দৃশ্যমান ছিল। বজ্রাহতের মতো অথবা যেন কোন প্রেতমূর্ত্তি দেখিয়াছি এমনি ভাবে দাঁড়াইলাম। আমি কান পাতিলাম, আমার চারি দিকে তাকাইলাম, কিছু শুনিতে পাইলাম না অথবা দেখিতেও পাইলাম না। আরো অধিক দূর দেখিবার জন্য ক্রমোচ্চ ভূমির উপরে উঠিয়া গেলাম। আমি তটের এক দিকে চলিয়া গেলাম আবার বিপরীত দিকে চলিয়া আসিলাম, কিন্তু সবই সমান; সেই একটি ছাড়া অন্য কোনো চিহ্ন দেখিতে পাইলাম না। আরো অধিক চিহ্ন আছে কিনা দেখিবার জন্য এবং ইহা আমার কল্পনা হইতে পারে কিনা তাহা অবধারণের জন্য পুনর্ব্বার ইহার কাছে গেলাম; কিন্তু এরূপ সন্দেহের কোনো কারণ ছিল না, কেন না সেখানে ঠিক কেবল একটি পায়েরই ছাপ ছিল-- পদাঙ্গুলি গোড়ালি এবং একটি পায়ের প্রত্যেক অংশের ছাপ। ইহা কী করিয়া সেখানে আসিল তাহা বুঝিলাম না অথবা লেশমাত্র কল্পনা করিতে পারিলাম না।

 

৭৫

 

মনে করো, যদি হাইড পার্কের সমস্ত জায়গা জুড়িয়া বহুসংখ্যক কামান থাকিত এবং একই মুহূর্ত্তে বৈদ্যুতদ্বারা এই সমস্ত কামান ছোঁড়া যাইত, তবে যদিও শব্দগুলি একই কালে উৎপন্ন হইত, তথাপি যেখানেই তুমি দাঁড়াও না কেন, এক সঙ্গে সমস্ত শুনিতে পাইতে না; হাতের কাছের কামান হইতে আওয়াজ তোমার কানে প্রথমে পৌঁছিত এবং অধিকতর দূরের শব্দ ক্রমশ পরে আসিত। তোমার নিকট হইতে কত দূরে বিদ্যুৎ স্ফুরিত হইয়াছে তাহার হিসাব করিতে গেলে, প্রথমে যে সময়ে তুমি স্ফুরণ দেখিয়াছিলে এবং তাহার পরে যে সময়ে তাহার অনুবর্ত্তী বজ্রগর্জ্জন শুনিয়াছ, তাহারই মধ্যকালীন প্রত্যেক পাঁচ সেকেণ্ডে এক মাইল ধরিয়া লইতে হইবে। আলোক এবং শব্দ একই কালে উৎপন্ন হইয়াছে, কিন্তু শব্দ প্রত্যেক মাইল উত্তীর্ণ হইতে পাঁচ সেকেণ্ডে লয়, অথচ আলোক শব্দের তুলনায় তৎক্ষণাৎ ধাবিত হয় বলা যাইতে পারে। আলো এত দ্রুত চলে যে, এক সেকেণ্ডে সাত বারের অধিক পৃথিবীর চারি দিকে তাহা দৌড়িয়া আসিতে পারে। আমাদের চাঁদ আমাদের এত কাছে যে, এই অল্প দূরত্ব অতিক্রম করিতে আলোকের এক সেকেণ্ডের কিঞ্চিদধিক সময় লাগে। কিন্তু সূর্য্য হইতে পৃথিবীতে আসিতে আলোকের আট মিনিট কাল লাগে; বস্তুত যেসকল সূর্য্যরশ্মি এখনই আমাদের চক্ষুতে আসিল তাহা আট মিনিট আগে সূর্য্য ছাড়িয়াছে।

 

৭৬

 

দৈর্ঘ্যে তিনি মাঝারি আয়তনের চেয়ে কিছু বেশি হইবেন। তাঁহার বর্ণ পাণ্ডুর ছিল এবং তাঁহার আয়ত কৃষ্ণচক্ষু তাঁহার মুখশ্রীতে যে একটি গাম্ভীর্য্যের ব্যঞ্জনা অর্পণ করিয়াছিল, তাহা তাঁহার মতো প্রফুল্ল মেজাজের লোকের কাছে প্রত্যাশা করা যায় না। তাঁহার গড়ন পাতলা ছিল, অন্তত তাঁহার শেষ জীবন পর্য্যন্ত; কিন্তু তাঁহার বক্ষপট ছিল গভীর, তাঁহার স্কন্ধ প্রশস্ত, তাঁহার দেহ পেশীযুক্ত এবং প্রমাণসঙ্গত। তাঁহার সজ্জা এমনতরো ছিল যাহাতে তাঁহার সুন্দর আকৃতির অনুকূল শোভা সম্পাদন করিত; তাহা না ছিল অত্যলঙ্কৃত, না চমৎকৃতিজনক, কিন্তু মূল্যবান।

 

৭৭

 

উপযুক্ত প্রকারের এবং উপযুক্ত পরিমাণে জ্বালানি এঞ্জিনের অবশ্যই চাই, নহিলে ইহা ভালো কাজ করিতে পারে না। উপযুক্ত প্রকারের এবং পরিমাণের তাপজনক খাদ্য মানবদেহের পক্ষেও আবশ্যক, নহিলে ইহা ভালো কাজ করিতে পারে না। মানবদেহ সকল সময়েই কিছু কাজ করিতেছে-- এমন কি, নিদ্রায় রোগে এবং বিশ্রামকালে। এঞ্জিন গড়িতে হয় এবং মেরামত করিতে হয়, তাহাতে কয়লা ভরিতে হয়, তেল দিতে হয়, এবং তাহাকে কায়দায় রাখিতে হয়। মানবদেহ-সম্বন্ধেও সেই একই কথা। আমাদের তাপ জোগাইবার খাদ্য, গড়িয়া তুলিবার, মেরামত করিবার খাদ্য এবং নিয়ন্ত্রণ করিবার খাদ্য চাই। এখন মনে করো, আহার্য্যভাণ্ডারে আমাদের এই সকল প্রকারের খাদ্য আছে এবং তাহা রাঁধিবার জন্য কয়লা আছে। এই সব খাদ্য যথা-পরিমাণে আমরা বন্টন করিয়া দিতে নাও পারি। দৃষ্টান্ত-স্বরূপে বলিতেছি অত্যধিক অথবা অত্যল্প উত্তাপ দিবার খাদ্য, অত্যল্প নিয়ন্ত্রণকাজের খাদ্য, বা অত্যধিক গড়িয়া তুলিবার বা মেরামত করিবার খাদ্য সামঞ্জস্য নষ্ট করিতে পারে।

 

৭৮

 

পাখী যেন বায়ুর প্রবাহ বলিলেই হয়, কেবল পাখাগুলি-দ্বারা আকার লাভ করিয়াছে মাত্র; ইহার সকল পালকেই বাতাস আছে, ইহা নিজের সমস্ত কলেবর এবং চর্ম্ম দিয়া বায়ু গ্রহণ করে এবং উড়িবার কালে ইহা বায়ুতাড়িত শিখার মতো বায়ুর সংঘর্ষে জ্বল জ্বল করিতে থাকে; ইহা বায়ুর উপরে বিশ্রাম করে, তাহাকে দমন করে, তাহাকে অতিক্রম করে এবং বেগে তাহাকে পরাভূত করে। ইহা বায়ুই, সেই বায়ু আপনাকে জানিয়াছে, আপনাকে জিতিয়াছে, আপনাকে শাসন করিতেছে। পুনশ্চ, পাখীর কণ্ঠেও যেন বায়ুরই বাণী দেওয়া হইয়াছে। বায়ুর মধ্যে ধ্বনিমাধুর্য্যে যাহা কিছু দুর্ব্বল উদ্দাম এবং অনবাবশ্যক তাহাই ইহার গানে সুগ্রথিত হইয়া উঠিয়াছে।

 

৭৯

 

যুক্তরাজ্যে চাউলের বার্ষিক খরচ লোক-পিছু ছয় পাউণ্ডের ঊর্দ্ধে কখনও চড়ে নাই। ইহার বিরুদ্ধ তুলনায়, আমরা যতটা চাউল খাই য়ুরোপ তাহার পাঁচগুণ অধিক খাইয়া থাকে এবং ঘন-অধ্যুষিত প্রাচ্যদেশে প্রত্যেক লোক বৎসরে এমন কি ২৫০ পাউণ্ড পর্য্যন্ত চাউল খাইয়া থাকে। যুদ্ধের পূর্ব্বে ব্রিটিশ দ্বীপের পাঁচ কোটী লোক বৎসরে ৭৫ কোটী পাউণ্ডের অধিক চাউল খাইত এবং জার্ম্মানি বৎসরে এক শত কোটী পাউণ্ডের অধিক চাউল আমদানি করিত। এইরূপে দেখা যাইতেছে যে, কালিফর্ণিয়ায় চাউল-আবাদের অপেক্ষাকৃত অধুনাতন বিস্তার কৃষিবিভাগের একলার উদ্যম হইতেই লব্ধ। গত মর্‌সুমে স্যাক্রামেন্টো উপত্যকায় ৬০,০০০ একরে ধান বোনা হয় এবং পঞ্চাশ লক্ষ ডলারের ফসল বিক্রয় হয়। এই সবে আরম্ভ। কথিত হইয়াছে যে, প্যাসিফিক উপকূলে বৎসরে যে ৫ কোটী ৫০ লক্ষ পাউণ্ড চাউল খরচ হয়, তাহার চেয়ে বহুগুণ অধিকতর উৎপাদনের মতো ব্যবহার্য্য ধানের জমি কালিফর্ণিয়ায় আছে। তাহা ছাড়া ক্ষেত্রগুলি প্লাবিত করিবার উপযুক্ত যথেষ্ট জলেরও জোগান সেখানে আছে। চাউল-ব্যবসায়ের এই নূতন প্রয়াস যে লক্ষ্য ধরিয়া চলিতেছে তাহাতে বোধ হয় মার্কিনেরা ভাতকেই প্রধান খাদ্যরূপে গ্রহণ করিবে। ইহার পোষণগুণ প্রভূত। অধিকাংশ মার্কিন-পাচকেরা ইহা কেমন করিয়া প্রস্তুত করিতে হয় জানে না বলিয়া এবং ইহা আঠা আঠা পিণ্ডাকারে পাতে দেওয়া হয় বলিয়াই, সম্ভবত বর্ত্তমানে লোকের কাছে ইহার আদরের অভাব।

 

৮০

 

কতকগুলি মরুজাত উদ্ভিদ জলসঞ্চয় করিয়া থাকে; ইহারা প্রতিকূল অবস্থার সহিত অভিসংযোগ-সাধনের সুবিদিত দৃষ্টান্তস্থল। ইহাদের শিকড়ের সংস্থান অপেক্ষাকৃত বৃহৎ এবং ইহার সাহায্যে প্রাপ্তিযোগ্য জলের আয়োজনকে তাহারা প্রকৃষ্ট পরিমাণে নিজের ব্যবহারে লাগাইতে পারে। কালিফর্ণিয়ার মোহাব মরুতে F. V, Coville একজাতীয় শাখাবান্‌ মনসাসীজ দেখিয়াছেন; তাহা উনিশ ইঞ্চি উচ্চ এবং তাহার শিকড়ের জাল আঠারো ফিট পরিধির অধিক স্থান ব্যাপ্ত করিয়া থাকে। এই শিকড়সকল ভূতলের কেবলমাত্র দুই হইতে চারি ইঞ্চি পর্য্যন্ত নীচে চলিয়া গিয়াছে; এই জন্য ধারাবর্ষণকে কাজে লাগাইবার পক্ষে ইহারা উপযুক্ত। এই উদ্ভিদের অভ্যন্তরভাগ প্রধানত জলসঞ্চয়কোষে নির্ম্মিত, এমন কি, ইহাতে শতকরা ৯৬ অংশ পরিমাণে জল সংগৃহীত হইতে পারে। এইরূপে এই উদ্ভিদ একটি জলাধার হইয়া উঠে এবং অনেক সময়েই পানের পক্ষে এই জল সম্পূর্ণ উপযুক্ত।

 

৮১

 

জগতের অধিকাংশ রোগই সজীব বীজাণু-দ্বারা সংঘটিত। ইহারা এত ক্ষুদ্র যে অণুবীক্ষণ ব্যতীত ইহাদিগকে আমরা দেখিতে পাই না এবং ইহারা আমাদের দেহে প্রবেশ করিয়া মাংস ধ্বংস করে ও তাহাই খাইয়া বাঁচিয়া থাকে। প্রধানত ইহাদের আকৃতি চারি প্রকারের; ছোটো ছোটো গুলির মতো, নয় ঋজু দণ্ডের মতো, নয় দুই গোলপ্রান্তবিশিষ্ট দণ্ডের মতো, অথবা স্ক্রুর মতো। ইহারা নিজেকে বিভক্ত করিয়া অথবা ডিম্ব প্রসব করিয়া বংশবৃদ্ধি করে; তাহা এমন ভয়ঙ্কর দ্রুতবেগে করিয়া থাকে যে একটিমাত্র রোগবীজ কয়েক ঘন্টার মধ্যে বহুলক্ষ বীজ উৎপাদন করিতে পারে এবং যে জন্তুকে ইহারা আক্রমণ করিয়াছে, বিষ প্রস্তুত করিয়া, তাহাকে অবশেষে মারিয়া ফেলিতে পারে। সজীব জন্তুদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিবার পূর্ব্বে, মাটির উপরে সঞ্চিত ধূলি এবং ময়লার মধ্যে ইহাদের বাসা থাকে, বিশেষত সে মাটি যদি সেঁৎসেতে হয়।

 

৮২

 

একটি বেশ মজবুত রকমের জাপানী যুবক চৌরঙ্গীর রাস্তা বাহিয়া যাইতেছিল, দুইজন য়ুরোপীয় ভদ্রলোকের সঙ্গে তাহার ঝগড়া বাধিল; তাহারা স্থানীয় বায়স্কোপ-শালায় চলিয়াছিল। জাপানী তাহাদের আচরণে বিরক্ত হইয়া বিনা কালব্যয়ে তাহাদের উভয়কে চিৎ করিয়া পাড়িয়া ফেলিল। নিকটবর্ত্তী কর্ম্মস্থানের দুইজন দারোয়ান সাহেবদের সহায়তা করিতে ছুটিয়া আসিল; কিন্তু যাহাদের পক্ষ সমর্থন করিতে আসিল ইহারাও তাহাদেরই দশা প্রাপ্ত হইল। আরও দুইজন দারোয়ান এবং দুইজন কন্‌ষ্টেবল ঘটনাস্থানে ছুটিয়া আসিল; তাহাদের আগমনের কয়েক সেকেণ্ড্‌ পরেই দেখা গেল তাহারাও রাস্তার মাঝখানে লুটাইতেছে। জাপানীকে দেখিয়া বোধ হইল যে, তাহার জুজুৎসু খেলা আরো কিছু দেখাইবার জন্য সে প্রস্তুত আছে। শক্তি পরীক্ষা করিয়া দেখিবার জন্য সে মিষ্ট হাসিমুখে অন্য সকলকে আহ্বান করিতে লাগিল। একজন য়ুরোপীয় সার্জ্জেন্ট এই সঙ্কটকালে উপস্থিত হইল এবং তাহার সঙ্গে ফাঁড়ি-থানায় যাইতে তাহাকে সবিনয় অনুরোধের দ্বারা রাজি করাইল। গতকল্য রিপোর্টে পাওয়া গিয়াছে যে, তাহাকে সাবধান করিয়া ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে।

 

৮৩

 

একটি হিন্দুরমণীকে মিথ্যা পরিচয়ে বিবাহ করিবার অপরাধে হরিপুরের পুলিস মনোহর পাল-নামক এক ব্যক্তিকে এইমাত্র গ্রেফ্‌তার করিয়াছে। এইরূপ উক্ত হইয়াছে যে, অভিযুক্ত নিজেকে মথুর গাঙ্গুলীর পুত্র ব্রজ গাঙ্গুলী নামে অভিহিত করিয়াছিল এবং সে মাধব চক্রবর্ত্তী নামে একজনের বাড়িতে বাস করিত। ইহাও বর্ণিত হইয়াছে যে, সে মাধবের বাড়িতে বার্ষিক দুর্গাপূজা করিত। কানাই চাটুজ্জে নামে একজনের কাদম্বিনী বলিয়া এক অবিবাহিত ভগিনী ছিল। মথুরের পুত্রকে এ পর্য্যন্ত খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই এবং রিপোট্‌ দেওয়া হইয়াছিল যে, সে সন্ন্যাসী হইয়া তাহার পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়াছিল। মনোহর ইহাই জানিতে পারিয়া সন্ন্যাসীর মতো চলিতে লাগিল এবং লোককে জানাইল যে, সে'ই মথুরের নিরুদ্দেশ ছেলে। কানাই তাহার সঙ্গে নিজের বোনের বিবাহের বন্দোবস্ত করে এবং চার বৎসর পূর্ব্বে হিন্দুপ্রথামতে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি কানাইয়ের কাছে আসিত এবং একটা ব্যবসা করিবে বলিয়া জানাইলে কানাই তাহাকে ৬৫০ টাকা দেয়। তাহার আচারব্যবহার কেমন সন্দেহজনক ছিল; পরে তাহার সত্য নাম ও জাতি প্রকাশ হইয়া পড়িল। কানাইয়ের ভগিনী ইহা জানিতে পারিয়া তাহার ভাইকে বলে যে, তাহাকে উদ্ধার না করিলে সে আত্মহত্যা করিবে। পুলিসকে খবর দেওয়া হইল এবং অভিযুক্ত গ্রেফ্‌তার হইল। আরও অনুসন্ধান চলিতেছে।

 

৮৪

 

ধনুষ্টঙ্কার যে রোগবীজের দ্বারা উৎপন্ন হয় তাহারা ভূমির উপরিভাগে বাস করে; তাহারা বিশেষভাবে এমন ভূমিতলকে পছন্দ করে যেখানে ঘোড়া কিংবা গোরুর পাল বাস করিতেছে, যেমন আস্তাবল রাস্তা এবং গোলাবাড়ী। গোরু এবং ঘোড়ার শরীর হইতে যেসকল ত্যাজ্য পদার্থ নির্গত হইয়াছে তাহা এইসকল রোগবীজের পোষণের পক্ষে বিশেষ উপযোগী বলিয়া বোধ হয়। তাহারা চর্ম্মের কোনো একটা ক্ষুদ্র ক্ষত কিম্বা ঘা দিয়া কিম্বা নাকের কিম্বা মুখের ভিতর দিয়া মানুষের দেহে প্রবেশ করে।

 

৮৫

 

সেই জন্য যেসব লোক খালি পায়ে যায়, কিম্বা রাস্তায় পড়িয়া গিয়া যাহাদের ঘা লাগে বা আঁচড় লাগে, বিশেষত সেই রাস্তায় যদি ঘোড়া কিংবা গোরুর যাতায়াত থাকে, তবে ধনুষ্টঙ্কারের দ্বারা আক্রান্ত হইবার সম্ভাবনা অন্য লোকদের চেয়ে ইহাদের অধিক। যখন ভূতলের উপরিভাগ শুকাইয়া যায় এবং মলিন পদার্থ উড়িয়া বেড়ায়, তখন বাতাসে ভাসমান ধূলি নাক মুখ বা কণ্ঠের মধ্যে কিছু পরিমাণ এই রোগবীজ বহন করিয়া আনিতে পারে। আর যদি সেখানে কোনো ক্ষুদ্র ক্ষত থাকে তবে ইহা রক্তে প্রবেশ করিয়া ধনুষ্টঙ্কার ঘটাইতে পারে।

 

৮৬

 

এই গৃহ Madam Orange এর; তিনি অপেক্ষাকৃত দরিদ্রশ্রেণীর বৃদ্ধা ফরাসী স্ত্রীলোকের খাঁটি নিদর্শন; তাঁহার স্বামী যুদ্ধক্ষেত্রের পুরঃসীমায় আছেন। প্রফুল্লভাবে স্বেচ্ছারত কর্ম্মশীলতায় তিনি বিস্ময়জনক-- এবং যদিও তাঁহার অল্পই কাপড় আছে এবং বস্তুত টাকা নাই, এবং না আছে কয়লা, না আছে বাতি, না আছে কেরোসিন, এবং পাঁচ হইতে দশ বছর বয়সের চারিটি ছোটো ছোটো শিশুর এবং চারিটি অত্যন্ত সতেজ মার্কিন সেনানায়কের সেবার ভারে তিনি ভারাক্রান্ত - তথাপি সকল সময়েই তাঁহার মুখে হাসি এবং কণ্ঠে হাস্যধ্বনি। এক অক্ষর ইংরেজী তিনি বলিতে কিংবা বুঝিতে পারেন না, আর আমাদের মধ্যে আমিই কেবল এক মাত্র আছি যে লোক ফরাসী শিখিবার জন্য, এমন কি, প্রয়াসও করিয়াছে-- সুতরাং কথাবার্ত্তা চালাইবার চেষ্টা করিতে গিয়া আমাদের কত বড়ো কাণ্ডটাই যে হয় তাহা কল্পনা করিতে পার।

 

৮৭

 

আমি এই ব্যাপারে নিজের ক্ষমতা-সম্বন্ধে যথার্থ গর্ব্ব অনুভব করি; কারণ আমি দেখিয়াছি, দুইশো রকমের বাঁধা অঙ্গভঙ্গীর সাহায্যে আমি প্রায় সবই বলিতে পারি। ছোটো শিশুগুলি চমৎকার, তাহাদের লইয়া আমরা সকলে ক্ষেপিয়া গিয়াছি। প্রত্যেক বার যখন আমরা বাড়ির বাহিরে যাই বা বাড়িতে প্রবেশ করি এবং তাহার মধ্যবর্ত্তী সময়েও, যতবার তাহাদের মন যায় তাহারা সকলে আসিয়া আমাদের চুম্বন করে। তাহারা অন্য একজন ফরাসী স্ত্রীলোকের সন্তান এবং আমি যতটা বুঝিলাম তাহার স্বামী যুদ্ধে মারা গিয়াছে আর সে নিজে রুগ্ন, তাই যখন সে পারে তখন যুদ্ধাস্ত্রের কারখানায় কিংবা সেই রকমের কিছু একটাতে কাজ করে।

 

৮৮

 

যুদ্ধ যত দিন চলে এই ছেলেগুলি Madam Orange -এর কাছে থাকিবে। বস্তুত তাহারা নিঃসম্বল, যথেষ্ট বলিতে যাহা বোঝায় এমন শীতের বস্ত্র তাহাদের নাই; তাহাদের জন্য জিনিষপত্র কিনিয়া দিয়া আমরা ভারী আমোদ পাইয়াছি। বর্ণনাপটু লেখকের ক্ষমতা যদি আমার আরো অধিক থাকিত তবে বড়ো ভালো হইত, কেন না, ইচ্ছা করে এই বৃদ্ধা স্ত্রীলোকের আর গুহার মতো তাহার ছোটো ঠাণ্ডা ঘরটির চিত্র ধরিয়া রাখি, কিন্তু যথাযোগ্যমত করিয়া লিখিতে পারিলাম না।

 

৮৯

 

কিছুকাল পূর্ব্বে সকলেই মনে করিত বাতাস যেন কতকটা সমুদ্রের জলের মতো, এবং ইহা ব্যাপ্ত হইয়া আমাদের উপরের এবং চারি দিকের আকাশ পূর্ণ করিয়াছে। নদী বাহিয়া চলিতে চলিতে জলের মাঝখানে যদি একটা গর্ত্ত পাওয়া যাইত-- একটা শূন্যতামাত্র-- যাহার মধ্যে নৌকাটা পড়িয়া যাইতে পারে, তবে সে একটা ভারী অসুবিধার ব্যাপার হইত না কি? অথচ মানুষ যখন উড়া-কলে আকাশে ওঠে তখন মাঝে মাঝে এইরূপ ঘটে। বাতাসে গর্ত্ত আছে, বায়ুরথের সারথির পক্ষে তাহা পার হইয়া চলা অসম্ভব। তাহার যন্ত্রটা হঠাৎ ডুব মারে ও পড়িয়া যায় এবং সেটি যদি বহমান বাতাসের স্রোতের মধ্যে দ্রুত আসিয়া না পৌঁছে, তবে তাহার গুরুতর আপদ্‌ ঘটিতে পারে। বাতাসের মধ্যে কেমন করিয়া যে এইরূপ গর্ত্ত হয়, বৈজ্ঞানিক লোকেরা তাহা খুঁজিয়া বাহির করিবার চেষ্টা করিতেছেন।

 

৯০

 

জিনিষপত্রের চড়া দামের গতিকে মাদুরাতে একটা গুরুতর দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটিয়াছিল। সোমবার সকালে একদল লোক একটি চালের বাজারের রক্ষককে মারপিট করিয়া লুঠ করিতে চেষ্টা করিয়াছিল। আগাগোড়া সমস্ত সহরের দোকানদার লুঠের ভয় করিয়া তাহাদের দোকান বন্ধ করিয়াছিল। কালেক্টার এই উৎপাতের জায়গায় মোটরে করিয়া উপস্থিত হইলেন এবং লোকেরা তাঁহার কাছে দাবী করিল যে, তিনি যেন শস্য এবং কাপড়-ব্যবসায়ীদের প্রতি এই হুকুম জারী করেন যে, তাহারা সঙ্গত দামে মাল বিক্রয় করে। তিনি বলিলেন, তাহাদের নালিশ জানাইয়া একটা দরখাস্ত দাখিল করিলে বিবেচনা করা হইবে। জনতার লোকেরা দাবী করিল-- এখনি হুকুম জারী করা হউক। তাহারা কালেক্টারের গাড়ী ঘেরাও করিল এবং পাথর ছুঁড়িয়া মারিল; তাহার মধ্যে দুটো একটা কালেক্টারকে লাগিল; যাহাই হউক, তিনি চলিয়া যাইতে পারিলেন। অল্প পরেই তিনি রিজার্ভ্‌ পুলিস লইয়া ফিরিয়া আসিলেন এবং আরও অধিক শান্তিভঙ্গ ঘটা নিবারণ করিতে কৃতকার্য্য হইলেন। দোকানগুলি কিন্তু সমস্ত দিন বন্ধ রহিল।

 

৯১

 

চীনের অবস্থা উত্তরোত্তর অধিকতর মন্দ হইবার দিকে চলিয়াছে। বর্ত্তমান মুহূর্ত্তে গভর্ণমেন্টের আটটি স্বতন্ত্র সৈন্যদল ভিন্ন ভিন্ন ভূভাগে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করিতেছে এবং তাহাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দক্ষিণদেশী সৈন্যদল লাগিয়া আছে। দশটি প্রদেশকে অল্পাধিক পরিমাণে দস্যুদলের হাতে ছাড়িয়া দেওয়া হইয়াছে; তাহারা প্রাদেশিক কর্ত্তৃপক্ষের নিকট হইতে কোনো বাধা না পাইয়া লুটিতেছে, খুন করিতেছে এবং মানুষ ধরিয়া লইয়া যাইতেছে।

 

৯২

 

