উপহারভাই জ্যোতিদাদা যাহা দিতে আসিয়াছি কিছুই তা নহে ভাই! কোথাও পাই নে খুঁজে যা তোমারে দিতে চাই! আগ্রহে অধীর হ'য়ে ক্ষুদ্র উপহার ল'য়ে যে উচ্ছ্বাসে আসিতেছি ছুটিয়া তোমারি পাশ, দেখাতে পারিলে তাহা পূরিত সকল আশ। ছেলেবেলা হ'তে, ভাই, ধরিয়া আমারি হাত অনুক্ষণ তুমি মোরে রাখিয়াছ সাথে সাথ। তোমার স্নেহের ছায়ে কত না যতন ক'রে কঠোর সংসার হ'তে আবরি রেখেছ মোরে। সে স্নেহ-আশ্রয় ত্যজি যেতে হবে পরবাসে। তাই বিদায়ের আগে এসেছি তোমার পাশে। যতখানি ভালবাসি, তার মত কিছু নাই-- তবু যাহা সাধ্য ছিল যতনে এনেছি তাই! |
| প্রথম দৃশ্য
| দৃশ্য--পর্ব্বতগুহা। রাত্রি কালভৈরবের প্রতিমার সম্মুখে রুদ্রচণ্ড | রুদ্রচণ্ড।
| মহাকালভৈরব-মুরতি, শুন, দেব, ভক্তের মিনতি! কটাক্ষে প্রলয় তব, চরণে কাঁপিছে ভব, প্রলয়গগনে জ্বলে দীপ্ত ত্রিলোচন। তোমার বিশাল কায়া ফেলেছে আঁধার ছায়া, অমাবস্যারাত্রি-রূপে ছেয়েছে ভুবন। জটার জলদরাশি চরাচর ফেলে গ্রাসি, দশনবিদ্যুত-বিভা দিগন্তে খেলায়। তোমার নিশ্বাসে খসি নিভে রবি, নিভে শশী, শত লক্ষ তারকার দীপ নিভে যায়। প্রচণ্ড উল্লাসে মেতে, জগতের শ্মশানেতে প্রেতসহচরগণ ভ্রমে ছুটে ছুটে-- নিদারুণ অট্টহাসে প্রতিধ্বনি কাঁপে ত্রাসে, ভগ্ন ভূমণ্ডল তারা লুফে করপুটে। প্রলয়মূরতি ধর', থরহর সুর নর, চারি পাশে দানবেরা করুক বিহার-- মহাদেব, শুন শুন নিবেদিনু পুনঃ পুন আমি রুদ্রচণ্ড, চণ্ড, সেবক তোমার। সে সঙ্কল্প আছে মনে সঁপিনু তা ও চরণে, কৃপা করি লও দেব, লও তাহা তুলে। এ দারুণ ছুরিখানি অর্ঘ্যরূপে দিনু আনি, দু-দণ্ড এ ছুরিকাটি রাখ পদমূলে। কৃপা তব হবে কবে মনোআশা পূর্ণ হবে, মন হ'তে নেমে যাবে প্রতিজ্ঞা-পাষাণ! সঙ্কল্প হইলে সিদ্ধ এ হৃদি করিয়া বিদ্ধ নিজের শোণিত দিব উপহারদান! |
| দ্বিতীয় দৃশ্য
| দৃশ্য--অরণ্য। রুদ্রচণ্ড ও অমিয়া | রুদ্রচণ্ড।।
| বার বার ক'রে আমি ব'লেছি, অমিয়া, তোরে কবিতা আলাপ-তরে নহে এ কুটীর, তবু তোরা বার বার মিছা কি প্রলাপ গাহি বনের আঁধার চিন্তা দিস্ ভাঙ্গাইয়া! পাতালের গূঢ়তম অন্ধতম অন্ধকার! অধিকার কর' এর বালিকা-হৃদয়, ও হৃদের সুখ আশা ও হৃদের উষালোক মৃদুহাসি মৃদুভাব ফেল গো গ্রাসিয়া! হিমাদ্রিপাষাণ চেয়ে গুরুভার মন মোর, তেমনি উহার মন হোক গুরুভার! হিমাদ্রিতুষার চেয়ে রক্তহীন প্রাণ মোর, তেমনি কঠিন প্রাণ হউক উহার! কুটীরের চারি দিকে ঘনঘোর গাছপালা আঁধারে কুটীর মোর রেখেছে ডুবায়ে-- এই গাছে, কতবার দেখেছি, অমিয়া তুই, লতিকা জড়ায়েছিস আপনার মনে-- ফুলন্ত লতিকা যত ছিঁড়িয়া ফেলেছি রোষে, এ সকল ছেলেখেলা পারি নে দেখিতে! আবার কহি রে তোরে, বসি চাঁদ কবি-সনে এ অরণ্যে করিস নে কবিতা-আলাপ! |
অমিয়া
।
| যাহা যাহা বলিয়াছ সব শুনিয়াছি পিতা-- আর আমি আনমনে গাহি না ত গান, আর আমি তরুদেহে জড়ায়ে দিই না লতা, আর আমি ফুল তুলে গাঁথি না ত মালা! কিন্তু পিতা, চাঁদ কবি, এত তারে ভালবাসি, সে আমার আপনার ভায়ের মতন-- বল মোরে বল পিতা, কেন দেখিব না তারে! কেন তার সাথে আমি কহিব না কথা! সেকি পিতা? তারে তুমি দেখেছে ত কত বার, তবু কি তাহারে তুমি ভালবাস নাই! এমন মুরতি আহা, সে যেন দেবতা-সম, এমন কে আছে তারে ভাল যে না বাসে! এই যে আঁধার বন তার পদার্পণ হ'লে এও যেন হেসে ওঠে মনের হরষে! এই যে কুটীর, এও কোল বাড়াইয়া দেয়, অভ্যর্থনা করে নি যে কোন অতিথিরে! ভ্রূকুটি কোরো না পিতা, ওই ভ্রূকুটির ভয়ে সমস্ত তোমার আজ্ঞা করেছি পালন। পায়ে পড়ি ক্ষমা কর-- এই ভিক্ষা দাও পিতা, এ ভালবাসায় মোর করিও না রোষ! |
রুদ্রচণ্ড
।
| মাতৃস্তন্য কেন তোর হয় নাই বিষ! অথবা ভূমিষ্ঠশয্যা চিতাশয্যা তোর! | অমিয়া।
| তাই যদি হ'ত, পিতা, বড় ভাল হ'ত! কে জানে মনের মধ্যে কি হয়েছে মোর, বরষার মেঘ যদি হইতাম আমি বর্ষিয়া সহশ্রুধারে অশ্রুজলরাশি বজ্রনাদে করিতাম আকুল বিলাপ! আগে ত লাগিত ভালো জোছনার আলো, ফুটন্ত ফুলের গুচ্ছ, বকুলতলাটি-- ভ্রূকুটির ভয়ে তব ডরিয়া ডরিয়া তাহাদেরো 'পরে মোর জন্মেছে বিরাগ! শুধু একজন আছে যার মুখ চেয়ে বড়ই হরষে পিতা সব যাই ভুলে, দূর হ'তে দেখি তারে আকুল হৃদয় দেহ ছাড়ি তাড়াতাড়ি বাহিরিতে চায়! সে আইলে তার কাছে যেতে দিও মোরে! সে যে পিতা অমিয়ার আপনার ভাই! |
রুদ্রচণ্ড
।
| বটে বটে, সে তোমার আপনার ভাই! শত তীক্ষণ বজ্র তার পড়ুক মস্তকে, চিরজীবী হউক সে অগ্নিকুণ্ডমাঝে! মুখ ঢাকিস নে তুই, শোন্ তোরে বলি, পুনরায় যদি তোর আপনার ভাই-- চাঁদ কবি এ কাননে করে পদার্পণ এই যে ছুরিকা আছে কলঙ্ক ইহার তাহার উত্তপ্ত রক্তে করিব ক্ষালন! |
