Home > Plays > চিরকুমার-সভা > চিরকুমার সভা
Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | SINGLE PAGE

চিরকুমার সভা    

দ্বিতীয় অঙ্ক


প্রথম দৃশ্য


চন্দ্রবাবুর বাড়ি। চিরকুমার-সভার ঘর

 

শ্রীশ ও বিপিন

 

শ্রীশ।

তা, যাই বল, অক্ষয়বাবু যখন আমাদের সভায় ছিলেন তখন আমাদের চিরকুমার-সভা জমেছিল ভালো। আমাদের সভাপতি চন্দ্রবাবু কিছু কড়া।

 

বিপিন।

তিনি থাকতে রস কিছু বেশি জমে উঠেছিল-- চিরকৌমার্যব্রতের পক্ষে রসাধিক্যটা ভালো নয়, আমার তো এই মত।

 

শ্রীশ।

আমার মত ঠিক উল্টো। আমাদের ব্রত কঠিন বলেই রসের দরকার বেশি। রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলাতে গেলে কি জলসিঞ্চনের প্রয়োজন হয় না। চিরজীবন বিবাহ করব না এই প্রতিজ্ঞাই যথেষ্ট, তাই বলেই কি সব দিক থেকেই শুকিয়ে মরতে হবে।

 

বিপিন।

যাই বল, হঠাৎ কুমার-সভা ছেড়ে দিয়ে বিবাহ করে অক্ষয়বাবু আমাদের সভাটাকে যেন আল্‌গা করে দিয়ে গেছেন। ভিতরে ভিতরে আমাদের সকলেরই প্রতিজ্ঞার জোর কমে গেছে।

 

শ্রীশ।

কিছুমাত্র না। আমার নিজের কথা বলতে পারি, আমার প্রতিজ্ঞার বল আরো বেড়েছে। যে ব্রত সকলে অনায়াসেই রক্ষা করতে পারে তার উপরে শ্রদ্ধা থাকে না।

 

বিপিন।

একটা সুখবর দিই শোনো।

 

শ্রীশ।

তোমার বিবাহের সম্বন্ধ হয়েছে নাকি।

 

বিপিন।

হয়েছে বৈকি-- তোমার দৌহিত্রীর সঙ্গে। ঠাট্টা রাখো, পূর্ণ কাল কুমার-সভার সভ্য হয়েছে।

 

শ্রীশ।

পূর্ণ! বল কী। তা হলে তো শিলা জলে ভাসল।

 

বিপিন।

শিলা আপনি ভাসে না হে। তাকে আর-কিছুতে অকূলে ভাসিয়েছে।

 

শ্রীশ।

ওহে বিপিন, পূর্ণ যে খামকা চিরকুমার-সভার সভ্য হল তার তো কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ সভায় কৈশিকাকর্ষণ, মাধ্যাকর্ষণ, চুম্বকাকর্ষণ প্রভৃতি কোনো আকর্ষণের বালাই নেই।

 

বিপিন।

কে বললে নেই। পর্দার আড়ালে আছে।

 

শ্রীশ।

আর-একটু খোলসা করে বলো। তোমার বুদ্ধির দৌড়টা কিরকম শুনি।

 

বিপিন।

পূর্ণ এ সভার সভ্য হবার পর থেকে আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যে তার দুটি চক্ষু সর্বদা ঐ দরজার দিকের পর্দাটার রহস্যভেদ করবার জন্যই নিবিষ্ট। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখি পর্দার নীচের ফাঁক দিয়ে দুখানি চরণ দেখা যাচ্ছে। দেখেই বোঝা গেল, সেই চরণের দিকে যার মন বিচরণ করে কুমার-ব্রত রক্ষা করতে গিয়ে সে বিব্রত হবে।

 

শ্রীশ।

সেই চরণযুগলের চরম তত্ত্বটা ধরতে পারলে? যাকে একটু করে জানলে মন উতলা হয় অনেক সময় তাকে সম্পূর্ণ জানলে মন শান্তি পায়। চরণ দুটি কার শুনি।

 

বিপিন।

তবে ইতিহাসটা বলি শোনো। জানই তো, পূর্ণ সন্ধ্যাবেলায় চন্দ্রবাবুর কাছে পড়ার নোট নিতে যায়। সেদিন আমি আর পূর্ণ একসঙ্গেই একটু সকাল সকাল চন্দ্রবাবুর বাসায় এসেছিলেম। তিনি একটা মিটিং থেকে সবে এসেছেন। বেহারা কেরোসিন জ্বেলে দিয়ে গেছে, পূর্ণ বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছে, এমন সময়-- কী আর বলব ভাই, সে যেন বঙ্কিমবাবুর কোন্‌ এক অলিখিত নভেলের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল এক কন্যে, পিঠে দুলছে বেণী--

 

শ্রীশ।

বল কী, বল কী বিপিন।

 

বিপিন।

শোনোই-না! এক হাতে থালায় করে চন্দ্রবাবুর জন্যে জলখাবার, আর-এক হাতে জলের গ্লাস নিয়ে হঠাৎ ঘরের মধ্যে এসে উপস্থিত। আমাদের দেখেই তো কুণ্ঠিত, সচকিত, লজ্জায় মুখ রক্তিমবর্ণ। হাত জোড়া, মাথায় কাপড় দেবার জো নেই। তাড়াতাড়ি টেবিলের উপর খাবার রেখেই ছুট। পূর্ণর মুখ দেখেই বোঝা গেল, তার মনটা দোদুল্যমান বেণীর পিছন পিছন ছুটেছে। ব্রাহ্ম বটে, কিন্তু তেত্রিশ কোটির সঙ্গে লজ্জাকে বিসর্জন দেয় নি এবং সত্য বলছি শ্রীকেও রক্ষা করেছে।

 

শ্রীশ।

বল কী বিপিন, দেখতে ভালো বুঝি।

 

বিপিন।

দিব্যি দেখতে। হঠাৎ যেন বিদ্যুতের মতো এসে পড়ে পড়াশুনোয় বজ্রাঘাত করে গেল।

 

শ্রীশ।

আহা, কই আমি তো একদিনও দেখি নি। মেয়েটি কে হে।

 

বিপিন।

আমাদের সভাপতির ভাগ্নী, নাম নির্মলা।

 

শ্রীশ।

ভাগ্নী? সর্বনাশ! এইখানেই থাকেন?

 

বিপিন।

সন্দেহমাত্র নেই। সভাপতিমশায় নিজে নীরোগ, কিন্তু রোগের ছোঁয়াচ নিয়ে ফেরেন।

 

শ্রীশ।

কিন্তু ভাগ্নেজামাই ব'লে বালাই নেই বুঝি?

 

বিপিন।

সে বালাইটি অপরিণীত আকারে চিরকুমার-সভায় ঢুকে পড়েছে। পূর্ণ পরিণত আকারে যখন বেরিয়ে পড়বে তখন প্রজাপতি কুমার-সভার গুটি বিদীর্ণ করে দেবেন।

 

শ্রীশ।

তিনি তবে কুমারী?

 

বিপিন।

কুমারী বৈকি। কুমার-সভার মহামারী। এই ঘটনার ঠিক পরেই পূর্ণ হঠাৎ আমাদের কুমার-সভায় নাম লিখিয়েছে।

 

শ্রীশ।

পূজারি সেজে ঠাকুর চুরি করবার মতলব। আমাকেও তো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

 

বিপিন।

নারীতত্ত্বের গবেষণা স্বাস্থ্যকর না হতে পারে।

 

শ্রীশ।

তোমার স্বাস্থ্যের যদি ব্যাঘাত না হয়ে থাকে তা হলে আমারও--

 

বিপিন।

আরম্ভেতে রোগের প্রবেশ ধরা পড়ে না। কিন্তু, কুমারের মার যখন ভিতর থেকে ফুটে উঠবে তখন অশ্বিনীকুমারেরও সাধ্য নেই রক্ষা করে। গোড়ায় সাবধান হওয়া ভালো।

 

একটি প্রৌঢ় ব্যক্তির প্রবেশ

 

বিপিন।

কী মশায়, আপনি কে।

 

প্রৌঢ় ব্যক্তি।

আজ্ঞে, আমার নাম শ্রীবনমালী ভট্টাচার্য, ঠাকুরের নাম ljকমল ন্যায়চঞ্চু, নিবাস--

 

শ্রীশ।

আর অধিক আমাদের ঔৎসুক্য নেই। এখন কী কাজে এসেছেন সেইটে--

 

বনমালী।

কাজ কিছুই নয়। আপনারা ভদ্রলোক, আপনাদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয়--

 

শ্রীশ।

কাজ আপনার না থাকে আমাদের আছে। এখন, অন্য কোনো ভদ্রলোকের সঙ্গে যদি আলাপ-পরিচয় করতে যান তা হলে আমাদের একটু--

 

বনমালী।

তবে কাজের কথাটা সেরে নিই।

 

শ্রীশ।

সেই ভালো।

 

বনমালী।

কুমারটুলির নীলমাধব চৌধুরি-মশায়ের দুটি পরমাসুন্দরী কন্যা আছে-- তাঁদের বিবাহযোগ্য বয়স হয়েছে--

 

শ্রীশ।

হয়েছে তো হয়েছে, আমাদের সঙ্গে তার সম্বন্ধটা কী।

 

বনমালী।

সম্বন্ধ তো আপনারা একটু মনোযোগ করলেই হতে পারে। সে আর শক্ত কী। আমি সমস্তই ঠিক করে দেব।

 

বিপিন।

আপনার এত দয়া অপাত্রে অপব্যয় করছেন।

 

বনমালী।

অপাত্র! বিলক্ষণ! আপনাদের মতো সৎপাত্র পাব কোথায়। আপনাদের বিনয়গুণে আরো মুগ্ধ হলেম।

 

শ্রীশ।

এই মুগ্ধভাব যদি রাখতে চান তা হলে এইবেলা সরে পড়ুন। বিনয়গুণে অধিক টান সয় না।

 

বনমালী।

কন্যার বাপ যথেষ্ট টাকা দিতে রাজি আছেন।

 

শ্রীশ।

শহরে ভিক্ষুকের তো অভাব নেই। ওহে বিপিন, তোমার আমোদ বোধ হচ্ছে, কিন্তু এরকম সদালাপ আমার ভালো লাগে না।

 

বিপিন।

পালাই কোথায়। ভগবান এঁকেও যে লম্বা একজোড়া পা দিয়েছেন।

 

শ্রীশ।

যদি পিছু ধরেন তা হলে ভগবানের সেই দান মানুষের হাতে প'ড়ে খোয়াতে হবে।

 

বনমালী।

আমিই যাই।

 

[ প্রস্থান

 

চন্দ্রমাধববাবুর প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণ!

 

শ্রীশ।

আজ্ঞে, আমি শ্রীশ।

 

চন্দ্রবাবু।

আমাদের এই সভার সভ্যসংখ্যা অল্প হওয়াতে কারো হতাশ্বাস হবার কোনো কারণ নেই--

 

শ্রীশ।

হতাশ্বাস? সেই তো আমাদের সভার গৌরব। এ সভার মহৎ আদর্শ এবং কঠিন বিধান কি সর্বসাধারণের উপযুক্ত। আমাদের সভা অল্প লোকের সভা।

 

চন্দ্রবাবু।

(কার্যবিবরণের খাতাটা চোখের কাছে তুলিয়া) কিন্তু আমাদের আদর্শ উন্নত এবং বিধান কঠিন বলেই আমাদের বিনয় রক্ষা করা কর্তব্য; সর্বদাই মনে রাখা উচিত আমরা আমাদের সংকল্পসাধনের যোগ্য না হতেও পারি। ভেবে দেখো পূর্বে আমাদের মধ্যে এমন অনেক সভ্য ছিলেন যাঁরা হয়তো আমাদের চেয়ে সর্বাংশে মহত্তর ছিলেন, কিন্তু তাঁরাও নিজের সুখ এবং সংসারের প্রবল আকর্ষণে একে একে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছেন। আমাদের কয়জনের পথেও যে প্রলোভন কোথায় অপেক্ষা করছে তা কেউ বলতে পারে না। সেইজন্য আমরা দম্ভ পরিত্যাগ করব এবং কোনো রকম শপথেও বদ্ধ হতে চাই নে। আমাদের মত এই যে, কোনো কালে মহৎ চেষ্টাকে মনে স্থান না দেওয়ার চেয়ে চেষ্টা করে অকৃতকার্য হওয়া ভালো।

 

পাশের ঘরে ঈষৎ-মুক্ত দরজার অন্তরালে একটি শ্রোত্রী এই কথায় যে একটুখানি বিচলিত হইয়া উঠিল, তাহার অঞ্চলবদ্ধ চাবির গোছায় দুই-একটা চাবি যে একটু ঠুন্‌ শব্দ করিল তাহা পূর্ণ ছাড়া আর কেহ লক্ষ্য করিতে পারিল না

 

চন্দ্রবাবু।

আমাদের সভ্যকে অনেকেই পরিহাস করেন; অনেকেই বলেন তোমরা দেশের কাজ করবার জন্য কৌমার্যব্রত গ্রহণ করছ, কিন্তু সকলেই যদি এই মহৎ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয় তা হলে পঞ্চাশ বৎসর পরে দেশে এমন মানুষ কে থাকবে যার জন্যে কোনো কাজ করা কারো দরকার হবে। আমি প্রায়ই নম্র নিরুত্তরে এই-সকল পরিহাস বহন করি; কিন্তু এর কি কোনো উত্তর নেই?