স্থানীয় শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার জন্য যে প্রাদেশিক সৈন্যদলের নিযুক্ত থাকা উচিত তাহারা রাষ্ট্রীয় সংগ্রামে চলিয়া গিয়াছে, এবং যখনই তাহারা স্বস্থান ছাড়িয়া যায় তখনই বড়ো বড়ো ভূভাগ চোর-ডাকাতের হাতে গিয়া পড়ে। যেখানে সৈন্যেরা যুদ্ধ করিতেছে বলিয়া অনুমান করা হয় সেখানে লোকেরা যেরূপ উৎপীড়িত হইতেছে তাহা বাক্যের অতীত। গ্রামের লোকেদের ধন লুণ্ঠিত, তাহাদের গৃহ ভস্মীভূত এবং তাহারা নিহত হইতেছে। সমস্ত সহর ব্যাপিয়া লুট চলিতেছে, স্ত্রীলোক ও শিশুরা সৈনিকদের উপদ্রব হইতে রক্ষা পাইবার জন্য পর্ব্বতে ও দুর্গম স্থানে হাজারে হাজারে আশ্রয় লইতেছে। সৈন্যেরা ন্যূনতম পরিমাণে লড়াই ও প্রভূততম পরিমাণে লুট করিবার জন্য বাহির হইয়াছে।

 

৯৩

 

তিন জন কয়েদীকে তাহাদের নিজ নিজ কুঠরি হইতে অসর্তকতাবশত পালাইয়া যাইতে দিয়াছে বলিয়া সেন্‌ট্রাল জেলের একজন সর্দ্দার ও চৌকিদারের নামে যে অভিযোগ আসিয়াছিল, আলিপুরের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট তাহার বিচার শেষ করিয়াছেন। একটি দড়িতে ভাঙা কাচ আঠা দিয়া জুড়িয়া তাহাদের কুঠরির লোহার গরাদে কাটিয়া এই তিন জন কয়েদী অত্যন্ত চতুরতার সহিত পালাইতে পারিয়াছে। তাহার পরে যখন চৌকিদার দূরে গেল, তখন তাহার দৃষ্টি এড়াইয়া ইহারা ইলেক্‌ট্রিক্‌ তার ধরিয়া নীচে নামিয়া এবং সীমানার প্রাচীরের উপরে চড়িয়া পালাইয়া গেল। জেলের সুপারিন্টেণ্ডেন্ট্‌ প্রকাশ করেন যে, অভিযুক্তেরা সে সময়ে শাসনলাঘবযোগ্য অবস্থায় কাজ করিতেছিল, যেহেতু কর্মচারীদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রামক হওয়াতে জেল-ব্যবস্থা বিশৃলঙ্খলতায় উপনীত হইয়াছিল।

 

৯৪

 

খোলা জানালার কাছে পাঁচ মিনিট ধরিয়া সচেষ্টভাবে গভীর নিশ্বাস লওয়া, দিন আরম্ভ করার পক্ষে মন্দ সাধনা নহে। ইহাতে ফুস্‌ফুস্‌গুলির সকল অংশের স্থিতিস্থাপকতা-রক্ষার চর্চ্চা আপনি ঘটে, এবং তাহাদের মধ্যে রক্তনিশ্চলতার বাধা দেয়। ইহা স্বাস্থ্য এবং সুপরিপাকের সাহায্য এবং কোষ্ঠবদ্ধতার প্রতিকার করে। ইহা নিশ্চিত যে, অবাধ শ্বাসক্রিয়াকে যেসকল ব্যায়াম বাধা দেয় সে সমস্তই মন্দ; এবং মোটের উপরে আমরা ইহা বলিতে পারি যে, অন্য ব্যায়ামগুলি যে পরিমাণে শ্বাসক্রিয়ার আনুকূল্য করে এবং তদ্বারা তলপেটের যন্ত্রগুলির এবং হৃদ্‌যন্ত্রের উপকার সাধন করে বহুলাংশে সেই পরিমাণেই তাহারা ভালো।

 

৯৫

 

আমি একজন ব্রহ্মিক মহিলাকে জানি; একজন ইংরেজের সহিত তাঁহার বিবাহ হইয়াছে। ইংরেজটি অনেকগুলি হাঁসের বাচ্ছা কিনিয়াছিলেন, তাহারা বেশ সুন্দর হইয়া বড়ো হইয়াছিল, এবং আমার বন্ধু ইহাদের মধ্যে একটি আমাকে দিবেন বলিয়া প্রতিশ্রুত ছিলেন। কিন্তু একদিন যখন দেখিলাম সব হাঁসগুলি অন্তর্ধান করিয়াছে তখন যে কিরূপ নিরাশ হইয়াছিলাম কল্পনা করিয়া দেখ। আমার বন্ধু আমাকে বলিলেন-- তাঁহার অবর্ত্তমানে তাঁহার স্ত্রী নদীর উজানে কয়েকটি বন্ধুর সঙ্গে দেখা করিতে গিয়াছিলেন এবং তাঁহার সঙ্গে হাঁসগুলি লইয়া গিয়াছিলেন।

 

৯৬

 

তাহাদিগকে যে মারা হইবে সে তিনি সহিতে পারেন নাই; এই জন্য তাহাদিগকে লইয়া গিয়া তাঁহার বন্ধুদের মধ্যে এখানে একটি সেখানে একটি করিয়া বিতরণ করিলেন; কেন না তিনি জানিতেন হাঁসগুলিকে তাঁহারা ভালো করিয়া রাখিবেন এবং মারিবেন না। যখন তাঁহার স্বামীর প্রাতরাশের জন্য মুর্গি মারিতে হুকুম করিতে হইত তখন এই মহিলা ভয়ঙ্কর কষ্ট পাইতেন। আমি দেখিয়াছি পাচককে মুর্গি মারিতে বলিয়া তিনি দৌড়িয়া বারান্দায় গিয়া কানে হাত দিয়া বসিতেন-- ভয়, পাছে তাহার চীৎকার তিনি শুনিতে পান।

 

৯৭

 

পর্য্যবেক্ষণের দ্বারা যতগুলি নিশ্চিততম তথ্য জানা গিয়াছে তাহারই মধ্যে একটি এই যে, পৃথিবীর কঠিন আবরণটি স্থিতিস্থাপক-প্রকৃতির। হ্রাসবৃদ্ধিশীল চাপের ক্রিয়াধীনে বৃহৎ ভূখণ্ডসকল উঠে এবং পড়ে। এই জন্য এ কথা অনুমান করা সঙ্গত যে, সুদূর কালে মহাদেশব্যাপী দুই এক মাইল গভীর প্রকাণ্ড হিমসংহতির সঞ্চয় এমন চাপ দিয়াছে যে, তদ্বারা অধিকৃত বৃহৎ ভূখণ্ডে অধঃসরণ ঘটিয়াছে। অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে উত্তর মার্কিন মহাদেশের উত্তর-পূর্ব্ব অংশে ভূমির সুস্পষ্ট এবং সুপ্রত্যক্ষ উন্নয়নই এই কথাকে যেন সমর্থন করে। এইচ| এল| ফেয়ার্‌চাইল্‌ড্‌ "সায়ান্স্‌" পত্রে লিখিবার কালে বলিয়াছেন, সর্ব্বাপেক্ষা আধুনিক কালে মার্কিন দেশীয় তুষারাচ্ছাদনে যে ভূখণ্ড আবৃত হইয়াছিল সেই ভূখণ্ড তাহার বর্ত্তমান প্রতিষ্ঠা-স্থানের অনেক নীচে অবস্থিত ছিল, এমন সময়ে বরফের চাদর গলিয়া গেলে মৃদুমন্দ উত্থানক্রিয়ায় ইহা বর্ত্তমান উচ্চতায় আনীত হইয়াছে।

 

৯৮

 

ফরাসী সৈন্য কেবল দেশ, তাহার নগর, তাহার কৃষিক্ষেত্র, তাহার গৃহ ছাড়া আর কিছুর জন্য যে লড়িতেছে এমন কোনো নিদর্শন সে কখনো দেয় নাই। যে যুদ্ধলালসার চরম লক্ষ্য যুদ্ধ করা তাহার দ্বারা সে কখনো অভিভূত হয় না। এই যুদ্ধ অমঙ্গলরূপে উপদ্রবরূপে তাহার প্রিয় স্বদেশকে ধ্বংস করিতেছে ইহাই সে জানে; এবং এই মহামারী হইতে পৃথিবীকে মুক্ত করাই সে তাহার পিতৃপুরুষদের প্রতি, নিজের প্রতি এবং নিজের সন্তানদের প্রতি কর্ত্তব্য বলিয়া অনুভব করে। যুদ্ধ যে কত দূর যুক্তিবিরুদ্ধ মূঢ়োচিত এবং বর্ব্বর তাহা ব্যাখ্যা করিবার জন্য উৎকর্ষবান ফরাসী বিশেষ যত্নশীল, অথচ দেখিবে এই উৎকর্ষবান ফরাসীই তাঁহার মাতৃভূমির সৈনিকবেশ পরিধান করিয়া রণমত্ত ভৈরবের মতো কলের কামানের মুখে ধাবিত হইতেছেন।

 

৯৯

 

জাপানের বর্ত্তমানকালীন অবস্থার কঠোরতম বিচারকদের মধ্যে অধ্যাপক হাকুসন কুরিয়াগাওয়া একজন; তিনি ওসাকা মাইনিচি পত্রে ইহাই বলিতে চান যে, রাষ্ট্রনীতি এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে এবং ন্যাশনাল জীবনের প্রায় প্রত্যেক বিভাগে জাপান প্রহসন অভিনয় করিতেছে। তাঁহার নালিস এই-- রাষ্ট্রনীতিতে অধিকাংশ জাপানী আধুনিক কালের দুই শতাব্দী পিছনে আছে। তিনি বলেন-- পাশ্চাত্য প্রতিষ্ঠানগুলি গ্রহণ করিবার কালে তাহাদের অন্তঃস্থিত সারতত্ত্বটি বাদ দেওয়া হইয়াছে। ধার-করা প্রতিষ্ঠানগুলির উৎকর্ষসাধনের জন্য জাপান যত্নের ত্রুটি করে না, কিন্তু তাঁহার মতে জীবনের বুদ্ধিগত দিক এবং আধ্যাত্মিক দিকের চর্চ্চা সে উপেক্ষা করে। যে জাপানী জাতি ধনের প্রতি বিদ্বেষবান বলিয়া আখ্যাত, সে কি তলে তলে সকলের চেয়ে ধনের প্রতি আসক্ত নয়?

 

১০০

 

১৬১০ খ্রীষ্টাব্দে Galileo ভেনিসের সেন্ট্‌ মার্কের গির্জ্জার উচ্চ ঘন্টামন্দিরের (Campanile) উপর আরোহণ করিয়া সমাগত অভিজাতবর্গ ও সেনেটর্‌দিগকে আপন নব-উদ্ভাবিত দূরবীক্ষণ-যোগে দেখাইলেন যে, শুক্রগ্রহ কলাবিশিষ্ট, চন্দ্রে উচ্চ পর্ব্বতসকল আছে, তাহারা চন্দ্রের বক্ষে কৃষ্ণবর্ণ ছায়াপাত করে, কৃত্তিকা-নামক তারকাগুচ্ছে-- সাতটি নহে-- ছত্রিশটি তারা আছে এবং ছায়াপথ তারকায় রেণুময়। কিন্তু শীঘ্রই গ্যালিলিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধানল জ্বলিয়া উঠিল; ধর্ম্মাধ্যক্ষগণ দেখিলেন যে, প্রতিষ্ঠিত ধর্ম্মমত-সকল বিপদ্‌গ্রস্ত হইতেছে। তাঁহাকে শাস্ত্রদ্রোহিতা ও নাস্তিকতার অপরাধে অভিযুক্ত করা হইল। তাঁহার জ্যোতিষবিষয়ক আবিষ্কারের উপর অন্ধ-সংস্কারের জয়গৌরব তখনকার মতো সম্পূর্ণ হইল।

 

১০১

 

এই মহান্‌ প্রতিভাবান্‌ ব্যক্তি তাঁহার জীবিতকালের মধ্যেই দেখিলেন যে, তাঁহার গ্রন্থসকল য়ুরোপের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় হইতে নির্ব্বাসিত এবং তাহাদের প্রকাশ নিষিদ্ধ এবং জানিয়াছিলেন যে মিথ্যা শপথ করিয়া তিনি নির্য্যাতন হইতে অব্যাহতি পাইলেন-- এই পরিচয় লইয়া সমস্ত উত্তরকালের সম্মুখীন হওয়াই তাঁহার ভাগ্যে আছে। গ্যালিলিওকে রোমে প্রথমবার আহ্বান করার ষোল বৎসর পূর্ব্বে ঐ নগরে Giordano Brunoকে পুড়াইয়া মারা হয়। উৎপীড়ন হইতে অব্যাহতি-লাভের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে ব্রুণো ইংলণ্ডে আসিয়াছিলেন। সতর্ক বুদ্ধির প্রণোদনে তিনি প্রায়ই বাসস্থান পরিবর্ত্তন করিতে বাধ্য হইতেন এবং তিনি যে অবশেষে ভেনিসে আসিয়া পড়িবেন তাহাতে আশ্চর্য কিছুই নাই।

 

১০২

 

অন্যান্য ইটালীর নগর অপেক্ষা এখানে ধর্ম্মবিষয়ক স্বাধীনতা অধিকতর পরিমাণে দেওয়া হইত এবং এখানে কখনও দাহনযূপ স্থাপন করা হয় নাই। গ্রাণ্ড্‌ কেনালের উপরিস্থিত Piazzo Mocenig এ ইন্‌কুইজিসনের দূতগণ তাঁহাকে অবশেষে তাড়া করিয়া পাড়িয়া ফেলিল। তাঁহার বিরুদ্ধে ইন্‌কুইজিসনের প্রথম এই অভিযোগ উপস্থিত হইল যে, তিনি অসংখ্য জগৎ আছে বলিয়া শিক্ষা দিয়াছেন। Piazzo Campo di Fiore -তে ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে তাঁহাকে পুড়াইয়া মারা হয়। গ্যালিলিওর সমসাময়িক ব্যক্তিদিগের মধ্যে গ্রহগতির নিয়ম-আবিষ্কারক কেপ্‌লারই সর্ব্বপ্রধান ছিলেন। ঐ নিয়মগুলি নিউটনের মহত্তর আবিষ্কারের পথ সুগম করিয়া দেয়।

 

১০৩

 

কেপ্‌লার নিন্দিত ও কারারুদ্ধ হন এবং তাঁহার মত-সকলকে বাইবেলের মতের সহিত সঙ্গত করিতে হইবে বলিয়া সতর্ক করিয়া দেওয়া হয়। তৎকাল-প্রচলিত যাদুবিদ্যায় অন্ধবিশ্বাস হইতে কেপ্‌লারের জীবনের এক অতি ভয়ানক অভিজ্ঞতা-উদ্ভব হয়। তাঁহার মাসি ও মাকে ডাইনি বলিয়া অভিযুক্ত করা হয় এবং তাঁহাদিগকে পুড়াইয়া মারিবার দণ্ডাজ্ঞা দেওয়া হয়। কেপ্‌লারের অক্লান্ত চেষ্টার ফলে এবং শক্তিশালী বন্ধুদিগের প্রভাবে তাঁহার মাতা রক্ষা পান, কিন্তু বর্ষাধিক কারাবাসকালে তিনি যে যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন তাহার ফলে কয়েক মাস পরে তাঁহার মৃত্যু হয়। কেপ্‌লারের মাসিকে দাহনযূপে পুড়াইয়া মারা হয়।

 

১০৪

 

ধনী হইবার চেষ্টা ব্রহ্মীর নাই। ধন কামনা করা তাহার স্বভাবসঙ্গত নহে এবং যখন সে তাহা পায় তখন তাহা জমাইবার চেষ্টা করাও তাহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ। প্রাত্যহিক অভাবের পক্ষে যাহা যথেষ্ট তদতিরিক্ত অর্থের মূল্য তাহার কাছে বেশি নহে। জমির পরে জমি এবং টাকার পরে টাকা বাড়াইয়া তুলিতে সে খেয়াল করে না এবং তাহার টাকা আছে এই ঘটনাটুকুমাত্র তাহাকে কোনো সুখ দেয় না। টাকা দিয়া যেটুকু কেনা যাইতে পারে, টাকার মূল্য তাহার কাছে কেবল সেইটুকু। যখন তাহার সামান্য অভাব পূরিয়া গেল, নিজের জন্য যখন একটি নূতন রেশমের কাপড় কেনা এবং স্ত্রীকে একটি সোনার বালা দেওয়া হইল, যখন গ্রামশুদ্ধ সকলকে নিমন্ত্রণ করিয়া তাহাদিগকে যাত্রাগান শুনাইয়া আমোদ দেওয়া সারা হইল, তখন, কখনো বা তাহার পূর্ব্বেই, সে তাহার অবশিষ্ট টাকা দানে খরচ করিয়া ফেলে।

 

১০৫

 

পূর্ব্বে যাহা কিছু আমি মন্দ এবং হীন বলিয়া মনে করিতাম-- চাষীদের গ্রাম্যতা, মোটা ভাত, মোটা কাপড়, সাদাসিধা রকমের বাসস্থান ও চালচলন-- এ সকলই আমার চক্ষে ভালো এবং মহৎ হইয়া উঠিয়াছে। যাহা বাহ্যত আমাকে অন্য সকলের ঊর্দ্ধে তুলিয়া দেয়, যাহা তাহাদের হইতে আমাকে পৃথক্‌ করিয়া দেয়, এমন কিছুতে এখন আমি যোগ দিতে পারি না। পূর্ব্বের ন্যায় এখন আমি আর নিজের সম্বন্ধে বা অন্যের সম্বন্ধে কোনো পদবী পদ বা গুণকে মানবসাধারণের পদবী বা গুণের চেয়ে  বড়ো করিয়া স্বীকার করিতে পারি না। আমি যশ বা প্রশংসা সন্ধান করিয়া ফিরিতে পারি না, আমি এমন কোনো উৎকর্ষ কামনা করি না যাহা মানবসাধারণ হইতে আমাকে স্বতন্ত্র করে। আমার সমস্ত সত্তায়-- আমার বাসস্থানে, অশন বসনে, আমার লোকব্যবহারে, যাহা কিছু জনসাধারণ হইতে আমাকে বিচ্ছিন্ন না করে, পরন্তু তাহাদের নিকট আকর্ষণ করে, তাহাই কামনা না করিয়া আমি থাকিতে পারি না।

 

১০৬

 

অতি শৈশবকালেই সমুদ্রশুশুকের সহিত আমার প্রথম পরিচয় হয়। লণ্ডন হইতে বৃটিশ গায়েনার ডেমেরারা'তে আমার প্রথম সমুদ্রযাত্রাকালে ইহা ঘটে। আকাশ অত্যন্ত পরিষ্কার ছিল এবং উত্তর আট্‌লান্টিকের শৈবালাচ্ছন্ন যে আবর্ত্ত সারাগাসো-সাগর নামে সুবিখ্যাত তাহাই পার হইবার সময় আমাদের পুরাতন জাহাজে অলস বায়ুর বেগ এত দুর্ব্বল ছিল যে, সেই তৃণবর্ণ পিণ্ডগুলিকে ঠেলিয়া আমরা অনেক সময়ে প্রায় পথ করিতে পারিতেছিলাম না। ক্ষণে ক্ষণে আরমা এই সকল শৈবালের মধ্যে বিস্তৃত ফাঁকা জায়গা পাইতেছিলাম, সেইসকল পরিষ্কার স্থানের কোনো একটিতে মন্দ গমনে চলিতে চলিতে সহসা আমরা এক বৃহৎ ঝাঁক মাছের মধ্যে আসিয়া পড়িলাম। তাহারা সংখ্যায় বহু সহস্র হইবে এবং তাহারা চলমান সৈন্যগণের মতো নিবিড়ভাবে দল বাঁধিয়া সাঁতার দিতেছিল।

 

১০৭

 

একই মুহূর্ত্তে উহারা সকলে যখন পাশ ফিরিল, উহাদের শরীর হইতে তখন একটি আভা প্রক্ষিপ্ত হইল; যেন প্রকাণ্ড একখানি দর্পণ সূর্য্যালোক্‌কে আমার চক্ষুর উপরে কেন্দ্রীভূত করিয়া অকস্মাৎ আবর্ত্তন করিল। উত্তেজনায় পূর্ণ হইয়া একটি নাবিককে রেলিঙের নিকট লইয়া গিয়া সেখান হইতে ঝাঁকটি নির্দ্দেশ করিয়া দেখাইলাম। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, "ইহারা কী?" একবার মাত্র দৃষ্টিপাত করিয়া এবং "শুশুক" এই একটি কথা বলিয়াই সে ছুটিয়া চলিয়া গেল এবং ব্যাপারটা যে কী ইহাই আমি চিন্তা করিতে লাগিলাম। বাকি দিনটা এই সব সুন্দর মাছ আরো বেশি করিয়া দেখিবার কামনা হইতে আমি মুক্তি পাইলাম না। আমি তাহাদের প্রতি এমনই সতর্ক দৃষ্টি রাখিয়াছিলাম, যেন উহাদিগকে আবিষ্কার করার উপরেই আমার জীবন নির্ভর করিতেছে।

 

১০৮

 

সহসা ইহাদের এই নিবিড়সম্বদ্ধ স্তূপের মধ্যে উহাদের একটি স্বজাতীয় প্রাণী তীরবেগে আসিয়া পড়িল-- সে উহাদের অপেক্ষা অনেক বৃহত্তর, অন্ততঃ পক্ষে দৈর্ঘ্যে ছয় ফুট এবং সেই অনুপাতেই চওড়া হইবে। আমি দেখিলাম, উহারা লক্ষ্যশূন্যভাবে বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়িল, যেন জানে না কোথায় পালাইতে হইবে। এই সন্ত্রস্ত তরুণ প্রাণীগুলির মধ্যে উক্ত স্বজাতিখাদক যখন ইতস্তত তীরবেগে ছুটিতে লাগিল তখন তাহাকে ক্ষণকালের জন্য অস্পষ্ট দেখিতে পাওয়া গেল; তাহার পরে জল রক্তে এবং মৎস্যের ভাসমান ছিন্নাংশে এমন মলিন হইয়া গেল যে, কিছুক্ষণের মতো আর এই উৎপাত দেখিতে পাইলাম না।

 

১০৯

 

সমুদ্রশুশুকের জীবন নিশ্চয়ই অত্যন্ত সুখের হইবে, কারণ সে বিনা বাধায় মহাসমুদ্র-সকলের উন্মুক্ত প্রসারতার মধ্যে ভ্রমণ করিয়া থাকে। উহার যেসব শত্রু আছে তাহাদিগকে বেগে ছাড়াইয়া চলিতে ও এড়াইয়া যাইতে সে খুবই সমর্থ। সময় সময়ে অসতর্ক হইয়া সে হাঙ্গরের শিকার হইয়া পড়ে, কিন্তু আমার মনে হয় ইহা কদাচিৎ ঘটিয়া থাকে। এরূপ এক ঘটনা আমি একবার দেখিয়াছিলাম। প্রশান্ত মহাসাগরে, সম্পূর্ণ এক শান্ত দিনে মাস্তুলের উপরিস্থিত আমার আশ্রয়স্থান হইতে নীলসমুদ্রের তলে যাহা কিছু ঘটিতেছে একটি শক্তিশালী দূরবীণের মধ্য দিয়া সেসমস্তই অত্যন্ত পরিষ্কাররূপে দৃষ্টিগোচর হইতেছিল। খুব কাছেই প্রকাণ্ড এক কাঠের গুঁড়ি ভাসিতেছিল। ইহা নিরীক্ষণকালে জমকালো এক সমুদ্রশুশুক দেখিতে পাইলাম-- ইহার চর্ম্ম হইতে  সূর্য্যকিরণে নীল এবং সোনালি আভা ঠিক্‌রাইতেছে; সে আলস্যভরে লেজ নাড়িতে নাড়িতে কাষ্ঠখণ্ডের সম্মুখ দিয়া চলিয়া যাইতেছে, মনে হয় যেন সে আহার করিয়া পরিতৃপ্ত।

 

১১০

 

ঠিক তাহার পশ্চাতে কাষ্ঠখণ্ডের তলদেশ হইতে এক অস্পষ্ট ছায়া নির্গত হইয়া উপরিভাগে উৎক্ষিপ্ত হইল, সেখানে এক ঘূর্ণি এবং আবিলতা দেখা দিল এবং ঐ সৌখিন সমুদ্রজীবটি দুই খণ্ডে বিভক্ত হইয়া গেল; উহার একখণ্ড চতুর হাঙ্গরের গলার মধ্য দিয়া অদৃশ্য হইল। অবশ্য দ্বিতীয় অর্দ্ধাংশও সত্বর প্রথমকে অনুসরণ করিয়া হাঙ্গরের কণ্ঠ দিয়া নামিয়া গেল-- এবং তখন শেষোক্ত প্রাণীটিও পুনরায় আপনাকে প্রচ্ছন্ন করিল। আমি লক্ষ্য করিলাম, তিনবার এই হাঙ্গর এইরূপ কৌশলে কৃতকার্য্য হইল; কিন্তু একমাত্র এই উপলক্ষ্যেই আমি দেখিলাম যে, একটি শুশুক চতুরতায় একটি হাঙ্গর-কর্ত্তৃক পরাভূত হইয়াছে।

 

১১১

 

মধ্যযুগে লোকের এইরূপ বিশ্বাস ছিল যে, এক সহস্র খৃষ্টীয় শকে জগতের নিশ্চিত অবসান ঘটিবে। খৃষ্টান সমাজ এই বিশ্বাস লইয়াই জীবননির্ব্বাহ করিত এবং যে ব্যক্তি ইহাতে সন্দেহ করিত সে শাস্ত্রদ্রোহী বলিয়া গণ্য হইত। মধ্যযুগের অধিকাংশ আইন ও রাজদত্ত দলিল "জগতের আসন্ন দিনান্তকালে" এই বাক্যের দ্বারা আরম্ভ করা হইত। দশম শতাব্দীর সমাপ্তি যখন নিকটতর হইয়া আসিল তখন ভয়ের পরিমাণও বাড়িয়া উঠিল। য়ুরোপ যেন তখন তাহার শেষ উইল লিখিয়া সারিল এবং চার্চ্চ্‌কে যাহা দান করা হইল তাহার অধিকাংশের তারিখ সেই যুগ হইতেই সুরু। লোকেরা তাহাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে ইচ্ছা করিল। তাহারা চার্চ্চকে আপন সম্পত্তি দিয়া ফেলিল, বস্তুত সে সম্পত্তিতে তাহাদের আর অধিক প্রয়োজন থাকার কথা ছিল না; এবং সেই একই কারণে সরকারী সম্পত্তির অধিকাংশই পুরোহিতসম্প্রদায়ের অধিকারে আসিল। কিন্তু এক হাজার সালও কাটিয়া গেল এবং আমাদের ভূমণ্ডল তাহার কক্ষের চতুর্দ্দিকে আবর্ত্তন বন্ধ করিল না। তখন হইতে জগতের অন্ত-সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্‌বাণী উচ্চারণ করিতে অল্প লোকই সাহস করিয়াছে।

 

১১২

 

পুরাকালে লোকেরা ধূমকেতুর সহিত সংঘাতকে ভয় করিত, কিন্তু যখন হইতে এই নভশ্চর পদার্থসকল আমাদের নিকট অধিকতর সুবিদিত হইয়াছে তখন তাহারা আর কাহাকেও ভয় দেখাইতে পারে না। ধূমকেতু কোনো প্রাণীর ক্ষতি করিয়াছে এমন একটি ঘটনারও উল্লেখ করা যাইতে পারে না। তাহাদের পুচ্ছ এত সূক্ষ্ম গ্যাসে নির্ম্মিত যে, বহু সহস্র মাইল পুরু হইলেও তাহা একগ্লাস জলের মতোই স্বচ্ছ। এরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ আছে যে, এই গ্যাস বেন্‌জইন অথবা পেট্রোলিয়ম বাষ্পের দ্বারা গঠিত, কিন্তু ধূমকেতুর যে পুচ্ছ বিমানপথচারী দুই জ্যোতিষ্কের মধ্যবর্ত্তী আকাশের সেতু রচনা করিতে পারে তাহার সমস্ত উপাদান সম্ভবত কয়েকটি মাত্র পিপার সামান্য স্থানের মধ্যে প্রবেশযোগ্য। অতএব পেট্রোলিয়ম-বর্ষণ আশঙ্কা করিবার প্রয়োজন নাই।

