Home > Plays > ভগ্নহৃদয় > ভগ্নহৃদয়
Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 | 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 | 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | 29 | 30 | 31 | 32 | 33 | 34 | SINGLE PAGE

ভগ্নহৃদয়    

উপহার

 

শ্রীমতী হে ..........,

 

 


 

হৃদয়ের বনে বনে সূর্য্যমুখী শত শত

ওই মুখপানে চেয়ে ফুটিয়া উঠেছে যত।

বেঁচে থাকে বেঁচে থাক্‌,   শুকায়ে শুকায়ে যাক্‌,

ওই মুখপানে তারা চাহিয়া থাকিতে চায়।

বেলা অবসান হবে,  মুদিয়া আসিবে যবে

ওই মুখ চেয়ে যেন নীরবে ঝরিয়া যায়!

 

 


 

জীবনসমূদ্রে তব জীবনতটিনী মোর

মিশায়েছি একেবারে আনন্দে হইয়ে ভোর।

সন্ধ্যার বাতাস লাগি   ঊর্ম্মি যত উঠে জাগি

অথবা তরঙ্গ উঠে ঝটিকায় আকুলিয়া--

জানে বা না জানে কেউ   জীবনের প্রতি ঢেউ

মিশিবে-- বিরাম পাবে-- তোমার চরণে গিয়া।

 

 


 

হয়ত জান না, দেবি, অদৃশ্য বাঁধন দিয়া

নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ মোর হিয়া।

গেছি দূরে, গেছি কাছে,   সেই আকর্ষণ আছে,

পথভ্রষ্ট হই নাক তাহারি অটল বলে।

নহিলে হৃদয় মম   ছিন্নধূমকেতু-সম

দিশাহারা হইত সে অনন্ত আকাশতলে!

 

 


 

আজ সাগরের তীরে দাঁড়ায়ে তোমার কাছে;

পরপারে মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার দেশ আছে।

দিবস ফুরাবে যবে  সে দেশে যাইতে হবে,

এ পারে ফেলিয়া যাব আমার তপন শশী--

ফুরাইবে গীত গান,   অবসাদে ম্রিয়মাণ,

সুখ শান্তি অবসান-- কাঁদিব আঁধারে বসি!

 

 


 

স্নেহের অরুণালোকে খুলিয়া হৃদয় প্রাণ

এ পারে দাঁড়ায়ে, দেবি, গাহিনু যে শেষ গান

তোমারি মনের ছায়   সে গান আশ্রয় চায়--

একটি নয়নজল তাহারে করিও দান।

আজিকে বিদায় তবে,  আবার কি দেখা হবে--

পাইয়া স্নেহের আলো হৃদয় গাহিবে গান?

 

 

কাব্যের পাত্রগণ

কবি; অনিল; মুরলা (অনিলের ভগ্নী ও কবির বাল্যসহচরী); ললিতা (অনিলের প্রণয়িনী); নলিনী (এক চপলস্বভাবা কুমারী; চপলা (মুরলার সখী)


লীলা; সুরুচি মাধবী প্রভৃতি (নলিনীর সখীগণ)


সুরেশ, বিজয়, বিনোদ প্রভৃতি (নলিনীর বিবাহ বা প্রণয়াকাঙ্ক্ষী)


ভূমিকা

 

এই কাব্যটিকে কেহ যেন নাটক মনে না করেন। নাটক ফুলের গাছ। তাহাতে ফুল ফুটে বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে মূল, কাণ্ড, শাখা, পত্র, এমন কি কাঁটাটি পর্য্যন্ত থাকা চাই। বর্ত্তমান কাব্যটি ফুলের মালা, ইহাতে কেবল ফুলগুলি মাত্র সংগ্রহ করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, যে, দৃষ্টান্তস্বরূপেই ফুলের উল্লেখ করা হইল।

 



দৃশ্য-- বন। চপলা ও মুরলা

 

চপলা।

           সখি, তুই হলি কি আপনা-হারা?

এ ভীষণ বনে পশি     একেলা আছিস্‌ বসি

খুঁজে খুঁজে হোয়েছি যে সারা!

এমন আঁধার ঠাঁই--    জনপ্রাণী কেহ নাই,

জটিল-মস্তক বট চারি দিকে ঝুঁকি!

দুয়েকটি রবিকর   সাহসে করিয়া ভর

অতি সন্তর্পণে যেন মারিতেছে উঁকি।

অন্ধকার, চারি দিক হ'তে, মুখপানে

এমন তাকায়ে রয়,বুকে বড় লাগে ভয়,

কি সাহসে রোয়েছিস্‌ বসিয়া এখানে?

 

 

মুরলা।

          সখি, বড় ভালবাসি এই ঠাঁই!

বায়ু বহে হুহু করি,পাতা কাঁপে ঝর ঝরি,

স্রোতস্বিনী কুলু কুলু করিছে সদাই!

বিছায়ে শুকানো পাতা  বটমূলে রাখি মাথা

দিনরাত্রি পারি, সখি, শুনিতে ও ধ্বনি।

বুকের ভিতরে গিয়া     কি যে উঠে উথলিয়া

বুঝায়ে বলিতে তাহা পারি না সজনি!

যা সখি, একটু মোরে রেখে দে একেলা,

এ বন আঁধার ঘোরভাল লাগিবে না তোর,

তুই কুঞ্জবনে, সখি, কর্‌ গিয়ে খেলা!

 

 

চপলা।

          মনে আছে, অনিলের ফুলশয্যা আজ?

তুই হেথা বোসে র'বি, কত আছে কাজ!

কত ভোরে উঠে    বনে গেছি ছুটে,

        মাধবীরে লোয়ে ডাকি,

ডালে ডালে যত    ফুল ছিল ফুটে

        একটি রাখি নি বাকি!

শিশিরে ভিজিয়ে    গিয়েছে আঁচল,

        কুসুমরেণুতে মাখা।

কাঁটা বিঁধে, সখি,  হোয়েছিনু সারা

        নোয়াতে গোলাপ-শাখা!

তুলেছি করবী       গোলাপ-গরবী,

        তুলেছি টগরগুলি,

যুঁইকুঁড়ি যত        বিকেলে ফুটিবে

        তখন আনিব তুলি।

আয়, সখি, আয়,   ঘরে ফিরে আয়,

        অনিলে দেখ্‌সে আজ--

হরষের হাসি        অধরে ধরে না,

        কিছু যদি আছে লাজ!

 

 

মুরলা।

          আহা সখি, বড় তারা ভালবাসে দুই জনে!

 

 

চপলা।

          হ্যাঁ সখি, এমন আর দেখি নি ত বর-কোনে!

জানিস্‌ ত, সখি, ললিতার মত

       অমন লাজুক মেয়ে

অনিলের সাথে দেখা করিবারে

প্রতিদিন যায় বিপাশার ধারে

      সরমের মাথা খেয়ে!

কবরীতে বাঁধি কুসুমের মালা,

       নয়নে কাজলরেখা,

চুপি চুপি যায়, ফিরে ফিরে চায়,

       বনপথ দিয়ে একা!

দূর হোতে দেখি অনিলে অমনি

   সরমে চরণ সরে না যেন!

ফিরিবে ফিরিবে মনে মনে করি

    চরণ ফিরিতে পারে না যেন!

অনিল অমনি দূর হোতে আসি

       ধরি তার হাতখানি

কহে যে কত-কি হৃদয়-গলানো

    সোহাগে মাখানো বাণী।

আমি ছিনু, সখি, লুকিয়ে তখন

     গাছের আড়ালে আসি,

লুকিয়ে লুকিয়ে দেখিতেছিলেম

    রাখিতে পারি নে হাসি!

কত কথা ক'য়ে কত হাত ধরি

কত শত বার সাধাসাধি করি

বসাইল যুবা ললিতা বালারে

       বকুল গাছের ছায়।

মাথার উপরে ঝরে শত ফুল--

যেন গো করুণ তরুণ বকুল

ফুল চাপা দিয়ে লাজুক মেয়েরে

     ঢাকিয়া ফেলিতে চায়!

ললিতার হাত কাঁপে থর থর,

আঁখি দুটি নত মাটির উপর,

ভূমি হোতে এক কুসুম তুলিয়া

     ছিঁড়িতেছে শত ভাগে।

লাজনত মুখ ধরিয়া তাহার

অনিল রাখিল বুকের মাঝার,

অনিমিষ আঁখি মেলিয়া যুবক

      চাহি থাকে মুখবাগে!

আদরে ভাসিয়া ললিতার চোখে

        বাহিরে সলিলধার--

সোহাগে সরমে প্রণয়ে গলিয়া

আঁখি দুটি তার পড়িল ঢলিয়া,

হাসি ও নয়নসলিলে মিলিয়া

        কি শোভা ধরিল মুখানি তার!

আমি, সখি, আর নারিনু থাকিতে--

        সুমুখে পড়িনু আসি,

করতালি দিয়ে উপহাস কত

        করিলাম হাসি হাসি!

ললিতা অমনি চমকি উঠিল,

মুখেতে একটি কথা না ফুটিল,

আকুল ব্যাকুল হইয়া সরমে

        লুকাতে ঠাঁই না পায়।

ছুটিয়ে পলায়ে এলেম অমনি,

হেসে হেসে আর বাঁচি নে সজনি,

সে দিন হইতে আমারে হেরিলে

        ললিতা সরমে মরিয়া যায়!

 

 

মুরলা।

          আহা, কেন বাধা দিতে গেলি তাহাদের কাছে?

 

 

চপলা।

          বাধা না পাইলে, সখি, সুখেতে কি সুখ আছে?

 

 

মুরলা।

          সূর্য্যমুখী ফুল, সখি, আমি ভালবাসি বড়--

দু চারিটি তুলে এনে আজিকে করিস্‌ জড়।

মনে বড় সাধ তার দেখে রবিমুখ-পানে,

রবি যেখা মাথা তার লোয়ে যায় সেইখানে!

তবু মনোআশা হায় মনেই মিশায়ে যায়,

মুখানি তুলিতে নারে সরমেতে জড়সড়!

সে ফুলে সাজাবি দেহ লাজময়ী ললিতার,

লজ্জাবতী পাতা দিয়ে ঢাকিবি শয়ন তার;

কমল আনিয়া তুলি     লাজে-রাঙা পাপ্‌ড়িগুলি

গাঁথি গাঁথি নিরমিয়া দিবি ঘোমটার ধার!

পাতা-ঢাকা আধ-ফুটো    লাজুক গোলাপ দুটো

আনিস্‌, দুলায়ে দিবি সুচারু অলকে তার!

সহসা রজনী-গন্ধা প্রভাতের আলো দেখে

ভাবিয়া না পায় ঠাঁই কোথা মুখ রাখে ঢেকে--

আকুল সে ফুলগুলি    যতনে আনিস্‌ তুলি,

তাই দিয়ে গেঁথে গেঁথে বিরচিবি কণ্ঠহার।

 

 

চপলা।

           তুই, সখি, আয়-- একেলা আমার

     ভাল নাহি লাগে বালা!

দুটি সখী মিলি হাসিতে হাসিতে

গুন্‌ গুন্‌ গান গাহিতে গাহিতে

     মনের মতন গাঁথিব মালা!

বল্‌ দেখি, সখি, হ'ল কি তোর?

হাসিয়া খেলিয়া কুসুম তুলিয়া

     কুমারীজীবন ভোর--

তা না, একি জ্বালা? মরমে মিশিয়া

আপনার মনে আপনি বসিয়া

সাধ কোরে এত ভাল লাগে, সখি,

    বিজনে ভাবনা-ঘোর!

তা হবে না, সখি, না যদি আসিস্‌

    এই কহিলাম তোরে--

যত ফুল আমি আনিয়াছি তুলি

আঁচল ভরিয়া ল'ব সবগুলি,

বিপাশার স্রোতে দিব লো ভাসায়ে

    একটি একটি কোরে!

 

 

মুরলা।

           মাথা খা, চপলা, মোরে জ্বালাস্‌ নে আর!

 

 

চপলা।

           ভাল, সই, জ্বালাব না চলিনু এবার!

[গমনোদ্যম ঃ পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া]

না না, সখি, এই আঁধার কাননে

      একেলা রাখিয়া তোরে

কোথায় যাইব বল্‌ দিখি তুই,

      যাইব কেমন কোরে?

তোরে ছেড়ে আমি পারি কি থাকিতে?

      ভালবাসি তোরে কত!

আমি যদি, সখি, হোতেম তোমার

      পুরুষ মনের মত

সারাদিন তোরে রাখিতাম ধোরে,

      বেঁধে রাখিতাম হিয়ে,

একটুকু হাসি কিনিতাম তোর

      শতেক চুম্বন দিয়ে!

অমিয়া-মাখানো মুখানি তোমার

দেখে দেখে সাধ মিটিত না আর!

ও মুখানি লোয়ে কি যে করিতাম

বুকের কোথায় ঢেকে রাখিতাম,

      ভাবিয়া পেতাম তা কি?

সখি, কার তুমি ভালবাসা-তরে

ভাবিছ অমন দিনরাত ধোরে,

পায়ে পড়ি তব খুলে বল তাহা--

      কি হবে রাখিয়া ঢাকি?

 

 

মুরলা।

           ক্ষমা কর মোরে, সখি, শুধায়ো না আর!

মরমে লুকানো থাক্‌ মরমের ভার!

যে গোপন কথা, সখি,     সতত লুকায়ে রাখি

ইষ্টদেবমন্ত্র-সম পূজি অনিবার

তাহা মানুষের কানে   ঢালিতে যে লাগে প্রাণে--

লুকানো থাক্‌ তা, সখি, হৃদয়ে আমার!

ভালবাসি, শুধায়ো না কারে ভালবাসি!

সে নাম কেমনে, সখি, কহিব প্রকাশি!

আমি তুচ্ছ হোতে তুচ্ছ,        সে নাম যে অতি উচ্চ,

সে নাম যে নহে যোগ্য এই রসনার!

ক্ষুদ্র ওই কুসুমটি পৃথিবীকাননে,

আকাশের তারকারে পূজে মনে মনে--

দিন দিন পূজা করি    শুকায়ে পড়ে সে ঝরি,

আজন্ম নীরব প্রেমে যায় প্রাণ তার--

তেমনি পূজিয়া তারে    এ প্রাণ যাইবে হা-রে,

তবুও লুকানো রবে এ কথা আমার!

 

 

চপলা।

           কে জানে সজনি, বুঝিতে না পারি

      এ তোর কেমন কথা!

আজিও ত সখি না পেনু ভাবিয়া

      একি প্রণয়ের প্রথা!

প্রণয়ীর নাম রসনার, সখি,

      সাধের খেলেনা-মত,

উলটি পালটি সে নাম লইয়া

      রসনা খেলায় কত!

নাম যদি তার বলিস্‌, তা হ'লে

      তোরে আমি অবিরাম

      শুনাব তাহারি নাম--

গানের মাঝারে সে নাম গাঁথিয়া

      সদা গাব সেই গান!

রজনী হইলে সেই গান গেয়ে

      ঘুম পাড়াইব তোরে,

প্রভাত হইলে সেই গান তুই

      শুনিবি ঘুমের ঘোরে!

ফুলের মালায় কুসুম-আখরে

      লিখি দিব সেই নাম--

গলায় পরিবি, মাথায় পরিবি,

তাহারি বলয় কাঁকন করিবি,

হৃদয়-উপরে যতনে ধরিবি

      নামের কুসুমদাম!

যখনি গাহিবি তাহার গান,

যখনি কহিবি তাহার নাম,

সাথে সাথে সখি আমিও গাহিব,

সাথে সাথে সখি আমিও কহিব,

      দিবারাতি অবিরাম--

সারা জগতের বিশাল আখরে

      পড়িবি তাহারি নাম!

যখনি বলিবি তোর পাশে তারে

      ধরিয়া আনিয়া দিব--

সুমুখ হইতে পলাইয়া গিয়া

      আড়ালেতে লুকাইব।

দেখিব কেমন দুখ না ছুটে

ওই মুখে তোর হাসি না ফুটে--

ভুলিবি এ বন, ভুলিবি বেদন,

      সখীরেও বুঝি ভুলিয়া যাবি!

বল্‌, সখি, প্রেমে পড়েছিস্‌ কার!

বল্‌, সখি, বল্‌ কি নাম তাহার!

বলিবি নি কি লো?    না যদি বলিস্‌

      চপলার মাথা খাবি!

 

 

মুরলা।

            [নেপথ্যে চাহিয়া ] জীবন্ত স্বপ্নের মত, ওই দেখ, কবি

একা একা ভ্রমিছেন আঁধার অটবী।

ওই যেন মূর্ত্তিমান ভাবনার মত

নত করি দু-নয়নশুনিছেন একমন

স্তব্ধতার মুখ হোতে কথা কত শত!

 

 

কবি।

              বনদেবীটির মত এই যে মুরলা,

প্রভাতে কাননে বসি ভাবনাবিহ্বলা!

প্রকৃতি আপনি আসি লুকায়ে লুকায়ে

আপনার ভাষা তোরে দেছে কি শিখায়ে?

দিনরাত কলস্বরে      তটিনী কি গান করে

তাহা কি বুঝিতে তুই পেরেছিস্‌ বালা?

তাই হেথা প্রতিদিন আসিস্‌ একালা!

মুরলা! আজিকে তোরে        বনবালা-মত কোরে

চপলা সাজায়ে দিক্‌ দেখি একবার।

এলোথেলো কেশপাশে লতা দে বাঁধিয়া,

অলক সাজায়ে দে লো তৃণফুল দিয়া--

ফুলসাথে পাতাগুলি একটি একটি তুলি

অযতনে দে লো তাহা আঁচলে গাঁথিয়া!

হরিণশাবক যত ভুলিবে তরাস,

পদতলে বসি তোর চিবাইবে ঘাস।

ছিঁড়ি ছিঁড়ি পাতাগুলি  মুখে তার দিবি তুলি,

সবিস্ময়ে সুকুমার গ্রীবাটি বাঁকায়ে

অবাক্‌ নয়নে তারা রহিবে তাকায়ে!

আমি হোয়ে ভাবে ভোর     দেখিব মুখানি তোর,

কল্পনার ঘুমঘোর পশিবে পরাণে!

ভাবিব, সত্যই হবে    বনদেবী আসি তবে

অধিষ্ঠান হইলেন কবির নয়ানে!

 

 

চপলা।

           বল দেখি মোরে, কবি গো, হ'ল কি

      তোমাদের দু-জনার?

সখীরে আমার কি গুণ করেছ

      বল দেখি একবার!

সখীর আমার খেলাধূলা নেই,

সারাদিন বসি থাকে বিজনেই--

জানি না ত, কবি, এত দিন আছি

      কিসের ভাবনা তার!

ছেলেবেলা হোতে তোমরা দুজনে

      বাড়িয়াছ এক সাথে,

আপনার মনে ভ্রমিতে দুজনে

      ধরি ধরি হাতে হাতে!

তখন না জানি কি মন্ত্র, কবি গো,

      দিলে মুরলার কানে!

কি মায়া না জানি দিয়েছিলে পড়ি

      সখীর তরুণ প্রাণে!

বেলা হোয়ে এল সজনি এখন,

করিয়াছে পান প্রভাতকিরণ

ফুলবধূটির অধর হইতে

      প্রতি শিশিরের কণা।

তুই থাক্‌, হেথা, আমি যাই ফিরে,

অমনি ডাকিয়া ল'ব মালতীরে--

একেলা ত, বালা, অত ফুলমালা

      গাঁথিবারে পারিব না!

 

 

কবি।

              মূরলা, তোমার কেন  ভাবনার ভাব হেন?

কতবার শুধায়েছি বল নি আমারে!

লুকায়ো না কোন কথা,  যদি কোন থাকে ব্যথা

রুধিয়া রেখো না তাহা হৃদয়মাঝারে!

হয়ত হৃদয়ে তব কিসের যাতনা

আপনি মুরলা তাহা জানিতে পার না!

হয়ত গো যৌবনের বসন্তসমীরে

মানসকুসুম তব ফুটেছে সুধীরে,

প্রণয়বারির তরে তৃষায় আকুল

ম্রিয়মাণ হয়ে বুঝি পোড়েছে সে ফুল?

পেয়েছ কি যুবা কোন মনের মতন?

ভালবাসো, ভালবাসা করহ গ্রহণ--

তা হ'লে হৃদয় তব পাইবে জীবন নব,

উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাসময় হেরিবে ভুবন।

 

 

মুরলা।

           [স্বগত]  বুঝিলে না-- বুঝিলে না-- কবি গো, এখনো

      বুঝিলে না এ প্রাণের কথা!

দেবতা গো বল দাও,এ হৃদয়ে বল দাও,

      পারি যেন লুকাতে এ ব্যথা।

জানি, কবি, ভাল তুমি বাস' নাক মোরে--

তা হ'লে এ মন তুমি চিনিবে কি কোরে?

একটুকু ভাল যদি বাসিতে আমারে

তা হ'লে কি কোন কথা        এ মনের কোন ব্যথা

তোমার কাছেতে, কবি, লুকায়ে থাকিতে পারে?

তাহা হ'লে প্রতি ভাবে, প্রতি ব্যবহারে,

মুখ দেখে, আঁখি দেখে,        প্রত্যেক নিশ্বাস থেকে

বুঝিতে যা গুপ্ত আছে বুকের মাঝারে।

প্রেমের নয়ন থেকে    প্রেম কি লুকানো থাকে?

তবে থাক্‌, থাক্‌ সব, বুকে থাক্‌ গাঁথা--

বুক যদি ফেটে যায়-- ভেঙ্গে যায়-- চুরে যায়--

      তবু রবে লুকানো এ কথা।

দেবতা গো বল দাও-- এ হৃদয়ে বল দাও

      পারি যেন লুকাতে এ ব্যথা!

 

 

কবি।

             বহুদিন হ'তে, সখি, আমার হৃদয়

হোয়েছে কেমন যেন অশান্তি-আলয়।

চরাচর-ব্যাপী এই বোম-পারাবার

সহসা হারায় যদি আলোক তাহার,

আলোকের পিপাসায় আকুল হইয়া

কি দারুণ বিশৃঙ্খল হয় তার হিয়া!

তেমনি বিপ্লব ঘোর হৃদয় ভিতরে

হ'তেছে দিবস নিশা, জানি না কি-তরে!

