Home > Stories > তিনসঙ্গী > ল্যাবরেটরি
Chapters: 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | SINGLE PAGE Next Previous

ল্যাবরেটরি    

১১


ল্যাবরেটরির চার দিকে অনেকখানি জমি ফাঁকা আছে। কাঁপন বা শব্দ যাতে যথাসম্ভব কাজের মাঝখানে না পৌঁছয়। এই নিস্তব্ধতা কাজের অভিনিবেশে রেবতীকে সহায়তা করে। তাই ও প্রায়ই এখানে রাত্রে কাজ করতে আসে।

 

নীচের ঘড়িতে দুটো বাজল। মুহূর্তের জন্য রেবতী তার চিন্তার বিষয় ভাবছিল জানলার বাইরে আকাশের দিকে চোখ মেলে।

 

এমন সময়ে দেওয়ালে পড়ল ছায়া। চেয়ে দেখে ঘরের মধ্যে এসেছে নীলা। রাত-কাপড় পরা, পাতলা সিল্কের শেমিজ। ও চমকে চৌকি থেকে উঠে পড়তে যাচ্ছিল। নীলা এসে ওর কোলের উপর বসে গলা জড়িয়ে ধরল। রেবতীর সমস্ত শরীর থর্‌ থর্‌ করে কাঁপতে লাগল, বুক উঠতে পড়তে লাগল প্রবলবেগে। গদ্‌গদ কণ্ঠে বলতে লাগল, 'তুমি যাও, এ ঘর থেকে তুমি যাও।'

 

ও বললে, 'কেন।'

 

রেবতী বললে, 'আমি সহ্য করতে পারছি নে। কেন এলে তুমি এ ঘরে।'

 

নীলা ওকে আরো দৃঢ়বলে চেপে ধরে বললে, 'কেন, আমাকে কি তুমি ভালোবাস না।'

 

রেবতী বললে, 'বাসি, বাসি, বাসি। কিন্তু এ ঘর থেকে তুমি যাও।'

 

হঠাৎ ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল পাঞ্জাবী প্রহরী; ভর্ৎসনার কণ্ঠে বললে, 'মায়িজি, বহুত শরমকি বাৎ হ্যায়, আপ বাহার চলা যাইয়ে।'

 

রেবতী চেতনমনের অগোচরে ইলেকট্রিক ডাকঘড়িতে কখন্‌ চাপ দিয়েছিল।

 

পাঞ্জাবী রেবতীকে বললে, 'বাবুজি, বেইমানি মৎ করো।'

 

রেবতী নীলাকে জোর করে ঠেলে দিয়ে চৌকি থেকে উঠে পড়ল। দরোয়ান ফের নীলাকে বললে,'আপ বাহার চলা যাইয়ে, নহি তো মনিবকো হুকুম তামিল করেগা।'

 

অর্থাৎ জোর করে অপমান করে বের করে দেবে। বাইরে যেতে যেতে নীলা বললে, 'শুনছেন সার আইজাক নিউটন?-- কাল আমাদের বাড়িতে আপনার চায়ের নেমন্তন্ন, ঠিক চারটে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের সময়। শুনতে পাচ্ছেন না? অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন?' ব'লে একবার তার দিকে ফিরে দাঁড়ালে।

 

বাষ্পার্দ্র কণ্ঠে উত্তর এল, 'শুনেছি।'

 

রাত-কাপড়ের ভিতর থেকে নীলার নিখুঁত দেহের গঠন ভাস্করের মূর্তির মতো অপরূপ হয়ে ফুটে উঠল, রেবতী মুগ্ধ চোখে না দেখে থাকতে পারল না। নীলা চলে গেল। রেবতী টেবিলের উপর মুখ রেখে পড়ে রইল। এমন আশ্চর্য সে কল্পনা করতে পারে না। একটা কোন্‌ বৈদ্যুত বর্ষণ প্রবেশ করেছে ওর শিরার মধ্যে, চকিত হয়ে বেড়াচ্ছে অগ্নিধারায়। হাতের মুঠো শক্ত করে রেবতী কেবলই নিজেকে বলাতে লাগল, কাল চায়ের নিমন্ত্রণে যাবে না। খুব শক্ত শপথ করবার চেষ্টা করতে চায়, মুখ দিয়ে বেরয় না। ব্লটিঙের উপর লিখল, যাব না, যাব না, যাব না। হঠাৎ দেখলে তার টেবিলে একটা ঘন লাল রঙের রুমল পড়ে আছে, কোণে নাম সেলাই করা 'নীলা'। মুখের উপর চেপে ধরল রুমাল, গন্ধে মগজ উঠল ভরে, একটা নেশা সির্‌ সির্‌ করে ছড়িয়ে গেল সর্বাঙ্গে।