 

তিনি তাঁহার তিনটিমাত্র সভ্যের দিকে চাহিলেন

 

পূর্ণ।

(নেপথ্যবাসিনীকে স্মরণ করিয়া সোৎসাহে) আছে বৈকি। সকল দেশেই একদল মানুষ আছে যারা সংসারী হবার জন্যে জন্মগ্রহণ করে নি, তাদের সংখ্যা অল্প। সেই কটিকে আকর্ষণ করে এক উদ্দেশ্য-বন্ধনে বাঁধবার জন্যে আমাদের এই সভা-- সমস্ত জগতের লোককে কৌমার্যব্রতে দীক্ষিত করবার জন্যে নয়। আমাদের এই জাল অনেক লোককে ধরবে এবং অধিকাংশকেই পরিত্যাগ করবে, অবশেষে দীর্ঘকাল পরীক্ষার পর দুটি-চারটি লোক থেকে যাবে। যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে, তোমরাই কি সেই দুটি-চারটি লোক তবে স্পর্ধাপূর্বক কে নিশ্চয়রূপে বলতে পারে। হাঁ, আমরা জালে আকৃষ্ট হয়েছি এই পর্যন্ত, কিন্তু পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত টিঁকতে পারব কি না তা অন্তর্যামীই জানেন। কিন্তু আমরা টিঁকতে পারি বা না পারি, আমরা একে একে স্খলিত হই বা না হই, তাই বলে আমাদের এই সভাকে পরিহাস করবার অধিকার কারো নেই। কেবল যদি আমাদের সভাপতিমশায় একলামাত্র থাকেন, তবে আমাদের এই পরিত্যক্ত সভাক্ষেত্র সেই এক তপস্বীর তপঃপ্রভাবে পবিত্র উজ্জ্বল হয়ে থাকবে এবং তাঁর চিরজীবনের তপস্যার ফল দেশের পক্ষে কখনোই ব্যর্থ হবে না।

 

কুণ্ঠিত সভাপতি কার্যবিবরণের খাতাখানি পুনর্বার তাঁহার চোখের অত্যন্ত কাছে ধরিয়া অন্যমনস্কভাবে কী দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু পূর্ণর এই বক্তৃতা যথাস্থানে যথাবেগে গিয়া

 

পৌঁছিল। চন্দ্রমাধববাবুর একাকী তপস্যার কথায় নির্মলার চক্ষু ছল ছল করিয়া আসিল এবং বিচলিত বালিকার চাবির গোছার ঝনক শব্দ উৎকর্ণ পূর্ণকে পুরস্কৃত করিল

 

বিপিন।

আমরা এ সভার যোগ্য কি অযোগ্য কালেই তার পরিচয় হবে, কিন্তু, কাজ করাও যদি আমাদের উদ্দেশ্য হয় তবে সেটা কোনো-এক সময়ে শুরু করা উচিত। আমার প্রশ্ন এই, কী করতে হবে।

 

চন্দ্রবাবু।

(উৎসাহিত হইয়া) এই প্রশ্নের জন্য আমরা এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম, কী করতে হবে। এই প্রশ্ন যেন আমাদের প্রত্যেককে দংশন করে অধীর করে তোলে, কী করতে হবে। বন্ধুগণ, কাজই একমাত্র ঐক্যের বন্ধন। একসঙ্গে যারা কাজ করে তারাই এক। এই সভায় আমরা যতক্ষণ সকলে মিলে একটা কাজে নিযুক্ত না হব ততক্ষণ আমরা যথার্থ এক হতে পারব না। অতএব বিপিনবাবু আজ এই-যে প্রশ্ন করছেন "কী করতে হবে', এই প্রশ্নকে নিবতে দেওয়া হবে না। সভ্যমহাশয়গণ, আপনারা উত্তর করুন কী করতে হবে।

 

শ্রীশ।

(অস্থির হইয়া) আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন "কী করতে হবে' আমি বলি আমাদের সকলকে সন্ন্যাসী হয়ে ভারতবর্ষের দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে দেশহিতব্রত নিয়ে বেড়াতে হবে, আমাদের দলকে পুষ্ট করে তুলতে হবে, আমাদের সভাটিকে সূক্ষ্ম সূত্র স্বরূপ করে সমস্ত ভারতবর্ষকে গেঁথে ফেলতে হবে।

 

বিপিন।

(হাসিয়া) সে ঢের সময় আছে, যা কালই শুরু করা যেতে পারে এমন একটা-কিছু কাজ বলো। "মারি তো গণ্ডার লুঠি তো ভাণ্ডার' যদি পণ ক'রে বস তবে গণ্ডারও বাঁচবে, ভাণ্ডারও বাঁচবে, তুমিও যেমন আরামে আছ তেমনি আরামে থাকবে। আমি প্রস্তাব করি, আমরা প্রত্যেকে দুটি করে বিদেশী ছাত্র পালন করব, তাদের পড়াশুনো এবং শরীরমনের সমস্ত চর্চার ভার আমাদের উপর থাকবে।

 

শ্রীশ।

এই তোমার কাজ! এর জন্যই আমরা সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করেছি? শেষকালে ছেলে মানুষ করতে হবে! তা হলে নিজের ছেলে কী অপরাধ করেছে।

 

বিপিন।

(বিরক্ত হইয়া) তা যদি বল তা হলে সন্ন্যাসীর তো কর্মই নেই; কর্মের মধ্যে ভিক্ষে আর ভ্রমণ আর ভণ্ডামি।

 

শ্রীশ।

(রাগিয়া) আমি দেখছি আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন এ সভার মহৎ উদ্দেশ্যের প্রতি যাঁদের শ্রদ্ধামাত্র নেই, তাঁরা যত শীঘ্র এ সভা পরিত্যাগ করে সন্তানপালনে প্রবৃত্ত হন ততই আমাদের মঙ্গল।

 

বিপিন।

(আরক্তবর্ণ হইয়া) নিজের সম্বন্ধে কিছু বলতে চাই নে, কিন্তু এ সভায় এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা সন্ন্যাসগ্রহণের কঠোরতা এবং সন্তানপালনের ত্যাগস্বীকার দুয়েরই অযোগ্য, তাঁদের--

 

চন্দ্রবাবু।

(চোখের কাছ হইতে কার্যবিবরণের খাতা নামাইয়া) উত্থাপিত প্রস্তাব সম্বন্ধে পূর্ণবাবুর অভিপ্রায় জানতে পারলে আমার মন্তব্য প্রকাশ করবার অবসর পাই।

 

পূর্ণ।

অদ্য বিশেষরূপে সভার ঐক্য-বিধানের জন্য একটা কাজ অবলম্বন করবার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কাজের প্রস্তাবে ঐক্যের লক্ষণ কিরকম পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে সে আর কাউকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার দরকার নেই। ইতিমধ্যে আমি যদি আবার একটা তৃতীয় মত প্রকাশ করে বসি তা হলে বিরোধানলে তৃতীয় আহুতি দান করা হবে-- অতএব আমার প্রস্তাব এই যে, সভাপতিমশায় আমাদের কাজ নির্দেশ করে দেবেন এবং আমরা তাই শিরোধার্য করে নিয়ে বিনা বিচারে পালন করে যাব, কার্যসাধন এবং ঐক্যসাধনের এই একমাত্র উপায় আছে।

 

পাশের ঘরে এক ব্যক্তি আবার একবার নড়িয়া-চড়িয়া বসিল

 

এবং তাহার চাবি ঝন্‌ করিয়া উঠিল

 

চন্দ্রবাবু।

আমাদের প্রথম কর্তব্য ভারতবর্ষের দারিদ্র্যমোচন, এবং তার আশু উপায় বাণিজ্য। আমরা কয়জনে বড়ো বাণিজ্য চালাতে পারি নে, কিন্তু তার সূত্রপাত করতে পারি। মনে করো আমরা সকলেই যদি দিয়াশলাই সম্বন্ধে পরীক্ষা আরম্ভ করি। এমন যদি একটা কাঠি বের করতে পারি যা সহজে জ্বলে, শীঘ্র নেবে না এবং দেশের সর্বত্র প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তা হলে দেশে সস্তা দেশালাই-নির্মাণের কোনো বাধা থাকে না। আমি বলছি শুধু ও জিনিসটা প্রস্তুত করার প্রণালী জানলেই তো হবে না। আমাদের দেশে যত রকম কাঠ মেলে তার মধ্যে কোন্‌ কাঠটা সব চেয়ে দাহ্য তার সন্ধান করা চাই।

 

বিপিন।

দাহনতত্ত্ব সম্বন্ধে পূর্ণবাবুর কিছু অভিজ্ঞতা আছে বলে মনে হয়।

 

চন্দ্রবাবু।

তাই নাকি। কী পূর্ণ, তুমি কি দাহ্য পদার্থের পরীক্ষা করেছ নাকি।

 

পূর্ণ।

আমার মনে হয় খ্যাংরা কাঠি জিনিসটা সস্তাও বটে অথচ--

 

বিপিন।

হাঁ, অথচ ওটা সহজেই জ্বালা ধরিয়ে দেয়, কিন্তু কুমার-সভায় তার পরীক্ষা সহজ নয়।

 

চন্দ্রবাবু।

কী বলছেন বিপিনবাবু। কথাটা শুনতে পেলুম না।

 

বিপিন।

আমি বলছিলুম, আমাদের দেশে দাহ্য পদার্থ যথেষ্ট আছে, যাতে দাহন করে এমন জিনিসেরও অভাব নেই; কিন্তু পরীক্ষাটা খুব বিবেচনাপূর্বক করা চাই।

 

চন্দ্রবাবু।

ঠিক কথা বলেছেন। অনেক কাঠ আছে, যেমন শীঘ্র জ্বলে ওঠে তেমনি শীঘ্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

 

বিপিন।

আছে বৈকি।

 

চন্দ্রবাবু।

শীঘ্র জ্বলবে, অল্প অল্প করে জ্বলবে, অনেক ক্ষণ ধরে শেষ পর্যন্ত জ্বলবে, এমন জিনিসটি চাই। খুঁজলে পাওয়া যাবে না কি?

 

শ্রীশ।

খুব পাওয়া যাবে, হয়তো দেখবেন হাতের কাছেই আছে।

 

পূর্ণ।

পাকাটি এবং খ্যাংরা কাঠি দিয়ে শীঘ্রই পরীক্ষা করে দেখব।

 

শ্রীশ মুখ ফিরাইয়া হাসিল

 

অক্ষয়ের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

মশায়, প্রবেশ করতে পারি?

 

ক্ষীণদৃষ্টি চন্দ্রমাধববাবু হঠাৎ চিনিতে না পারিয়া

 

ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া অবাক হইয়া চাহিয়া রহিলেন

 

অক্ষয়।

মশায়, ভয় পাবেন না এবং এমন ভ্রূকুটি করে আমাকেও ভয় দেখাবেন না। আমি অভূতপূর্ব নই, এমন-কি, আমি আপনাদেরই ভূতপূর্ব-- আমার নাম--

 

চন্দ্রবাবু।

আর নাম বলতে হবে না। আসুন, আসুন অক্ষয়বাবু--

 

তিন তরুণ সভ্য অক্ষয়কে নমস্কার করিল

 

বিপিন ও শ্রীশ দুই বন্ধু সদ্যোবিবাদের বিমর্ষতায় গম্ভীর হইয়া বসিয়া রহিল

 

পূর্ণ।

মশায়, অভূতপূর্বের চেয়ে ভূতপূর্বকেই বেশি ভয় হয়।

 

অক্ষয়।

পূর্ণবাবু বুদ্ধিমানের মতো কথাই বলেছেন। সংসারে ভূতের ভয়টাই প্রচলিত। নিজে যে ব্যক্তি ভূত অন্য লোকের জীবনসম্ভোগটা তার কাছে বাঞ্ছনীয় হতে পারেই না, এই মনে করে মানুষ ভূতকে ভয়ংকর কল্পনা করে। অতএব সভাপতিমশায়, চিরকুমার-সভার ভূতটিকে সভা থেকে ঝাড়াবেন, না পূর্বসম্পর্কের মমতা-বশত একখানি চৌকি দেবেন-- এই বেলা বলুন।

 

চন্দ্রবাবু।

চৌকি দেওয়াই স্থির।

 

(একখানি চেয়ার অগ্রসর করিয়া দিলেন)

 

অক্ষয়।

সর্বসম্মতিক্রমে আসন গ্রহণ করলুম। আপনারা আমাকে নিতান্ত ভদ্রতা করে বসতে বললেন বলেই যে আমি অভদ্রতা করে বসেই থাকব আমাকে এমন অসভ্য মনে করবেন না। বিশেষত পান তামাক এবং পত্নী আপনাদের সভার নিয়মবিরুদ্ধ, অথচ ঐ তিনটে বদ্‌ অভ্যাসই আমাকে একেবারে মাটি করেছে, সুতরাং চট্‌পট্‌ কাজের কথা সেরেই বাড়িমুখো হতে হবে।

 

চন্দ্রবাবু।

(হাসিয়া) আপনি যখন সভ্য নন তখন আপনার সম্বন্ধে সভার নিয়ম নাই খাটালেম; পান-তামাকের বন্দোবস্ত বোধ হয় করে দিতে পারব, কিন্তু আপনার তৃতীয় নেশাই--

 

অক্ষয়।

সেটি এখানে বহন করে আনবার চেষ্টা করবেন না, আমার সে নেশাটি প্রকাশ্য নয়।

 

চন্দ্রবাবু পান-তামাকের জন্য সনাতন চাকরকে ডাকিবার উপক্রম করিলেন

 

পূর্ণ "আমি ডাকিয়া দিতেছি' বলিয়া উঠিল--

 

পাশের ঘরে চাবি এবং চুড়ি এবং সহসা পলায়নের শব্দ একসঙ্গে শোনা গেল

 

অক্ষয়।

যস্মিন্‌ দেশে যদাচারঃ। যতক্ষণ আমি এখানে আছি ততক্ষণ আমি আপনাদের চিরকুমার, কোনো প্রভেদ নেই। এখন আমার প্রস্তাবটা শুনুন।

 

চন্দ্রবাবু টেবিলের উপর কার্যবিবরণের খাতাটির প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিয়া পড়িয়া মন দিয়া শুনিতে লাগিলেন

 

অক্ষয়।

আমার কোনো মফস্বলের ধনী বন্ধু তাঁর একটি সন্তানকে আপনাদের কুমার-সভার সভ্য করতে ইচ্ছা করেছেন।

 

চন্দ্রবাবু।

(বিস্মিত হইয়া) বাপ ছেলেটির বিবাহ দিতে চান না!

 

অক্ষয়।

সে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন-- বিবাহ সে কোনোক্রমেই করবে না, আমি তার জামিন রইলুম। তার দূর সম্পর্কের এক দাদা-সুদ্ধ সভ্য হবেন। তাঁর সম্বন্ধেও আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। কারণ যদিচ তিনি আপনাদের মতো সুকুমার নন, কিন্তু আপনাদের সকলের চেয়ে বেশি কুমার, তাঁর বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে-- সুতরাং তাঁর সন্দেহের বয়সটা আর নেই, সৌভাগ্যক্রমে সেটা আপনাদের সকলেরই আছে।

 

চন্দ্রবাবু।

সভ্যপদপ্রার্থীদের নাম ধাম বিবরণ--

 

অক্ষয়।

অবশ্যই তাঁদের নাম ধাম বিবরণ একটা আছেই, সভাকে তার থেকে বঞ্চিত করতে পারা যাবে না-- সভ্য যখন পাবেন তখন নাম ধাম বিবরণ-সুদ্ধই পাবেন। কিন্তু আপনাদের এই এক তলার স্যাঁৎসেঁতে ঘরটি স্বাস্থ্যের পক্ষে অনুকূল নয়; আপনাদের এই চিরকুমার-ক'টির চিরত্ব যাতে হ্রাস না হয় সে দিকে একটু দৃষ্টি রাখবেন।

 

চন্দ্র।

(কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া খাতাটি নাকের কাছে তুলিয়া লইয়া) অক্ষয়বাবু, আপনি জানেন তো আমাদের আয়--

 

অক্ষয়।

আয়ের কথাটা আর প্রকাশ করবেন না, আমি জানি ও আলোচনাটা চিত্তপ্রফুল্লকর নয়। ভালো ঘরের বন্দোবস্ত করে রাখা হয়েছে, সেজন্যে আপনাদের ধনাধ্যক্ষকে স্মরণ করতে হবে না। চলুন-না, আজই সমস্ত দেখিয়ে শুনিয়ে আনি।

 

বিমর্ষ বিপিন-শ্রীশের মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সভাপতিও প্রফুল্ল হইয়া উঠিয়া চুলের মধ্য দিয়া বারবার আঙুল

 

বুলাইতে বুলাইতে চুলগুলাকে অত্যন্ত অপরিষ্কার করিয়া তুলিলেন। কেবল পূর্ণ অত্যন্ত দমিয়া গেল

 

পূর্ণ।

সভার স্থান-পরিবর্তনটা কিছু নয়।

 

অক্ষয়।

কেন, এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি করলেই কি আপনাদের চিরকৌমার্যের প্রদীপ হাওয়ায় নিবে যাবে।

 

পূর্ণ।

এ ঘরটি তো আমাদের মন্দ বোধ হয় না।

 

অক্ষয়।

মন্দ নয়। কিন্তু এর চেয়ে ভালো ঘর শহরে দুষ্প#f হবে না।

 

পূর্ণ।

আমার তো মনে হয় বিলাসিতার দিকে মন না দিয়ে খানিকটা কষ্টসহিষ্ণুতা অভ্যাস করা ভালো।