অমিয়া
।
| ও কথা বোল' না পিতা-- |
রুদ্রচণ্ড
।
| চুপ্, শোন্ বলি; জীবন্তে ছুরিকা দিয়া বিঁধিয়া বিঁধিয়া শত খণ্ড করি তার ফেলিব শরীর, পাণ্ডুবর্ণ আঁখি-মুদা ছিন্ন মুণ্ড তার এই বৃক্ষশাখা-'পরে দিব টাঙ্গাইয়া, ভিজিবে বর্ষার জলে, পুড়িবে তপনে যতদিনে বাহিরিয়া না পড়ে কঙ্কাল! শুনিয়া কাঁপিতেছিস, দেখিবি যখন মস্তকের কেশ তোর উঠিবে শিহরি! আপনার ভাই তোর! কে সে চাঁদ কবি! হতভাগ্য পৃথ্বীরাজ, তারি সভাসদ! সে পৃথ্বীরাজের হীন জীবন মরণ এই ছুরিকার 'পরে রয়েছে ঝুলান'! |
অমিয়া
।
| থাম পিতা, থাম থাম, ও কথা বোলা না! শত শত অভাগার শোণিতের ধারা তোমার ছুরিকা ওই করিয়াছে পান, তবুও-- তবুও ওর মিটে নি পিপাসা? কত বিধবার আহা কত অনাথার নিদারুণ মর্ম্মভেদী হাহাকারধ্বনি তোমার নিষ্ঠুর কর্ণ করিয়াছে পান, তবুও তবুও ওর মিটে নি কি তৃষা? |
রুদ্রচণ্ড
।
| [আপনার মনে]-- মিটে নাই! মিটে নাই! মোর নির্ব্বাসন! রাজ্য ছিল, ধন ছিল, সব ছিল মোর, আর কত শত আশা ছিল এই হৃদে-- রাজ্য গেল, ধন গেল, সব গেল মোর, কূলে এসে ডুবে গেল যত আশা ছিল! শুধু এই ছুরি আছে, আর এই হৃদি আগ্নেয় গিরির চেয়ে জ্বলন্ত গহ্বর! মোরে নির্ব্বাসন! হায়, কি বলিব প্রিথ্বী,-- এ নির্ব্বাসনের ধার শুধিতাম আমি প্রিথ্বীতে থাকিত যদি এমন নরক যন্ত্রণা জীবন যেথা এক নাম ধরে, জীবননিদাঘে যেথা নাই মৃত্যুছায়া! মোরে নির্ব্বাসন! কেন, কোন্ অপরাধে? অপরাধ! শতবার লক্ষবার আমি অপরাধ করি যদি কে সে পৃথ্বীরাজ! বিচার করিতে তার কোন্ অধিকার! নাহয় দুরাশা মোর করিতে সাধন শত শত মানুষের লয়েছি মস্তক-- তুমি কর নাই? তোমার দুরাশাযজ্ঞে লক্ষ মানবের রক্ত দাও নি আহুতি? লক্ষ লক্ষ গ্রাম দেশ কর নি উচ্ছিন্ন? লক্ষ লক্ষ রমণীরে কর নি বিধবা? শুধু অভিমান তব তৃপ্ত করিবারে-- ভ্রাতা তব জয়চাঁদ, তার রাজ্য দেশ ভূমিসাৎ করিতে কর নি আয়োজন? প্রিথ্বীতেই তোমার কি হবে না বিচার? নরকের অধিষ্ঠাতৃদেব, শুন তুমি, এই বাহু যদি নাহি হয় গো অসাড়, রক্তহীন যদি নাহি হয় এ ধমনী, তবে এই ছুরিকাটি এই হস্তে ধরি উরসে খোদিব তার মরণের পথ! হৃদয় এমন মোর হয়েছে অধীর পারি নে থাকিতে হেথা স্থির হ'য়ে আর! চলিনু, অমিয়া, আমি-- তুই থাক্ হেথা, চলিনু গুহায় আমি করিগে ভ্রমণ। শোন্, শোন্, শোন্ বলি, মনে আছে তোর-- চাঁদ কবি পুনঃ যদি আসে এ কুটীরে জীবন লইয়া আর যাবে না সে ফিরে! | [প্রস্থান | অমিয়া।
| বড় সাধ যায় এই নক্ষত্রমালিনী স্তব্ধ যামিনীর সাথে মিশে যাই যদি! মৃদুল সমীর এই, চাঁদের জোছনা, নিশার ঘুমন্ত শান্তি, এর সাথে যদি অমিয়ার এ জীবন যায় মিলাইয়া! আঁধার ভ্রূকুটিময় এই এ কানন, সঙ্কীর্ণহৃদয় অতি ক্ষুদ্র এ কুটীর, ভ্রূকুটির সমুখেতে দিনরাত্রি বাস, শাসন-শকুনি এক দিনরাত্রি যেন মাথার উপরে আছে পাখা বিছাইয়া-- এমন ক'দিন আর কাটিবে জীবন! থেকে থেকে প্রাণ উঠে কাঁদিয়া কাঁদিয়া! পাখী যদি হইতাম,দু-দণ্ডের তরে সুনীল আকাশে গিয়া ঊষার আলোকে একবার প্রাণ ভ'রে দিতেম সাঁতার! আহা, কোথা চাঁদ কবি, ভাই গো আমার! এ রুদ্ধ অরণ্য-মাঝে তোমারে হেরিলে দু-দণ্ড যে আপনারে ভুলে থাকি আমি! (রুদ্রচণ্ডের প্রবেশ) না-- না পিতা, পায়ে পড়ি, পারিব না তাহা, আর কি তাহারে কভু দেখিতে দিবে না? কোন্ অপরাধ আমি করেছি তোমার অভাগীরে এত কষ্ট দিতেছ যা লাগি! কে জানে বুকের মধ্যে কি যে করিতেছে! দাও পিতা, ওই ছুরি বিঁধিয়া বিঁধিয়া ভেঙ্গে ফেল যাতনার এ আবাসখানা! ওই ছুরি কত শত বীরের শোণিতে মাথা তার ডুবায়েছে হাসিয়া হাসিয়া, ক্ষুদ্র এই বালিকার শোণিত বর্ষিতে ও দারুণ ছুরি তব হবে না কুণ্ঠিত! হেসো না অমন করি, পায়ে পড়ি তব, ওর চেয়ে রোষদীপ্ত ভ্রূকুটিকুটিল রুদ্র মুখপানে তব পারি নেহারিতে! |
রুদ্রচণ্ড
।
| ঘুমাগে ঘুমাগে তুই, অমিয়া, ঘুমাগে-- একটু রহিব একা, তাও কি দিবি না? আজ আমি ঘুমাব না, একেলা হেথায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া রাত্রি করিব যাপন। এনে দে কুঠার মোর, কাটিয়া পাদপ এ দীর্ঘ সময় আমি দিব কাটাইয়া। বিশ্রাম আমার কাছে দারুণ যন্ত্রণা। বিশ্রাম, কালের প্রতি মুহূর্ত্ত যেমন দংশন করিতে থাকে হৃদয় আমার। মরুভূমিপথমাঝে পথিক যখন দূর গম্যদেশে তার করিতে গমন যত অগ্রসর হয়, দিগন্তবিস্তৃত নব নব মরু যদি পড়ে দৃষ্টিপথে, তাহার হৃদয় হয় যেমন অধীর, তেমনি আমার সেই উদ্দেশ্যের মাঝে প্রত্যেকে আমার সেই উদ্দেশ্যে মাঝে প্রত্যেক মুহূর্ত্তকাল, প্রত্যেক নিমেষ অস্থির করিয়া তুলে হৃদয় আমার! |