 

নীলা আবার ঘরের মধ্যে এল। বললে, 'একটা কাজ আছে ভুলে গিয়েছিলুম।'

 

দরোয়ান রুখতে গেল। নীলা বললে, 'ভয় নেই তোমার, চুরি করতে আসি নি। একটা কেবল সই চাই। জাগানী ক্লাবের প্রেসিডেন্ট করব তোমাকে-- তোমার নাম আছে দেশ জুড়ে।'

 

অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে রেবতী বললে, 'ও ক্লাবের আমি তো কিছুই জানি নে।'

 

'কিছুই তো জানবার দরকার নেই। এইটুকু জানলেই হবে ব্রজেন্দ্রবাবু এই ক্লাবের পেট্রন।'

 

'আমি তো ব্রজেন্দ্রবাবুকে জানি নে।'

 

' এইটুকু জানলেই হবে, মেট্রপলিটান ব্যাঙ্কের তিনি ডাইরেক্টর। লক্ষী আমার, জাদু আমার, একটা সই বৈ তো নয়।' ব'লে ডান হাত দিয়ে তার কাঁধ ঘিরে তার হাতটা ধরে বললে, 'সই করো।'

 

সে  স্বপ্নাবিষ্টের মতো সই করে দিলে।

 

কাগজটা নিয়ে নীলা যখন মুড়ছে দরোয়ান বললে, 'এ কাগজ আমাকে দেখতে হবে।'

 

নীলা বললে, 'এ তো তুমি বুঝতে পারবে না।'

 

দরোয়ান বললে, 'দরকার নেই বোঝবার।' বলে কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললে। বললে, 'দলিল বানাতে হয় বাইরে গিয়ে বানিয়ো। এখানে নয়।'

 

রেবতী মনে মনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দরোয়ান নীলাকে বললে, 'মাজি, এখন চলো তোমাকে বাড়ি পৌছিয়ে দিয়ে আসি গে।' ব'লে তাকে নিয়ে গেল।

 

কিছুক্ষণ পরে আবার ঘরে ঢুকল পাঞ্জাবী। বললে 'চার দিকে আমি দরজা বন্ধ করে রাখি, তুমি ওকে ভিতর থেকে খুলে দিয়েছ।'

 

এ কী সন্দেহ, কী অপমান। বারবার করে বললে, 'আমি খুলি নি।'

 

'তবে  ও কী করে ঘরে এল।'

 

সেও তো বটে। বিজ্ঞানী তখন সন্ধান করে বেড়াতে লাগল ঘরে ঘরে। অবশেষে দেখলে রাস্তার ধারের একটা বড়ো জানলা ভিতর থেকে আগল দেওয়া ছিল, কে সেই অগলটা দিনের বেলায় এক সময়ে খুলে রেখে গেছে।

 

রেবতীর যে ধূর্ত বুদ্ধি  আছে  এতটা শ্রদ্ধা তার প্রতি দরোয়ানজির ছিল না।  বোকা মানুষ, পড়াশুনা  করে  এই  পর্যন্ত  তার  তাকত।  অবশেষে কপাল  চাপড়ে বললে, 'আওরত!  এ শয়তানি বিধিদত্ত।'

 

যে অল্প-একটু রাত বাকি ছিল রেবতী নিজেকে বারবার করে বলালে, চায়ের নিমন্ত্রণে যাবে না।

 

কাক ডেকে উঠল। রেবতী চলে গেল বাড়িতে।

 




Chapters: 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | SINGLE PAGE Next Previous