 

শ্রীশ।

সেটা সভার অধিবেশনে না করে সভার বাইরে করা যাবে।

 

বিপিন।

একটা কাজে প্রবৃত্ত হলেই এত ক্লেশ সহ্য করবার অবসর পাওয়া যায় যে, অকারণে বলক্ষয় করা মূঢ়তা।

 

অক্ষয়।

বন্ধুগণ, আমার পরামর্শ শোনো, সভাঘরের অন্ধকার দিয়ে চিরকৌমার্য-ব্রতের অন্ধকার আর বাড়িয়ো না। আলোক এবং বাতাস স্ত্রীজাতীয় নয়, অতএব সভার মধ্যে ও দুটোকে প্রবেশ করতে বাধা দিয়ো না। আরো বিবেচনা করে দেখো, এ স্থানটি অত্যন্ত সরস, তোমাদের ব্রতটি তদুপযুক্ত নয়। বাতিকের চর্চা করছ করো, কিন্তু বাতের চর্চা তোমাদের প্রতিজ্ঞার মধ্যে নয়। কী বল শ্রীশবাবু। বিপিনবাবুর কী মত।

 

শ্রীশ ও বিপিন। ঠিক কথা। ঘরটা একবার দেখেই আসা যাক-না।

 

পূর্ণ বিমর্ষ হইয়া নিরুত্তর রহিল। পাশের ঘরেও চাবি একবার ঠুন করিল

 

কিন্তু অত্যন্ত অপ্রসন্ন সুরে

 

অক্ষয়।

চন্দ্রবাবু, এখনই আসুন-না, দেখিয়ে আনি।

 

চন্দ্রবাবু।

চলুন।

 

[ চন্দ্রবাবু ও অক্ষয়ের প্রস্থান

 

বিপিন।

দেখো পূর্ণবাবু, সত্যি কথা বলছি তোমাকে, চিরকুমার-সভার ফ্রন্টিয়ার পলিসিতে আমরা পর্দা জিনিসটার অনুমোদন করি নে। ঐখান থেকেই শত্রুপ্রবেশের পথ।

 

পূর্ণ।

মানে কী হল।

 

বিপিন।

পর্দার মতো উড়ুক্ষু জিনিস, অল্প একটু হাওয়াতে চঞ্চল হয়ে ওঠে, কুমার-সভার সে যোগ্য নয়।

 

শ্রীশ।

এখানকার সীমানা- রক্ষার জন্য পাকা ইঁটের দেওয়ালের মতো অচল পদার্থ চাই। ঐ পর্দাটা ভালো ঠেকছে না।

 

পূর্ণ।

তোমাদের কথাগুলো কিছু রহস্যময় শোনাচ্ছে।

 

বিপিন।

সে কথা ঠিক। রহস্য পদার্থটাই সর্বনেশে। চিরকুমারদের সকলের চেয়ে যে বড়ো শত্রু পর্দা-বেষ্টনীর মধ্যেই তার বাস।

 

শ্রীশ।

আমাদের ব্রত হচ্ছে পর্দাটাকে আক্রমণ করা, তাকে ছিন্ন করে ফেলা। পর্দার ছায়ায় ছায়ায় ফেরে যে মায়ামৃগী আলো ফেললেই মরীচিকার মতো সে মিলিয়ে যাবে।

 

পূর্ণ।

শ্রীশবাবু, মরীচিকা মেলাতে পারে, কিন্তু তৃষ্ণা তো মেলায় না।

 

শ্রীশ।

কেন মেলাবে। ওটা থাকা চাই। তৃষ্ণা না থাকলে আমাদের ছোটাবে কিসে। কেবল জানা দরকার কোন্‌ পথে ছুটলে ফল পাওয়া যাবে।

 

নেপথ্যে গান। ওগো, তোরা কে যাবি পারে।

 

বিপিন।

একটু আস্তে। গান শুনতে পাচ্ছ না? খাসা গান বটে।

 

পূর্ণ।

ঐ গানটাও কি পর্দা নয়। ওর আড়ালে যে রহস্য গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে পথে বিপথে ছোটাবার ক্ষমতা তারও আছে।

 

বিপিন।

থাক্‌ ভাই। তত্ত্বকথাটা এখন থাক্‌। একটু শুনতে দাও। খুব কাছের বাড়ি থেকেই গানটা আসছে, শুনেছি অক্ষয়বাবুর বাসা ঐখানেই।

 

শ্রীশ।

গানের কথাটা বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

 

নেপথ্যে গান

 

ওগো, তোরা কে যাবি পারে।

      আমি    তরী নিয়ে বসে আছি নদী-কিনারে।

ও পারেতে উপবনে      কত খেলা কত জনে,

এ পারেতে ধু ধু মরু বারি বিনা রে।

এইবেলা বেলা আছে, আয়, কে যাবি।

মিছে কেন কাটে কাল কত কী ভাবি।

সূর্য পাটে যাবে নেমে,     সুবাতাস যাবে থেমে,

খেয়া বন্ধ হয়ে যাবে সন্ধ্যা-আঁধারে।

 

 

শ্রীশ।

গানটা বোধ হচ্ছে যেন কুমার-সভাকেই ভয় দেখাবার গান। খেয়া বন্ধ হয়ে গেলেই তো মুশকিল।

 

বিপিন।

ঐ শুনলে না বললে-- "এ পারেতে ধূ ধূ মরু বারি বিনা রে'?

 

পূর্ণ।

তা হলে আর দেরি কেন। পারে যাবার জোগাড় করো।

 

শ্রীশ।

গলাটা শুনে বোধ হচ্ছে পারে নিয়ে যাবে না, অতলে তলিয়ে দেবে।

 

[ সকলের প্রস্থান

 

দ্বিতীয় দৃশ্য


শ্রীশের বাসা

 

শ্রীশ তাহার বাসায় দক্ষিণের বারান্দায় একখানা বড়ো হাতাওয়ালা কেদারার দুই হাতার উপর দুই পা তুলিয়া দিয়া শুক্লসন্ধ্যায় চুপচাপ বসিয়া সিগারেট ফুঁকিতেছিল। পাশে টিপায়ের উপর রেকাবিতে একটি গ্লাসে বরফ-দেওয়া লেমনেড ও স্তূপাকার কুন্দফুলের মালা

 

বিপিনের প্রবেশ

 

বিপিন।

কী গো সন্ন্যাসীঠাকুর।

 

শ্রীশ।

(উঠিয়া বসিয়া উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া) এখনো বুঝি ঝগড়া ভুলতে পার নি? আচ্ছা ভাই শিশুপালক, তুমি কি সত্যি মনে কর আমি সন্ন্যাসী হতে পারি নে।

 

বিপিন।

কেন পারবে না। কিন্তু অনেকগুলি তল্পিদার চেলা সঙ্গে থাকা চাই।

 

শ্রীশ।

তার তাৎপর্য এই যে, কেউ-বা আমার বেলফুলের মালা গেঁথে দেবে, কেউ-বা বাজার থেকে লেমনেড ও বরফ ভিক্ষে করে আনবে, এই তো? তাতে ক্ষতিটা কী। যে সন্ন্যাসধর্মে বেলফুলের প্রতি বৈরাগ্য এবং ঠাণ্ডা লেমনেডের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মায় সেটা কি খুব উঁচু দরের সন্ন্যাস।

 

বিপিন।

সাধারণ ভাষায় তো সন্ন্যাসধর্ম বলতে সেইরকমটাই বোঝায়।

 

শ্রীশ।

ঐ শোনো, তুমি কি মনে কর ভাষায় একটা কথার একটা বৈ অর্থ, নেই। একজনের কাছে সন্ন্যাসী কথাটার যে অর্থ আর-একজনের কাছেও যদি ঠিক সেই অর্থই হয়, তা হলে মন ব'লে একটা স্বাধীন পদার্থ আছে কী করতে।

 

বিপিন।

তোমার মন সন্ন্যাসী কথাটার কী অর্থ করছেন আমার মন সেইটি শোনবার জন্য উৎসুক হয়েছেন।

 

শ্রীশ।

আমার সন্ন্যাসীর সাজ এইরকম-- গলায় ফুলের মালা, গায়ে চন্দন, কানে কুণ্ডল, মুখে হাস্য। আমার সন্ন্যাসীর কাজ মানুষের চিত্ত-আকর্ষণ। সুন্দর চেহারা, মিষ্টি গলা, বক্তৃতায় অধিকার, এ-সমস্ত না থাকলে সন্ন্যাসী হয়ে উপযুক্ত ফল পাওয়া যায় না। রুচি বুদ্ধি কার্যক্ষমতা ও প্রফুল্লতা, সকল বিষয়েই আমার সন্ন্যাসীসম্প্রদায়কে গৃহস্থের আদর্শ হতে হবে।

 

বিপিন।

অর্থাৎ, একদল কার্তিককে ময়ূরের উপর চড়ে রাস্তায় বেরোতে হবে।

 

শ্রীশ।

ময়ূর না পাওয়া যায় ট্রাম আছে, পদব্রজেও নারাজ নই। কুমার-সভা মানেই তো কার্তিকের সভা। কিন্তু কার্তিক কি কেবল সুপুরুষ ছিলেন। তিনিই ছিলেন স্বর্গের সেনাপতি।

 

বিপিন।

লড়াইয়ের জন্যে তাঁর দুটিমাত্র হাত, কিন্তু বক্তৃতা করবার জন্যে তাঁর তিনজোড়া মুখ।

 

শ্রীশ।

এর থেকে প্রমাণ হয় আমাদের আর্য পিতামহরা বাহুবল অপেক্ষা বাক্যবলকে তিনগুণ বেশি বলেই জানতেন। আমিও পালোয়ানিকে বীরত্বের আদর্শ বলে মানি নে।

 

বিপিন।

ওটা বুঝি আমার উপর হল?

 

শ্রীশ।

ঐ দেখো। মানুষকে অহংকারে কী রকম মাটি করে। তুমি ঠিক করে রেখেছ, পালোয়ান বললেই তোমাকে বলা হল। তুমি কলিযুগের ভীমসেন। আচ্ছা, এসো, যুদ্ধং দেহি। একবার বীরত্বের পরীক্ষা হয়ে যাক।

 

এই বলিয়া দুই বন্ধু ক্ষণকালের জন্য লীলাচ্ছলে হাত-কাড়াকাড়ি করিতে লাগিল বিপিন হঠাৎ "এইবার ভীমসেনের পতন' বলিয়া ধপ করিয়া শ্রীশের কেদারাটা অধিকার করিয়া তাহার উপরে দুই পা তুলিয়া দিল এবং "উঃ অসহ্য তৃষ্ণা' বলিয়া লেমনেডের গ্লাসটি এক নিশ্বাসে খালি করিল। তখন শ্রীশ তাড়াতাড়ি কুন্দফুলের মালাটি সংগ্রহ করিয়া "কিন্তু বিজয়মাল্যটি আমার' বলিয়া সেটা মাথায় জড়াইল এবং বেতের মোড়াটার উপরে বসিয়া পড়িল

 

শ্রীশ।

আচ্ছা ভাই, সত্যি বলো, একদল শিক্ষিত লোক যদি এইরকম সংসার পরিত্যাগ ক'রে পরিপাটি সজ্জায়, প্রফুল্ল প্রসন্ন মুখে, গানে এবং বক্তৃতায় ভারতবর্ষের চতুর্দিকে শিক্ষা বিস্তার করে বেড়ায় তাতে উপকার হয় কি না।

 

বিপিন।

আইডিয়াটা ভালো বটে।

 

শ্রীশ।

অর্থাৎ, শুনতে সুন্দর, কিন্তু করতে অসাধ্য। আমি বলছি অসাধ্য নয় এবং আমি দৃষ্টান্ত দ্বারা তার প্রমাণ করব। ভারতবর্ষে সন্ন্যাসধর্ম বলে একটা প্রকাণ্ড শক্তি আছে; তার ছাই ঝেড়ে, তার ঝুলিটা কেড়ে নিয়ে, তার জটা মুড়িয়ে, তাকে সৌন্দর্যে এবং কর্মনিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত করাই চিরকুমার-সভার একমাত্র উদ্দেশ্য। ছেলে পড়ানো এবং দেশলাইয়ের কাঠি তৈরি করবার জন্যে আমাদের মতো লোক চিরজীবনের ব্রত অবলম্বন করে নি। বলো বিপিন, তুমি আমার প্রস্তাবে রাজি আছ কি না।

 

বিপিন।

তোমার সন্ন্যাসীর যেরকম চেহারা গলা এবং আসবাবের প্রয়োজন আমার তো তার কিছুই নেই। তবে তল্পিদার হয়ে পিছনে যেতে রাজি আছি। কানে যদি সোনার কুণ্ডল, অন্তত চোখে যদি সোনার চশমাটা প'রে যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াও তা হলে একটা প্রহরীর দরকার, সে কাজটা আমার দ্বারা কতকটা চলতে পারবে।

 

শ্রীশ।

আবার ঠাট্টা।

 

বিপিন।

না ভাই, ঠাট্টা নয়। আমি সত্যিই বলছি, তোমার প্রস্তাবটাকে যদি সম্ভবপর করে তুলতে পার তা হলে খুব ভালোই হয়। তবে এরকম একটা সম্প্রদায়ে সকলেরই কাজ সমান হতে পারে না, যার যেমন স্বাভাবিক ক্ষমতা সেই অনুসারে যোগ দিতে পারে।

 

শ্রীশ।

সে তো ঠিক কথা। কেবল একটি বিষয়ে আমাদের খুব দৃঢ় হতে হবে, স্ত্রীজাতির কোনো সংস্রব রাখব না।

 

বিপিন।

মাল্যচন্দন অঙ্গদকুণ্ডল সবই রাখতে চাও, কেবল ঐ একটা বিষয়ে এত বেশি দৃঢ়তা কেন?