| তৃতীয় দৃশ্য
| অরণ্য চাঁদ কবি ও অমিয়ায |
চাঁদ কবি
।
| কেন লো অমিয়া, তোর কচি মুখখানি অমন বিষণ্ন হেরি, অমন গম্ভীর? আয়, কাছে আয়, বোন, শোন্ তোরে বলি, গান শিখাইব ব'লে দুটি গান আমি আপনি রচনা ক'রে এনেছি অমিয়া! বনের পাখীটি তুই, গান গেয়ে গেয়ে বেড়াইবি বনে বনে এই তোরে সাজে-- |
অমিয়া
।
| চূপ কর, ওই বুঝি পদশব্দ শুনি! বুঝি আসিছেন পিতা! না না, কেন নয়! শোন ভাই, এ বনে এস না তুমি আর! আসিবে না? তা তা' হলে কি অমিয়ার সাথে আর দেখা হবে নাক? হবে না কি আর? |
চাঁদ কবি
।
| কি কথা বলিতেছিস, অমিয়া, বালিকা! |
অমিয়া
।
| পিতা যে কি বলেছেন, শোন নাই তাহা-- বড় ভয় হয় শুনে, প্রাণ কেঁপে ওঠে! কাজ নাই ভাই, তুমি যাও হেথা হতে! যেমন করিয়া হোক, কাটিবেক দিন-- অমিয়ার তরে, কবি, ভেবোনাক তুমি। |
চাঁদ কবি
।
| আমি গেলে বল্ দেখি, বোনটি আমার, কার কাছে ছুটে যাবি মনে ব্যথা পেলে? আমি গেলে এ অরণ্যে কে রহিবে তোর! |
অমিয়া
।
| কেহ না, কেহ না চাঁদ! আমি বলি ভাই, পিতারে বুঝায়ে তুমি বোলো একবার! বোলো তুমি অমিয়ারে ভালবাস বড়, মাঝে মাঝে তারে তুমি আস দেখিবারে! আর কিছু নয়, শুধু এই কথা বোলো! তুমি যদি ভাল করে বলো বুঝাইয়া, নিশ্চয় তোমার কথা রাখিবেন পিতা! বলিবে? |
চাঁদ কবি
।
| বলিব বোন! ও কথা থাকুক্!-- সে দিন যে গান তোরে দেছিনু শিখায়ে, সে গানটি ধীরে ধীরে গা' দেখি অমিয়া! | গান রাগিণী--মিশ্র ললিত |
অমিয়া
।
| বসন্তপ্রভাতে এক মালতীর ফুল প্রথম মেলিল আঁখি তার, চাহিয়া দেখিল চারি ধার। সৌন্দর্য্যের বিন্দু সেই মালতীর চোখে সহসা জগৎ প্রকাশিল, প্রভাত সহসা বিভাসিল বসন্তলাবণ্যে সাজি গো-- একি হর্ষ -- হর্ষ আজি গো! উষারাণী দাঁড়াইয়া শিয়রে তাহার দেখিছে ফুলের ঘুম-ভাঙা, হরষে কপোল তাঁর রাঙা! কুসুমভগিনীগণ চারি দিক হ'তে আগ্রহে রয়েছে তারা চেয়ে, কখন ফুটিবে চোখ ছোট বোনটির জাগিবে সে কাননের মেয়ে। আকাশ সুনীল আজি কিবা, অরুণনয়নে হাস্যবিভা, বিমল শিশিরধৌত তনু হাসিছে কুসুমরাজি গো-- একি হর্ষ-- হর্ষ আজি গো! মধুকর গান গেয়ে বলে, "মধু কই, মধু দাও দাও!' হরষে হৃদয় ফেটে গিয়ে ফুল বলে, "এই লও লও!' বায়ু আসি কহে কানে কানে, "ফুলবালা,পরিমল দাও!' আনন্দে কাঁদিয়া কহে ফুল, "যাহা আছে সব লয়ে যাও!' হরষ ধরে না তার চিতে, আপনারে চায় বিলাইতে, বালিকা আনন্দে কুটিকুটি, পাতায় পাতায় পড়ে লুটি-- নূতন জগত দেখি রে আজিকে হরষ একি রে! |
অমিয়া
।
| সত্য সত্য ফুল যবে মেলে আঁখি তার, না জানি সে মনে মনে কি ভাবে তখন! |
চাঁদ কবি
।
| অমিয়া, তুই তা, বল্, বুঝিবি কেমনে! তুই সুকুমার ফুল যখনি ফুটিলি, যখনি মেলিলি আঁখি, দেখিলি চাহিয়া-- শুষ্ক জীর্ণ পত্রহীন অতি সুকঠোর বজ্রাহত শাখা- 'পরে তোর বৃন্ত বাঁধা একটিও নাই তোর কুসুমভগিনী, আঁধার চৌদিক হতে আছে গ্রাস করি-- যেমনি মেলিলি আঁখি অমনি সভয়ে মুদিতে চাহিলি বুঝি নয়নটি তোর। না দেখিলি রবিকর, জোছনার আলো, না শুনিলি পাখীদের প্রভাতের গান! আহা বোন, তোরে দেখে বড় হয় মায়া! মাঝে মাঝে ভাবি ব'সে কাজ-কর্ম ভুলি, "এতক্ষণে অমিয়া একেলা বসে আছে, বিশাল আঁধার বনে কেহ তার নাই!' অমনি ছুটিয়া আসি দেখিবারে তোরে! আরেকটি গান তোরে শিখাইব আজি, মন দিয়ে শোন্ দেখি অমিয়া আমার! গান রাগিণী-- মিশ্র গৌড়-সারঙ্গ তরুতলে ছিন্নবৃন্ত মালতীর ফুল মুদিয়া আসিছে আঁখি তার, চাহিয়া দেখিল চারি ধার। শুষ্ক তৃণরাশি-মাঝে একেলা পড়িয়া, চারি দিকে কেহ নাই আর। নিরদয় অসীম সংসার। কে আছে গো দিবে তার তৃষিত অধরে এক বিন্দু শিশিরের কণা? কেহ না-- কেহ না! মধুকর কাছে এসে বলে, "মধু কই, মধু চাই চাই।' ধীরে ধীরে নিশ্বাস ফেলিয়া ফুল বলে, "কিছু নাই নাই।' "ফুলবালা, পরিমল দাও' বায়ু আসি কহিতেছে কাছে। মলিন বদন ফিরাইয়া ফুল বলে, "আর কিবা আছে!' মধ্যাহ্নকিরণ চারি দিকে খর দৃষ্টে চেয়ে অনিমিখে, ফুলটির মৃদু প্রাণ হায় ধীরে ধীরে শুকাইয়া যায়। |
অমিয়া
।
| ওই আসিছেন পিতা, লুকাও লুকাও, পায়ে পড়ি-- লুকাও লুকাও এই বেলা, একটি আমার কথা রাখ চাঁদ কবি! সময় নাইক আর-- ওই আসিছেন, কি হবে? কি হবে ভাই? কোথা লুকাইবে? [ রুদ্রচণ্ডের প্রবেশ ] পিতা, পিতা, ক্ষমা কর, ক্ষমা কর মোরে; আপনি এসেছি আমি চাঁদ কবি-কাছে, চাঁদের কি দোষ তাহে বল পিতা, বল! এসেছিনু, কিছুতেই পারি নি থাকিতে-- নিজে এসেছিনু আমি, চাঁদের কি দোষ? |
রুদ্রচণ্ড
।
|
অভাগিনী!