নবজাত উল্কানেত্র মহাপক্ষ গরুড় যেমন

বসিতে না পায় ঠাঁই চরাচর করিয়া ভ্রমণ,

উচ্চতম মহীরুহ পদভরে ভূমিতলে লুটে,

ভূধরের শিলাময় ভিত্তিমূল বিদারিয়া উঠে,

অবশেষে শূন্যে শূন্যে দিবারাত্রি ভ্রমিয়া বেড়ায়,

চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ঢাকি ঘোর পাখার ছায়ায়,

তেমনি এ ক্লান্ত হৃদি বিশ্রামের নাহি পায় ঠাঁই--

সমস্ত ধরায় তার বসিবার স্থান যেন নাই।

তাই এই মহারণ্যে অমারাত্রে আসি গো একাকী,

মহান্‌ ভাবের ভারে    দুরন্ত এ ভাবনারে

কিছুক্ষণ-তরে তবু দমন করিয়া যেন রাখি।

চন্দ্রশূন্য আঁধারের নিস্তরঙ্গ সমুদ্রমাঝারে

সমস্ত জগৎ যবে মগ্ন হ'য়ে গেছে একেবারে

অসহায় ধরা এক মহামন্ত্রে হোয়ে অচেতন

নিশীথের পদতলে করিয়াছে আন্তসমর্পণ,

তখন অধীর হৃদি অভিভূত হোয়ে যেন পড়ে--

অতি ধীরে বহে শ্বাস, নয়নেতে পলক না পড়ে।

| | |

প্রাণের সমুদ্র এক আছে যেন এ দেহমাঝারে,

মহা উচ্ছ্বাসের সিন্ধু রুদ্ধ এই ক্ষুদ্র কারাগারে!

মনের এ রুদ্ধস্রোত দেহখানা করি বিদারিত

সমস্ত জগৎ যেন চাহে, সখি, করিতে প্লাবিত!

অনন্ত আকাশ যদি হ'ত এ মনের ক্রীড়াস্থল,

অগণ্য তারকারাশি হ'ত তার খেলেনা কেবল,

চৌদিকে দিগন্ত আসি রুধিত না অনন্ত আকাশ,

প্রকৃতি জননী নিজে পড়াত কালের ইতিহাস,

দুরন্ত এ মন-শিশু প্রকৃতির স্তন্য পান করি

আনন্দসঙ্গীতস্রোতে ফেলিত গো শূন্যতল ভরি,

উষার কনকস্রোতে প্রতিদিন করিত সে স্নান,

জ্যোছনা-মদিরাধারা পূর্ণিমায় করিত সে পান,

ঘূর্ণ্যমান ঝটিকার মেঘমাঝে বসিয়া একেলা

কৌতুকে দেখিত যত বিদ্যুৎ-বালিকাদের খেলা,

দুরন্ত ঝটিকা হোথা এলোচুলে বেড়াত নাচিয়া

তরঙ্গের শিরে শিরে অধীর চরণ বিক্ষেপিয়া।

হরষে বসিত গিয়া ধূমকেতুপাখার উপরে,

তপনের চারি দিকে ভ্রমিত সে বর্ষ বর্ষ ধোরে।

চরাচর মুক্ত তার অবারিত বাসনার কাছে,

প্রকৃতি দেখাত তারে যেথা তার যত ধন আছে;

কুসুমের রেণুমাখা বসন্তের পাখায় চড়িয়া

পৃথিবীর ফুলবনে ভ্রমিত সে উড়িয়া উড়িয়া;

সমীরণ কুসুমের লঘু পরিমলভার বহি

পথশ্রমে শ্রান্ত হোয়ে বিশ্রাম লভিছে রহি রহি,

সেই পরিমল সাথে অমনি সে যাইত মিলায়ে--

ভ্রমি কত বনে বনে    পরিমলরাশি-সনে

অতি দূর দিগন্তের হৃদয়েতে যাইত মিশায়ে

তটিনীর কলম্বর        পল্লবের মরমর

শত শত বিহগের হৃদয়ের আনন্দ-উচ্ছ্বাস

সমস্ত বনের স্বর মিশে হ'ত একত্তর

একপ্রাণ হোয়ে তারা পরশিত উন্নত আকাশ।

তখন সে সঙ্গীতের তরঙ্গে করিয়া আরোহণ

মেঘের সোপান দিয়া অতি উচ্চ শূন্যে গিয়া

উষার আরক্ত ভাল পারিত গো করিতে চুম্বন!

কল্পনা, থাম গো থাম, কোথায়-- কোথায় যাও নিয়ে?

ক্ষুদ্র এ পৃথিবী, দেবি, কোন্‌খেনে রেখেছি ফেলিয়ে?

মাটির শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা যে গো রোয়েছে চরণ,

যত উচ্চে আরোহিব তত হবে দারুণ পতন!

কল্পনার প্রলোভনে    নিরাশার বিষয় ঢাকা,

শূন্য অন্ধকার মেঘে     সন্ধ্যার কিরণ মাখা,

সেই বিষ প্রাণ ভোরে   সখি লো করিনু পান--

মন হ'য়ে গেল, সখি,   অবসন্ন-- ম্রিয়মাণ।

 

 

মুরলা।

           কবি গো, ওসব কথা ভেবো নাকো আর,

শ্রান্ত মাথা রাখ এই কোলেতে আমার।

 

 

কবি।

             সখি, আর কত দিন   সুখহীন শান্তিহীন

হাহা কোরে বেড়াইব নিরাশ্রয় মন লোয়ে!

পারি নে, পারি নে আর--      পাষাণ মনের ভার

বহিয়া পড়েছি, সখি, অতি শ্রান্ত ক্লান্ত হোয়ে।

সম্মুখে জীবন মম     হেরি মরুভূমিসম,

নিরাশা বুকেতে বসি ফেলিতেছে বিষশ্বাস।

উঠিতে শকতি নাই,   যেদিকে ফিরিয়া চাই

শূন্য-- শূন্য-- মহাশূন্য নয়নেতে পরকাশ।

কে আছে, কে আছে, সখি, এ শ্রান্ত মস্তক মম

বুকেতে রাখিবে ঢাকি যতনে জননী-সম!

কে আছে, অজস্র স্রোতে প্রণয়অমৃত ভরি

অবসন্ন এ হৃদয় তুলিবে সজীব করি!

মন, যত দিন যায়,    মুদিয়া আসিছে হায়--

শুকায়ে শুকায়ে শেষে মাটিতে পড়িবে ঝরি।

 

 

মুরলা।

           [স্বগত]  হা কবি, ও হৃদয়ের শূন্য পুরাইতে

অভাগিনী মুরলা গো কি না পারে দিতে!

কি সুখী হোতেম, যদি মোর ভালবাসা

পুরাতে পারিত তব হৃদয়পিপাসা!

শৈশবে ফুটে নি যবে আমার এ মন

তরুণ-প্রভাত-সম, কবি গো, তখন

প্রতিদিন ঢালি ঢালি দিয়েছ শিশির--

প্রতিদিন যোগায়েছ শীতল সমীর!

তোমারি চোখের 'পরে করুণ কিরণে

এ হৃদি উঠেছে ফুটি তোমারি যতনে!

তোমারি চরণে, কবি, দেছি উপহার,

যা কিছু সৌরভ এর তোমারি-- তোমার।

     [ প্রকাশ্যে ]  তোল কবি, মাথা তোল, ভেবো না, এমন--

দুজনে সরসীতীরে করিগে ভ্রমণ।

ওই চেয়ে দেখ, কবি, তটিনীর ধারে

মধ্যাহ্নকিরণ লোয়ে   বনদেবী স্তব্ধ হোয়ে

দিতেছে বিবাহ দিয়া আলোকে আঁধারে।

সাধের সে গান তব শুনিবে এখন?

তবে গাই, মাথা তোল, শোন দিয়ে মন।

 

 

গান

 

কত দিন একসাথে ছিনু ঘুমঘোরে,

তবু জানিতাম নাকো ভালবাসি তোরে।

মনে আছে ছেলেবেলা   কত খেলিয়াছি খেলা,

ফুল তুলিয়াছি কত দুইটি আঁচল ভোরে!

ছিনু সুখে যত দিন   সুজনে বিরহহীন

তখন কি জানিতাম ভালবাসি তোরে?

অবশেষে এ কপাল ভাঙ্গিল যখন,

ছেলেবেলাকার যত ফুরাল স্বপন,

লইয়া দলিত মন হইনু প্রবাসী,

তখন জানিনু, সখি, কত ভালবাসি।

 

 



ক্রীড়াকানন। নলিনী ও সখীগণ

 

নলিনী।

          সখি! অলকচিকুরে কিশলয়-সাথে

      একটি গোলাপ পরায়ে দে।

চারু! দেখি ও আরশীখানি;

বালা! সিঁথিটি দে ত লো আনি;

লীলা! শিথিল কুন্তল দেখ্‌ বার বার

কপোলে দুলিয়া পড়িছে আমার,

      একটু এপাশে সরায়ে দে।

 

 

সুরুচি।

         মাধবী! বল্‌ ত মোরে একবার

      আজিকে হ'ল কি তোর!

কতখন ধ'রে গাঁথিছিস্‌ মালা

এখনো কি শেষ হ'ল না তা বালা?

এক মালা গেঁথে করিবি না কি লো

      সারাটি রজনী ভোর?

অনিলের হবে ফুলশয্যা আজ,

সাঁঝের আগেই শেষ করি সাজ

সব সখী মিলি যেতে হবে সেথা

      তা কি মনে আছে তোর?

 

 

অলকা।

         মরি মরি কিবা সাজাবার ছিরি,

      চেয়ে দেখ্‌ একবার!

সখীর অমন ক্ষীণ দেহমাঝে

কমলফুলের মালা কি লো সাজে?

বিনোদিনী দেখ্‌ গাঁথিছে বসিয়া

      কমলের ফুলহার!

 

 

নলিনী।

          ওই দেখ, সখি, দাঁড়ের উপরে

মাথাটি গুঁজিয়া পাখার ভিতরে

শ্যামাটি আমার-- সাধের শ্যামাটি

      কেমন ঘুমায়ে আছে!

      আন্‌ সখি ওরে কাছে!

গান গেয়ে গেয়ে, তালি দিয়ে দিয়ে,

ঘিরে বসি ওরে সকলে মিলিয়ে--

দেখিব কেমন ফিরে ফিরে ফিরে

      তালে তালে তালে নাচে।

 

 

শ্যামার প্রতি গান

 

      নাচ্‌, শ্যামা, তালে তালে।

বাঁকায়ে গ্রীবাটি  তুলি পাখা দুটি

এপাশে ওপাশে করি ছুটাছুটি

      নাচ্‌, শ্যামা, তালে তালে।

রুণু রুণু ঝুনু বাজিছে নূপুর,

মৃদু মৃদু মধু উঠে গীতসুর,

বলয়ে বলয়ে বাজে ঝিনি ঝিনি,

তালে তালে উঠে করতালিধ্বনি--

      নাচ্‌, শ্যামা, নাচ্‌ তবে!

নিরালয় তোর বনের মাঝে

সেথা কি এমন নূপুর বাজে?

বনে তোর পাখী আছিল যত

গাহিত কি তারা মোদের মত

      এমন মধুর গান?

      এমন মধুর তান?

কমলকরের করতালি হেন

      দেখিতে পেতিস্‌ কবে?

      নাচ্‌, শ্যামা, নাচ্‌ তবে!

বন্দী বোলে তোর কিসের দুখ?

বনে বল্‌ তোর কি ছিল সুখ?

বনের বিহগ কি বুঝিবি তুই

      আছে লোক কত শত

      যারা, শ্যামা, তোর মত

এমনি সোনার শিকলি পরিয়া

      সাধের বন্দী হইতে চায়!

এই গীতরবে হোয়ে ভরপুর

শুনি শুনি এই চরণনূপুর

      জনম জনম নাচিতে চায়!

সাধ কোরে ধরা দেয় গো তারা,

সাথে সাথে ভ্রমি হয় গো সারা,

ফিরেও দেখি নে-- ফিরেও চাহি নে--

বড় জ্বালাতন করে গো যখন

অশরীরী বাজ করি বরিষণ--

      উপেখা-বাণের ধারা!

      তবে দেখ, পাখী, তোর

      কেমন ভাগ্যের জোর!

বড় পুণ্যফলে মিলেছে বিহগ

      এমন সুখের কারা!

      আয় পাখী, আয় বুকে!

কপোলে আমার মিশায়ে কপোল

      নাচ্‌, নাচ্‌ নাচ্‌ সুখে!

বড় দুখ মনে, বনের বিহগ,

      কিছু তুই বুঝিলি না!

এমন কপোল অমিয়মাখা

চুমিলি, তবুও ঝাপটি পাখা

      উড়িতে চাহিস্‌ কি না!

প্রতি পাখা তোর উঠে নি শিহরি?

পুলকে হরষে মরমেতে মরি

ঘুরিয়া ঘুরিয়া চেতনা হারায়ে

      পদতলে পড়িলি না?

      নাচ্‌ নাচ্‌ তালে তালে!

বাঁকায়ে গ্রীবাটি     তুলি পাখা দুটি

এপাশে ওপাশে করি ছুটাছুটি

      নাচ্‌, শ্যামা, তালে তালে!

 

 

দামিনী।

          শুনেছিস সখি, বিবাহসভায়

      বিনোদ আসিবে আজ!

      ভালো কোরে কর্‌ সাজ!

 

 

নলিনী।

         আহা মরে যাই কি কথা বলিলি,

      শুনিয়া যে হয় লাজ!

      বিনোদ আসিবে আজ?

এ বারতা দিয়ে কেন, লো সজনি,

      মাথায় হানিলি বাজ?

সারাখন মোর সাথে সাথে ফিরে

      ক্ষান্ত নহে একটুক,

মুখখানা তার দেখিবারে পাই

      যে দিকে ফিরাই মুখ!

এক-দৃষ্টে হেন রহে সে তাকায়ে

      থেকে থেকে ফেলে শ্বাস,

মুখেতে আঁচল চাপিয়া চাপিয়া

      রাখিতে পারি নে হাস!

 

 

লীলা।

            শুনেছি প্রমোদ আসিবে, যাহারে

      ভ্রমর বলিয়া ডাকি--

যাহারে হেরিলে হরষে তোমার

      উজলিয়া উঠে আঁখি।

 

 

নলিনী।

          গা ছুঁয়ে আমার বল্‌, লো সজনি,

      সত্য সে আসিবে নাকি?

দেখ্‌, দেখি সখি, অভাগীর তরে

      কোথাও নিস্তার নাই,

মরি মরি কিবা ভ্রমর আমার!

      ভ্রমরের মুখে ছাই!

সে ছাড়া ভ্রমর আর কি নাই?

তা হলে এখনি-- সখি রে, এখনি

      নলিনী-জনম ঘুচাতে চাই!

 

 

চারুশীলা।

       লুকাস্‌ নে মোরে, আমি জানি সখি,

      কে তোমার মনোচোর।

বলিব? বলিব? হেথা আয় তবে,

      বলি কানে কানে তোর!

 

 

[কানে কানে কথা]

 

নলিনী।

          জ্বালাস্‌ নে চারু, জ্বালাস্‌ নে মোরে,

      করিস্‌ নে নাম তার!

সুরেশ?-- তাহার জ্বালায়, সজনি,

      বেঁচে থাকা হ'ল ভার!

কে জানিত আগে বল্‌ ত, সখি লো,

      রূপের যাতনা অতি?

সাধ যায় বড় কুরূপা হইয়া

      লভি শান্তি এক রতি!

 

 

মাধবী।

          শোন্‌ বলি লীলা, জানি কারে সখি

      মনে মনে ভাল বাসে।

দেখিনু সেদিন বিজয়ের সাথে

      বসি আছে পাশে পাশে।

মৃদু হাসি হাসি কত কহে কথা,

      কভু লাজে শির নত,

কভু ল'য়ে কেশ বেণী ফেলি খুলে--

জড়ায়ে জড়ায়ে মৃণাল আঙ্গুলে

      আন্‌মনে খেলে কত!

কখন বা শুনে অতি একমনে

      বিজয়ের কথাগুলি,

শুনিতে শুনিতে শির নত করি

তুলি কুঁড়ি এক কতখন ধরি

খুলি খুলি দেয় মুদিত পাপড়ি,

      ফুটাইয়া তারে তুলি।

      কভু বা সহসা উঠিয়া যায়,

      কভু বা আবার ফিরিয়া চায়--

মৃদু মৃদু স্বরে গুন্‌ গুন্‌ করে

      উঠে এক গান গেয়ে!

এমন মধুর অধীরতা তার!

      এমন মোহিনী মেয়ে!

 

 

বিনো।

           সখি লো, তা নয়, কতবার আমি

      দেখিয়াছি লুকাইয়া

অশোকের সাথে বসি আছে একা

      প্রমোদকাননে গিয়া!

জানি আমি তারে হেরিলে সখীর

      সুখে নেচে উঠে হিয়া।

 

 

নলিনী।

          হেথা আয় তোরা, দে দেখি সাজায়ে

      শ্যামা-পাখীটিরে মোর!

দুটি ফুল বসা দুইটি ডানায়,

বেলকুঁড়ি-মালা কেমন মানায়

      সুগোল গলায় ওর!

ওই দেখ্‌ সখি!   দেখি কি কখনো

      এমন দুরন্ত পাখী!

যতগুলি ফুল দিলেম পরায়ে

সবগুলি দেখ্‌ ফেলেছে ছড়ায়ে,

শত শত ভাগে ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া

      একটি রাখে নি বাকী!

ভাল, পাখী যদি না চায় সাজিতে

      আমারে সাজা লো তবে।

 

 

চারু।

                  তোর সাজ ফুরাইবে কবে?

 

 

লীলা।

                  সখি,   আবার কিসের সাজ?

 

 

সুরুচি।

                 দেখ্‌,   এসেছে হইয়া সাঁঝ।

 

 

নলিনী।

          দেখ্‌ লো সুরুচি, লীলা ভাল কোরে

      বাঁধিতে পারে নি চুল--

এই দেখ্‌ হেথা পরায়ে দিয়াছে

      অলকে শুকানো ফুল।

বেণী খুলে চুল বেঁধে দে আবার,

      কানে দে পরায়ে দুল।

 

 

সুরুচি।

          না লো সখি, দেখ্‌, আঁধার হতেছে,

      দেরি হয়ে যায় ঢের--

চল্‌ ত্বরা করে যাই দেখিবারে

      ফুলশয্যা অনিলের।

 

 

অলকা।

         এত খনে, সখি, এসেছে সেথায়

      যতেক গ্রামের লোক।

 

 

দামিনী।

          [হাসিয়া] এসেছে বিনোদ!

 

 

লীলা।

            [হাসিয়া] এসেছে প্রমোদ!

 

 

বিনো।

           [হাসিয়া] এসেছে সেথা অশোক!

 

 

মাধবী।

           [হাসিয়া] এসেছে বিজয়!

 

 

চারু।

            [চিবুক ধরিয়া]      সুরেশ রয়েছে

      পথ চেয়ে তোর তরে!

 

 

অলকা।

                আয় তবে ত্বরা করে!

 

 

নলিনী।

          ভাল, সখি, ভাল, চল্‌ তবে চল্‌--

      জ্বালাস্‌ নে আর মোরে!

 

 



মুরলা ও অনিল

 

অনিল।

          ও হাসি কোথায় তুই শিখেছিলি বোন?

বিষণ্ন অধর দুটি   অতি ধীরে ধীরে টুটি

অতি ধীরে ধীরে ফুটে হাসির কিরণ।

অতি ঘন মেঘমালা    ভেদি স্তরে স্তরে, বালা,

সায়াহ্ন জলদপ্রান্তে দেয় যথা দেখা

ম্লান তপনের মৃদু কিরণের রেখা।

কত ভাবনার স্তর    ভেদ করি পর পর

ওই হাসিটুকু আসি পঁহুছে অধরে!

ও হাসি কি অশ্রুজলে সিক্ত থরে থরে?

ও হাসি কি বিষাদের গোধূলির হাস?

ও হাসি কি বরষার      সুকুমারী লতিকার

ধৌতরেণু ফুলটির অতি মৃদু বাস?

মুরলা রে, কেন আহা, এমন তু' হলি!

এত ভালবাসা কারে দিলি জলাঞ্জলি?

যে জন রেখেছে মন শূন্যের উপরে,

আপনারি ভাব নিয়া     উলটিয়া পালটিয়া

দিনরাত যেই জন শূন্যে খেলা করে,

শূন্য বাতাসের পটে শত শত ছবি

মুছিতেছে আঁকিতেছে--    শতবার দেখিতেছে--

সেই এক মোহময় স্বপ্নময় কবি--

সদা যে বিহ্বল প্রাণে    চাহিয়া আকাশ-পানে,

আঁখি যার অনিমিষ আকাশের প্রায়,

মাটিতে চরণ তবু মাটিতে না চায়--

ভাবের আলোকে অন্ধ তারি পদতলে

অভাগিনী, লুটাইয়া পড়িলি কি বোলে?

সে কি রে, অবোধ মেয়ে   বারেক দেখিবে চেয়ে?

জানিতেও পারিবে না, যাইবে সে চ'লে

যুথিকাহৃদয় তোর ধূলি-সাথে দ'লে।

এত ভালবাসা তারে কেন দিলি হায়?

সাগর-উদ্দেশ-গামী তটিনীর পায়

না ভাবিয়া না চিন্তিয়া যথা অবহেলে

ক্ষুদ্র নির্ঝরিণী দেয় আপনারে ঢেলে।

নিশীথের উদাসীন পথিক সমীর

শূন্য হৃদয়ের তাপে হইয়া অধীর

কুসুমকানন দিয়া যায় যবে বয়ে

আকুল রজনীগন্ধা কথাটি না কয়ে

প্রাণের সুরভি সব দিয়া তার পায়

পরদিন বৃন্ত হতে ঝরে পড়ে যায়।

মেঘের দুঃস্বপ্নে মগ্ন দিনের মতন

কাঁদিয়া কাটিবে কি রে সারাটি যৌবন?

কেঁদে কেঁদে শ্রান্ত হয়ে দীন অতিশয়--

আপনার পানে তবে    চাহিয়া দেখিবি যবে

দেখিবি জীবনদিন সন্ধ্যা হয় হয়!

যে মেঘ-মাঝারে থাকি উদিলি প্রভাতে

সেই মেঘমাঝে থাকি অস্ত গেলি রাতে।

 

 

মুরলা।

                               কি জানি কেমন

মুরলার সুখের কি দুঃখের জীবন!