 

শ্রীশ।

ঐগুলো রাখছি ব'লেই দৃঢ়তা। যেজন্যে চৈতন্য তাঁর অনুচরদের স্ত্রীলোকের সঙ্গ থেকে কঠিন শাসনে দূরে রেখেছিলেন। তাঁর ধর্ম অনুরাগ এবং সৌন্দর্যের ধর্ম, সেজন্যেই তাঁর পক্ষে প্রলোভনের ফাঁদ অনেক ছিল।

 

বিপিন।

তা হলে ভয়টুকুও আছে।

 

শ্রীশ।

আমার নিজের জন্যে লেশমাত্র নেই। আমি আমার মনকে পৃথিবীর বিচিত্র সৌন্দর্যে ব্যাপ্ত করে রেখে দিই, কোনো একটা ফাঁদে আমাকে ধরে কার সাধ্য? কিন্তু তোমরা যে দিনরাত্রি ফুটবল টেনিস ক্রিকেট নিয়ে থাক, তোমরা একবার পড়লে ব্যাট্‌বল গুলিডাণ্ডা সবসুদ্ধ ঘাড়-মোড় ভেঙে পড়বে।

 

বিপিন।

আচ্ছা ভাই, সময় উপস্থিত হলে দেখা যাবে।

 

শ্রীশ।

ও কথা ভালো নয়। সময় উপস্থিত হবে না, সময় উপস্থিত হতে দেব না। সময় তো রথে চড়ে আসেন না, আমরা তাঁকে ঘাড়ে করে নিয়ে আসি; কিন্তু তুমি যে সময়টার কথা বলছ তাকে বাহন-অভাবে ফিরতেই হবে।

 

পূর্ণবাবুর প্রবেশ

 

উভয়ে।

এসো পূর্ণবাবু।

 

বিপিন তাহাকে কেদারাটা ছাড়িয়া দিয়া একটা চৌকি টানিয়া লইয়া বসিল

 

পূর্ণ।

তোমাদের এই বারান্দায় জ্যোৎস্নাটি তো মন্দ রচনা কর নি, মাঝে মাঝে থামের ছায়া ফেলে ফেলে সাজিয়েছ ভালো।

 

শ্রীশ।

ছাদের উপর জ্যোৎস্না রচনা করা প্রভৃতি কতকগুলি অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা জন্মাবার পূর্ব হতেই আমার আছে। কিন্তু দেখো পূর্ণবাবু, ঐ দেশালাই করা-টরা ওগুলো আমার ভালো আসে না।

 

পূর্ণ।

(ফুলের মালার দিকে চাহিয়া) সন্ন্যাসধর্মেই কি তোমার অসামান্য দখল আছে নাকি।

 

শ্রীশ।

সেই কথাই তো হচ্ছিল। সন্ন্যাসধর্ম তুমি কাকে বল শুনি।

 

পূর্ণ।

যে ধর্মে দর্জি ধোবা নাপিতের কোনো সহায়তা নিতে হয় না, তাঁতিকে একেবারেই অগ্রাহ্য করতে হয়, পিয়ার্স্‌ সোপের বিজ্ঞাপনের দিকে দৃক্‌পাত করতে হয় না--

 

শ্রীশ।

আরে ছিঃ, সে সন্ন্যাসধর্ম তো বুড়ো হয়ে মরে গেছে। এখন নবীন সন্ন্যাসী ব'লে একটা সম্প্রদায় গড়তে হবে--

 

পূর্ণ।

বিদ্যাসুন্দরের যাত্রায় যে নবীন সন্ন্যাসী আছেন তিনি মন্দ দৃষ্টান্ত নন, কিন্তু তিনি তো চিরকুমার-সভার বিধানমতে চলেন নি।

 

শ্রীশ।

যদি চলতেন তা হলে তিনিই ঠিক দৃষ্টান্ত হতে পারতেন। সাজে সজ্জায় বাক্যে আচরণে সুন্দর এবং সুনিপুণ হতে হবে--

 

পূর্ণ।

কেবল রাজকন্যার দিক থেকে দৃষ্টি নামাতে হবে। এই তো? বিনি সুতার মালা গাঁথতে হবে, কিন্তু সে মালা পরাতে হবে কার গলায় হে।

 

শ্রীশ।

স্বদেশের। কথাটা কিছু উচ্চ শ্রেণীর হয়ে পড়ল, কী করব বলো, মালিনী মাসি এবং রাজকুমারী একেবারেই নিষিদ্ধ-- কিন্তু ঠাট্টা নয় পূর্ণবাবু--

 

পূর্ণ।

ঠাট্টার মতো মোটেই শোনাচ্ছে না-- ভয়ানক কড়া কথা, একেবারে খট্‌খটে শুকনো।

 

শ্রীশ।

আমাদের চিরকুমার-সভা থেকে এমন-একটি সন্ন্যাসীসম্প্রদায় গঠন করতে হবে যারা রুচি শিক্ষা ও কর্মে সকল গৃহস্থের আদর্শ হবে। যারা সংগীত প্রভৃতি কলাবিদ্যায় অদ্বিতীয় হবে, আবার লাঠি তলোয়ার -খেলা, ঘোড়ায় চড়া, বন্দুক লক্ষ্য করায় পারদর্শী হবে--

 

পূর্ণ।

অর্থাৎ, মনোহরণ এবং প্রাণহরণ দুই কর্মেই মজবুত হবে। পুরুষ দেবীচৌধুরানীর দল আর-কি।

 

শ্রীশ।

বঙ্কিমবাবু আমার আইডিয়াটা পূর্বে হতেই চুরি করে রেখেছেন, কিন্তু ওটাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের নিজের করে নিতে হবে।

 

পূর্ণ।

সভাপতিমশায় কী বলেন।

 

শ্রীশ।

তাঁকে ক'দিন ধরে বুঝিয়ে বুঝিয়ে আমার দলে টেনে নিয়েছি। কিন্তু, তিনি তাঁর দেশালাইয়ের কাঠি ছাড়েন নি। তিনি বলেন, সন্ন্যাসীরা কৃষিতত্ত্ব বস্তুতত্ত্ব প্রভৃতি শিখে গ্রামে গ্রামে চাষাদের শিখিয়ে বেড়াবে, এক টাকা ক'রে শেয়ার নিয়ে একটা ব্যাঙ্ক্‌ খুলে বড়ো বড়ো পল্লীতে নূতন নিয়মে এক-একটা দোকান বসিয়ে আসবে-- ভারতবর্ষের চারি দিকে বাণিজ্যের জাল বিস্তার করে দেবে। তিনি খুব মেতে উঠেছেন।

 

পূর্ণ।

বিপিনবাবুর কী মত।

 

বিপিন।

যদিচ আমি নিজেকে শ্রীশের নবীন সন্ন্যাসী-সম্প্রদায়ের আদর্শ পুরুষ ব'লে জ্ঞান করি নে, কিন্তু দল যদি গড়ে ওঠে তো আমিও সন্ন্যাসী সাজতে রাজি আছি।

 

পূর্ণ।

কিন্তু সাজতে খরচ আছে মশায়। কেবল কৌপীন নয় তো, অঙ্গদ কুণ্ডল আভরণ কুন্তলীন দেলখোশ--

 

শ্রীশ।

পূর্ণবাবু, ঠাট্টাই কর আর যাই কর চিরকুমার-সভা সন্ন্যাসীসভা হবেই। আমরা এক দিকে কঠোর আত্মত্যাগ করব, অন্য দিকে মনুষ্যত্বের কোনো উপকরণ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করব না। আমরা কঠিন শৌর্য এবং ললিত সৌন্দর্য উভয়কেই সমান আদরে বরণ করব, সেই দুরূহ সাধনায় ভারতবর্ষে নবযুগের আবির্ভাব হবে--

 

পূর্ণ।

বুঝেছি শ্রীশবাবু-- কিন্তু নারী কি মনুষ্যত্বের একটা সর্বপ্রধান উপকরণের মধ্যে গণ্য নয়। এবং তাকে উপেক্ষা করলে ললিত সৌন্দর্যের প্রতি কি সমাদর রক্ষা হবে। তার কী উপায় করলে।

 

শ্রীশ।

নারীর একটা দোষ, নরজাতিকে তিনি লতার মতো বেষ্টন করে ধরেন। যদি তাঁর দ্বারা বিজড়িত হবার আশঙ্কা না থাকত, যদি তাঁকে রক্ষা করেও স্বাধীনতা রক্ষা করা যেত, তা হলে কোনো কথা ছিল না। কাজে যখন জীবন উৎসর্গ করতে হবে তখন কাজের সমস্ত বাধা দূর করতে চাই-- পাণিগ্রহণ করে ফেললে নিজের পাণিকেও বদ্ধ করে ফেলতে হবে, সে হলে চলবে না পূর্ণবাবু।

 

পূর্ণ।

ব্যস্ত হোয়ো না ভাই, আমি আমার শুভবিবাহে তোমাদের নিমন্ত্রণ করতে আসি নি। কিন্তু ভেবে দেখো দেখি, মনুষ্যজন্ম আর পাব কি না সন্দেহ, অথচ হৃদয়কে চিরজীবন যে পিপাসার জল থেকে বঞ্চিত করতে যাচ্ছি তার পূরণস্বরূপ আর কোথাও আর-কিছু জুটবে কি। মুসলমানের স্বর্গে হুরী আছে, হিন্দুর স্বর্গেও অপ্সরার অভাব নেই, চিরকুমার-সভার স্বর্গে সভাপতি এবং সভ্যমহাশয়দের চেয়ে মনোরম আর-কিছু পাওয়া যাবে কি।

 

শ্রীশ।

পূর্ণবাবু বল কী। তুমি যে--

 

পূর্ণ।

ভয় নেই ভাই, এখনো মরিয়া হয়ে উঠি নি। তোমার এই ছাদ-ভরা জ্যোৎস্না আর ঐ ফুলের গন্ধ কি কৌমার্যব্রত-রক্ষার সহায়তা করবার জন্যে সৃষ্টি হয়েছে। মনের মধ্যে মাঝে মাঝে যে বাষ্প জমে আমি সেটাকে উচ্ছ্বসিত করে দেওয়াই ভালো বোধ করি; চেপে রেখে নিজেকে ভোলাতে গেলে কোন্‌দিন চিরকুমারব্রতের লোহার বয়্‌লারখানা ফেটে যাবে। যাই হোক, যদি সন্ন্যাসী হওয়াই স্থির কর তো আমিও যোগ দেব-- কিন্তু আপাতত সভাটাকে তো রক্ষা করতে হবে।

 

শ্রীশ।

কেন? কী হয়েছে?

 

পূর্ণ।

অক্ষয়বাবু আমাদের সভাকে যে স্থানান্তর করবার ব্যবস্থা করছেন, এটা আমার ভালো ঠেকছে না।

 

শ্রীশ।

সন্দেহ জিনিসটা নাস্তিকতার ছায়া। মন্দ হবে, ভেঙে যাবে, নষ্ট হবে, এ-সব ভাব আমি কোনো অবস্থাতেই মনে স্থান দিই নে। ভালোই হবে, যা হচ্ছে বেশ হচ্ছে, চিরকুমার-সভার উদার বিস্তীর্ণ ভবিষ্যৎ আমি চোখের সম্মুখে দেখতে পাচ্ছি-- অক্ষয়বাবু সভাকে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে তার কী অনিষ্ট করতে পারেন। কেবল গলির এক নম্বর থেকে আর-এক নম্বরে নয়, আমাদের যে পথে-পথে দেশে-দেশে সঞ্চরণ করে বেড়াতে হবে। সন্দেহ শঙ্কা উদ্‌বেগ এগুলো মন থেকে দূর করে দাও পূর্ণবাবু-- বিশ্বাস এবং আনন্দ না হলে বড়ো কাজ হয় না।

 

বিপিন।

দিনকতক দেখাই যাক-না। যদি কোনো অসুবিধার কারণ ঘটে তা হলে স্বস্থানে ফিরে আসা যাবে-- আমাদের সেই অন্ধকার বিবরটি ফস্‌ করে কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।

 

অকস্মাৎ চন্দ্রমাধববাবুর সবেগে প্রবেশ। তিনজনের সসম্ভ্রমে উত্থান

 

চন্দ্রবাবু।

দেখো, আমি সেই কথাটা ভাবছিলুম--

 

শ্রীশ।

বসুন।

 

চন্দ্রবাবু।

না না, বসব না, আমি এখনই যাচ্ছি। আমি বলছিলুম, সন্ন্যাসব্রতের জন্যে আমাদের এখন থেকে প্রস্তুত হতে হবে। হঠাৎ একটা অপঘাত ঘটলে, কিম্বা সাধারণ জ্বরজ্বালায়, কিরকম চিকিৎসা সে আমাদের শিক্ষা করতে হবে-- ডাক্তার রামরতনবাবু ফি- রবিবারে আমাদের দু ঘণ্টা করে বক্তৃতা দেবেন বন্দোবস্ত করে এসেছি।

 

শ্রীশ।

কিন্তু, তাতে অনেক বিলম্ব হবে না?

 

চন্দ্রবাবু।

বিলম্ব তো হবেই, কাজটি তো সহজ নয়। কেবল তাই নয়-- আমাদের কিছু কিছু আইন অধ্যয়নও দরকার। অবিচার অত্যাচার থেকে রক্ষা করা এবং কার কতদূর অধিকার সেটা চাষাভুষোদের বুঝিয়ে দেওয়া আমাদের কাজ।

 

শ্রীশ।

চন্দ্রবাবু, বসুন--

 

চন্দ্রবাবু।

না শ্রীশবাবু, বসতে পারছি নে, আমার একটু কাজ আছে। আর-একটি আমাদের করতে হচ্ছে-- গোরুর গাড়ি, ঢেঁকি, তাঁত প্রভৃতি আমাদের দেশী অত্যাবশ্যক জিনিসগুলিকে একটু-আধটু সংশোধন করে যাতে কোনো অংশে তাদের সস্তা বা মজবুত বা বেশি উপযোগী করে তুলতে পারি সে চেষ্টা আমাদের করতে হবে। এবার গ্রীষ্মের অবকাশে কেদারবাবুদের কারখানায় গিয়ে প্রত্যহ আমাদের কতকগুলি পরীক্ষা করা চাই।

 

শ্রীশ।

চন্দ্রবাবু, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন--

 

চৌকি অগ্রসর-করণ

 

চন্দ্রবাবু।

না না, আমি এখনই যাচ্ছি। দেখো, আমার মত এই যে, এই-সমস্ত গ্রামের ব্যবহার্য সামান্য জিনিসগুলির যদি আমরা কোনো উন্নতি করতে পারি তা হলে তাতে করে চাষাদের মনের মধ্যে যেরকম আন্দোলন হবে বড়ো বড়ো সংস্কারকার্যেও তেমন হবে না। তাদের সেই চিরকালের ঢেঁকি-ঘানির কিছু পরিবর্তন করতে পারলে তবে তাদের সমস্ত মন সজাগ হয়ে উঠবে, পৃথিবী যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই এ তারা বুঝতে পারবে--

 

শ্রীশ।

চন্দ্রবাবু, বসবেন না কি।

 

চন্দ্রবাবু।

থাক্‌-না। একবার ভেবে দেখো, আমরা যে এতকাল ধরে শিক্ষা পেয়ে আসছি, উচিত ছিল আমাদের ঢেঁকি কুলো থেকে তার পরিচয় আরম্ভ হওয়া। বড়ো বড়ো কল-কারখানা তো দূরের কথা, ঘরের মধ্যেই আমাদের সজাগ দৃষ্টি পড়ল না। আমাদের হাতের কাছে যা আছে আমরা না তার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলুম, না তার সম্বন্ধে চিন্তা করলুম। যা ছিল তা তেমনিই রয়ে গেছে। মানুষ অগ্রসর হচ্ছে অথচ তার জিনিসপত্র পিছিয়ে থাকছে, এ কখনো হতেই পারে না। আমরা পড়েই আছি-- ইংরেজ আমাদের কাঁধে করে বহন করছে, তাকে এগোনো বলে না। ছোটোখাটো সামান্য গ্রাম্য জীবনযাত্রা পল্লীগ্রামের পঙ্কিল পথের মধ্যে বদ্ধ হয়ে অচল হয়ে আছে, আমাদের সন্ন্যাসীসম্প্রদায়কে সেই গোরুর গাড়ির চাকা ঠেলতে হবে-- কলের গাড়ির চালক হবার দুরাশা এখন থাক্‌।-- ক'টা বাজল শ্রীশবাবু।

 

শ্রীশ।

সাড়ে আটটা বেজে গেছে।

 

চন্দ্রবাবু।

তা হলে আমি যাই। কিন্তু এই কথা রইল, আমাদের এখন অন্য-সমস্ত আলোচনা ছেড়ে নিয়মিত শিক্ষাকার্যে প্রবৃত্ত হতে হবে এবং--

 

পূর্ণ।

আপনি যদি একটু বসেন চন্দ্রবাবু, তা হলে আমার দুই-একটা কথা বলবার আছে।

 

চন্দ্রবাবু।

না, আজ আর সময় নেই--

 

পূর্ণ।

বেশি কিছু নয়, আমি বলছিলুম আমাদের সভা--

 

