Home > Plays > চিরকুমার-সভা > চিরকুমার সভা
Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | SINGLE PAGE

চিরকুমার সভা    

পঞ্চম অঙ্ক


প্রথম দৃশ্য


অক্ষয়ের বাসা

 

অক্ষয় ও পুরবালা

 

অক্ষয়।

দেবী, যদি অভয় দাও তো একটি প্রশ্ন আছে।

 

পুরবালা।

কী শুনি।

 

অক্ষয়।

শ্রীঅঙ্গে কৃশতার তো কোনো লক্ষণ দেখছি নে!

 

পুরবালা।

শ্রীঅঙ্গ তো কৃশ হবার জন্যে পশ্চিমে বেড়াতে যায় নি।

 

অক্ষয়।

তবে কি বিরহবেদনা বলে জিনিসটা মহাকবি কালিদাসের সঙ্গে সহমরণে মরেছে।

 

পুরবালা।

তার প্রমাণ তুমি। তোমারও তো স্বাস্থ্যের বিশেষ ব্যাঘাত হয় নি দেখছি।

 

অক্ষয়।

হতে দিল কই। তোমার তিন ভগ্নী মিলে অহরহ আমার কৃশতা নিবারণ করে রেখেছিল-- বিরহ যে কাকে বলে সেটা আর কোনোমতেই বুঝতে দিলে না।--

 

গান

 

                    

বিরহে মরিব ব'লে ছিল মনে পণ--

                    

কে তোরা বাহুতে বাঁধি করিলি বারণ।

                    

ভেবেছিনু অশ্রুজলে     ডুবিব অকূল-তলে

                    

কাহার সোনার তরী করিল তারণ।

 

--প্রিয়ে, কাশীধামে বুঝি পঞ্চশর ত্রিলোচনের ভয়ে এগোতে পারেন না।

 

 

 

 

পুরবালা।

তা হতে পারে, কিন্তু কলকাতায় তো তাঁর যাতায়াত আছে।

 

অক্ষয়।

তা আছে-- কোম্পানির শাসন তিনি মানেন না, আমি তার প্রমাণ পেয়েছি।

 

নৃপবালা ও নীরবালার প্রবেশ

 

নীরবালা।

দিদি।

 

অক্ষয়।

এখন দিদি বৈ আর কথা নেই, অকৃতজ্ঞ! দিদি যখন বিচ্ছেদদহনে উত্তরোত্তর তপ্তকাঞ্চনের মতো শ্রী ধারণ করছিলেন তখন তোমাদের ক'টিকে সুশীতল করে রেখেছিল কে।

 

নীরবালা।

শুনছ দিদি। এমন মিথ্যে কথা! তুমি যতদিন ছিলে না আমাদের একবার ডেকেও জিজ্ঞাসা করেন নি, কেবল চিঠি লিখেছেন আর টেবিলের উপর দুই পা তুলে দিয়ে বই হাতে করে পড়েছেন। তুমি এসেছ, এখন আমাদের নিয়ে গান হবে, ঠাট্টা হবে, দেখাবেন যেন--

 

নৃপবালা।

দিদি, তুমিও তো ভাই, এতদিন আমাদের একখানিও চিঠি লেখ নি।

 

পুরবালা।

আমার কি সময় ছিল ভাই। মাকে নিয়ে দিন রাত ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল।

 

অক্ষয়।

যদি বলতে "তোদের ভগ্নীপতির ধ্যানে নিমগ্ন ছিলুম' তা হলে কি লোকে নিন্দে করত।

 

নীরবালা।

তা হলে ভগ্নীপতির আস্পর্ধা আরো বেড়ে যেত। মুখুজ্জেমশায়, তুমি তোমার বাইরের ঘরে যাও-না। দিদি এতদিন পরে এসেছেন, আমরা কি ওঁকে নিয়ে একটু গল্প করতে পাব না।

 

অক্ষয়।

নৃশংসে, বিরহদাবদগ্ধ তোর দিদিকে আবার বিরহে জ্বালাতে চাস? তোদের ভগ্নীপতিরূপ ঘনকৃষ্ণ মেঘ মিলনরূপ মুষলধারাবর্ষণ-দ্বারা প্রিয়ার চিত্তরূপ লতা নিকুঞ্জে আনন্দরূপ কিশলয়োদ্‌গম ক'রে প্রেমরূপ বর্ষায় কটাক্ষরূপ বিদ্যুৎ--

 

নীরবালা।

এবং বকুনিরূপ ভেকের কলরব--

 

শৈলবালার প্রবেশ

 

অক্ষয়।

এসো এসো-- উত্তমাধমমধ্যমা এই তিন শ্যালী না হলে আমার--

 

নীরবালা।

উত্তমমধ্যম হয় না।

 

শৈলবালা।

(নৃপ ও নীরর প্রতি) তোরা ভাই, একটু যা তো, আমাদের কথা আছে।

 

অক্ষয়।

কথাটা কী বুঝতে পারছিস তো নীরু? হরিনাম-কথা নয়।

 

নীরবালা।

আচ্ছা, তোমার আর বকতে হবে না।

 

[ নৃপ ও নীরর প্রস্থান

 

শৈলবালা।

দিদি, নৃপ-নীরর জন্যে মা দুটি পাত্র তা হলে স্থির করেছেন?

 

পুরবালা।

হাঁ, কথা একরকম ঠিক হয়ে গেছে। শুনেছি ছেলে দুটি মন্দ নয়-- তারা মেয়ে দেখে পছন্দ করলেই পাকাপাকি হয়ে যাবে।

 

শৈলবালা।

যদি পছন্দ না করে?

 

পুরবালা।

তা হলে তাদের অদৃষ্ট মন্দ।

 

অক্ষয়।

এবং আমার শ্যালী দুটির অদৃষ্ট ভালো।

 

শৈলবালা।

নৃপ নীরু যদি পছন্দ না করে?

 

অক্ষয়।

তা হলে ওদের রুচির প্রশংসা করব।

 

পুরবালা।

পছন্দ আবার না করবে কী? তোদের সব বাড়াবাড়ি, স্বয়ম্বরার দিন গেছে। মেয়েদের পছন্দ করবার দরকার হয় না। স্বামী হলেই তাকে ভালোবাসতে পারে।

 

অক্ষয়।

নইলে তোমার বর্তমান ভগ্নীপতির কী দুর্দশাই হত শৈল!

 

জগত্তারিণীর প্রবেশ

 

জগত্তারিণী।

বাবা অক্ষয়, ছেলে দুটিকে তা হলে তো খবর দিতে হয়। তারা তো আমাদের বাড়ির ঠিকানা জানে না।

 

অক্ষয়।

বেশ তো মা, রসিকদাদাকে পাঠিয়ে দেওয়া যাক।

 

জগত্তারিণী।

পোড়া কপাল! তোমার রসিকদাদার যেরকম বুদ্ধি। তিনি কাকে আনতে কাকে আনবেন ঠিক নেই।

 

পুরবালা।

তা মা, তুমি কিছু ভেবো না। ছেলে দুটিকে আনবার ব্যবস্থা করে দেব।

 

জগত্তারিণী।

মা পুরী, তুই একটু মনযোগ না করলে হবে না। আজকালকার ছেলে, তাদের সঙ্গে কিরকম ব্যাভার করতে হয় না-হয় আমি কিছুই বুঝি নে।

 

অক্ষয়।

(জনান্তিকে) পুরীর হাতযশ আছে। পুরী তাঁর মার জন্যে যে জামাইটি জুটিয়েছেন, পসার খুব বেড়ে গেছে। আজকালকার ছেলে কী করে বশ করতে হয় সে বিদ্যে--

 

পুরবালা।

(জনান্তিকে) মশায় বুঝি আজকালকার ছেলে।

 

জগত্তারিণী।

মা, তোমরা পরামর্শ করো। কায়েৎদিদি এসে বসে আছেন, আমি তাঁকে বিদায় করে আসি।

 

শৈলবালা।

মা, তুমি একটু বিবেচনা করে দেখো, ছেলে দুটিকে এখনো তোমরা কেউ দেখ নি, হঠাৎ--

 

জগত্তারিণী।

বিবেচনা করতে করতে আমার জন্ম শেষ হয়ে এল, আর বিবেচনা করতে পারি নে--

 

অক্ষয়।

বিবেচনা সময়মত এর পর করলেই হবে, এখন কাজটা আগে হয়ে যাক।

 

জগত্তারিণী।

বলো তো বাবা, শৈলকে বুঝিয়ে বলো তো।

 

[ প্রস্থান

 

পুরবালা।

মিথ্যে তুই ভাবছিস শৈল-- মা যখন মনস্থির করেছেন ওঁকে আর কেউ টলাতে পারবে না। প্রজাপতির নির্বন্ধ আমি মানি ভাই। যার সঙ্গে যার হবার, হাজার বিবেচনা করে মলেও সে হবেই।

 

অক্ষয়।

সে তো ঠিক কথা-- নইলে যার সঙ্গে যার হয়ে থাকে তার সঙ্গে না হয়ে আর-একজনের সঙ্গে হত।

 

পুরবালা।

কী যে তর্ক কর তোমার অর্ধেক কথা বোঝাই যায় না।

 

অক্ষয়।

তার কারণ আমি নির্বোধ।

 

পুরবালা।

যাও, এখন স্নান করতে যাও, মাথা ঠাণ্ডা করে এসো গে।

 

[ প্রস্থান

 

রসিকের প্রবেশ

 

শৈলবালা।

রসিকদাদা শুনেছ তো সব? মুশকিলে পড়া গেছে।

 

রসিক।

মুশকিল কিসের। কুমার-সভারও কৌমার্য রয়ে গেল, নৃপ-নীরুও পার পেলে, সব দিক রক্ষা হল।

 

শৈলবালা।

কোনো দিক রক্ষা হয় নি।

 

রসিক।

অন্তত এই বুড়োর দিকটা রক্ষা হয়েছে-- দুটো অর্বাচীনের সঙ্গে মিশে আমাকে রাত্রে রাস্তায় দাঁড়িয়ে শ্লোক আওড়াতে হবে না।

 

শৈলবালা।

মুখুজ্জেমশায়, তুমি না হলে রসিকদাদাকে কেউ শাসন করতে পারে না-- উনি আমাদের কথা মানেন না।

 

অক্ষয়।

যে বয়সে তোমাদের কথা বেদবাক্য বলে মানতেন সে বয়স পেরিয়েছে কিনা। তাই লোকটা বিদ্রোহ করতে সাহস করছে। আচ্ছা, আমি ঠিক করে দিচ্ছি। চলো তো রসিকদা, আমার বাইরের ঘরটাতে বসে তামাক নিয়ে পড়া যাক।

 

দ্বিতীয় দৃশ্য


বিপিনের বাসা

 

বিপিন ও গুরুদাস

 

বিপিন।

ভাই গুরুদাস, তুমি তো ওস্তাদ মানুষ, আমার এই উপকারটি তোমার করে দিতেই হবে। এই খাতার সব গানগুলিই তোমাকে সুর বসিয়ে দিতে হবে। যেটা গাইলে ওটা খাসা হয়েছে। যদি কষ্ট না হয় তো আর একবার-- আগে ঐ গানের কথা দেখেই মজে গিয়েছিলুম, এখন দেখি কথাটি মানস সরোবরের পদ্ম, আর তার উপরে গানটি বসেছে যেন বীণাপাণি স্বয়ং। ভাই আর-একবার--

 

গুরুদাস।--

 

গান

 

তোমায় চেয়ে আছি বসে পথের ধারে সুন্দর হে।

জমল ধুলা প্রাণের বীণার তারে তারে সুন্দর হে।

নাই যে কুসুম, মালা গাঁথব কিসে।        কান্নারই গান বীণায় এনেছি সে,

দূর হতে তাই শুনতে পাবে অন্ধকারে সুন্দর হে।

দিনের পরে দিন কেটে যায় সুন্দর হে।

মরে হৃদয় কোন্‌ পিপাসায় সুন্দর হে।

শূন্য ঘাটে আমি কী যে করি,    রঙিন পালে কবে আসবে তরী--

পাড়ি দেব কবে সুধারসের পারাবারে সুন্দর হে।

 

 

ভৃত্যের প্রবেশ

 

ভৃত্য।

একটি বাবু এসেছেন।

 

বিপিন।

বাবু? কিরকম বাবু রে।

 

ভৃত্য।

বুড়ো লোকটি।

 

বিপিন।

মাথায় টাক আছে?