সুখ দুঃখ দিনরাত মিলিয়া উভয়ে

রেখেছে সায়াহ্ন করি এ শান্ত হৃদয়ে।

হেন আলিঙ্গনে তারা রয়েছে সদাই

যেন তারা দুটি সখা, যেন দুটি ভাই।

জোছনা ও যামিনীতে প্রণয় যেমন

তেমনি মিলিয়া তারা রয়েছে দুজন।

সুখের মুখেতে থাকে দুখের কালিমা,

দুখের হৃদয়ে জাগে সুখের প্রতিমা।

একা যবে বসে থাকি স্তব্ধ জোছনায়,

বহে বাতায়ন-পানে নিশীথের বায়,

বড় সাধ যায় মনে যারে ভালবাসি

একবার মুহূর্ত্ত সে বসে কাছে আসি,

দুটি শুধু কথা কহে-- একটু আদর--

সেই স্তব্ধ জোছনায়    কাঁদিয়া কাঁদিয়া হায়

মরিয়া যাই গো তারি বুকের উপর।

যখনি কবিরে দেখি সব যাই ভুলে,

কিছুই নাহি না আর--  কিছুই ভাবি না আর--

শুধু সেই মুখে চাই দুটি আঁখি তুলে।

দেখি দেখি-- কি যে দেখি, কি বলিব কি সে!

হৃদয় গলিয়া যায় জোছনায় মিশে।

জোছনার মত সেই বিগলিত হিয়া

প্রাণের ভিতরে ধরি--  একেবারে মগ্ন করি

কবিরে চৌদিকে যেন থাকে আবরিয়া।

মনে মনে মন যেন কাঁদিয়া দু-করে

কবির চরণ দুটি জড়াইয়া ধরে,

আঁখি মুদি "কবি! কবি!" বলে শতবার--

শতবার কেঁদে বলে "আমার! আমার!"

"আমার আমার" যেন বলিতে বলিতে

চাহে মন একেবারে জীবন ত্যজিতে!

সুখেতে কি দুখে যেন ফেটে যায় বুক--

সুখ বলে দুখ আমি, দুখ বলে সুখ।

কোথা কবি, কোথা আমি! সে যে গো দেবতা--

তারে কি কহিতে পারি প্রণয়ের কথা?

কবি যদি ভুলে কভু মোরে ভালবাসে

তা হলে যে ম'রে যাব সঙ্কোচে উল্লাসে।

চাই না চাই না আমি প্রণয় তাঁহার,

যাহা পাই তাই ভাল স্নেহসুধাধার।

শুকতারা স্নেহমাখা করুণ নয়ানে

চেয়ে থাকে অস্তমান যামিনীর পানে,

তেমনি চাহেন যদি কবি স্নেহভরে

মুরলার ক্ষুদ্র এই হৃদয়ের 'পরে

তাহা হলে নয়নের সামনে তাঁহার

হাসিয়ে ফুরায়ে যাবে জীবন আমার।

 

 

অনিল।

          স্বার্থপর, আপনারি ভাবভরে ভোর,

আজিও সে দেখিল না হৃদয়টি তোর?

সর্ব্বস্ব তাহারি পদে দিয়া বিসর্জ্জন

কাঁদিয়া মরিছে এক দীনহীন মন,

ইহাও কি পড়িল না নয়নে তাহার?

আপনারে ছাড়া কেহ নাহি দেখিবার?

নিশ্চয় দেখেছে, তবু দেখেও দেখে নি।

দেখেছে সে-- নিরুপায়   নিতান্তই অসহায়

ভালবাসিয়াছে এক অভাগা রমণী।

দেখেছে-- হৃদয় এক ফাটিয়া নীরবে

একান্ত মরিবে, তবু কথা নাহি কবে!

দেখেও দেখে নি তবু, পশু সে নির্দ্দয়!

ভাঙ্গিয়া দেখিতে চাহে রমণীহৃদয়।

শতধা করিতে চায় মন রমণীর,

দেখিবারে হৃদয়ের শির উপশির।

এমন সুন্দর মন মুরলা তোমার--

এমন কোমল, শান্ত, গভীর, উদার--

ও মহান্‌ হৃদয়েতে প্রেমজলধির

নাই রে দিগন্ত বুঝি, নাই তার তীর।

করিস নে, করিস নে ও হৃদি বিনাশ!

যৌবনেই প্রণয়েতে হোস নে উদাস!

কহিগে প্রণয় তোর কবির সকাশে,

শুধাইগে ভাল তোরে বাসে কি না বাসে।

ভাল যদি নাই বাসে কেন সেই জন

মিছা স্নেহ দেখাইয়া বেঁধে রাখে মন?

না যদি করিতে পারে তোরে আপনার,

আপনা মত কেন করে ব্যবহার?

কথা নাহি কহে যেন, না করে আদর,

পরের মতন থাকে-- দেখে তোরে পর!

নিরদয়-দয়া তোরে নাই বা করিল!

শত্রুতার ভালবাসা নাই বা বাসিল!

মুহূর্ত্তসুখের তোরে দিয়া প্রলোভন

অসুখী করিবে কেন সারাটি জীবন?

দু-দণ্ডের আদরেতে কভু ভুলিস না!

আধেক সুখেতে কভু পূরে না বাসনা।

এখনি চলিনু তবে তার কাছে যাই,

ভাল বাসে কি না বাসে শুধাইতে চাই।

 

 

মুরলা।

          মনে কোরেছিনু, ভাই, এ প্রাণের কথা

কাহারেও বলিব না যত পাই ব্যথা।

সেদিন সায়াহ্নকালে উচ্ছ্বসি উঠিয়া

বড় নাকি কেঁদে মোর উঠেছিল হিয়া,

তাই আমি পাগলের মত একেবারে

ছুটিয়া তোমারি কাছে গেনু কাঁদিবারে।

উচ্ছ্বসি বলিনু যত কাহিনী আমার!

কেন রে বলিলি হা রে, দুর্ব্বল, অসার?

ভালবাসিতেই যদি করিলি সাহস,

লুকাতে নারিস তাহা হা হৃদি অবশ?

পরের চোখের কাছে না ফেলিলে জল

আশ কি মেটে না তোর রে আঁখি দুর্ব্বল?

মুরলা রে, অভাগী রে,  কেন ভাল বাসিলি রে?

যদি বা বাসিলি ভাল কেন তোর মন

হ'ল হেন নীচ হীন, দুর্ব্বল এমন?

একটি মিনতি আজি রাখ গো আমার!

সহস্র যাতনা পাই  আর কখন ত, ভাই,

ফেলিব না তব কাছে অশ্রুবারিধার--

যেও না কবির কাছে ধরি তব পায়,

ভুলে যাও যত কথা কহেছি তোমায়!

দয়া করে আরেকটি কথা মোর রাখ,

যদি গো কবির 'পরে রোষ করে থাক

মোর কাছে কভু আর   কোরো নাক নাম তাঁর--

সে নাম ঘৃণার স্বরে কভু সহিব না!

জানালেম এই মোর প্রাণের প্রার্থনা!

 

 

অনিল।

          তবে কি এমনি শুধু মিছে ভালবেসে

শূন্য এ জীবন তোর ফুরাইবে শেষে!

 

 

মুরলা।

           যায় যদি যাক্‌ ভাই, ফুরায় ফুরাক,

প্রভাতে তারার মত মিশায় মিশাক--

মুরলার মত ছায়া    কত আসে কত যায়,

              কি হয়েছে তায়!

অবোধ বালিকা আমি, মিছে কষ্ট পাই--

এ জীবনে মুরলার কোন কষ্ট নাই!

স্নেহের সমুদ্র সেই কবি গো আমার--

অনন্ত স্নেহের ছায়ে     আমারে রেখেছে পায়ে,

তাই যেন চিরকাল থাকে মুরলার!

সে স্নেহের কোলে শুয়ে কাটায় জীবন!

সে স্নেহের কোলে প্রাণ করে বিসর্জ্জন!

কুসুমিত সে অনন্ত স্নেহরাজ্য-'পরে

তিল স্থান থাকে যেন মুরলার তরে!

যত দিন থাকে প্রাণ-- ব্যাপি সেইটুকু স্থান

মাটিতে মিশায়ে রবে হৃদয় আমার।

কোনো-- কোনো-- কোনো সুখ নাহি চাহি আর।

 

 



কবি

 

প্রথম গান

 

বিপাশার তীরে ভ্রমিবারে যাই,

প্রতিদিন প্রাতে দেখিবারে পাই

লতা-পাতা-ঘেরা জানালা-মাঝারে

       একটি মধুর মুখ।

চারি দিকে তার ফুটে আছে ফুল,

কেহ বা হেলিয়া পরশিছে চুল,

দুয়েকটি শাখা কপাল ছুঁইয়া,

দুয়েকটি আছে কপোলে নুইয়া,

কেহবা এলায়ে চেতনা হারায়ে

       চুমিয়া আছে চিবুক।

বসন্ত প্রভাতে লতার মাঝারে

       মুখানি মধুর অতি!

অধর দুটির শাসন টুটিয়া

রাশি রাশি হাসি পড়িছে ফুটিয়া,

দুটি আঁখি-'পরে মেলিছে মিশিছে

       তরল চপল জ্যোতি।

 

 

দ্বিতীয় গান

 

প্রতিদিন যাই সেই পথ দিয়া,

      দেখি সেই মুখখানি--

কুসুমমাঝারে রয়েছে ফুটিয়া

      কুসুমগুলির রাণী!

আপনা-আপনি উঠে আঁখি মোর

      সেই জানালার পানে,

আনমন হয়ে রহি দাঁড়াইয়া

      কিছুখন সেইখানে।

আর কিছু নহে, এ ভাব আমার

      কবির সৌন্দর্য্যতৃষা,

কলপনা-সুধা-বিভল কবির

      মনের মধুর নেশা!

গোলাপের রূপ, বকুলের বাস,

      পাপিয়ার বনগান,

সৌন্দর্য্যমদিরা দিবস রজনী

      করিয়া করিয়া পান

শিথিল হইয়া পড়েছে হৃদয়--

      নয়নে লেগেছে ঘোর--

বিকশিত রূপ বড় ভাল লাগে

      মুগধ নয়নে মোর!

 

 

তৃতীয় গান

 

প্রতিদিন দেখি তারে,    কেন না দেখিনু আজি?

আলিঙ্গিতে গ্রীবা তার    লতাগুলি চারি ধার

আছে শত বাহু তুলি    শত ফুলহারে সাজি।

দূর-বন হতে ছুটি   আসিয়া প্রভাতবায়

সে বয়ান না দেখিয়া     শূন্য বাতায়ন দিয়া

প্রবেশি আঁধার গৃহে    করিতেছে হায় হায়!

কত খন-- কত খন--   কত খন ভ্রমি একা,

গণিনু ফুলের দল,   মাটিতে কাটিনু রেখা।

কত খন-- কত খন--   গেল চলি কত খন--

খনে খনে দেখি চাহি,    তবু না পাইনু দেখা!

ফিরিনু আলয়মুখে,  চলিনু আপন মনে,

চলিতে চলিতে ধীরে    ভুলে ভুলে ফিরে ফিরে

বার বার এসে পড়িসেই-- সেই বাতায়নে!

নিরাশ-আশার মোহে    চেয়ে দেখি বার বার,

শূন্য-- শূন্য-- শূন্য সব   বাতায়ন অন্ধকার!

ফুলময় বাহু দিয়া    আঁধারকে বুকে নিয়া

আঁধারকে আলিঙ্গিয়া     রয়েছে সে লতাগুলি,

তবু ফিরি ফিরি সেথা    আসিলাম ভুলি ভুলি!

তেমনি সকলি আছে--  বাতায়ন ফুলে সাজি,

দুলিছে তেমনি রি   বাতাসে কুসুমরাজি!

শুধু এ মনে আমার  এক কথা বার বার

এক সুরে মাঝে মাঝে   উঠিতেছে বাজি বাজি--

"প্রতিদিন দেখি তারে,  কেন না দেখিনু আজি?

কেন না দেখিনু তারে,   কেন না দেখিনু আজি?"

অতিধীর পদক্ষেপে  আলয়ে আসিনু ফিরি,

শতবার আনমনে    বলিলাম ধীরি ধীরি--

"প্রতিদিন দেখি তারে,  কেন না দেখিনু আজি?"

 

 

চতুর্থ গান

 

কাল যবে দেখা হ'ল পথে যেতে যেতে চলি

মোরে হেরে আঁখি তার কেন গো পড়িল ঢলি?

অজানা পথিকে হেরি এত কি সরম হবে?

কি যেন গো কথা আছে,   আটকিয়া রহিয়াছে!

আধ--মুদা দুটি আঁখি    কি যেন রেখেছে ঢাকি,

খুলিলে আঁখির পাতা প্রকাশ তা হয় পাছে!

সরম না হয় যদি, এ ভাব কিসের তবে?

কাল তাই বোসে বোসে ভাবিয়াছি সারাক্ষণ,

স্বপনে দেখেছি তার ঢ'লে-পড়া দু-নয়ন!

প্রভাতে বসিয়া আজ ভাবিতেছি নিরিবিলি--

"মোরে হেরে আঁখি তার কেন গো পড়িল ঢলি?"

 

 

পঞ্চম গান

 

সত্য কি তাহারে ভালবাসি?

ভুলিনু কি শুধু তার দেখে রূপরাশি?

স্বপনে জানি না তার হৃদয় কেমন,

সহসা আপনা ভুলে--   শুধু কি রূপসী ব'লে

জীবন্তপুত্তলী-পদে বিসর্জ্জিনু মন?

 

 

ষষ্ঠ গান

 

মোর এ যে ভালবাসা রূপমোহ এ কি?

ভাল কি বেসেছি শুধু তার মুখ দেখি?

মুখেতে সৌন্দর্য্য তার হেরিনু যখনি

তখনি কি মন তার দেখিতে পাই নি?

মধুর মুখেতে তার আঁখি-দরপণে

মনচ্ছায়া হেরিয়াছি কল্পনানয়নে!

সেই সে মুখানি তার মধুর-আকার

বেড়াতেছে খেলাইয়া হৃদয়ে আমার!

কত কথা কহিতেছে হরষে বিভোর,

কত হাসি হাসিতেছে গলা ধরে মোর!

কি করিয়া হাসে আর কি ক'রে সে কয়,

কি ক'রে আদর করে ভালবাসাময়,

মুখানি কেমন হয় মৃদু অভিমানে,

সকলি হৃদয় মোর না জানিয়া জানে!

যেন তারে জানি কত বর্ষ অগণন,

এ হৃদয়ে কিছু তার নহে গো নূতন!

মুখ দেখে শুধু ভাল বেসেছি কি তারে?

মন তার দেখি নি কি মুখের মাঝারো?

 

 

সপ্তম গান

 

দু জনে মিলিয়া যদি ভ্রমি গো বিপাশা-পারে!

কবিতা আমার যত সুধীরে শুনাই তারে!

দোঁহে মিলি একপ্রাণগাহিতেছি এক গান,

দু জনের ভাবে ভাবে একেবারে গেছে মিশে,

দু জনে দু জন -পানে চেয়ে থাকি অনিমিষে,

দু জনের আঁখি হতে দু জনে মদিয়া পিয়া

আসিবে অবশ হয়ে দোঁহার বিভল হিয়া!

মুখে কথা ফুটিবে না,   আঁখিপাতা উঠিবে না,

আমার কাঁধের পরে নোয়াবে মাথাটি তার--

দু জনে মিলিয়া যদি ভ্রমি গো বিপাশা-পার!

 

 

অষ্টম গান

 

শুনেছি-- শুনেছি কি নাম তাহার

      শুনেছি-- শুনেছি তাহা!

নলিনী-- নলিনী-- নলিনী-- নলিনী--

      কেমন মধুর আহা!

নলিনী-- নলিনী-- বাজিছে শ্রবণে

      বাজিছে প্রাণের গভীর ধাম!

কভু আনমনে উঠিতেছে মুখে

      নলিনী-- নলিনী-- নলিনী নাম!

বালার খেলার সখীরা তাহারে

      নলিনী বলিয়া ডাকে,

স্বজনেরা তার নলিনী-- নলিন--

      নলিনী বলে গো তাকে!

      নামেতে কি যায় আসে?

      রূপেতে কি যায় আসে?

হৃদয় হৃদয় দেখিবারে চায়

      যে যাহারে ভালবাসে!

নলিনীর মত হৃদয় তাহার

      নলিনী যাহার নাম--

কোমল-- কোমল-- কোমল অতি--

      যেমন কোমল নাম!

যেমন কোমল তেমনি বিমল,

      তেমনি সুরভধাম!

নলিনীর মত হৃদয় তাহার

      নলিনী যাহার নাম!

 

 



কানন

 

রাত্রি

 

অনিল ললিতা। নলিনী ও সখীগণ। বিজয় সুরেশ বিনোদ প্রমোদ অশোক নীরদ

 

কাননের এক পাশে ললিতার প্রতি অনিলের গান

 

              বউ! কথা কও!

সারাদিন বনে বনে   ভ্রমিছি আপন মনে,

সন্ধ্যাকালে শ্রান্ত বড়-- বউ, কথা কও!

শুন লো, বকুল-ডালে   লুকায়ে পল্লবজালে

পিক-সহ পিকবধূ মুখে মুখ মিলায়ে

দু জনেতে এক প্রাণ   গাহিতেছে এক গান,

রাশি রাশি স্বরসুধা বাতাসেরে বিলায়ে।

সারাদিন তপনের কিরণেতে তাপিয়া

সন্ধ্যাকালে নীড়ে ফিরে আসিয়াছে পাপিয়া।

প্রিয়ারে না দেখি তার   ঢালিতেছে স্বরধার

অধীর বিলাপ তার লতাপাতা-ভিতরে,

গলি সে আকুল ডাকে   বসি অতি দূর-শাখে

প্রাণের বিহগী তার "যাই যাই" উতরে।

অতি উচ্চ শাখে উঠি   দেখ লো কপোত দুটি

মুখে মুখে কানে কানে কত কথা বলিছে,

বুকে বুক মিলাইয়া   চঞ্চুপুট বুলাইয়া,

কপোতী সে কপোতের আদরেতে গলিছে!

এস প্রিয়ে, এস তবে   মধুর-- মধুর রবে

জুড়াও শ্রবণ মোর-- বউ! কথা কও!

যদি বড় হয় লাজ   আমার বুকের মাঝ

পাখার ভিতরে মুখ লুকাও তোমার!

অতি ধীরে মৃদু-মধু   বুকের কাছেতে, বধূ,

দু-চারিটি কথা শুধু বল একবার!

[কিছুক্ষণ থামিয়া]

তবে কি কবে না কথা, পূরাবে না আশা?

ভাল ভাল, কোয়ো নাকো,   মুখ ফিরাইয়া থাকো,

বুঝিনু আমার পরে নাই ভালবাসা।

 

 

ললিতা।

         [স্বগত]   কি কহিব কথা সখা?   কহিতে না জানি!

বুদ্ধি নাই-- ক্ষুদ্র নারী-- ফুটেনাকো বাণী।

মনে কত ভাব যুঝে,  হৃদয় নিজে না বুঝে,

প্রকাশ করিতে গিয়া কথা না যোগায়।

হৃদয়ে যে ভাব উঠে হৃদয়ে মিলায়।

তবে কি কহিব কথা-- ভেবে নাহি পাই--

কথা কহিবার, সখা,  ক্ষমতা যে নাই!

কি এমন কথা কব   ভাল যা লাগিবে তব?

তুমি গো শুনাও মোরে কাহিনী বিরলে,

এক মনে শুনি আমি বসি পদতলে।

মাথার উপর দিয়া তারাগুলি যত

একটি একটি করি হবে অস্তগত।

শ্রান্তি তৃপ্তি নাহি জানি   ও মুখের প্রতি বাণী

তৃষিত শ্রবণে মোর শুনিতে শুনিতে

কখন প্রভাত হ'ল নারিব জানিতে।

 

 

অনিল।

           জান ত-- জান ত, সখি, মানুষের মন?

যে কথা সে ভালবাসে   শত শতবার তা সে

ঘুরে ফিরে শুনিবারে চায় প্রতিক্ষণ।

জানি ভালবাস তুমি, ললিতা, আমারে--

তবু, সখি, প্রতিক্ষণে   বড় সাধ যায় মনে

বাহিরে সে প্রেমের প্রকাশ দেখিবারে।

দু-দিনে নীরব প্রেম হয় পুরাতন।

বিচিত্রতা নাহি তায়, শ্রান্ত হয় মন।

আদরতরঙ্গ-মালা    নিয়ত যে করে খেলা,

তাইতে দেখায় প্রেমে নিয়ত-নূতন।

নিত্য নব নব উঠি আদরের নাম

নিয়ত নবীন রাখে প্রণয়ের ধাম।

আদর প্রেমের, সখি, বরষার জল--

না পেলে আদর-ধারা    হয় সে যে বলহারা,

ভূমে নুয়াইয়া পড়ে মুমূর্ষু বিকল।

ওকি বালা, কেন হেন কাতর নয়ানে

এক দৃষ্টে চেয়ে আছ ভূমিতল-পানে!

হাসিতে হাসিতে, সখি, দুটা ক্ষুদ্র কথা

কহিনু, তা'তেই মনে পেয়েছে কি ব্যথা?

 

 

ললিতা।

         [স্বগত]   একা বসে ভাবিয়াছি কত-- কতবার,

কোন গুণ নাই মোর, কি হবে আমার?

হা ললিতা! কি করিস্‌-- দেখিস্‌ না চেয়ে?

শুধু দুটা কথা হা-- রে--     পারিস্‌ না কহিবারে?

দুটা আদরের কথা-- বুদ্ধিহীন মেয়ে!

দেখিস্‌ না-- দুটা কথা কহিলি না ব'লে,

আদরের ধন তোর--   প্রাণের সর্ব্বস্ব তোর

হারায়-- হারায় বুঝি-- যায় বুঝি চলে!

শুধু দুটা কথা তুই কহিলি না ব'লে!

কি কহিবি? হা অবোধ, ভাবনা কি তায়!

মুক্তকণ্ঠে বল্‌ মন যা বলিতে চায়?--

মনের গোপন ধামে    ডাকিস যে শত নামে

সেই নাম মুখ ফুটে ডাক্‌ রে তাহার!

একবার প্রাণ খুলে বল্‌ প্রাণেশ্বরে--

"মোর প্রেম, চিন্তা, আশা সব তোমা-'পরে;

নির্ব্বোধ নিগুZ ব'লে-- নাথ-- স্বামী-- প্রভু,

অসহায় অবলারে ত্যজিও না কভু!"

দিবস রজনী ভুলি    বুকে তারে রাখ্‌ তুলি,

"ভালবাসি" "ভালবাসি" বল্‌ শতবার,

আলিঙ্গনে বেঁধে বেঁধে হৃদয় তাহার!

কিন্তু লজ্জা?-- দূর হ রে-- লজ্জা, দূর হ রে--

বিষময় বাহু তোর     বাঁধি বাঁধি শত ডোর

জীর্ণ করিয়াছে মোর মন স্তরে স্তরে!

আর না-- আর না লজ্জা-- দূর হ এখন!