চন্দ্রবাবু।

সে কথা কাল হবে পূর্ণবাবু।

 

পূর্ণ।

কিন্তু কালই তো সভা বসছে--

 

চন্দ্রবাবু।

আচ্ছা, তা হলে পরশু। আমার সময় নেই--

 

পূর্ণ।

দেখুন, অক্ষয়বাবু যে--

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণবাবু, আমাকে মাপ করতে হবে, আজ দেরি হয়ে গেছে।-- কিন্তু দেখো, আমার একটা কথা মনে হচ্ছিল যে, চিরকুমার-সভা যদি ক্রমে বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ে তা হলে আমাদের সকল সভ্যই কিছু সন্ন্যাসী হয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন না, অতএব ওর মধ্যে দুটি বিভাগ রাখা দরকার হবে--

 

পূর্ণ।

স্থাবর এবং জঙ্গম।

 

চন্দ্রবাবু।

তা সে যে নামই দাও। তা ছাড়া অক্ষয়বাবু সেদিন একটি কথা যা বললেন সেও আমার মন্দ লাগল না। তিনি বলেন, চিরকুমার-সভার সংস্রবে আর-একটি সভা রাখা উচিত যাতে বিবাহিত এবং বিবাহ-সংকল্পিত লোকদের নেওয়া যেতে পারে। গৃহী লোকদেরও তো দেশের প্রতি কর্তব্য আছে। সকলেরই সাধ্যমত কোনো-না-কোনো হিতকর কাজে নিযুক্ত থাকতে হবে-- এইটে হচ্ছে সাধারণ ব্রত। আমাদের এক- দল কুমারব্রত ধারণ করে দেশে দেশে বিচরণ করবেন, একদল কুমারব্রত ধারণ করে এক জায়গায় স্থায়ী হয়ে বসে কাজ করবেন, আর-এক দল গৃহী নিজ নিজ রুচি ও সাধ্য-অনুসারে একটা কোনো প্রয়োজনীয় কাজ অবলম্বন করে দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করবেন। যাঁরা পর্যটক-সম্প্রদায়ভুক্ত হবেন তাঁদের ম্যাপ-প্রস্তুত, জরিপ, ভূতত্ত্ববিদ্যা, উদ্ভিদ্‌বিদ্যা, প্রাণীতত্ত্ব প্রভৃতি শিখতে হবে; তাঁরা যে দেশে যাবেন সেখানকার সমস্ত তথ্য তন্ন তন্ন করে সংগ্রহ করবেন-- তা হলেই ভারতবর্ষীয়ের দ্বারা ভারতবর্ষের যথার্থ বিবরণ লিপিবদ্ধ হবার ভিত্তি স্থাপিত হতে পারবে, হন্টার সাহেবের উপরেই নির্ভর করে কাটাতে হবে না--

 

পূর্ণ।

চন্দ্রবাবু, যদি বসেন তা হলে একটা কথা--

 

চন্দ্রবাবু।

না, আমি বলছিলুম, যেখানে যেখানে যাব সেখানকার ঐতিহাসিক জনশ্রুতি এবং পুরাতন পুঁথি সংগ্রহ করা আমাদের কাজ হবে; শিলালিপি তাম্রশাসন এগুলোও সন্ধান করতে হবে-- অতএব প্রাচীন-লিপি-পরিচয়টাও আমাদের কিছুদিন অভ্যাস করা আবশ্যক।

 

পূর্ণ।

সে-সব তো পরের কথা, আপাতত--

 

চন্দ্রবাবু।

না না, আমি বলছি নে সকলকেই সব বিদ্যা শিখতে হবে, তা হলে কোনো কালে শেষ হবে না। অভিরুচি-অনুসারে ওর মধ্যে আমরা কেউ-বা একটা কেউ-বা দুটো-তিনটে শিক্ষা করব--

 

শ্রীশ।

কিন্তু, তা হলেও--

 

চন্দ্রবাবু।

ধরো, পাঁচ বছর। পাঁচ বছরে আমরা প্রস্তুত হয়ে বেরোতে পারব। যারা চিরজীবনের ব্রত গ্রহণ করবে, পাঁচ বছর তাদের পক্ষে কিছুই নয়। তা ছাড়া এই পাঁচ বছরেই আমাদের পরীক্ষা হয়ে যাবে; যাঁরা টিঁকে থাকতে পারবেন তাঁদের সম্বন্ধে আর কোনো সন্দেহ থাকবে না।

 

পূর্ণ।

কিন্তু দেখুন, আমাদের সভাটা যে স্থানান্তর করা হচ্ছে--

 

চন্দ্রবাবু।

না পূর্ণবাবু, আজ আর কিছুতেই না, আমার অত্যন্ত জরুরি কাজ আছে। পূর্ণবাবু, আমার কথাগুলো ভালো করে চিন্তা করে দেখো। আপাতত মনে হতে পারে অসাধ্য, কিন্তু তা নয়। দুঃসাধ্য বটে-- তা, ভালো কাজ মাত্রই দুঃসাধ্য। আমরা যদি পাঁচটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ লোক পাই তা হলে আমরা যা কাজ করব তা চিরকালের জন্য ভারতবর্ষকে আচ্ছন্ন করে দেবে।

 

শ্রীশ।

কিন্তু, আপনি যে বলছিলেন গোরুর গাড়ির চাকা প্রভৃতি ছোটো ছোটো জিনিস--

 

চন্দ্রবাবু।

ঠিক কথা, আমি তাকেও ছোটো মনে করে উপেক্ষা করি নে এবং বড়ো কাজকেও অসাধ্য জ্ঞান করে ভয় করি নে--

 

পূর্ণ।

কিন্তু, সভার অধিবেশন সম্বন্ধেও--

 

চন্দ্রবাবু।

সে-সব কথা কাল হবে পূর্ণবাবু। আজ তবে চললুম।

 

[ প্রস্থান

 

বিপিন।

ভাই শ্রীশ, চুপচাপ যে। এক মাতালের মাতলামি দেখে অন্য মাতালের নেশা ছুটে যায়। চন্দ্রবাবুর উৎসাহে তোমাকে সুদ্ধ দমিয়ে দিয়েছে।

 

শ্রীশ।

না হে, অনেক ভাববার কথা আছে। উৎসাহ কি সব সময়ে কেবল বকাবকি করে। কখনো বা একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে থাকে, সেইটেই হল সাংঘাতিক অবস্থা।

 

বিপিন।

পূর্ণবাবু, হঠাৎ পালাচ্ছ যে?

 

পূর্ণ।

সভাপতিমশায়কে রাস্তায় ধরতে যাচ্ছি, পথে যেতে যেতে যদি দৈবাৎ আমার দুটো-একটা কথায় কর্ণপাত করেন।

 

বিপিন।

ঠিক উল্টো হবে। তাঁর যে-ক'টা কথা বাকি আছে সেইগুলো তোমাকে শোনাতে শোনাতে কোথায় যাবার আছে সে কথা ভুলেই যাবেন।

 

বনমালীর প্রবেশ

 

বনমালী।

ভালো আছেন শ্রীশবাবু? বিপিনবাবু, ভালো তো? এই-যে পূর্ণবাবুও আছেন দেখছি। তা, বেশ হয়েছে। আমি অনেক ব'লে ক'য়ে সেই কুমারটুলির পাত্রী দুটিকে ঠেকিয়ে রেখেছি।

 

শ্রীশ।

কিন্তু আমাদের আর ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন না। আমরা একটা গুরুতর কিছু করে ফেলব।

 

পূর্ণ।

আপনারা বসুন শ্রীশবাবু। আমার একটা কাজ আছে।

 

বিপিন।

তার চেয়ে আপনি বসুন পূর্ণবাবু। আপনার কাজটা আমরা দুজনে মিলে সেরে দিয়ে আসছি।

 

পূর্ণ।

তার চেয়ে তিন জনে মিলে সারাই তো ভালো।

 

বনমালী।

আপনারা ব্যস্ত হচ্ছেন দেখছি|। আচ্ছা, তা আর-এক সময় আসব।

 

তৃতীয় দৃশ্য


চন্দ্রবাবুর বাড়ি

 

চন্দ্রমাধববাবু, নির্মলা

 

চন্দ্রবাবু।

নির্মল।

 

নির্মলা।

কী মামা।

 

চন্দ্রবাবু।

নির্মল, আমার গলার বোতামটা খুঁজে পাচ্ছি নে।

 

নির্মলা।

বোধ হয় ঐখানেই কোথাও আছে।

 

চন্দ্রবাবু।

(নিশ্চিন্তভাবে) একবার খুঁজে দেখো তো ফেনি।

 

নির্মলা।

তুমি কোথায় কী ফেল আমি কি খুঁজে বের করতে পারি!

 

চন্দ্রবাবু।

(মনে একটুখানি সন্দেহের সঞ্চার হওয়ায়, স্নিগ্ধকণ্ঠে) তুমিই তো পার নির্মল। আমার সমস্ত ত্রুটি সম্বন্ধে এত ধৈর্য আর কার আছে?

 

নির্মলার রুদ্ধ অভিমান চন্দ্রবাবুর স্নেহস্বরে অকস্মাৎ অশ্রুজলে বিগলিত হইবার উপক্রম করিল-- নিঃশব্দে সম্বরণ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। তাহাকে নিরুত্তর দেখিয়া চন্দ্রমাধববাবু নির্মলার কাছে আসিলেন। নির্মলার মুখখানি দুই আঙুল দিয়া তুলিয়া ধরিয়া ক্ষণকাল দেখিলেন

 

(মৃদুহাস্যে) নির্মল আকাশে একটুখানি মালিন্য দেখছি যেন। কী হয়েছে বলো দেখি।

 

নির্মলা।

(ক্ষুব্ধস্বরে) এতদিন পরে আমাকে তোমাদের চিরকুমার-সভা থেকে বিদায় দিচ্ছ কেন। আমি কী করেছি।

 

চন্দ্রবাবু।

(আশ্চর্য হইয়া) চিরকুমার-সভা থেকে তোমাকে বিদায়? তোমার সঙ্গে সে সভার যোগ কী।

 

নির্মলা।

দরজার আড়ালে থাকলে বুঝি যোগ থাকে না? অন্তত সেই যতটুকু যোগ তাই বা কেন যাবে।

 

চন্দ্রবাবু।

নির্মল, তুমি তো এ সভার কাজ করবে না, যারা কাজ করবে তাদের সুবিধার প্রতি লক্ষ রেখেই--

 

নির্মলা।

আমি কেন কাজ করব না। তোমার ভাগ্নে না হয়ে ভাগ্নী হয়ে জন্মেছি বলেই কি তোমাদের হিতকার্যে যোগ দিতে পারব না। তবে আমাকে এতদিন শিক্ষা দিলে কেন। নিজের হাতে আমার সমস্ত মন প্রাণ জাগিয়ে দিয়ে শেষকালে কাজের পথ রোধ করে দাও কী বলে।

 

চন্দ্রবাবু।

নির্মল, এক সময়ে তো বিবাহ করে তোমাকে সংসারের কাজে প্রবৃত্ত হতে হবে, চিরকুমার-সভার কাজ--

 

নির্মলা।

বিবাহ আমি করব না।

 

চন্দ্রবাবু।

তবে কী করবে বলো।

 

নির্মলা।

দেশের কাজে তোমায় সাহায্য করব।

 

চন্দ্রবাবু।

আমরা তো সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়েছি।

 

নির্মলা।

ভারতবর্ষে কি কেউ কখনো সন্ন্যাসিনী হয় নি।

 

চন্দ্রমাধববাবু নিরুত্তর হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন

 

মামা, যদি কোনো মেয়ে তোমাদের ব্রত-গ্রহণের জন্যে অন্তরের সঙ্গে প্রস্তুত হয় তবে প্রকাশ্যভাবে তোমাদের সভার মধ্যে কেন তাকে গ্রহণ করবে না। আমি তোমাদের কৌমার্যসভার কেন সভ্য না হব।

 

চন্দ্রবাবু।

(দ্বিধাকুণ্ঠিতভাবে) অন্য যাঁরা সভ্য আছেন--

 

নির্মলা।

যাঁরা সভ্য আছেন, যাঁরা ভারতবর্ষের হিতব্রত নেবেন, যাঁরা সন্ন্যাসী হতে যাচ্ছেন, তাঁরা কি একজন ব্রতধারিণী স্ত্রীলোককে অসংকোচে নিজের দলে গ্রহণ করতে পারবেন না। তা যদি হয় তা হলে তাঁরা গৃহী হয়ে ঘরে রুদ্ধ থাকুন, তাঁদের দ্বারা কোনো কাজ হবে না।

 

চন্দ্রমাধববাবু চুলগুলোর মধ্যে ঘন ঘন পাঁচ আঙুল চালাইয়া অত্যন্ত উষ্কখুষ্ক করিয়া তুলিলেন এমন সময় হঠাৎ তাঁহার আস্তিনের ভিতর হইতে হারানো বোতামটা মাটিতে পড়িয়া গেল নির্মলা হাসিতে হাসিতে কুড়াইয়া লইয়া চন্দ্রমাধববাবুর কামিজের গলায় লাগাইয়া দিল-- চন্দ্রমাধববাবু তাহার কোনো খবর লইলেন না-- চুলের মধ্যে

 

অঙ্গুলিচালনা করিতে করিতে মস্তিষ্ককুলায়ের চিন্তাগুলিকে বিব্রত

 

করিতে লাগিলেন।

 

[ নির্মলার প্রস্থান

 

পূর্ণবাবুর প্রবেশ

 

পূর্ণ।

চন্দ্রবাবু, সে কথাটা কি ভেবে দেখলেন। আমাদের সভাটিকে স্থানান্তর করা আমার বিবেচনায় ভালো হচ্ছে না।

 

চন্দ্রবাবু।

আজ আর-একটি কথা উঠেছে, সেটা পূর্ণবাবু তোমার সঙ্গে ভালো করে আলোচনা করতে ইচ্ছা করি। আমার একটি ভাগ্নী আছেন বোধ হয় জান?

 

পূর্ণ।

(নিরীহভাবে) আপনার ভাগ্নী?

 

চন্দ্রবাবু।

হাঁ, তাঁর নাম নির্মলা। আমাদের চিরকুমার-সভার সঙ্গে তার হৃদয়ের খুব যোগ আছে।

 

পূর্ণ।

(বিস্মিতভাবে) বলেন কী।

 

চন্দ্রবাবু।

আমার বিশ্বাস, তাঁর অনুরাগ এবং উৎসাহ আমাদের কারো চেয়ে কম নয়।

 

পূর্ণ।

(উত্তেজিতভাবে) এ কথা শুনলে আমাদের উৎসাহ বেড়ে ওঠে। স্ত্রীলোক হয়ে তিনি--

 

চন্দ্রবাবু।

আমিও সেই কথা ভাবছি, স্ত্রীলোকের সরল উৎসাহ পুরুষের উৎসাহে যেন নূতন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে-- আমি নিজেই সেটা আজ অনুভব করছি।

 

পূর্ণ।

(আবেগপূর্ণভাবে) আমিও সেটা বেশ অনুমান করতে পারি।

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণবাবু, তোমারও কি ঐ মত।

 

পূর্ণ।

কী মত বলছেন?

