Home > Verses > রূপান্তর > ভট্টনারায়ণ-বররুচি-প্রমুখ

ভট্টনারায়ণ-বররুচি-প্রমুখ    


             ১

সূতো বা সূতপুত্রো বা

      যো বা কো বা ভবাম্যহম্‌।

দৈবায়ত্তং কূলে জন্ম

      মদায়ত্তং হি পৌরুষম্‌॥

                          --বেণীসংহার, ৩| ৩৭

 

             ১

যেমন তেমন হোক মোর জাত,

      হই ডোম হই চামার,

জন্মের কুল সেটা দৈবাৎ_

      পৌরুষ সেটা আমার।

 

             ২      

ইতরপাপফলানি [১] যথেচ্ছয়া

      বিতর তানি সহে চতুরানন।

অরসিকেষু রসস্য নিবেদনম্‌

      শিরসি মা লিখ মা লিখ মা লিখ॥

                          --নীতিরত্ন, ২

 

             ২

চতুরানন, পাপের ফল

      যেমন খুশি তব

বিতর মোরে, সকলই আমি

      যে ক'রে হোক সব।

মিনতি শুধু-- অরসিকেরে

      রসের নিবেদন

লিখো না, ওগো, লিখো না ভালে,

      লিখো না সে বেদন।

 

      পাঠান্তর

বিধি হে, যত তাপ মোর দিকে,

      হানিবে, অবিচল রব তাহে।

রসের নিবেদন অরসিকে

      ললাটে লিখো না হে, লিখো না হে।

 

             ৩

ভদ্রং কৃতং কৃতং মৌনং

      কোকিলৈর্জলদাগমে।

দর্দুরা যত্র বক্তারস্‌-

      তত্র মৌনং হি শোভনম্‌।

                          --নীতিরত্ন, ১১

 

             ৩

ভালোই করেছ, পিক,

      চুপ করে  রয়েছ আষাঢ়ে।

মৌনই সেথায় শোভে

      ভেকেরা যেথায় ডাক ছাড়ে।

 

             ৪

কাকঃ কৃষ্ণঃ পিকঃ কৃষ্ণস্‌-

      ত্বভেদঃ পিককাকয়োঃ।

বসন্তে সমুপায়াতে

      কাকঃ কাকঃ পিকঃ পিকঃ॥

                          --বররুচি : নীতিরত্ন, ১৩

 

             ৪

কাক কালো, পিক কালো,

      বর্ষায় সমান তারা ঠিক--

বসন্ত যেমনি আসে

      কাক কাক, পিক হয় পিক।

 

             পাঠান্তর

কাক কালো, পিক কালো,

      মিথ্যা ভেদ খোঁজা--

বসন্ত যেমনি আসে

      ভেদ যায় বোঝা।

 

             ৫

কাকস্য পক্ষৌ যদি স্বর্ণযুক্তৌ [২]

মাণিক্যযুক্তৌ চরণৌ চ তস্য

একৈকপক্ষে গজরাজমুক্তা

তথাপি কাকো ন চ রাজহংসঃ॥

                          --বররুচি : নীতিরত্ন, ৮

 

             ৫

সোনা দিয়ে বাঁধা হোক কাকটার ডানা,

মানিকে জড়ানো হোক তার পা দুখানা,

এক এক পক্ষে তার গজমুক্তা থাক্‌--

রাজহংস নয় কভু, তবুও সে কাক।

 

             ৬

উদ্যোগিনং পুরুষসিংহমুপৈতি লক্ষ্মীর্‌-

দৈবেন দেয়মিতি কাপুরুষা বদন্তি।

দৈবং নিহত্য কুরু পৌরুষমাত্মশক্ত্যা

যত্নে কৃতে যদি ন সিধ্যতি কোহত্র দোষঃ॥

                          --ঘটকর্পর : নীতিসার, ১৩

 

             ৬

উদ্যোগী পুরুষসিংহ, তারি [৩] 'পরে জানি

             কমলা সদয়।

দৈবে করিবেন [৪] দান এ অলসবাণী

             কাপুরুষে কয়।

দৈবেরে হানিয়া [৫] করো পৌরুষ আশ্রয়

             আপন শক্তিতে।

যত্ন করি সিদ্ধি যদি তবু নাহি হয়

             দোষ নাহি ইথে।

 

             পাঠান্তর ৬

সেই তো পুরুষসিংহ উদ্যোগী যে জন,

             তারি লক্ষ্মীলাভ।

দৈবপানে চেয়ে থাকে কাপুরুষগণ

             দুর্বলস্বভাব।

দৈবেরে পরাস্ত করো আত্মশক্তিবলে,

             পৌরুষ তাহাই।

যত্ন করি সিদ্ধি যদি তবুও না ফলে

             তাহে দোষ নাই।

 

             পাঠান্তর ৬

লক্ষ্মী সে পুরুষসিংহে করেন ভজন

             উদ্যোগী যে জন।

দৈবে করে ফল দান হেন কথা বলে

             কাপুরুষ-দলে।

পৌরুষ সাধন করো দৈবেরে বধিয়া

             আত্মশক্তি দিয়া।

বহুযত্নে ফল যদি নাহি মিলে হাতে

             দোষ কী তাহাতে!

 

             পাঠান্তর ৬

উদ্যোগী পুরুষ বলবান্‌

             লক্ষ্মী করে জয়,

দৈবে আসি করে বরদান

             কাপুরুষে কয়।

দৈব ছাড়ি আত্মশক্তিবলে

             পৌরুষ লভিবা--

যত্নে যদি সিদ্ধি নাহি ফলে

             দোষ তাহে কিবা!