চূর্ণ চূর্ণ ভেঙ্গে আর ফেলিস না মন!

শিথিল করে দে তোর     শতেক বন্ধন-ডোর,

মুহূর্ত্তের তরে মুখ তুলি একবার--

বন্ধনজর্জর মন শুধু রে মুহূর্ত্ত ক্ষণ

বাহিরে বাতাসে গিয়া বাঁচুক আবার!

 

 

অনিল।

    আজি শুভদিনে ওকি অশ্রুবারিপাত?

অশ্রুজলে কাটাবে কি ফুলশয্যা-রাত?

 

 

[কাননের অপর পার্শ্বে

 

অভিমান করিয়া বিজয়ের প্রতি]

 

নলিনী।

          মিছে বোলোনাকো মোরে   ভালবাস ভালবাস!

নয়নেতে ঝরে বারি   হৃদয়ে হৃদয়ে হাস!

সারহীন-- ভাবহীন   দুটা লঘু কথা ব'লে--

হেসে দুটা মিষ্টি হাসি,   দুই ফোঁটা অশ্রু ফেলে,

শূন্য রসিকতা করি   দুই দণ্ড কাল হরি'

সরলহৃদয় চাহ লভিবারে অবহেলে!

অবশেষে আড়ালেতে কহ হাসি হাসি কত

রমণীর ক্ষুদ্র মন লঘু তৃণটির মত!

ভালবাসা খেলা নয়, খেলেনা নহে গো হৃদি,

নারী ব'লে মন তার দলিতে সৃজে নি বিধি!

ভাল যদি বাস, তবে ভালবাস প্রাণপণে--

ক্ষুদ্র মনে ক'রে খেলা করিও না মোর সনে!

হৃদয়ের অশ্রু ফেল দিবানিশি পদতলে,

মিছা হাসিও না হাসি-- কথা কহিও না ছলে!

 

 

বিজয়।

           কেন বালা, আমি ত লো দিনরাত্রি ভুলে

অশ্রু ঢালিয়াছি তব প্রেমতরুমূলে,

আজিও ত কিছু তার হয় নিকো ফল,

ব্যর্থ হইয়াছে মোর এত অশ্রুজল!

 

 

নলিনী।

          ওই যে সুরুচি হোথায় আছে,

যাই একবার তাহার কাছে!

[দূরে গিয়া ফিরিয়া আসিয়া]    দেখি নি এমন জ্বালা!

হাত হতে খসি পড়েছে কোথায়

      বেল ফুলে গাঁথা বালা!

[সহসা উপরে চাহিয়া] ওই দেখ হোথা কামিনী-শাখায়

      ফুটেছে কামিনীগুলি--

পাতাগুলি সাথে দু-চারিটি, সখা,

      দাও-না আমারে তুলি!

 

 

বিজয়।

                কি পাইব পুরস্কার?

 

 

নলিনী।

                পুরস্কার?-- মরি লাজে!

একটি কুসুম যদি ঠাঁই পায়

      আমার অলকমাঝে--

একটি কুসুম নুয়ে পড়ে যদি

      এ মোর কপোল-'পরে,

একটি পাপড়ি ছিঁড়ে পড়ে পায়ে

      শুধু মুহূর্ত্তের তরে,

ভুলে যদি রাখি একটি কুসুম

      রচিতে এ কণ্ঠহার--

তার চেয়ে বল আছে ভাগ্যে তব

      আর কিবা পুরস্কার!

 

 

[বিজয়ের ফুল তুলিয়া দেওন ও তাহা চরণে দলিয়া ]

 

নলিনী।

                 এই তব পুরস্কার!

অনুগ্রহ করি এ চরণ দিয়া

ফুলগুলি তব দিলাম দলিয়া,

      এই তব পুরস্কার!

 

 

বিজয়।

            আহা! আমি যদি হতেম, সজনি,

      একটি কুসুম ওর--

ওই পদতলে দলিত হইয়া

      ত্যজিতাম দেহ মোর!

[গাছের দিকে চাহিয়া নলিনীর মৃদুস্বরে গান]

 

 

      খেলা কর্‌-- খেলা কর্‌--

তোরা        কামিনী-কুসুমগুলি!

দেখ্‌, সমীরণ লতাকুঞ্জে গিয়া

কুসুমগুলির চিবুক ধরিয়া

ফিরায়ে এ ধার-- ফিরায়ে ও ধার

দুইটি কপোল চুমে বার বার

      মুখানি উঠায়ে তুলি!

তোরা খেলা কর্‌-- তোরা খেলা কর্‌

      কামিনী-কুসুমগুলি!

কভু পাতা-মাঝে লুকা রে মুখ,

কভু বায়ু-কাছে খুলে দে বুক--

মাথা নাড়ি নাড়ি নাচ্‌ কভু নাচ্‌

      বায়ু-কোলে দুলি দুলি!

দু-দণ্ড বাঁচিবে-- খেলা' তবে খেলা',

প্রতি নিমেষেই ফুরাইছে বেলা,

বসন্তের কোলে খেলা-শ্রান্ত প্রাণ

      ত্যেজিবি ভাবনা ভুলি!

 

 

অশোক।

              [দূর হইতে দেখিয়া]

ওই যে হোথায় নলিনী রয়েছে

      বসি বিজয়ের সাথে!

কত কাছাকাছি!-- কত পাশাপাশি!

      হাত রাখি তার হাতে!

অসার হৃদয়, লঘু, হীন মন

      কোন গুণ নাই যার--

শুধু ধন দেখে বিকাবি, নলিনী,

      তারে দেহ আপনার?

কতবার, প্রেম,   যাস্‌ পলাইয়া

      ভয়ে ফুলডোর দেখি--

ধনের সোনার শিকল হেরিয়া

      আজ ধরা দিলি একি?

 

 

সুরেশ।

           খুঁজিয়া খুঁজিয়া পাই না দেখিতে

      নলিনী কোথায় আছে।

ওই যে হোথায় লতাকুঞ্জতলে

      বসিয়া বিজয়-কাছে!

কি ভয় হৃদয়!   জানি গো নিশ্চয়

      সে আমারে ভালবাসে,

মন তার আছে আমারি কাছেতে

      থাকুক সে যার পাশে!

 

 

বিনোদ।

          কথা শুনে তার-- ভাব দেখে তার

      কতবার ভাবি মনে--

নলিনী আমার-- আমারেই বুঝি

      ভালবাসে সঙ্গোপনে!

      সত্য হয় যদি আহা!

সে আশ্বাসবাণী, সে হাসি মধুর,

      সত্য যদি হয় তাহা!

 

 

নীরদ।

                  কে আমার সংশয় মিটায়!

কে বলি দিবে সে ভাল বাসে কি আমায়?

তার প্রতি দৃষ্টি হাসি   তুলিছে তরঙ্গরাশি

এক মুহূর্ত্তের শান্তি কে দিবে গো হায়!

পারি নে পারি নে আর   বহিতে সংশয়ভার,

চরণে ধরিয়া তার শুধাইব গিয়া,

হৃদয়ের এ সংশয় দিব মিটাইয়া!

কিন্তু এ সংশয়ও ভাল,   পাছে গো সত্যের আলো

ভাঙ্গে এ সাধের স্বপ্ন বড় ভয় গণি--

হানে এ আশার শিরে দারুণ অশনি!

[নলিনীর নিকট হইতে বিজয়ের দূরে গমন, ও নলিনীর  নিকটে গিয়া প্রমোদের গান ]

 

 

আঁধার শাখা উজল করি,

হরিত পাতা ঘোমটা পরি

বিজন বনে, মালতীবালা,

      আছিস কেন ফুটিয়া?

শুনাতে তোরে মনের ব্যথা

শুনিতে তোর মনের কথা

পাগল হয়ে মধুপ কভু

      আসে না হেথা ছুটিয়া!

মলয় তম প্রণয়-আশে

ভ্রমে না হেথা আকুল শ্বাসে,

পায় না চাঁদ দেখিতে তোর

      সরমে-মাখা মুখানি!

শিয়রে তোর বসিয়া থাকি

মধুর স্বরে বনের পাখী

লভিয়া তোর সুরভিশ্বাস

      যায় না তোরে বাখানি!

 

 

নলিনী।

           [হাসিয়া] শুনিয়া ধীরে মালতীবালা

      কহিল কথা সুরভি-ঢালা,--

"আঁধার বনে আছি গো ভাল,

      অধিক আশা রাখি না!

তোদের চিনি চতুর অলি,

মনো-ভুলানো বচন বলি

ফুলের মন হরিয়া লয়ে

      রাখিয়া যাস যাতনা!

অবলা মোরা কুসুমবালা

সহিব মিছা মনের জ্বালা

চিরটি কাল, তাহার চেয়ে

      রহিব হেথা লুকায়ে!

আঁধার বনে রূপের হাসি

ঢালিব সদা সুরভিরাশি,

আঁধার এই বনের কোলে

      মরিব শেষে শুকায়ে!"

[অশোকের নিকটে গিয়া]

 

অশোক, হোথায় দূরে কেন তুমি

      দাঁড়াইয়া এক ধার?

কত দিন হ'ল আমার কাছেতে

      আস নি ত একবার!

ভুলেছে যে প্রেম, ভুলেছ যে মোরে,

      তোমার কি দোষ আছে?

এ মুখ আমার এ রূপ আমার

      পুরাতন হইয়াছে?

ভাল, সখা, ভাল, প্রেম না থাকিলে

      আসিতে নাই কি আছে?

যেচে প্রেম কভু পাওয়া নাহি যায়,

      বন্ধুত্বে কি দোষ আছে?

যদি সারাদিন রহিয়া তোমার

      প্রাণের রূপসী-সাথে

কোনো সন্ধ্যাবেলা মুহূর্ত্তের তরে

      অবকাশ পাও হাতে,

আমাদের যেন পড়ে গো স্মরণে--

      এসো একবার তবে!

দু-চারিটা গান গাব সবে মিলি

      দু-চারিটা কথা হবে!

 

 

অশোক।

          [স্বগত]   পাষাণে বাঁধিয়া মন মনে করি যতবার

কাছে তার যাবনাকো মুখ দেখিব না আর,

তার মুখ হতে তিল আঁখি ফিরায়েছি যবে--

দূরে যেতে এক পদ শুধু বাড়ায়েছি সবে,

অমনি সে কাছে ঢ'লে   দু একটি কথা ব'লে

পাষাণ প্রতিজ্ঞা মোর ধূলিসাৎ করিয়াছে!

শুধু দুটি কথা ব'লে, একবার এসে কাছে!

জানি না কি শুধু সে গো মন ভোলাবার কথা?

হে হাসি-- সে মিষ্টি হাসি-- নিদারুণ কপটতা?

জানে জানে সব জানে--   তবু মন নাহি মানে,

প্রতিবার ঘুরে ফিরে তবুও সে যায় তথা।

জেনে শুনে তবু তার ভাল লাগে কপটতা,

সেই মিষ্টি হাসি, সেই মন ভুলাবার কথা!

যবে ভুলাবার তরে    কপট আদর করে,

মোর মুখপানে চেয়ে গাহে প্রণয়ের গীত,

সাধ করে মন যেন হতে চায় প্রতারিত!

হা হৃদয়! লঘু, নীচ, হীন-- হীন অতি--

খেলেনার 'পরে তোর এতই আরতি?

কখনো না-- কখনো না-- হোক যা হবার,

এই যে ফিরানু মুখ ফিরিব না আর!

ধিক্‌-- ধিক্‌-- শিশু-হৃদি!   ধিক্‌ ধিক্‌ তোরে--

লজ্জার পাথারে আর ডুবাস্‌ নে মোরে!

কপট রমণী এক, অধম, চপল,

নির্দ্দয়, হৃদয়হীন, অসার দুর্ব্বল--

দুর্ব্বল হাতে সে তার    যেথা ইচ্ছা সেই ধার

টলাইয়ে নুয়াইবে এ মোর হৃদয়?

তৃণ-- শুষ্ক পত্র এক-- দুর্ব্বলতা-ময়?

কাঁদাইবে, হাসাইবে--   দূরে যেতে নাহি দিবে--

নিশ্বাসে উড়ায়ে দেবে প্রতিজ্ঞা আমার!

ইচ্ছা, সাধ, চিন্তা, আশা--   দুঃখ, সুখ, ভালবাসা

সমস্ত রাখিবে চাপি পদতলে তার!

শিকলি-- পশুর সম--   বাঁধিবে গলায় মম,

মুহূর্ত্ত নাহিবে শক্তি মাথা তুলিবার--

ধূলিতে পড়িবে লুটি এ মাথা আমার!

হা হৃদয়, কি করিলি?   তুই কি উন্মাদ হলি?

সমস্ত সংসার তুই দিলি বিসর্জ্জন!

ধন, মান, যশ, আশা--   সখাদের ভালবাসা,

লুটিতে শুধু কি এক নারীর চরণ?

নিশ্বাসে প্রশ্বাসে তার উঠিতে পড়িতে?

কাঁদিতে হাসিতে তার কটাক্ষে ইঙ্গিতে?

খেলেনা হইতে তার ভ্রূকুটি-হাসির?

কেন এত গেলি গ'লে!   শুধু রূপ আছে ব'লে?

ক্ষণস্থায়ী জড়রূপ গঠিত মাটির!

কুঞ্চিত-কুন্তল তার, আরক্ত কপোল,

সুদীর্ঘ নয়ন তার কটাক্ষ বিলোল,

তাই কি ত্যজিলি তুই সমস্ত সংসার?

জীবনের উদ্দেশ্য করিলি ছারখার?

সমস্ত জগৎ হাসে ধিক্‌ ধিক্‌ বলি--

প্রতিক্ষণে আত্মগ্লানি উঠে জ্বলি জ্বলি--

তবু তার পদতলে লুটাইবে গিয়া

শুধু তার আঁখি দুটি সুদীর্ঘ বলিয়া?

কি মদিরা আছে, বালা, নয়নে তোমার!

ফেলেছ বিহ্বল করি হৃদয় আমার!

ফিরাও ফিরাও আঁখি--   পাতা দিয়া ফেল ঢাকি--

হৃদয়েরে দূরে যেতে দাও একবার!

করেছি দারুণ পণ    করিবারে পলায়ন,

নিষ্ঠুর মধুর বাক্যে ফিরায়ো না আর!

ও অনল হতে সাধ দূরে থাকিবার--

ফিরায়ো না মোরে, সখি, ফিরায়ো না আর!

 

 



কবি ও মুরলা

 

কবি।

        উন্মাদিনী কল্লোলিনী   ক্ষুদ্র এক নির্ঝরিণী

শিলা হতে শিলান্তরে লুটিয়া লুটিয়া,

নেচে, নেচে, অট্টহেসে,   ফেনময় মুক্তকেশে

প্রশান্ত হ্রদের কোলে পড়ে ঝাঁপাইয়া!

শুধু মুহূর্ত্তের তরে    তিল বিচলিত করে

সে প্রশান্ত সলিলের শুধু এক পাশ--

উনমত্ত কোলাহল   অধীর তরঙ্গদল

মুহূর্ত্তের মাঝে সব পায় গো বিনাশ!

দেখ, সখি, গৃহমাঝে দেখ গো চাহিয়া,

নাচ, গান, বাদ্য, হাসি--   আমোদ কল্লোলরাশি--

নিশীথপ্রশান্তি-মাঝে পড়িছে ঝাঁপিয়া!

আলোকে আলোকে গৃহ উঠেছে মাতিয়া,

স্ফটিকে স্ফটিকে আলো নাচে বিদ্যুতিয়া,

শত রমণীর পদ পড়ে তালে তালে।

চরণের আভরণ    নেচে নেচে প্রতিক্ষণ

শত আলোকের বাণ হানে এককালে,

মূর্চ্ছিয়া পড়িছে আলো হীরকে হীরকে!

শতকৃষ্ণ আঁখিতারা    হানিছে আলোকধারা--

শত হৃদে পড়ে গিয়া ঝলকে ঝলকে!

চারি দিকে ছুটিতেছে আলোকের বাণ,

চারি দিকে উঠিতেছে হাসি বাদ্য গান।

কিন্তু হেথা চেয়ে দেখ কি শান্ত যামিনী!

কি শুভ্র জোছনা ভায়! কি শান্ত বহিছে বায়!

কেমন ঘুমন্ত আছে প্রশান্ত তটিনী!

বল, সখি, পূর্ণিমা কি আমাদের রাত?

করি আপনার মনে রজনী প্রভাত!

               গান

 

 

নীরব রজনী দেখ মগ্ন জোছনায়।

ধীরে ধীরে অতিধিরে-- অতিধীরে গাও গো!

ঘুমঘোরময় গান বিভাবরী গায়,

রজনীর কণ্ঠ-সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো!

নিশীথের সুনীরব শিশিরের সম,

নিশীথের সুনীরব সমীরের সম,

নিশীথের সুনীরব জোছনা সমান

অতি-- অতি-- অতিধীরে কর সখি গান!

নিশার কুহক-বলে   নীরবতাসিন্ধুতলে

মগ্ন হয়ে ঘুমাইছে বিশ্ব চরাচর--

প্রশান্ত সাগরে হেন   তরঙ্গ না তুলে যেন

অধীর-উচ্ছ্বাস-ময় সঙ্গীতের স্বর!

তটিনী কি শান্ত আছে! ঘুমাইয়া পড়িয়াছে

বাতাসের মৃদুহস্ত-পরশে এমনি,

ভুলে যদি ঘুমে ঘুমে   তটের চরণ চুমে

সে চুম্বনধ্বনি শুনে চমকে আপনি!

তাই বলি অতি ধীরে-- অতি ধীরে গাও গো,

রজনীর কণ্ঠ-সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো!

[মুরলার প্রতি]

 

কেন লো মলিন, সখি, মুখানি তোমার?

কাছে এস, মোর পাশে বোসো একবার!

কেন, সখি, বল্‌ মোরে,    যখনি দেখেছি তোরে

মাটি-পানে নত দুটি বিষণ্ন নয়ান!

আননের দুই পাশ   অবদ্ধ কুন্তলরাশ--

করুণ ও মুখখানি বড়, সখি, ম্লান!

 

 

মুরলা।

     সত্য ম্লান কি গো, কবি, এ মুখ আমার?

নিশীথবাতাস লাগি   মনে কত উঠে জাগি

নিস্তব্ধ জোছনারাতে ভাবনার ভার!

[স্বগত]       আহা কি করুণ, সখা, হৃদয় তোমার!

কবি গো!   বুক যে যায়-- ভেঙ্গে যায়, ফেটে যায়--

অশ্রুজল রুধিবারে পারিনাক আর!

পারি নে-- পারি নে সখা, পারি নে গো আর!

ভেঙ্গে বুঝি ফেলে তারা  মর্ম্মকারাগার!

একবার পায় ধরে   কেঁদে নিই প্রাণ ভরে--

একবার শুধু, কবি, শুধু একবার!

যুঝিছে বুকের মাঝে শত অশ্রুধার!

 

 

কবি।

        একটি প্রাণের কথা রয়েছে গোপনে,

বলিব বলিব তোরে করিতেছি মনে!

আজ জোছনার রাতে বিপাশার তীরে

কাছে আয়, সে কথাটি বলি ধীরে ধীরে!

 

 

মুরলা।

      কি কথা সে?   বল কবি!   করহ প্রকাশ!

 

 

কবি।

        কে জানে উঠেছে হৃদে কিসের উচ্ছ্বাস!

খেলিছে মর্ম্মের মাঝে অধীর উল্লাস!

অথচ, উল্লাস সেই সুকুমার হেন,

শিশিরের বাষ্প দিয়ে গঠিত সে যেন!

হৃদয়ে উঠেছে যেন বন্যা জোছনার,

মধুর অশান্তিময় হৃদয় আমার।

সূক্ষ্ম আবরণ, গাঁথা সন্ধ্যামেঘস্তরে,

পড়িয়াছে যেন মোর নয়নের 'পরে!

কিছু যেন দেখেও দেখে না আঁখিদ্বয়,

সকল অস্ফুট, যেন সন্ধ্যাবর্ণময়!

শোন্‌ বলি, মুরলা লো, আরো আয় কাছে--

শূন্য এ হৃদয় মোর ভাল বাসিয়াছে!

 

 

মুরলা।

      ভালবাসে? কারে কবি? কার সখা? কারে?

 

 

কবি।

        মধুর নলিনী-সম নলিনী বালারে!

 

 

মুরলা।

      নলিনী? নলিনী সখা! নলিনী বালারে?

কবি মোর! সখা মোর! ভালবাস তারে?

 

 

কবি।

        হাঁ মুরলা, সেই নলিনী বালারে,

      তারে তুমি জান না কি?

এমন মধুর  মুখভাব তায়?

      এমন মধুর আঁখি!

এত রাশি রাশি খেলাইছে হাসি

      হৃদয়ের নিরালায়--

নয়ন অধর ভাসাইয়া দিয়া

      উথলি পড়িয়া যায়!

যে দিকে সে চায় হাসিময় চোখে

      হাসি উঠে চারি ধার,

যে দিকে সে যায়-- আঁধার মুছিয়া

      চলে জ্যোতি-ছায়া তার!

তার সে-নয়ন-নিঝর হইতে

      হাসি সুধারাশি ঝরি,

এই হৃদয়ের আকাশ পাতাল

      রেখেছে জোছনা করি!

 

 

মুরলা।

      [স্বগত]    দেবি গো করুণাময়ী,

কোথা পাই ঠাঁই মা গো-- কোথা গিয়ে কাঁদি!

দুর্ব্বল এ মন দে মা পাষাণেতে বাঁধি!

[প্রকাশ্যে]   আহা, কবি, তাই হোক্‌-- সুখে তুমি থাক।

এ নব প্রণয়ে মন পূর্ণ করে রাখ!

নয়নের জল তব কিছুতে মোছে নি,

হৃদয়-অভাব তব কিছুতে ঘোচে নি--

আজ, কবি, ভালবেসে সুখী যদি হও শেষে,

আজ যদি থামে তব নয়নের ধার,

দেবতা গো, তাই করো!   চিরজন্ম সুখী করো

কবিরে আমার, বাল্য-সখারে আমার!

 

 

কবি।

        মুছ অশ্রুজল, সখি, কেঁদো না অমন--

যে হাসির কিরণেতে পূর্ণ হ'ল মন

একেলা বিজনে বসি কবিরে তোমার

কাঁদিতে দেখিতে, সখি, হবেনাক আর!

আজ হতে মিলাবে না হাসি এ অধরে,

বিষণ্ন হবে না মুখ মুহূর্ত্তের তরে।

আয় সখি, আয় তবে, কাছে আয় মোর--

মুছাইয়া দিই আহা অশ্রুজল তোর!