 

ভৃত্য।

আছে।

 

বিপিন।

(তানপুরা রাখিয়া) নিয়ে আয়, এখনই নিয়ে আয়। ওরে ওরে, তামাক দিয়ে যা। বেহারাটা কোথায় গেল, পাখা টানতে বলে দে। আর দেখ্‌, চট করে গোটাকতক মিঠে পানের দোনা কিনে আন্‌ তো রে। দেরি করিস নে, আর আধ সের বরফ নিয়ে আসিস-- বুঝেছিস?

 

[ ভৃত্যের প্রস্থান

 

(পদশব্দ শুনিয়া) রসিকবাবু, আসুন।

 

বনমালীর প্রবেশ

 

বিপিন।

রসিকবাবু-- এ যে সেই বনমালী!

 

বৃদ্ধ। আজ্ঞে হাঁ, আমার নাম শ্রীবনমালী ভট্টাচার্য।

 

বিপিন।

সে পরিচয় অনাবশ্যক। আমি একটু বিশেষ কাজে আছি।

 

বনমালী।

মেয়েদুটিকে আর রাখা যায় না-- পাত্রও অনেক আসছে--

 

বিপিন।

শুনে খুশি হলেম-- দিয়ে ফেলুন, দিয়ে ফেলুন--

 

বনমালী।

কিন্তু আপনাদেরই ঠিক উপযুক্ত হত--

 

বিপিন।

দেখুন বনমালীবাবু, এখনো আপনি আমার সম্পূর্ণ পরিচয় পান নি-- যদি একবার পান তা হলে আমার উপযুক্ততা সম্বন্ধে আপনার ভয়ানক সন্দেহ হবে।

 

বনমালী।

তা হলে আমি উঠি, আপনি ব্যস্ত আছেন, আর-এক সময় আসব।

 

বিপিন।

(তানপুরা তুলিয়া লইয়া) সারেগা রেগামা গামাপা--

 

শ্রীশের প্রবেশ

 

শ্রীশ।

কী হে বিপিন, একি। কুস্তি ছেড়ে দিয়ে গান ধরেছ? গুরুদাস যে?

 

বিপিন।

ওস্তাদজি, আজ ছুটি। কী করব বলো, গান না শিখলে তো আর তোমার সন্ন্যাসীদলে আমল পাওয়া যাবে না। গুরুদাসকে গুরু মেনেছি। ওর কাছে নবীন-সন্ন্যাস-ব্রতের দীক্ষা নিচ্ছি।

 

শ্রীশ।

সে কিরকম।

 

বিপিন।

রস ভরে উঠলে তবেই তো ত্যাগ সহজ হয়। মেঘ যখন জলে ভারী হয় তখনই জল বর্ষণ করে।

 

শ্রীশ।

রাখো তোমার নতুন ফিলসফি, কুমার-সভার সেই লেখাটায় হাত দিতে পেরেছ?

 

বিপিন।

না ভাই, সেটাতে এখনো হাত দিতে পারি নি। তোমার লেখাটি হয়ে গেছে নাকি।

 

শ্রীশ।

না, আমিও হাত দিই নি। (কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া) না ভাই, ভারি অন্যায় হচ্ছে। ক্রমেই আমরা আমাদের সংকল্প থেকে যেন দূরে চলে যাচ্ছি।

 

বিপিন।

অনেক সংকল্প ব্যাঙাচির লেজের মতো, পরিণতির সঙ্গে সঙ্গে আপনি অন্তর্ধান করে। কিন্তু যদি লেজটুকুই থেকে যেত, আর ব্যাঙটা যেত শুকিয়ে সে কিরকম হত। এক সময় একটা সংকল্প করেছিলেম বলেই যে সে সংকল্পের খাতিরে নিজেকে শুকিয়ে মারতে হবে আমি তো তার মানে বুঝি নে।

 

শ্রীশ।

আমি বুঝি। অনেক সংকল্প আছে যার কাছে নিজেকে শুকিয়ে মারাও শ্রেয়। অফলা গাছের মতো আমাদের ডালে পালায় প্রতিদিন যেন অতিরিক্ত-পরিমাণ রস-সঞ্চার হচ্ছে এবং সফলতার আশা প্রতিদিন যেন দূর হয়ে যাচ্ছে। আমি ভুল করেছিলুম ভাই বিপিন-- সব বড়ো কাজেই তপস্যা চাই, নিজেকে নানা ভোগ থেকে বঞ্চিত না করলে, নানা দিক থেকে প্রত্যাহার করে না আনতে পারলে, চিত্তকে কোনো মহৎ কাজে সম্পূর্ণভাবে নিযুক্ত করা যায় না। এবার থেকে রসচর্চা একেবারে পরিত্যাগ করে কঠিন কাজে হাত দেব, এইরকম প্রতিজ্ঞা করেছি।

 

বিপিন।

তোমার কথা মানি। কিন্তু, সব তৃণেই তো ধান ফলে না-- শুকোতে গেলে কেবল নাহক শুকিয়ে মরাই হবে, ফল ফলবে না। কিছুদিন থেকে আমার মনে হচ্ছে আমরা যে সংকল্প গ্রহণ করেছি সে সংকল্প আমাদের দ্বারা সফল হবে না-- অতএব আমাদের স্বভাবসাধ্য অন্য কোনোরকম পথ অবলম্বন করাই শ্রেয়।

 

শ্রীশ।

এ কোনো কাজের কথা নয়। বিপিন তোমার তম্বুরা ফেলো--

 

বিপিন।

আচ্ছা, ফেললুম, তাতে পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হবে না।

 

শ্রীশ।

চন্দ্রবাবুর বাসায় আমাদের সভা তুলে নিয়ে যাওয়া যাক--

 

বিপিন।

উত্তম কথা।

 

শ্রীশ।

আমরা দুজনে মিলে রসিকবাবুকে একটু সংযত করে রাখব।

 

বিপিন।

তিনি একলা আমাদের দুজনকে অসংযত করে না তোলেন।

 

গুরুদাস। সংযমচর্চা যদি আরম্ভ করেন তা হলে আমাকে আর দরকার নেই।

 

বিপিন।

দরকার আরো বেশি। রৌদ্র যত প্রখর হবে, জলের প্রয়োজন ততই বাড়বে। এই দুঃসময়ে তুমি আমাকে ত্যাগ কোরো না-- সকাল-সন্ধ্যায় যেন দর্শন পাই। সেই গানটা যদি এর মধ্যে তৈরি হয়ে যায় তো আজ সন্ধেবেলায়-- কী বল?

 

গুরুদাস। আচ্ছা, তাই হবে।

 

[ প্রস্থান

 

ভৃত্যের প্রবেশ

 

ভৃত্য।

একটি বুড়ো বাবু এসেছেন।

 

বিপিন।

বুড়ো বাবু? জ্বালালে দেখছি। বনমালী আবার এসেছে।

 

শ্রীশ।

বনমালী? সে যে এই খানিকক্ষণ হল আমার কাছেও এসেছিল।

 

বিপিন।

ওরে, বুড়োকে বিদায় করে দে।

 

শ্রীশ।

তুমি বিদায় করলে আবার আমার ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়বে। তার চেয়ে ডেকে আনুক, আমরা দুজনে মিলে বিদায় করে দিই। (ভৃত্যের প্রতি) বুড়োকে নিয়ে আয়।

 

[ ভৃত্যের প্রস্থান

 

রসিকের প্রবেশ

 

বিপিন।

একি। এ তো বনমালী নয়, এ যে রসিকবাবু।

 

রসিক।

আজ্ঞে হাঁ-- আপনাদের আশ্চর্য চেনবার শক্তি-- আমি বনমালী নই। "ধীরেসমীরে যমুনাতীরে বসতি বনে বনমালী--'

 

শ্রীশ।

না রসিকবাবু, ও-সব নয়, রসালাপ আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।

 

রসিক।

আঃ, বাঁচিয়েছেন।

 

শ্রীশ।

অন্য সকল-প্রকার আলোচনা পরিত্যাগ করে এখন থেকে আমরা একান্তমনে কুমার-সভার কাজে লাগব।

 

রসিক।

আমারও সেই ইচ্ছে।

 

শ্রীশ।

বনমালী বলে একজন বুড়ো, কুমোরটুলির নীলমাধব চৌধুরীর দুই কন্যার সঙ্গে আমাদের বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, আমরা তাকে সংক্ষেপে বিদায় করে দিয়েছি-- এ-সকল প্রসঙ্গও আমাদের কাছে অসংগত বোধ হয়।

 

রসিক।

আমার কাছেও ঠিক তাই। বনমালী যদি দুই বা ততোধিক কন্যার বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হতেন তবে বোধ হয় তাঁকে নিষ্ফল হয়ে ফিরতে হত।

 

বিপিন।

রসিকবাবু, কিছু জলযোগ করে যেতে হবে।

 

রসিক।

না মশায়, আজ থাক্‌। আপনাদের সঙ্গে দুটো-একটা বিশেষ কথা ছিল, কিন্তু কঠিন প্রতিজ্ঞার কথা শুনে সাহস হচ্ছে না।

 

বিপিন।

(সাগ্রহে) না না, তাই ব'লে কথা থাকলে বলবেন না কেন।

 

শ্রীশ।

আমাদের যতটা ঠাওরাচ্ছেন ততটা ভয়ংকর নই। কথাটা কি বিশেষ করে আমার সঙ্গে।

 

বিপিন।

না, সেদিন যে রসিকবাবু বলছিলেন আমারই সঙ্গে ওঁর দুটো-একটা আলোচনার বিষয় আছে।

 

রসিক।

কাজ নেই, থাক্‌।

 

শ্রীশ।

বলেন তো আজ রাত্রে গোলদিঘির ধারে--

 

রসিক।

না শ্রীশবাবু, মাপ করবেন।

 

শ্রীশ।

বিপিন ভাই, তুমি একটু ও ঘরে যাও-না, বোধ হয় তোমার সাক্ষাতে রসিকবাবু--

 

রসিক।

না না, দরকার কী--

 

বিপিন।

তার চেয়ে রসিকবাবু, তেতালার ঘরে চলুন-- শ্রীশ এখানে একটু অপেক্ষা করবেন এখন।

 

রসিক।

না, আপনারা দুজনেই বসুন, আমি উঠি।

 

বিপিন।

সে কি হয়। কিছু খেয়ে যেতে হবে।

 

শ্রীশ।

না, আপনাকে কিছুতেই ছাড়ছি নে। সে হবে না।

 

রসিক।

তবে কথাটা বলি। নৃপবালা নীরবালার কথা তো পূর্বেই আপনারা শুনেছেন--

 

শ্রীশ।

শুনেছি বৈকি-- তা নৃপবালার সম্বন্ধে যদি কিছু--

 

বিপিন।

নীরবালার কোনো বিশেষ সংবাদ--

 

রসিক।

তাঁদের দুজনের সম্বন্ধেই বিশেষ চিন্তার কারণ হয়ে পড়েছে।

 

উভয়ে। অসুখ নয় তো?