 

চন্দ্রবাবু।

অর্থাৎ, যথার্থ অনুরাগী স্ত্রীলোক আমাদের কঠিন কর্তব্যের বাধা না হয়ে যথার্থ সহায় হতে পারেন।

 

পূর্ণ।

(নেপথ্যের প্রতি লক্ষ করিয়া উচ্চকণ্ঠে) সে বিষয়ে আমার লেশমাত্র সন্দেহ নেই। স্ত্রীজাতির অনুরাগ পুরুষের অনুরাগের একমাত্র সজীব নির্ভর, তাঁদের উৎসাহে আমাদের উদ্দীপনা। পুরুষের উৎসাহকে নবজাত শিশুটির মতো মানুষ করে তুলতে পারে কেবল স্ত্রীলোকের উৎসাহ।

 

শ্রীশ ও বিপিনের প্রবেশ

 

শ্রীশ।

তা তো পারে পূর্ণবাবু, কিন্তু, সেই উৎসাহের অভাবেই কি আজ সভায় যেতে বিলম্ব হচ্ছে।

 

চন্দ্রবাবু।

না না, দেরি হবার কারণ, আমার গলার বোতামটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি নে।

 

শ্রীশ।

গলায় তো একটা বোতাম লাগানো রয়েছে দেখতে পাচ্ছি, আরো কি প্রয়োজন আছে। যদি-বা থাকে, আর ছিদ্র পাবেন কোথা।

 

চন্দ্রবাবু।

(গলায় হাত দিয়া) তাই তো!-- আমরা সকলেই তো উপস্থিত আছি, এখন সেই কথাটার আলোচনা হয়ে যাওয়া ভালো, কী বল পূর্ণবাবু।

 

পূর্ণ।

সে বেশ কথা, কিন্তু এ দিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে না?

 

চন্দ্রবাবু।

না, এখনো সময় আছে। শ্রীশবাবু, তোমরা একটু বোসো-না, কথাটা একটু স্থির হয়ে ভেবে দেখবার যোগ্য। আমার একটি ভাগ্নী আছেন, তাঁর নাম নির্মলা--

 

পূর্ণ হঠাৎ কাশিয়া লাল হইয়া উঠিল

 

আমাদের কুমার-সভার সমস্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে তাঁর একান্ত মনের মিল।

 

শ্রীশ এবং বিপিন অবিচলিত নিরুৎসুকভাবে শুনিয়া যাইতে লাগিল

 

এ কথা আমি নিশ্চয় বলতে পারি, তাঁর উৎসাহ আমাদের কারো চেয়ে কম নয়।

 

শ্রীশ ও বিপিনের কাছ হইতে কিছুমাত্র সাড়া না পাইয়া

 

চন্দ্রবাবুও মনে মনে একটু উত্তেজিত হইতেছিলেন

 

এ কথা আমি ভালোরূপ বিবেচনা করে দেখে স্থির করেছি, স্ত্রীলোকের উৎসাহ পুরুষের সমস্ত বৃহৎ কার্যের মহৎ অবলম্বন। কী বল পূর্ণবাবু?

 

পূর্ণ।

(নিস্তেজভাবে) তা তো বটেই।

 

চন্দ্রবাবু।

(হঠাৎ সবেগে) নির্মলা যদি কুমার-সভার সভ্য হবার জন্য প্রার্থী থাকে, তা হলে তাকে আমরা সভ্য না করব কেন।

 

পূর্ণ।

বলেন কী চন্দ্রবাবু।

 

শ্রীশ।

আমরা কখনো কল্পনা করি নি যে, কোনো স্ত্রীলোক আমাদের সভার সভ্য হতে ইচ্ছা প্রকাশ করবেন, সুতরাং এ সম্বন্ধে আমাদের কোনো নিয়ম নেই--

 

বিপিন।

নিষেধও নেই।

 

শ্রীশ।

স্পষ্ট নিষেধ না থাকতে পারে কিন্তু আমাদের সভার যে-সকল উদ্দেশ্য তা স্ত্রীলোকের দ্বারা সাধিত হবার নয়।

 

বিপিন।

আমাদের সভার উদ্দেশ্য সংকীর্ণ নয়, এবং বৃহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে গেলে বিচিত্র শ্রেণীর ও বিচিত্র শক্তির লোকের বিচিত্র চেষ্টায় প্রবৃত্ত হওয়া চাই। স্বদেশের হিতসাধন একজন স্ত্রীলোক যেরকম পারবেন তুমি সেরকম পারবে না, এবং তুমি যেরকম পারবে একজন স্ত্রীলোক সেরকম পারবেন না-- অতএব সভার উদ্দেশ্যকে সর্বাঙ্গসম্পূর্ণভাবে সাধন করতে গেলে তোমারও যেমন দরকার স্ত্রীসভ্যেরও তেমনি দরকার।

 

শ্রীশ।

যারা কাজ করতে চায় না তারাই উদ্দেশ্যকে ফলাও করে তোলে। যথার্থ কাজ করতে গেলেই লক্ষ্যকে সীমাবদ্ধ করতে হয়। আমাদের সভার উদ্দেশ্যকে যত বৃহৎ মনে করে তুমি বেশ নিশ্চিন্ত আছ আমি তত বৃহৎ মনে করি নে।

 

বিপিন।

আমাদের সভার কার্যক্ষেত্র অন্তত এতটা বৃহৎ যে তোমাকে গ্রহণ করেছে বলে আমাকে পরিত্যাগ করতে হয় নি এবং আমাকে গ্রহণ করেছে বলে তোমাকে পরিত্যাগ করতে হয় নি। তোমার আমার উভয়েরই যদি এখানে স্থান হয়ে থাকে, আমাদের দুজনেরই যদি এখানে উপযোগিতা ও আবশ্যকতা থাকে, তা হলে আরো একজন ভিন্ন প্রকৃতির লোকের এখানে স্থান হওয়া এমন কী কঠিন।

 

শ্রীশ।

উদারতা অতি উত্তম জিনিস, সে আমি নীতিশাস্ত্রে পড়েছি। আমি তোমার সেই উদারতাকে নষ্ট করতে চাই নে, বিভক্ত করতে চাই মাত্র। স্ত্রীলোকেরা যে কাজ করতে পারেন তার জন্যে তাঁরা স্বতন্ত্র সভা করুন, আমরা তার সভ্য হবার প্রার্থী হব না, এবং আমাদের সভাও আমাদেরই থাক্‌। নইলে আমরা পরস্পরের কাজের বাধা হব মাত্র। মাথাটা চিন্তা করে মরুক, উদরটা পরিপাক করতে থাক-- পাকযন্ত্রটি মাথার মধ্যে এবং মস্তিষ্কটি পেটের মধ্যে প্রবেশচেষ্টা না করলেই বস্‌।

 

বিপিন।

কিন্তু তাই বলে মাথাটা ছিন্ন করে এক জায়গায় এবং পাকযন্ত্রটাকে আর-এক জায়গায় রাখলেও কাজের সুবিধা হয় না।

 

শ্রীশ।

(অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া) উপমা তো আর যুক্তি নয় যে সেটাকে খণ্ডন করলেই আমার কথাটাকে খণ্ডন করা হল। উপমা কেবল খানিক দূর পর্যন্ত খাটে--

 

বিপিন।

অর্থাৎ, যতটুকু কেবল তোমার যুক্তির পক্ষে খাটে।

 

পূর্ণ।

(অত্যন্ত বিমনা হইয়া) বিপিনবাবু, আমার মত এই যে, আমাদের এই-সকল কাজে মেয়েরা অগ্রসর হয়ে এলে তাতে তাঁদের মাধুর্য নষ্ট হয়।

 

চন্দ্রবাবু।

(একখানা বই চক্ষের অত্যন্ত কাছে ধরিয়া) মহৎ কার্যে যে মাধুর্য নষ্ট হয় সে মাধুর্য সযত্নে রক্ষা করবার যোগ্য নয়।

 

শ্রীশ।

না চন্দ্রবাবু, আমি ও-সব সৌন্দর্য-মাধুর্যের কথা আনছিই নে। সৈন্যদের মতো এক চালে আমাদের চলতে হবে, অনভ্যাস বা স্বাভাবিক দুর্বলতা বশত যাঁদের পিছিয়ে পড়বার সম্ভাবনা আছে তাঁদের নিয়ে ভারগ্রস্ত হলে আমাদের সমস্তই ব্যর্থ হবে।

 

এমন সময় নির্মলা অকুণ্ঠিত মর্যাদার সহিত গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল হঠাৎ সকলেই স্তম্ভিত হইয়া গেল। অশ্রুপূর্ণ ক্ষোভে তাহার কণ্ঠস্বর আর্দ্র

 

নির্মলা।

আপনাদের কী উদ্দেশ্য এবং আপনারা দেশের কাজে কত দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত আছেন তা আমি কিছুই জানি নে, কিন্তু আমি আমার মামাকে জানি-- তিনি যে পথে যাত্রা করে চলেছেন আপনারা কেন আমাকে সে পথে তাঁর অনুসরণ করতে বাধা দিচ্ছেন।

 

শ্রীশ নিরুত্তর, পূর্ণ কুণ্ঠিত-অনুতপ্ত, বিপিন প্রশান্ত-গম্ভীর, চন্দ্রবাবু সুগভীর চিন্তামগ্ন

 

নির্মলা।

(পূর্ণ এবং শ্রীশের প্রতি অশ্রুজলস্নাত কটাক্ষপাত করিয়া) আমি যদি কাজ করতে চাই, যিনি আমার আশৈশবের গুরু, মৃত্যু পর্যন্ত যদি সকল শুভচেষ্টায় তাঁর অনুবর্তিনী হতে ইচ্ছা করি, আপনারা কেবল তর্ক করে আমার অযোগ্যতা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন কেন। আপনারা আমাকে কী জানেন।

 

শ্রীশ স্তব্ধ। পূর্ণ ঘর্মাক্ত

 

নির্মলা।

আমি আপনাদের কুমার-সভা বা অন্য কোনো সভা জানি নে, কিন্তু যাঁর শিক্ষায় আমি মানুষ হয়েছি তিনি যখন কুমার-সভাকে অবলম্বন করেই তাঁর জীবনের সমস্ত উদ্দেশ্য-সাধনে প্রবৃত্ত হয়েছেন, তখন এই কুমার-সভা থেকে আপনারা আমাকে দূরে রাখতে পারবেন না। (চন্দ্রবাবুর দিকে ফিরিয়া) তুমি যদি বল আমি তোমার কাজের যোগ্য নই তা হলে আমি বিদায় হব, কিন্তু এঁরা আমাকে কী জানেন। এঁরা কেন আমাকে তোমার অনুষ্ঠান থেকে বিচ্ছিন্ন করবার জন্যে সকলে মিলে তর্ক করছেন।

 

শ্রীশ।

(বিনীত মৃদুস্বরে) মাপ করবেন, আমি আপনার সম্বন্ধে কোনো তর্ক করি নি, আমি সাধারণত স্ত্রীজাতি সম্বন্ধেই বলছিলুম।

 

নির্মলা।

আমি স্ত্রীজাতি পুরুষজাতির প্রভেদ নিয়ে কোনো বিচার করতে চাই নে-- আমি নিজের অন্তঃকরণ জানি এবং যাঁর উন্নত দৃষ্টান্তকে আশ্রয় করে রয়েছি তাঁর অন্তঃকরণ জানি, কাজে প্রবৃত্ত হতে এর বেশি আমার আর-কিছু জানবার দরকার নেই।

 

চন্দ্রবাবু নিজের দক্ষিণ করতল চোখের অত্যন্ত কাছে লইয়া নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতে লাগিলেন

 

পূর্ণ খুব চমৎকার করিয়া একটা- কিছু বলিবার ইচ্ছা করিল-- কিন্তু তাহার মুখ দিয়া কোনো কথাই বাহির হইল না

 

পূর্ণ।

(মনে মনে অনেক আবৃত্তি করিয়া) দেবী, এই পঙ্কিল পৃথিবীর কাজে কেন আপনার পবিত্র দুইখানি হস্ত প্রয়োগ করতে চাচ্ছেন।

 

কথাটা মনে যেমন লাগিতেছিল মুখে তেমন শোনাইল না, পূর্ণ বলিয়াই বুঝিতে পারিল কথাটা গদ্যের মধ্যে পদ্যের মতো কিছু যেন বাড়াবাড়ি হইয়া পড়িল--

 

লজ্জায় তাহার কান লাল হইয়া উঠিল

 

বিপিন।

(স্বাভাবিক সুগম্ভীর শান্ত স্বরে) পৃথিবী যত বেশি পঙ্কিল পৃথিবীর সংশোধনকার্য তত বেশি পবিত্র।

 

শ্রীশ।

সভার অধিবেশনে স্ত্রীসভ্য লওয়া সম্বন্ধে নিয়মমত প্রস্তাব উত্থাপন করে যা স্থির হয় আপনাকে জানাব।

 

নির্মলা একমুহূর্ত অপেক্ষা না করিয়া নিঃশব্দে চলিয়া যাইবার উপক্রম করিল

 

চন্দ্র।

(হঠাৎ) ফেনি, আমার সেই গলার বোতামটা?

 

নির্মলা।

(সলজ্জ হাসিয়া মৃদুকণ্ঠে) গলাতেই আছে।

 

চন্দ্র।

(গলায় হাত দিয়া) হাঁ হাঁ, আছে বটে।

 

তিন ছাত্রের দিকে চাহিয়া হাসিলেন

 

চতুর্থ দৃশ্য


অক্ষয়ের বাসা

 

নৃপবালা ও নীরবালা

 

নৃপবালা।

আজকাল তুই মাঝে মাঝে কেন অমন গম্ভীর হচ্ছিস বল্‌ তো নীরু।

 

নীরবালা।

আমাদের বাড়ির যত কিছু গাম্ভীর্য সব বুঝি তোর একলার? আমার খুশি আমি গম্ভীর হব।

 

নৃপবালা।

তুই কী ভাবছিস আমি বেশ জানি।

 

নীরবালা।

তোর অত আন্দাজ করবার দরকার কী ভাই। এখন তোর নিজের ভাবনা ভাববার সময় হয়েছে।

 

নৃপবালা।

(নীরর গলা জড়াইয়া) তুই ভাবছিস, মাগো মা, আমরা কী জঞ্জাল-- আমাদের বিদায় করে দিতেও এত ভাবনা এত ঝঞ্ঝাট।

 

নীরবালা।

তা, আমরা তো ভাই, ফেলে দেবার জিনিস নয় যে অমনি ছেড়ে দিলেই হল। আমাদের জন্যে যে এতটা হাঙ্গামা হচ্ছে সে তো গৌরবের কথা। কুমারসম্ভবে তো পড়েছিস গৌরীর বিয়ের জন্য একটি আস্ত দেবতা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। যদি কোনো কবির কানে ওঠে তা হলে আমাদের বিবাহের একটা বর্ণনা বেরিয়ে যাবে।

 

নৃপবালা।

না ভাই, আমার ভারি লজ্জা করছে।

 

নীরবালা।

আর, আমার বুঝি লজ্জা করছে না? আমি বুঝি বেহায়া? কিন্তু কী করবি বল্‌। ইস্কুলে যেদিন প্রাইজ নিতে গিয়েছিলুম লজ্জা করেছিল, আবার তার পরবছরেও প্রাইজ নেবার জন্যে রাত জেগে পড়া মুখস্থ করেছিলেম। লজ্জাও করে, প্রাইজও ছাড়ি নে, আমার এই স্বভাব।

 

নৃপবালা।

আচ্ছা নীরু, এবারে যে প্রাইজটার কথা চলছে সেটার জন্যে তুই কি খুব ব্যস্ত হয়েছিস।

 

নীরবালা।

কোন্‌টা বল্‌ দেখি। চিরকুমার-সভার দুটো সভ্য?