 

১১৩

 

কিন্তু অন্যসকল বিপত্তি আছে। আমাদের জীবিতকালের মধ্যেই দেখিয়াছি বাহিরের কোনও কারণ ব্যতিরেকেও আমাদের ভূমণ্ডল বিদীর্ণ হইয়াছে। ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে আগষ্ট্‌ মাসে সুণ্ডা দ্বীপে কারাগাতোয়া-নামক একটি ক্ষুদ্র জ্বালামুখীর সমুদ্রতলবর্ত্তী একটি স্থানে এইরূপ ঘটিয়া অগ্নিময় গর্ত্তের মধ্যে সমুদ্রজলের প্রবেশপথ হইয়াছিল। অগ্নিগহ্বর সমুদ্রকে মেঘলোকে উৎক্ষিপ্ত করিয়া দিয়াছিল; তাহাতে প্রকাণ্ড তরঙ্গ সৃষ্ট হইয়া তাহা তটভূমিতে এক শত ফুট উর্দ্ধে উচ্ছ্রিত হইয়াছিল। তাহা জ্বালামুখীর নিকটবর্ত্তী সমস্ত সহর ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল এবং পঞ্চাশ হাজার মানুষকে জলমগ্ন করিয়াছিল। ইহাই পঞ্চাশ হাজার লোকের পক্ষে জগতের অবসান, এবং সেই অবসান সম্পূর্ণ অপ্রতীক্ষিতভাবেই আসিয়াছিল। এই আপৎপাতের বেগকে বহুগুণিত করিয়া কল্পনা করা যাক-- মনে করা যাক হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের Mouno Los-নামক পৃথিবীর প্রবলতম দহমান জ্বালামুখী সহসা প্যাসিফিক মহাসাগরে নিমজ্জিত হইয়াছে; তাহা হইলে এমন এক তরঙ্গ সহজেই উঠিতে পারে যাহা কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বহু জনসমূহকে ডুবাইয়া দিতে পারে। ইহা বিনা ঘোষণায় কালই, এমন কি, আজই ঘটিতে পারে।

 

১১৪

 

জাপানে চাউল-লুণ্ঠন-ঘটিত গুরুতর দাঙ্গায় পর্য্যবসিত যে খাদ্যসমস্যা গত কয়দিনের টেলিগ্রামে বর্ণিত হইয়াছে তাহা নূতন ব্যাপার নহে; কারণ বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি প্রধান আহার্য্য দ্রব্য পাওয়া কঠিন হইয়া উঠিয়াছে। মে মাসের শেষভাগে য়োকোহামার একজন পত্রলেখক তাঁহার লিখিত পত্রে নির্দ্দেশ করিয়াছেন যে, বিদেশী চাউল আমদানী ও সঙ্গত মূল্যে উহার বিক্রয় নিয়ন্ত্রিত করার জন্য জাপান গভর্ণমেন্ট্‌ কতকগুলি বহুপল্লবিত নিয়মপত্র বাহির করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।

 

১১৫

 

তিনি বলিয়াছিলেন সচরাচর জাপানের প্রয়োজনীয় সমস্ত চাউল প্রায় জাপানেই উৎপন্ন হইয়া থাকে, এবং বিদেশী চাউল-সম্বন্ধে বরাবর জাপানের একটি প্রবল বিরুদ্ধ সংস্কার আছে। যাহা হউক ইদানীং জনসংখ্যার বৃদ্ধি-বশত চাউলের খরচ চাউলের জোগানকে অতিক্রম করিয়াছে। তবুও আমদানি করা আহার্য্যদ্রব্যে জাপানের আবশ্যকতা অপেক্ষাকৃত অল্প। কারণ, কোরিয়া ও হোক্কেডোর অনেক স্থান এখনো অনাবাদী পড়িয়া আছে এবং দক্ষিণ মাঞ্চুরিয়াও জাপানের একটি বৃহৎ শস্যস্থলী। কিন্তু গত কয়েক বৎসর ধরিয়া চাউল-উৎপাদন অপেক্ষা অধিকতর লাভজনক নিষ্কাশনপথে জাপানী শক্তি ধাবিত হইয়াছে।

 

১১৬

 

কল্পনা করা যাক, আমাদের পদাতিক সৈন্যের একদল বিশ্রামের জন্য গর্ত্তগড়ের বাহিরে আসিয়াছে। মাটির আঁকাবাঁকা ফাটল বাহিয়া দুই মাইল হাঁটিয়া একটি গ্রামের নিকট তাহারা উপরিতলে পৌঁছিয়াছে। গ্রামের পূর্ব্বদিকের দেওয়াল-কয়টিতে অনেকগুলি ছিদ্র আছে, কিন্তু গ্রামখানির একেবারে ধ্বংস হয় নাই। গ্রামের প্রধান রাস্তায় যখন সৈন্যদল প্রবেশ করিল ঠিক সেই সময় কয়েকটি জার্ম্মান কামান, ঐখানে কোথাও বৃটিশ কামান না থাকা সত্ত্বেও আন্দাজে শেল্‌ নিক্ষেপ করিয়া গ্রামময় তাহার সন্ধান করিতেছে। আরও অনেক শেল্‌ গ্রাম ছাড়াইয়া রাস্তার উপর বেশ একটু ঘন ঘন পড়িতেছে। এই রাস্তা ধরিয়াই সৈন্যদলকে এক মাইল দুই মাইল দূরে ভাঙা বাড়ির মাটির তলের কুটুরিতে তাহাদের যথানির্দিষ্ট বাসায় পৌঁছিতে হইবে। গ্রামের রাস্তা গ্রামখানির সম্মুখভাগের সঙ্গে সমান্তরালরেখায় উত্তর হইতে দক্ষিণ পর্য্যন্ত চলিয়া গিয়াছে। যে পর্য্যন্ত না বর্ষণের ঝড় সাঙ্গ হয়, সে পর্য্যন্ত রাস্তার পূর্ব্বদিকে বাড়িগুলির নিরাপদ ভাগে সৈন্যদিগকে লাইন ভঙ্গ করিয়া বিশ্রাম করিবার জন্য দলপতি আদেশ করিলেন।

 

১১৭

 

গর্ত্তগড় হইতে যাহারা আসিয়াছে তাহাদের প্রত্যেকেই অত্যন্ত ক্লান্ত। কোনো একটা ছুতায় থামিবার জন্য উৎসুক সৈন্যদল কুটীরের দ্বারবর্ত্তী সিঁড়ির ধাপের উপর হইতে অসৈনিক জীবনযাত্রা নিরীক্ষণ করিয়া, দীর্ঘকাল গর্ত্তগড়ের কর্ত্তব্যে কালযাপনের পর, আমোদ এবং কৌতূহল অনুভব করিতেছে। কুটীরের যে অধিবাসিগণ রাস্তার নিরাপদ অংশে বাস করিতেছে, তাহারা তাহাদের দরজার কাছে আসিয়া সৈন্যদের সঙ্গে নিরুদ্‌বিগ্নভাবে আলাপ করিতে লাগিল। পনেরো বছর বয়সের মতো চেহারার এক ঊনিশ বছরের বালককে অত্যন্ত শ্রান্ত দেখিয়া একজন স্ত্রীলোক তাহাকে একটু গরম কাফি আনিয়া দিল। বালক কাফির মূল্য দিতে চাওয়ায় স্ত্রীলোকটি হাসিয়া বলিল, "যুদ্ধের পরে, যুদ্ধের পরে।"

 

১১৮

 

বিধবা ছেলেপিলের মায়েরা অথবা যেসকল ফরাসী এক্ষণে যুদ্ধক্ষেত্রে আছেন তাঁহাদের স্ত্রীরাই এখানকার মতো জায়গায় অধিকাংশ গৃহস্থালীর কর্ত্তৃপক্ষ। উহারা গৃহত্যাগ করিতে ভয় পায়, অথবা অন্যত্র কোথায় যাইবে জানে না, এবং উহারা ইংরেজ সৈনিকদের কাছে স্বল্প কয়েক প্রকারের পণ্যদ্রব্য মাত্র আর মাটির তলার ভাণ্ডার-ঘরে ও গর্ত্তসকলের মধ্যে যে সব জিনিসের প্রয়োজনের অন্ত নাই সেই চকোলেট্‌, কমলালেবু, আপেল, শার্ডিন মাছ, মোমবাতি বিক্রয় করিয়া দিনপাত করিতে পারে। অন্য স্ত্রীলোকেরা সৈনিকদের কাপড় ধোলাই করিতেছে কিংবা তাহারা জানালায় "বিলাতী বিয়ার"-লেখা একখানি কার্ড ঝোলানো ছোটো ছোটো বেসরকারী মদ্যশালা খুলিয়াছে, সেখানে একটি ঘরের চতুর্দ্দিকের দেওয়ালের গায়ে টেবিল সাজানো।

 

১১৯

 

আমি পীড়িত ছিলাম, অত্যন্ত পীড়িত, এত বেশি যে আমার কলিকাতা-বাসের সমস্ত শেষ মাসটি আমি শয্যাগত ছিলাম এবং লেখা এমন কি চিন্তা করাও আমার পক্ষে নিষিদ্ধ ছিল। খুব দুর্ব্বল অবস্থাতেই আমাকে আমার ঘর হইতে জাহাজে লইয়া যাওয়া হইয়াছিল; কিন্তু আনন্দের সহিত জানাইতেছি যে, এখনি আমি প্রায় রোগমুক্ত হইয়াছি। সুমাত্রা দ্বীপের দর্শনলাভ এবং মলয় দ্বীপপুঞ্জের স্বাস্থ্যদায়ক বায়ুপ্রবাহ আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তন সাধন করিয়াছে। এবং যদিও আমি এখনো দুর্ব্বল বোধ করিয়া থাকি তবুও মোটের উপরে বলিতে পারি যে, আমি সুস্থ অবস্থায় এবং স্ফূর্ত্তিতেই আছি। বাট্টা দেশের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত টাম্পানুলী আমি সবেমাত্র ছাড়িয়া আসিয়াছি। বাট্টারা সুমাত্রার একটি সুবিস্তীর্ণ জনবহুল জাতি; দ্বীপটির যে অংশ চীন ও মেনাঙ্গকাবুর মধ্যে সমুদ্রের উভয় তীর পর্য্যন্ত ব্যাপ্ত উহারা তাহারই সমগ্রভাগ অধিকার করিয়া বাস করে। তীরপ্রদেশটি বিরলবসতি কিন্তু অভ্যন্তর-ভাগে অধিবাসিগণ অরণ্যের পত্রপুঞ্জের ন্যায় নিবিড় বলিয়া কথিত আছে। সমস্ত জাতির জনসংখ্যা সম্ভবত দশ লক্ষ হইতে বিশ লক্ষের মধ্যে হইবে।

 

১২০

 

উহাদের রীতিমত শাসনতন্ত্র আছে এবং উহারা মহাবাগ্মী; উহারা প্রায় সকলেই লিখিতে জানে এবং উহাদের নিজের ভাষা এবং বিশেষ এক প্রকার লেখা অক্ষর আছে; উহাদের ভাষায় এবং শব্দে এবং উহাদের কোনো কোনো নিয়মে ও প্রথায় হিন্দুধর্ম্মের প্রভাব অনুমান করা যাইতে পারে, কিন্তু উহাদের নিজেরও বিশেষ এক প্রকার ধর্ম্ম আছে। উহারা "দিবতা অস্‌সি অস্‌সি" নামে এক এবং অদ্বিতীয় দেবতাকে স্বীকার করিয়া থাকে এবং তাঁহার দ্বারা সৃষ্ট বলিয়া কল্পিত উহাদের তিনটি বড়ো দেবতা আছে। উহারা যুদ্ধপ্রিয় এবং সমস্ত ব্যবহারেই অত্যন্ত ন্যায়পর, নিষ্কপট। উহাদের দেশ প্রকৃষ্টভাবে আবাদ করা হইয়াছে এবং এখানে অপরাধ অল্প। উহাদের অনুকূলে এই সমস্ত কথা বলিবার থাকা সত্ত্বেও, Mr. Marsden যে প্রমাণ প্রয়োগ করিয়াছেন তাহাতে বাট্টারা যে নরভুক্‌ এ সম্বন্ধে কোনো অপক্ষপাত ব্যক্তির মনে আর সন্দেহ মাত্র থাকে না। আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি, বাট্টারা মন্দ লোক নহে এবং আমি এখনো সেইরূপ মনে করি, যদিচ তাহারা পরস্পরকে খাইয়া থাকে এবং মানুষের মাংস বলদ বা শূকরের মাংসের চেয়ে তাহাদের কাছে রুচিকর।

 

১২১

 

এ কথা তোমাকে বিবেচনা করিতে হইবে যে, আমি তোমাকে একটি নূতন রকম সামাজিক অবস্থার বিবরণ জানাইতেছি। বাট্টারা বর্ব্বর নহে, কারণ তাহারা লিখিতে পড়িতে জানে এবং যাহারা আমাদের ন্যাশনাল স্কুলে পড়িয়া মানুষ, ইহারা সম্পূর্ণ তাহাদেরই মতো এমন কি তাহাদের চেয়ে বেশি চিন্তা করিতে পারে। তাহাদের বহুপ্রাচীন শাস্ত্রানুশাসন আছে এবং এইসকল অনুশাসনরে প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাহাদের পূর্ব্বপুরুষদের অনুষ্ঠানসকলের প্রতি ভক্তি-বশতই তাহারা পরস্পরকে খাইয়া থাকে।  এই অনুশাসনে আছে যে, চারিটি বিশেষ অপরাধে অপরাধীকে জীবিত-অবস্থায় খাইতে হইবে। এবং এই অনুশাসনেই বলিতেছে যে, বড়ো বড়ো যুদ্ধে বন্দী-সকলকে জীবিত মৃত বা কবরস্থ সকল অবস্থাতেই আহার করা বৈধ। আমাকে নিশ্চয় করিয়া বলা হইয়াছে এবং আমি ইহা যথার্থই বিশ্বাস করিয়া থাকি যে, এই সকল লোকদের মধ্যে অনেকেই অন্য সকল কিছুর চেয়ে মানুষের মাংসই বেশি পছন্দ করিয়া থাকে, কিন্তু এরূপ প্রবৃত্তি সত্ত্বেও বিধিসঙ্গত উপলক্ষ্য ছাড়া তাহারা কখনো এই লালসাকে প্রশ্রয় দেয় না।

 

১২২

 

আমার প্রিয়তম বন্ধু--

 

আমাদের পরিবারে যে ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা হয়তো White কিংবা আমার বন্ধুদের মধ্যে কাহারো কাছ হইতে কিংবা খবরের কাগজ হইতে এত দিনে খবর পাইয়া থাকিবে। আমি কেবল তোমাকে উহার একটি মোটামুটি নক্সা দিব। আমার প্রিয়তমা ভগিনী উন্মত্ততার ঝোঁকে তাহার আপন মায়ের মৃত্যুর কারণ হইয়াছে। বর্ত্তমানে সে পাগলা-গারদে আছে। আমার আশঙ্কা হইতেছে যে, তাহাকে হাঁসপাতালে পাঠাইতে হইবে।

 

১২৩

 

ঈশ্বর আমার বুদ্ধি স্থির রাখিয়াছেন। আমি আহার-পান করি, ঘুমাই এবং আমার বিশ্বাস আমার বিচারশক্তিও বেশ প্রকৃতিস্থ আছে। আমার পিতা বেচারা সামান্যরূপে আহত হইয়াছিলেন এবং তাঁহাকে ও আমার পিসিকে সেবা করিবার জন্য আমিই আছি। Blue-Coat স্কুলে Mr. Morris আমাদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ব্যবহার করিতেছেন, এবং আমাদের আর কোন বন্ধু নাই কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমি খুব শান্ত ও সমাহিত আছি এবং যাহা কিছু করিতে বাকি ছিল তাহা উত্তমরূপেই করিতে পারিতেছি। যত দূর সম্ভব একখানি ধর্ম্মভাবপূর্ণ পত্র লিখিও, কিন্তু যাহা গিয়াছে এবং চুকিয়াছে তাহার কোনো উল্লেখ করিয়ো না।

 

১২৪

 

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, Coleridge! যদিও ইহা আশ্চর্য্য শুনাইবে তথাপি আমি বরাবর সমাহিত শান্ত ছিলাম, তাহার কোনো অন্যথা হয় নাই। এমন কি, সেই ভয়ানক দিনে এবং ভয়ংকর দুঃখের মধ্যেও আমি এমন ধৈর্য্য রক্ষা করিয়াছিলাম যাহাকে বাহিরের লোকে হয়তো ঔদাসীন্য বলিয়া ব্যাখ্যা করিয়া থাকিবে; এই ধৈর্য্য নৈরাশ্যজনিত নহে। এরূপ বলা কি আমার পক্ষে নির্ব্বুদ্ধিতা অথবা পাপ হইবে যে, আমার মধ্যে একটি ধর্ম্মতত্ত্বই আমাকে সর্ব্বাপেক্ষা অধিক আশ্রয় দান করিয়াছিল? আমি বুঝিয়াছিলাম যে, অনুশোচনা করা ছাড়া আমার অন্য কাজ করিবার আছে।

 

১২৫

 

সেই প্রথম দিনের সন্ধ্যায় আমার পিসি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া আছেন, দেখিয়া মনে হয় যেন মুমূর্ষ; আমার পিতা তাঁহার যে কন্যাটিকে অত্যন্ত ভালবাসিতেন এবং যে তাঁহাকে কিছু কম ভালবাসিত না, তাহার দ্বারা আঘাত-হেতু কপালে-পলেস্তারা-দেওয়া; পাশের ঘরে আমার মা একটি শব মাত্র; তবুও আমি আশ্চর্য্যরূপে আশ্রয় পাইয়াছিলাম। সেই রাত্রিতে আমি অনিদ্রাবশত চক্ষু বুজি নাই, কিন্তু আতঙ্কশূন্য ও নৈরাশ্যশূন্য হইয়া বিছানায় পড়িয়াছিলাম। তাহার পর হইতে আর একটি দিনও আমার ঘুমের ব্যাঘাত হয় নাই। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পদার্থসকলের 'পরে ভর করার অভ্যাস আমার অনেক দিন ছিল না, ইহাই আমাকে খাড়া রাখিয়াছিল।

 

১২৬

 

পবিরারের সমস্ত ভার আমার উপরই পড়িয়াছিল, কারণ আমার ভ্রাতা (আমি তাঁহার প্রতি স্নেহশূন্য হইয়া বলিতেছি না) কোনো কালেই বৃদ্ধ ও দুর্ব্বলের সেবায় উৎসাহী ছিলেন না, বর্ত্তমানে তিনি তাঁহার পায়ের পীড়া লইয়া এই সকল কর্ত্তব্য হইতে দায়মুক্ত হইয়াছিলেন এবং তখন আমি একাই পড়িয়াছিলাম। ঠিক ইহার পরদিনে, এরূপ ঘটনায় সচরাচর যেমন হইয়া থাকে সেইমতোই, আমাদের ঘরে অন্তত বিশ জন লোক রাত্রিভোজনে বসিয়া গিয়াছিল, তাহারা আমাকে তাহাদের সহিত খাইতে বসিতে রাজি করিয়াছিল। তাহারা সকলেই ঘরের মধ্যে আমোদ করিতেছিল। তাহাদের মধ্যে কেহ বা বন্ধুত্ববশত, কেহ বা কৌতূহলবশত, কেহ বা স্বার্থবশত আসিয়াছিল।

 

১২৭

 

আমি উহাদের সঙ্গে যোগ দিতে যাইব, এমন সময় আমার স্মরণ হইল যে, আমার মৃত মাতা-- এমন মা যিনি সারাজীবন সন্তানদের কল্যাণ ব্যতীত আর কিছু কামনা করেন নাই, পাশের ঘরে, একেবারে পাশের ঘরটিতে পড়িয়া রহিয়াছে। ঘৃণা, শোকের উত্তেজনা, অনুতাপের মতো একটা কিছু আমার মনের উপর ছুটিয়া আসিল। হৃদয়াবেগের যন্ত্রণায় আমি যন্ত্রচালিতের মতো পাশের ঘরে গিয়া উপস্থিত হইলাম এবং তাঁহার শবাধারের পার্শ্বে হাঁটু গাড়িয়া পড়িলাম ও তাঁহাকে এত শীঘ্র ভুলিবার জন্য ঈশ্বরের কাছে ও কখনো কখনো তাঁহার কাছে ক্ষমা চাহিলাম।

 

১২৮

 

অল্প কয়েক বৎসরের পূর্ব্বপর্য্যন্ত দুয়ার প্রদেশের চা-আবাদী জেলাগুলি ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের জন্য অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর-- এই অখ্যাতি ছিল। শেষে ১৯০৬ সালে য়ুরোপীয় আবাদকারী যুবকদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা অতিরিক্ত বেশি হওয়ায়, ইহার কারণ-অনুসন্ধান প্রবর্ত্তিত হয়। তাহাতে দেখা যায় যে, এইসকল রোগ প্রতিনিয়ত ঘটিবার মুখ্য কারণ, সাধারণত যথেষ্ট কুইনীন ব্যবহার না করা। দৈনিক অল্পমাত্রায় কুইনীন-ব্যবহার রোগপ্রতিষেধক বলিয়া উপদিষ্ট ও প্রায় সমগ্র য়ুরোপীয় সমাজ-কর্ত্তৃক গৃহীত হইয়াছে এবং তাহার ফল হইয়াছে যে, তাহাদের মধ্যে কালাজ্বর ঘটা প্রায় থামিয়া গিয়াছে। যথানিয়মে কুইনীন ব্যবহার করায় অনেক য়ুরোপীয় মহিলা ও শিশু দুয়ার প্রদেশে থাকিয়াই অপেক্ষাকৃত উত্তম স্বাস্থ্য ভোগ করিতে সমর্থ হইয়াছেন। এক্ষণে দুয়ার প্রদেশকে মোটের উপর স্বাস্থ্যকর জেলা বলা হইয়া থাকে, দশ বৎসর পূর্ব্বে ইহা চিন্তা করাই অসম্ভব হইত।

 

১২৯

 

সম্প্রতি দুয়ার প্রদেশের সমস্ত য়ুরোপীয় সরকারী চিকিৎসকদের নিকটে, তথাকার অধিবাসীদের মধ্যে কুইনীন ব্যবহার সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা উপদিষ্ট হইয়াছিল এবং সেই অনুসন্ধানের ফল ১৯১৭ সালের বাঙ্গালার স্বাস্থ্য-সম্বন্ধীয় রিপোর্টে প্রকাশিত হইয়াছে। দেখা গিয়াছে য়ুরোপীয়দের মধ্যে কুইনীনের ব্যবহার শিশু ও বয়ঃপ্রাপ্ত উভয়েরই মধ্যে মোটের উপর ব্যাপক। এবং একজন চিকিৎসক লিখিতেছেন, "প্রতিষেধক কুইনীন-প্রচলনের পর হইতে ইংলণ্ড হইতে সদ্য-আগত যুবাপুরুষ এবং এই জেলায় জাত য়ুরোপীয় শিশুদের মধ্যে স্বাস্থ্যের প্রভূত উন্নতি দেখিয়া আমি অত্যন্ত বিস্মিত হইয়াছি।"

 

১৩০

 

উহারা ম্যালেরিয়া জ্বরে প্রায় ততটা বেশি ভোগে না এবং উহাদের প্লীহাবৃদ্ধি-রোগ দৈবাৎ দেখা যায়। কালাজ্বর-রোগের সংখ্যার হ্রাস সুস্পষ্ট বুঝা যাইতেছে; এবং যত দূর স্মরণ হয়, গত নয় বৎসরে য়ুরোপীয় অধিবাসিগণের মধ্যে আমি চারিটি মাত্র কালাজ্বরের রোগী পাইয়াছিলাম; উহাদের মধ্যে দুটির রোগ নিতান্তই সামান্য এবং যে একজন রোগীর অবস্থা খুব খারাপ ছিল, সে আমার কাছে স্বীকার করিয়াছিল যে, আমার উপদেশ-অনুযায়ী কুইনীন সে ব্যবহার করিত না। যখন হইতে কুইনীন-ব্যবহার ব্যাপক হইয়াছে তখন হইতে স্বাস্থ্যের সাধারণ উন্নতি-সম্বন্ধে বোধ হয় সর্ব্বসাধারণের মতের ঐক্য ঘটিয়াছে।

 

১৩১

 

আমার উপস্থিতিকাল ঘটনাক্রমে হাটবারের পূর্ব্বদিনের সন্ধ্যায় পড়িয়াছিল এবং চারি দিকের প্রতিবেশ হইতে গ্রামবাসীরা তাহাদের পণ্য দ্রব্য লইয়া ভীড় করিতেছিল। যখন দলের পর দল তাহাদের বহুবিধ এবং উজ্জ্বলবর্ণে রঞ্জিত পোষাক পরিয়া এই ক্ষেত্রে আসিয়া পৌঁছিল এবং তাহাদের কৃষ্ণবর্ণ অশ্বলোমনির্ম্মিত পটমণ্ডপ সন্নিবেশিত করিতে আরম্ভ করিল, তখন তাহার চেয়ে অধিক বিচিত্র ও চিত্রবৎ দৃশ্য কল্পনা করা অসম্ভব হইল। দিবালোক ক্ষীণ হইলে যখন সন্ধ্যার অন্ধকার আরম্ভ হইল তখন দৃশ্যটি আরো চিত্তাকর্ষক হইয়া উঠিল।

 

১৩২

 

অগ্নিসকল প্রজ্জ্বলিত হইলে শিখাগুলি উজ্জ্বলভাবে জ্বলিতে লাগিল; এবং অশ্বসহ চতুর্দ্দিকে-বিহরণ-কারী মুরদিগের শ্যামমূর্ত্তির উপরে, একটিমাত্র-কেশগুচ্ছ-ধারী রিফিয়ানদের উপরে এবং তাহাদের পার্শ্ববর্ত্তী লম্বা ও সরল তলোয়ারের উপরে ঐ শিখাগুলি বিবর্ণ পাণ্ডুর প্রতিচ্ছায়া নিক্ষেপ করিল। দূরে স্থলান্তর্দ্দেশে আমি দীর্ঘ এক সার উটের দল আভাসে জানিলাম মাত্র; উহারা দেখিতে দূরে দিগন্তে কলঙ্ক-রেখার ন্যায়; তাহারা পর্ব্বতের আঁকা-বাঁকা পথ বাহিয়া হাটের অভিমুখে ঘুরিয়া ঘুরিয়া চলিয়াছে। যখন জনতার লোকেরা বিশ্রাম করিতে আসিল এবং তাম্বু গাড়িতে লাগিল তখন মানবশিশু ঘোড়া গাধা উট এবং মুরগীতে মিলিয়া রাত্রের মতো একত্র ঘেঁষাঘেঁষি হইয়া থাকার সে  এক অপূর্ব্ব দৃশ্য।

 

১৩৩

 