 

রসিক।

তার চেয়ে বেশি। তাঁদের বিবাহের সম্বন্ধ--

 

শ্রীশ।

বলেন কী রসিকবাবু। বিবাহের তো কোনো কথা শোনা যায় নি--

 

রসিক।

কিচ্ছু না-- হঠাৎ মা কাশী থেকে এসে দুটো অকালকুষ্মাণ্ডের সঙ্গে মেয়েদুটির বিবাহ স্থির করেছেন--

 

বিপিন।

এ তো কিছুতেই হতে পারে না রসিকবাবু।

 

রসিক।

মশায়, পৃথিবীতে যেটা অপ্রিয় সেইটেরই সম্ভাবনা বেশি। ফুলগাছের চেয়ে আগাছাই বেশি সম্ভবপর।

 

বিপিন।

কিন্তু মশায়, আগাছা উৎপাটন করতে হবে--

 

শ্রীশ।

ফুলগাছ রোপণ করতে হবে--

 

রসিক।

তা তো বটেই, কিন্তু করে কে মশায়।

 

শ্রীশ।

আমরা করব। কী বল বিপিন।

 

বিপিন।

নিশ্চয়ই।

 

রসিক।

কিন্তু, কী করবেন।

 

বিপিন।

যদি বলেন তো সেই ছেলেদুটোকে পথের মধ্যে--

 

রসিক।

বুঝেছি, সেটা মনে করলেও শরীর পুলকিত হয়। কিন্তু, বিধাতার বরে অপাত্র জিনিসটা অমর-- দুটো গেলে আবার দশটা আসবে।

 

বিপিন।

এদের দুটোকে যদি ছলে বলে কিছুদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারি তা হলে ভাববার সময় পাওয়া যাবে।

 

রসিক।

ভাববার সময় সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। এই শুক্রবারে তারা মেয়ে দেখতে আসবে।

 

বিপিন।

এই শুক্রবারে?

 

শ্রীশ।

সে তো পরশু।

 

রসিক।

আজ্ঞে, পরশুই তো বটে। শুক্রবারকে তো পথের মধ্যে ঠেকিয়ে রাখা যায় না।

 

শ্রীশ।

আচ্ছা, আমার একটা প্ল্যান মাথায় এসেছে।

 

রসিক।

কিরকম শুনি।

 

শ্রীশ।

সেই ছেলেদুটোকে বাড়ির কেউ চেনে?

 

রসিক।

কেউ না।

 

শ্রীশ।

তারা বাড়ি চেনে?

 

রসিক।

তাও না।

 

শ্রীশ।

তা হলে বিপিন যদি সেদিন তাদের কোনো রকম করে আটকে রাখতে পারে তো আমি তাদের নাম নিয়ে নৃপবালাকে--

 

বিপিন।

জানই তো ভাই, আমার কোনো রকম কৌশল মাথায় আসে না। তুমি ইচ্ছে করলে কৌশলে ছেলেদুটোকে ভুলিয়ে রাখতে পারবে-- আমি বরঞ্চ নিজেকে তাদের নামে চালিয়ে দিয়ে নীরবালাকে--

 

রসিক।

কিন্তু মশায়, এ স্থলে তো গৌরবে বহুবচন খাটবে না। দুটি ছেলে আসবার কথা আছে, আপনাদের একজনকে দুজন বলে চালানো আমার পক্ষে কঠিন হবে--

 

শ্রীশ।

ও, তা বটে।

 

বিপিন।

হাঁ, সে কথা ভুলেছিলেম।

 

শ্রীশ।

তা হলে তো আমাদের দুজনকেই যেতে হয়। কিন্তু--

 

রসিক।

সে দুটোকে ভুল রাস্তায় চালান করে দিতে আমিই পারব। কিন্তু, আপনারা--

 

বিপিন।

আমাদের জন্যে ভাববেন না রসিকবাবু।

 

শ্রীশ।

আমরা সব-তাতেই প্রস্তুত আছি।

 

রসিক।

আপনারা মহৎ লোক, এরকম ত্যাগস্বীকার--

 

শ্রীশ।

বিলক্ষণ! এর মধ্যে ত্যাগস্বীকার কিছুই নেই।

 

বিপিন।

এ তো আনন্দের কথা।

 

রসিক।

না না, তবু তো মনে আশঙ্কা হতে পারে যে, কী জানি নিজের ফাঁদে যদি নিজেই পড়তে হয়।

 

শ্রীশ।

কিছু না মশায়, কোনো আশঙ্কায় ডরাই নে।

 

বিপিন।

আমাদের যাই ঘটুক তাতেই আমরা সুখী হব।

 

রসিক।

এ তো আপনাদের মহত্ত্বের কথা, কিন্তু আমার কর্তব্য আপনাদের রক্ষা করা। তা, আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি-- এই শুক্রবারের দিনটা আপনারা কোনোমতে উদ্ধার করে দিন, তার পরে কখনো আপনাদের আর বিরক্ত করব না।

 

শ্রীশ।

আমাদের বিরক্ত করবেন না এই কথা শুনে দুঃখিত হলেম রসিকবাবু।

 

রসিক।

আচ্ছা, করব।

 

বিপিন।

আমরা কি নিজের স্বাধীনতার জন্যেই কেবল ব্যস্ত। আমাদের এতই স্বার্থপর মনে করেন?

 

রসিক।

মাপ করবেন-- আমার ভুল ধারণা ছিল।

 

শ্রীশ।

আপনি যাই বলুন, ফস্‌ করে ভালো পাত্র পাওয়া বড়ো শক্ত।

 

রসিক।

সেইজন্যেই তো এত দিন অপেক্ষা করে শেষে এই বিপদ। বিবাহের প্রসঙ্গমাত্রই আপনাদের কাছে অপ্রিয়, তবু দেখুন আপনাদের সুদ্ধ--

 

বিপিন।

সেজন্যে কিছু সংকোচ করবেন না--

 

শ্রীশ।

আপনি যে আর-কারো কাছে না গিয়ে আমাদের কাছে এসেছেন, সেজন্যে অন্তরের সঙ্গে ধন্যবাদ দিচ্ছি।

 

রসিক।

আমি আর আপনাদের ধন্যবাদ দেব না। সেই কন্যা দুটির চিরজীবনের ধন্যবাদ আপনাদের পুরস্কৃত করবে।

 

বিপিন।

ওরে, পাখাটা টান্‌।

 

শ্রীশ।

রসিকবাবুর জন্যে জলখাবার আনাবে বলেছিলে--

 

বিপিন।

সে এল বলে। ততক্ষণ এক গ্লাস বরফ-দেওয়া জল খান--

 

শ্রীশ।

জল কেন, লেমনেড আনিয়ে দাও-না। (পকেট হইতে টিনের বাক্স বাহির করিয়া) এই নিন রসিকবাবু, পান খান।

 

বিপিন।

ওদিকে হাওয়া পাচ্ছেন? এই তাকিয়াটি নিন-না।

 

শ্রীশ।

আচ্ছা রসিকবাবু, নৃপবালা বুঝি খুব বিষণ্ন হয়ে পড়েছেন--

 

বিপিন।

নীরবালাও অবশ্য খুব--

 

রসিক।

সে আর বলতে।

 

শ্রীশ।

নৃপবালা বুঝি কান্নাকাটি করছেন?

 

বিপিন।

আচ্ছা, নীরবালা তাঁর মাকে কেন একটু ভালো করে বুঝিয়ে বলেন না--

 

রসিক।

(স্বগত) ঐ রে, শুরু হল। আমার লেমনেডে কাজ নেই। (প্রকাশ্যে) মাপ করবেন, আমায় কিন্তু এখনই উঠতে হচ্ছে।

 

শ্রীশ।

বলেন কী।

 

বিপিন।

সে কি হয়।

 

রসিক।

সেই ছেলেদুটোকে ভুল ঠিকানা দিয়ে আসতে হবে, নইলে--

 

শ্রীশ।

বুঝেছি, তা হলে, এখনই যান।

 

বিপিন।

তা হলে আর দেরি করবেন না।

 

তৃতীয় দৃশ্য


চন্দ্রবাবুর বাড়ি

 

নির্মলা বাতায়নতলে আসীন। চন্দ্রবাবুর প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

(স্বগত) বেচারা নির্মলা বড়ো কঠিন ব্রত গ্রহণ করেছে। আমি দেখছি কদিন ধরে ও চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রয়েছে। স্ত্রীলোক, মনের উপর এতটা ভার কি সহ্য করতে পারবে। (প্রকাশ্যে) নির্মল।

 

নির্মলা।

(চমকিয়া) কী মামা।

 

চন্দ্রবাবু।

সেই লেখাটা নিয়ে বুঝি ভাবছ? আমার বোধ হয় অধিক না ভেবে মনকে দুই-একদিন বিশ্রাম দিলে লেখার পক্ষে সুবিধা হতে পারে।

 

নির্মলা।

(লজ্জিত হইয়া) আমি ঠিক ভাবছিলুম না মামা। আমার এতক্ষণ সেই লেখায় হাত দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এই কদিন থেকে গরম পড়ে দক্ষিনে হাওয়া দিতে আরম্ভ করেছে, কিছুতেই যেন মন বসাতে পারছি নে-- ভারি অন্যায় হচ্ছে, আজ আমি যেমন করে হোক--

 

চন্দ্রবাবু।

না না, জোর করে চেষ্টা কোরো না। আমার বোধ হয় নির্মল, বাড়িতে কেউ সঙ্গিনী নেই, নিতান্ত একলা কাজ করতে তোমার শ্রান্তি বোধ হয়। কাজে দুই-একজনের সঙ্গ এবং সহায়তা না হলে--

 

নির্মলা।

অবলাকান্তবাবু আমাকে কতকটা সাহায্য করবেন বলেছেন-- আমি তাঁকে রোগীশুশ্রূষা সম্বন্ধে সেই ইংরেজি বইটা দিয়েছি, তিনি একটা অধ্যায় আজ লিখে পাঠাবেন বলেছেন। বোধ হয় এখনই পাওয়া যাবে, তাই আমি অপেক্ষা করে বসে আছি।