|
চাঁদ কবি
।
| রুদ্রচণ্ড, শোন মোর কথা। |
অমিয়া
।
| থাম চাঁদ, কোন কথা বোলো না পিতারে, থাম থাম। |
চাঁদ কবি
।
| রুদ্রচণ্ড, শোন মোর কথা! |
অমিয়া
।
| পিতা, পিতা, এই পায়ে পড়িলাম আমি, যাহা ইচ্ছা কর তাই এখনি-- এখনি। চেয়ো না চাঁদের পানে অমন করিয়া। |
চাঁদ কবি
।
| দাঁড়ানু কৃপাণ এই পরশ করিয়া-- সূর্য্যদেব, সাক্ষী রহ, আমি চাঁদ কবি আজ হতে অমিয়ার হনু পিতা মাতা। তোর সাথে অমিয়ার সমস্ত বন্ধন এ মুহূর্ত্ত হতে আজ ছিন্ন হয়ে গেল। মোর অমিয়ার কেশ স্পর্শ কর যদি রুদ্রচণ্ড, তোর দিন ফুরাইবে ভবে! | [অমিয়ার মূর্চ্ছিত হইয়া পতন উভয়ের দ্বন্দ্বযুদ্ধ ও রুদ্রচণ্ডের পতন] | রুদ্রচণ্ড।
| সম্বর সম্বর অসি, থাম চাঁদ, থাম! কি! হাসিছ বুঝি! বুঝি ভাবিতেছ মনে, মরণেরে ভর করি আমি রুদ্রচণ্ড! জানিস নে মরণের ব্যবসায়ী আমি! জীবন মাগিতে হ'ল তোর কাছে আজ শত বার মৃত্যু এই হইল আমার! রুদ্রচণ্ড যে মুহূর্ত্তে ভিক্ষা মাগিয়াছে রুদ্রচণ্ড সে মুহূর্ত্তে গিয়াছে মরিয়া! আজ আমি মৃত সে রুদ্রের নাম লয়ে কেবল শরীর তার, কহিতেছি তোরে-- এখনো জীবনে মোর আছে প্রয়োজন! এখনো-- এখনো আছে! এখনো আমার সঙ্কল্প রয়েছে হ'য়ে দারুণ তৃষিত! রুদ্রচণ্ড তোর কাছে ভিক্ষা মাগিতেছে আর কি চাহিস চাঁদ? দিবি মোরে প্রাণ? | [অশ্বারোহী দূতের প্রবেশ চাঁদ কবির প্রতি] |
দূত
।
| মহাশয়, আসিতেছি রাজসভা হতে! নিমেষ ফেলিতে আর নাই অবসর! প্রতি মুহূর্ত্তের 'পরে অতি ক্ষীণ সূত্রে রাজত্বের শুভাশুভ করিছে নির্ভর! প্রশ্নোত্তর করিবার নাইক সময়! | [সত্বর উভয়ের প্রস্থান |
| চতুর্থ দৃশ্য
| রুদ্রচণ্ড |
রুদ্রচণ্ড
।
| অনুগ্রহ ক'রে মোরে চ'লে গেল চাঁদ! গৃহে ব'সে ভাবিতেছে প্রসন্নবদনে রুদ্রচণ্ডে বাঁচালেম অনুগ্রহ ক'রে? অনুগ্রহ! রুদ্রচণ্ডে অনুগ্রহ করা! এ অনুগ্রহের ছুরি মর্ম্মের মাঝারে --যত দিন বেঁচে রব-- রহিবে নিহিত! দিনরাত্রি রক্ত মোর করিবে শোষণ। দুগ্ধপোষ্য শিশু চাঁদ-- তার অনুগ্রহ! ভিক্ষা-পাওয়া এ জীবন না রাখিলে নয়! এ হীন প্রাণের কাজ যখনি ফুরাবে তখনি ধূলায় এরে করিব নিক্ষেপ, চরণে দলিয়া এরে চূর্ণ ক'রে দেব'। [অমিয়ার প্রবেশ] আবার রাক্ষসি, তুই আবার আইলি! এ সংসারে আছে যত আপনার ভাই-- সকলেরে ডেকে আন্, পিতার জীবন সে কুক্কুরদের মুখে করিস নিক্ষেপ। পিতার শোণিত দিয়ে পুষিস তাদের। দূর হ রাক্ষসি, তুই এখনি দূর হ। |
অমিয়া
।
| পিতা, পিতা, পায়ে পড়ি, শতবার আমি দূর হয়ে যাইতেছি এ কুটীর হ'তে-- বোলো না, অমন ক'রে বোলো না আমারে। বুঝিতে পারি নে যে গো কি আমি করেছি। চাঁদের সহিত দুটি কথা কয়েছিনু-- কেন পিতা, তার তরে এত শান্তি কেন? |
রুদ্রচণ্ড
।
| চুপ কর্, "কেন' "কেন' শুধাস নে আর। "দুর হ রাক্ষসি' এই আদেশ আমার! দিনরাত্রি, পাপিয়সি, "কেন কেন' করি করিস নে মোর আদেশের অপমান। |
অমিয়া
।
| কোথা যাব পিতা, আমি পথ যে জানি নে। কারেও চিনি নে আমি-- কি হবে আমার! পিতা গো, জান ত তুমি, অমিয়া তোমার নিতান্ত নির্ব্বোধ মেয়ে কিছু সে বুঝে না-- না বুঝে করেছে দোষ ক্ষমা কর তারে। |
রুদ্রচণ্ড
।
| হতভাগী! |
অমিয়া
।
| ক্ষমা কর, ক্ষমা কর পিতা! আজ রাত্রে দূর ক'রে দিও না আমারে, এক রাত্রি তরে দাও কুটীরে থাকিতে। |
রুদ্রচণ্ড
।
| শিশুর হৃদয় এ কি পেয়েছিস তুই! দুই ফোঁটা অশ্রু দিয়ে গলাতে চাহিস! এখনি ও অশ্রুজল মুছে ফেল্ তুই। অশ্রুজলধারা মোর দু-চক্ষের বিষ। আর নয়, শোন্ শেষ আদেশ আমার-- দূর হ রে-- |
অমিয়া
।
| ধর পিতা, ধর গো আমায়-- |
রুদ্রচণ্ড
।
| ছুঁস্ নে, ছুঁস্ নে মোরে, রাক্ষসি, ছুস্ নে। | [অমিয়ার মূর্চ্ছিত হইয়া পতন ও তাহাকে তুলিয়া লইয়া বনান্ত-উদ্দেশে রুদ্রচণ্ডের প্রস্থান] |
| পঞ্চম দৃশ্য
| অমিয়া। রাজপথে প্রাসাদসম্মুখে |
অমিয়া
।
| আর ত পারি না, শ্রান্ত ক্লান্ত কলেবর। সঘনে ঘুরিছে মাথা, টলিছে চরণ। বহিছে বহুক ঝড়, পড়ুক অশনি, ঘোর অন্ধকার মোরে ফেলুক গ্রাসিয়া। এ কি এ বিদ্যুৎ মাগো! অন্ধ হ'ল আঁখি। চাঁদ, চাঁদ, কোথা গেলে ভাইটি আমার! সারাদিন উপবাসে পথে পথে ভ্রমি "চাঁদ চাঁদ' ব'লে আমি খুঁজেছি তোমায়। কোথাও পেনু না কেন ভাই গো আমার? অতি ভয়ে ভয়ে গেছি পান্থদের কাছে-- শুধায়েছি, কেহ কেন বলে নি আমারে? এ প্রাসাদ যদি হয় তাঁহারি আলয়! যদি গো এখনি চাঁদ বাহিরিয়া আসে, হেথা মোরে দেখিয়া কি করেন তা হ'লে? হয়ত আছেন তিনি, যাই একবার। উহু কি বাতাস! শীতে কাঁপি থর থর! যদি না থাকেন তিনি, আর কেহ এসে যদি কিছু বলে মোরে, কি করিব তবে? কে আছ গো, দ্বার খোল-- আমি নিরাশ্রয়, অমিয়া আমার নাম, এসেছি দুয়ারে। | দ্বার খুলিয়া একজন।।