তখন স্ত্রীলোকেরা তাহাদের সন্ধ্যার খাদ্য প্রস্তুত করিতে প্রবৃত্ত হইল ও ততক্ষণ তাহাদের পাগড়ি-পরা স্বামীরা ব্যস্তভাবে তাহাদের পণ্যদ্রব্য-উদঘাটনে অথবা তাহাদের জন্তুদলের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত হইল। এই বহুবিচিত্র ব্যস্ততাপূর্ণ দৃশ্যের মধ্যে আমাদের পক্ষে এতই নূতন ও চিত্তাকর্ষক জিনিষ ছিল যে, এখানে আমরা দীর্ঘকাল বিলম্ব করিতে পারিতাম। কিন্তু অনিচ্ছাসহকারেই এখান হইতে আমরা ফিরিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। যখন বিশেষ সময়ে প্রতি রাত্রে সন্ধ্যা-উপাসনার জন্য শ্বেতপতাকা উন্নমিত করা হয়, সেই সময়ে ধর্ম্মবিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী যে হউক, যদি সহরের মধ্যে না থাকে তবে তাহাকে সে রাত্রের মতো বাহিরে নির্ম্মমভাবে অবরুদ্ধ রাখা হয়। অতএব যাহাতে যথাসময়ে আমরা Cazyold গেটের ভিতর দিয়া ঢুকিয়া এইরূপ একটা বিশ্রী উভয়সঙ্কট উত্তীর্ণ হইতে পারি সেই জন্য যথাসম্ভব সত্বর ফিরিয়া গেলাম।

 

১৩৪

 

পরদিন সূর্য্যালোকের প্রথম রশ্মিগুলি সেই বিচিত্র জনতাকে দিবসের কর্ম্মব্যাপারে জাগাইয়া তুলিল। সাম্রাজ্যের সকল বিভাগ হইতে সেখানে লোক-সমাগম হইয়াছিল-- অভ্যন্তর প্রদেশ হইতে কৃষ্ণকায়গণ, প্রত্যন্তদেশ হইতে রিফিয়ানেরা, মরুদেশ হইতে আরবেরা, সহরের ইহুদিরা এবং দেশের সর্ব্বাপেক্ষা প্রাচীনজাতীয় বহুসংখ্যক Berber। সম্প্রদায়ের অপূর্ব্ব সম্মিলনীর প্রত্যেক ব্যক্তিই তাহার পণ্যগুলিকে সর্ব্বোচ্চ সুবিধার হারে বিক্রয় করিবার জন্য ব্যগ্র হইয়া ব্যস্তভাবে ব্যবসায় চালাইতেছিল। এই উদ্দ্যমপূর্ণ পণ্যবিনিময়ের দৃশ্য হইতে কেবল এক দিকে যেমনি ফিরিয়া দাঁড়ানো অমনি, পাথর ছুঁড়িয়া মারিলেই পৌঁছায় এতটা দূরের মধ্যে, আমি মূরীয় কবরস্থান দেখিতে পাইলাম।

 

১৩৫

 

স্থানটি বিষাদপূর্ণ উজাড় চেহারার। আমাদেরই সমাধিভূমির মতো এখানে ছোটো ছোটো মৃত্তিকাস্তূপের দ্বারা মৃতদিগের শেষ আবাস নির্দ্দিষ্ট এবং অপেক্ষকৃত ধনীদের কবর অনুচ্চ শ্বেতবর্ণ প্রাচীর-দ্বারা পরিবেষ্টিত। যেখানে কোনো খৃষ্টানের প্রবেশের অনুমতি নাই এবং যাহা জীবিত কালে বহুসংখ্যক মুসলমান তীর্থযাত্রীর আশ্রয়, সেই পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে মাথা রাখিয়া মৃতদিগকে সমাহিত করা হয়। যাহা হউক পরবর্ত্তী দিনে, শুক্রবারে, মূরদিগের বিশ্রামবাসরে এই স্থানটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আকৃতি প্রকাশ করিল। স্ত্রীলোকদের জনতা-দ্বারা অধিকৃত হইল; সকলেই সাদা পোষাকপরা এবং এই স্থানের গুণে তাহাদিগকে ভূতের মতো দেখাইতে লাগিল, অন্তত ইংলণ্ডে ভূতের চেহারা আমরা এমনই মনে করিয়া থাকি।

 

১৩৬

 

বিচ্ছেদশোকে কেহ কেহ তাহাদের বক্ষে আঘাত করিতেছে এবং যন্ত্রণার কর্ণভেদী স্বরে মৃতদিগকে আহ্বান করিতেছে। সেই সময়ে, যেসকল সমাধি স্পষ্টতই অনধিক কাল পূর্ব্বেই মৃতদিগকে আবৃত করিয়াছে তাহাদের কাছে কেহ কেহ লুটাইতে লাগিল। অপর কেহ মৃত স্বামীর কবর সজ্জিত করিবার জন্য তাজা ফুল লইয়া আসিল এবং যেখানে তাহার হৃদয় নিহিত রহিয়াছে, সেই বিষাদপূর্ণ স্থানে দীর্ঘক্ষণ থাকিয়া তাহার স্বামীকে (উদ্দেশ্য করিয়া) বলিল, জীবন এক্ষণে তাহার পক্ষে ভার-স্বরূপ, সংসার আপন ভোগের দ্বারা আর তাহাকে আকৃষ্ট করিতে পারে না এবং তাহার উৎকণ্ঠিততম কামনা ও প্রার্থনা এই যে, সে যেন শীঘ্র কবর পার হইয়া তাঁহার সহিত মিলিত হইবার অনুমতি লাভ করে।

 

১৩৭

 

এই বিলাপসকলের মধ্যে প্রিয় মৃত ব্যক্তিকে সম্বোধন করিয়া নিতান্ত অদ্ভুত ও হাস্যকর যে সকল উক্তি আমি শুনিলাম, তাহাতে মৃতসম্বন্ধে এই নিঃসংশয় বিশ্বাসের প্রভাব প্রকাশ পাইতেছে যে, যে নগর ও সমাজ ত্যাগ করিয়া তিনি চলিয়া গিয়াছেন তৎসম্বন্ধে এখনো তিনি প্রবল ঔৎসুক্য অনুভব করিয়া থাকেন। একজন স্ত্রীলোক একটি গোরের নিকটে একান্ত গম্ভীরমুখে বসিয়া গত সপ্তাহের ট্যাঞ্জিয়ারের যত কিছু গালগল্প, যত কিছু নিন্দা-অপবাদ, যাহা সেইখানে মুখে-মুখে রটিতেছিল এবং যত কিছু গার্হস্থ্য বিবরণ, যত কলহ ও তাহার মিটমাটের কথা, সমস্তই মৃতব্যক্তিকে জানাইতেছিল। একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মিছিল অকস্মাৎ একটি অমসৃণ কাষ্ঠাধারে চারিজন বাহকের স্কন্ধে বাহিত একটি মৃতদেহ লইয়া আসিয়া উপস্থিত হইল।

 

১৩৮

 

যাহারা অন্ত্যেষ্টি-সৎকারের অনুষ্ঠানে যোগ দেয় তাহারা কবরস্থানে যাইবার পথে কোরাণ হইতে শ্লোক গান করে। এবং তাহারা সমাধিভূমিতে আসিলে একটি সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা উচ্চারণ করা হয়। তাহার পরে মৃতদেহকে বিনা শবাধারেই গোরের মধ্যে রাখা হয়; অল্প পরিমাণে এক পাশে কাৎ করিয়া শোয়ানো হয়, যাহাতে মুখ মক্কার দিকে ফিরিয়া থাকে। দেহের উপর অল্প মাটি ফেলা হয় এবং জনতা মৃতব্যক্তির বাড়িতে ফিরিয়া যায়। অনুষ্ঠানের সময় পরিবারের স্ত্রীলোকেরা একত্র হয় এবং বিনা ব্যাঘাতে নিতান্ত অমানুষিক চীৎকার ও বীভৎস উচ্চধ্বনি করিতে থাকে। বস্তুত মৃত্যুর পর হইতেই বরাবর তাহারা এইরূপ কাণ্ড করিয়া আসিতেছে। অন্যূন আটটি দীর্ঘ দিন ধরিয়া তাহারা অধ্যবসায়সহকারে এই ক্লান্তিকর কণ্ঠচালনা করিয়া থাকে।

 

১৩৯

 

ভাষা মনুষ্যজাতির কেবলমাত্র মহৎ মিলনসাধক নহে, ইহা পরম বিভাগকারীও বটে। যথা, ব্রহ্মদেশে এক জাতি এবং অন্য জাতির মধ্যে তাহাদের নিজদেশীয় পর্ব্বত-শ্রেণী, নিবিড় বন, বেগবতী নদী কিংবা বিশাল সমুদ্র অপেক্ষা ভাষাই প্রায় অধিকতর অলঙ্ঘ্য ব্যবধান। ধর্ম্ম এবং জাতিগত প্রথার বাধা অপেক্ষা এই ব্যবধান ভাঙিয়া ফেলা অধিকতর কঠিন। শান-মালভূমিতে কখনও বা একই গ্রামে একই ধর্ম্ম ও প্রায় একই রূপ প্রথা লইয়া যে জাতিসকল পাশাপাশি বাস করিতেছে, একজন দোভাষীর সাহায্য ভিন্ন তাহাদের মধ্যে কোনও বলা-কহা চলিতে পারে না। নিকোবরবর্গের নানা দ্বীপে যেসকল জাতি-সম্প্রদায় বাস করে, যদিও তাহারা একই মূল-বংশের তথাপি তাহাদের আন্তর্‌দ্বৈপিক পণ্যবিনিময়-প্রথা হিন্দুস্থানী অথবা ইংরেজীর মধ্যস্থতায় সম্পাদিত হয়। যেসকল আণ্ডামানী জাতিসম্প্রদায় একই দ্বীপে বাস করে তাহারা সঙ্কেতের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে কথাবার্ত্তা চালায়। যে Chin জাতিগুলি একটিমাত্র পর্ব্বতমালার দ্বারা বিভক্ত অথবা একই উপত্যকার ভিন্ন অংশে পরস্পরের দৃষ্টিগোচরেই বাস করে, তাহাদের মধ্যে ভাষার অনুত্তরণীয় বিচ্ছেদ বর্ত্তমান।

 

১৪০

 

যে স্তন্যপায়ী জীব বিশেষ কোনও জৈবক্রিয়ার যন্ত্র হইতে বঞ্চিত হইয়াছে সেই প্রাণী সাধারণত বাঁচিতে পারে না। সে তাহার কোনও অঙ্গ হারাইলে তাহা তাহার পক্ষে সঙ্কটজনক হইয়া উঠে। তাহার পাকস্থলী অপসারিত হইলে দ্রুত তাহার সাংঘাতিক ফল ঘটিতে পারে। ইহাই বিস্ময়ের বিষয় যে, যেসকল ক্ষতি অনেক সময়ে সামান্য বলিয়া বোধ হয়, স্তন্যপায়ী জীবের পক্ষে তাহাই প্রাণহানিকর হইতে পারে। অঙ্গচ্ছেদ-সম্বন্ধে মৎস্যও অল্প ঘাতকাতর নহে। কিন্তু কীট এই নিয়মের সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম, এবং ইহাই জীবনের প্রতি কীটের আকৃষ্টিপরতা সপ্রমাণ করে। যেসব হানির দ্বারা উন্নততর শ্রেণীর প্রাণীদের মধ্যে প্রায় অচিরাৎ মৃত্যু ঘটাইতে পারে, অনেকজাতীয় কীট সেইসব হানি অতিক্রম করিয়াও বাঁচিয়া থাকিতে সমর্থ।

 

১৪১

 

একটি পতঙ্গের জীবনীশক্তি দেখিয়া Doctor Miller-এর মনোযোগ এই বিষয়ে প্রথম বিশেষভাবে আকৃষ্ট হইয়াছিল। Doctor Miller স্বয়ং বলিয়াছেন-- "আলোচ্য পতঙ্গটিকে ধরিয়া যথাবিহিতরূপে ক্লোরোফর্‌ম্‌ করিয়া আমার একজন সহকারী আমার নিকটে আনিয়াছিলেন। মৃত্যুকে দ্বিগুণতর সুনিশ্চিত করিবার জন্য তাহার বুকের (thorax) ভিতর দিয়া আমি একটি জ্বলন্ত ছুঁচ প্রবেশ করাইয়া দিয়াছিলাম। চারি দিন পরে একদিন সন্ধ্যাকালে আমি তাহার প্রতি পুনরায় দৃষ্টিপাত করিলাম। তাহাকে আড়ষ্ট এবং মৃত বলিয়া বোধ হইল এবং ভাবিলাম শীঘ্রই এটি আলমারিতে তুলিবার যোগ্য হইবে। পরদিন প্রাতে যখন দেখিলাম সে অনেক ডজন ডিম রাত্রির মধ্যে পাড়িয়া রাখিয়াছে, তখন আমার কিরূপ বিস্ময় হইয়াছিল, কল্পনা করিয়া দেখো।

 

১৪২

 

প্রায় সেই সময়েই উহারই নিকট-শ্রেণীর আর একটি পতঙ্গ-সম্বন্ধে অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়াছিল। নমুনার জন্য রক্ষিত পতঙ্গটি একেবারে মরিয়া গিয়াছে বোধ হওয়াতে একটা তক্তায় আমি তাহাকে আলপিন্‌ দিয়া বিঁধিয়া শুকাইবার জন্য সরাইয়া রাখিলাম। কয়েক রাত্রি পরে একদিন টেবিলের উপর প্রবল পাখা-নাড়ার শব্দে জাগিয়া উঠিলাম এবং অনুসন্ধান করিয়া দেখিলাম যে, পতঙ্গতটি পুনরায় তাজা হইয়া উঠিয়াছে, ধ্বস্তাধ্বস্তি করিয়া আলপিন্‌টা তক্তা হইতে আল্‌গা করিয়াছে এবং ধড়ফড় করিতে গিয়া পাখা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিয়া ফেলিয়াছে।

 

১৪৩

 

Bathsheba-র পুত্র Solomon যখন রাজত্ব করিতে আরম্ভ করেন, তখন তাঁহার বয়স ছিল বিশ বৎসর। শান্তিপ্রিয় ব্যক্তির পক্ষে তাঁহার সিংহাসনারোহণের সময়টা অনুকূল ছিল। বেবিলন এসিরিয়া মিশর দুর্ব্বল ছিল, চতুর্দ্দিকের জাতিসকল David-এর দ্বারা বশীভূত হইয়াছিল, এবং Solomon এর আধিপত্যে বিরোধী হইতে পারে এমন কোনও শক্তি যথেষ্ট প্রবল ছিল না। অতএব তাঁহার পিতা যে মহাসমৃদ্ধ দায়াধিকার রাখিয়া গিয়াছিলেন তাহাই উপভোগ করিতে, রাজধানীর বিস্তার ও শোভা সম্পাদন করিতে, তাঁহার পিতা যে বৃহৎ কীর্ত্তির উপরে তাঁহার হৃদয়কে নিয়োগ করিয়াছিলেন সেই মন্দিররচনা সম্পাদন করিতে, তাঁহার অবসর ছিল। এই কার্য্যে তিনি টায়ারের রাজা Hiram-এর কাছ হইতে দুর্ল্লভ সহায়তা লাভ করিয়াছিলেন। David-এর প্রতি এই যুবকের অসীম শ্রদ্ধা ছিল।

 

১৪৪

 

হিব্রুরা সাদাসিধে কৃষিজীবি লোক ছিল, তাহাদের শিল্পনৈপুণ্য অল্পই ছিল, পরন্তু  Hiram -এর ফিনিসীয় প্রজাদের মধ্যে সুশিক্ষিত কারিগর ছিল। তন্মধ্যে যাহারা সর্ব্বোৎকৃষ্ট তাহাদিগকে Solomonএর হস্তে স্বেচ্ছায় সমর্পণ করা হইয়াছিল। মন্দির নির্ম্মাণ করিতে সাত বৎসর লাগিল; প্রত্যেক খুঁটিনাটি কার্য্য নিখুঁত  হইল-- ব্যয়বিষয়ে কোনোই কার্পণ্য হয় নাই। কার্য্যশেষে দুই-সপ্তাহ-ব্যাপী মহোৎসব পুণ্যবিধিপূর্ব্বক সমাধা করিয়া মন্দির উৎসর্গ করা হইল, এবং ইহাতে দেশের নানা অংশ হইতে বিপুল জনস্রোত আকৃষ্ট হইয়াছিল। এই সময় হইতে জেরুজিলাম ইহুদীরাজ্যের ধর্ম্মকেন্দ্র হইয়া উঠিল এবং ক্রমে এই মন্দির এমন একটি স্থান হইল যে, প্রত্যেক খাঁটি ইহুদী উৎসুক দৃষ্টিসহকারে তাহার দিকে তাকাইত।

 

১৪৫

 

মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে Solomonএর নির্ম্মাণ-উদ্যোগ শেষ হইল না। জেরুজিলাম দুর্গবদ্ধ হইল; মহাশোভন রাজবাটীসমূহ নির্ম্মিত হইল; যে নগরে মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো উৎসব-উপলক্ষ্যে দর্শকগণের ভিড় হয় তাহার জন্য জল-সরবরাহের কারখানা ও জল-নিকাশের পথের যে নিতান্ত প্রয়োজন এ কথা Solomon বিস্মৃত হন নাই। প্রথম বয়সে শাসনকার্য্যে নিবিড়ভাবে মনোনিবেশ করিয়াছিলেন, এবং দেশটিও সুব্যবস্থিত ছিল। তথাপি তাঁহার সমস্ত ঐশ্বর্য্য ও সমস্ত প্রাজ্ঞতা সত্ত্বেও Solomon-এর জীবন অসুখী ছিল। যেসকল প্রলোভন রাজাকে ঘিরিয়া থাকে তিনি অসহায়ভাবে তাহার কবলগ্রস্ত হইয়াছিলেন। তাঁহার অন্তঃপুর অভূতপূর্ব্ব পরিমাণে বৃহৎ ছিল; তাঁহার পত্নীদের মধ্যে অনেকেই প্রতিমাপূজক হওয়ায় তাঁহারা ঈশ্বরের নিকট হইতে তাঁহার হৃদয় অপহরণ করিয়া লইলেন। তাঁহার বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধর্ম্মকর্ম্মে শিথিল হইতে লাগিলেন-- রাজ্যমধ্যে অবাধে প্রতিমাপূজার অনুমোদন করিলেন। তাঁহার রাজত্বের শেষভাগে তাঁহার প্রতি জনাদর হ্রাসপাইয়াছিল।

 

১৪৬

 

যে ধনভাণ্ডার পূর্ণ করিয়াছিলেন যত দিন তাহার কিছুমাত্র অবশিষ্ট থাকিল তত দিন সব ভালোই চলিল, কিন্তু তাহাও যখন নিঃশেষ হইল এবং তাঁহার অতিসজ্জিত প্রাসাদগুলির ও অসংখ্য ভৃত্যবর্গের সংরক্ষণের জন্য অর্থসংগ্রহ করার প্রয়োজন হইল-- তখন রাজকর পীড়াদায়ক ও প্রজাগণ অসন্তুষ্ট হইয়া উঠিল। অবশেষে প্রায় ত্রিশ বৎসর রাজত্ব করিয়া পঞ্চাশের কিছু বেশি বয়সে তিনি মারা গেলেন। Solomon অনেক বিস্ময়কর সুযোগ পাইয়াছিলেন। তিনি বিস্তৃত সাম্রাজ্য, মহাখ্যাতি এবং অগণিত ধনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। পরন্তু প্রথমত তিনি ভালোই চলিয়াছিলেন, কিন্তু সমৃদ্ধির আনুষঙ্গিক প্রলোভনসমূহ তাঁহাকে অভিভূত করিল, এবং শেষের বৎসরগুলি তিনি ইন্দ্রিয়সম্ভোগে কাটাইয়াছিলেন। তিনি যখন অকালে জীর্ণ হইয়া মারা যান, তখন তিনি শূন্য রাজকোষ, বিদ্রোহী প্রজা এবং এমন একটি সাম্রাজ্য রাখিয়া গেলেন, যাহা লেশমাত্র স্পর্শে খণ্ড খণ্ড হইয়া পড়িতে প্রস্তুত।

 

১৪৭

 

বরাকর পুলিস ষ্টেশনের কয়েক মাইল দক্ষিণে বরাকর নদীর সহিত ইহার মিলনস্থানে, দামোদর নদ প্রথমে বর্দ্ধমান জিলায় প্রবেশ করে। অতঃপর ইহা রাণীগঞ্জ ও অণ্ডাল অতিক্রম করিয়া বর্দ্ধমান ও বাঁকুড়া জিলার মধ্যবর্ত্তী ৪৫ মাইল-ব্যাপী সীমা রচনাপূর্ব্বক দক্ষিণ-পূর্ব্ব দিকে প্রবাহিত হয় এবং খণ্ডঘোষের কাচে বর্দ্ধমান জিলায় প্রবেশ করে। এখানে নদী উত্তর-পূর্ব্ব দিকে হঠাৎ বাঁক লয় এবং বর্দ্ধমান সহরের কাছ ঘেঁষিয়া যাওয়ার পর সোজা দক্ষিণে মোড় ফিরিয়া অবশেষে মোহনপুর গ্রামের নিকটে এই জিলা পরিত্যাগ করে। ইহা অতঃপর শাপুর ও হবিবপুর গ্রামের মধ্যস্থলে উত্তর দিক হইতে হুগলী জিলায় প্রবেশ করে এবং একবার পূর্ব্বে একবার পশ্চিমে বাঁকিতে বাঁকিতে আরামবাগ মহকুমাকে জিলার অবশিষ্টাংশ হইতে পৃথক্‌ করিয়া দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়।

 

১৪৮

 

রাজবলহাটের উপর দিক হইতে ৮ মাইল দূর পর্য্যন্ত ইহা হাওড়া এবং হুগলী জিলার মধ্যবর্ত্তী সীমা রচনা করে। সীমান্তের ৮ মাইল ধরিয়া লইলে হুগলী জিলায় এই নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮ মাইল। তার পর ওক্‌না গ্রামের ধার দিয়া হাওড়া জিলায় প্রবেশ করে এবং দক্ষিণে আমতার দিকে প্রবাহিত হয়, আরও ভাটিতে অগ্রসর হইয়া ইহা দক্ষিণ তীরে গাইমাটা খাড়ির সহিত মিলিত হয়। আম্‌তা পশ্চাতে ফেলিয়া ইহা বাগনানের অভিমুখে আঁকাবাঁকা দক্ষিণগামী পথ লয় এবং অতঃপর ইহা দক্ষিণপূর্ব্ব দিকে প্রবাহিত হইয়া ফল্‌তার ঠোঁটার অপর ধারে হুগলী নদীতে পড়িয়াছে। হাওড়া জিলার মধ্যগত এবং তাহার সীমাসংলগ্ন ইহার দৈর্ঘ্য মোট ৪৫ মাইল।

 

১৪৯

 

আগে আমার ঘরগুলি ঠিকঠাক করা হউক, তার পরে তোমার সঙ্গে দেখা হইলে আমি সুখী হইব। ইহা আমার সত্য মনের কথা, অতএব এমন সন্দেহ করিও না যে তোমাকে এড়াইবার জন্য বলিতেছি। এই যে আমি ঘর সাজাইতেছি, আমার নিজের জন্য ততটা নয় যতটা তোমার জন্য, মার্চে ভারতের দিকে পাড়ি দিব বলিয়া যে আশা করিতেছি তাহাতে যদি বিশেষ প্রতিবন্ধক কিছু না ঘটে, তবে তৎপূর্ব্বেই তোমাকে এখানে প্রতিষ্ঠিত করিব। আমার ইচ্ছা এই যে, আমার সমুদ্রযাত্রার পক্ষে কী কী দ্রব্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন, তাহা তুমি Major Watson-Government-Consul ইত্যাদি এবং কলিকাতা ও মান্দ্রাজের শাসনকর্ত্তাদিগেরও নিকট হইতে পত্র পাইতে পারি।

 

১৫০

 

আমার প্রত্যাবর্ত্তন পর্য্যন্ত আমার সম্পত্তি ও উইল ট্রাষ্টিদের হাতে অর্পণ করিব এবং তোমাকেও আমি তাহার মধ্যে একজন নিয়োগ করিতে মনস্থ করিয়াছি। H-এর কাছ হইতে কোনো খবর পাই নাই; যখন পাইব, তখন তোমাকে সব বিস্তারিত খবর দিব। এ কথা তোমাকে মানিতে হইবে যে, মোটের উপর আমার মতলবটা মন্দ নয়। এখন যদি আমি ভ্রমণ না করি, তবে আর কখনও করা ঘটিবে না; ইহা সকল মানুষেরই কোনও না কোনও দিন করা উচিত। গৃহে আটকাইয়া রাখিবার মতো কোনও সম্বন্ধ বর্ত্তমানে আমার নাই, না আছে স্ত্রী, না এমন কোনো ভাইবোন যাহারা নিঃসম্বল। আমি তোমার যত্ন লইব এবং প্রত্যাবর্ত্তনের পর সম্ভবত আমি একজন রাষ্ট্রনীতিক হইতে পারিব। নিজের দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশ-সম্বন্ধে কয়েক বৎসরের অভিজ্ঞতা আমাকে উক্ত কাজের জন্য অযোগ্য করিবে না। কেবল স্বজাতি ছাড়া অন্য কোনো জাতিকে যদি না দেখি, তবে মানবজাতি সম্বন্ধে যথেষ্ট সুবিচার করিতে পারিব না। পুস্তকের দ্বারা নহে অভিজ্ঞতার দ্বারাই তাহাদের সম্বন্ধে বিচার করা কর্ত্তব্য।

 

১৫১

 

আমরা আমাদের দোলা-বিছানায় চড়িলাম, মেক্সিকীয় লোকগণ তাহাদের অশ্বতরের জিনের উপর মাথা দিয়া মাটিতেই সটান শুইয়া পড়িল এবং শীঘ্রই প্রভু ও ভৃত্য সকলেই ঘুমাইয়া পড়িল। মধ্যরাত্রির কাছাকাছি কোনো সময়ে চারি দিকের বায়ুমণ্ডল হইতে একটা চাপের ভাব অনুভব করায় আমার ঘুম ভাঙিয়া গেল। বায়ুকে আর বায়ু বলিয়া বোধ হইতেছিল না, উহা যেন কোনো বিষময় উচ্ছ্বাস, হঠাৎ উঠিয়া আমাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে। আমরা যে গিরিসঙ্কটের মধ্যে শয়ন করিয়াছিলাম, তাহার পশ্চাদ্ভাগ হইতে কৃষ্ণবর্ণ পূতিবিষাক্ত কুয়াশার ঢেউ গড়াইয়া আসিল, তাহাদের অনিষ্টকর প্রভাব আমাদিগকে বেষ্টন করিয়া ধরিতেছিল। ইহা স্বয়ং জ্বর, কুয়াশা-রূপ ধারণ করিয়া আসিয়াছে।

 

১৫২

 

আমি যখন নিশ্বাস গ্রহণ করিবার জন্য ছট্‌ফট্‌ করিতেছি, ঠিক সেই সময়েই একটা মেঘের মতো পদার্থ যেন আসিয়া আমার উপরে স্থির হইয়া বসিল এবং আমার হস্ত মুখ কণ্ঠ প্রভৃতি দেহের যে কয়টি অংশ তিন পাক বস্ত্রের দ্বারা রক্ষিত না ছিল, সেই সকল অঙ্গে অগ্নিময় সূচীর ন্যায় সহস্র হুল বিদ্ধ করিতে লাগিল। আমি তৎক্ষণাৎ নিজের দুই হাত প্রসারিত করিয়া দিয়া তাহা মুষ্টিবদ্ধ করিলাম, ও এইরূপ উপায়ে শত শত প্রকাণ্ড মশা ধরিয়া ফেলিলাম। আকাশ তখন ঐ কীটগুলির নিবিড় ঝাঁকে পরিপূর্ণ হইল, এবং বারংবার তাহাদের বিষাক্ত দংশনের যন্ত্রণাও অবর্ণনীয় হইয়া উঠিল।

 

১৫৩

 