 

চন্দ্রবাবু।

ঐ ছেলেটি বড়ো ভালো।

 

নির্মলা।

খুব ভালো-- চমৎকার--

 

চন্দ্রবাবু।

এমন অধ্যবসায়, এমন কার্যতৎপরতা--

 

নির্মলা।

আর, এমন সুন্দর নম্রস্বভাব--

 

চন্দ্রবাবু।

ভালো প্রস্তাবমাত্রেই তাঁর উৎসাহ দেখে আমি আশ্চর্য হয়েছি।

 

নির্মলা।

তা ছাড়া, তাঁকে দেখবামাত্র তাঁর মনের মাধুর্য মুখে এবং চেহারায় কেমন স্পষ্ট বোঝা যায়।

 

চন্দ্রবাবু।

এত অল্প কালের মধ্যেই যে কারো প্রতি এত গভীর স্নেহ জন্মাতে পারে তা আমি কখনো মনে করি নি। আমার ইচ্ছা করে, ঐ ছেলেটিকে নিজের কাছে রেখে ওর সকলপ্রকার লেখাপড়ায় এবং কাজে সহায়তা করি।

 

নির্মলা।

তা হলে আমারও ভারি উপকার হয়, অনেক কাজ করতে পারি। আচ্ছা, এরকম প্রস্তাব করে একবার দেখোই-না-- ঐ-যে বেহারা আসছে। বোধ হয় তিনি লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন। রামদীন, চিঠি আছে? এই দিকে নিয়ে আয়।

 

বেহারার প্রবেশ

 

ও চন্দ্রবাবুর হাতে চিঠি-প্রদান

 

মামা, সেই প্রবন্ধটা নিশ্চয় তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, ওটা আমাকে দাও।

 

চন্দ্রবাবু।

না ফেনি, এটা আমার চিঠি।

 

নির্মলা।

তোমার চিঠি! অবলাকান্তবাবু বুঝি তোমাকেই লিখেছেন? কী লিখেছেন।

 

চন্দ্রবাবু।

না, এটা পূর্ণর লেখা।

 

নির্মলা।

পূর্ণবাবুর লেখা? ওঃ--

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণ লিখছেন-- "গুরুদেব, আপনার চরিত্র মহৎ, মনের বল অসামান্য; আপনার মতো বলিষ্ঠপ্রকৃতি লোকেই মানুষের দুর্বলতা ক্ষমার চক্ষে দেখিতে পারেন ইহাই মনে করিয়া অদ্য এই চিঠিখানি আপনাকে লিখিতে সাহসী হইতেছি।'

 

নির্মলা।

হয়েছে কী। বোধ হয় পূর্ণবাবু চিরকুমার-সভা ছেড়ে দেবেন, তাই এত ভূমিকা করছেন। লক্ষ্য করে দেখেছ বোধ হয়, পূর্ণবাবু আজকাল কুমার-সভার কোনো কাজই করে উঠতে পারেন না।

 

চন্দ্রবাবু।

"দেব, আপনি যে আদর্শ আমাদের সম্মুখে ধরিয়াছেন তাহা অত্যুচ্চ, যে উদ্দেশ্য আমাদের মস্তকে স্থাপন করিয়াছেন তাহা গুরুভার-- সে আদর্শ এবং সেই উদ্দেশ্যের প্রতি এক মুহূর্তের জন্য ভক্তির অভাব হয় নাই, কিন্তু মাঝে মাঝে শক্তির দৈন্য অনুভব করিয়া থাকি তাহা চরণসমীপে সবিনয়ে স্বীকার করিতেছি।'

 

নির্মলা।

আমার বোধ হয়, সকল বড়ো কাজেই মানুষ মাঝে মাঝে আপনার অক্ষমতা অনুভব করে হতাশ হয়ে পড়ে, শ্রান্ত মন এক-একবার বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়, কিন্তু সে কি বরাবর থাকে।

 

চন্দ্রবাবু।

"সভা হইতে গৃহে ফিরিয়া আসিয়া যখন কার্যে হাত দিতে যাই তখন সহসা নিজেকে একক মনে হয়, উৎসাহ যেন আশ্রয়হীন লতার মতো লুণ্ঠিত হইয়া পড়িতে চাহে।'-- নির্মল, আমরা তো ঠিক এই কথাই বলছিলেম।

 

নির্মলা।

পূর্ণবাবু যা লিখেছেন সেটা সত্য-- মানুষের সঙ্গ না হলে কেবলমাত্র সংকল্প নিয়ে উৎসাহ জাগিয়ে রাখা শক্ত।

 

চন্দ্রবাবু।

"আমার ধৃষ্টতা মার্জনা করিবেন, কিন্তু অনেক চিন্তা করিয়া এ কথা স্থির বুঝিয়াছি, কুমারব্রত সাধারণ লোকের জন্য নহে-- তাহাতে বল দান করে না, বল হরণ করে। স্ত্রী পুরুষ পরস্পরের দক্ষিণ হস্ত-- তাহারা মিলিত থাকিলে তবেই সম্পূর্ণরূপে সংসারের সকল কাজের উপযোগী হইতে পারে।'

 

তোমার কী মনে হয় নির্মল। (নির্মলা নিরুত্তর) অক্ষয়বাবুও এই কথা নিয়ে সেদিন আমার সঙ্গে তর্ক করছিলেন-- তাঁর অনেক কথার উত্তর দিতে পারি নি।

 

নির্মলা।

তা, হতে পারে। বোধ হয় কথাটার মধ্যে অনেকটা সত্য আছে।

 

চন্দ্রবাবু।

"গৃহস্থসন্তানকে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত না করিয়া গৃহাশ্রমকে উন্নত আদর্শে গঠিত করাই আমার মতে শ্রেষ্ঠ কর্তব্য।'

 

নির্মলা।

এ কথাটা কিন্তু পূর্ণবাবু বেশ বলেছেন।

 

চন্দ্রবাবু।

আমিও কিছুদিন থেকে মনে করছিলেম কুমারব্রত গ্রহণের নিয়ম উঠিয়ে দেব।

 

নির্মলা।

আমারও বোধ হয় উঠিয়ে দিলে মন্দ হয় না। কী বল মামা। অন্য কেউ কি আপত্তি করবেন। অবলাকান্তবাবু, শ্রীশবাবু--

 

চন্দ্রবাবু।

আপত্তির কোনো কারণ নেই।

 

নির্মলা।

তবু একবার অবলাকান্তবাবুদের মত নিয়ে দেখা উচিত।

 

চন্দ্রবাবু।

মত তো নিতেই হবে।

 

(পত্রপাঠ) "এ পর্যন্ত যাহা লিখিলাম সহজে লিখিয়াছি, এখন যাহা বলিতে চাহি তাহা লিখিতে কলম সরিতেছে না।'

 

নির্মলা।

মামা, পূর্ণবাবু হয়তো কোনো গোপনীয় কথা লিখছেন, তুমি চেঁচিয়ে পড়ছ কেন।

 

চন্দ্রবাবু।

ঠিক বলেছ ফেনি। (আপন মনে পাঠ) কী আশ্চর্য, আমি কি সকল বিষয়েই অন্ধ। এতদিন তো আমি কিছুই বুঝতে পারি নি। নির্মল, পূর্ণবাবুর কোনো ব্যবহার কি কখনো তোমার কাছে--

 

নির্মলা।

হাঁ, পূর্ণবাবুর ব্যবহার আমার কাছে মাঝে মাঝে অত্যন্ত নির্বোধের মতো ঠেকেছিল।

 

চন্দ্রবাবু।

অথচ পূর্ণবাবু খুব বুদ্ধিমান। তা হলে তোমাকে খুলে বলি-- পূর্ণবাবু বিবাহের প্রস্তাব করে পাঠিয়েছেন--

 

নির্মলা।

তুমি তো তাঁর অভিভাবক নও, তোমার কাছে প্রস্তাব--

 

চন্দ্রবাবু।

আমি যে তোমার অভিভাবক, এই পড়ে দেখো--

 

নির্মলা।

(পত্র পড়িয়া রক্তিমমুখে) এ হতেই পারে না।

 

চন্দ্রবাবু।

আমি তাঁকে কী বলব।

 

নির্মলা।

বোলো, কোনোমতে হতেই পারে না।

 

চন্দ্রবাবু।

কেন নির্মল, তুমি তো বলছিলে কুমারব্রত-পালনের নিয়ম সভা হতে উঠিয়ে দিতে তোমার আপত্তি নেই।

 

নির্মলা।

তাই বলেই কি যে প্রস্তাব করবে তাকেই--

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণবাবু তো যে-সে নয়, অমন ভালো ছেলে--

 

নির্মলা।

মামা, তুমি এ-সব বিষয়ে কিছুই বোঝ না, তোমাকে বোঝাতে পারবও না-- আমার কাজ আছে।

 

[ প্রস্থানোদ্যম

 

মামা, তোমার পকেটে ওটা কী উঁচু হয়ে আছে।

 

চন্দ্রবাবু।

(চমকিয়া উঠিয়া) হাঁ হাঁ, ভুলে গিয়েছিলেম, বেহারা আজ সকালে তোমার নামে লেখা একটা কাগজ আমাকে দিয়ে গেছে--

 

নির্মলা।

(তাড়াতাড়ি কাগজ লইয়া) দেখো দেখি মামা, কী অন্যায়, অবলাকান্তবাবুর লেখাটা সকালেই এসেছে, আমাকে দাও নি। আমি ভাবছিলেম তিনি হয়তো ভুলেই গেছেন। ভারি অন্যায়।

 

চন্দ্রবাবু।

অন্যায় হয়েছে বটে। কিন্তু, এর চেয়ে ঢের বেশি অন্যায় ভুল আমি প্রতিদিনই করে থাকি ফেনি-- তুমিই তো আমাকে প্রত্যেক বার মাপ করে প্রশ্রয় দিয়েছ।

 

নির্মলা।

না, ঠিক অন্যায় নয়-- আমিই অবলাকান্তবাবুর প্রতি মনে মনে অন্যায় করছিলেম, ভাবছিলেম-- এই যে, রসিকবাবু আসছেন। আসুন রসিকবাবু, মামা এইখানেই আছেন।

 

রসিকের প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

এই-যে রসিকবাবু এসেছেন, ভালোই হয়েছে।

 

রসিক।

আমার আসাতেই যদি ভালো হয় চন্দ্রবাবু, তা হলে আপনাদের পক্ষে ভালো অত্যন্ত সুলভ। যখনই বলবেন তখনই আসব, না বললেও আসতে রাজি আছি।

 

চন্দ্রবাবু।

আমরা মনে করছি আমাদের সভা থেকে চিরকুমারব্রতের নিয়মটা উঠিয়ে দেব-- আপনি কী পরামর্শ দেন।

 