| কে তুই? |
অমিয়া
।
| (সভয়ে) অমিয়া আমি। |
দ্বাররক্ষক
।
| হেথা কেন এলি? |
অমিয়া
।
| চাঁদ কবি ভাই মোর আছেন কি হেথা? বড় শ্রান্ত ক্লান্ত আমি চাহি গো আশ্রয়। |
দ্বাররক্ষক
।
| এ রাত্রে দুয়ারে মিছা করিস নে গোল। হেথা ঠাঁই মিলিবে না, দূর হ ভিখারী। | [দ্বাররোধন। একটি পান্থের প্রবেশ] |
পান্থ
।
| উঃ! একি মুহুর্মুহু হানিছে বিদ্যুৎ! এ দুর্য্যোগে পথপার্শ্বে কে বসিয়া হোথা? এমন বহিছে ঝড়, গর্জ্জিছে অশনি, আর রাত্রে গৃহ ছেড়ে পথে কে রে তুই! [কাছে আসিয়া] একি বাছা, হেথা কেন একেলা বসিয়া? পিতা মাতা কেহ তোর নাই কি সংসারে? |
অমিয়া
।
| [কাঁদিয়া উঠিয়া ] ওগো পান্থ, কেহ নাই, কেহ নাই মোর। অমিয়া আমার নাম, বড় শ্রান্ত আমি, সারাদিন পথে পথে করেছি ভ্রমণ। |
পান্থ
।
| আয় মা, আমার সাথে আয় মোর ঘরে। অরণ্যে আমার কুঁড়ে, বেশি দূর নয়। আহা দাঁড়াবার বল নাই যে চরণে। আয়, তোরে কোলে ক'রে তুলে নিয়ে যাই। |
অমিয়া
।
| চাঁদ কবি, ভাই মোর, তারে জান তুমি? কোথায় থাকেন তিনি পার কি বলিতে? |
পান্থ
।
| জানি নে মা, কোথাকার কে সে চাঁদ কবি। আমরা বনের লোক, কাঠ কেটে খাই, নগরে কে কোথা থাকে জানিব কি ক'রে? চল্ মা, আজি এ রাত্রে মোর ঘরে চল্। |
| ষষ্ঠ দৃশ্য
| চাঁদ কবি। শিবির |
চাঁদ কবি
।
| সহস্র থাকুক কাজ, আজ একবার অমিয়ারে না দেখিলে নারিব থাকিতে। না জানি সে অভাগিনী কি করিছে আহা! হয়ত সে সহিছে দ্বিগুণ অত্যাচার। তোর দুঃখ গেনু আমি দূর করিবারে, ফেলিনু দ্বিগুণ কষ্টে অমিয়া আমার। জানিলি নে, অভাগিনী, সুখ কারে বলে! শাসনের অন্ধকারে, অরণ্যবিজনে, পিতা নামে নিরদয় শমনের কাছে দারুণ কটাক্ষে তার থরথর কাঁপি দিনরাত্রি রয়েছিস ম্রিয়মাণ হয়ে। প্রভাতের ফুল তুই, দিবসের পাখী-- করে এ আঁধার রাতি ফুরাইবে তোর? ওই মুখখানি নিয়ে প্রফুল্ল নয়নে গান গাবি, খেলাইবি প্রশান্ত হরষে! এই যুদ্ধ শেষ হলে, অভাগিনী তোরে অনিব রে নিষ্ঠুর পিতার গ্রাস হতে। আপনার ঘরে আনি রাখিব যতনে, এতদিনকার দুঃখ দিব দূর ক'রে। রাজপুত ক্ষত্রিয়েরে করিবি বিবাহ, ভালবেসে দুই জনে কাটাবি জীবন। অন্ধকার অরণ্যের রুদ্ধ বাল্যকাল দুঃস্বপ্নের মত শুধু পড়িবেক মনে। [দূতের প্রবেশ] মহাশয়, এসেছে এসেছে শত্রুগণ, তিন ক্রোশ দূরে তারা ফেলেছে শিবির। রাত্রিযোগে অলক্ষ্যেতে এসেছে তাহারা, সহসা প্রভাতে আজি পেলেম বারতা। |
চাঁদ
।
| চল তবে-- বাজাও বাজাও রণভেরী। সৈন্যগণ, অস্ত্র লও, উঠাও শিবির। দুয়ারে এসেছে শত্রু, বিলম্ব সহে না। দাও মোরে বর্ম্ম দাও, অশ্ব ল'য়ে এস। ত্বরা কর, বাজাও বাজাও রণভেরী। | [কোলাহল] |
| সপ্তম দৃশ্য
| বন | |
দূত
।
| একি ঘোর স্তব্ধ বন, একি অন্ধকার! চারি দিকে ঝোপঝাপ, পথ নাই কোথা! ওই বুঝি হবে তার আঁধার কুটীর, ওইখানে রুদ্রচণ্ড বাস করে বুঝি! | [রুদ্রচণ্ডের প্রবেশ] |
দূত
।
| প্রণাম! |
রুদ্র
।
| কে তুই! |
দূত
।
| আগে কুটীরেতে চল! একে একে সব কথা করি নিবেদন! |
রুদ্র
।
| পথ ভুলে বুঝি তুই এসেছিস্ হেথা? আমি রুদ্রচণ্ড, এই অরণ্যের রাজা। নগরনিবাসী তোরা হেথা কেন এলি? ঐশ্বর্য্যমাঝারে তোরা প্রাসাদে থাকিস, ননীর পুতুল যত ললনারে লয়ে আবেশে মুদিত আঁখি, গদ গদ ভাষা, ফুলের পাপড়ি 'পরে পড়িলে চরণ ব্যথায় অধীর হয়ে উঠিস যে তোরা-- নগরফুলের কীট হেথা তোরা কেন? আমি পৃথ্বীরাজ নই, আমি রুদ্রচণ্ড। মৃদু মিষ্ট কথা শুনি আহ্লাদে গলিয়া রাজ্যধন উপহার দিই নাক আমি! বিশাল রাজসভার ব্যাধি তোরা যত আমার অরণ্যে কেন করিলি প্রবেশ? পুষ্টদেহ ধনী তোরা, দেখিতে এলি কি কুটীরে কি ক'রে থাকে অরণ্যের লোক? মনে কি করিলি এই অরণ্যবাসীরে দুটা অনুগ্রহবাক্যে কিনিয়া রাখিবি? তাই আজ প্রাতঃকালে স্বর্ণময় বেশে বিশাল উষ্ঞীষ এক বাঁধিয়া মাথায় এলি হেথা ধাঁধিবারে দরিদ্রনয়ন? জানিস কি, বনবাসী এই রুদ্রচণ্ড-- যতেক উষ্ঞীষধারী আছয়ে নগরে সবার উষ্ঞীষে করে শত পদাঘাত! |
দূত
।
| রুদ্রচণ্ড, মিছা কেন করিতেছে রোষ! উপকার করিতেই এসেছি হেথায়! |
রুদ্র
।