আমার নিকট হইতে প্রায় দশ গজ দূরে  Rowley-র দোলা-বিছানা টাঙানো-- শীঘ্রই সে মুখর হইয়া উঠিল; আমি শুনিতে পাইলাম যে সে লাথি ছুঁড়িতেছে ও কটূক্তি করিতেছে এতই সতেজে ও সবলে যে অন্য কোন অবস্থায় হইলে হাস্যকর হইত, কিন্তু অবস্থা ঠিক সেই সময়টাতে হাস্যের পক্ষে কিছু অতিরিক্ত গুরুতর হইয়া উঠিয়াছিল। মশকদংশনের যন্ত্রণা এবং আমাদের চারি দিকে প্রতি মুহূর্ত্তেই ঘনায়মান ঐ  বিষাক্ত বাষ্পের ফলে আমি ইতিমধ্যেই প্রবল  জ্বরে আক্রান্ত হইয়া পর্য্যায়ক্রমে উত্তাপে তপ্ত ও শীতে কম্পিত হইতেছিলাম, আমার জিহ্বা শুষ্ক এবং মস্তিষ্ক যেন অগ্নিদগ্ধ হইতেছিল।

 

১৫৪

 

সেই ক্ষণে আমাদের কয়েক পাদ দূরেই যন্ত্রণাকাতর ও চরম বিপদাপন্ন স্ত্রীলোকের আর্ত্ত চীৎকারের ন্যায় একটা চীৎকার শোনা গেল। আমি আমার দোলা-বিছানা হইতে লাফাইয়া পড়িলাম, এবং তৎক্ষণাৎ চীৎকার স্বরে সাহায্য প্রার্থনা করিয়া আর্ত্তনাদ করিতে করিতে আমার পার্শ্ব দিয়া দুই শ্বেতবসনা ও কমনীয়া নারীমূর্ত্তি তীরের ন্যায় ছুটিয়া চলিয়া গেল। পলাতকাদের একেবারে পশ্চাতেই প্রকাণ্ড দীর্ঘ পদক্ষেপে ও লাফ দিতে দিতে তিন চারিটি কৃষ্ণবর্ণ পদার্থ আসিয়া পড়িল, তাহারা পার্থিব কোনো বস্তুরই সদৃশ নয়। তাহাদের শরীরের গঠন নিশ্চিতই মনুষ্যের ন্যায় কিন্তু তাহাদের চেহারা এমন কুশ্রী ও ভয়াবহ, এমন অস্বাভাবিক এবং প্রেততুল্য যে, ঐ আলোকহীন গিরিসঙ্কটে এবং আমাদের চতুর্দ্দিক্‌ব্যাপী অন্ধকারে উহাদের সম্মুখে আসিয়া পড়িলে প্রবলতম সাহসিক ব্যক্তিও বিচলিত হইতে পারিত।

 

১৫৫

 

ঐ অদ্ভুত বস্তুগুলির আবির্ভাবে আমি ও Rowley মুহূর্ত্তকাল বিস্ময়ে গতিশক্তিহীন হইয়া দাঁড়াইয়া রইলাম, কিন্তু আর একটি কর্ণভেদী আর্তনাদ আমাদের সতর্ক মন ফিরাইয়া আনিল। ঐ স্ত্রীলোকদূতির মধ্যে একজন হয় উঁচট খাইয়াছিল, নয় ক্লান্তিবশত পড়িয়া গিয়াছিল এবং শ্বেতবর্ণ স্তূপের ন্যায় ভূমিতলে শয়ান ছিল! আর একজনের দেহাবরণ-বস্ত্র ঐ প্রতমূর্ত্তিদের মধ্যে একজনের করায়ত্ত হইয়াছে, এমন সময় Rowley আশঙ্কার আর্ত্তরবে সম্মুখে ধাবিত হইল এবং আপনার ছুরির দ্বারা ঐ ভীষণ জীবটিকে এক প্রচণ্ড আঘাত করিল। কিরূপে ঘটিল তাহা প্রায় না জানিয়াই আমিও সেই সময়েই ঐরূপ আর একটি প্রাণীর সহিত যুদ্ধে নিযুক্ত হইয়া পড়িলাম। কিন্তু ঐ যুদ্ধ সমকক্ষের যুদ্ধ ছিল না।

 

১৫৬

 

আমরা বৃথাই আমাদের ছুরিকা-দ্বারা আঘাত করিতে লাগিলাম, আমাদের প্রতিপক্ষগণ এমন কঠিন লোমাবৃত চর্ম্ম-দ্বারা আচ্ছন্ন ও রক্ষিত ছিল যে, আমাদের ছুরিকাগুলি তীক্ষ্ণ ও সূক্ষ্মাগ্র হইলেও তাহাদের চর্ম্মভেদ করিতে অত্যন্ত বাধা পাইতেছিল, এবং অপর পক্ষে আমরা দীর্ঘ পেশীবহুল ও ঈগল পক্ষীর নখরের ন্যায় দৃঢ় ও তীক্ষ্ণ নখরশালী অঙ্গুলিযুক্ত বাহু-দ্বারা ধৃত হইলাম! ঐ প্রাণী যখন আমাকে ধরিয়া আপনার দিকে আকর্ষণ করিয়া ভল্লুকের ন্যায় আলিঙ্গনে বদ্ধ করিল তখন তাহার ঐ ভীষণ নখরের আঘাত আমি আমার স্কন্ধে অনুভব করিলাম, তাহার অর্দ্ধমানুষ ও অর্দ্ধপাশব মুখ তখন দন্তবিকাশপূর্ব্বক আমাকে লক্ষ্য করিয়া গর্জ্জন করিতেছিল এবং আমার মুখের ছয় ইঞ্চির মধ্যে তাহার তীক্ষ্ণ ও বিশাল শ্বেত দন্ত-সকল ঘর্ষণ করিতেছিল।

 

১৫৭

 

"স্বর্গাধিরাজ ভগবান, এ যে ভয়ানক-- রাউলি আমাকে সাহায্য করো।" কিন্তু  Rowley আপনার দানবিক বলসত্ত্বেও তাহার ভীষণ প্রতিপক্ষদের বাহুবন্ধনে শিশুর ন্যায় শক্তিহীন হইয়া পড়িয়াছিল। সে আমার কয়েক পা দূরেই তাহাদের দুই জনের সহিত যুঝিতেছিল এবং হস্ত হইতে পতিত অথবা বলপূর্ব্বক গৃহীত ছুরিকাটি পুনর্ব্বার অধিকার করিবার জন্য অতিমানবিক চেষ্টা করিতেছিল। নৈরাশ্যের প্রবল বলে তাড়িত একটি ছুরিকাঘাত আমার শত্রুর পার্শ্বদেশ ভেদ করিল। ক্রোধ ও যন্ত্রণাব্যঞ্জক কর্ণবধিরকর চীৎকার করিয়া ঐ বিকট প্রাণী তাহার বীভৎস দেহের সহিত আমাকে আরও সবলে চাপিয়া ধরিল, তাহার তীক্ষ্ণ নখর আরও গভীরভাবে আমার পৃষ্ঠে বিদ্ধ করিয়া যেন মাংস ছিঁড়িয়া তুলিতে লাগিল; সে যন্ত্রণা অসহনীয়, আমার সংজ্ঞা লুপ্ত হইয়া আসিতে লাগিল।

 

১৫৮

 

ঠিক সেই সময় দুম্‌ দুম্‌ বন্দুকের শব্দ। দুই, চার, বারোটা বন্দুক ও পিস্তলের শব্দ-- তাহার পরেই সমস্বরে সে কী চীৎকার গর্জ্জন ও অপার্থিব হাস্য! আমাকে যে জন্তুটা ধরিয়াছিল সে যেন কিঞ্চিৎ চকিত হইয়া তাহার বাহুবেষ্টন ঈষৎ শিথিল করিল। সেই মুহূর্ত্তে আমার সম্মুখে কে একখানা কৃষ্ণবর্ণ হস্ত চালাইয়া দিল, চক্ষু অন্ধকার করিয়া একটা অগ্নিশিখা স্ফূরিত হইয়া উঠিল এবং একটা তীব্র চীৎকার শোনা গেল এবং আমি আমার শত্রুর আলিঙ্গনমুক্ত হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেলাম। আমার আর কিছুই স্মরণ নাই। যখন সংজ্ঞা ফিরিয়া আসিল তখন দেখিলাম পুষ্পপল্লবময় একটি নিকুঞ্জের মতো জায়গায় কতকগুলি কম্বলের উপর আমি শয়ান। তখন স্পষ্ট দিন হইয়াছে, সূর্য্য তখন উজ্জ্বলরূপে দীপ্যমান, পুষ্পসকল সুগন্ধ দান করিতেছে এবং বিচিত্রবর্ণপক্ষযুক্ত গুঞ্জৎ পক্ষীরা প্রাণবান্‌ সকোণ কাচখণ্ডের ন্যায় সূর্য্যালোকে ইতস্তত তীরবেগে ধাবিত হইতেছে।

 

১৫৯

 

আমার শয্যাপার্শ্বে দণ্ডায়মান এবং আমার অপরিচিত একজন মেক্সিকীয় ইণ্ডিয়ান আমার দিকে কোনো তরল পদার্থে পূর্ণ একটি নারিকেলের মালা অগ্রসর করিয়া ধরিল; সাগ্রহে তাহা গ্রহণ করিয়া তন্মধ্যস্থ পদার্থ পান করিয়া ফেলিলাম। ঐ পানীয়টি আমাকে অনেক পরিমাণে সজীব করিয়া তুলিল এবং কনুইয়ে ভর দিয়া অতিকষ্টে উঠিয়া আমি চারি দিকে চাহিলাম এবং এমন একটি ব্যস্ততা ও সজীবতাপূর্ণ দশ্যৃ দেখিলাম, যাহা আমার নিকটে সম্পূর্ণরূপে অ-বোধগম্য। যে মেক্সিকীয় ব্যক্তিটি তখনও আমার শয্যাপার্শ্বে দণ্ডায়মান ছিল তাহাকে এই সকলের অর্থ কী জিজ্ঞাসা করিবার জন্য আমার স্পেনীয় ভাষাজ্ঞান মনে মনে গুছাইয়া লইলাম।

 

১৬০

 

এমন সময় ঐ শিবিরের মধ্যে একটা প্রবল ব্যস্ততা অনুভব করিলাম এবং দেখিলাম, দীর্ঘপর্ণী-জাতীয় উদ্ভিদের ঝোপের ভিতর হইতে সবে মাত্র একদল লোক বাহির হইয়া আলিয়াছে-- উহাদের মধ্যে আমাদের ভৃত্যবর্গকে চিনিতে পারিলাম। ঐ নবাগতগণ কোনো বস্তুর চতুর্দ্দিকে দলবদ্ধ হইয়া তাহাকে ভূমির উপর দিয়া আকর্ষণ করিয়া আনিতেছিল। আমার অনুচর উল্লসিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, "উহারা একটি জাম্বো বধ করিয়াছে!" আমি ও Rowley যে স্থানে শয়ন করিয়াছিলাম, ঐ দলটি লাফাইতে লাফাইতে ও হাসিতে হাসিতে তাহারি নিকটে আসিয়া বলিতে লাগিল, "একটা জাম্বো, একটা জাম্বো, হত হইয়াছে!"

 

১৬১

 

ঐ দলটি একটু ফাঁক হইয়া গেল, আমরা আমাদের পূর্ব্বরাত্রের ভীষণ প্রতিপক্ষদের মধ্যে একটিকে মৃতাবস্থায় ভূতলে শায়িত দেখিলাম। আমি ও Rowley এক নিশ্বাসে বলিয়া উঠিলাম- "এ কী?" "এই জাম্বোগণ অতি ভয়ানক, এক প্রকার বানর!" আমি বলিলাম, "বানর!" বেচারা Rowley আপনার হস্তদ্বয়ের সাহায্যে উঠিয়া বসিয়া আমার কথার পুনরুক্তি করিয়া বলিল, "বানর! আমরা বানরের সহিত যুদ্ধ করিতেছিলাম! এবং তাহারাই আমাদিগকে এইরূপে আহত করিয়াছে।"

 

১৬২

 

চা-বাগানের এক ম্যানেজার লিখিতেছেন যে, "অঙ্কুশকৃমি"র চিকিৎসার সফলতায় এই বাগানের কুলিদের স্বাস্থ্য এবং স্বস্তির পক্ষে আশাতীত পরিমাণে উপকার ঘটিয়াছে। পূর্ব্বে বর্ষাকালে নানাপ্রকার পীড়া-বশত প্রত্যহ আমার প্রায় ১৫০ হইতে ২০০ কুলি বেকার থাকিত। আমি নির্দ্দিষ্ট করিয়া বলিতে পারি যে, এ বৎসর বেকার কুলিদের সর্ব্বোচ্চ সংখ্যা ৬০, এবং প্রায়ই ইহার চেয়ে অনেক কম। Colonel Lane-এর নিজের সুবিচারিত মত এই যে, "ভারতবর্ষকে এই কৃমির সংক্রামকতা হইতে মুক্ত করা নিশ্চয়ই সম্ভবপর। এবং ইহা সম্পন্ন হইলে বর্ত্তমানে যে ভারতবর্ষকে আমরা জানি, তাহা হইতে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভারতবর্ষ জন্মলাভ করিবে; তাহা নীরোগতায় স্বাস্থ্যে শক্তিতে এবং সম্পদে পৃথক্‌।" তিনি উপসংহারকালে,এই নবভারত কী উপায়ে সৃষ্ট হইতে পারে তৎসম্বন্ধে মত প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন যে,প্রথম উপায় তাহার যে পীড়া সেই জ্ঞান; তাহার পরে তাহার রোগের প্রকৃতি, কিরূপে তাহার প্রতিকার হইতে পারে এবং কিরূপে রোগের পুনরাবর্ত্তন নিষেধ করা যায়, তৎসম্বন্ধে জ্ঞান।

 

১৬৩

 

তোমাকে আমার লিখিবার উদ্দেশ্য এই যে, বাংলা দেশের পক্ষে যে জ্ঞানের এত বেশি প্রয়োজন যাহাতে সেই জ্ঞান বিস্তার করিবার শ্রেষ্ঠ উপায়-সম্বন্ধে স্যানিটারী বোর্ডের উপদেশ সংগ্রহ করা হয়। এই ব্যাধি সম্বন্ধে আমাদের বর্ত্তমান অভিজ্ঞতা হইতে দুইটি কথা সুস্পষ্ট প্রকাশিত হইয়াছে-- প্রথম, যে, ইহা অত্যন্ত দূরবিস্তৃত, এবং দ্বিতীয়, যে, ইহা সহজেই সারিয়া যায়। কিন্তু যদি বা এই পরাশিত কীট মনুষ্যের দেহতন্ত্র হইতে বিনাক্লেশে তাড়িত হয় তথাপি ইহার পুনঃসংক্রমণ নিষেধ করা এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যাপার। এবং সেই পুনঃসংক্রমণ হইতে নিরাপদ হওয়া কেবলমাত্র জনগণের স্বাস্থ্যপালন-সম্বন্ধীয় অভ্যাসসকলের পরিবর্ত্তন-দ্বারাই ঘটিতে পারে। অতএব এইরূপ যেন বোধ হইতেছে যে, এই পরাশিত কীটের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ-সাধনের চেষ্টার সময় এখনো আসে নাই। কিন্তু যাবৎ বর্ত্তমানে অঙ্কুশকৃমির বিরুদ্ধে নিঃশেষকারী যুদ্ধ চালনা করা সাধ্য না হয় তাবৎ আমার এই বোধ হয় যে, সংগ্রামের একটা প্রথম উপক্রম হাতে লওয়া বেশ চলে।

 

১৬৪

 

উপসংহারে আমি বলি যে, এক্ষণে এ সম্বন্ধে আমাদের যতটা জ্ঞান আছে তাহাতে নিম্নলিখিত প্রতিজ্ঞাগুলিকে স্থাপিত করা আমাদের পক্ষে অন্যায় নহে যে-- (১) বাংলার জনসংখ্যার বৃহদংশ, সম্ভবতঃ শতকরা আশি ভাগ, যাহাতে মোটের উপরে প্রায় তিন কোটি ষাট লক্ষ লোক বুঝায়, এই অঙ্কুশকৃমির দ্বারা আক্রান্ত; (২) এমন কি, মৃদুসংক্রমণেও জীবনীশক্তির খর্ব্বতা, রক্তহীনতা, জড়তা প্রভৃতি মন্দ ফলের জন্য ইহা দায়ী; (৩) অল্পব্যয়ে এই ব্যাধির প্রতিকার হইতে পারে; কিন্তু (৪) দূষিত ভূমিতলকে রোগসংক্রমণ হইতে মুক্ত করিলে তবে ইহাকে নিরস্ত করা এবং তদনুসারে ধ্বংস করা যাইতে পারে; এবং (৫) এই রোগের কারণ ও প্রকৃতি-সম্বন্ধীয় জ্ঞানের বিস্তৃত প্রচার এবং তৎপশ্চাতে জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষা-সম্বন্ধীয় অভ্যাসসকলের পরিবর্ত্তনের দ্বারাই ইহা সম্ভাবিত হইতে পারে।

 

১৬৫

 

মা যখন মারা গেলেন, তখন Catherina-বয়স পনেরো বৎসর মাত্র, সেই জন্য তিনি তখন আপনার কুটির পরিত্যাগ করিয়া, যে ধর্ম্মযাজকের দ্বারা আশৈশব শিক্ষিত হইয়াছিলেন তাঁহারই সহিত বাস করিতে গেলেন। তাঁহার গৃহে তিনি তাঁহার পুত্রকন্যার শিক্ষয়িত্রী পরিচারিকারূপে আবাস গ্রহণ করিলেন। Catherina কে ঐ বৃদ্ধ আপনার সন্তানদেরই একজনের ন্যায় দেখিতেন এবং বাড়ির অন্য সকলের শিক্ষায় নিযুক্ত যে সকল শিক্ষক ছিলেন তাঁহাদিগের দ্বারাই তাঁহাকে নৃত্যবিদ্যা ও সঙ্গীতে শিক্ষিতা করিতে লাগিলেন। এইরূপে Catherinaক্রমশই উন্নতি লাভ করিয়া চলিলেন যে পর্য্যন্ত না ধর্ম্মযাজকের মৃত্যু হইল। এই দুর্ঘটনায় পুনশ্চ তাঁহাকে দারিদ্র্যে অবতীর্ণ করিল।

 

১৬৬

 

লিভোনিয়া প্রদেশ এই সময় যুদ্ধের দ্বারা উচ্ছন্ন হইতেছিল, এবং শোচ্যতম ধ্বংসাবস্থায় পতিত হইয়াছিল। ঐসকল দুর্দ্দৈব চিরকালই দরিদ্রের পক্ষেই সর্ব্বাপেক্ষা দুর্ব্বহ হয়, ঐ কারণে Catherina এত নানা বিদ্যার অধিকারিণী হইয়াও নৈরাশ্যজনক অকিঞ্চনতার সর্ব্বপ্রকার দুঃখ ভোগ করিলেন। আহার্য্য প্রতিদিনই দুর্লভতর হইয়া উঠায় এবং তাঁহার নিজস্ব সম্বল একেবারে নিঃশেষিত হইয়া যাওয়ায় তিনি অবশেষে Marionburg নগরে যাত্রা করিতে সংকল্প করিলেন। তাঁহার ভ্রমণকালে একদিন সন্ধ্যার সময় যখন তিনি রাত্রিবাসের জন্য পথপার্শ্বস্থ এক কুটিরে প্রবেশ করিয়াছেন, তখন দুই জন সুইডীয় সৈনিকের দ্বারা তিনি উৎপীড়িত হন। ঘটনাক্রমে সেই সময় ঐ স্থান দিয়া একজন সৈন্যদলের উপনায়ক যাইতেছিলেন, তিনি তাঁহার সাহায্যার্থে উপস্থিত না হইলে উহারা  অপমানকে সম্ভবত উপদ্রবে পরিণত করিত।

 

১৬৭

 

তাঁহার আবির্ভাবে সৈনিকদ্বয় তৎক্ষণাৎ নিরস্ত হইল, কিন্তু Catherina যখন আপনার উদ্ধারকর্ত্তাকে তাঁহার পূর্ব্বতন গুরু, হিতকারী এবং বন্ধু ধর্ম্মযাজকের পুত্র বলিয়া অবিলম্বে চিনিতে পারিলেন, তখন যেমন বিস্মিত তেমনি কৃতজ্ঞ হইলেন। এই সাক্ষাৎকার  Catherina-পক্ষে সুখকর হইয়াছিল। যে অল্প অর্থসম্বল তিনি গৃহ হইতে লইয়া আসিয়াছিলেন তাহা এত দিনে সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছিল। যাহারা তাঁহাকে আপনাদের গৃহে আশ্রয় দান করিয়াছিল তাহাদের সন্তুষ্টির জন্য পরিচ্ছদগুলি এক এক করিয়া নিঃশেষিত হইতেছিল। এই কারণে তাঁহার বদান্য স্বদেশী ব্যক্তিটি পরিচ্ছদ ক্রয় করিবার জন্য যতটা পারেন অর্থ দান করিলেন, একটি অশ্ব জোগাইয়া দিলেন এবং তাঁহার পিতার বিশ্বাসী বন্ধু Marionburg-এর পরিদর্শক Mr. Gluck-এর নিকট প্রশংসাপত্রও দিলেন।

 

১৬৮

 

তৎক্ষণাৎ পরিদর্শকের পরিবারে তাঁহার কন্যাদ্বয়ের শিক্ষয়িত্রী পরিচারিকারূপে নিযুক্ত হইলেন। তাঁহার সুমতি ও সৌন্দর্য্য এত অধিক ছিল যে, অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহার প্রভু তাঁহার পাণিগ্রহণের প্রস্তাব করিলেন এবং যখন Catherina তাহা প্রত্যাখ্যান করাই সঙ্গত মনে করিলেন তখন তিনি বিস্মিত হইলেন। যদিও উদ্ধারকর্ত্তার একটি হস্ত কাটা গিয়াছিল এবং যুদ্ধব্যবসায়ে অন্য প্রকারে তিনি বিকৃতদেহ হইয়াছিলেন, তথাপি কৃতজ্ঞতার ভাবে প্রণোদিত হইয়া তিনি উদ্ধারকর্ত্তাকেই বিবাহ করিতে সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। সেই কর্ম্মচারী কার্য্যানুরোধে ঐ নগরে আসিবামাত্র Catherina তাঁহাকে আপনার পাণিদানের প্রস্তাব করিতেই তিনি তাহা উল্লাসের সহিত গ্রহণ করিলেন। কিন্তু যেদিন তাঁহাদের বিবাহ হইল সেই দিনেই রুষগণ Marionburg অবরোধ করিল। ঐ দুর্ভাগ্য সৈনিক একটি আক্রমণ ব্যাপারে আহূত হইলেন, কিন্তু আর তাঁহাকে ফিরিতে দেখা গেল না।

 

১৬৯

 

শত্রুদ্বারা অধিকৃত হইল এবং আততায়ীদের প্রচণ্ডতা এরূপ ছিল যে, কেবলমাত্র প্রহরী-সৈন্য নয়, নগরের প্রায় সমস্ত অধিবাসী-- স্ত্রী পুরুষ ও শিশু তরবারির মুখে নিক্ষিপ্ত হইল। অবশেষে হত্যাকাণ্ডের যখন প্রায় অবসান হইয়াছে তখন Catherina চুলার মধ্যে লুক্কায়িত অবস্থায় ধরা পড়িলেন। তিনি এত দিন দরিদ্র ছিলেন বটে, কিন্তু স্বাধীন ছিলেন, তাঁহাকে এক্ষণে কঠোর ভাগ্যের আনুগত্য করা এবং ক্রীতদাসী হওয়া যে কী তাহা শিক্ষা করিতে হইল। যাহা হউক, এই অবস্থায় তিনি তাঁহার ব্যবহারে ধর্ম্মনিষ্ঠা এবং নম্রতা রক্ষা করিয়া চলিতেন। তাঁহার গুণের খ্যাতি রুষীয় সৈন্যাধ্যক্ষ প্রিন্স্‌ Memsikoff-এর নিকটেও পৌঁছিল, তিনি তাঁহাকে দেখিতে চাহিলেন এবং তাঁহার সৌন্দর্য্যে বিস্মিত হইয়া তাঁহাকে আপনার ভগিনীর তত্ত্বাবধানে স্থাপিত করিলেন।

 

১৭০

 

এখানে সকলের ব্যবহারে তিনি তাঁহার গুণের উপযুক্ত শ্রদ্ধা লাভ করিলেন; এ দিকে তাঁহার সৌভাগ্যের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁহার সৌন্দর্য্যও উন্নতি লাভ করিতে লাগিল। এই অবস্থায় তাঁহার দীর্ঘকাল না যাইতেই যখন পীটর্‌ দি গ্রেট্‌ প্রিন্সের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিলেন, ঘটনাক্রমে Catherina কিছু ফল লইয়া ঘরে ঢুকিলেন এবং বিশেষ একটি চারুতার সহিত তাহা পরিবেষণ করিয়াছিলেন। প্রতাপশালী রাজা তাঁহার সৌন্দর্য্য দেখিলেন এবং দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। তিনি পরদিন পুনর্ব্বার আসিলেন, আসিয়া সুন্দরী দাসীকে আহ্বান করিলেন ও তাঁহাকে কতকগুলি প্রশ্ন করিয়া দেখিলেন যে, তাঁহার বুদ্ধি তাঁহার সৌন্দর্য্য অপেক্ষাও পূর্ণতর।

 

১৭১

 

তিনি তৎক্ষণাৎ এই অষ্টাদশ বৎসর অপেক্ষাও অল্প বয়সের সুন্দরী লিভোনিয়া-বাসিনীর জীবনকাহিনী সম্বন্ধে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহার বংশের হীনতা সম্রাটের অভিপ্রায়কে কোনোই বাধা দিল না, তাঁহাদের বিবাহ গোপনে বিধিপূর্ব্বক অনুষ্ঠিত হইল; প্রিন্স্‌ তাঁহার সভাসদ্‌দিগকে দৃঢ় করিয়া বলিলেন যে, গুণই একমাত্র সিংহাসনে আরোহণের যোগ্য সোপান। আমরা এখন Catherinaকে অনুচ্চ মৃন্ময়প্রাচীরবিশিষ্ট কুটীর হইতে বৃহত্তম রাজ্যের অধীশ্বরীরূপে দেখিলাম।

 

১৭২

 

এক ডাকেই তোমার দুইখানা চিঠি পাওয়া আমার পক্ষে বড়োই আনন্দময় বিস্ময়ের কারণ হইয়াছিল। তুমি ভারতবর্ষে ফিরিয়া যাওয়ার পর আমরা ছোটোখাটো দুই এক কথায় তোমার খবর পাইয়াছিলাম, কিন্তু এই দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর ভারতবর্ষে পৌঁছিয়াই যে তুমি কাজে কর্ম্মে বিষম ব্যস্ত হইয়া পড়িবে তাহা ভালো করিয়াই বুঝিয়াছিলাম। সম্প্রতি আমাদের এখানে বহু পরিমাণে বৃষ্টি হইয়াছে। একটা বিশেষ রকমের অসুখকর সর্দ্দিজ্বর সংক্রামক হইয়া উঠিয়াছে, এবং সহজে এই জ্বরের যতটা অংশ আমাদের পরিবারের ভাগে পড়া উচিত ছিল তাহার চেয়ে বরঞ্চ অনেকটা বেশি পড়িয়াছে। Elsie-যে ছোটো ভাগিনেয়টি সারা দিনই তাহার কাছে কাছে থাকে, এবং যাহার মতে জগতে "Elsie মামী'র মতো খেলার সাথী আর নাই, তাহাকে পাইয়া Elsie খুব সুখী হইয়াছে। আমাদের সকলকেই খুব খাটিতে হইতেছে। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের সময়ে আমাদের কাহারও দিনই সহজভাবে কাটিতেছে না। তোমাকে আমাদের পরিবারমণ্ডলের অকপট প্রীতি জানাইতেছি।

 