রসিক।

আমি খুব নিঃস্বার্থভাবেই পরামর্শ দিতে পারব, কারণ, এ ব্রত রাখুন বা উঠিয়ে দিন আমার পক্ষে দুই-ই সমান। আমার পরামর্শ এই যে, উঠিয়ে দিন, নইলে সে কোন্‌ দিন আপনিই উঠে যাবে। আমাদের পাড়ার রামহরি মাতাল রাস্তার মাঝখানে এসে সকলকে ডেকে বলেছিল, বাবাসকল, আমি স্থির করেছি এইখানটাতেই আমি পড়ব। স্থির না করলেও সে পড়ত, অতএব স্থির করাটাই তার পক্ষে ভালো হয়েছিল।

 

চন্দ্রবাবু।

ঠিক বলেছেন রসিকবাবু, যে- জিনিস বলপূর্বক আসবেই তাকে বলপ্রকাশ করতে না দিয়ে আসতে দেওয়াই ভালো। আসছে রবিবারের পূর্বেই এই প্রস্তাবটা সকলের কাছে একবার তুলতে চাই।

 

রসিক।

আচ্ছা, শুক্রবারের সন্ধ্যাবেলায় আপনারা আমাদের ওখানে যাবেন, আমি সকলকে সংবাদ দিয়ে আনাব।

 

চন্দ্রবাবু।

রসিকবাবু, আপনার যদি সময় থাকে তা হলে আমাদের দেশে গোজাতির উন্নতি সম্বন্ধে একটা প্রস্তাব আপনাকে--

 

রসিক।

বিষয়টা শুনে খুব ঔৎসুক্য জন্মাচ্ছে, কিন্তু সময় খুব যে বেশি--

 

নির্মলা।

না রসিকবাবু, আপনি ও ঘরে চলুন, আপনার সঙ্গে অনেক কথা কবার আছে। মামা, তোমার লেখাটা শেষ করো, আমরা থাকলে ব্যাঘাত হবে।

 

রসিক।

তা হলে চলুন।

 

নির্মলা।

(চলিতে চলিতে) অবলাকান্তবাবু আমাকে তাঁর সেই লেখাটা পাঠিয়ে দিয়েছেন-- আমার অনুরোধ যে তিনি মনে করে রেখেছিলেন সেজন্যে আপনি তাঁকে আমার ধন্যবাদ জানাবেন।

 

রসিক।

ধন্যবাদ না পেলেও আপনার অনুরোধ রক্ষা করেই তিনি কৃতার্থ।

 

চতুর্থ দৃশ্য


অক্ষয়ের বাসা

 

জগত্তারিণী, পুরবালা ও অক্ষয়

 

জগত্তারিণী।

বাবা অক্ষয়, দেখো তো, মেয়েদের নিয়ে আমি কী করি। নেপো বসে বসে কাঁদছে; নীর রেগে অস্থির, সে বলে সে কোনোমতেই বেরোবে না। ভদ্রলোকের ছেলেরা আজ এখনই আসবে, তাদের এখন কী বলে ফেরাব। তুমিই বাপু, ওদের শিখিয়ে পড়িয়ে বিবি করে তুলেছ, এখন তুমিই ওদের সামলাও।

 

[ প্রস্থান

 

পুরবালা।

সত্যি, আমি ওদের রকম দেখে অবাক হয়ে গেছি, ওরা কি মনে করেছে ওরা--

 

অক্ষয়।

বোধ হয় আমাকে ছাড়া আর-কাউকে ওরা পছন্দ করছে না; তোমারই সহোদরা কিনা, রুচিটা তোমারই মতো।

 

পুরবালা।

ঠাট্টা রাখো, এখন ঠাট্টার সময় নয়। তুমি ওদের একটু বুঝিয়ে বলবে কি না বলো। তুমি না বললে ওরা শুনবে না।

 

অক্ষয়।

এত অনুগত! একেই বলে ভগ্নীপতিব্রতা শ্যালী। আচ্ছা, আমার কাছে একবার পাঠিয়ে দাও-- দেখি।

 

[ পুরবালার প্রস্থান

 

নৃপবালা ও নীরবালার প্রবেশ

 

নীরবালা।

না, মুখুজ্জেমশায়, সে কোনোমতেই হবে না।

 

নৃপবালা।

মুখুজ্জেমশায়, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, আমাদের যার-তার সামনে ও-রকম করে বের কোরো না।

 

অক্ষয়।

ফাঁসির হুকুম হলে একজন বলেছিল আমাকে বেশি উঁচুতে চড়িয়ো না, আমার মাথা ঘোরা ব্যামো আছে। তোদের যে তাই হল। বিয়ে করতে যাচ্ছিস, এখন দেখা দিতে লজ্জা করলে চলবে কেন।

 

নীরবালা।

কে বললে আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি।

 

অক্ষয়।

অহো, শরীরে পুলক সঞ্চার হচ্ছে। কিন্তু হৃদয় দুর্বল এবং দৈব বলবান, যদি দৈবাৎ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে হয়--

 

নীরবালা।

না, ভঙ্গ হবে না।

 

অক্ষয়।

হবে না তো? তবে নির্ভয়ে এসো, যুবক-দুটোকে দেখা দিয়ে আধপোড়া করে ছেড়ে দাও-- হতভাগারা বাসায় ফিরে গিয়ে মরে থাকুক।

 

নীরবালা।

অকারণে প্রাণিহত্যা করবার জন্য আমাদের এত উৎসাহ নেই।

 

অক্ষয়।

জীবের প্রতি কী দয়া! কিন্তু, সামান্য ব্যাপার নিয়ে গৃহবিচ্ছেদ করবার দরকার কী। তোদের মা দিদি যখন ধরে পড়েছেন এবং ভদ্রলোক দুটি যখন গাড়িভাড়া করে আসছে তখন একবার মিনিট-পাঁচেকের মতো দেখা দিস, তার পরে আমি আছি-- তোদের অনিচ্ছায় কোনোমতেই বিবাহ দিতে দেব না।

 

নীরবালা।

কোনোমতেই না?

 

অক্ষয়।

কোনোমতেই না।

 

পুরবালার প্রবেশ

 

পুরবালা।

আয়, তোদের সাজিয়ে দিই গে।

 

নীরবালা।

আমরা সাজব না।

 

পুরবালা।

ভদ্রলোকদের সামনে এইরকম বেশেই বেরোবি! লজ্জা করবে না!

 

নীরবালা।

লজ্জা করবে বৈকি দিদি, কিন্তু সেজে বেরোতে আরো বেশি লজ্জা করবে।

 

অক্ষয়।

উমা তপস্বিনীবেশে মহাদেবের মনোহরণ করেছিলেন, শকুন্তলা যখন দুষ্মন্তের হৃদয় জয় করেছিল তখন তার গায়ে একখানি বাকল ছিল-- কালিদাস বলেন, সেও কিছু আঁট হয়ে পড়েছিল-- তোমার বোনেরা সেই-সব পড়ে সেয়ানা হয়ে উঠেছে, সাজতে চায় না।

 

পুরবালা।

সে-সব হল সত্যযুগের কথা। কলিকালের দুষ্মন্ত মহারাজারা সাজ-সজ্জাতেই ভোলেন।

 

অক্ষয়।

যথা--

 

পুরবালা।

যথা তুমি। যেদিন তুমি দেখতে এলে, মা বুঝি আমাকে সাজিয়ে দেন নি?

 

অক্ষয়।

আমি মনে মনে ভাবলেম, সাজেও যখন একে সেজেছে তখন সৌন্দর্যে না জানি কত শোভা হবে।

 

পুরবালা।

আচ্ছা, তুমি থামো। নীরু, আয়।

 

নীরবালা।

না ভাই দিদি--

 

পুরবালা।

আচ্ছা, সাজ নাই করলি, চুল তো বাঁধতে হবে?

 

অক্ষয়।

গান

 

অলকে কুসুম না দিয়ো,

শুধু   শিথিল কবরী বাঁধিয়ো।

কাজলবিহীন সজল নয়নে

হৃদয়দুয়ারে ঘা দিয়ো।

আকুল আঁচলে পথিকচরণে

মরণের ফাঁদ ফাঁদিয়ো।

না করিয়া বাদ মনে যাহা সাধ

নিদয়া নীরবে সাধিয়ো।

 

 

পুরবালা।

তুমি আবার গান ধরলে! আমি কখন কী করি বলো দেখি। তাদের আসবার সময় হল-- এখনো আমার খাবার তৈরি করা বাকি আছে।

 

[ নৃপবালা ও নীরবালাকে লইয়া প্রস্থান

 

রসিকের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

পিতামহ ভীষ্ম, যুদ্ধের সমস্তই প্রস্তুত?

 

রসিক।

সমস্তই। বীরপুরুষ দুটিও সমাগত।

 

অক্ষয়।

এখন কেবল দিব্যাস্ত্র-দুটি সাজতে গেছেন। তুমি তা হলে সেনাপতির ভার গ্রহণ করো, আমি একটু অন্তরালে থাকতে ইচ্ছা করি।

 

রসিক।

আমিও প্রথমটা একটু আড়াল হই।

 

[ রসিক ও অক্ষয়ের প্রস্থান

 

শ্রীশ ও বিপিনের প্রবেশ

 

শ্রীশ।

বিপিন, তুমি তো আজকাল সংগীতবিদ্যার উপর চীৎকারশব্দে ডাকাতি আরম্ভ করেছ-- কিছু আদায় করতে পারলে?

 

বিপিন।

কিছু না। সংগীতবিদ্যার দ্বারে সপ্তসুর অনবরত পাহারা দিচ্ছে, সেখানে কি আমার ঢোকবার জো আছে। কিন্তু এ প্রশ্ন কেন তোমার মনে উদয় হল।

 

শ্রীশ।

আজকাল মাঝে মাঝে কবিতায় সুর বসাতে ইচ্ছে করে। সেদিন বইয়ে পড়ছিলুম--

 

কেন সারা দিন ধীরে ধীরে

বালু নিয়ে শুধু খেল তীরে।

চলে যায় বেলা,   রেখে মিছে খেলা

ঝাঁপ দিয়ে পড়ো কালো নীরে।

অকূল ছানিয়ে      যা পাস তা নিয়ে

হেসে কেঁদে চলো ঘরে ফিরে।

 

 

--মনে হচ্ছিল এর সুরটা যেন জানি কিন্তু গাবার জো নেই।

 

বিপিন।

জিনিসটা মন্দ নয় হে-- তোমার কবি লেখে ভালো। ওহে, ওর পরে আর-কিছু নেই? যদি শুরু করলে তবে শেষ করো।

 

শ্রীশ।

নাহি জানি মনে কী বাসিয়া

পথে বসে আছে কে আসিয়া।

যে ফুলের বাসে অলস বাতাসে

হৃদয় দিতেছে উদাসিয়া

যেতে হয় যদি চলো নিরবধি

সেই ফুলবন তলাশিয়া।

 

 

বিপিন।

বাঃ, বেশ! কিন্তু শ্রীশ, শেল্‌ফের কাছে তুমি কী খুঁজে বেড়াচ্ছ।

 

শ্রীশ।

সেই-যে সেদিন যে বইটাতে নাম লেখা দেখেছিলাম সেইটে--

 

বিপিন।

না ভাই, আজ ও-সব নয়।

 

শ্রীশ।

কী-সব নয়।

 