 

নৃপবালা।

যেই হোক-না কেন, তুই তো বুঝতে পারছিস।

 

নীরবালা।

তা ভাই সত্যি কথা বলব? (নৃপর গলা জড়াইয়া কানে কানে) শুনেছি কুমার-সভার দুটি সভ্যের মধ্যে খুব ভাব, আমরা যদি দুজনে দুই বন্ধুর হাতে পড়ি তা হলে বিয়ে হয়েও আমাদের ছাড়াছাড়ি হবে না-- নইলে আমরা কে কোথায় চলে যাব তার ঠিক নেই। তাই তো সেই যুগল দেবতার জন্যে এত পূজার আয়োজন করছি ভাই। জোড়হস্তে মনে মনে বলছি, হে কুমার-সভার অশ্বিনীকুমারযুগল, আমাদের দুটি বোনকে এক বোঁটার দুই ফুলের মতো তোমরা একসঙ্গে গ্রহণ করো।

 

বিরহসম্ভাবনার উল্লেখমাত্রে দুই ভগিনী পরস্পরকে জড়াইয়া ধরিল

 

এবং নৃপ কোনোমতে চোখের জল সামলাইতে পারিল না

 

নৃপবালা।

আচ্ছা নীরু, মেজদিদিকে কেমন করে ছেড়ে যাবি বল্‌ দেখি। আমরা দুজনে গেলে ওঁর আর কে থাকবে।

 

নীরবালা।

সে কথা অনেক ভেবেছি। থাকতে যদি দেন তা হলে কি ছেড়ে যাই। ভাই, ওঁর তো স্বামী নেই, আমাদেরও নাহয় স্বামী না রইল। মেজদিদির চেয়ে বেশি সুখে আমাদের দরকার কী।

 

পুরুষবেশধারিণী শৈলবালার প্রবেশ

 

নীরবালা।

(টেবিলের উপরিস্থিত থালা হইতে একটি ফুলের মালা তুলিয়া লইয়া শৈলবালার গলায় পরাইয়া) আমরা দুই স্বয়ম্বরা তোমাকে আমাদের পতিরূপে বরণ করলুম।

 

শৈলবালাকে প্রণাম করিল

 

শৈলবালা।

ও আবার কী।

 

নীরবালা।

ভয় নেই ভাই, আমরা দুই সতিনে তোমাকে নিয়ে ঝগড়া করব না। যদি করি মেজদিদি আমার সঙ্গে পারবে না-- আমি একলাই মিটিয়ে নিতে পারব, তোমাকে কষ্ট পেতে হবে না। না, সত্যি বলছি মেজদিদি, তোমার কাছে আমরা যেমন আদরে আছি এমন আদর কি আর কোথাও পাব। কেন তবে আমাদের পরের গলায় দিতে চাস।

 

নৃপর দুই চক্ষু বাহিয়া ঝর্‌ ঝর্‌ করিয়া জল পড়িতে লাগিল

 

শৈলবালা।

(তাহার চোখ মুছিয়া দিয়া) ও কী ও নৃপ, ছি। তোদের কিসে সুখ তা কি তোরা জানিস। আমাকে নিয়ে যদি তোদের জীবন সার্থক হত তা হলে কি আমি আর-কারো হাতে তোদের দিতে পারতুম।

 

রসিকের প্রবেশ

 

রসিক।

ভাই, আমার মতো অসভ্যটাকে তোরা সভ্য করলি-- আজ তো সভা এখানে বসবে, কিরকম করে চলব শিখিয়ে দে।

 

নীরবালা।

ফের পুরোনো ঠাট্টা? তোমার ঐ সভ্য-অসভ্যর কথাটা এই পরশু থেকে বলছ।

 

রসিক।

যাকে জন্ম দেওয়া যায় তার প্রতি মমতা হয় না? ঠাট্টা একবার মুখ থেকে বের হলেই কি রাজপুতের কন্যার মতো তাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে হবে। হয়েছে কী, যতদিন চিরকুমার-সভা টিঁকে থাকবে এই ঠাট্টা তোদের দু বেলা শুনতে হবে।

 

নীরবালা।

তবে ওটাকে তো একটু সকাল-সকাল সেরে ফেলতে হচ্ছে। মেজদিদি ভাই, আর দয়ামায়া নয়-- রসিকদাদার রসিকতাকে পুরোনো হতে দেব না, চিরকুমার-সভার চিরত্ব আমরা অচিরে ঘুচিয়ে দেব। তবেই তো আমাদের বিশ্ববিজয়িনী নারী নাম সার্থক হবে। কিরকম করে আক্রমণ করতে হবে একটা কিছু প্ল্যান ঠাউরেছিস?

 

শৈলবালা।

কিছুই না। ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে যখন যেরকম মাথায় আসে।

 

নীরবালা।

আমাকে যখন দরকার হবে রণভেরী ধ্বনিত করলেই আমি হাজির হব। "আমি কি ডরাই সখী কুমার-সভারে। নাহি কি বল এ ভুজমৃণালে?'

 

অক্ষয়ের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

অদ্যকার সভায় বিদুষীমণ্ডলীকে একটি ঐতিহাসিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করি।

 

শৈলবালা।

প্রস্তুত আছি।

 

অক্ষয়।

বলো দেখি যে দুটি ডালে দাঁড়িয়েছিলেন সেই দুটি ডাল কাটতে চেয়েছিলেন কে।

 

নৃপবালা।

আমি জানি মুখুজ্জেমশায়, কালিদাস।

 

অক্ষয়।

না, আরো একজন বড়োলোক। শ্রীঅক্ষয়কুমার মুখোপাধ্যায়।

 

নীরবালা।

ডাল দুটি কে।

 

অক্ষয়।

(বামে নীরকে টানিয়া) এই একটি (দক্ষিণে নৃপকে টানিয়া আনিয়া) এই আর-একটি।

 

নীরবালা।

আর, কুড়ুল বুঝি আজ আসছে?

 

অক্ষয়।

আসছে কেন, এসেছে বললেও অত্যুক্তি হয় না। ঐ-যে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

 

দৌড় দৌড়। শৈল পালাইবার সময় রসিকদাদাকে টানিয়া লইয়া গেল

 

চুড়িবালার ঝংকার এবং ত্রস্ত পদপল্লবকয়েকটির দ্রুতপতনশব্দ সম্পূর্ণ না মিলাইতেই

 

শ্রীশ ও বিপিনের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

পূর্ণবাবু এলেন না যে?

 

শ্রীশ।

চন্দ্রবাবুর বাসায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ তাঁর শরীরটা খারাপ হয়েছে বলে আজ আর আসতে পারলেন না।

 

অক্ষয়।

(পথের দিকে চাহিয়া) একটু বসুন, আমি চন্দ্রবাবুর অপেক্ষায় দ্বারের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তিনি অন্ধ মানুষ, কোথায় যেতে কোথায় গিয়ে পড়বেন তার ঠিক নেই। কাছাকাছি এমন স্থানও আছে, যেখানে কুমার-সভার অধিবেশন কোনোমতেই প্রার্থনীয় নয়।

 

[ অক্ষয়ের প্রস্থান

 

অক্ষয় চলিয়া গেলে ঘরটি শ্রীশ ভালো করিয়া দেখিয়া লইল। ঘরে দুটি দীপ জ্বলিতেছে সেই দুটিকে বেষ্টন করিয়া ফিরোজ রঙের রেশমের অবগুণ্ঠন। সেই আবরণ ভেদ করিয়া ঘরের আলোটি মৃদু এবং রঙিন হইয়া উঠিয়াছে। টেবিলের মাঝখানে ফুলদানিতে ফুল সাজানো

 

বিপিন।

(ঈষৎ হাসিয়া) যা বল ভাই, এ ঘরটি চিরকুমার-সভার উপযুক্ত নয়।

 

শ্রীশ।

(চকিত হইয়া) কেন নয়।

 

বিপিন।

ঘরের সজ্জাগুলি তোমার নবীন সন্ন্যাসীদের পক্ষেও যেন বেশি বোধ হচ্ছে।

 

শ্রীশ।

আমার সন্ন্যাসধর্মের পক্ষে বেশি কিছু হতে পারে না।

 

বিপিন।

কেবল নারী ছাড়া।

 

শ্রীশ।

হাঁ, ঐ একটিমাত্র।

 

অন্য দিনের মতো কথাটায় তেমন জোর পৌঁছিল না

 

বিপিন।

দেয়ালের ছবি এবং অন্যান্য পাঁচরকমে এ ঘরটিতে সেই নারীজাতির অনেকগুলি পরিচয় পাওয়া যায় যেন।

 

শ্রীশ।

সংসারে নারীজাতির পরিচয় তো সর্বত্রই আছে।

 

বিপিন।

তা তো বটেই। কবিদের কথা যদি বিশ্বাস করা যায় তা হলে চাঁদে ফুলে লতায় পাতায় কোনোখানেই নারীজাতির পরিচয় থেকে হতভাগ্য পুরুষমানুষের নিষ্কৃতি পাবার জো নেই।

 

শ্রীশ।

(হাসিয়া) কেবল ভেবেছিলুম, চন্দ্রবাবুর বাসার সেই একতলার ঘরটিতে রমণীর কোনো সংস্রব ছিল না। আজ সে ভ্রমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। নাঃ, ওরা পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়েছে।

 

বিপিন।

বেচারা চিরকুমার ক'টির জন্যে একটা কোনো ফাঁক রাখে নি। সভা করবার জায়গা পাওয়াই দায়।

 

শ্রীশ।

এই দেখো-না।

 

কোণের একটা টিপাই হইতে গোটাদুয়েক চুলের কাঁটা তুলিয়া দেখাইল

 

বিপিন।

(কাঁটা দুটি লইয়া পর্যবেক্ষণ করিয়া) ওহে ভাই, এ স্থানটা তো কুমারদের পক্ষে নিষ্কণ্টক নয়।

 

শ্রীশ।

ফুলও আছে, কাঁটাও আছে।

 

বিপিন।

সেইটেই তো বিপদ। কেবল কাঁটা থাকলে এড়িয়ে চলা যায়।

 

শ্রীশ অপর কোণের ছোটো বইয়ের শেলফ হইতে বইগুলি তুলিয়া দেখিতে লাগিল-- কতকগুলি নভেল কতকগুলি ইংরাজি কাব্যসংগ্রহ। প্যাল্‌গ্রেভের গীতিকাব্যের স্বর্ণভাণ্ডার খুলিয়া দেখিল

 

মার্জিনে মেয়েলি অক্ষরে নোট লেখা-- তখন গোড়ার পাতাটা উল্টাইয়া দেখিল দেখিয়া একটু নাড়িয়া-চাড়িয়া বিপিনের সম্মুখে ধরিল

 

বিপিন।

নৃপবালা! আমার বিশ্বাস নামটি পুরুষমানুষের নয়। কী বোধ কর।

 

শ্রীশ।

আমারও সেই বিশ্বাস। এ নামটিও অন্যজাতীয় বলে ঠেকছে হে।

 

আর-একটা বই দেখাইল

 

বিপিন।

নীরবালা! এ নামটি কাব্যগ্রন্থে চলে কিন্তু কুমার-সভায়--

 

শ্রীশ।

কুমার-সভাতেও এই নামধারিণীরা যদি চলে আসেন তা হলে দ্বাররোধ করতে পারি এত বড়ো বলবান তো আমাদের মধ্যে কাউকে দেখি নে।

 

বিপিন।

পূর্ণ তো একটি আঘাতেই আহত হয়ে পড়ল, রক্ষা পায় কি না সন্দেহ।

 

শ্রীশ।

কি রকম।

 

বিপিন।

লক্ষ্য করে দেখ নি বুঝি?

 

শ্রীশ।

না না, ও তোমার অনুমান।

 

বিপিন।

হৃদয়টা তো অনুমানেরই জিনিস-- না যায় দেখা, না যায় ধরা।

 

শ্রীশ।

পূর্ণর অসুখটাও তা হলে বৈদ্যশাস্ত্রের অন্তর্গত নয়?

 

বিপিন।

না, এ-সকল ব্যাধি সম্বন্ধে মেডিকাল কলেজে কোনো লেক্‌চার চলে না।

 

শ্রীশ।

এ বাড়ির দরজায় ঢুকতেই রসিক চক্রবর্তী বলে যে বৃদ্ধ যুবকটির সঙ্গে দেখা হল তাঁকে চিরকুমার-সভার দ্বারীর উপযুক্ত বলে বোধ হল না।

 

বিপিন।

মনে হল শিবের তপোবন আগলাবার জন্য স্বয়ং পঞ্চশর নন্দীর ছদ্মবেশে এসেছেন, লোকটাকে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকছে না।

 

চন্দ্রের প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

আজকের তর্কবিতর্কের উত্তেজনায় পূর্ণবাবুর হঠাৎ শরীর খারাপ হল দেখে, আমি তাঁকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া উচিত বোধ করলুম।

 

বিপিন।

পূর্ণবাবুর যেরকম দুর্বল অবস্থা দেখছি পূর্ব হতেই তাঁর বিশেষ সাবধান হওয়া উচিত ছিল।

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণবাবুকে তো বিশেষ অসাবধান বলে বোধ হয় না।

 

অক্ষয় ও রসিকের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

মাপ করবেন। এই নবীন সভ্যটিকে আপনাদের হাতে সমর্পণ করে দিয়েই আমি চলে যাচ্ছি।

 

রসিক।

(হাসিয়া) আমার নবীনতা বাইরে থেকে বিশেষ প্রত্যক্ষগোচর নয়--

 

অক্ষয়।

অত্যন্ত বিনয়বশত সেটা বাহ্য প্রাচীনতা দিয়ে ঢেকে রেখেছেন-- ক্রমশ পরিচয় পাবেন। ইনিই হচ্ছেন সার্থকনামা শ্রীরসিক চক্রবর্তী।

 

রসিক।

পিতা আমার রসবোধ সম্বন্ধে পরিচয় পাবার পূর্বেই রসিক নাম রেখেছিলেন, এখন পিতৃসত্যপালনের জন্য আমাকে রসিকতার চেষ্টা করতে হয়, তার পরে "যত্নে কৃতে যদি ন সিধ্যতি কোহত্র দোষঃ'।

 

[ অক্ষয়ের প্রস্থান

 

পুরুষবেশী শৈলের প্রবেশ

 

শৈল আসিয়া সকলকে নমস্কার করিল। ক্ষীণদৃষ্টি চন্দ্রমাধববাবু ঝাপসাভাবে তাহাকে দেখিলেন--

 

বিপিন ও শ্রীশ তাহার দিকে চাহিয়া রহিল শৈলের পশ্চাতে দুইজন ভৃত্য কয়েকটি ভোজনপাত্র হাতে করিয়া উপস্থিত হইল শৈল ছোটো ছোটো রুপার থালাগুলি লইয়া সাদা পাথরের টেবিলের উপর সাজাইতে লাগিল

 

রসিক।

ইনি আপনাদের সভার আর-একটি নবীন সভ্য। এঁর নবীনতা সম্বন্ধে কোনো তর্ক নেই। ঠিক আমার বিপরীত। ইনি বুদ্ধির প্রবীণতা বাহ্য নবীনতা দিয়ে গোপন করে রেখেছেন। আপনারা কিছু বিস্মিত হয়েছেন দেখছি-- হবার কথা। এঁকে দেখে মনে হয় বালক, কিন্তু আমি আপনাদের কাছে জামিন রইলুম-- ইনি বালক নন।

 

চন্দ্রবাবু।

এঁর নাম?

 

রসিক।

শ্রীঅবলাকান্ত চট্টোপাধ্যায়।

 

শ্রীশ।

অবলাকান্ত?