১৭৩

 

অষ্টাদশ শতাব্দী পর্য্যন্ত সকল যুগের সাহিত্যেই দেখা যায় যে, ধূমকেতুকে লোকে তখন দুঃখের ভীষণ অগ্রদূত বলিয়া বিশ্বাস করিত। লোকের সাধারণতঃ ধারণা ছিল যে, নক্ষত্র ও উল্কা ভবিষ্যৎ শুভ ঘটনার, বিশেষ করিয়া বীর ও মহৎ জনশাসকদের জন্মের ভাবী বার্ত্তা বলে। সূর্য্যচন্দ্রের গ্রহণগুলি পার্থিব দুর্ঘটনায় প্রকৃতির দুঃখানুভব ব্যক্ত করে এবং অন্যান্য সমস্ত দৈব সঙ্কেতসমষ্টির অপেক্ষা ধূমকেতুই গুরুতর অমঙ্গলের পূর্ব্বসূচনা। যাহারা ইহা ভগবানের প্রেরিত সঙ্কেত বলিয়া স্বীকার না করিত তাহারা নাস্তিক নামে কলঙ্কিত হইত। John Knox ইহাদিগকে দেবতার ক্রোধের চিহ্ন বলিয়া বিশ্বাস করিতেন, অপর অনেকে পোপপূজকদিগকে সমূলে বিনাশ করিবার জন্য রাজার প্রতি সঙ্কেত ইহার মধ্যে দেখিয়াছিল। Luther ইহাদিগকে সয়তানের কীর্ত্তি বলিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন এবং ইহাদিগকে কুলটা তারা বলিতেন।

 

১৭৪

 

বলেন যে, ধূমকেতু তাহার ভয়াবহ কেশজাল ঝাড়া দিয়া মহামারী ও যুদ্ধবিগ্রহ বর্ষণ করে। রাজা হইতে আরম্ভ করিয়া দীনতম কৃষক পর্য্যন্ত সমগ্র জাতি এই অমঙ্গলের দূতসকলের আবির্ভাবে ক্ষণে ক্ষণে দারুণতম আতঙ্কে নিমগ্ন হইত। ১৪৫৬ খ্রীষ্টাব্দে, হ্যালির নামে পরিচিত ধূমকেতুর পুনরাগমনে যেমন সুদূরব্যাপী ভয়ের সঞ্চার হইয়াছিল পূর্ব্বে আর কখনও তেমন হইয়াছে বলিয়া জানা যায় নাই। বিধাতার শেষ বিচারের দিন আগতপ্রায় এই বিশ্বাস ব্যাপক হইয়াছিল। লোকে সমস্ত আশা ভরসা ছাড়িয়া দিয়া তাহাদের বিনাশদণ্ডের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিল। ১৬০৭ খ্রীষ্টাব্দে ইহা আবার স্বীয় আবির্ভাবে জগৎকে শঙ্কিত করিয়া তুলিল এবং ভজনালয়গুলি ভয়াভিহত জনসঙ্ঘে পূর্ণ হইয়া গেল।

 

১৭৫

 

তৎকালীন প্রেগ্‌ নগরের রাজজ্যোতিষী Kepler শান্তচিত্তে ইহার গতিপথ অনুসরণ করিয়া আবিষ্কার করিলেন যে, সেই পথ চন্দ্রের ভ্রমণকক্ষের বাহিরে। Kepler-এর এই আবিষ্কারের ঘোষণা তুমুল বাদবিসম্বাদের সৃষ্টি করিল, কারণ, ইহা ধূমকেতু-সম্বন্ধীয় অন্ধ সংস্কারসকলের মূলে আঘাত করিয়াছিল। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগের ন্যায় এত অধুনাতন কালেও রোমের ক্লেমেন্টিন কলেজের Father De Angelis ধূমকেতু-সম্বন্ধীয় প্রাচীন বিশ্বাস সমর্থন করিয়া একখানি পুস্তক প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি স্থির সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন যে, ধূমকেতুসকল চন্দ্রের নীচে আমাদের বায়ুমণ্ডলেই জন্মে। প্রত্যেক দিব্য বস্তুই নিত্যকালস্থায়ী। আমরা ধূমকেতুর আরম্ভও দেখি সমাপ্তিও দেখি, সুতরাং তাহারা দিব্য জ্যোতিষ্ক নহে। ইহারা বায়ুর শুষ্ক ও মেদযুক্ত পদার্থ হইতে নিঃসৃত এবং ইহারা আকাশ হইতে কোনো স্ফুলিঙ্গ অথবা বিদ্যুৎ-দ্বারা প্রজ্জ্বলিত হইতে পারে।

 

১৭৬

 

Bayonee-এ Biarrit-এ যাইতে ইচ্ছা করিলাম। পথ না জানাতে আমি একজন Navarre-দেশীয় কৃষককে সম্বোধন করিয়া প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলাম। সে বলিল, "Pont Magour-এর পথ ধরো এবং Porte d' Espagne পর্য্যন্ত ইহার অনুসরণ করিয়া যাও।" "বিয়ারিজের জন্য একখানা গাড়ী পাওয়া কি সহজ?" নাভারীয় আমার দিকে তাকাইল, একটু গম্ভীর হাসি হাসিল এবং নিজ দেশ-প্রচলিত টান দিয়া স্মরণীয় এই যে কয়টি কথা বলিল তাহার গভীর সত্যতা আমি পরে বুঝিয়াছিলাম-- "সাহেব, সেখানে যাওয়া সহজ কিন্তু ফিরিয়া আসা শক্ত।"

 

১৭৭

 

আমি Pont Magour-এর পথ ধরিলাম। এই পথে উঠিতে উঠিতে আমি অনেকগুলি দেওয়ালে লাগানো বিভিন্ন রঙের বিজ্ঞাপনফলক দেখিলাম, সেগুলিতে ভাড়াটে গাড়ীওয়ালারা নানা সঙ্গত ভাড়ায় সাধারণকে Biarrit-এ যাইবার জন্য গাড়ী দিবার প্রস্তাব করিয়াছে। আমি লক্ষ্য করিলাম কিন্তু খেয়াল করিলাম না যে, সকল ঘোষণারই শেষে এই একই বাক্য আছে-- "সন্ধ্যা আট ঘটিকা পর্য্যন্ত ভাড়ার বদল হইবে না।" আমি Porte de Espagne পৌঁছিলাম। সেখানে সকল প্রকারের শকট এলোমেলা ভাবে ঠাসাঠাসি করা আছে। এই ভীড়-করা গাড়ীর প্রতি দৃষ্টি দিতে না দিতে দেখিলাম আমি স্বয়ং অকস্মাৎ আর এক প্রকার ভীড়ের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ইহারা গাড়োয়ান-দল। এক মুহূর্ত্তে আমার কানে তালা লাগাইয়া দিল। আমি এক যোগে সব-রকম কণ্ঠস্বর, সব-রকম উচ্চারণের টান, সব-রকম অপভাষা, সব-রকম শপথ-বাক্য এবং সব-রকম প্রস্তাবের দ্বারা আক্রান্ত হইলাম।

 

১৭৮

 

একজন আমার দক্ষিণ হস্তখানা ধরিয়া ফেলিল, "মহাশয়, আমি Castix সাহেবের গাড়োয়ান; গাড়ীতে উঠিয়া পড়ুন, এক সীটের ভাড়া ১৫ সূ।" আর একজন আমার বাম হস্ত ধরিল, "মহাশয়, আমি Ruspit, আমারও একখানা গাড়ী আছে-- বারো সূ'তে একটি সীট।" তৃতীয় একজন আমার পথ জুড়িয়া দাঁড়াইল, "আমি Anatole, এই যে আমার গাড়ী; আপনাকে দশ সূ'তে গাড়ী হাঁকাইয়া লইয়া যাইব।" চতুর্থ এক ব্যক্তি আমার কানে কানে বলিল, "মহাশয়, Momus এর সঙ্গে আসুন, আমিই মোমস। ছয় সূ'তে পূরা দমে বিয়ারিজে।" আমার চারি দিকে  আর সকলে "পাঁচ সূ" বলিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল। "দেখুন মহাশয়, সুন্দর গাড়ীখানি-- বিয়ারিজের সুলতান; পাঁচ সূ'তে এক সীট।"

 

১৭৯

 

যে আমার সঙ্গে প্রথম কথা বলিয়াছিলেন এবং আমার ডান হাত ধরিয়াই ছিল সে'ই শেষ কালে সকল কোলাহলের উপরে গলা চড়াইল। সে বলিল, "সাহেব, আমিই আপনার সঙ্গে প্রথম কথা বলিয়াছি, আমাকেই পছন্দ করা উচিত।" অন্য গাড়োয়ানেরা চীৎকার করিয়া উঠিল, "ও পনেরো সূ চায়।" লোকটি অনায়াসে উত্তর করিল, "মহাশয়, আমি তিন সূ চাই।" নিবিড় নিঃশব্দতা বিরাজ করিতে লাগিল। লোকটি বলিল, "আমিই সাহেবের সঙ্গে প্রথম কথা বলিয়াছিলাম।" তাহার পরে যখন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা অবাক্‌ হইয়া গেছে সেই সুযোগে সে তাড়াতাড়ি নিজের গাড়ীর দরজা খুলিল, আমি প্রকৃতিস্থ হইবার সময় পাইবার পূর্ব্বেই আমাকে ভিতরে ঠেলিয়া দিল, দরজাটা আবার বন্ধ করিল, কোচ্‌বাক্সে চড়িয়া বসিল এবং দ্রুত ঘোড়া ছুটাইয়া চলিল।

 

১৮০

 

গাড়ীখানা সম্পূর্ণ নূতন এবং বেশ ভালো; ঘোড়াগুলি অতি উৎকৃষ্ট। অর্দ্ধ ঘন্টারও অল্প সময়ে আমরা বিয়ারিজে আসিয়া পড়িলাম। সেখানে পৌঁছিয়া, সস্তা চুক্তির সুবিধা গ্রহণ করিতে অনিচ্ছুক ছিলাম বলিয়া আমি টাকার থলি হইতে পনেরোটি সূ লইলাম এবং গাড়োয়ানকে তাহাই দিলাম। আমি চলিয়া যাইতে উদ্যত ছিলাম, কিন্তু সে আমার হাত ধরিল। সে বলিল, "মহাশয়, আমার প্রাপ্য মাত্র তিন সূ।" আমি উত্তর করিলাম, "হাঁঃ! তুমি আমাকে প্রথমে পনেরো সূ বলিয়াছিলে। পনেরো সূই দিব।" "মোটেই না সহেব! আমি বলিয়াছিলাম আপনাকে তিন সূ'তে লইব, সুতরাং ভাড়া তিন সূ।" এবং উদ্‌বৃত্ত মুদ্রা ফিরাইয়া দিয়া প্রায় জোর করিয়া সে আমাকে তাহা গছাইয়া দিল। আমি যাইতে যাইতে বলিলাম, "লোকটা খাঁটি বটে!" অন্যান্য যাত্রীরাও আমার মতো তিন সূ মাত্রই দিয়াছিল।

 

১৮১

 

সারাদিন সমুদ্রতীরে ঘুরিয়া বেড়াইবার পর সন্ধ্যা হইয়া আসিল এবং আমি Bayonne-এ ফিরিবার কথা চিন্তা করিতে লাগিলাম। আমি ক্লান্ত হইয়া পড়িলাম এবং যে উৎকৃষ্ট যান ও সাধু সারথি আমাকে সেখানে পৌঁছাইয়া দিয়াছিল তাহারই কথা স্মরণ করিয়া আমি বিশেষ কিছু আনন্দ বোধ করিলাব। যখন আমি পুরাতন বন্দর হইতে ফিরিবার মুখে ঢালু পথে উঠিতেছিলাম তখন সমতল দেশে দূরের ঘড়িগুলিতে আটটা বাজিতেছিল। চারি দিক হইতে যে সব পদাতিক ভীড় করিয়া আসিতেছিল, এবং মনে হইল তাহারা গ্রামের প্রবেশপথে গাড়ী দাঁড়াইবার জায়গায় যাইতেছে, তাহাদের প্রতি কোনও মনোযোগ দিই নাই। সন্ধ্যাটি চমৎকার হইয়াছিল, কয়েকটি তারা যেন গোধূলির নির্ম্মল আকাশ বিদীর্ণ করিতে সুরু করিয়াছিল; শান্তপ্রায় সমুদ্রে বিপুল তৈলাস্তরণের মতো একটি নিস্তেজ অস্বচ্ছ আভা বিরাজ করিতেছিল।

 

১৮২

 

অন্ধকার নিবিড়তর হইয়া উঠিল এবং অকস্মাৎ কোন্‌ এক সময়ে Bayonne নগর এবং আমার সরাইখানার চিন্তা আমার ধ্যানের মাঝখানে আসিয়া পড়িল। আমি আবার চলা আরম্ভ করিলাম এবং যে জায়গা হইতে গাড়ী ছাড়ে সেইখানে আসিয়া পৌঁছিলাম। একটিমাত্র গাড়ী অবশিষ্ট ছিল। ভূমিতলে স্থাপিত একটি প্রকাণ্ড লণ্ঠনের আলোকে আমি তাহা দেখিলাম। ইহা চারি জনের সীট-বিশিষ্ট গাড়ী। তিনটি সীট ইতিমধ্যেই অধিকৃত। আমি নিকটস্থ হইতে একটি চীৎকার-স্বর উঠিল, "এই যে সাহেব, শীঘ্র করুন, একটি শেষ সীট এবং আমাদেরই শেষ গাড়ী।" আমি আমার সকাল বেলাকার সারথির কণ্ঠস্বর চিনিলাম। মনুষ্যজাতীয় সেই অপূর্ব্ব পদার্থটিকে আমি পুনর্ব্বার পাইলাম। এই সৌভাগ্য আমার নিকট দৈবঘটিত বোধ হইল এবং আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলাম। আর এক মুহূর্ত্ত দেরি করিলেই পদব্রজে যাত্রা করিতে বাধ্য হইতাম-- খাঁটি দেড় ক্রোশ পল্লীপথ। আমি বলিলাম, "তোমাকে আবার দেখিয়া আনন্দিত হইলাম।" লোকটি উত্তর দিল, "মহাশয়, তাড়াতাড়ি ঢুকিয়া পড়ুন।" আমি সত্বর নিজেকে গাড়ীর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিলাম।

 

১৮৩

 

আমি উপবিষ্ট হইলে পর সারথি দরজার হ্যাণ্ডেলে হাত রাখিয়া আমাকে বলিল, "মহাশয়, জানেন কি যে, ঘন্টা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে?" আমি বলিলাম, "কিসের ঘন্টা?" "আটটা।" "ঠিক কথা। আমি ঐ রকমই বাজিতে শুনিয়াছি বটে।" উত্তরে লোকটি বলিল, "সাহেব, জানেন যে, সন্ধ্যার আটটার পর ভাড়ার পরিবর্ত্তন হয়। রওয়ানা হইবার পূর্ব্বেই ভাড়া দেওয়া দস্তুর।" আমি টাকার থলিটা টানিয়া বাহির করিয়া উত্তর দিলাম, "নিশ্চয়ই, কত ভাড়া?" লোকটি মিষ্টস্বরে উত্তর দিল, "বারো ফ্রাঙ্ক্‌ সাহেব!" তৎক্ষণাৎ কার্য্যপ্রণালীটি বুঝিলাম। প্রাতঃকালে ইহারা লোকপিছু তিন সূ হারে দর্শকদিগকে বিয়ারিজে গাড়ী করিয়া লইয়া যাইবে বলিয়া ঘোষণা করে এবং তখনই ভীড় জমিয়া যায়। সন্ধ্যায় লোকপিছু বারো ফ্রাঙ্ক্‌ হারে ইহারা সেই ভীড়টিকে Bayonne-এ ফিরাইয়া আনে।

 

১৮৪

 

৩১শে মে, ৮২। আজ হইতে আমি চৌষট্টি বৎসরে পা দিলাম। যে পক্ষাঘাত রোগ প্রায় দশ বৎসর পূর্ব্বে আমাকে প্রথম আক্রমণ করিয়াছে, তখন হইতেই নানা দশান্তরের মধ্য দিয়া থাকিয়াই গিয়াছে, এখন যেন যেন তাহা বেশ শান্তভাবে স্থায়ী আড্ডা গাড়িয়া বসিয়াছে এবং সম্ভবতঃ এই ভাবেই চলিবে। আমি সহজেই ক্লান্ত হইয়া পড়ি, বেশি দূর হাঁটিতে পারি না; কিন্তু আমার স্ফূর্ত্তি সেরা দরের। আমি প্রায় প্রতিদিনই বাহিরে ঘুরিয়া বেড়াই-- কখনও কখনও রেলে কি নৌকাপথে শত শত মাইল জুড়িয়া এক একটি লম্বা চক্র দিয়া আসি, বেশির ভাগ সময় খোলা হাওয়ায় থাকি-- রোদপোড়া ও মোটাসোটা হইয়াছি; লোকযাত্রা, জনসাধারণ, সমাজের উন্নতি ও সাময়িক সমস্যাসকল সম্বন্ধে আমার ঔৎসুক্য বজায় রাখি। দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় আমি বেশ আরামে থাকি। আমার মানসিকশক্তি বরাবর যেমন ছিল সেইরূপ সম্পূর্ণ অবিকৃতই আছে, যদিও শারীরিক হিসাবে আমি অর্দ্ধ-অসাড় এবং যত দিন বাঁচি আমার এইরূপ থাকা সম্ভবপর। কিন্তু আমার জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়াছে বলিয়া মনে হয়-- আমার বন্ধুরা একান্ত নিষ্ঠাবান ও অনুরক্ত, আত্মীয়স্বজন স্নেহশীল, আর শত্রুদিগকে বাস্তবিক হিসাবের মধ্যেই ধরি না।

 

১৮৫

 

ভারতবর্ষে নানাপ্রকার তালী-জাতীয় বৃক্ষ হইতে ন্যূনপক্ষে তিন লক্ষ টন চিনি প্রতিবৎসর উৎপন্ন হয়। এই পরিমাণ চিনির মধ্যে বঙ্গদেশে প্রায় এক লক্ষ টন উৎপন্ন হয় বলিয়া উক্ত হইয়াছে। মাদ্রাজের য়ুরোপীয় হৌসগুলি গুড় পরিষ্কার ও চোলাই করিবার অভিপ্রায়ে প্রায় পঁচিশ হাজার টন গুড় প্রতিবৎসর ক্রয় করিয়া থাকে। সুতরাং আমাদের এমন একটি ব্যবসায় আছে, সহজ বৎসরে যাহাতে উৎপন্ন দ্রব্যের বাৎসরিক মূল্য মোটামুটি পঁচিশ লক্ষ পাউণ্ড। এ বিষয়ে অতি সামান্যই অনুসন্ধান হইয়াছে। চিনির উৎপাদন হিসাবে তালী-জাতীয় বৃক্ষের শ্রেষ্ঠতা এই যে, বৎসর হইতে বৎসরান্তে তাহার উৎপন্ন চিনির পরিমাণ সমান থাকে এবং ইক্ষুর ন্যায় ইহার অতিবৃষ্টি বা বন্যার কোনো প্রভাব নাই। চাষের খরচ নাম মাত্র লাগে; এবং ইক্ষু অপেক্ষা তালে দীর্ঘকাল চিনি করিবার মরসুম সম্ভব হয়।

 

১৮৬

 

অপরন্তু ইক্ষুর বেলায় গুড় তৈয়ারির মণ-করা খরচ অপেক্ষা খেজুর ও তালের বেলায় খরচ কম লাগে। উভয়ত্রই চিনির পরিমাণ ন্যূনাধিক সমান। তাল-গুড়ের রঙের উন্নতি করিতে পারিলে আরও ভাল দাম পাওয়া যাইতে পারিত। সতর্কতার সহিত সংগৃহীত হইলে তালের রস খুবই বিশুদ্ধ হইয়া থাকে এবং ইক্ষু-শর্করা ব্যতীত অন্যজাতীয় চিনি ইহাতে অতিঅল্প থাকে। বাঙ্গালা দেশে ভাল পদ্ধতিতে এই রস সংগৃহীত হয় না, কিন্তু এই পদ্ধতির উন্নতি করা যায়। এই রস পাইতে কোনো পেষণযন্ত্র লাগে না।

 

১৮৭

 

"গুড্‌ হেলথ্‌' কাগজে সম্ভবত সম্পাদক Dr. J. H. Kellogg-কর্ত্তৃক কতকটা চমক-লাগানো এই একটি উক্তি প্রকাশিত হইয়াছে যে, তারুণ্য ও বার্দ্ধক্যের মধ্যবর্ত্তী কাল সংক্ষিপ্ত হইয়াছে। অর্থাৎ তিনি মনে করেন, দমনপ্রাপ্ত না হইলে যেসকল অবজননকর শক্তি লোক ধ্বংস করিবে তাহাদেরই প্রভাবে এখন বার্দ্ধক্যের বিশেষ লক্ষণ অপেক্ষাকৃত সকাল সকাল দেখা দিতেছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও প্রতিষেধক ঔষধের উন্নতিসাধন সত্ত্বেও দীর্ঘ আয়ুতে উপনীত হয় এমন ব্যক্তির পরিমাণ পূর্ব্বের চেয়ে এখন অনেক কম। ডাক্তার কেলগ শঙ্কা করেন যে যৌবনের সঙ্গে মিলিত হইবার জন্য বার্দ্ধক্য মন্দ গতিতে নামিয়া আসিতেছে, ইহার ফলে অবশেষে আমরা বিশ বৎসর বয়সে বৃদ্ধ হইয়া উঠিব।

 

১৮৮

 

গত বিশ বৎসরের মধ্যে, বিশেষভাবে সভ্য দেশসকলে, জাতিগত জীর্ণতার প্রমাণ এত প্রচুর পরিমাণে সঞ্চিত হইয়াছে যে, বর্ত্তমান কালে কোনো নৃতত্ত্ব-অনুশীলনকারী এ কথা স্বীকার করিতে দ্বিধা করিবেন না যে, প্রত্যেক সভ্যসমাজে যেসকল অবজনন-প্রভাব বর্ত্তমান, প্রত্যহ তাহার প্রবলতা বৃদ্ধি পাইতেছে এবং সমূলে দমন প্রাপ্ত না হইলে কালক্রমে তাহা অবশ্যই লোক ধ্বংস করিবে। লোকসংখ্যার অবশিষ্ট ভাগের তুলনায় শতায়ু লোকের পরিমাণের সুস্পষ্ট হ্রস্বতাই জনগণের অবজননের সুনিশ্চিত প্রমাণসকলের মধ্যে অন্যতম, লেখক প্রায় চল্লিশ বৎসর ধরিয়া তৎপ্রতি লোকের মনোযোগ অভিনির্দ্দেশ করিতেছেন। ফরাসী দেশে শতায়ু লোকের পরিমাণ জনসংখ্যার এক লক্ষ নব্বই হাজারে একজন; ইংলণ্ডে দুই লক্ষে একজন, জর্ম্মানিতে সাত লক্ষে একজন।

 

১৮৯

 

আজকাল কুইনাইন এবং অন্যান্য সিঙ্কোনা-জাত পদার্থের উৎপাদন অত্যধিক পরিমাণে জাভার ডচ্‌ গভর্ণমেন্টের হস্তেই আছে। এই প্রবল একচেটিয়া ব্যবসার প্রতিকূলে ভারতবর্ষে দার্জ্জিলিঙে কয়েকটি এবং উহা অপেক্ষা অল্প পরিমাণে মান্দ্রাজ প্রেসিডেন্সির নীলগিরিতে অবস্থিত কয়েকটি সিঙ্কোনার কৃষিক্ষেত্র আমাদের আছে। বর্ত্তমান কাল পর্য্যন্ত ভারতবর্ষে সিঙ্কোনার কারখানা-সকলকে প্রধানত জাভা হইতে ক্রীত বল্কলের উপর অত্যন্ত বেশি নির্ভর করিতে হইয়াছে। ১৮৮৭ হইতে ১৮৯২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত যত দিন কুইনাইনের প্রয়োজন অল্প ছিল তত দিন বিদেশী গাছ ক্রয় করা হয় নাই এবং বার্ষিক যে ৩০০,০০০ পাউণ্ড্‌ বল্কলের জোগান পাওয়া যাইত এবং যাহা হইতে ২৬০০ পাউণ্ড কুইনাইন উৎপন্ন হইত, তাহাই ভারতবর্ষের তখনকার প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। ১৮৯২ হইতে ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে চাহিদা যখন বাড়িয়া উঠিল, তখন প্রায় ২৫০,০০০ পাউণ্ড্‌ গাছের ছাল বাংলা দেশেই উৎপন্ন হইয়াছে, কিন্তু অন্যূন ২৫১,৫০০ পাউণ্ড্‌ ক্রয় করা হইয়াছিল এবং তাহা হইতে ৮০০০ পাউণ্ড্‌ কুইনাইন উৎপন্ন হয়।

 

১৯০

 

বাঙ্গলার সিঙ্কোনা-কৃষিক্ষেত্র সংখ্যায় দুইটি; তাহার মধ্যে যেটি প্রাচীনতর সেটি রিয়াঙ্গ উপত্যকার দুই পার্শ্বে মংপোতে অবস্থিত। ঐ উপত্যকার নদীটি তিস্তা ভ্যালি রেলওয়ের রিয়াঙ্গ ষ্টেশনে তিস্তার সহিত যুক্ত হইয়াছে। ঐ কৃষিক্ষেত্র ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে স্থাপিত হয়, এবং বর্ত্তমানে কুইনাইন প্রস্তুত করিবার যে কারখানা আছে তাহা উহারই মধ্যে। কিন্তু ঐ ক্ষেত্রটি এখন ব্যবহার দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া গিয়াছে এবং উহাকে অনেক পরিমাণে পুনর্বনান্বিত করা হইয়াছে। যত দিন পর্য্যন্ত না ঐ বন বাড়িয়া উঠিবে পুনর্ব্বার পরিষ্কৃত হইবে এবং নূতন সিঙ্কোনা বৃক্ষগুলি পরিণতি প্রাপ্ত হইবে, তত দিন উহা কাজে লাগাইবার উপযুক্ত পরিমাণে গাছের ছাল জোগাইতে পারিবে না।

 

১৯১

 

অতএব আরো দশ কি পনেরো বৎসর মংপো কৃষিক্ষেত্র হইতে আবশ্যকমত সরবরাহের আশা করা নিষ্প্রয়োজন। সৌভাগ্যক্রমে, তখনকার সিঙ্কোনা-কৃষি-পরিদর্শক Sir David Prainএর দূরদর্শিতা ইহার প্রতিকার করিয়া রাখিয়াছিল এবং ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে দার্জ্জিলিঙের কালিম্পং সাব্‌ডিভিসনে তিস্তা নদীর পূর্ব্বদিকে একটি নূতন কৃষিক্ষেত্রের সূচনা করা হইয়াছিল। এই ক্ষেত্রটিতে প্রায় ৯০০০ একর জমি আছে এবং ইহা একদা ঘনবনাচ্ছন্ন ছিল। কর্ষণের পক্ষে অধিকতর উপযোগী ভূমির অনেকাংশই পরিষ্কার করা হইয়াছে এবং এখন মংপো কারখানাতে যত গাছের ছাল ব্যবহৃত হয়, তাহার অধিকাংশই এই মন্‌সঙ্গ কৃষিক্ষেত্র নামে বিদিত স্থান হইতে আসে।

 

১৯২

 