বিপিন।

তাঁদের কথা নিয়ে কোনো রকম--

 

শ্রীশ।

কী আশ্চর্য বিপিন। তাঁদের কথা নিয়ে আমি কি এমন কোনো আলোচনা করতে পারি যাতে--

 

বিপিন।

রাগ কোরো না ভাই-- আমি নিজের সম্বন্ধেই বলছি, এই ঘরেই আমি অনেক সময় রসিকবাবুর সঙ্গে তাঁদের বিষয়ে যে ভাবে আলাপ করেছি, আজ সে ভাবে কোনো কথা উচ্চারণ করতেও সংকোচ বোধ হচ্ছে-- বুঝছ না--

 

শ্রীশ।

কেন বুঝব না। আমি কেবল একখানি বই খুলে দেখবার ইচ্ছে করেছিলুম মাত্র-- একটি কথাও উচ্চারণ করতুম না--

 

বিপিন।

না, আজ তাও না। আজ তাঁরা আমাদের সম্মুখে বেরোবেন, আজ আমরা যেন তার যোগ্য থাকতে পারি।

 

শ্রীশ।

বিপিন, তোমার সঙ্গে--

 

বিপিন।

না ভাই, আমার সঙ্গে তর্ক কোরো না, আমি হারলুম-- কিন্তু বইটা রাখো।

 

রসিকের প্রবেশ

 

রসিক।

এই-যে আপনারা এসে একলা বসে আছেন-- কিছু মনে করবেন না--

 

শ্রীশ।

কিছু না। এই ঘরটি আমাদের সাদর সম্ভাষণ করে নিয়েছিল।

 

রসিক।

আপনাদের কত কষ্ট দেওয়া গেল।

 

শ্রীশ।

কষ্ট আর দিতে পারলেন কই। একটা কষ্টের মতো কষ্ট স্বীকার করবার সুযোগ পেলে কৃতার্থ হতুম।

 

রসিক।

যা হোক, অল্পক্ষণের মধ্যে চুকে যাবে এই এক সুবিধে। তার পরেই আপনারা স্বাধীন। ভেবে দেখুন দেখি, যদি এটা সত্যকার ব্যাপার হত তা হলেই "পরিণামে বন্ধনভয়ম্‌'। বিবাহ জিনিসটা মিষ্টান্ন দিয়েই শুরু হয়, কিন্তু সকল সময় মধুরেণ সমাপ্ত হয় না। আচ্ছা, আজ আপনারা দুঃখিতভাবে এরকম চুপচাপ করে বসে আছেন কেন বলুন দেখি। আমি বলছি, আপনাদের কোনো ভয় নেই। আপনারা বনের বিহঙ্গ, দুটিখানি সন্দেশ খেয়েই আবার বনে উড়ে যাবেন-- কেউ আপনাদের বাঁধবে না। নাত্র ব্যাধশরাঃ পতন্তি পরিতো নৈবাত্র দাবানলঃ। দাবানলের পরিবর্তে ডাবের জল পাবেন।

 

শ্রীশ।

আমাদের সে দুঃখ নয় রসিকবাবু, আমরা ভাবছি-- আমাদের দ্বারা কতটুকু উপকারই বা হচ্ছে। ভবিষ্যতের সমস্ত আশঙ্কা তো দূর করতে পারছি নে।

 

রসিক।

বিলক্ষণ! যা করছেন তাতে আপনারা দুটি অবলাকে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ করছেন-- অথচ নিজেরা কোনোপ্রকার পাশেই বদ্ধ হচ্ছেন না।

 

জগত্তারিণী।

(নেপথ্যে মৃদুস্বরে) আঃ, নেপো কী ছেলেমানুষি করছিস। শিগ্‌গির চোখের জল মুছে ঘরের মধ্যে যা, লক্ষ্মী মা আমার-- কেঁদে চোখ লাল করলে কী রকম ছিরি হবে ভেবে দেখ্‌ দেখি।-- নীরো, যা না। তোদের সঙ্গে আর পারি নে বাপু। ভদ্রলোকদের কতক্ষণ বসিয়ে রাখবি। কী মনে করবেন।

 

শ্রীশ।

ঐ শুনেছেন রসিকবাবু? এ অসহ্য। এর চেয়ে রাজপুতদের কন্যাহত্যা ভালো।

 

বিপিন।

রসিকবাবু, এঁদের এই সংকট থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা করবার জন্যে আপনি আমাদের যা বলবেন আমরা তাতেই প্রস্তুত আছি।

 

রসিক।

কিছু না, আপনাদের আর অধিক কষ্ট দেব না। কেবল আজকের দিনটা উত্তীর্ণ করে দিয়ে যান, তার পরে আপনাদের আর-কিছুই ভাবতে হবে না।

 

শ্রীশ।

ভাবতে হবে না? কী বলেন রসিকবাবু। আমরা কি পাষাণ। আজ থেকেই আমরা বিশেষরূপে এঁদের জন্যে ভাববার অধিকার পাব।

 

বিপিন।

এমন ঘটনার পর আমরা যদি এঁদের সম্বন্ধে উদাসীন হই তবে আমরা কাপুরুষ।

 

শ্রীশ।

এখন থেকে এঁদের জন্যে ভাবা আমাদের পক্ষে গর্বের বিষয়-- গৌরবের বিষয়।

 

রসিক।

তা বেশ, ভাববেন, কিন্তু বোধ হয় ভাবা ছাড়া আর-কোনো কষ্ট করতে হবে না।

 

শ্রীশ।

আচ্ছা রসিকবাবু, আমাদের কষ্ট স্বীকার করতে দিতে আপনার এত আপত্তি হচ্ছে কেন।

 

বিপিন।

এঁদের জন্যে যদিই আমাদের কোনো কষ্ট করতে হয় সেটা যে আমরা সম্মান বলে জ্ঞান করব।

 

শ্রীশ।

দু দিন ধরে, রসিকবাবু, বেশি কষ্ট পেতে হবে না ব'লে আপনি ক্রমাগতই আমাদের আশ্বাস দিচ্ছেন-- এতে আমরা বাস্তবিক দুঃখিত হয়েছি।

 

রসিক।

আমাকে মাপ করবেন-- আমি আর কখনো এমন অবিবেচনার কাজ করব না। আপনারা কষ্ট স্বীকার করবেন।

 

শ্রীশ।

আপনি কি এখনো আমাদের চিনলেন না।

 

রসিক।

চিনেছি বৈকি, সেজন্যে আপনারা কিছুমাত্র চিন্তিত হবেন না।

 

কুণ্ঠিত নৃপবালা ও নীরবালার প্রবেশ

 

শ্রীশ।

(নমস্কার করিয়া) রসিকবাবু, আপনি এঁদের বলুন আমাদের যেন মার্জনা করেন।

 

বিপিন।

আমরা যদি ভ্রমেও ওঁদের লজ্জা বা ভয়ের কারণ হই তবে তার চেয়ে দুঃখের বিষয় আমাদের পক্ষে আর কিছুই হতে পারে না, সেজন্যে যদি ক্ষমা না করেন তবে--

 

রসিক।

বিলক্ষণ! ক্ষমা চেয়ে অপরাধিনীদের অপরাধ আরো বাড়াবেন না। এঁদের অল্প বয়স, মান্য অতিথিদের কিরকম সম্ভাষণ করা উচিত তা যদি এঁরা হঠাৎ ভুলে গিয়ে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকেন তা হলে আপনাদের প্রতি অসদ্ভাব কল্পনা করে এঁদের আরো লজ্জিত করবেন না। নৃপদিদি, নীরদিদি, কী বল ভাই। যদিও এখনো তোমাদের চোখের পাতা শুকোয় নি তবু এঁদের প্রতি তোমাদের মন যে বিমুখ নয় সে কথা কি জানাতে পারি।

 

নৃপ ও নীরু লজ্জিত নিরুত্তর

 

না, একটু আড়ালে জিজ্ঞাসা করা দরকার। (জনান্তিকে) ভদ্রলোকদের এখন কী বলি বলো তো ভাই। বলব কি, তোমরা যত শীঘ্র পার বিদায় হও।

 

নীরবালা।

(মৃদুস্বরে) রসিকদাদা, কী বক তার ঠিক নেই, আমরা কি তাই বলেছি-- আমরা কি জানতুম এঁরা এসেছেন।

 

রসিক।

(শ্রীশ ও বিপিনের প্রতি) এঁরা বলছেন--

 

                    

       সখা, কী মোর কলমে লেখি--

                    

       তাপন বলিয়া তপনে ডরিনু,

                    

       চাঁদের কিরণ দেখি।

 

--এর উপরে আপনাদের আর কিছু বলবার আছে?

 

 

 

 

নীরবালা।

(জনান্তিকে) আঃ রসিকদাদা, কী বলছ তার ঠিক নেই। ও কথা আমরা কখন বললুম।

 

রসিক।

(শ্রীশ ও বিপিনের প্রতি) এঁদের মনের ভাবটা আমি সম্পূর্ণ ব্যক্ত করতে পারি নি বলে এঁরা আমাকে ভর্ৎসনা করছেন। এঁরা বলতে চান চাঁদের কিরণ বললেও যথেষ্ট বলা হয় না-- তার চেয়ে আরো যদি--

 

নীরবালা।

(জনান্তিকে) তুমি অমন কর যদি তা হলে আমরা চলে যাব।

 

রসিক।

সখি, ন্‌ যুক্তম্‌ অকৃতসৎকারম্‌ অতিথিবিশেষম্‌ উজ্‌ঝিত্বা স্বচ্ছন্দতো গমনম্‌। (শ্রীশ ও বিপিনের প্রতি) এঁরা বলছেন এঁদের যথার্থ মনের ভাবটি যদি আপনাদের কাছে ব্যক্ত করে বলি, তা হলে এঁরা লজ্জায় এ ঘর থেকে চলে যাবেন।

 

[ নীরবালা ও নৃপবালার প্রস্থানোদ্যম

 

শ্রীশ।

রসিকবাবুর অপরাধে আপনারা নির্দোষদের সাজা দেবেন কেন। আমরা তো কোনোপ্রকার প্রগল্‌ভতা করি নি।

 

নৃপবালা ও নীরবালার "ন যযৌ ন তস্থৌ' ভাব

 

বিপিন।

(নীরকে লক্ষ্য করিয়া) পূর্বকৃত কোনো অপরাধ যদি থাকে তো ক্ষমা-প্রার্থনার অবকাশ কি দেবেন না।

 

রসিক।

(জনান্তিকে) এই ক্ষমাটুকুর জন্যে বেচারা অনেক দিন থেকে সুযোগ প্রত্যাশা করছে।

 

নীরবালা।

(জনান্তিকে) অপরাধ কী হয়েছে যে ক্ষমা করতে যাব।

 

রসিক।

(বিপিনের প্রতি) ইনি বলছেন আপনার অপরাধ এমন মনোহর যে তাকে ইনি অপরাধ বলে লক্ষ্যই করেন নি। কিন্তু, আমি যদি সেই খাতাটি হরণ করতে সাহসী হতেম তবে সেটা অপরাধ হত-- আইনের বিশেষ ধারায় এইরকম লিখছে।