| বটে বটে, উপকার করিতে এসেছ! তোমারা নগরবাসী স্ফীতদেহ সবে উপকার করিবারে সদাই উদ্যত! তোমাদের নগরের বালক সে চাঁদ উপকার করিতে আসেন তিনি হেথা, উপকার ক'রে মোরে রেখেছেন কিনে! এত উপকার তিনি করেছেন মোর আর কারো উপকারে আবশ্যক নাই! |
দূত
।
| রুদ্রচণ্ড, বুঝি তুমি ভ্রমে পড়িয়াছ, আমি নহি পৃথ্বীরাজ-রাজ-সভাসদ। রাজরাজ মহারাজ মহম্মদ ঘোরী তিনি আমারে হেথা করেন প্রেরণ-- অধীর হোয়ো না, সব শোন একে একে-- পৃথ্বীরাজে আক্রমিতে আসিছেন তিনি, বহুদূর পর্য্যটনে শ্রান্ত সৈন্যদল-- থাম রুদ্র, বলি আমি, কথা মোর শোন-- আজ এক রাত্রি-তরে এ অরণ্যমাঝে রাজরাজ মহারাজ চাহেন আশ্রয়! |
রুদ্র
।
| কি বলিলি দূত! তোর মহম্মদ ঘোরী, পৃথ্বীরাজে আক্রমিতে আসিতেছে হেথা! |
দূত
।
| এ বনে ত লোক নাই? ধীরে কথা কও! |
রুদ্র
।
| ধীরে ক'ব! যাব আমি নগরে নগরে, ঊর্দ্ধকণ্ঠে কব আমি রাজপথে গিয়া, "ম্লেচ্ছ সেনাপতি এক মহম্মদ ঘোরী তস্করের মত আসে আক্রমিতে দেশ!' |
দূত
।
| শোন রুদ্র, পৃথ্বী তব রাজ্যধন কেড়ে নির্ব্বাসিত করেছেন এ অরণ্যদেশে-- |
রুদ্র
।
| সংবাদের-আবর্জ্জনা-ভিক্ষুক কুক্কুর, এ সংবাদ কোথা হতে করিলি সংগ্রহ? |
দূত
।
| ধৈর্য্য ধর। পৃথ্বী তব রাজ্যধন লয়ে নির্ব্বাসিত করেছেন এ অরণ্যদেশে! প্রতিহিংসা সাধিবার সাধ থাকে যদি এই তার উপযুক্ত হয়েছে সময়। মহম্মদ ঘোরী হেথা-- |
রুদ্র
।
| মহম্মদ ঘোরী? কেন, আমার কি কাছে ছুরি নাই মূঢ়! এত দিন বক্ষে তারে করিনু পোষণ, প্রতি দণ্ডে দণ্ডে তারে দিয়েছি আশ্বাস। আজ কোথা হতে আসি মহম্মদ ঘোরী তাহার মুখের গ্রাস লইবে কাড়িয়া? যেমন পৃথ্বীর শত্রু মহম্মদ ঘোরী তেমনি আমারো শত্রু কহি তোরে দূত! পৃথ্বীর রাজত্ব প্রাণ এসেছে কাড়িতে, সমস্ত জগৎ মোর ছিনিতে এসেছে। এখনি নগরে যাব কহি তোরে আমি। অশুভ বারতা এই করিব প্রচার। | [কৃপাণ খুলিয়া রুদ্রচণ্ডকে দূতের সহসা আক্রমণ উভয়ের যুদ্ধ ও দূতের পতন] |
| অষ্টম দৃশ্য
| দৃশ্য। পথ [নেপথ্যে গান] | [নেপথ্যে]।
| উত্তরের পথ দিয়া চল সৈন্যগণ! | [সেনাপতিগণ সৈন্যগণ ও চাঁদ কবির প্রবেশ] |
চাঁদ কবি
।
| অমিয়ার কণ্ঠ যেন শুনিনু সহসা, এ মধ্যাহ্নে রাজপথে সে কেন আসিবে? |
সেনাপতি
।
| সৈন্যগণ হেথা এসে দাঁড়াইলে কেন? বিশ্রাম করিতে কভু এই কি সময়? |
দ্বিতীয় সেনাপতি
।
| শুনিনু যবনগণ যুঝে প্রাণপণে-- অতিশয় ক্লান্ত নাকি হিন্দু সৈন্য যত। এখনো রয়েছে তারা সাহায্যের আশে, নিতান্ত নিরাশ হবে বিলম্ব হইলে। |
চাঁদ কবি
।
| তবে চল, চল ত্বরা, আর দেরি নয়! | [গমনোদ্যম। অমিয়ার প্রবেশ] |
অমিয়া
।
| চাঁদ, চাঁদ--ভাই মোর-- |
সৈন্যগণ
।
| কে তুই! দূর হ! |
সেনাপতি
।
| স'রে দাঁড়া, পথ ছাড়্, চল সৈন্যগণ! |
চাঁদ কবি
।
| [স্তম্ভিত হইয়া ] অমিয়া রে-- |
সেনাপতি
।
| চাঁদ কবি, এই কি সময়! আমাদের মুখ চেয়ে সমস্ত ভারত, ছেলেখেলা পেনু একি পথের ধারেতে? চল চল, বাজাও, বাজাও রণভেরী! |
চাঁদ
।
| [যাইতে যাইতে] অমিয়া রে, ফিরে এসে-- |
সেনাপতি
।
| বাজাও দুন্দুভি! | রণবাদ্য। প্রস্থান [অমিয়ার অবসন্ন হইয়া পতন] |
| নবম দৃশ্য
| নগর। রুদ্রচণ্ড |
রুদ্র
।
| বেধেছে তুমুল রণ; কোথা পৃথ্বীরাজ! ওরে রে সংগ্রামদৈত্য শোণিতপিপাসী, সমস্ত হস্তিনা তুই করিস রে গ্রাস, পৃথ্বীরাজে রেখে দিস এ ছুরিকা-তরে। পৃথ্বীরাজ আছে কোন্ শিবিরে না জানি! ভ্রমিতেছি তার তরে প্রভাত হইতে। আজ তার দেখা পেলে পুরাইব সাধ। একি ঘোর কোলাহল নগরের পথে, সম্মুখে, দক্ষিণে বামে সহস্র বর্ব্বর গায়েয উপর দিয়া যেতেছে চলিয়া! চারি দিকে রহিয়াছে প্রাসাদের বন, বাতায়ন হতে চেয়ে শত শত আঁখি! এত লোক, এত গোল সহ্য নাহি হয়! [একজন পান্থের প্রতি] কে গো তুমি মহাশয়, মুখপানে মোর একেবারে চেয়ে আছ অবাক্ হইয়া? কখন কি দেখ নাই মানুষের মুখ? যেথা যাই শত আঁখি মোর মুখ চেয়ে, আঁখিগুলা বুঝি মোরে পাগল করিবে! যেথা হেরি চারি দিকে সূর্য্যের আলোক, নয়ন বিঁধিছে মোর বাণের মতন! একটু আড়াল পাই, একটু আঁধার, বাঁচি তবে দুই দণ্ড নিশ্বাস ফেলিয়া! একি হেরি? ঊর্দ্ধশ্বাসে নাগরিকগণ কোথায় ছুটেছে সব অস্ত্র শস্ত্র লয়ে? ওগো পান্থ, বল মোরে ত্বরা ক'রে বল! মরেছে কি পৃথ্বীরাজ? ত্বরা ক'রে বল! |
পান্থ
।
| কে তুমি অসভ্য বন্য, কোথা হতে এলি? অকল্যাণ বাণী যদি উচ্চারিস মুখে রসনা পুড়াব তোর জ্বলন্ত অঙ্গারে! | [প্রস্থান |
রুদ্র
।