 

 

মুরলা।

      অশ্রু মুছায়ো না আর--   বহুক যা বহিবার--

এখনি আপনা হতে থামিবে উচ্ছ্বাস!

এ অশ্রু মুছাতে, কবি, কিসের প্রয়াস!

ক্ষুদ্র হৃদয়ের কত ক্ষুদ্র সুখ দুখ

আপনি সে জাগি উঠে--  আপনি শুকায় ফুটে,

চেয়েও দেখে না কেহ উঠুক-পড়ুক!

এস সখা, ওই কাঁধে রাখি এই মুখ

একে একে সব কথা কহ গো আমারে--

বড় ভাল বাস কি সে নলিনী বালারে?

 

 

কবি।

        শুধু যদি বলি, সখি, ভাল বাসি তায়

এ মনের কথা যেন তাহে না ফুরায়।

ভালবাসা ভালবাসা সবাই ত কয়,

ভালবাসা কথা যেন ছেলেখেলাময়!

প্রতি কাজে প্রতি পলে   সবাই যে কথা বলে

তাহে যেন মোর প্রেম প্রকাশ না হয়!

মনে হয় যেন, সখি, এত ভালবাসা

কেহ কারে বাসে নাই,   কারো মনে আসে নাই--

প্রকাশিতে নারে তাহা মানুষের ভাষা!

 

 

মুরলা।

      তাই হোক, ভাল তারে বাস প্রাণপণে!

তারে ছাড়া আর কিছু না থাকুক মনে!

 

 

কবি।

        সে আমার ভালবাসা না যদি পূরায়!

যেই প্রেম-আশা লয়ে   রয়েছি উন্মত্ত হয়ে,

বিশ্ব দেখি হাস্যময় যাহার মায়ায়,

যদি সখি, ফিরে নাহি পাই ভালবাসা--

ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে সেই প্রেম-আশা--

মুমূর্ষু আশার সেই গুরু দেহভার

সমস্ত জগৎ-ময়   বহিয়া বেড়াতে হয়--

শ্রান্ত হৃদি দিবানিশি করে হাহাকার!

অসুস্থ আশার সেই মুমূর্ষু-নিশ্বাসে

যদি এ হৃদয় হয় শূন্য মরুভূমিময়,

হৃদয়ের সব বৃত্তি শুকাইয়া আসে--

দিনরাত্রি মৃত ভার করিয়া বহন

ম্রিয়মাণ হয়ে যদি পড়ে এই মন!

 

 

মুরলা।

     ও কথা বোলো না, কবি, ভেবো নাক আর--

নিশ্চয় হইবে পূর্ণ প্রণয় তোমার।

কি-জানি-কি-ভাবময় ওই তব মুখ--

ওই তব সুধাময়-- প্রেমময়-- স্নেহময়--

সুকুমার-- সুকোমল-- করুণ ও মুখ--

হাসি আর অশ্রুজলে মাখানো ও মুখ--

রাখিতে প্রাণের কাছে   এমন কে নারী আছে

পেতে না দিবেক তার প্রেমময় বুক!

শত ভাব উথলিছে ওই আঁখি দিয়া,

শত চাঁদ ওই খানে আছে ঘুমাইয়া--

মুছাইতে ও মধুর নয়নের ধার

কোন্‌ নারী দিবেনাক আঁচল তাহার!

মধুময় তব গান   দিবারাত করি পান

ঘুমাইয়া পড়িবে সে হৃদয়ে তোমার।

বসি ওই পদমূলে   মুগ্ধ আঁখিপাতা তুলে

দিন রাত্রি চেয়ে রবে ওই মুখপানে

সূর্য্যমুখী ফুল-সম অবাক নয়ানে!

হেন ভাগ্যবতী নারী কে আছে ধরায়

যেজন কবির প্রেম না চাহিয়া পায়!

[স্বগত]      মুরলা রে, কোন আশা পূরিল না তোর--

কাঁদ্‌ তুই অভাগিনী এ জীবন-ভোর!

এ জনমে তো অশ্রু মুছাবে না কেহ,

এ জনমে ফুটিবে না তোর প্রেম স্নেহ!

কেহ শুনিবে না আর তোর মর্ম্মব্যথা,

ভালবেসে তোর বুকে রাখিবে না মাথা!

বড় যদি শ্রান্ত হয়ে পড়ে তোর মন

কেহ নাহি কহিবারে আশ্বাসবচন!

মাতৃহারা শিশু-মত কেঁদে কেঁদে অবিরত

পথের ধুলার পরে পড়িবি ঘুমায়ে--

একটি স্নেহের নেত্র দেখিবে না চেয়ে?

 

 

দূর হইতে] কবি।

  পূর্ণিমারূপিণী বালা!   কোথা যাও, কোথা যাও!

একবার এই দিকে মুখানি তুলিয়া চাও!

কি আনন্দ ঢেলেছ যে,   কি তরঙ্গ তুলেছ যে

আমার হৃদয়মাঝে একবার দেখে যাও!

দিবানিশি চায়, বালা, অধীর ব্যাকুল মন

ও হাসি-সমুদ্র-মাঝে করে আত্মবিসর্জ্জন!

হেরি ওই হাসিময় মধুময় মুখপানে

উন্মত্ত অধীর হৃদি তিল দূর নাহি মানে--

চায়, অতি কাছে গিয়া ওই হাত দুটি ধরি

অচেতনে কাটাইয়া দেয় দিবা বিভাবরী!

একটি চেতনা শুধু জাগি রবে অনিবার--

সে চেতনা তুমি-ময়-- ওই মিষ্ট হাসি-ময়--

ওই সুধামুখ-ময়-- কিছু-- কিছু নহে আর!

আমার এ লঘু-পাখা কল্পনার মেঘগুলি

তোমার প্রতিমা, বালা, মাথায় লয়েছে তুলি--

তোমার চরণ-জ্যোতি পড়িয়া সে মেঘ-'পরে

শত শত ইন্দ্রধনু রচিয়াছে থরে থরে!

তোমার প্রতিমা লয়ে কিরণে-কিরণে-ভরা

উড়েছে কল্পনা, কোথা ফেলিয়ে রেখেছে ধরা!

হরিত-আসন-'পরে নন্দনবনের কাছে

ফুলবাস পান করি বসন্ত ঘুমায়ে আছে,

ঘুমন্ত সে বসন্তের কুসুমিত কোল-'পরে

তোমারে কল্পনারাণী বসায়েছে সমাদরে--

চারি দিকে জুঁইফুল   চারি দিকে বেলফুল--

ঘিরে ঘিরে রহিয়াছে অজস্র কুসুমকুল,

শাখা হতে নুয়ে প'ড়ে পরশিয়া এলো চুল

শতেক মালতীকলি   হেসে হেসে ঢলাঢলি,

কপালে মারিছে উঁকি   কপোলে পড়িছে ঝুঁকি

ওই মুখ দেখিবারে কৌতুহলে সমাকুল,

অজস্র গোলাপ-রাশি পড়িয়া চরণতলে

না জানি কি মনোদুখে আকুল শিশিরজলে!

তোমার প্রতিমা লয়ে কল্পনা এমনি করি

খেলাইয়া বেড়াইছে, নাহি দিবা বিভাবরী--

কভু বা তারার মাঝে কভু বা ফুলের 'পরে

কভু বা উষার কোলে কভু সন্ধ্যামেঘস্তরে;

কত ভাবে দেখিতেছে,   কত ছবি আঁকিতেছে--

প্রফুল্ল-আনন কভু হরষের হাসি-মাখা,

অভিমান-নত আঁখি কভু অশ্রুজলে ঢাকা।

কাছে এস, কাছে এস, একবার মুখ দেখি--

তোল গো, নলিনীবালা, হাসিভারে নত আঁখি!

মর্ম্মভেদী আশা এক লুকানো হৃদয়তলে,

ওই হাতে হাত দিয়ে   প্রাণে প্রাণে মিশাইয়ে

বসন্তের বায়ু সেবি কুসুমের পরিমলে

নীরব জোছনা রাতে বিপাশাতটিনীতীরে

ফুলপথ মাড়াইয়া দোঁহে বেড়াইব ধীরে!

আকাশে হাসিবে চাঁদ, নয়নে লাগিবে ঘোর,

ঘুমময় জাগরণে করিব রজনী ভোর!

আহা সে কি হয় সুখ!   কল্পনায় ভাবি মনে

বিহ্বল আঁখির পাতা মুদে আসে দু-নয়নে!

 

 

মুরলা।

      [স্বগত]      হৃদয় রে!

এ সংসারে আর কেন রয়েছি আমরা?

তুচ্ছ হতে তুচ্ছ আমাদেরো তরে আজ

তিলমাত্র স্থান কি রে রাখিয়াছে ধরা!

এখনো কি আমাদের ফুরায় নি কাজ?

হৃদয় রে!   হৃদয় রে!   ওরে দগ্ধ মন!

আমাদের তরে ধরা হয় নি সৃজন!

 

 

কবি।

        মুরলা লো! চেয়ে দেখ্‌-- চেয়ে দেখ্‌ হোথা!

বল্‌ দেখি এত হাসি   এত মিষ্ট সুধারাশি

হেন মুখ হেন আঁখি দেখেছিস্‌ কোথা?

 

 

মুরলা।

      এমন সুন্দরী আহা কভু দেখি নাই--

কবির প্রেমের যোগ্য আর কিবা চাই!

কবিতার উৎস-সম ও নয়ন হতে

ঝরিবে কবিতা তব হৃদে শত-স্রোতে!

হাসিময় সৌন্দর্য্যের কিরণ-পরশে

বিহঙ্গম-হৃদি তব গাহিবে হরষে--

মধুর সঙ্গীতে বিশ্ব করিবে প্লাবন!

সুখে থাকো পূর্ণ মনে,   ভালবাসো প্রাণপণে

প্রেমযোগ্য নারী যবে পেয়েছ এমন!

[স্বগত]      কেন এত অশ্রু আজি করি বরিষণ?

কেন রে কিসের দুখ?   কেন এত ফাটে বুক?

কিসের যন্ত্রণা মর্ম্ম করিছে দংশন?

কখনো ত কবির অমূল্য ভালবাসা

অভাগিনী মনে মনে করি নাই আশা!

জানিতাম চিরদিন   রূপহীন গুণহীন

তুচ্ছ মুরলার এই ক্ষুদ্র ভালবাসা

পুরাতে নারিবে তাঁর প্রণয়পিপাসা--

মোরে ভালবেসে কবি সুখী হইবে না!

তবু আজ কিসের গো, কিসের যাতনা!

আজ কবি মুছেছেন অশ্রুবারিধার,

বহুদিনকার আশা পূরেছে তাঁহার!

আহা কবি, সুখে থাকো,   আর কিছু চাই নাকো--

এই মুছিলাম অশ্রু, আর কাঁদিব না!

কিসের যাতনা মোর, কিসের ভাবনা!

 

 

কবি।

        ওই দেখ্‌ ফুল তুলে আঁচলটি ভরি

কামিনীর শাখা লয়ে   ওই দেখ্‌ ভয়ে ভয়ে

অতি যত্নে রাখিয়াছে নোয়াইয়া ধরি,

পাছে কুসুমের দল ভূঁয়ে পড়ে ঝরি!

ওই দেখ্‌ উচ্চ শাখে ফুটিয়াছে ফুল,

তুলিবার তরে আহা কতই আকুল!

কিছুতে তুলিতে নারে কত চেষ্টা করি--

শাখাটি ধরিয়া শেষে   নাড়িছে মধুর রোষে,

কুসুম শতধা হোয়ে পড়িতেছে ঝরি।

বিফল হইয়া শেষে সখীদের কোলে

ওই দেখ্‌ হেসে হেসে পড়িতেছে ঢলে!

 

 

মুরলা।

                     [স্বগত]

আমি যদি হইতাম হাস্যোল্লাসময়

নির্ঝরিণী, বরষার নবোচ্ছ্বাসময়!

হরষেতে হেসে হেসে   কবির কাছেতে এসে

ডুবাতেম ভালবেসে আদরে আদরে!

যদি কভু দেখিতাম মুহূর্ত্তের তরে

বিষাদ ছাইছে পাখা কবির অধরে,

হাসিয়া কত-না হাসি   ঢালিয়া সঙ্গীতরাশি

মৃদু অভিমান ক'রি মৃদু রোষভরে--

মৃদু হেসে মৃদু কেঁদে   বাহুতে বাহুতে বেঁধে

দিতেম বিষাদভার সব দূর করে!

কিন্তু আমি অভাগিনী ছেলেবেলা হতে

এ গম্ভীর মুখে মম   অন্ধকার ছায়া-সম

রহিয়াছি সতত কবির সাথে সাথে!

আমি লতা গুরুভার   মেলি শাখা অন্ধকার

হেন ঘন আলিঙ্গনে করেছি বেষ্টন,

উন্নত মাথায় তাঁর   পড়িতে দিই না আর

চাঁদের হাসির আলো, রবির কিরণ!

হা মুরলা, মুরলা রে,   এমনি করেই হা রে

হারালি-- হারালি বুঝি ভালবাসা-ধন!

বুক, ফেটে যা রে, অশ্রু কর্‌ বরিষণ--

কবি তোর অশ্রুধার   দেখিতে পাবে না আর,

যে কিরণে আছে ডুবি তাঁহার নয়ন!

দুর্ব্বল-- দুর্ব্বল হৃদি!   আবার!   আবার!

আবার ফেলিস্‌ তুই অশ্রুবারিধার?

আবার আবার কেন   হৃদয়দুয়ারে হেন

পাষাণে পাষাণে গাঁথা   কে যেন হানিছে মাথা,

কে যেন উন্মাদ-সম করে হাহাকার--

সমস্ত হৃদয়ময় ছুটিয়া আমার!

থাম্‌ থাম্‌, থাম্‌ হৃদি, মোছ্‌ অশ্রুধার!

কবি যদি সুখী হয় কি ভাবনা আর!

আহা কবি, সুখী হও!   তুমি কবি সুখী হও!

আমি কে সামান্য নারী?-- কি দুঃখ আমার!

তুমি যদি সুখী হও কি দুঃখ আমার!

ও চাঁদের কলঙ্কও হতে নাহি পারি

এত ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্র তুচ্ছ আমি নারী!

[চপলার প্রবেশ ও গান]

 

 

সখি,     ভাবনা কাহারে বলে?

সখি,     যাতনা কাহারে বলে?

      তোমরা যে বল দিবস রজনী

            ভালবাসা ভালবাসা,

সখি,     ভালাবাসা কারে কয়?

সে কি     কেবলি যাতনাময়?

তাহে     কেবলি চোখের জল?

তাহে     কেবলি দুখের শ্বাস?

লোকে তবে করে কি সুখের তরে

      এমন দুখের আশ?

জীবনের খেলা খেলিছে বিধাতা,

      আমরা তাহার খেলেনা--

      আমাদের কিবা সুখ!

সখি,     আমাদের কিবা দুখ!

সখি,     আমাদের কিবা যাতনা!

তোমাদের চোখে হেরিলে সলিল

      ব্যথা বড় বাজে বুকে--

তবু ত, সজনি, বুঝিতে পারি নে

      কাঁদ যে কিসের দুখে।

আমার চোখেতে সকলি শোভন--

সকলি নবীন-- সকলি বিমল--

সুনীল আকাশ, শ্যামল কানন,

বিশদ জোছনা, কুসুম কোমল,

      সকলি আমারি মত!

কেবলি হাসে, কেবলি গায়,

হাসিয়া খেলিয়া মরিতে চায়,

না জানে বেদন, না জানে রোদন,

      না জানে সাধের যাতনা যত!

ফুল সে হাসিতে হাসিতে ঝরে,

      জোছনা হাসিয়া মিলায়ে যায়,

হাসিতে হাসিতে আলোকসাগরে

      আকাশের তারা তেয়াগে কায়!

আমার মতন সুখী কে আছে!

আয় সখি, আয় আমার কাছে!

      সুখী হৃদয়ের সুখের গান

শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ!

প্রতিদিন যদি কাঁদিবি কেবল

      একদিন নয় হাসিবি তোরা,

একদিন নয় বিষাদ ভুলিয়া

      সকলে মিলিয়া গাহিব মোরা!

[মুরলার প্রতি]

 

 

এই যে আমার সখীর অধরে

      ফুটেছে মৃদুল হাসি!

আয়, সখি, মোরা দুজনে মিলিয়া

      ললিতারে দেখে আসি।

মালতী সেথায়, মাধবী সেথায়,

সখীরা এসেছে সবে,

এতখনে সেথা ফাটিছে আকাশ

      কমলার হাসিরবে।

 

 

মুরলা।

      চল্‌ সখি, চল্‌ তবে।

 

 



অনিল ললিতা

 

অনিল।

                   [গাহিতে গাহিতে]

কাছে তার যাই যদি   কত যেন পায় নিধি,

তবু হরষের হাসি ফুটে ফুটে ফুটে না!

কখনো বা মৃদু হেসে   আদর করিতে এসে

সহসা সরমে বাধে, মন উঠে উঠে না!

রোষের ছলনা করি   দূরে যাই, চাই ফিরি,

চরণ বারণ তরে উঠে উঠে উঠে না।

কাতর নিশ্বাস ফেলি,   আকুল নয়ন মেলি

চাহি থাকে, লাজ-বাঁধ তবু টুটে টুটে না!

যখন ঘুমায়ে থাকি   মুখপানে মেলি আঁখি

চাহি থাকে, দেখি দেখি সাধ যেন মিটে না!

সহসা উঠিলে জাগি,   তখন কিসের লাগি

সরমেতে ম'রে গিয়ে কথা যেন ফুটে না!

লাজময়ি! তোর চেয়ে   দেখি নি লাজুক মেয়ে,

প্রেমবরিষার স্রোতে লাজ তবু টুটে না!

 

 

ললিতা।

                      [স্বগত]

পাষাণে বাঁধিয়া মন   আজ করেছিনু পণ

কাছে যাব-- কথা কব-- যাচিব আদর আজ!

ওরে, মন, ওরে মন, কার কাছে তোর লাজ?

আপনার চেয়ে যারে করেছিস্‌ আপনার

তার কাছে বল্‌ দেখি কিসের সরম আর?

 

 

অনিল।

     ফুল তুলিবার ছলে ওই যে ললিতা আসে,

মনে মনে জানা আছে   এলেই আমার কাছে

অমনি হাতটি ধরি বসাব আমার পাশে।

অন্য দিকে -পানে আমি চাহিয়া রহিব আজ,

দেখিব কেমন করি কোথা তার থাকে লাজ?

 

 

ললিতা।

             [ফুল তুলিতে তুলিতে]

নাহয় বসিনু কাছে   কি তাহাতে দোষ আছে?

বসিব নাথের পাশে তাহাতে কি আসে যায়?

আর, লজ্জা-- লজ্জা নয়-- লজ্জারে করিব জয়--

নাহয় বসিনু কাছে, কিসের সরম তায়!

কোথা লজ্জা-- লজ্জা কোথা?   এই ত বসিনু হেথা--

এই ত করিনু জয়, এই ত বসিনু কাছে--

বসিব নাথের পাশে কি তাহাতে দোষ আছে?

এখনো-- এখনো মোরে দেখিতে পান নি তবে--

তবে কি গো আরো কাছে-- আরো কাছে যেতে হবে?

আর নয়-- আরো কাছে যাইব কেমন করে?

হেথা তবে বসে থাকি,   মালাগুলি গেঁথে রাখি,

এখনি ভাবনা ভাঙ্গি দেখিতে পাইবে মোরে!

যদিবা দেখিতে পায় কি তবে করিবে মনে?

যদি গো বুঝিতে পারে   দেখিতে এসেছি তারে,

মিছে মালা-গাঁথা ছলে বসে আছি এইখানে?

 

 

অনিল।

     এই যে ললিতা হোথা--   ফুরালো মালা গাঁথা?

আরেকটু কাছে এসে নাহয় গাঁথিতে মালা!

এই হেথা কাছে আয়--    কিসের সরম তায়?

কেমন গাঁথিলি ফুল একবার দেখি বালা!

আদরিণী-- আদরিণী-- দেখি হাতখানি তোর!

একবার দেখি সখি, বাঁধ্‌ লো হৃদয় মোর!

এমনি করিয়া, সখি, কাছে আন্‌ মুখখানি--

এমনি করিয়া রাখ্‌ বুকের মাঝারে আনি!

কেন, লাজ এত কেন-- আঁখি দুটি নত কেন?

কি করেছি? একটি শুধু চুম্বন বইত নয়!

আরেকটি এই লও-- অরেকটি এই লও--

আর নয় করিব না বড় যদি লাজ হয়!

নাহয় কুন্তল দিয়ে ঢেকে দিই মুখখানি!

দেখিতে আনন তোর   ওই চন্দ্র ভাবে-ভোর

এক দৃষ্টে চেয়ে, সখি, রয়েছে অবাক্‌ মানি!

ওই দেখ্‌ তারাগলি   সহস্র নয়ন খুলি

ওই মুখটির তরে খুঁজিছে সমস্ত ধরা--

উচিত কি হয়, সখি, তাদের নিরাশ করা--

নয়নে নয়ন রাখি   একবার মেল আঁখি,

মিশাও কপোলে মোর ললিত কপোল তব!

কথা কও কানে,কানে,   মৃদু প্রণয়ের গানে

জাগাও ঘুমন্ত হৃদে সুখস্বপ্ন নব নব!

মনে আছে সেই রাত্রে কত সাধনার পরে

একটি সঙ্গীত, সখি, গিয়াছিলে গাহিবারে--

আরম্ভ করেই সবে অমনি থামালে গীত,

নিজের কণ্ঠের স্বরে নিজে হয়ে সচকিত!

সেই আরম্ভের কথা এখনো রয়েছে কানে,

সেই আরম্ভের সুর এখনো বাজিছে প্রাণে!

সে আরম্ভ শেষ, বালা, আজিকে করিতে চাই!

বড় কি হতেছে লাজ?   ভাল, সখি, কাজ নাই!

 

 

ললিতা।

     [স্বগত] কি কহিব?   বড়, সখা, মনে মনে পাই ব্যথা,

না জানি গাহিতে গান, না জানি কহিতে কথা!

কত আজ বেছে বেছে তুলেছি কুসুমভার,

কতখন হতে আজ   ভেবেছি ভুলিয়া লাজ

নিশ্চয় এ ফুলগুলি দিব তারে উপহার!

হাতটি এগিয়ে আজ গিয়েছিনু কতবার,

অমনি পিছায়ে হাত লইয়াছি শতবার!

সহস্র হউক লাজ,   এ কুসুমগুলি আজ

নিশ্চয় দিব গো তাঁরে না হবে অন্যথা তার!

কিন্তু কি বলিয়া দিব?   কি কথা বলিতে হবে?