আমাদের ভ্রমণকারীগণ পুনর্ব্বার অশ্বারোহণ করিয়া পার্ব্বত্য প্রদেশাভিমুখে যাত্রা করিয়াছেন; এইবার একটি তরুণ সেনানায়কের অধীনে অশ্বারোহীদলের অনেকগুলি সৈন্য তাঁহাদের সংখ্যাবৃদ্ধি করিয়াছে। তাঁহারা দস্যুর দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিতে যাইতেছেন বলিয়া সৌজন্য-সহকারে এই শরীররক্ষীর দল তাঁহাদিগকে দান করা হইয়াছে। সুন্দর একটি ছোটো ঘোড়ায় চড়িয়া ঐ যে হিংস্রমূর্ত্তি ব্যক্তি সমস্ত বাহিনীকে পথ দেখাইয়া যাইতেছে, ও কে-- এই কি তোমার প্রশ্ন? ঐ ব্যক্তি একজন বিখ্যাত দস্যু, নাম Andrea Puzzu, ও শুধু দস্যু নয় সর্ব্বাপেক্ষা অপকৃষ্ট শ্রেণীর একজন দস্যু-- অপকর্ম্মকারী দানববিশেষ; উহাকে যে রাগাইয়াছে তাহার প্রাণ লওয়া একটা কাকের প্রাণ লওয়ার চেয়ে উহার কাছে অধিক বলিয়া মনে হয় না। যাহা হউক, সে এখন অঙ্গীকারবদ্ধ অবস্থায় আছে এবং সে প্রতিজ্ঞা করিয়াছে যে, ঐ অশ্বারোহী দলটিকে সে লিম্বাবা গিরিশ্রেণীর দুর্গম বাধাসকলের মধ্য দিয়া নিরাপদে লইয়া যাইবে; এবং এ কাজে সে ব্যর্থ হইবে না, কারণ নির্দ্দয় দস্যু হইলেও সে আতিথ্যধর্ম্ম ভঙ্গ করিবে না।

 

১৯৩

 

ঐ পীড্‌মন্ট্‌দেশীয় তরুণ সেনানায়ক বিশেষরূপে প্রিয়দর্শন, চলনসই ধরণের শিক্ষিত, অতিশয় বিনীত। তিনি দলস্থ অল্পবয়স্ক ব্যক্তিদিগকে সাসারীয় (Sassarese) লোকসমাজ-সম্বন্ধে শত শত ক্ষুদ্র কাহিনী বলিয়া আমোদ দিতেছেন। ইটালীয় মাত্রেরই ন্যায় তিনিও সার্ডিনিয়ার উপর সম্পূর্ণ বীতরাগ এবং আগামী শরৎকালে কখন্‌ তিনি তাঁহার প্রিয় Turin-এ ফিরিয়া যাইবেন, যেন তাহারই প্রত্যেক ঘন্টা গুনিতেছেন। তিনি বলেন, "আমার এক জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যখন ঐ প্রচণ্ড দস্যুদিগের বিরুদ্ধে প্রেরিত একটি ক্ষুদ্র দলের অধিকনায়কত্ব করিতেছিলেন, তখন এই পর্ব্বতগুলির মধ্যেই কোনো এক স্থানে তিনি বন্দুকের গুলিতে নিহত হন।" ঐ দস্যুগণ চিরকালই গভর্ণমেন্টের পক্ষে আপদ্‌স্বরূপ, উহাদের চিন্তা মনে আসাতেই যে তিনি শিহরিয়া উঠেন তাহাতে বিষ্ময়ের বিষয় কিছুই নাই। তাঁহার যুবক ভ্রাতাটি সেরা মানুষ ও সাহসী সেনানায়ক ছিলেন। নরঘাতক প্রচ্ছন্ন আক্রমণকারী দস্যুদলের হস্তে নিহত হওয়া অপেক্ষা মহত্তর দশা যে তাঁহার ভাগ্যে ঘটিল না, ইহাতে তিনি খেদ না করিয়া থাকিতে পারেন না।

 

১৯৪

 

"কিন্তু ভগবান তাঁহার আত্মাকে শান্তি দিন" বলিয়া ঐ যুবক নম্রভাবে মস্তক নত করিলেন, উষ্ণ অশ্রুতে তাঁহার সুন্দর চক্ষু দুটিকে ঝাপসা ও তাঁহার কণ্ঠ রুদ্ধ করিয়া দিল। তিনি বলিলেন, "যাক, উহা ভগবানের ইচ্ছা, এখন ঐ দস্যুগণ অপেক্ষাকৃত ভদ্র হইয়াছে। কিন্তু ঐ ভয়াবহ রাক্ষস পুজ্জু--", --তাঁহারা কি পুজ্জুদিগের কথা কখনও শুনিয়াছেন? তাঁহারা কি মেষপালক Scaoccatos-এর হত্যার কাহিনী কখনও শুনিয়াছেন? ঐ কাহিনী শ্রবণযোগ্য বটে, এবং তাঁহারা উহা যদি শুনিতে চাহেন তাহা হইলে অশ্বারোহীদলের পশ্চাদ্‌ভাগে Padre Antonio নামে যে এক ব্যক্তি তাঁহার গিরিসঙ্কটমধ্যস্থ পৌরোহিত্যকর্ম্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে চলিয়াছেন, তিনি যদি বারেকের মতো তাঁহার বৈকালিক নিদ্রা ত্যাগ করিতে সম্মত হন, তবে মধ্যাহ্নভোজনের পর ঐ কাহিনী সবিশেষ বিবৃত করিয়া সমাগত ব্যক্তিবৃন্দকে তুষ্ট করিবার জন্য ঐ পীড্‌মন্ট্‌বাসী তাঁহাকে অনুরোধ করিবেন।

 

১৯৫

 

সকলেই রাজী হইলেন এবং যুবক সেনাপতি ঐ প্রস্তাব করিবার জন্য সত্বর বাহিনীর পশ্চাদ্‌ভাগে গেলেন। ইত্যবসরে ঐ অশ্ববাহিনী পর্ব্বতশ্রেণীর মধ্য দিয়া দ্রুতবেগে চলিতে লাগিল। সেখানকার দৃশ্য বিচিত্র ও সুন্দর এবং চারি দিকের ধ্বনি সেগুলিও কী মনোহর! বহুদূরে একটি গ্রাম্য গির্জ্জার ঘন্টা আপনার শ্রুতিমধুর শব্দ প্রেরণ করিতেছে ও তাহা নির্ম্মল ও সুখস্পর্শ বায়ুর মধ্য দিয়া ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হইতেছে। তাহা ছাড়া মেষদলের গলঘন্টার ঝঙ্কার, মেষ ও ছাগের ডাক, কুকুরের চীৎকার, মেষপালকের একঘেয়ে বাঁশীর সুর এবং মধ্যে মধ্যে কৃষকের সঙ্গীত; তাহার উপরে পাখীর গানও ছিল-- কারণ ইটালীতে পাখী দুর্লভ হইলেও এখানে যথেষ্ট পরিমাণেই আছে এবং ঐ যে পর্ব্বতচূড়ার দিকে উড়িয়া যাইতেছে উহা একটি ঈগলপক্ষী নয় কি?

 

১৯৬

 

মেষপালকদিগের "Stazzuz"-নামক যে এক প্রকার আড্ডা আছে তাহারই একটিতে এখন এই দলটি আসিয়া পৌঁছিল এবং সকলকে থামিবার জন্য সঙ্কেত করা হইল। একটি গিরিনির্ঝরিণীর পার্শ্বে বৃক্ষতলে আহার্য্য প্রস্তুত করা হইবে। Padre Antonio-কে পীড্‌মন্ট্‌বাসী পরিচিত করাইয়া দিলেন, পাদ্রি একজনের পর একজনকে গভীরভাবে নত হইয়া নমস্কার করিতে লাগিলেন। সম্মানসূচক আসন বলিয়া একটি শায়িতপ্রায় বৃক্ষকাণ্ডের উপরে পুরোহিত মহাশয়কে অধিষ্ঠিত করা হইল। পুরোহিত সার্ডিনিয়ার গ্রাম্যপুরোহিতের একটি খাঁটি নমুনা, তিনি খর্ব্বকায় ও তাঁহার আচারব্যবহার সসঙ্কোচ। ত্রিশ এবং ষাট বৎসরের মধ্যে যে-কোনো একটি বৎসর তাঁহার বয়স হইতে পারে। তিনি এখন বেশ স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করিতেছেন এবং গল্প বলিতে প্রস্তুত হইয়াছেন; কিন্তু সকলে বিস্মিত হইয়া দেখিল যে, তিনি সার্ড্‌ ভাষায় কথা বলিলেন না, ইটালীর ভাষাতেও নহে, কিন্তু অতি সুবোধ্য ফরাসী ভাষাতেই। --

 

১৯৭

 

একজন ধনী মেষপালক বলিয়া খ্যাত এবং বহুসংখ্যক গো এবং মেষপালের অধিকারী ছিলেন। আমি সঙ্গত কারণ-বশতই জানিতাম যে Pietro Leonardo এবং Giovanne Puzzu ভাতৃত্রয় তাহাদের সম্পত্তির সমতুল্যপ্রায় এই সম্পদের প্রতি ঈর্ষা অনুভব করিত এবং তাহাদের মৌখিক বন্ধুত্ব বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। আমি যখন Stazzu পৌঁছিলাম তখন স্ক্যাকাটোস্‌-গৃহিণী অলিন্দে বসিয়া যথানিয়মে তাঁহার শ্রমশীল অভ্যাস-মত শষ্য বাছিতেছিলেন। তিনি সুন্দর, উদারমূর্ত্তি ও প্রৌঢ় বয়সের প্রথম প্রথমদশাবর্ত্তিনী রমণী ছিলেন; যথাযোগ্য অভিবাদনের পর আমি তাঁহাকে এই ভাবে সম্ভাষণ করিলাম, "তোমার পুত্র Pietro কে নিশ্চয়ই তুমি ঐ ভয়ঙ্কর পরিবারে বিবাহ করিতে উৎসাহ দিবে না।" তাঁহার চক্ষু প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল; তিনি শস্যঝাড়ার চালুনীটাকে একবার ঊর্দ্ধে উৎক্ষিপ্ত করিয়া উত্তর দিলেন, "আঃ, কাল বিকালেই যে বাগ্‌দানের সময় নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।" আমি বলিলাম, "এখনও সময় আছে।" তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ কম্পিত হইতে লাগিল। "সে আর হইতে পারে না, এখন অতিরিক্ত বিলম্ব হইয়া গিয়াছে, না ঠাকুর, আপনি জানেন যে এখন আর কিছুই করা যায় না।"

 

১৯৮

 

তিনি যথার্থ কথাই বলিতেছিলেন আমি তাহা অনুভব করিলাম। আমি বলিলাম, "ভালো, সাধুপুরুষগণ তোমাদিগকে অমঙ্গল হইতে রক্ষা করুন। Caterina নিজে একটি নম্র তরুণ বালিকা, তাহার কাছ হইতে শঙ্কা করিবার কিছুই নাই, সে তাহার সদগতিপ্রাপ্ত মাতারই সদৃশ এবং পুজ্জু-বংশের রক্তের কোনো কলঙ্ক তাহার মধ্যে আছে বলিয়া বোধ হয় না। ভালোই হইবে বলিয়া আশা করা যাক্‌।" আমি দেখিলাম যে, আমার কথায় তিনি বিশেষ সান্ত্বনা লাভ করিলেন না, কারণ পুজ্জুর নামই যথেষ্ট। আমি বলিয়া উঠিলাম, "তাহা হইলে একেবারেই সব স্থির হইয়া গিয়াছে?" "হাঁ একেবারেই স্থির; অবিলম্বে, আসন্ন খ্রীষ্টোৎসবের সময় বিবাহ হইবে।" চোখে অশ্রু ও হৃদয়ে অশুভ আশঙ্কা লইয়া তিনি গৃহের ভিতর চলিয়া গেলেন। আমিও প্রায় তাঁহারই ন্যায় বিষণ্ণ হইয়া ষ্টাজ্জু হইতে চলিয়া আসিলাম।

 

১৯৯

 

বাগ্‌দানের পর কয়েক সপ্তাহ কাটিয়া গিয়াছে এবং খ্রীষ্টোৎসবও যখন আগতপ্রায় তখন আমি কয়েকজন বন্ধুর সহিত সাক্ষাৎকারের পর Sassari হইতে ফিরিয়া আসিতেছি, এমন সময় দূরে একটি অশ্ববাহিনীর পদধ্বনি শুনিতে পাইলাম। আমি অনুমান করিলাম যে, উহা ভবিষ্যৎ বধূর গৃহসজ্জাবহনকারী মিছিল, ঐ মিছিল আমাদের দেশে বিবাহের সপ্তাহখানেক পূর্ব্বে হইয়া থাকে-- বাস্তবিকও দেখিলাম তাই। গিরিপথ একেবারে সজীব হইয়া উঠিয়াছে। অনেকগুলি আসবাবপূর্ণ গোশকট চলিয়াছে, বলদগুলি রঙীন ফিতা ও পুষ্পদ্বারা সজ্জিত, তাহাদিগের শৃঙ্গে কমলালেবু বসানো। যাহা হউক, তাহাদের সংখ্যা বিস্তর, কারণ বালিকাটি ধনিগৃহের। কেহ বা একটা জিনিষ বহিতেছে, কেহ বা আর কিছু-- আসবাব, পরিচ্ছদ, ময়দা, তৈল, মদ্য, পনীর, মিষ্টান্ন। তাহাদিগের পশ্চাতে সুন্দরী ক্যাটেরিনা স্বয়ং আসিতেছে; উৎসবসাজে সে সজ্জিতা, তাহার ঘোড়ার মুখ ধরিয়া আসিতেছে তাহারই এক ছোটো ভাই। কী সুন্দরই তাহাকে দেখাইতেছিল! তাহার পশ্চাতে তাহার অনেক সখী, প্রত্যেকেই বধূর জন্য কোনো একটি দ্রব্য বহন করিয়া আসিতেছিল - একখান আয়না, একটি জপমালা, বধূর আরাধ্য সাধুর চিত্র, একটি ক্রুশকাষ্ঠ, খ্রীষ্টমাতার প্রতিমূর্ত্তি, একটি সেতার ইত্যাদি।

 

২০০

 

প্রত্যেক বালিকাই পূর্ণ উৎসবসজ্জায় সজ্জিতা; বাঁশীর উচ্চশব্দে অশ্বগুলি কী গর্ব্বভরেই শিরোৎক্ষেপ করিতেছিল! উহাদিগকে সামলাইয়া রাখিতে যুবকদের যথেষ্ট সতর্কতার প্রয়োজন হইতেছিল, নতুবা বালিকাগণ আসনচ্যুত হইয়া পড়িয়া যাইত। তরুণ Pietro যখন ক্যাটেরিনার পার্শ্বে অশ্বারোহণে যাইতেছিলেন তখন তাঁহাকেও সেদিন কী সুন্দরই দেখাইতেছিল। আমি উহার পূর্ব্বে ও পরে ঐ শ্রেণীর আরো অনেক মিছিল দেখিয়াছি, কিন্তু আর কখনও আমার মনে ঐরূপ অশুভ আশঙ্কার উদয় হয় নাই, আমার হৃৎপিণ্ড যেন স্তব্ধ হইয়া গেল। -- এই পর্য্যন্ত বলিয়া ঐ সাধু পাদ্রি একটি বিষাদসূচক দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন এবং মস্ত এক টিপ নস্য গ্রহণ করিয়া আরাম পাইলেন ও মাছি তাড়াইবার জন্য মাথার উপরে একটি অত্যুজ্জ্বল বর্ণের সূতি রুমাল অনেকবার ঘুরাইয়া তিনি আপনার কৌতূহলজনক কাহিনীর সূত্র পুনর্ব্বার অবলম্বন করিলেন।--

 

২০১

 

যাক্‌, খ্রীষ্টের জন্মোৎসব আসিয়া পড়িল এবং আমি কয়েকজন বন্ধুর মুখে শুনিলাম যে, সাসারির গির্জ্জার প্রাঙ্গণে ঐ পুজ্জু-ভ্রাতৃত্রয়কে গভীরভাবে পরামর্শ করিতে দেখা গিয়াছে এবং ইহা শুভসূচনা করে না। আমি উহা শুনিয়াই অনুভব করিলাম যে,কোনো দুর্ঘটনা ঘটিবে, কারণ ঐ স্থানে উহাদের কিসের প্রয়োজন? এ দিকে খ্রীষ্টোৎসবের দিন পিয়েট্রো ক্যাটেরিনা আমাদের প্রচলিত প্রথা-অনুসারে বন্ধুবান্ধবের সহিত সাক্ষাৎ করিল, যথারীতি ভোজ ও আমোদ-প্রমোদের পর বিশ্রাম করিতে গেল। পরদিন উহাদের বিবাহ হইল, এমন সমারোহ-সহকারে আমাদের পর্ব্বতপ্রদেশে ইহার পূর্ব্বে বিবাহ প্রায় ঘটে নাই। তরুণী বধূ যখন প্রথম বার তাহার নববিবাহিত পতির সহিত এক থালা এবং এক পানপাত্র ব্যবহার করিল তখন তাহার মূর্ত্তি কী মধুর দেখাইতেছিল! অতঃপর তাহারা যে একই ভাগ্য উভয়ে ভোগ করিবে, আমাদের দেশে এই প্রথা তাহারই নিদর্শনস্বরূপ এবং পতিগৃহে আশ্রয়সন্ধানের পূর্ব্বে ইহাই কন্যার পিতৃগৃহে শেষ আহারগ্রহণ। বরের গৃহাভিমুখে মিছিলটি অত্যন্ত প্রমোদময় হইয়াছিল। যথাস্থানে পৌঁছিবামাত্র প্রথা-অনুসারে আনন্দসূচক বন্দুকধ্বনি করা হইল; দ্বারমণ্ডলে পুষ্পমালা ও ফলের গুচ্ছের মধ্যে বরের মা হাতে একটি গমের পাত্র লইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন, তাহাতে লবণ মিশ্রিত-- ঐগুলির প্রথমটি প্রাচুর্য্যের, দ্বিতীয়টি আতিথেয়তার নিদর্শনস্বরূপ।

 

২০২

 

স্ক্যাকাটোস্‌-গৃহিণী সে কী সগৌরব মূর্ত্তিতে দাঁড়াইয়া পুত্রের নববধূর সম্মুখে ঐ পাত্রস্থ দ্রব্যগুলি শূন্যে উৎক্ষিপ্ত করিলেন, কী আবেগের সহিতই তিনি আশীর্ব্বচন উচ্চারণ করিলেন! নৃত্য,ভোজ, এবং পুষ্প-মিষ্টান্ন প্রভৃতি উপহারদান অবশ্য প্রচুর পরিমাণেই হইয়াছিল; কিন্তু বিবাহ-উৎসবদলের অনেকের মনেই পাথরের মতো কী যেন একটা গুরুভার চাপিয়া রহিল। তিন দিন কাটিয়া গিয়াছে, এমন সময় অ্যান্‌ড্রিয়া স্ক্যাকাটোস যিনি ঐ অশুভ বিবাহদিনের পর হইতেই গম্ভীর আলাপবিমুখ এবং হতাশভাব ধারণ করিয়াছিলেন, তিনি হঠাৎ ষ্টাজ্জুতে প্রবেশ করিয়া স্ক্যাকাটোস- জায়াকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, "পত্নী, অনুনয় করিয়া বলিতেছি তুমি আমার সঙ্গে এসো।"

 

২০৩

 

রমণী আমাকে পরে বলিয়াছেন যে, তাঁহার সমস্ত শিরার ভিতর দিয়া যেন একটা হিমকম্পন প্রবাহিত হইয়া গেল এবং যন্ত্রের ন্যায় স্বামীর পদক্ষেপ অনুসরণ করিয়া উঠান  পার হইয়া একটি বন্ধুর পার্ব্বত্য পথ অতিক্রম করিয়া কর্ক্‌ ও চেষ্টনাট বৃক্ষের একটি ক্ষুদ্র বনে গিয়া তিনি উপস্থিত হইলেন। সেখানে তিনি থামিলেন এবং ভূমিতলের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বিশেষ এক স্থান হইতে কতকগুলি মৃত্তিকার চাপ সরাইয়া দিতে সাহায্য করিবার জন্য তাঁহার পত্নীকে বলিলেন। তিনি তাহাই করিলেন এবং উভয়ে একত্র হইয়া বৃহৎ মাটির কলস তুলিলেন। অ্যান্‌ড্রিয়া বলিলেন, "এই কলসে ৪০০০ হাজার scudiস্বর্ণমুদ্রা আছে, উহা সারাজীবন নিরবিচ্ছিন্ন পরিশ্রমের সঞ্চয়। আমি প্রয়োজনের দিনের জন্য ইহা সযত্নে রক্ষা করিয়াছি, কে যেন আমাকে বলিতেছে যে সেই সময় উপস্থিত। যে-কোনো একটা বহিরুৎপাতে হয়তো আমার প্রাণ যাইতেও পারে, এবং এই সম্বল-সম্বন্ধে তুমি অজ্ঞ থাকো ইহা আমার ইচ্ছা নহে।" এই বলিয়া তিনি সেই কলস যত্নপূর্ব্বক পুনর্ব্বার যথাস্থানে রাখিয়া দিলেন, তাহা পুনর্ব্বার মাটির চাপড়া দিয়া আচ্ছাদিত করিলেন এবং ধীরে ধীরে গম্ভীরমুখে আপনার গৃহে ফিরিয়া আসিলেন।

 

২০৪

 

--এই স্থানে বেচারি পুরোহিত হৃদয়াবেগের প্রবলতায় অভিভূত হইয়া কিছুক্ষণ নীরব হইয়া রহিলেন।  --মহাশয়গণ (Signori), ইহা অতি ভয়ানক কাহিনী, অতি ভয়ানক! যাহা হউক, আমাকে আবার বলিতে হইবে। আমার এই সদ্যোবর্ণিত ঘটনাবলির পরদিনেরই সন্ধ্যাকালে অ্যান্‌ড্রিয়া স্ক্যাকাটোস এবং তাঁহার পরিবারবর্গ একত্র কাঠের আগুনের সম্মুখে বসিয়া ছিলেন, তাঁহাদের পরিবারটি বড়ো সুন্দর, অতি সুন্দর। তরুণ পিয়েট্রো ও তাহার বধূ এবং তিনটি ছোটে ভ্রাতা, তাহাদের মধ্যে একজন একান্তই শিশু। এই কাহিনী বলিতে আমার হৃদয় বিক্ষত হইয়া উঠিতেছে। স্ক্যাকাটোস-গৃহিণী সান্ধ্যভোজের অবশেষ তুলিয়া রাখিতে ভিতরের ঘরে প্রবেশ করিয়াছেন-- এমন সময় কুকুরের প্রচণ্ড চীৎকার, যেন অশ্বারোহীদলের পদধ্বনি এবং রুদ্ধদ্বারে প্রবল আঘাতের শব্দ শোনা গেল। একটা আকস্মিক বেদনা যেন রমণীর হৃদয় ভেদ করিল, তিনি অনুভব করিলেন, সময় আসিতেছে এবং আপনার সর্ব্বকনিষ্ঠ এবং সম্ভবত প্রিয়তম পুত্রটিকে কোলে তুলিয়া লইয়া তিনি তাহাকে একটি শূন্য মদের পিপার মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, যদি সে বাঁচিতে চায় তবে যেন চুপ করিয়া থাকে।

 

২০৫

 

এ দিকে অ্যান্‌ড্রিয়া দৃঢ়স্বরে প্রশ্ন করিলেন, "বাহিরে কে?" "আমরা মিত্র" এই বিশ্বাসঘাতী উত্তর আসিল। তাঁহার পত্নী তাঁহার পার্শ্বে প্রত্যাগত হইয়া অনুনয় করিয়া বলিলেন, "স্বামিন্‌, আমি তোমাকে মিনতি করিয়া বলিতেছি তুমি দ্বার খুলিও না, উহা পুজ্জুর কণ্ঠস্বর।" "গৃহিণী আতিথেয়তার প্রয়োজনে ইহা করিতে হইবে, ইহা ধর্ম্মকার্য্য।" আবার দ্বারে আঘাত হইল, এবার প্রথম বারের অপেক্ষাও প্রবলতর শব্দে-- "রাজার দোহাই, অ্যান্‌ড্রিয়া স্ক্যাকাটোস, তোমার দরজা খোলো, শীঘ্র খোলো।" দরজা খোলা হইল এবং অ্যান্‌ড্রিয়া স্ক্যাকাটোস জিওভ্যানি পুজ্জুর নিজ হস্তের গুলিতে হত হইয়া আপনার বীর্য্যবতী পত্নীর পার্শ্বে পড়িয়া গেলেন। তিনি ঐ ভয়ানক ব্যাপার সম্পূর্ণ সংঘটিত হইতে দেখিয়া, ঐ সশস্ত্র হত্যাকারীদলের ভিতর দিয়া যুঝিতে যুঝিতে, কয়েকটি ভীষণ আঘাত লাভ করা সত্ত্বেও বাহির হইয়া পলায়ন করিলেন। Giovanni Puzzu -কে সম্বোধন করিয়া একটি তরুণ কণ্ঠ কাতরভাবে বলিয়া উঠিল, "ধর্ম্মপিতা-- দেবতার দোহাই, ভগবানের সহিত শান্তি স্থাপনের জন্য আমাকে একমুহূর্ত্ত জীবন ভিক্ষা দাও।" কিন্তু আবেদন বৃথাই হইল, বন্দুকের গুলি ছুটিল এবং যে গুলি তরুণ পিয়েট্রোর মস্তিষ্ক চতুর্দ্দিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দিল তাহাই তাহার সুশীলা বধূর বক্ষ ভেদ করিয়া গেল এবং এক একটি করিয়া তিনটি পুত্র ও একটি পুত্রবধূ ছিন্নভিন্ন মৃতদেহস্তূপে একত্র শায়িত হইল।

 

২০৬

 

উন্মুক্ত কফিনের ভিতর হতব্যক্তিগণের দেহ রক্ষিত হইল, প্রত্যেকেরই বক্ষঃস্থলে এক একটি ক্রুশ। ভাড়া করা বিলাপকারিণীর দল আসিয়া পৌঁছিল-- আপনারা জানেন যে, উহা অতি প্রাচীন প্রথা, অন্য দেশে বোধ করি উহা বহুকাল হইল আর পালিত হয় না-- যাহা হউক, তাহারা অসংযত অঙ্গভঙ্গী-সহকারে, আলুলায়িতকেশে ভয়াবহ চীৎকার করিতে করিতে আসিয়া উপস্থিত হইল এবং অনতিবিলম্বে তাহাদের দলের নেত্রী হত স্ক্যাকাটোসের দেহের ঊর্দ্ধে বাহু বিস্তার করিয়া দাঁড়াইল এবং গম্ভীর অপার্থিব কণ্ঠে কথাগুলি বলিতে লাগিল, "চাহিয়া দেখো, বলশালী ব্যক্তি আজ ধূলায় লুণ্ঠিত, সাধু ব্যক্তি আজ দস্যুহস্তে ভূপতিত। হায়, হায়, হায়! তাঁহার জীবন উর্ব্বরা গোচারণভূমির মধ্য দিয়া প্রবাহিত নদীর ন্যায় ছিল, উহা চারি দিকে উর্ব্বরতা দান করিত। হায়, হায়, হায়! তাঁহার জীবনের দিনগুলি কী শান্তিপূর্ণ ও অক্ষুব্ধ ছিল, উহা চতুর্দ্দিকে আশিস বর্ষণ করিত। হায়, হায়, হায়! কারণ, তিনি সিংহের ন্যায় বীর্য্যবান ও সাহসী অথচ কপোতের ন্যায় মৃদুস্বভাব ছিলেন। হায়, হায়, হায়! কারণ তাঁহার আত্মা অগ্নিশিখার ন্যায় নির্ম্মল এবং তাঁহার বাক্য মধুর ন্যায় মিষ্ট ছিল। হায়, হায়, হায়!"