| [আর একজনের প্রতি] শোন পান্থ, বল মোরে কোথা যাও সবে, রণক্ষেত্রে অমঙ্গল ঘটে নি ত কিছু! | [উত্তর না দিয়া পান্থের প্রস্থান |
রুদ্র
।
| (একজন পান্থকে ধরিয়া) অসভ্য বর্ব্বর যত, বল্ মোরে বল্! ছাড়িব না, যতক্ষণ না দিবি উত্তর! বল্ শুধু পৃথ্বীরাজ রয়েছে বাঁচিয়া! | [বলপূর্ব্বক ছাড়াইয়া লইয়া পান্থের প্রস্থান |
রুদ্র
।
| নগরকুক্কুর যত মরুক-- মরুক! হীন অপদার্থ যত বিলাসীর পাল, যুদ্ধের হুঙ্কার শুনে ডরিয়া মরুক! নবনীগঠিত যত সুখের শরীর-- নিজের অস্ত্রের ভারে পিষিয়া মরুক! ঐশ্বর্য্যধূলায় অন্ধ নগরের কীট নিজের গরবে ফেটে মরুক-- মরুক! |
| দশম দৃশ্য
| অমিয়া। পথ |
অমিয়া
।
| চ'লে গেল!-- সকলেই চ'লে গেল গো! দিন রাত্রি পথে পথে করিয়া ভ্রমণ এক মুহূর্ত্তের তরে দেখা হল যদি, চ'লে গেল? একবার কথা কহিল না? একবার ডাকিল না "অমিয়া' বলিয়া? স্বপ্নের মতন সব চ'লে গেল গো? অমিয়া রে, এত কি নির্ব্বোধ তুই মেয়ে? সকলেরি কাছে কি করিস অপরাধ? পিতা তোরে জন্মতরে করিলেন ত্যাগ, চাঁদ কবি ভাই তোর স্নেহের সাগর, তাঁরো কাছে আজ কি রে হলি অপরাধী? তিনিও কি তোরে আজ করিলেন ত্যাগ? কেহ তোর রহিল না অকূল সংসারে? কে আছে গো, ক্ষুদ্র এই শ্রান্ত বালিকারে একবার নেবে গো স্নেহের কোলে তুলে? এই ত এসেছি সেই অরণ্যের পথে। যাব কি পিতার কাছে? যদি রুষ্ঠ হন! আবার আমারে যদি দেন তাড়াইয়া! যাহা ইচ্ছা করিবেন, তাঁরি কাছে যাই! ধরিয়া চরণ তাঁর রহিব পড়িয়া! মা গো মা, হৃদয় বুঝি ফেটে গেল মোর! প্রাণের বন্ধন বুঝি ছিঁড়ে গেল সব! চাঁদ, চাঁদ, ভাই মোর, দেখা হল যদি, একবার ডাকিলে না "অমিয়া' বলিয়া! | [প্রস্থান |
| একাদশ দৃশ্য
| নাগরিকগণ |
প্রথম
।
| সমাচার দাও সবে ঘরে ঘরে গিয়া-- শুনিতেছি পরাজয় হয়েছে মোদের। |
দ্বিতীয়
।
| অস্ত্রভার তুলিবারে সক্ষম যাহারা আয় সবে ত্বরা ক'রে, সময় যে নাই! নগরদুয়ারে গিয়া দাঁড়াই আমরা। |
সকলে
।
| এখনি-- এখনি চল যে আছ সেখানে! |
তৃতীয়
।
| চিতানল গৃহে গৃহে জ্বালাইতে বল, নগরশ্মশানে আজ রমণীরা যত প্রাণবিনিময়ে মান রাখিবে তাহারা! |
চতুর্থ
।
| মরণ-উৎসব আজ হইবে নগরে। চিতার মশাল জ্বালি শোণিতমদিরা যমরাজ আজ রাত্রে করিবেন পান। | [দূতের প্রবেশ] |
দূত
।
| শোন, শোন, পৃথ্বীরাজ বন্দী হয়েছেন। |
সকলে
।
| বন্দী? |
প্রথম
।
| রাজরাজ মহারাজ বন্দী আজি? |
দ্বিতীয়
।
| লাগাও আগুন তবে নগরে নগরে! |
তৃতীয়
।
| ভেঙে ফেল অট্টালিকা! |
চতুর্থ
।
| ভস্ম কর গ্রাম, |
সকলে
।
| সমভূমি ক'রে ফেল হস্তিনানগরী। |
| দ্বাদশ দৃশ্য
| রুদ্রচণ্ড |
রুদ্রচণ্ড
।
| এখনো ত কিছু তার পেনু না সংবাদ পৃথ্বীরাজ মরেছে কি রয়েছে বাঁচিয়া। হীন প্রাণ, কবে তোর ফুরাইবে কাজ! ঋণ-করা প্রাণ আর বহিতে পারি না, কবে তোরে ত্যাগ ক'রে বাঁচিব আবার! ছিছি, তোর লাগি আমি ভিক্ষা করিলাম, জীবন নামেতে এক মরণ পাইনু! অদৃষ্ট রে, আরো কি চাহিস করিবারে? অনুগ্রহ 'পরে মোর জীবন রাখিলি! অনুগ্রহ-- শিশু চাঁদ, তার অনুগ্রহ! | [একটি দূতের প্রবেশ] |
দূত
।
| বন্দী পৃথ্বীরাজ আজ হত হয়েছেন। |
রুদ্রচণ্ড
।
| [চমকিয়া]-- হত? সে কি কথা? মিথ্যা বলিস নে মূঢ়! মরে নি সে, মরে নি, মরে নি পৃথ্বীরাজ। এখনো আছে এ ছুরি, আছে এ হৃদয়, বল্ তুই, এখনো সে আছে পৃথ্বীরাজ। কোথা যাস বল্ তুই এখনো সে আছে! |
দূত
।
| সহসা উন্মাদ আজি হলে নাকি তুমি? বন্দীভাবে পৃথ্বীরাজ হত হয়েছেন যারে বলি সেই মোরে মারিতে উদ্যত, কিন্তু হেন রোষ আমি দেখি নি ত কারো। | [প্রস্থান |
রুদ্রচণ্ড
।
| [ছুরি নিক্ষেপ করিয়া ]-- মুহূর্ত্তে জগৎ মোর ধ্বংস হ'য়ে গেল। শূন্য হয়ে গেল মোর সমস্ত জীবন! পৃথ্বীরাজ মরে নাই, মরেছে যে জন সে কেবল রুদ্রচণ্ড, আর কেহ নয়। যে দুরন্ত দৈত্যশিশু দিন রাত্রি ধ'রে হৃদয়মাঝারে আমি করিনু পালন, তারে নিয়ে খেলা শুধু এক কাজ ছিল, পৃথিবীতে আর কিছু ছিল না আমার, তাহারি জীবন ছিল আমার জীবন-- এ মুহূর্ত্তে মরে গেল সেই বৎস মোর! তারি নাম রুদ্রচণ্ড, আমি কেহ নই। আয়, ছুরি, আয় তবে, প্রভু গেছে তোর-- এ শূন্য আসন তাঁর ভেঙ্গে ফেল্ তবে। [বিঁধাইয়া বিঁধাইয়া ] ভেঙ্গে ফেল্, ভেঙ্গে ফেল্, ভেঙ্গে ফেল্ তবে। [অমিয়ার প্রবেশ] | অমিয়া।
| পিতা, পিতা, অমিয়ারে ক্ষমা কর পিতা! [চমকিয়া স্তব্ধ] |
রুদ্রচণ্ড
।