বলিব কি-- "ফুলগুলি   যতনে এনেছি তুলি,

যদি গো গলায় পর' মালা গেঁথে দিই তবে"?

ছি ছি গো বলি কি করে-- সরমে যে যাব মরে--

নাইবা বলিনু কিছু, শধু দিই উপহার!

দিই তবে? দিই তবে?   দিই তবে এইবার?

দূর হোক্‌ কি করিব?   বড় যে গো লজ্জা করে!

থাক্‌ গো এখন থাক্‌-- দিব আরেকটু পরে!

 

 

অনিল।

     কি হয়েছে?   দিতে কি লো চাস্‌ ফুল-উপহার?

দে-না লো গলায় গেঁথে, কিসের সরম তার?

একটি দাও ত সখি, পরাই তোমার চুলে।

আর দুটি দাও সখি, পরাইব কর্ণমূলে।

মোরে দাও সবগুলি-- গাঁথিব ফুলের বালা,

গলায় দুলায়ে দিব গাঁথিয়া চাঁপার মালা,

আসন রচিয়া দিব দিয়ে শত শতদল!

তা হলে কি দিবি মোরে-- বল্‌ সখি বল্‌ বল্‌--

যতগুলি ফুল গাঁথি যত তার দল আছে

ততেক চুম্বন আমি লইব তোমার কাছে!

যত দিন না পারিবি শুধিতে চুম্বন-ধার

এ ভুজে রহিবি বদ্ধ এই বক্ষকারাগার!

দিবানিশি সজনি লো রেখে দেব চোখে চোখে!

বল্‌ তবে ফুলসাজে সাজায়ে দেব কি তোকে?

বলিবি না?   ভাল, সখি, দুইটি চুম্বন দাও--

নাহয় একটি দিও, মহার্ঘ হল কি তাও?

 

 

ললিতা।

                       [স্বগত]

আরেকটি বার, সখা, কর গো চুম্বন মোরে--

আরেকটি বার, সখা, রাখ গো বুকেতে ধরে!

জান আমি মুখ ফুটে সরমে বলিতে নারি,

তাই কি সহিতে হবে?   এত শান্তি, সখা, তারি?

আদরে হৃদয়ে যদি রাখ এ মাথাটি মোর,

আদরে চুম গো যদি আঁখির পাতাটি মোর,

তাহাতে আমার, সখা, অসাধ কি হতে পারে?

তবে কেন ব্যথা দিতে শুধাইছ বারে বারে?

আকুল ব্যাকুল হৃদি মিলিবারে তব পাশে

শতবার ধায়, সখা, শতবার ফিরে আসে!

দীন আপনারে, হেরে এমন সে লাজ পায়

তোমার কাছেতে, সখা, সঙ্কোচে না যেতে চায়!

সখা, তারে ডেকে নাও-- তুমি তারে ডেকে নাও--

তোমারি সে মুখ চেয়ে দাঁড়াইয়া একধার,

একটু আদর পেলে স্বর্গ হাতে পাবে তার!

 

 

অনিল।

     ডুবিছে চতুর্থী চাঁদ বিপাশার নীরে।

আয় সখি, আয় মোরা ঘরে যাই ফিরে।

আঁধারে কাননপথ দেখা নাহি যায়,

আয় তবে আরো কাছে-- আরো কাছে আয়।

হাতখানি রাখ্‌ মোর হাতের উপর,

শ্রান্ত যদি হোস্‌ মোর কাঁধে দিস্‌ ভর।

দেখিস্‌, বাধে না যেন চরণ লতায়--

আঁচল না ছিঁড়ে যায় গাছের কাঁটায়!

চমকি উঠিলি কেন?   কিছু নাই ভয়--

বাতাসের শব্দ শুধু, আর কিছু নয়!

এই দিকে পথ, বালা, এই দিকে আয়--

বাম পাশে বিপাশার স্রোত বহে যায়।

শ্রান্তি কি হতেছে বোধ?   লজ্জা কেন প্রিয়ে?

বেষ্টন কর না মোর স্কন্ধ বাহু দিয়ে!

কিসের তরাস এত-- ও কি বালা, ও কি?

ঝরিয়া পড়েছে শুধু শুষ্ক পত্র সখি!

ওই গেল গেল চাঁদ, ওই ডোবে ডোবে--

একটু জোছনারেখা এখনো যেতেছে দেখা,

আর নাই-- আর নাই-- ওই গেল ডুবে!

 

 



মুরলা ও চপলা

 

চপলা।

          দেখ্‌, সখি মোর, সত্য কহি তোরে

      প্রাণে বড় ব্যথা বাজে--

চপলার কেহ সখী নাই  হেথা

      এত বালিকার মাঝে!

তোদের ও মুখ হেরিলে মলিন

      হৃদয় কাঁদিয়া উঠে,

আকুল হইয়া শুধাবার তরে

      তাড়াতাড়ি আসি ছুটে।

শতবার করে শুধাই তোদের,

      কথা না কহিস্‌ তবু--

ভাবিস চপলা অবোধ বালিকা

      কিছু সে বুঝে না কভু!

চোখের জলের কাহিনী বুঝে না,

      বুঝে না সে ভালবাসা,

পড়িতে পারে না প্রাণের লিখন

      দুখের সুখের ভাষা!

ভাল, সখি, ভাল, নাইবা বুঝিল

      তাহাতে কি যায় আসে?

চপলা কি শুধু হাসিতেই জানে,

      কাঁদিতে কি জানে না সে?

মুরলা আমার, তোরে আমি এত

      ভালবাসি প্রাণ ভ'রে--

তবু একদিন তোর তরে, সখি,

      কাঁদিতে দিবি নে মোরে?

 

 

মুরলা।

           চপলাটি মোর, হাসিরাশি মোর,

      আমার প্রাণের সখি!

নিজের হৃদয় নিজেই বুঝি না,

      অপরে তা বুঝাব কি?

যাহাদের সুখে আমি সুখে রই

      সকলেই সুখী তারা--

তবে কেন আমি একেলা বসিয়া

      ফেলি এ নয়নধারা?

সকলেই যদি সুখে থাকে, সখি,

      আমি থাকিব না কেন?

প্রমোদ তেয়াগি বিজনে আসিয়া

      কেন বা কাঁদিব হেন?

নিজের মনেরে বুঝানু কতই,

      কিছুই না পেনু সাড়া--

মুরলার কথা শুধাস্‌ নে আর,

      মুরলা জগত-ছাড়া!

 

 

চপলা।

          এত দিনে দেখি কবির অধরে

      হরষকিরণ জ্বলে--

যেন আঁখি তার ডুবিয়া গিয়াছে

      সুখের স্বপনতলে!

জোছনা উদিলে কুসুমকাননে

      একেলা ভ্রমিয়া ফিরে,

ভাবে-মাতোয়ারা আপনার মনে

      গান গাহে ধীরে ধীরে।

নয়নে অধরে মলয়-আকুল

      বসন্ত বিরাজ করে,

মধুর অথচ উদাস হরষ

      ঘুমায় মুখের 'পরে!

হেন ভাব কেন হেরি লো তাহার

      শুধাইব তোর কাছে।

   বড়ই সে সুখে আছে।

 

 

মুরলা।

           চপলা, সখি লো, দেখেছিস তারে?

      বড় কি সে সুখে আছে?

কেমন বুঝিলি বল্‌ তাহা বল্‌

      বল্‌ সখি মোর কাছে!

      বড় কি সে সুখে আছে?

 

 

চপলা।

           হাঁ লো, সখি, হাঁ, লো-- শোন্‌ বলি তোরে--

      আয়, সখি, মোর পাশে--

কবি আমাদের নলিনীবালারে

      মনে মনে ভালবাসে।

সত্য কহি তোরে, নলিনীরে বড়

      ভাল নাহি লাগে মোর--

শুনিয়াছি নাকি পাষাণ হতেও

      মন তার সুকঠোর!

 

 

মুরলা।

          সে কি কথা বালা!   মুখখানি তার

      নহে কি মধুর অতি?

নয়নে কি তার দিবস রজনী

      খেলে না মধুর জ্যোতি?

 

 

চপলা।

          শুনেছি সে জ্যোতি আলেয়ার চেয়ে

      কপট, চপল নাকি--

পথিকের পথ ভুলাবারি তরে

      জ্বলি উঠে থাকি থাকি!

শুনেছি সে বালা সারাটি জীবন

      চড়িয়া পাষাণরথে

চাকায় দলিয়া চলিবারে চায়

      হৃদয়বিছানো পথে!

শুনেছি সে নাকি একটি একটি

      হৃদয় গণিয়া রাখে--

কি কুখনে, আহা, কবি আমাদের

      ভাল বাসিয়াছে তাকে!

 

 

মুরলা।

           চপলা, চপলা, পায়ে ধরি তোর,

      ক'স্‌ নে অমন করে।

তুই লো বালিকা হৃদয় তাহার

      চিনিবি কেমন করে?

 

 

চপলা।

          কে জানে, সজনি, বুঝিতে পারি নে

      কেন যে হইল হেন--

তাহারে হেরিলে মুখ ফিরাইতে

      সাধ যায় মোর যেন?

সেদিন যখন দেখিনু নলিনী

      বসিয়া কবির-সাথে,

সরমের বেশে লাজহীন হাসি

      খেলিছে আঁখির পাতে,

দেখিনু কপোল ঢাকিয়া তাহার

      অলক পড়েছে ঝুলি,

আঁচলেতে গাঁঠ বাঁধি শতবার

      শতবার ফেলে খুলি,

কে জানে আমার ভাল না লাগিল

      চলে এনু ত্বরা করে--

কপট সরম দেখিলে, সজনি,

      সরমেতে যাই ম'রে!

মুরলা আমার, অমন করিয়া

      কেন লো রহিলি বসি!

দেখিতে দেখিতে মলিন হইয়া

      এসেছে ও মুখশশী!

ভাবিস্‌ নে, সখি, কমলা কয়েছে

      কাল মোর কাছে এসে

পাষাণহৃদয়া নলিনীও নাকি

      ভালবাসে কবিরে সে।

শুনেছি নলিনী কবিরে দেখিতে

      নদীতীরে যায় নাকি।

কবিরে দেখিলে ঢ'লে পড়ে তার

      অনুরাগনত আঁখি

 

 

মুরলা।

           নলিনীবালারে ভালবেসে যদি

      কবি মোর সুখে থাকে

তাহা হলে, সখি, বল্‌ দেখি মোরে

      কেন না বসিবে তাকে?

মোরা তাহা লয়ে ভাবি কেন এত?

      চপলা লো, আমরা কে?

               চপলার গান

যে ভাল বাসুক-- সে ভাল বাসুক--

        সজনি লো, আমরা কে!

দীনহীন এই হৃদয় মোদের

        কাছেও কি কেহ ডাকে?

তবে কেন বল ভেবে মরি মোরা

        কে কাহারে ভালবাসে,

আমাদের কিবা আসে যায় বল

        কেবা কাঁদে, কেবা হাসে!

আমাদের মন কেহই চাহে না,

তবে মনখানি লুকান' থাক্‌,

প্রাণের ভিতরে ঢাকিয়া রাখ্‌।

        যদি, সখি, কেহ ভুলে

        মনখানি লয় তুলে,

উলটি-পালটি দু-দণ্ড ধরিয়া

        পরখ করিয়া দেখিতে চায়,

তখনি ধূলিতে ছুঁড়িয়া ফেলিবে

        নিদারুণ উপেখায়!

কাজ কি লো, মন লুকান' থাক্‌,

        প্রাণের ভিতরে ঢাকিয়া রাখ্‌।

হাসিয়া খেলিয়া ভাবনা ভুলিয়া

        হরষে প্রমোদে মাতিয়া থাক্‌!

 

 



নলিনী ও সখীগণ

 

নলিনী।

             [গাহিতে গাহিতে]

কি হল আমার? বুঝি বা সজনি

      হৃদয় হারিয়েছি!

প্রভাতকিরণে সকাল বেলাতে

মন লয়ে সখি গেছিনু খেলাতে,

মন কুড়াইতে, মন ছড়াইতে,

মনের মাঝারে খেলি বেড়াইতে,

মনফুল দলি চলি বেড়াইতে--

সহসা, সজনি, চেতনা পাইয়া

সহসা, সজনি, দেখিনু চাহিয়া

রাশি রাশি ভাঙ্গা হৃদয়মাঝারে

      হৃদয় হারিয়েছি!

পথের মাঝেতে খেলাতে খেলাতে

      হৃদয় হারিয়েছি!

যদি কেহ, সখি, দলিয়া যায়!

তার 'পর দিয়া চলিয়া যায়!

শুকায়ে পড়িবে, ছিঁড়িয়া পড়িবে--

দলগুলি তার ঝরিয়া পড়িবে,

      যদি কেহ, সখি, দলিয়া যায়!

আমার কুসুমকোমল হৃদয়

      কখনো সহে নি রবির কর,

আমার মনের কামিনী-পাপড়ি

      সহে নি ভ্রমরচরণ-ভর!

চিরদিন সখি বাতাসে খেলিতে,

জোছনা-আলোকে নয়ন মেলিতে,

হাসিপরিমলে অধর ভরিয়া

লোহিত রেণুর সিঁদুর পরিয়া

ভ্রমরে ডাকিতে হাসিতে হাসিতে--

কাছে এলে তারে দিত না বসিতে--

সহসা আজ সে হৃদয় আমার

      কোথায় হারিয়েছি!

এখনো যদি গো খুঁজিয়া পাই

      এখনো তাহারে কুড়ায়ে আনি--

এখনো তাহারে দলে নাই কেহ,

      আমার সাধের কুসুমখানি।

এখনো, সজনি, একটি পাপড়ি

      ঝরে নি তাহার জানি লো জানি।

শুধু হারায়েছে, খুঁজিয়া পাইলে

      এখনি তাহারে কুড়ায়ে আনি।

ত্বরা কর্‌ তবে, ত্বরা কর্‌ তোরা,

      হৃদয় খুঁজিতে যাই--

শুকাবার আগে ছিঁড়িবার আগে

      হৃদয় আমার চাই!

          [সখীদের প্রতি]

 

বিপাশাতীরের পথে, সখি, আয়

      আয়, ত্বরা করে আয়!

জানিস্‌ কি, সখি, নদীতীরে কবি

      কখন বেড়াতে যায়?

জানিস্‌ ত, সখি, পথের ধারেতে

      একটি অশোক আছে,

বনলতা কত ফুলে ফুলে ভরা

      উঠিয়াছে সেই গাছে--

সেই খানে, সখি, সেই গাছতলে

      বসিয়া থাকিতে হবে।

সেই পথ দিয়া যাইবে ত কবি?

      আয় ত্বরা করে তবে।

বল্‌ দিখি তোরা হল কি আমার!

      যখন কবির সুমুখে থাকি

একটিও কথা পারি নে, বলিতে,

      পারি নে তুলিতে আনত আঁখি!

কতবার, সখি, করিয়াছি মনে

      পরিহাস করি কহিব কথা--

নিদারুণ হাসি হাসিয়া হাসিয়া

      হৃদয়ে হৃদয়ে দিব গো ব্যথা,

কৃষ্ণহীরা-সম কৃষ্ণ আঁখি-তারা

আঁধার-আগার হতে আলো-ধারা

হানিবে হেথায়, হানিবে হোথায়

      আকুলিয়া দশ দিশ--

মুরছিয়া তার পড়িবেক মন,

মুদিয়া আসিবে অবশ নয়ন,

যতই ঢালিব এ অধর হতে

      মিষ্ট সুধাময় বিষ!

কিন্তু কি করে সে চেয়ে থাকে, সখি,

      না জানি নয়নে কি আছে জ্যোতি!

এমন সে গান গায় ধীরে ধীরে,

      কথা কয়, সখি, মৃদুল অতি--

মুখেতে আমার কথা নাহি ফুটে,

      চাহিতে পারি নে আঁখির পানে,

হাসির লহরী খেলে না অধরে,

      নয়নে তড়িৎ নাহিক হানে!

আয় ত্বরা করে-- বেলা হয়ে এল,

      অস্তাচলে যায় রবি,

পথের ধারেতে বসি রব' মোরা

      সেই পথে যাবে কবি!

 

 



মুরলা

 

[কবির প্রবেশ]

 

কবি।

        সকাল হইতে, মুরলা সখি লো,

      খুঁজিয়া বেড়াই তোরে,

বড়ই অধীর-হরষে আমার

      হৃদয় গিয়েছে ভরে।

পারি নে রাখিতে প্রাণের উচ্ছ্বাস,

আকুল ব্যাকুল করিতে প্রকাশ,

অধীর হইয়া সকাল হইতে

      খুঁজিয়া বেড়াই তোরে।

তোরে না কহিলে হৃদয়ের কথা

      মন শান্তি নাহি মানে;

কেন, সখি, তুই ব'সে রয়েছিস্‌

      একা একা এই খানে?

দেখ, সখি, আজ গিয়েছিনু আমি

      প্রমোদকাননে তার,

গাছের ছায়াতে আপনার মনে

      বসেছিনু একধার।--

মুরলা, হেথায় অন্ধকার ঘোর,

দেখিতে পাই নে মুখখানি তোর,

এত অন্ধকার ভাল নাহি লাগে,

      ওই খানে যাই উঠে।

ওখানে পড়েছে রবির কিরণ,

সমুখে সরসী হাসিছে কেমন,

গাছের উপরে শাখা শাখা ভরে

      বকুল রয়েছে ফুটে।

এই খানে  আয়, এই খানে বোস্‌!

      শোন্‌ সখি তার পরে--

গাছের তলায় ছিলাম বসিয়া

      মগন ভাবনা-ভরে।

গীতস্বর শুনি চমকি উঠিনু,

      শুনিনু মধুর বাঁশরী বাজে।

গীতের প্লাবনে আকাশ পাতাল

      ডুবিয়া গেল গো নিমেষমাঝে।

আকাশব্যাপিনী জোছনার, সখি,

      মরমে মরমে পশিল গান!

পৃথিবী-ডুবান' জোছনারে, সখি,

      ডুবায়ে দিল সে মধুর তান!

একটি একটি করি কথা তার

      পশিতে লাগিল শ্রবণে যত,

শোণিত লাগিল উঠিতে পড়িতে,

      হৃদয় হইল পাগল-মত।

একটি একটি একটি করিয়া

      গাঁথিতে লাগিনু কথা,

গান গাওয়া তার ফুরাল' যখন

      ফুরাল' আমার গাঁথা।

মুরলা, সখি লো, বল্‌ দেখি মোরে

কি গান গাহিতেছিল মধুস্বরে

      বিশ্ব করি বিমোহিত!

আমারি রচিত-- আমারি রচিত--

      আমারি রচিত গীত!

মুরলা, সখি লো, বল্‌ দেখি মোরে

কে গান গাহিতেছিল মধুস্বরে

      উনমাদ করি মন!

আমারি নলিনী-- আমারি নলিনী--

      আমারি হৃদয়ধন।

সখি, মোর সেই মনের কথা,

সখি, মোর সেই গানের কথা,

দিয়াছে মাজিয়া তার স্বর দিয়া--

প্রতি কথা তার উঠে উজলিয়া

      মেঘে রবিকর যথা।

শুনিবি কি গান গাহিতেছিল সে

      অমৃতমধুর রবে?

      শোন্‌ মন দিয়ে তবে।

গান

 

কে তুমি গো খুলিয়াছ স্বর্গের দুয়ার?

ঢালিতেছ এত সুখ,   ভেঙ্গে গেল-- গেল বুক--

যেন এত সুখ হৃদে ধরে না গো আর!

তোমার সৌন্দর্য্যভারে   দুর্ব্বল হৃদয় হা রে

অভিভূত হয়ে যেন পড়েছে আমার!

এস তবে হৃদয়েতে,   রেখেছি আসন পেতে--

ঘুচাও এ হৃদয়ের সকল আঁধার!

তোমার চরণে দিনু প্রেম-উপহার--

না যদি চাও গো দিতে প্রতিদান তার,

নাই বা দিলে তা বালা,   থাক' হৃদি করি আলা,

হৃদয়ে থাকুক্‌ জেগে সৌন্দর্য্য তোমার!

 

 



অনিল

 

অনিল।

                  কিছুই ত হল না!

সেই সব-- সেই সব--   সেই হাহাকাররব,

সেই অশ্রুবারিধারা, হৃদয়বেদনা!

কিছুতে মনের মাঝে শান্তি নাহি পাই,

কিছুই না পাইলাম যাহা-কিছু চাই!

ভাল ত গো বাসিলাম-- ভালবাসা পাইলাম,

এখনো ত ভালবাসি-- তবুও কি নাই!

তবুও কেন রে হৃদি শিশুর মতন

দিবানিশি নিরজনে করিছে রোদন!

মনোমত হয় নি বা যা কিছু পেয়েছে,

সকলেরি মাঝে বুঝি অভাব রয়েছে!

আশ মিটাইয়া বুঝি ভালবাসি নাই,

ভালবাসা পাই নি বা যতখানি চাই!

যেন গো যাহার তরে মন ব্যগ্র আছে

অশরীরী ছায়া তার দাঁড়াইয়া কাছে,

দুই বাহু বাড়াইয়া করি প্রাণপণ

তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে করি আলিঙ্গন--

ছায়া শুধু-- ছায়া শুধু-- হৃদয় না পূরে--

তা চেয়ে রহে না কেন শত ক্রোশ দূরে?

আমার এ ঊর্দ্ধ্বশ্বাস পিপাসিত মন

নাহি অনুভবে তার হৃদয়স্পন্দন।

মন চায় হাতে তার রাখি মোর হাত

বুকে তার মাথা রাখি করি অশ্রুপাত!

সেই ত ধরিনু হাত বুকে মাথা রাখি,

দৃঢ় আলিঙ্গন তারে করি থাকি থাকি--

কিন্তু এ কি হল দায়, এ কিসের মায়া?

কিছু না ছুঁইতে পাই, ছায়া সব ছায়া!

তাই ভাবি, মন মোর যা কিছু পেয়েছে

সকলেরি মাঝে বুঝি অভাব রয়েছে!

তৃষিত হৃদয় চায় ভালবাসা যত

ললিতা ফিরায়ে বুঝি দেয় নাকো তত!

আমি চাই এক সুরে দুই হৃদি বাজে,

আবরণ নাহি রয় দুজনার মাঝে!

সমুদ্র চাহিয়া থাকে আকাশের পানে,

আকাশ সমুদ্রে চায় অবাক্‌ নয়ানে,

তেমনি দোঁহার হৃদি হেরিবে দোঁহায়--

পড়িবে উভের ছায়া উভয়ের গায়!

কিন্তু কেন, ললিতার এত কেন লাজ!