 

বিপিন।

ঈর্ষা করবেন না রসিকবাবু। আপনারা সর্বদাই অপরাধ করবার সুযোগ পান এবং সেজন্যে দণ্ডভোগ করে কৃতার্থ হন। আমি দৈবক্রমে একটা অপরাধ করবার সুযোগ পেয়েছিলুম, কিন্তু এতই অধম যে দণ্ডনীয় বলেও গণ্য হলেম না, ক্ষমা পাবার যোগ্যতাও লাভ করলেম না।

 

রসিক।

বিপিনবাবু, একেবারে হতাশ হবেন না। শাস্তি অনেক সময় বিলম্বে আসে, কিন্তু নিশ্চিত আসে। ফস্‌ করে মুক্তি না পেতেও পারেন।

 

ভৃত্যের প্রবেশ

 

ভৃত্য।

জলখাবার তৈরি।

 

[ নৃপবালা ও নীরবালার প্রস্থান

 

শ্রীশ।

আমরা কি দুর্ভিক্ষের দেশ থেকে আসছি রসিকবাবু। জলখাবারের জন্যে এত তাড়া কেন।

 

রসিক।

মধুরেণ সমাপয়েৎ।

 

শ্রীশ।

(নিশ্বাস ফেলিয়া) কিন্তু সমাপনটা তো মধুর নয়। (জনান্তিকে বিপিনের প্রতি) কিন্তু বিপিন, এঁদের তো প্রতারণা করে যেতে পারব না।

 

বিপিন।

(জনান্তিকে) তা যদি করি তবে আমরা পাষণ্ড।

 

শ্রীশ।

(জনান্তিকে) এখন আমাদের কর্তব্য কী।

 

বিপিন।

(জনান্তিকে) সে কি আর জিজ্ঞাসা করতে হবে।

 

রসিক।

আপনারা দেখছি ভয় পেয়ে গেছেন। কোনো আশঙ্কা নেই, শেষকালে যেমন করেই হোক আমি আপনাদের উদ্ধার করবই।

 

শ্রীশ ও বিপিন আহারে প্রবৃত্ত হইল

 

ঘরের অন্য দিকে অক্ষয় ও জগত্তারিণীর প্রবেশ

 

জগত্তারিণী।

দেখলে তো বাবা, কেমন ছেলে দুটি?

 

অক্ষয়।

মা, তোমার পছন্দ ভালো, এ কথা তো আমি অস্বীকার করতে পারি নে।

 

জগত্তারিণী।

মেয়েদের রকম দেখলে তো বাবা? এখন কান্নাকাটি কোথায় গেছে তার ঠিক নেই।

 

অক্ষয়।

ঐ তো ওদের দোষ। কিন্তু মা, তোমাকে নিজে গিয়ে আশীর্বাদ ক'রে ছেলেদুটিকে দেখতে হচ্ছে।

 

জগত্তারিণী।

সে কি ভালো হবে অক্ষয়। ওরা কি পছন্দ জানিয়েছে।

 

অক্ষয়।

খুব জানিয়েছে। এখন তুমি নিজে এসে আশীর্বাদ করে গেলেই চট্‌পট্‌ স্থির হয়ে যায়।

 

জগত্তারিণী।

তা বেশ, তোমরা যদি বল, তা যাব, আমি ওদের মার বয়সী-- আমার লজ্জা কিসের।

 

পুরবালার প্রবেশ

 

জগত্তারিণী।

কী আর বলব পুরো, এমন সোনার চাঁদ ছেলে।

 

পুরবালা।

তা জানতুম। নীর-নৃপর অদৃষ্টে কি খারাপ ছেলে হতে পারে।

 

অক্ষয়।

তাদের বড়দিদির অদৃষ্টের আঁচ লেগেছে আর-কি।

 

পুরবালা।

আচ্ছা, থামো। যাও দেখি, তাদের সঙ্গে একটু আলাপ করো গে; কিন্তু শৈল গেল কোথায়।

 

অক্ষয়।

সে খুশি হয়ে দরজা বন্ধ করে পুজোয় বসেছে।

 

শ্রীশ ও বিপিনের নিকট আসিয়া

 

ব্যাপারটা কী। রসিকদা, আজকাল তো খুব খাওয়াচ্ছ দেখছি। প্রত্যহ যাকে দু বেলা দেখছ তাকে হঠাৎ ভুলে গেলে?

 

রসিক।

এঁদের নূতন আদর, পাতে যা পড়ছে তাতেই খুশি হচ্ছেন। তোমার আদর পুরোনো হয়ে এল, তোমাকে নূতন করে খুশি করি এমন সাধ্য নেই ভাই।

 

অক্ষয়।

কিন্তু শুনেছিলেম, আজকের সমস্ত মিষ্টান্ন এবং এ পরিবারের সমস্ত অনাস্বাদিত মধু উজাড় করে নেবার জন্যে দুটি অখ্যাতনামা যুবকের অভ্যুদয় হবে-- এঁরা তাঁদেরই অংশে ভাগ বসাচ্ছেন নাকি। ওহে রসিকদা, ভুল কর নি তো?

 

রসিক।

ভুলের জন্যেই তো আমি বিখ্যাত। বড়োমা জানেন তাঁর বুড়ো রসিক-কাকা যাতে হাত দেবেন তাতেই গলদ হবে।

 

অক্ষয়।

বল কী রসিকদাদা। করেছ কী। সে দুটি ছেলেকে কোথায় পাঠালে?

 

রসিক।

ভ্রমক্রমে তাঁদের ভুল ঠিকানা দিয়েছি।

 

অক্ষয়।

সে বেচারাদের কী গতি হবে।

 

রসিক।

বিশেষ অনিষ্ট হবে না। তাঁরা কুমারটুলিতে নীলমাধব চৌধুরির বাড়িতে এতক্ষণে জলযোগ সমাধা করেছেন। বনমালী ভট্টাচার্য তাঁদের তত্ত্বাবধানের ভার নিয়েছেন।

 

অক্ষয়।

তা যেন বুঝলুম, মিষ্টান্ন সকলেরই পাতে পড়ল, কিন্তু তোমারই জলযোগটি কিছু কটু রকম হবে। এইবেলা ভ্রম সংশোধন করে নাও। শ্রীশবাবু, বিপিনবাবু, কিছু মনে কোরো না-- এর মধ্যে একটু পারিবারিক রহস্য আছে।

 

শ্রীশ।

সরলপ্রকৃতি রসিকবাবু সে রহস্য আমাদের নিকট ভেদ করেই দিয়েছেন। আমাদের ফাঁকি দিয়ে আনেন নি।

 

বিপিন।

মিষ্টান্নের থালায় আমরা অনধিকার আক্রমণ করি নি, শেষ পর্যন্ত তার প্রমাণ দিতে প্রস্তুত আছি।

 

অক্ষয়।

বল কী বিপিনবাবু। তা হলে চিরকুমার-সভাকে চিরজন্মের মতো কাঁদিয়ে এসেছ? জেনেশুনে, ইচ্ছাপূর্বক?

 

রসিক।

না না, তুমি ভুল করছ অক্ষয়।

 

অক্ষয়।

আবার ভুল? আজ কি সকলেরই ভুল করবার দিন হল নাকি।--

 

গান

 

                    

ভুলে ভুলে আজ ভুলময়।

                    

   ভুলের লতায় বাতাসের ভুলে

                    

               ফুলে ফুলে হোক ফুলময়।

                    

       আনন্দ-ঢেউ ভুলের সাগরে উছলিয়া হোক কূলময়।

                    

 

 

রসিক।

এ কী, বড়োমা আসছেন যে!

 

অক্ষয়।

আসবারই তো কথা। উনি তো কুমারটুলির ঠিকানায় যাবেন না।

 

জগত্তারিণীর প্রবেশ

 

শ্রীশ ও বিপিনের ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম

 

দুইজনকে দুই মোহর দিয়া জগত্তারিণীর আশীর্বাদ। জনান্তিকে অক্ষয়ের সহিত জগত্তারিণীর আলাপ

 

অক্ষয়।

মা বলছেন, তোমাদের আজ ভালো করে খাওয়া হল না, সমস্তই পাতে পড়ে রইল।

 

শ্রীশ।

আমরা দুবার চেয়ে নিয়ে খেয়েছি।

 

বিপিন।

যেটা পাতে পড়ে আছে ওটা তৃতীয় কিস্তি।

 

শ্রীশ।

ওটা না পড়ে থাকলে আমাদেরই পড়ে থাকতে হত।

 

জগত্তারিণী।

(জনান্তিকে) তা হলে তোমরা ওঁদের বসিয়ে কথাবার্তা কও বাছা, আমি আসি।

 

[ প্রস্থান

 

রসিক।

না, এ ভারি অন্যায় হল।

 

অক্ষয়।

অন্যায়টা কী হল।

 

রসিক।

আমি ওঁদের বার বার করে বলে এসেছি যে, ওঁরা কেবল আজ আহারটি করেই ছুটি পাবেন, কোনোরকম বধবন্ধনের আশঙ্কা নেই। কিন্তু--

 

শ্রীশ।

ওর মধ্যে কিন্তুটা কোথায় রসিকবাবু। আপনি অত চিন্তিত হচ্ছেন কেন।

 

রসিক।

বলেন কী শ্রীশবাবু, আপনাদের আমি কথা দিয়েছি যখন--

 

বিপিন।

তা বেশ তো, এমনিই কী মহাবিপদে ফেলেছেন।

 

শ্রীশ।

মা আমাদের যে আশীর্বাদ করে গেলেন আমার যেন তার যোগ্য হই।

 

রসিক।

না না, শ্রীশবাবু, সে কোনো কাজের কথা নয়। আপনারা যে দায়ে পড়ে ভদ্রতার খাতিরে--

 

বিপিন।

রসিকবাবু, আমাদের প্রতি অবিচার করবেন না-- দায়ে পড়ে--

 

রসিক।

দায় নয় তো কী মশায়। সে কিছুতেই হবে না। আমি বরঞ্চ সেই ছেলেদুটোকে বনমালীর হাত ছাড়িয়ে কুমারটুলি থেকে এখনো ফিরিয়ে আনব, তবু--

 

শ্রীশ।

আপনার কাছে কী অপরাধ করেছি রসিকবাবু।

 

রসিক।

না না, এ তো অপরাধের কথা হচ্ছে না। আপনারা ভদ্রলোক, কৌমার্যব্রত অবলম্বন করেছেন-- আমার অনুরোধে পড়ে পরের উপকার করতে এসে শেষকালে--

 

বিপিন।

শেষকালে নিজের উপকার করে ফেলব এটুকু আপনি সহ্য করতে পারবেন না-- এমনি হিতৈষী বন্ধু!