| আয় মা অমিয়া মোর, কাছে আয় বাছা! এত দিন পিতা তোর ছিল না এ দেহে, আজ সে সহসা হেথা এসেছে ফিরিয়া। অমিয়া, মলিন বড় মুখখানি তোর! আহা বাছা, কত কষ্ট পেলি এ জীবনে! আর তোরে দুঃখ পেতে হবে না, বালিকা, পাষণ্ড পিতার তোর ফুরায়েছে দিন। | অমিয়া।
| [রুদ্রচণ্ডকে আলিঙ্গন করিয়া]-- ও কথা বোলো না পিতা, বোলো না, বোলো না-- অমিয়ার এ সংসারে কেহ নাই আর। তাড়ায়ে দিয়েছে মোরে সমস্ত সংসার, এসেছি পিতার কোলে বড় শ্রান্ত হয়ে। যেথা তুমি যাবে পিতা যাব সাথে সাথে, যা তুমি বলিবে মোর সকলি শুনিব, তোমারে তিলেক-তরে ছাড়িব না আর। |
রুদ্রচণ্ড
।
| আয় মা আমার তুই থাক্ বুকে থাক্। সমস্ত জীবন তোরে কত কষ্ট দিনু! এখন সময় মোর ফুরায়ে এসেছে, আজ তোরে কি করিয়া সুখী করি বাছা? আশীর্ব্বাদ করি, বাছা, জন্মান্তরে যেন এমন নিষ্ঠুর পিতা তোর নাহি হয়! অমিয়া মা, কাঁদিস্ নে, থাক্ বুকে থাক্! |
| ত্রয়োদশ দৃশ্য
| চাঁদ কবি | ।
| ভ্রমিব সন্ন্যাসীবেশে শ্মশানে শ্মশানে। অদৃষ্ট রে, একি তোর নিদারুণ খেলা, এক দিনে করিলি কি ওলট্পালট্! কিছু রাখিলি নে আজ, কাল যাহা ছিল! পৃথ্বীরাজ, রাজদণ্ড, দৌর্দ্দণ্ড প্রতাপ, হাসি-কান্না-লীলা-ময় নগর নগরী, অচল অটল কাল ছিল বর্ত্তমান, আজ তার কিছু নাই! চিহ্ন মাত্র নাই! এই যে চৌদিকে হেরি গ্রাম দেশ যত, এই যে মানুষগণ করে কোলাহল, একি সব শ্মশানেতে মরীচিকা আঁকা! মাঝে মাঝে স্থানে স্থানে মিলাইয়া যায়, জগতের শ্মশান বাহির হ'য়ে পড়ে। চিতার কোলের পরে অস্থিভস্মমাঝে মানুষেরা নাট্যশালা করেছে স্থাপন! সন্ন্যাসী, কোথায় যাস্ শ্মশানে ভ্রমিতে! নগর নগরী গ্রাম সকলি শ্মশান। পৃথ্বীরাজ, তুমি যদি গেলে গো চলিয়া, কবির বীণায় নাম রহিবে তোমার! যত দিন বেঁচে রব' যশোগান তব দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে বেড়াব গাহিয়া। কুটীরের রমণীরা কাঁদিবে সে গানে, বালকেরা ঘেরি মোরে শুনিবে অবাক্! দেশে দেশে সে গান শিখিবে কত লোক, মুখে মুখে তব নাম করিবে বিরাজ, দিশে দিশে সে নামের হবে প্রতিধ্বনি! এই এক ব্রত শুধু রহিল আমার, জীবনের আর সব গেছে ধ্বংস হ'য়ে! আহা সে অমিয়া মোর, সে কি বেঁচে আছে? তার তরে প্রাণ বড় হয়েছে অধীর! চৌদিকে উঠিছে যবে রণকোলাহল, চৌদিকে চলেছে যবে মরণের খেলা, করুণ সে মুখখানি, দীনহীন বেশ, আঁখির সামনে ছিল ছবির মতন! আকাশের পটে আঁকা সে মুখ হেরিয়া ভীষণ সমরক্ষেত্রে কাঁদিয়াছি আমি! তার সেই "চাঁদ' "চাঁদ' স্নেহের উচ্ছ্বাস, কানেতে বাজিতেছিল আকুল সে স্বর! একটি কথাও তারে নারিনু বলিতে? মুখের কথাটি তার মুখে র'য়ে গেল, একটি উত্তর দিতে পেনু না সময়? চাহিয়া পাষাণদৃষ্টি আইনু চলিয়া! পাব কি দেখিতে তারে কোথায় সে গেল? যাই সে অরণ্যমাঝে যাই একবার! |
| চতুর্দ্দশ দৃশ্য
| চাঁদ কবি |
চাঁদ কবি
।
| উহু, কি নিস্তব্ধ বন, হাহা করে বায়ু, পদশব্দে প্রতিধ্বনি উঠিছে কাঁদিয়া! আশঙ্কায় দেহ যেন উঠিছে শিহরি, অতিশয় ধীরে ধীরে পড়িছে নিঃশ্বাস! এই যে কুটীর সেই, সাড়াশব্দ নাই, গোপন কি কথা ল'য়ে স্তব্ধ আছে যেন! কাঁপিছে চরণ মোর! যাব কি ভিতরে? [দ্বার উদ্ঘাটন গৃহমধ্যে রুদ্রচণ্ডের মৃতদেহ ও মুমুর্ষু অমিয়া] অমিয়া, অমিয়া মোর, স্নেহের প্রতিমা! চাঁদ কবি, ভাই তোর এসেছে হেথায়। |
অমিয়া
।
| চাঁদ, চাঁদ, আইলে কি? এস কাছে এস-- কখন্ আসিবে তুমি সেই আশা চেয়ে বুঝি এতক্ষণ প্রাণ যায় নি চলিয়া কত দিন কত রাত্রি পথে পথে খুঁজি দেখা হল, ছুটে গেনু ভায়ের কাছেতে, একবার দাঁড়ালে না? চলে গেলে চাঁদ? না জানি কি অপরাধ করেছে অমিয়া! আজ, চাঁদ, জীবনের শেষ দণ্ডে মোর শুনিতে ব্যাকুল বড় সে কি অপরাধ! দেখিতে পাই নে কেন? কোথা তুমি ভাই? সংসার চোখের 'পরে আসিছে মিলায়ে। ত্বরা ক'রে বল চাঁদ, সময় যে নাই, একবার দাঁড়ালে না, চলে গেলে ভাই? | [মৃত্যু] |
চাঁদ কবি
।
| একি হ'ল, একি হ'ল, অমিয়া, অমিয়া, এক মুহূর্ত্তের তরে রহিলি না তুই? করুণ অন্তিম প্রশ্ন মুখে রয়ে গেল, উত্তর শুনিতে তার দাঁড়ালি নে বোন? যত দিন বেঁচে রব ওই প্রশ্ন তোর কানেতে বাজিবে মোর দিবস রজনী, জীবনের শেষ দণ্ডে ওই প্রশ্ন তোর শুনিতে শুনিতে বালা মুদিব নয়ন। অমিয়া, অমিয়া মোর, ওঠ্ একবার। প্রশ্ন শুধাবারে শুধু বেঁচেছিলি বোন, এক দণ্ড রহিলি নে উত্তর শুনিতে? ভাল বোন, দেখা হবে আর-এক দিন, সে দিন দুজনে মিলি করিব রে শেষ দুজনের হৃদয়ের অসম্পূর্ণ কথা। | সমাপ্ত |
|