এত কেন ব্যবধান দুজনার মাঝ?

মিলিবার তরে যাই হইয়া অধীর,

মাঝেতে কেন রে হেন লৌহের প্রাচীর?

আমি যাই তাড়াতাড়ি করিতে আদর,

তারে হেরে উল্লাসেতে নাচে গো অন্তর,

মিলিবারে অর্দ্ধপথে সে আসে না ছুটে--

তার মুখে একটিও কথা নাহি ফুটে!

জানি গো ললিতা মোরে ভালবাসে মনে,

যাতে আমি ভাল থাকি করে প্রাণপণে--

কিন্তু তাহে কিছুতেই তৃপ্ত নহে প্রাণ!

দুজনার মাঝে কেন এত ব্যবধান?

যেমন নিজের কাছে লাজ নাহি থাকে

তেমনিই মনে কেন করে না আমাকে?

               কিছুই গো হল না!

সেই সব, সেই সব--    সেই হাহাকাররব

সেই অশ্রুবারিধারা হৃদয়বেদনা!

 

 

[ললিতার প্রবেশ]

 

ললিতা।

    কেন গো বিষণ্ন হেরি নাথের বদন?

না জেনে কি দোষ কিছু করেছি এমন?

একবার কাছে গিয়ে ধরি দুটি হাত

শুধাব কি-- "হয়েছে কি?   অবোধ ললিতা সে কি

না বুঝে হৃদয়ে তব দিয়েছে আঘাত?"

সেদিন ত শুধালেন নাথ যবে আসি

"একবার বল্‌ ত রে   ভাল কি বাসিস মোরে?"

মুক্তকণ্ঠে বলেছিনু "নাথ, ভালবাসি!"

একেবারে সব লজ্জা দিনু বিসর্জ্জন,

বুকে তাঁর মুখ রেখে করেছি রোদন--

কাঁদিয়ে কহেছি কথা,   জানায়েছি সব ব্যথা

যত কথা রুদ্ধ ছিল মরমতলেতে,

এত দিন বলি বলি পারি নি বলিতে!

সেদিন ত কোন লজ্জা ছিল নাকো আর,

কিন্তু গো আবার কেন উদিল আবার!

হেথায় দাঁড়ায়ে আমি রহি এক ধারে--

এখনি দেখিতে নাথ পারেন আমারে!

ডাকিলেই কাছে গিয়ে   সব লজ্জা বিসর্জ্জিয়ে

একেবারে পায়ে ধরে কেঁদে গিয়ে কব,

"বল, নাথ, কি করেছি?   কি হয়েছে তব?"

 

 

অনিল।

     এমন বিষণ্ন হয়ে বসে আছি হেথা

তবুও সে দূরে আছে--   তবু সে এল না কাছে,

তবুও সে শুধালে না একটিও কথা!

পাষাণ বজ্রেতে গড়া এ লজ্জা তাহার

প্রেমবরিষার নদী   ভাঙ্গিতে নারিল যদি,

দয়াতেও ভাঙ্গিবে না হেরি অশ্রুধার?

লজ্জার একাধিপত্য যে নিষ্ঠুর মনে,

প্রেম দয়া যে হৃদয়ে   বাস করে ভয়ে ভয়ে,

চরণে শৃঙ্খল বাঁধা লজ্জার শাসনে--

অনিল, কি করিবি রে লয়ে হেন মন?

তুই চাস মুখে তোর   হেরিলে বিষাদ ঘোর

অশ্রুজলে অশ্রুজল করিবে বর্ষণ!

কত না আদরে তোর মুঝাবে নয়ন!

তুই কি চাস রে হেন পাষাণমুরতি

দূরে দাঁড়াইয়া রবে--   একটি কথা না কবে,

সান্ত্বনার তরে যবে তুই ব্যগ্র অতি?

হায় রে অদৃষ্ট মোর, কিছুই হল না--

সেই সব, সেই সব--   সেই হাহাকাররব

সেই অশ্রুবারিধারা হৃদয়বেদনা!

 

 

[অনিলের বেগে প্রস্থান

 

ললিতা।

                   [স্বগত]

নয়নে আঁধার হেরি, ঘুরিছে সংসার,

মা গো মা-- কোথায় মা গো-- পারি নে মা আর!

[বৃক্ষতলে বসিয়া পড়িয়া]

 

 

গেলে তবে গেলে চলি নিষ্ঠুর-- নিষ্ঠুর--

ললিতা যে এক ধারে   দাঁড়ায়ে রয়েছে হা রে

একটু আদর-তরে হয়ে তৃষাতুর!

কখন্‌ ডাকিবে ব'লে আছে মুখ চেয়ে,

একটু ইঙ্গিতে পায়ে পড়িত গো ধেয়ে--

দেখেও, দেখেও তারে গেলে গো চলিয়া?

একবার ডাকিলে না ললিতা বলিয়া?

দোষ কি করেছি কিছু সখা গো আমার?

তারি লাগি কেন না করিলে তিরস্কার?

একবার চাহিলে না,   ফিরেও গো দেখিলে না,

এমন কি অপরাধ পারি করিবারে?

তবে কেন, কেন, নাথ, বল নি আমারে?

যদি সখা, পায়ে ধ'রে    শত-শতবার ক'রে

শুধাই গো, বলিবে কি, কি দোষ করেছি?

অভাগিনী যদি, নাথ, যদি ম'রে যাই--

মরণশয্যায় শুয়ে শেষ ভিক্ষা চাই,

চরণদুখানি ধুয়ে শেষ অশ্রুজলে,

দুখিনী ললিতা তব কেঁদে কেঁদে বলে,

তবুও কি ফিরিবে না?   তবুও কি চাহিবে না?

তবুও কি বলিবে না কি দোষ করেছি!

তবুও কি, সখা, তুমি যাইবে চলিয়া?

একবার ডাকিবে না "ললিতা' বলিয়া?

 

 



নলিনী বিজয় বিনোদ প্রমোদ অশোক সুরেশ নীরদ ও অনিল

 

সুরেশ।

      যাইতে বলিছ বালা, কোথা যাব আর?

দিগ্বিদিক হারাইয়া    ও রূপ-অনলে গিয়া

এ পতঙ্গ পাখা দুটি পুড়ায়েছে তার!

রূপসী, ক্ষমতা আর নাই উড়িবার!

 

 

নলিনী।

     রূপ কিছু মোর না যদি থাকিত

      বড় হইতাম সুখী,

দেখিতাম যত পতঙ্গ তোমরা

      আসিতে কি লোভ দেখি!

রূপ-- রূপ-- রূপ-- পোড়া রূপ ছাড়া

      আর কিছু মোর নাই?

তোমাদের মত পতঙ্গের দল

চারি দিকে ঘিরে করে কোলাহল,

দিবস রজনী করে জ্বালাতন,

ঝাঁপায়ে পড়ে গো, না মানে বারণ--

পোড়া রূপ থেকে এই যদি হল

      হেন রূপ নাহি চাই!

      হেন কেহ নাই হায়

শুধু ভালবাসে নালিনী বালারে,

      আর কিছু নাহি চায়!

[অশোকের প্রতি]

 

 

এই যে অশোক! ওই দেখ সখা

      দিবে কি আমারে দিবে কি তুলে

বক্ষ হতে মোর ফুল উড়ে গিয়ে

      পড়েছে তোমার চরণমূলে!

যদি সখা ওটি রাখিতে চাও

তোমারি কাছেতে রাখিয়া দাও--

দুদণ্ডেই ওটি যাইবে শুকায়ে,

      শুকায়ে গেলেই দিও গো ফেলে!

যতখন ওটি নাহি পড়ে ঝ'রে

ততখনো যদি মনে রাখ মোরে

      ততখনো যদি না থাক ভুলে,

তা হলেও, সখা, বড় ভাগ্য মানি

      চিরকাল মনে সে কথা রবে!

যদি, সখা, নাহি লইতে চাও

এখনি ভুতলে ফেলিয়া দাও,

      চরণে দলিয়া ফেল গো তবে!

কত শত হেন অভাগা কুসুম

      আপনি পড়েছে চরণে আসি,

কত শত লোক চেয়েও দেখে নি,

      চরণে দলিয়া গিয়াছে হাসি!

তবে আর কেন, ফেল গো দলিয়া--

      কিসের সরম আমার কাছে?

যে কুসুম, সখা, শাখা হতে ঝ'রে

চরণের নীচে পড়ে সাধ ক'রে,

কে না জানে বল তাহার কপালে

      চরণে দলিয়া মরণ আছে!

[নীরদের প্রতি]

 

 

এই যে নীরদ, এনেছ গাঁথিয়া

      গোলাপ ফুলের হার!

ভুলে গেছ কেন বাছিয়া ফেলিতে

      কাঁটাগুলি, সখা, তার?

      তবে গো পরায়ে দাও--

নাহয় কাঁটায় ছিঁড়িবে হৃদয়,

নাহয় এ বুক হবে রক্তময়,

এনেছ গাঁথিয়া গোলাপ যখন

      তবে গো পরায়ে দাও!

কতই না কাঁটা বিঁধিয়াছে হেথা

      রাখিতে গোলাপ বুকের কাছে,

জ্বলুক্‌ হৃদয়-- বহুক্‌ শোণিত--

      তা বলে গোলাপ ফেলিতে আছে?

[প্রমোদের প্রতি]

 

 

চাই নে তোমার ফুল-উপহার,

      যাও-- হেথা হতে যাও!

দুটি ফুল দিয়ে, ফুলবিনিময়ে

      হাসি কিনিবার চাও!

নলিনী, নলিনী, কেন রে হলি নি

      পাষাণকঠিন-মন?

দুটো কথা শুনে, দুটো ফুল পেয়ে

      ভাঙ্গে কেন তোর পণ?

পলকে পলকে ভাঙ্গিস গড়িস--

      ভেঙ্গে যায় মৃদু শ্বাসে,

যার 'পরে তুই করিস লো মান

      সেই মনে মনে হাসে!

দেখি আজ তুই কেমন পারিস

      থাকিবারে অভিমানে?

কহিস নে কথা, হাসিস নে হাসি,

      চাহিস নে তার পানে!

 

 

বিনোদ।

     একটি কথাও কহিল না মোরে,

      পাশ দিয়া গেল চলি!

গর্ব্বভারগুরু প্রতি পদক্ষেপে

      মরমে মরমে দলি।

কেন গো, কেন গো; কি আমি করেছি--

      কিছু ত না পড়ে মনে!

কহেছে ত কথা প্রমোদের সাথে,

      অশোক নীরদ-সনে!

গেল হে হৃদয়-- কত দিন আর

      রবে সে এমন করি

কখনো উঠিয়া আকাশের 'পরে

      কখনো পাতালে পড়ি!

 

 

অনিল।

     [দূর হইতে দেখিয়া]

না জানি কিসের জ্যোতি নয়নে আছে গো বালা!

যে দিকে চাহিয়া দেখ সে দিক করিছ আলা।

অন্ধকারভেদী এক হাসিময় তারা-সম

প্রাণের ভিতর-পানে চাহিয়া রয়েছ মম!

ফিরায়ে লইনু মুখ, তবুও কেন গো দেখি

চাহিছে হৃদয়-পানে দুটি হাসিমাখা আঁখি!

আঁখি মুদি, তবু কেন হেরি গো প্রাণের কাছে

দুটি আঁখি চেয়ে আছে   এক দৃষ্টে চেয়ে আছে!

হেথা না পাইবি ঠাঁই-- দূর হ তুই রে তারা--

চন্দ্রমা জোছনা করি   এ হৃদি রেখেছে ভরি,

তুই তারা সে আলোকে হইবি আপনাহারা!

দূর হ রে-- দূর হ রে-- দূর হ রে ক্ষুদ্র তারা!

কিন্তু কি মধুর মুখ ভাবভরে ঢলঢল!

কোমলকুসুমসম সমীরণে টলমল!

দেখি নি এহেন মুখ সুমধুর ভাবময়!

কেন? ললিতার মুখ এ হতে কি ভাল নয়?

আহা সে মধুর বড় ললিতার মুখখানি--

আঁখি কত কথা কয়, মুখেতে নাইক বাণী,

বাহির হইতে চায় তার সেই মৃদু হাসি--

অধরের চারি ধারে   কতবার উঁকি মারে,

লজ্জায় মরিয়া যায় কেবল দুই পা আসি!

তার মুখ পূর্ণরাকা   শরমের মেঘে ঢাকা,

মধুর মুখানি তার আমি বড় ভালবাসি!

ললিতার চেয়ে কি গো মুখখানি ভাল এর?

উভেরই মধুর মুখ----দুই ভাব দু-জনের--

ললিতা সে লাজময়ী মুখেতে নাইক কথা,

মাটি-পানে চেয়ে আছে যেন লজ্জাবতী লতা;

নলিনী, নলিনীসম কেমন রয়েছে ফুটি,

বরষার নদী জল  করিতেছে টলমল

হেলি দুলি লহরীতে পড়িতেছে লুটি লুটি।

উভেরই মধুর মুখ ললিতার, নলিনীর--

অধীর সৌন্দর্য্য কারো, কারো বা প্রশান্ত স্থির!

কিন্তু নলিনীর মুখ ভাবের খেলার গেহ--

সেথা ভাবশিশুগুলি  করিতেছে কোলাকুলি,

কেহ বা অধরে হাসে, নয়নে নাচিছে কেহ,

এই যে অধরে ছিল এই সে নয়নে গেছে,

দু-দণ্ড খেলায়ে কেহ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে!

কভু বা দু-তিন জনে নাচিতেছে এক সনে,

পলক পড়িতে চোখে আর ত তাহারা নাই--

নলিনীর মুখখানি ভাবের খেলার ঠাঁই!

নলিনীর মুখপানে যতই চাহিয়া থাকি

নূতন নূতন শোভা দেখিতে পায় যে আঁখি!

কিন্তু ললিতার মুখ কখনো এমন নয়।

এত সে কয় না কথা,  এত ভাব নাই সেথা,

নহে গো এমনতর অধীরমাধুর্য্যময়!

নাই বা এমন হ'ল তাহাতে কি আছে হানি?

নাহয় দেখিতে ভাল নলিনীর মুখখানি!

তবু ললিতারে মোর ভাল আমি বাসি ত রে!

তবু ত সৌন্দর্য্য তার এ হৃদি রয়েছে ভ'রে!

রূপেতে কি যায় আসে?  রূপ কেবা ভাল বাসে?

ললিতা নলিনী-আছে নাহয় রূপেতে হারে--

ভালবাসি-- ভালবাসি-- তবু আমি ললিতারে!

 

 

[বিনোদের কাছে পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া]

 

নলিনী।

     কেন হেন আহা মলিন আনন,

      আঁখি নত মাটি-পানে!

তোমারে, বিনোদ, পাই নি দেখিতে

      দাঁড়াইয়া এইখানে!

শিথিল হইয়া পড়েছে ঝুলিয়া

      ফুলের বলয় মোর,

দাও-না গো, সখা, দাও না তুলিয়া,

      বাঁধ গো আঁটিয়া ডোর!

  নলিনীর গান

এস মন, এস,   তোমাতে আমাতে

          মিটাই বিবাদ যত!

আপনার হয়ে    কেন মোরা দোঁহে

          রহি গো পরের মত?

আমি যাই এক   দিকে, মন মোর!

          তুমি যাও আর দিকে--

যার কাছ হতে ফিরাই নয়ন

          তুমি চাও তার দিকে!

তার চেয়ে এস দুজনে মিলিয়ে

হাত ধরে যাই এক পথ দিয়ে,

আমারে ছাড়িয়ে অন্য কোনখানে

          যেও না কখনো আর!

পারি না কি মোরা দুজনে থাকিতে,

দোঁহে হেসে খেলে কাল কাটাইতে?

তবে কেন তুই না শুনে বারণ

          যাস্‌ রে পরের দ্বার?

তুমি আমি মোরা থাকিতে দুজন,

বল্‌ দেখি, হৃদি, কিবা প্রয়োজন

          অন্য সহচরে আর?

এত কেন সাধ বল্‌ দেখি, মন,

পর-ঘরে যেতে যখন তখন--

          সেথা কি রে তুই আদর পাস্‌?

বল্‌ ত কত-না সহিস যাতনা?

দিবানিশি কত সহিস লাঞ্ছনা?

          তবু কি রে তোর মিটে নি আশ?

আয়, ফিরে আয়, মন, ফিরে আয়--

          দোঁহে এক সাথে করিব বাস!

অনাদর আর হবে না সহিতে,

দিবস রজনী পাষাণ বহিতে,

মরমে দহিতে, মুখে না কহিতে,

          ফেলিতে দুখের শ্বাস!

শুনিলি নে কথা?  আসিলি নে হেথা?

          ফিরিলি নে একবার?

সখি লো, দুরন্ত হৃদয়ের সাথে

          পেয়ে উঠি  নে ত আর!

"নয় রে সুখের খেলা ভালবাসা!"

          কত বুঝালেম তায়--

হেরিয়া চিকণ সোনার শিকল

খেলাইতে যায় হৃদয় পাগল,

খেলাতে খেলাতে না জেনে না শুনে

          জড়ায় নিজের পায়!

বাহিরিতে চায়, বাহিরিতে নারে,

          করে শেষে হায়-হায়!

শিকল ছিঁড়িয়ে এসেছে ক'বার,

          আবার কেন রে যায়?

চরণে শিকল বাঁধিয়া কাঁদিতে

          না জানি কি সুখ পায়!

তিলেক রহে না আমার কাছেতে

          যতই কাঁদিয়া মরি,

এমন দুরন্ত হৃদয় লইয়া,

          সজনি, বল্‌ কি করি?

----

 

 

অনিল।

     ওঠ্‌ হেথা হাতে-- চল্‌ চল্‌ যাই,

          কি কারণে হেথা আছিস্‌ আর!

মুদিয়া আসিছে মনের নয়ন,

          মনের চরণে পড়িছে ভার!

ললিতা আমার, না থাকুক্‌ রূপ,

          নাই বা গাহিতে পারিলি গান,

ভালবাসি তোরে, ভালবাসিব রে

          যত দিন দেহে রহিবে প্রাণ!

 

 

[নলিনী ব্যতীত আর সকলের প্রস্থান]

 

নলিনী।

      পারি নে ত আর, বসি এই খানে,

          ওই যে এ দিকে আসিছে কবি!

কথা আজ মোরে কহিতে হইবে,

          র'ব না বসিয়া অচল ছবি!

কি কথা বলিব?  ভাবিতেছি মনে,

          কিছুই ত ভেবে নাহিক পাই!

বলিব কি তারে-- "তোমরা কবি গো,

          তোমাদের ভাল বাসিতে নাই!

বুঝিতে পার না আপনার মন,

          দিবানিশি বৃথা কর গো শোক!

ভালবাসা-তরে আকুল হৃদয়,

          ভালবাসিবার পাও না লোক!

মনে তোমাদের সৌন্দর্য্য জাগিছে

          ধরায় তেমন পাও না খুঁজে,

তবুও ত ভাল বাসিতেই হবে

          নহিলে কিছুতে মন না বুঝে।

অবশেষে কারে পাও দেখিবারে

          নেশায় আপনা ভুলি,

সাজাইয়া দেয় কলপনা তারে

          নিজের গহনা খুলি।

আসি কলপনা কুহকিনীবালা

          নয়নে কি দেয় মায়া,

কলপনা তারে ঢেকে রাখে নিজে

          দিয়ে নিজে জ্যোতিছায়া।

কল্পনাকুহকে মায়া মুগ্ধ চোকে

          কি দেখিতে দেখ কিবা,

অপরূপ সেই প্রতিমা তাহার

          পুজ মনে নিশি দিবা!

যত যায় দিন, যত যায় দিন,

          যত পাও তারে পাশে,

দেবীর জ্যোতি সে হারায় তাহার

          মানুষ হইয়া আসে!

ভালবাসা যত দূরে চলি যায়

          হাহাকার করে মনে,

কলপনা কাঁদে ব্যথিত হইয়া

          আপনার প্রতারণে!

আমি গো অবলা-- করিব প্রণয়

          অত নাহি করি আশা,

আমি চাই নিজ মনের মানুষ

          সাদাসিদে ভালবাসা!"

এমনি করিয়ে বাতাসের 'পরে

          মিছে অভিমান বাঁধি

অকারণে তার কবির লাঞ্ছনা

          অভিমানে কাঁদি কাঁদি।

কিছুতে সান্ত্বনা না আমি মানিব,

          দূরেতে যাইব চলে--

কাছেতে আসিতে করিব বারণ

          করুণ চোখের জলে!

 

 



অনিল ও ললিতা

 

ললিতা।

    ভেঙ্গেছে ভেঙ্গেছে যত লজ্জা ললিতার।

মুক্তকণ্ঠে শুধাইছে, সখা, বার বার--

কি করিব বল দেখি তোমার লাগিয়া?

কি করিলে জুড়াইতে পারিব ও হিয়া?

এই পেতে দিনু বুক-- রাখ, সখা, রাখ মুখ--

ঘুমাও তুমি গো, আমি রহিব জাগিয়া!

খুলে বল, বল সখা, কি দুঃখ তোমার!

অশ্রুজলে মিশাইব অশ্রুজলধার।

একদিন বলেছিলে মোর ভালবাসা

পেলেই পুরিবে তব প্রণয়পিপাসা!

বলেছিলে সব তব করিছে নির্ভর

পৃথিবীর সুখ দুঃখ আমারি উপর।

কই সখা? প্রাণ মন  করেছি ত সমর্পণ,

দিয়েছি ত যাহা কিছু ছিল আপনার--

তবু কেন শুকাল না অশ্রুবারিধার?

 

 

অনিল।

      ললিতা রে, ললিতা রে, আমার কিসের দুখ

হৃদয়ে জাগিছে যবে ওই তোর মধুমুখ!

জীবননিশীথ মোর  ও রবিকিরণে তোর

একেবারে মিশায়েছি আপনারে পাশরিয়া--

মাঝে মাঝে হৃদাকাশে   যদিও বা মেঘ আসে,

ভিতরে তবুও হাসে সে রবিকিরণ প্রিয়া!

ওই স্মিত আঁখি দুটি   হৃদয়ে রহিয়া ফুটি

রেখেছে ফুল ফুটায়ে প্রাণের বিজন বনে!

তব প্রেমসুধাধারা   ঝরিয়া নির্ঝর-পারা

তুলেছে হরিত করি এই মরুভূমি-মনে।

তব হাসি জ্যোৎস্না-সম  এ মুগ্ধ নয়নে মম

সারা জগতের মুখে ফুটায়ে রেখেছে হাসি।

তুমি সদা আছ কাছে   তাই দিবালোক আছে,

নহিলে জগতে মোর কাঁদিত আঁধাররাশি।

আয় সখি, বুকে আয়, উলসি উঠেছে প্রাণ--

ত্বরা ক'রে যা লো বালা, বাঁশি আন্‌, বীণা আন্‌!