 

রসিক।

নামটি আমাদের সভায় চলতি হবার মতো নয় স্বীকার করি। নামটির প্রতি আমারও বিশেষ মমত্ব নেই-- যদি পরিবর্তন করে বিক্রমসিংহ বা ভীমসেন বা অন্য কোনো উপযুক্ত নাম রাখেন তাতে উনি আপত্তি করবেন না। যদিচ শাস্ত্রে আছে বটে "স্বনামা পুরুষো ধন্য'-- কিন্তু উনি অবলাকান্ত নামটির দ্বারাই জগতে পৌরুষ অর্জন করতে ব্যাকুল নন।

 

শ্রীশ।

বলেন কী মশায়। নাম তো আর গায়ের বস্ত্র নয় যে, বদল করলেই হল।

 

রসিক।

ওটা আপনাদের একেলে সংস্কার শ্রীশবাবু, নামটাকে প্রাচীনেরা পোশাকের মধ্যেই গণ্য করতেন। দেখুন-না কেন, অর্জুনের পিতৃদত্ত নাম কী ঠিক করে বলা শক্ত-- পার্থ, ধনঞ্জয়, সব্যসাচী, লোকের যখন যা মুখে আসত তাই বলেই ডাকত। দেখুন, নামটাকে আপনারা বেশি সত্য মনে করবেন না; ওঁকে যদি ভুলে আপনি অবলাকান্ত না'ও বলেন উনি লাইবেলের মকদ্দমা আনবেন না।

 

শ্রীশ।

(হাসিয়া) আপনি যখন এতটা অভয় দিচ্ছেন তখন অত্যন্ত নিশ্চিন্ত হলুম-- কিন্তু ওঁর ক্ষমাগুণের পরিচয় নেবার দরকার হবে না, নাম ভুল করব না মশায়।

 

রসিক।

আপনি না করতে পারেন, কিন্তু আমি করি মশায়। উনি আমার সম্পর্কে নাতি হন; সেইজন্যে ওঁর সম্বন্ধে আমার রসনা কিছু শিথিল, যদি কখনো এক বলতে আর বলি সেটা মাপ করবেন।

 

শ্রীশ।

অবলাকান্তবাবু, আপনি এ-সমস্ত কী আয়োজন করেছেন। আমাদের সভার কার্যাবলীর মধ্যে মিষ্টান্নটা ছিল না।

 

রসিক।

(উঠিয়া) সেই ত্রুটি যিনি সংশোধন করেছেন তাঁকে সভার হয়ে ধন্যবাদ দিই।

 

শৈল।

(থালা সাজাইতে সাজাইতে) শ্রীশবাবু, আহারটাও কি আপনাদের নিয়মবিরুদ্ধ।

 

শ্রীশ।

(বিপুলায়তন বিপিনকে টানিয়া আনিয়া) এই সভ্যটির আকৃতি নিরীক্ষণ করে দেখলেই ও সম্বন্ধে কোনো সংশয় থাকবে না।

 

বিপিন।

নিয়মের কথা যদি বলেন অবলাকান্তবাবু, সংসারের শ্রেষ্ঠ জিনিস মাত্রই নিজের নিয়ম নিজেই সৃষ্টি করে; ক্ষমতাশালী লেখক নিজের নিয়মে চলে, শ্রেষ্ঠ কাব্য সমালোচকের নিয়ম মানে না। যে মিষ্টান্নগুলি সংগ্রহ করেছেন এ সম্বন্ধেও কোনো সভার নিয়ম খাটতে পারে না; এর একমাত্র নিয়ম, বসে যাওয়া এবং নিঃশেষ করা। ইনি যতক্ষণ আছেন ততক্ষণ জগতের অন্য সমস্ত নিয়মকে দ্বারের কাছে অপেক্ষা করতে হবে।

 

শ্রীশ।

তোমার হল কী বিপিন। তোমাকে খেতে দেখেছি বটে, কিন্তু এক নিশ্বাসে এত কথা কইতে শুনি নি তো।

 

বিপিন।

রসনা উত্তেজিত হয়েছে, এখন সরস বাক্য বলা আমার পক্ষে অত্যন্ত সহজ হয়েছে। যিনি আমার জীবনবৃত্তান্ত লিখবেন, হায়, এ সময়ে তিনি কোথায়?

 

রসিক।

(টাকে হাত বুলাইতে বুলাইতে) আমার দ্বারা সে কাজটা প্রত্যাশা করবেন না, আমি এত দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে পারব না।

 

নূতন ঘরের বিলাসসজ্জার মধ্যে আসিয়া চন্দ্রমাধববাবুর মনটা বিক্ষিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। তাঁহার উৎসাহস্রোত যথাপথে প্রবাহিত হইতেছিল না। তিনি ক্ষণে ক্ষণে কার্যবিবরণের খাতা ক্ষণে ক্ষণে নিজের করকোষ্ঠী অকারণে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতেছিলেন

 

শৈলবালা।

(চন্দ্রবাবুর সম্মুখে গিয়ে) সভার কার্যের যদি কিছু ব্যাঘাত করে থাকি তো মাপ করবেন চন্দ্রবাবু, কিছু জলযোগ--

 

চন্দ্রবাবু।

এ-সমস্ত সামাজিকতায় সভার কার্যের ব্যাঘাত করে, তাতে সন্দেহ নেই।

 

রসিক।

আচ্ছা, পরীক্ষা করে দেখুন, মিষ্টান্নে যদি সভার কার্য রোধ হয় তা হলে--

 

বিপিন।

(মৃদুস্বরে) তা হলে ভবিষ্যতে নাহয় সভাটা বন্ধ রেখে মিষ্টান্নটা চালালেই হবে।

 

শ্রীশ।

আসুন রসিকবাবু। আপনি উঠছেন না যে?

 

রসিক।

রোজ রোজ যেচে এবং মাঝে মাঝে কেড়ে খেয়ে থাকি, আজ চিরকুমারসভার সভ্যরূপে আপনাদের সংসর্গগৌরবে কিঞ্চিৎ উপরোধের প্রত্যাশায় ছিলুম, কিন্তু--

 

শৈলবালা।

"কিন্তু' আবার কী রসিকদাদা। তুমি যে রবিবার করে থাক, আজ তুমি কিছু খাবে নাকি।

 

রসিক।

দেখছেন মশায়! নিয়ম আর-কারো বেলায় নয়, কেবল রসিকদাদার বেলায়। নাঃ, "বলং বলং বাহুবলম্‌'। উপরোধ-অনুরোধের অপেক্ষা করা নয়।

 

বিপিন।

(চারটিমাত্র ভোজনপাত্র দেখিয়া) আপনি আমাদের সঙ্গে বসবেন না?

 

শৈলবালা।

না, আমি পরিবেশন করব।

 

শ্রীশ।

সে কি হয়।

 

শৈলবালা।

আমাকে পরিবেশন করতে দিন, খাওয়ার চেয়ে তাতে আমি ঢের বেশি খুশি হব।

 

শ্রীশ।

রসিকবাবু, এটা কি ঠিক হচ্ছে।

 

রসিক।

ভিন্নরুচির্হি লোকঃ। উনি পরিবেশন করতে ভালোবাসেন, আমরা আহার করতে ভালোবাসি, এরকম রুচিভেদে বোধ হয় পরস্পরের কিছু সুবিধা আছে।

 

সকলের আহার

 

শৈলবালা।

চন্দ্রবাবু, ওটা মিষ্টি, ওটা আগে খাবেন না, এই দিকে তরকারি আছে। জলের গ্লাস খুঁজছেন? এই-যে গ্লাস।

 

চন্দ্রবাবুর পাতে আম ছিল, তিনি সেটাকে ভালোরূপ আয়ত্ত করিতে পারিতে ছিলেন না-- অনুতপ্ত শৈল তাড়াতাড়ি তাহা কাটিয়া সহজসাধ্য করিয়া দিল। যে সময়ে যেটি আবশ্যক আস্তে আস্তে হাতের কাছে জোগাইয়া দিয়া তাঁহার ভোজনব্যাপারটি নির্বিঘ্ন করিতে লাগিল

 

চন্দ্রবাবু।

শ্রীশবাবু, স্ত্রীসভ্য নেওয়া সম্বন্ধে আপনি কিছু বিবেচনা করেছেন?

 

শ্রীশ।

ভেবে দেখতে গেলে ওতে আপত্তির কারণ বিশেষ নেই, কেবল সমাজের আপত্তির কথাটা আমি ভাবি।

 

বিপিন।

সমাজকে অনেক সময় শিশুর মতো গণ্য করা উচিত। শিশুর সমস্ত আপত্তি মেনে চললে শিশুর উন্নতি হয় না, সমাজ সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথা খাটে।

 

শ্রীশ।

আমার বোধ হয় আমাদের দেশে যে এত সভাসমিতির আয়োজন অনুষ্ঠান অকালে ব্যর্থ হয় তার প্রধান কারণ, সে-সকল কার্যে স্ত্রীলোকদের যোগ নেই। রসিকবাবু কী বলেন।

 

রসিক।

অবস্থাগতিকে যদিও স্ত্রীজাতির সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ নেই তবু এটুকু জেনেছি-- স্ত্রীজাতি হয় যোগ দেন নয় বাধা দেন, হয় সৃষ্টি নয় প্রলয়। অতএব ওঁদের দলে টেনে অন্য সুবিধা যদিবা না'ও হয় তবু বাধার হাত এড়ানো যায়। বিবেচনা করে দেখুন, চিরকুমার-সভার মধ্যে যদি স্ত্রীজাতিকে আপনারা গ্রহণ করতেন তা হলে গোপনে এই সভাটিকে নষ্ট করবার জন্যে ওঁদের উৎসাহ থাকত না, কিন্তু বর্তমান অবস্থায়--

 

শৈলবালা।

কুমার-সভার উপর স্ত্রীজাতির আক্রোশের খবর রসিকদাদা কোথায় পেলে।

 

রসিক।

বিপদের খবর না পেলে কি আর সাবধান করতে নেই। একচক্ষু হরিণ যে দিকে কানা ছিল সেই দিক থেকেই তো তীর খেয়েছিল-- কুমার-সভা যদি স্ত্রীজাতির প্রতিই কানা হন তা হলে সেই দিক থেকেই হঠাৎ ঘা খাবেন।

 

শ্রীশ।

(বিপিনের প্রতি মৃদুস্বরে) একচক্ষু হরিণ তো আজ একটা তীর খেয়েছেন, একটি সভ্য ধূলিশায়ী।

 

চন্দ্রবাবু।

কেবল পুরুষ নিয়ে যারা সমাজের ভালো করতে চায় তারা এক পায়ে চলতে চায়। সেইজন্যই খানিক দূর গিয়েই তাদের বসে পড়তে হয়। সমস্ত মহৎ চেষ্টা থেকে মেয়েদের দূরে রেখেছি বলেই আমাদের দেশের কাজে প্রাণসঞ্চার হচ্ছে না। আমাদের হৃদয়, আমাদের কাজ, আমাদের আশা বাইরে ও অন্তঃপুরে খণ্ডিত-- সেইজন্যে আমরা বাইরে গিয়ে বক্তৃতা দিই, ঘরে এসে ভুলি। দেখো অবলাকান্তবাবু, এখনো তোমার বয়স অল্প আছে, এই কথাটি ভালো করে মনে রেখো-- স্ত্রীজাতিকে অবহেলা কোরো না। স্ত্রীজাতিকে যদি আমরা নিচু করে রাখি তা হলে তাঁরাও আমাদের নীচের দিকেই আকর্ষণ করেন; তা হলে তাঁদের ভারে আমাদের উন্নতির পথে চলা অসাধ্য হয়, দু পা চলেই আবার ঘরের কোণে এসেই আবদ্ধ হয়ে পড়ি। তাঁদের যদি আমরা উচ্চে রাখি তা হলে ঘরের মধ্যে এসে নিজের আদর্শকে খর্ব করতে লজ্জাবোধ হয়। আমাদের দেশে বাইরে লজ্জা আছে, কিন্তু ঘরের মধ্যে সেই লজ্জাটি নেই, সেইজন্যেই আমাদের সমস্ত উন্নতি কেবল বাহ্যাড়ম্বরে পরিণত হয়।

 

শৈলবালা।

আশীর্বাদ করুন আপনার উপদেশ যেন ব্যর্থ না হয়, নিজেকে যেন আপনার আদর্শের উপযুক্ত করতে পারি।

 

চন্দ্রবাবু।

আমার ভাগ্নী নির্মলাকে কুমার-সভার সভ্যশ্রেণীতে ভুক্ত করতে আপনাদের কোনো আপত্তি নেই?

 

রসিক।

আর-কোনো আপত্তি নেই, কেবল একটু ব্যাকরণের আপত্তি। কুমারসভায় কেউ যদি কুমারীবেশে আসেন তা হলে বোপদেবের অভিশাপ।

 

শৈলবালা।

বোপদেবের অভিশাপ এ কালে খাটে না।

 

রসিক।

আচ্ছা, অন্তত লোহারামকে তো বাঁচিয়ে চলতে হবে? আমি তো বোধ করি, স্ত্রীসভ্যরা যদি পুরুষসভ্যদের অজ্ঞাতসারে বেশ ও নাম পরিবর্তন করে আসেন তা হলে সহজে নিষ্পত্তি হয়।

 

শ্রীশ।

তা হলে একটা কৌতুক এই হয় যে, কে স্ত্রী কে পুরুষ নিজেদের এই সন্দেহটা থেকে যায়--

 

বিপিন।

আমি বোধ হয় সন্দেহ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি।

 

রসিক।

আমাকেও বোধ হয় আমার নাতনী বলে কারো হঠাৎ আশঙ্কা না হতে পারে।

 

শ্রীশ।

কিন্তু অবলাকান্তবাবু সম্বন্ধে একটা সন্দেহ থেকে যায়।

 

শৈল অদূরবর্তী টিপাই হইতে মিষ্টান্নের থালা আনিতে প্রস্থান করিল

 

চন্দ্রবাবু।

দেখুন রসিকবাবু, ভাষাতত্ত্বে দেখা যায়, ব্যবহার করতে করতে একটা শব্দের মূল অর্থ লোপ পেয়ে বিপরীত অর্থ ঘটে থাকে। স্ত্রীসভ্য গ্রহণ করলে চিরকুমারসভার অর্থের যদি পরিবর্তন ঘটে তাতে ক্ষতি কী।

 

রসিক।

কিছু না। আমি পরিবর্তনের বিরোধী নই-- তা নামপরিবর্তন বা বেশ-পরিবর্তন যাই হোক-না কেন, যখন যা ঘটে আমি বিনা বিরোধে গ্রহণ করি বলেই আমার প্রাণটা নবীন আছে।

 

মিষ্টান্ন শেষ হইল এবং স্ত্রীসভ্য লওয়া সম্বন্ধে কাহারো আপত্তি হইল না

 

রসিক।

আশা করি সভার কাজের কোনো ব্যাঘাত হয় নি।

 

শ্রীশ।

কিছু না-- অন্যদিন কেবল মুখেরই কাজ চলত, আজ দক্ষিণ হস্তও যোগ দিয়েছে।

 

বিপিন।

তাতে আভ্যন্তরিক তৃপ্তিটা কিছু বেশি হয়েছে। আজ তা হলে এইখানেই সভা ভঙ্গ করা হোক, কারণ এর পরে আর-কোনো আলোচনা চলবে না। এ দিকে দেরিও হয়ে গেছে।

 

[ সকলের প্রস্থান

 


Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | SINGLE PAGE