 

শ্রীশ।

আমরা যেটাকে সৌভাগ্য বলে স্বীকার করছি-- আপনি তার থেকে আমাদের বঞ্চিত করতে চেষ্টা করছেন কেন।

 

রসিক।

শেষকালে আমাকে দোষ দেবেন না।

 

বিপিন।

নিশ্চয় দেব, যদি না আপনি স্থির হয়ে শুভকর্মে সহায়তা করেন।

 

রসিক।

আমি এখনো সাবধান করছি--

 

গতং তদ্‌গাম্ভীর্যং তটমপি চিতং জালিকশতৈঃ

সখে হংসোত্তিষ্ঠ ত্বরিতমমুতো গচ্ছ সরসঃ।

সে গাম্ভীর্য গেল কোথা,            নদীতট হেরো হোথা

জালিকেরা জালে ফেলে ঘিরে--

সখে হংস, ওঠো ওঠো,             সময় থাকিতে ছোটো

হেথা হতে মানসের তীরে।

 

 

শ্রীশ।

কিছুতেই না। তা, আপনার সংস্কৃত শ্লোক ছুঁড়ে মারলেও সখা হংসরা কিছুতেই এখান থেকে নড়ছেন না।

 

রসিক।

স্থান খারাপ বটে, নড়বার জো নেই। আমি তো অচল হয়ে বসে আছি-- হায় হায়--

 

অয়িকুরঙ্গ তপোবনবিভ্রমাৎ

     উপগতাসি কিরাতপুরীমিমাম্‌।

 

 

ভৃত্যের প্রবেশ

 

ভৃত্য।

চন্দ্রবাবু এসেছেন।

 

অক্ষয়।

এইখানেই ডেকে নিয়ে আয়।

 

[ ভৃত্যের প্রস্থান

 

রসিক।

একেবারে দারোগার হাতে চোর-দুটিকে সমর্পণ করে দেওয়া হোক।

 

চন্দ্রবাবুর প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

এই-যে, আপনারা এসেছেন। পূর্ণবাবুকেও দেখছি।

 

অক্ষয়।

আজ্ঞে না, আমি পূর্ণ নই, তবু অক্ষয় বটে।

 

চন্দ্রবাবু।

অক্ষয়বাবু। তা, বেশ হয়েছে, আপনাকেও দরকার ছিল।

 

অক্ষয়।

আমার মতো অদরকারি লোককে যে- দরকারে লাগাবেন তাতেই লাগতে পারি-- বলুন কী করতে হবে।

 

চন্দ্রবাবু।

আমি ভেবে দেখেছি আমাদের সভা থেকে কুমারব্রতের নিয়ম না ওঠালে সভাকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে রাখা হচ্ছে। শ্রীশবাবু বিপিনবাবুকে এই কথাটা একটু ভালো করে বোঝাতে হবে।

 

অক্ষয়।

ভারি কঠিন কাজ, আমার দ্বারা হবে কিনা সন্দেহ।

 

চন্দ্রবাবু।

একবার একটা মতকে ভালো ব'লে গ্রহণ করেছি ব'লেই সেটাকে পরিত্যাগ করবার ক্ষমতা দূর করা উচিত নয়। মতের চেয়ে বিবেচনাশক্তি বড়ো। শ্রীশবাবু, বিপিনবাবু--

 

শ্রীশ।

আমাদের অধিক বলা বাহুল্য--

 

চন্দ্রবাবু।

কেন বাহুল্য। আপনারা যুক্তিতেও কর্ণপাত করবেন না?

 

বিপিন।

আমরা আপনারই মতে--

 

চন্দ্রবাবু।

আমার মত এক সময় ভ্রান্ত ছিল সে কথা স্বীকার করছি, আপনারা এখনো সেই মতেই--

 

রসিক।

এই-যে পূর্ণবাবু আসছেন। আসুন আসুন।

 

পূর্ণর প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

পূর্ণবাবু, তোমার প্রস্তাবমতে আমাদের সভা থেকে কুমারব্রত তুলে দেবার জন্যেই আজ আমরা এখানে মিলিত হয়েছি। কিন্তু, শ্রীশবাবু এবং বিপিনবাবু অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এখন ওঁদের বোঝাতে পারলেই--

 

রসিক।

ওঁদের বোঝাতে আমি ত্রুটি করি নি চন্দ্রবাবু--

 

চন্দ্রবাবু।

আপনার মতো বাগ্মী যদি ফল না পেয়ে থাকেন তা হলে--

 

রসিক।

ফল যা পেয়েছি "তা ফলেন পরিচীয়তে'।

 

চন্দ্রবাবু।

কি বলছেন ভালো বুঝতে পারছি নে।

 

অক্ষয়।

ওহে রসিকদা, চন্দ্রবাবুকে খুব স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। আমি দুটি প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনই এনে উপস্থিত করছি।

 

শ্রীশ।

পূর্ণবাবু, ভালো আছেন তো?

 

পূর্ণ।

হাঁ।

 

বিপিন।

আপনাকে একটু শুকনো দেখাচ্ছে।

 

পূর্ণ।

না, কিছু না।

 

শ্রীশ।

আপনাদের পরীক্ষার আর তো দেরি নেই।

 

পূর্ণ।

না।

 

নৃপবালা ও নীরবালাকে লইয়া অক্ষয়ের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

(নৃপবালা ও নীরবালার প্রতি) ইনি চন্দ্রবাবু, ইনি তোমাদের গুরুজন,এঁকে প্রণাম করো। (নৃপ ও নীরর প্রণাম) চন্দ্রবাবু, নূতন নিয়মে আপনাদের সভায় এই দুটি সভ্য বাড়ল।

 

চন্দ্রবাবু।

বড়ো খুশি হলেম। এঁরা কে।

 

অক্ষয়।

আমার সঙ্গে এঁদের সম্বন্ধ খুব ঘনিষ্ঠ। এঁরা আমার দুটি শ্যালী। শ্রীশবাবু এবং বিপিনবাবুর সঙ্গে এঁদের সম্বন্ধ শুভলগ্নে আরো ঘনিষ্ঠতর হবে। এঁদের প্রতি দৃষ্টি করলেই বুঝবেন, রসিকবাবু এই যুবক-দুটির যে মতের পরিবর্তন করিয়েছেন সে কেবলমাত্র বাগ্মিতার দ্বারা নয়।

 

চন্দ্রবাবু।

বড়ো আনন্দের কথা।

 

পূর্ণবাবু।

শ্রীশবাবু, বড়ো খুশি হলুম। বিপিনবাবু, আপনাদের বড়ো সৌভাগ্য। আশা করি অবলাকান্তবাবুও বঞ্চিত হন নি, তাঁরও একটি--

 

নির্মলার প্রবেশ

 

চন্দ্রবাবু।

নির্মলা, শুনে খুশি হবে, শ্রীশবাবু এবং বিপিনবাবুর সঙ্গে এঁদের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির হয়ে গেছে। তা হলে কুমারব্রত উঠিয়ে দেওয়া সম্বন্ধে প্রস্তাব উত্থাপন করাই বাহুল্য।

 

নির্মলা।

কিন্তু অবলাকান্তবাবুর মত তো নেওয়া হয় নি-- তাঁকে এখানে দেখছি নে-

 

চন্দ্রবাবু।

ঠিক কথা, আমি সেটা ভুলেই গিয়েছিলুম-- তিনি আজ এখনো এলেন না কেন।

 

রসিক।

কিছু চিন্তা করবেন না, তাঁর পরিবর্তন দেখলে আপনারা আরো আশ্চর্য হবেন।

 

অক্ষয়।

চন্দ্রবাবু, এবারে আমাকেও দলে নেবেন। সভাটি যেরকম লোভনীয় হয়ে উঠল এখন আমাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন না।

 

চন্দ্রবাবু।

আপনাকে পাওয়া আমাদের সৌভাগ্য।

 

অক্ষয়।

আমার সঙ্গে সঙ্গে আর-একটি সভ্যও পাবেন। আজকের সভায় তাঁকে কিছুতেই উপস্থিত করতে পারলেম না। এখন তিনি নিজেকে সুলভ করবেন না-- বাসরঘরে ভূতপূর্ব কুমার-সভাটিকে সাধ্যমত পিণ্ডদান করে তার পরে যদি দেখা দেন। এইবার অবশিষ্ট সভ্যটি এলেই আমাদের চিরকুমার-সভা সম্পূর্ণ সমাপ্ত হয়।

 

শৈলবালার প্রবেশ

 

শৈলবালা।

(চন্দ্রবাবুকে প্রণাম করিয়া) আমাকে ক্ষমা করবেন।

 

শ্রীশ।

এ কী, অবলাকান্তবাবু--

 

অক্ষয়।

আপনারা মত-পরিবর্তন করেছেন, ইনি বেশ-পরিবর্তন করেছেন মাত্র।

 

রসিক।

শৈলজা ভবানী এতদিন কিরাতবেশ ধারণ করেছিলেন, আজ ইনি আবার তপস্বিনীবেশ গ্রহণ করলেন।

 

চন্দ্রবাবু।

নির্মলা, আমি কিছুই বুঝতে পারছি নে।

 

নির্মলা।

অন্যায়! ভারি অন্যায়! অবলাকান্তবাবু--

 

অক্ষয়।

নির্মলা দেবী ঠিক বলেছেন-- অন্যায়। কিন্তু, সে বিধাতার অন্যায়। এঁর অবলাকান্ত হওয়াই উচিত ছিল, কিন্তু ভগবান এঁকে বিধবা শৈলবালা করে কী মঙ্গল সাধন করছেন সে রহস্য আমাদের অগোচর।

 

শৈলবালা।

(নির্মলার প্রতি) আমি অন্যায় করেছি, সে অন্যায়ের প্রতিকার আমার দ্বারা কী হবে? আশা করি কালে সমস্ত সংশোধন হয়ে যাবে।

 

পূর্ণ।

(নির্মলার নিকটে আসিয়া) এই অবকাশে আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, চন্দ্রবাবুর পত্রে আমি যে স্পর্ধা প্রকাশ করেছিলুম সে আমার পক্ষে অন্যায় হয়েছিল-- আমার মতো অযোগ্য--

 

চন্দ্রবাবু।

কিছু অন্যায় হয় নি পূর্ণবাবু, আপনার যোগ্যতা যদি নির্মলা না বুঝতে পারেন তো সে নির্মলারই বিবেচনার অভাব।

 

[ নির্মলার নতমুখে নিরুত্তরে প্রস্থান

 

রসিক।

(পূর্ণের প্রতি জনান্তিকে) ভয় নেই পূর্ণবাবু, আপনার দরখাস্ত মঞ্জুর-- প্রজাপতির আদালতে ডিক্রি পেয়েছেন-- কাল প্রত্যুষেই জারি করতে বেরোবেন।

 

শ্রীশ।

(শৈলবালার প্রতি) বড়ো ফাঁকি দিয়েছেন।

 

বিপিন।

সম্বন্ধের পূর্বেই পরিহাসটা করে নিয়েছেন।

 

শৈলবালা।

পরে তাই বলে নিষ্কৃতি পাবেন না।

 

বিপিন।

নিষ্কৃতি চাই নে।

 

রসিক।

এইবারে নাটক শেষ হল। এইখানে ভরতবাক্য উচ্চারণ করে দেওয়া যাক--

 

                    

সর্বস্তরতু দুর্গাণি সর্বো ভদ্রাণি পশ্যতু।

                    

    সর্বঃ কামানবাপ্নোতু সর্বঃ সর্বত্র নন্দতু॥

                    

 

                    

 


Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | SINGLE PAGE