আজি এ মধুর সাঁঝে   রাখি এ বুকের মাঝে

মধুর মুখানি তোর, ধীরে ধীরে কর্‌ গান।

 

 

ললিতা।

    না সখা, মনের ব্যথা কোরো না গোপন!

যবে অশ্রুজল হায়   উচ্ছ্বসি উঠিতে চায়,

রুধিয়া রেখো না তাহা আমারি কারণ।

চিনি সখা, চিনি তব ও দারুণ হাসি,

ওর চেয়ে কত ভাল অশ্রুজলরাশি।

মাথা খাও, অভাগীরে কোরো না বঞ্চনা,

ছদ্মবেশে আবরিয়া রেখো না যন্ত্রণা!

মমতার অশ্রুজলে   নিভাইব সে অনলে,

ভাল যদি বাস তবে রাখ এ প্রার্থনা!

 

 



মুরলা ও কবি

 

কবি।

        কত দিন দেখিয়াছি তোরে, লো মুরলে,

একেলা কাঁদিতেছিস বসিয়া বিরলে।

করতলে রাখি মুখ--  কি জানি কিসের দুখ--

বড় বড় আঁখিদুটি মগ্ন অশ্রুজলে!

বড়, সখি, ব্যথা লাগে হেরি তোর মুখ!

এমন করুণ আহা!  ফেটে যায় বুক।

ভাল কি বাসিস কারে?  কত দিন বল্‌

পোষণ করিবি হৃদে হৃদয়-অনল?

যত তোর কথা আছে   বলিস আমার কাছে,

এত স্নেহ কোথা পাবি-- এত অশ্রুজল?

 

 

মুরলা।

      কারে বা ভাল বাসিব কবি গো আমার?

ভালবাসা সাজে কি গো এই মুরলার?

সখা, এত আমি দীন,  এতই গো গুণহীন,

ভালবাসিতে যে, কবি, মরি গো লজ্জায়।

যদি ভুলি আপনারে,   যদি ভালবাসি কারে,

সে জন ফিরেও কভু দেখে কি আমায়?

যদি বা সে দয়া ক'রে  আদর করে গো মোরে,

সঙ্কোচেতে দিবানিশি দহি না কি তবু?

তাই, কবি, বলি তাই--  ভাল যে বাসিতে নাই,

ভালবাসা মুরলারে সাজে কি গো কভু?

দূর হোক-- মুরলার কথা দূর হোক--

মুরলার দুখজ্বালা মুরলার র'ক--

বল, কবি, গেছিল কি নলিনীর কাছে?

নলিনীর কথা কিছু বলিবার আছে?

 

 

কবি।

        সখি লো, বড়ই মনে পাইয়াছি ব্যথা!

কাল আমি সন্ধ্যাকালে গিয়েছিনু সেথা--

পথপার্শ্বে সেই বনে   নীরবে আপনমনে

দেখিতেছিলাম একা বসি কতক্ষণ

সন্ধ্যার কপোল হতে সুধীর কেমন

মিলায়ে আসিতেছিল সরমের রাগ--

একটি উঠেছে তারা,  বিপাসা হরষে হারা

ছায়া বুকে লয়ে কত করিছে সোহাগ!

কতক্ষণ পথ চেয়ে রয়েছি বসিয়া--

এমন সময়ে হেরি  সখীদের সঙ্গে করি

আসিছে নলিনীবালা হাসিয়া হাসিয়া!

নাচিয়া উঠিল মন হরষে উল্লাসে,

রহিনু অধীর হয়ে মিলনের আশে।

কিন্তু নলিনীর কেন   চরণ উঠে না যেন,

দুই পা চলিয়া যেন পারে না চলিতে!

কেহ যেন তার তরে   বসে নাই আশা ক'রে,

সে যেন কাহারো সাথে আসে নি মিলিতে!

কোন কাজ নাই তাই এসেছে খেলিতে!

যেতে যেতে পথমাঝে যদি হেরে ফুল

করতালি দিয়ে উঠে   তাড়াতাড়ি যায় ছুটে--

আনে তুলে, পরে চুলে, হেসেই আকুল!

কভু হেরি প্রজাপতি   কৌতূহলে ব্যগ্র অতি

ধীরে ধীরে পা টিপিয়া যায় তার কাছে।

কভু কহে, "চল্‌ সখি, সেই চাঁপা গাছে

আজিকে সকাল বেলা   কুঁড়ি দেখেছিনু মেলা,

এতক্ষণে বুঝি তারা উঠিয়াছে ফুটে,

চল্‌, সখি, একবার দেখে আসি ছুটে!"

কত-না বিলম্ব পথে করিল এমন,

বড়ই অধীর হয়ে উঠিল গো মন।

কতক্ষণ পরে শেষে   গান গেয়ে হেসে হেসে

যেথা আমি বসেছিনু আসিল সেথায়--

চলিয়া গেল সে, যেন দেখে নি আমায়

একেলা বসিয়া আমি রহিনু আঁধারে

সমস্ত রজনী, সখি, সেই পথধারে।

কেন, সখি, এত হাসি, এক কেন গান?

কিসের উল্লাসে এত পূর্ণ ছিল প্রাণ?

মন এক দলিবার আছে গো ক্ষমতা,

যখন তখন খুসী দিতে পারে ব্যথা,

তাই গর্ব্বে কোন দিকে ফিরেও না চায়?

তাই এত হাসে হাসি, এত গান গায়?

কৃপাণ যে হাসি হাসে ঝলসি নয়ন,

বিদ্যুৎ যে হাসি হাসে অশনিদশন!

অথবা হয়ত, সখি, আমারিই ভুল;

হয়ত সে মনে মনে   কল্পনায় অকারণে

প্রণয়ে সন্দেহ ক'রে হয়েছে আকুল!

অভিমানে জানাইতে চায় মোর কাছে--

রাখে না আমার আশা,  নাই কিছু ভালবাসা,

ভাল না বেসেও মোরে বড় সুখে আছে।

যখন গাহিতেছিল   মরমে দহিতেছিল--

হাসি সে মুখের হাসি আর কিছু নয়,

গোপনে কাঁদিতেছিল অশান্ত হৃদয়!

আজ আমি তার কাছে যাই একবারে--

শুধাই, অমন ক'রে   কেন সে নিষ্ঠুর  মোরে

দিয়াছে বেদনা দলি হৃদয় আমার?

 

 

[কবির প্রস্থান

 

মুরলা।

      আসিয়াছে সন্ধ্যা হয়ে নিস্তব্ধ গভীর--

তারা নাহি দেখা যায় কুয়াশা-ভিতরে,

একটি একটি করে পড়িছে শিশির

মুরলার মাথার শুকানো ফুল -'পরে!

জীর্ণ শাখা শীতবায়ে উঠে শিহরিয়া,

গাছের শুকনো পাতা পড়িছে ঝরিয়া!

ওঠ্‌ লো মুরলা, ওঠ্‌, দিন হল শেষ,

পর্‌ লো মুরলা, পর্‌ সন্ন্যাসিনীবেশ।

মুরলা? মুরলা কোথা? গেছে সে মরিয়া--

সেই যে দুখিনী ছিল বিষণ্ন মলিন,

সেই যে ভাল বাসিত হৃদয় ভরিয়া,

সেই যে কাঁদিত বনে আসি প্রতিদিন,

সে বালা মরিয়া গেছে, কোথায় সে আর?

ছিন্ন বস্ত্র, ম্লান মুখ, লয়ে দুঃখভার,

তাহার সে বুকের লুকানো কথা লয়ে

মরেছে সে বালা আজ সন্ধ্যার উদয়ে!

তবে এ কাহারে হেরি নিশীথে শ্মশানে?

ও একটি উদাসিনী সন্ন্যাসিনী যায়--

কারে বাসে না ভাল, কারেও না জানে,

আপনার মনে শুধু ভ্রমিয়া বেড়ায়!

একটি ঘটনা ওর ঘটে নি জীবনে,

একটি পড়ে নি রেখা ওর শুন্য মনে!

পথ ছাড়, পান্থ, কিবা শুধাইছ আর?

জীবনে কাহিনী কিছু নাই বলিবার!

মুরলা, সত্যই তবে হলি সন্ন্যাসিনী?

সত্যই ত্যজিলি তোর যত কিছু আশা?

তবে রে বিলম্ব কেন,  বসিয়া আছিস হেন?

এখনো কি-- এখনো কি সব ফুরায় নি?

এখনো কি মনে ্‌মনে চাস ভালবাসা?

বড় মনে সাধ ছিল রহিব হেথায়--

কষ্ট পাই, দুঃখ পাই, রব তাঁরি সাথ--

আজন্ম কালের তাঁর সহচরী হায়

আমরণ বেড়াইব ধরি তাঁরি হাত!

কিছুতে নারিনু অশ্রু করিতে দমন,

কিছুতে এল না হাসি বিষণ্ন বদনে,

সদাই এড়াতে হ'ত কবির নয়ন,

কাঁদিতে আসিত হ'ত এ আঁধার  বনে!

আজিকে সুখের দিন কবির আমার,

হৃদয়ে তিলেক নাহি বিষাদ-আঁধার,

নূতন প্রণয়ে মগ্ন তাঁহার হৃদয়

বিশ্বচরাচর হেরে হাস্যসুধাময়!

এখন, মুরলা আমি, কেন রহি আর?

যেখানেই যান কবি হর্ষে হাসি হাসি

সেথাই দেখিতে পান এ মুখ আমার--

বিষাদের প্রতিমূর্ত্তি অন্ধকাররাশি!

ওঠ্‌ লো মুরলা তবে-- দিন হ'ল শেষ!

পরথ লো মুরলা তবে সন্ন্যাসিনীবেশ।

বেড়াইবি তীর্থে তীর্থে, ত্যজিবি সংসার--

ভুলে যাবি যত কিছু আছে আপনার!

কত শত দিন কত বর্ষ যাবে চলি--

তখন কপালে তোর পড়েছে ত্রিবলী,

নয়ন হইয়া তোর গেছে জ্যোতিহীন,

কত কত বর্ষ গেছে, গেছে কত দিন--

এই গ্রামে ফিরিয়া আসিবি একবার,

যাইবি মাগিতে ভিক্ষা কবির দুয়ার,

দেখিবি আছেন সুখে নলিনীরে লয়ে

দুইজনে একমন একপ্রাণ হয়ে!

কত-না শুনাইছেন কবিতা তাহারে!

কত-না সাজাইছেন কুসুমের হারে!

মোরে হেরে কবি মোর অবাক্‌ নয়নে

মোর মুখপানে চেয়ে রহিবেন কত,

মনে পড়ি পড়ি করি পড়িবে না মনে

নিশীথের ভুলে-যাওয়া স্বপনের মত!

কতক্ষণ মুখপানে চেয়ে থেকে থেকে

সবিস্ময়ে নলিনীরে কহিবেন ডেকে,

"যেন হেন মুখ আমি দেখেছিনু প্রিয়া!

কিছুতেই মনে তবু পড়িছে না আর!"

অমনি নলিনীবালা উঠিবে হাসিয়া--

কহিবে, "কল্পনা,কবি, কল্পনা তোমার!"

শুনিয়া হাসিবে কবি, ফিরাবে নয়ন,

নলিনীর পাখীটিরে করিবে আদর--

আমিও সেখান হতে করিব গমন

ভ্রমিয়া বেড়াতে পুনঃ দূর দেশান্তর!

ওঠ্‌ লো মুরলা তবে-- দিক হ'ল শেষ

পর্‌ লো মুরলা তবে সন্ন্যাসিনীবেশ!

থাক্‌ থাক্‌, আজ থাক্‌, আজ থাক্‌ আর!

কবিরে দেখিতে হবে আরেকটি বার!

কাল হব সন্ন্যাসিনী, বরিব বিরাগে--

দেখিব আরেক বার যাইবার আগে।

 

 



কবি ও মুরলা

 

মুরলা।

      কবি গো আমার, যদি আমি ম'রে যাই

তা হ'লে কি বড় কষ্ট হয় গো তোমার?

 

 

কবি।

        ওকি কথা মুরলা লো, বলিতে যে নাই!

তুই ছেলেবেলাকার সঙ্গিনী আমার!

কাঁদিস্‌ না, কাঁদিস্‌ না, মোছ্‌ অশ্রুধার!

আহা, সখি, বড় সুখী হই আমি মনে

যদি দেখি প্রেমে তুই পড়েছিস্‌ কার,

সুখেতে আছিস্‌ তোরা মিলি দুইজনে!

নিরাশ্রয় মনে আসে কত কি ভাবনা,

কিছুতে অধীর হৃদি মানে না সাত্ত্বনা--

সজনি, অমন সব ভাবনা-আঁধার

ভাবিস্‌ নে কখনো লো, ভাবিস্‌ নে আর!

 

 

মুরলা।

      কবি গো, রজনীগন্ধা ফুটেছিল গাছে--

তুমি ভালবাস ব'লে  আপনি এনেছি তুলে,

নেবে কি এ ফুলগুলি, রাখিবে কি কাছে?

 

 

কবি।

        সখি লো, নলিনী কাল দুটি চাঁপা তুলে

পরায়ে দেছিল মোর দুই কর্ণমূলে,

পরশিতে দলগুলি পড়িছে ঝরিয়া,

এখনো সুবাস তার যায় নি মরিয়া।

 

 

মুরলা।

      দেখি সখা, একবার দেখি হাতখানি--

এ হাত কাহারে, কবি, করিবে অর্পণ?

কত ভাল তোমারে সে বাসিবে না জানি!

না জানি, তোমারে কত করিবে যতন!

কিসে তুমি রবে সুখী   সকলি সে জানিবে কি?

দেখিবে কি প্রতি ক্ষুদ্র অভাব তোমার?

তোমার ওমুখ দেখি    অমনি সে বুঝিবে কি

কখন পড়েছে হৃদে একটু আঁধার!

অমনি কি কাছে গিয়ে  কত-না সাত্ত্বনা দিয়ে

দূর করি দিবে সব বিষাদ তোমার?

তাই যেন হয়, কবি, আর কিবা চাই--

তা হ'লেই সুখী হব রহি না যেথাই।

 

 

কবি।

                   মূরলা, সখি লো,

কেন আজ মন মোর উঠিছে কাঁদিয়া?

বিষাদ ভুজঙ্গসম   কেন রে হৃদয় মম

দলিতেছে চারি দিকে বাঁধিয়া বাঁধিয়া?

ছেলেবেলা হতে যেন কিছুই হল না,

যত দিন বেঁচে রব কিছুই হবে না,

এমনি করেই যেন কাটিবেক দিন,

কাঁদিয়া বেড়াতে হবে সুখশান্তিহীন!

কেহ যেন নাহি মোর, রবে নাকো কেহ--

ধরায় নাইক যেন বিশ্রামের গেহ।

কিছু হারাই নি তবু খুঁজিয়া বেড়াই,

কিছুই চাই না তবু কি যেন কি চাই!

কোন আশা না করিয়া নৈরাশ্যেতে দহি,

কোন কষ্ট না পাইয়া তবু কষ্ট সহি!

কেন রে এমন কেন হল আজ মন?

দিয়েছি ত, পেয়েছি ত ভালবাসা-ধন!

তুই কাছে আয় দেখি, আর একবার,

মুখ তোর রাখ্‌ দেখি বুকেতে আমার!

দেখি তাহে এ হৃদয় শান্তি পায় যদি!

কে জানে উচ্ছ্বসি কেন উঠিতেছে হৃদি!

দেখি তোর মুখখানি   সখি, তোর মুখখানি--

বুকে তোর মুখ চাপি--কেন, সখি, কেন

সহসা উচ্ছ্বসি কাঁদি উঠিলি রে হেন?

যেন বহুক্ষণ হতে যুঝিয়া যুঝিয়া

আর পারিল না, হৃদি গেল গো ভাঙ্গিয়া!

কি হয়েছে বল্‌ মোরে, বল্‌, সখি, বল্‌--

লুকাস্‌ নে, লুকাস্‌ নে দুখ-অশ্রুজল!

পৃথিবীতে কেহ যদি নাহি থাকে তোর

এই হেথা এই আছে এই বক্ষ মোর!

এ আশ্রয় চিরকাল রহিবে তোমার,

এ আশ্রয় কখনোই হারাবি নে আর!

কাঁদিবি যখন চাস্‌ হেথা মুখ ঢাকি,

তোর সাথে বরষিবে অশ্রু মোর আঁখি!

 

 

মুরলা।

      তুমি সুখি হও, কবি, এই আমি চাই--

তুমি সুখী হলে মোর কোন দুঃখ নাই!

 

 

কবি।

        আমি সুখী নই সখি, সুখী কেবা আর?

বল্‌ দেখি মুরলা লো কি দুঃখ আমার!

অমন নলিনী মোর হৃদয়ের ধন

সে আমার-- সে আমার কাছে গো যখন,

পেয়েছি যখন আমি তার ভালবাসা,

তখন আমার আর কিসের বা আশা?

পেয়েছি যখন আমি তোর মত সখী--

দুখে মোর দুখ পায়, সুখে মোর সুখী--

তবে বল্‌ দেখি, সখি, কি দুঃখ আমার?

তবে যে উঠেছে মনে বিষাদ-আঁধার

শরতের মেঘসম দু-দণ্ডে মিলাবে,

কোথা হতে আসিয়াছে কোথায় বা যাবে!

এখনি নলিনী-কাছে যাই একবার,

এখনি ঘুচিবে এই বিষাদের ভার!

মুরলা সখি লো, তুমি থাকিস্‌ হেথাই,

ফিরে এসে পুনঃ যেন দেখিবারে পাই!  

 

 

[কবির প্রস্থান

 

মুরলা।

      ফিরে এসে মুরলারে পাবে না দেখিতে!

কবি মোর, আরেকটু যদি গো থাকিতে!

নলিনী ত চিরজন্ম রহিবে তোমার,

আমি যে ও মুখ কভু হেরিব না আর!

ও মুখ কি আর কভু পাব না দেখিতে

যত দিন হবে মোরে বাঁচিয়া থাকিতে?

পল যাবে, দণ্ড যাবে,  দিন যাবে, মাস যাবে,

বর্ষ বর্ষ করি যাবে জীবন আমার--

ও মুখ দেখিতে তবু পাব নাকো আর?

মুরলা, পারিবি তুই? পরিবি থাকিতে?

দারুণ পাষাণে মন বাঁধিয়া রাখিতে?

না, না, না, মুরলা তুই যাইবি কোথায়?

অসীম সংসারে তোর কে আছে রে হায়?

হবে যা অদৃষ্টে আছে   থাকিস কবির কাছে--

কবি তোর সুখ শান্তি হৃদয়ের ধন,

থাকিস জড়ায়ে ধরি কবির চরণ,

কবির চরণে শেষে ত্যজিস জীবন!

কিন্তু  স্বার্থপর তুই কি করিয়া র'বি?

বিষণ্ন ও মুখ তোর নিরখিয়া কবি

এখনো কাঁদেন যদি,  এখনো তাঁহার হৃদি

পুরানো বিষাদ যদি করে গো স্মরণ?

সেই ছেলেবেলাকার   বিষাদযন্ত্রণাভর

আমি যদি তাঁর মনে জাগাইয়া রাখি--

তবে, রে হতভাগিনী, কি বলিয়া থাকি!

তবে আমি যাই, তবে যাই, তবে যাই--

কেহ মোর ছিল নাকো, কেহ মোর নাই!

মুরলা বলিয়া কেহ আছে কি ভুবনে?

মুরলা বলিয়া যারে ভাবিতেছি মনে

সে একটি নিশীথের স্বপ্ন মোহময়,

দেখিব স্বপন ভাঙ্গি মুরলা সে নয়!

নাই তার সুখ দুখ, নাই ভালবাসা,

নাই কবি-- নাই কেহ-- নাই কোন আশা!

কেহই সে নয়, আর কেহ তার নাই,

তবে কি ভাবনা আর-- যেথা ইচ্ছা যাই!

কিন্তু কবি মোর, আহা ভালবাসাময়,

আমারে না দেখে যদি তাঁর কষ্ট হয়?

থাম্‌ থাম্‌, মুরলা রে,  কেন মিছে বারে বারে

মনেরে প্রবোধ দিস ও কথা বলিয়া!

শুনিলে জগৎ যে রে উঠিবে হাসিয়া!

চল্‌ তুই, চল্‌ তুই-- যেথা ইচ্ছা চল্‌ তুই,

কেহ নাই তোর লাগি কাঁদিবার তরে!

তবে চলিলাম, কবি, দূর দেশান্তরে!

অন্তর্যামী দেবতা গো, শুন একবার,

যদি আমি ভালবাসি করিবে আমার

কবি যেন সুখী হয়,  নলিনী সে সুখে রয়--

সখারে আমার আমি ভালবাসি যত

নলিনীবালাও যেন ভালবাসে তত!

নলিনীবালার যত আছে দুখজ্বালা

সব যেন মোর, হয়, সুখে থাক্‌ বালা!

তবে চলিলাম কবি, আমি চলিলাম--

মুরলা করিছে এই বিদায়প্রণাম!

 

 



ললিতা

 

কে জানে নাথের কেন হ'ল গো এমন?

জানি না কি ভাবিবারে   যান বিপাশার ধারে,

ললিতার চেয়ে ভাল বাসেন বিজন!

কভুবা আছেন যবে বিরলে বসিয়া

আমি যদি যাই কাছে হাসিয়া হাসিয়া

বিরক্তিতে ভুরু কেন   আকুঞ্চিয়া উঠে যেন,

বিরক্তি জাগিয়া উঠে অধরখানিতে,

আপনি যেন গো তাহা নারেন জানিতে!

সহসা চমকি উঠি  কি যেন হয়েছে ত্রুটি

আমারে কাছেতে এনে ডাকিয়া বসান,

কি কথা ভাবিতেছেন বুঝাইতে চান,

না পারেন বুঝাইতে--  সরমে আকুল চিতে

কি কথা বলিতে হবে ভাবিয়া না পান!

কেন ত্যজি ললিতারে   এলেন বিপাশাপারে

শতেক সহস্র তার কারণ দেখান,

তা লাগি করেছি যেন কত অভিমান!

আপনি বলেন আসি  "ভালবাসি ভালবাসি"

সন্দেহ করেছি যেন প্রণয়ে তাঁহার,

তা লাগি করেছি যেন কত তিরস্কার!

সহসা কাননে এলে   আমারে দেখিতে পেলে

লুকাইয়া দ্রুত পদে পালান চকিতে

মনে ভাবি'