 

২০৭

 

"কিন্তু তোমার ঋণ পরিশোধ হইবে, তোমার ক্ষতস্থান ঐ শত্রুর বক্ষেই প্রত্যাবর্ত্তিত হইবে। হায়, হায়, হায়! পার্ব্বত্য গৃধিনী তাহার দেহ ভোগ করিবে এবং দাঁড়কাক তাহার চক্ষু উৎপাটিত করিয়া ফেলিবে। হায়, হায় হায়! তোমার রক্তাক্ত অঙ্গাবরণ তোমার প্রতিশোধকারীদিগের হস্তে অবতীর্ণ হইবে, রোষের বিগ্রহস্বরূপে তাহা বংশানুক্রমে রক্ষিত হইতে থাকিবে। হায়, হায়, হায়! অতএব তুমি তোমার নির্জ্জন সমাধিতে বিশ্রাম লাভ করো, কারণ তোমার হত্যার প্রতিশোধ লইতে বিলম্ব হইবে না। হায়, হায়, হায়! হাঁ, এইরূপই ঘটিবে, তোমার হইয়া পূরা প্রতিশোধ দেওয়া হইবে।" এই বলিয়া রমণী তাহার উগ্রবাক্‌ প্রবন্ধ সমাপ্ত করিল এবং শেষের দিকে তাহার চীৎকার উচ্চতর ও দীর্ঘতর হইয়া উঠিয়া নাড়ীতে নাড়ীতে যেন স্পন্দন জাগাইয়া তুলিল। তখন স্ক্যাকাটোস-গৃহিণী এক হস্তে হত স্বামীর রক্তাক্ত অঙ্গাবরণ লইয়া এবং অন্য হস্তে যে শিশুকে তিনি মদের পিপার ভিতর লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন সেই নয় বৎসর বয়স্ক ক্ষুদ্র Michele -এর হস্ত ধারণ করিয়া আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

 

২০৮

 

একবার সেই মৃতদেহের নিশ্চল বিবর্ণ মূর্ত্তির দিকে এবং একবার সেই রক্তরঞ্জিত স্মৃতিচিহ্নের দিকে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া এবং ঐ শিশুর ক্লিষ্ট মুখের দিকে স্থির-দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন, "শপথ করো, মিকেল, শপথ করো যে, তুমি এই গর্হিত কার্য্যের প্রতিশোধ লইবে; স্বর্গবাসী সকল সাধুপুরুষের দোহাই যে, যত দিন না দস্যুর নিপাত হয় তত দিন তুমি কোনো আমোদ করিবে না এবং তোমার আত্মা কোনো শান্তি পাইবে না; আমি তোমাকে আজ্ঞা করিতেছি, শপথ করো, এবং ঐ শপথ তোমার বয়োবৃদ্ধির সহিত বর্দ্ধিত হউক, যত দিন পর্য্যন্ত ঐ ন্যায়ানুমোদিত প্রতিশোধ গ্রহণ করিবার মতো তোমার বাহু বলিষ্ঠ এবং চক্ষু স্থিরলক্ষ্য না হয়।" ঐ বালক খাড়া হইয়া দাঁড়াইয়া বলিল, "হে আমার পিতা, আমি তোমার মৃত্যুর প্রতিশোধ লইব বলিয়া প্রতিজ্ঞা করিতেছি, সাধুপুরুষগণ আমার সহায় হউন!" এবং ঐ ভীষণ বাক্য উচ্চারণকালে তাহার বিশাল নয়নদ্বয় বিস্ফারিত এবং তাহার আরক্ত ক্ষুদ্র অধরৌষ্ঠ দৃঢ় ও পাণ্ডুবর্ণ হইয়া উঠিল। তাহার শিশুমুখ হইতে যখন এক একটি করিয়া ঐ ভয়ানক কথা বাহির হইতে শুনিলাম তখন ভিতরে ভিতরে লোমহর্ষণ অনুভব করিলাম।

 

২০৯

 

মহাশয়গণ, আমার আর অল্পই বলিবার আছে, অতি অল্প। যদিও স্বদেশের প্রথা অনুসরণ করিয়া স্ক্যাকাটোস-গৃহিণী প্রতিবৎসর ঐ ভয়ানক দিনে তাঁহার পুত্রকে ঐ ভীষণ প্রতিজ্ঞার পুনরুচ্চারণ করাইতেন, তথাপি তিনি প্রতিশোধের আঘাত হানিবার জন্য উহার তরুণ বাহুর বললাভ ও দৃষ্টির অচপলতা-লাভের অপেক্ষা করেন নাই। তাঁহার আপনার হস্তেই প্রতিশোধের উপায় ছিল এবং তিনি অতি প্রবলরূপেই তাহা প্রয়োগ করিয়াছিলেন। তিনি গভর্ণমেন্টের নিকটে বিচারপ্রার্থী হইলেন এবং আবেদন করিয়া এমন সফলতা লাভ করিলেন যে, ঐ ঘৃণ্য দুরাত্মা জিওভ্যানি পুজ্জু সাসারিতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইল, লিয়োনার্ডো ও পিয়েট্রো Madalena-নামক ক্ষুদ্র দ্বীপে নির্ব্বাসিত হইল এবং ঐ পরিবারস্থ আরও পাঁচটি ব্যক্তি প্রাণদণ্ডের ভয়ে পর্ব্বতে পলায়ন করিল-- এই অ্যান্‌ড্রিয়া তাহাদেরই মধ্যে একজন। মহাশয়গণ, ইহার পরে আর আমার অল্পই বলিবার আছে। যাহাদের নামই ভীতিজনক ছিল এবং যাহাদের ক্ষমতা কোনোই সীমা গ্রাহ্য করিত না, এমন দুরাত্মাদিগকে সকল প্রকার বিপদাশঙ্কা স্বীকার করিয়াও সমুচিত দণ্ডিত করাইবার পরে, স্বীয় দেশবাসীর কৃতজ্ঞতা লাভ করিয়া অ্যান্‌ড্রিয়া স্ক্যাকাটোসের বিধবা পত্নী এখন ঝনলসভড়-এর এক সন্ন্যাসিনীমঠে প্রবেশ করিয়াছেন।

 

২১০

 

ইহা লক্ষ্য করিবার যোগ্য, যেসকল যুগে পরাক্রম-বিস্তারকেই ন্যাশনাল অত্যাকাঙক্ষার প্রধান সহায়রূপে আহ্বান করা হইয়াছে সেই যুগগুলিই মানবের শ্রেষ্ঠ বা উচ্চতম ফললাভের জন্য খ্যাত নহে। Caesar-এর রাজ্যকালে দেশজয় ও আধিপত্য-বিস্তারের পথে রোম যখন নির্ম্মমভাবে যাত্রা করিয়াছিল তখন বহুবিস্তৃত অধীন দেশসমূহে তাহার অস্ত্রচালনার সফলতায় মোহ প্রসার করিয়াছিল বটে, কিন্তু তাহার পূর্ব্বকালেই রোম আপন বুদ্ধিবিকাশের পরাকাষ্ঠায় উঠিয়াছিল। এসিয়াতে আপন আধিপত্য-বিস্তারের পূর্ব্বে ঈজিপ্ট্‌ তাহার কলা ও সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাসকল প্রকাশ করিয়াছিল এবং যে এসীরিয়া প্রাচীনকালে সামরিক শক্তিতে সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ছিল আত্মোৎকর্ষশক্তি তাহার ছিল না। এ কথা নিশ্চয়ই বলা যায় না যে, বুদ্ধি সাফল্যলাভ-সম্বন্ধে ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দের পরের জর্ম্মানি তাহার পূর্ব্ববর্তী জর্ম্মানির অপেক্ষা মহত্তর।

 

২১১

 

বিষাদের সহিত এই তথ্যটি সম্বন্ধে মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন যে, ১৮৭০ সালে জর্ম্মান-উপরাজ্যগুলির সম্মিলনের পর হইতেই জর্ম্মানিতে উদার-মতের হ্রাস আরম্ভ হয়। ব্রাণ্ডেস্‌ বলেন, "বর্ত্তমান প্রজাতির বৃদ্ধ মানুষেরাই মনোভাবে তরুণ, অপর পক্ষে যুবকদের অনেকেই প্রতিমুখ মতগুলির সহিত আপনাদিগকে সংশ্লিষ্ট করিয়াছে।" শতাব্দীর বিগত চতুর্থাংশ সময়ে জর্ম্মানির আর্থিক সমৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির পরিণতি সাহিত্যে দর্শনে এমন কি পাণ্ডিত্যেও তেমন প্রখ্যাতনামা ব্যক্তিদিগকে জন্ম দেয় নাই, যেমন ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দের পূর্ব্বে ঘটিয়াছিল। Kant এর সময়েই জর্ম্মানিতে দর্শনের মহাযুগ আরম্ভ হয়, কিন্তু তিনি এমন সময়ে জন্মিয়াছিলেন যখন জর্ম্মানিকে বিস্তীর্ণতর করিবার চিন্তাও কোথাও ছিল না। Goethe এবং Schiller এমন সময় বিরাজমান ছিলেন যখন জর্ম্মন জনসমূহ নেপোলিয়নীয় আধিপত্যের ছায়াতলে বাস করিত, এবং যখন লোকেরা স্বাধীনতালাভের জন্য প্রয়াস পাইতেছে সেই সময়ে স্বাধীনতার কবি Heine তাঁহার অমর গানগুলি গাহিয়াছেন।

 

২১২

 

পূর্ব্বে আমি এক আকাশচারী বিদ্যাধর ছিলাম। এক সময়ে আমি হিমালয়ের একটি শিখরের উপর দিয়া যাইতেছিলাম। নীচে মহাদেব তখন গৌরীর সহিত ক্রীড়া করিতেছিলেন; তাঁহাকে উল্লঙ্ঘন করিয়া যাওয়ায়, তিনি ক্রুদ্ধ হইয়া শাপ প্রদান করিলেন, "তুমি মনুষ্যগর্ভে নিপতিত হও। সেখানে এক বিদ্যাধরী স্ত্রী লাভ করিয়া ও পুত্রকে তোমার পদে স্থাপিত করিয়া তুমি নিজের পূর্ব্বজন্ম স্মরণ করিবে এবং পুনর্ব্বার বিদ্যাধররূপে জন্মলাভ করিবে।" শিব আমার শাপাবসানকাল জানাইয়া দিয়া তিরোহিত হইলে, আমি অচিরেই ভূতলে এক বনিগ্‌বংশে জন্ম লইলাম। আমি বল্লভী-নামক নগরে এক ধনশালী বণিকের পুত্র হইয়া বাড়িয়া উঠিলাম,আমার নাম ছিল বাসুদত্ত।

 

২১৩

 

কালক্রমে আমি যৌবনপ্রাপ্ত হইলে, পিতা আমার জন্য একদল পরিচর নিযুক্ত করিলেন, এবং আমি তাঁহার আদেশে বাণিজ্যের জন্য দেশান্তরে গমন করিলাম। আমি যখন যাইতেছিলাম তখন একজন দস্যু এক অরণ্যে আমাকে আক্রমণ করিল। এবং আমার সর্ব্বস্ব লইয়া আমাকে শৃঙ্খলে বাঁধিয়া নিজেদের পল্লীতে, পশুপ্রাণগ্রাসোদ্যত কৃতান্তের জিহ্বার ন্যায় দীর্ঘ ও চঞ্চল রক্তবর্ণ পতাকান্বিত এক ভীষণ চণ্ডীমন্দিরে লইয়া গেল। তাহারা সেখানে আমাকে বলির জন্য তাহাদের দেবীপূজারত প্রভু পুলিন্দকের নিকট উপস্থিত করিল। চণ্ডাল হইলেও, আমাকে দেখিবামাত্রই তাঁহার হৃদয় করুণাবিগলিত হইল; হৃদয়ের অহৈতুক স্নেহচাঞ্চল্য পূর্ব্বজন্মের সখ্যের নিদর্শন।

 

২১৪

 

অনন্তর সেই শবরপতি হত্যা হইতে আমাকে বাঁচাইয়া যখন নিজেকেই বলি দিয়া পূজা সমাপ্ত করিতে উদ্যত হইলেন, তখন এক দৈববাণী তাঁহাকে বলিলেন, "এরূপ করিও না, আমি তোমার প্রতি প্রসন্না হইয়াছি, আমার নিকট বর প্রার্থনা করো।" তিনি ইহাতে আনন্দিত হইয়া বলিলেন, "দেবি, আপনি প্রসন্না হইয়াছেন; ইহা ছাড়া অন্য কোন্‌ বরে আমার প্রয়োজন থাকিতে পারে? তথাপি আমি ইহাই প্রার্থনা করিতেছি যে, জন্মান্তরেও যেন এই বণিকের সহিত আমার বন্ধুত্ব হয়।" "তথাস্তু" এই বলিয়া দৈববাণী নীরব হইলে, সেই শবর আমাকে প্রভূত অর্থ দিয়া স্বভবনে পাঠাইয়া দিলেন।

 

২১৫

 

হিমবান্‌ নামে এক মহাপর্ব্বত আছে-- ইহা জগজ্জননীর পিতা এবং কেবল গিরিরাজ নহে, শিবেরও গুরু বটে। বিদ্যাধরগণের আবাসভূত সেই মহাপর্ব্বতে বিদ্যাধরাধিপতি রাজা জীমূতকেতু বাস করিতেন। তাঁহার গৃহে পূর্ব্বপুরুষক্রমাগত সার্থকনামা কল্পবৃক্ষ ছিল। এক দিন রাজা জীমূতকেতু তাঁহার উদ্যানে সেই দেবতাত্মক কল্পদ্রুমের নিকম উপস্থিত হইয়া প্রার্থনা করিলেন, "হে দেব, আমরা আপনার নিকট সর্ব্বদা সমস্ত দ্রব্যই পাইয়া থাকি; আমি পুত্রহীন, অতএব, আমাকে একটি বিজয়ী পুত্র প্রদান করুন!" কল্পদ্রুম বলিলেন, "রাজন্‌, আপনার এক জাতিস্মর দানবীর ও সর্ব্বভূতে দয়াবান্‌ পুত্র উৎপন্ন হইবে!" ইহা শ্রবণে রাজা আনন্দিত হইয়া কল্পবৃক্ষকে প্রণামপূর্ব্বক গমন করিলেন এবং রাণীকে এই সংবাদ জানাইয়া তাঁহার আনন্দ উৎপাদন করিলেন।

 

২১৬

 

তদনুসারে অচিরেই তাঁহার এক পুত্র উৎপন্ন হইল এবং পিতা সেই পুত্রের নাম রাখিলেন জীমূতবাহন। অনন্তর মহাসত্ত্ব জীমূতবাহন সর্ব্বভূতের প্রতি তাঁহার স্বাভাবিক অনুকম্পার সহিত বৃদ্ধি পাইতে লাগিলেন। কালক্রমে যৌবরাজ্য প্রাপ্ত হইলে তিনি একদিন জগতের প্রতি অনুকম্পাবশত নির্জ্জনে পিতাকে নিবেদন করিলেন, "তাত, আমি জানি এই সংসারে সমস্ত পদার্থই ক্ষণভঙ্গুর; কিন্তু একমাত্র মহাপুরুষগণের নির্ম্মল যশই কল্পান্ত পর্য্যন্ত টিঁকিয়া থাকে। যদি পরোপকারজনিত যশ লাভ করিতে পারা যায়, তাহা হইলে উদার ব্যক্তিগণের নিকটে তাহার মতো কোন্‌ ধন প্রাণাপেক্ষাও অধিক মূল্যবান পরিগণিত হইতে পারে?"

 

২১৭

 

"যে সম্পদে পরের উপকার করিতে পারা যায় না তাহা তো বিদ্যুতের ন্যায় কেবল ক্ষণকালের জন্য লোকচক্ষুর কষ্টই উৎপাদন করিয়া বিলীন হইয়া যায়। অতএব এই যে আমাদের অধিকারে অভিলষিত বস্তুপ্রদ কল্পবৃক্ষ রহিয়াছেন, ইঁহাকে যদি পরোপকারে লাগাইতে পারা যায় তাহা হইলে ইঁহার নিকটে সমস্ত ফল পাওয়া যাইবে। অতএব আমি সেইরূপ উপায় গ্রহণ করিতে চাহি, যাহাতে ইঁহার ধন-দ্বারা প্রার্থী জনসমূহ দারিদ্র্য হইতে মুক্ত হয়।" জীমূতবাহন পিতাকে এই আবেদন জানাইয়া ও তাঁহার অনুজ্ঞা লাভ করিয়া কল্পদ্রুমের নিকটে গমনপূর্ব্বক বলিলেন, "হে দেব, আপনি সর্ব্বদা আমাদিগকে অভীষ্ট ফল দান করিয়া থাকেন। অতএব আজ আপনি আমাদের একটি অভিলাষ পূর্ণ করুন। হে বন্ধু, আপনি এই সমগ্র পৃথিবীর দৈন্য উপশম করুন! আপনার জয় হউক, আপনি ধনার্থী জগতেরই জন্য প্রদত্ত হইয়াছে।" সেই ত্যাগশীল-কর্ত্তৃক এইরূপে উক্ত হইয়া কল্পদ্রুম ভূতলে প্রচুর স্বর্ণবর্ষণ করিলেন এবং লোকেরা তাহাতে আনন্দিত হইয়া উঠিল।

 

২১৮

 

পূর্ব্বকালে কাল নামে এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি পুষ্করতীর্থে গমন করিয়া সেখানে দিবারাত্রি মন্ত্র জপ করিতেছিলেন। তাঁহার জপ করিতে করিতে দেবগণের দুই অযুত বৎসর চলিয়া গেল। তখন তাঁহার মস্তক হইতে অবিচ্ছিন্ন এক মহৎ জ্যোতি আবির্‌ভূত হইল এবং ইহা দশ সহস্র সূর্য্যের ন্যায় অন্তরীক্ষে উৎসারিত হইয়া সিদ্ধ প্রভৃতির গতিকে রুদ্ধ ও ত্রিভুবনকে প্রজ্জ্বলিত করিল। তখন ব্রহ্মা, ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা আগমন করিয়া কহিলেন, "হে ব্রাহ্মণ, আপনার জ্যোতিতে এই সমস্ত ভুবন দগ্ধ হইতেছে। আপনার যে বর অভিলষিত হয় গ্রহণ করুন।" তিনি তাঁহাদিগকে উত্তর দিলেন, "জপ ভিন্ন অন্যত্র যেন আমার অনুরাগ না হয় ইহাই আমার বর, আমি অন্য কিছু চাহি না।"

 

২১৯

 

যখন তাঁহারা তাঁহাকে সনির্বন্ধ অনুনয় করিতে লাগিলেন, তখন সেই জপকারী সেস্থান হইতে দূরে গমন করিয়া হিমালয়ের উত্তর পার্শ্বে থাকিয়া জপ করিতে লাগিলেন। সেখানেও যখন ক্রমশ তাঁহার অসামান্য তেজ অসহ্য হইয়া উঠিল তখন ইন্দ্র তাঁহাকে বিক্ষুব্ধ করিবার জন্য প্রলোভন প্রেরণ করিলেন। কিন্তু সেই আত্মসংযমী অবিচলিত রহিলেন। অনন্তর তাঁহার নিকটে মৃত্যুকে দূতরূপে প্রেরণ করিলেন। তিনি তাঁহার নিকটে আসিয়া বলিলেন, "হে ব্রাহ্মণ, মর্ত্ত্যেরা এত দীর্ঘকাল বাঁচে না, অতএব আপনি নিজের জীবন পরিত্যাগ করুন; প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করিবেন না।" ইহা শুনিয়া সেই ব্রাহ্মণ বলিলেন, "যদি আমার আয়ুর সীমা পূর্ণ হইয়া থাকে, তাহা হইলে তুমি আমাকে লইয়া যাইতেছ না কেন? তুমি কিসের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছ? হে দেব পাশহস্ত, আমি স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া নিজের প্রাণ ত্যাগ করিব না, কেননা ইচ্ছা করিয়া দেহত্যাগ করিলে আমাকে আত্মঘাতী হইতে হইবে।"

 

২২০

 

এইরূপ বলিলে, তাঁহার প্রভাববশতঃ মৃত্যু যখন তাঁহাকে লইয়া যাইতে পারিলেন না, তখন যেমন তিনি আসিয়াছিলেন তেমনিই চলিয়া গেলেন। অনন্তর ইন্দ্র তাঁহাকে বলপূর্ব্বক স্বর্গে লইয়া গেলেন, সেখানে তিনি সেখানকার প্রমোদসম্ভোগে বিমুখ হইয়া জপ হইতে বিরত হইলেন না। তাই দেবতারা তাঁহাকে পুনশ্চ ভূলোকে নামাইয়া দিলেন এবং তিনিও হিমালয় প্রত্যাগমন করিলেন। সেখানে যখন দেবতারা সকলেই তাঁহাকে বরগ্রহণে সম্মত করিবার চেষ্টা করিতেছিলেন তখন সেই পথে রাজা ইক্ষাকু আসিয়া উপস্থিত হইলেন। যখন তিনি সমস্ত বিষয় অবগত হইলেন, তখন তিনি ঐ জপকারীকে বলিলেন, "আপনি যদি দেবগণের নিকট বর গ্রহণ না করেন তাহা হইলে আমার নিকট হইতে গ্রহণ করুন।"

 

২২১

 

জপকারী ইহা শ্রবণে হাস্য করিয়া রাজাকে বলিলেন, "আমি দেবগণের নিকট যখন বর গ্রহণ করিতেছি না, তখন আপনি বরদান করিতে পারেন!" তিনি এই কথা বলিলে ইক্ষাকু ব্রাহ্মণকে বলিলেন, "আমি যদি আপনাকে বর প্রদান করিতে সমর্থ না হই,  আপনি আমাকে দিতে পারেন। অতএব আমাকে একটি বর দান করুন।" জপকারী বলিলেন, "আপনার যাহা অভীষ্ট হয় প্রার্থনা করুন, আমি আপনাকে তাহা দিব।" রাজা ইহা শুনিয়া মনে মনে বিচার করিলেন, "আমি দান করিব এবং তিনি গ্রহণ করিবেন এই বিহিত বিধান; কিন্তু তিনি দান করিবেন আর আমি গ্রহণ করিব ইহা বিপরীত বিধি।" রাজা যখন এই সঙ্কটসম্বন্ধে চিন্তা করিয়া বিলম্ব করিতেছিলেন তখন দুইটি ব্রাহ্মণ বিবাদ করিতে করিতে সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন এবং রাজাকে দেখিয়া বিচারের জন্য তাঁহার নিকট প্রার্থনা করিলেন। প্রথম ব্যক্তি বলিলেন, "এই ব্রাহ্মণ আমাকে দক্ষিণার সহিত একটি গাভী প্রদান করিয়াছেন। আমি ইঁহাকে তাহা প্রত্যর্পণ করিতেছি, কিন্তু ইনি আমার হাত হইতে তাহা কেন গ্রহণ করিবেন না?" অপর ব্যক্তি বলিলেন, "আমি ইহা প্রথমে গ্রহণ করি নাই, আর ইহা প্রার্থনাও করি নাই, তবে ইনি কেন ইহা আমাকে বলপূর্ব্বক গ্রহণ করাইতে ইচ্ছা করিতেছেন?"

 

২২২

 

রাজা ইহা শুনিয়া বলিলেন, "এই অভিযোগকারীর অভিযোগ ঠিক নেহ। আপনি গাভী গ্রহণ করিবার পর যিনি ইহা দিয়াছেন তাঁহাকেই আবার বলপূর্ব্বক ফিরাইয়া দিতেছেন কেন?" রাজা ইহা বলিলে ইন্দ্র অবসর পাইয়া তাঁহাকে বলিলেন, "হে রাজন্‌, আপনি যদি ইহাই ন্যায্য বলিয়া জানেন, তবে ঐ জপকারী ব্রাহ্মণের নিকট প্রার্থনা করিয়া তৎপরে প্রাপ্ত বরটি তাঁহার নিকট হইতে গ্রহণ করিতেছেন না কেন?" রাজা ইহার উত্তর ভাবিয়া না পাইয়া সেই জপকারী ব্রাহ্মণকে বলিলেন, "ভগবন্‌, আপনার জপের অর্দ্ধেক অংশের ফল বররূপে আমাকে প্রদান করুন।" অনন্তর সেই জপকারী ব্রাহ্মণ বলিলেন, "ভালো, আমার জপের অর্দ্ধেক ফল তুমি গ্রহণ করো।" এই বলিয়া তিনি রাজাকে বর প্রদান করিলেন। রাজা এই বরের দ্বারা সর্ব্বলোকেই নিজের গতি লাভ করিলেন এবং সেই জপকারীও শিবলোক প্রাপ্ত হইলেন।

 

২২৩

 

আর এক প্রকারে পৃথিবীর ধ্বংস ঘটিতে পারে। একটি প্রকাণ্ড উল্কাপ্রস্তর কোনও একদিন আকাশ হইতে পড়িতে পারে। বস্তুত প্রস্তরখণ্ড আকাশ হইতে পৃথিবীতে পড়িতেছেই। এইরূপ নানা আয়তনের প্রস্তর মিউজিয়ামে দেখা যায়, তাহাদের কোনো-কোনোটা ওজনে বহুশত পাউণ্ড ভারী। এমন হইতে পারে কোনও এক সময়ে বহুশত মাইল আয়তনের পাথর পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হইবে। সমুদ্রের মধ্যে পড়িয়া সমস্ত মহাদেশগুলিকে ডুবাইয়া দিবার উপযুক্ত তরঙ্গের সৃষ্টি করিবার জন্য এতবড়ো প্রকাণ্ড শিলাখণ্ডের প্রয়োজন হয় না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন-সকল শক্তি আছে, যাহার সহিত তুলনা করিলে মানবের মধ্যে যে প্রবলতম তাহারও শক্তি একটি মশকের লীলার মতো; সে এমন শক্তি যাহার আঘাতে, বাতাসের এক দমকায়  একপাল মশার মতো, সমস্ত মানুষকে পৃথিবী হইতে উড়াইয়া দিতে পারে।

 

২২৪

 

জীবনসংগ্রামে গত কল্য যেমন যোগ্যতমরাই টিঁকিয়াছিল, আগামী কল্যও ঠিক সেইরূপই ঘটিবে; কিন্তু অতীত কালে স্বার্থরক্ষাই যেমন যোগ্যতার পরিমাপক ছিল, ভবিষ্যতে সেইরূপ প্রেমের বিস্তৃতি ও গভীরতা-দ্বারাই উদ্বর্ত্তনের মূল্যনির্দ্ধারণ হইবে। বর্ত্তমান বিজ্ঞানে এই যে শিক্ষা দিতেছে যে, কোনো মনুষ্যই একাকী কেবল আপনাকে লইয়া বাঁচিয়া থাকিতে পারে না, ইতঃপূর্ব্বে এমন করিয়া শিক্ষা আর কখনও দেওয়া হয় নাই। মনুষ্যকে যখন জঙ্গল ও প্রান্তরের বন্যপশুদের সঙ্গে লড়াই করিয়া চলিতে হইত তখন প্রাণরক্ষার জন্য ব্যক্তিদের মধ্যে এবং তাহার পরে পরিবারগণের মধ্যে পরস্পর-সহকারিতা উহাদের পক্ষে একান্ত আবশ্যক ছিল। এক্ষণে পৃথিবীতে মানবজাতির অনবিচ্ছিন্ন জীবন-ধারণের জন্য ভিন্ন ভিন্ন গোত্র ও Nation-এর পরস্পরের মধ্যে আরও অনেক অধিক সহকারিতার প্রয়োজন হইয়াছে। এক্ষণে এবং চিরকালই যেসকল ব্যক্তি বা জনসংঘ ক্রমবিকাশের অনুসারে মহা পুরোযাত্রার সময়ে না চলিবে তাহাদের ভাগ্যে বিনাশ রহিয়াছে।