 

             ৭

গর্জসি মেঘ ন যচ্ছসি তোয়ং

চাতকপক্ষী ব্যাকুলিতোহহম্‌।

দৈবাদিহ যদি দক্ষিণবাতঃ

ক্বত্বংক্বাহংক্ব চ জলপাতঃ॥

                          --পূর্বচাতকাষ্টক, ৪

 

       ৭

গর্জিছ মেঘ, নাহি বর্ষিছ জল--

আমি যে চাতক পাখি, চিত্ত বিকল--

দৈবাৎ আসে যদি দক্ষিণবাত

কোথা তুমি, কোথা আমি, কোথা জলপাত!

 

             ৮

উপকর্তুং যথা স্বল্পঃ

সমর্থে ন তথা মহান্‌।

প্রায়ঃ কুপস্তৃষাং হন্তি

সততং ন তু বারিধি॥

                    --কুসুমদেব : দৃষ্টান্তশতক, ১৩

 

             ৮

প্রায় কাজে নাহি লাগে মস্ত ডাগর--

কূপ তৃষা দূর করে, করে না সাগর।

 

       ৯

উদয়তি যদি ভানুঃ পশ্চিমে দিগ্‌বিভাগে

বিকসতি যদি পদ্মঃ পর্বতানাং শিখাগ্রে।

প্রচলতি যদি মেরুঃ শীততাং যাতি বহ্নির্‌-

ন চলতি খলু বাক্যং সজ্জনানাং কদাচিৎ॥

                          --কবিভট্ট : পদ্যসংগ্রহ, ৭

 

             ৯

উঠে যদি ভানু পশ্চিম দিকে,

      পদ্ম বিকাশে গিরিশিরে,

মেরু যদি নড়ে, জুড়ায় বহ্নি--

      সাধুর বচন নাহি ফিরে।

 

             ১০

সদ্ভিস্তু লীলয়া প্রোক্তং

শিলালিখিতমক্ষরম্‌।

অসদ্ভিঃ শপথেনাপি

জলে লিখিতমক্ষরম্‌॥

               --সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার

 

             ১০

সতের বচন লীলায় কথিত

      শিলায়-খোদিত যেন সে।

অসতের কথা শপথজড়িত

      জলের লিখন জেনো সে।

 

             ১১

নিন্দন্তু নীতিনিপুণা যদি বা স্তুবন্তু

লক্ষ্মীঃ সমাবিশতু গচ্ছতু বা যথেষ্টম্‌।

অদ্যৈব বা মরণমস্তু যুগান্তরে বা

ন্যাষ্যাৎ পথঃ প্রবিচলন্তি পদং ন ধীরাঃ॥

                          --ভর্তৃহরি : নীতিশতক, ১০

 

       ১১

নীতিবিশারদ যদি করে নিন্দা অথবা স্তবন,

লক্ষ্মী যদি আসেন বা যথা-ইচ্ছা ছাড়েন ভবন,

অদ্য মৃত্যু হয় যদি কিম্বা যদি হয় যুগান্তরে--

ন্যায্য পথ হতে তবু ধীর কভু এক পা না সরে॥

 

             পাঠান্তর

নীতিজ্ঞ করুক নিন্দা অথবা স্তবন,

লক্ষ্মী গৃহে আসুন বা ছাড়ুন ভবন,

অদ্য মৃত্যু হোক কিম্বা হোক যুগান্তরে--

ন্যায়পথ হতে ধীর এক-পা [৬] না সরে।

 

               পাঠান্তর

নীতিজ্ঞ বলুন ভালো, গালি বা পাড়ুন,

লক্ষ্মী ঘরে আসুন বা যথেচ্ছা ছাড়ুন,

মৃত্যু চেপে ধরে যদি অথবা পাসরে--

ন্যায্য পথ হতে ধীর এক-পা না সরে।

 

             ১২

আরম্ভগুর্বী ক্ষয়িণী ক্রমেণ

লঘ্‌বী পুরা বৃদ্ধিমতী চ পশ্চাৎ

দিনস্য পূর্বার্ধপরার্ধভিন্না

ছায়েব মৈত্রী খলসজ্জনানাম্‌।

                    --ভর্তৃহরি : নীতিশতক, ৭৮

 

               ১২

আরম্ভে দেখায় গুরু, ক্রমে হয় ক্ষীণকায়া,

দুর্জনের মৈত্রী যেন পূর্বার্ধদিবসছায়া।

সজ্জনের মৈত্রী ভায়   অপরাহ্নছায়াপ্রায়--

প্রথমে দেখিতে লঘু, কালবশে বৃদ্ধি পায়।

 

       ১৩

শম্ভুস্বয়ম্ভুহরয়ো হরিণেক্ষণানাং

যেনাক্রিয়ন্ত সততং গৃহকর্মদাসাঃ।

বাচামগোচরচরিত্রবিচিত্রিতায়

তস্মৈ নমো ভগবতে কুসুমায়ুধায়॥

                    --ভর্তৃহরি : শৃঙ্গারশতক, ১

 

                     ১৩

যাঁর তাপে বিধি বিষ্ণু শম্ভু বারো মাস

হরিণেক্ষণার দ্বারে গৃহকর্মদাস,

বাক্য-অগোচর চিত্র চরিত্র যাঁহার,

ভগবান্‌ পঞ্চবাণ, তাঁরে নমস্কার।

 

                     ১৪

মধু তিষ্ঠতি বাচি যোষিতাং হৃদি হালাহলমেব কেবলম্‌।

অতএব নিপীয়তেহধরো হৃদয়ং মুষ্টিভিরেব তাড্যতে॥

                        --ভর্তৃহরি : শৃঙ্গারশতক, ৮৫

 

                   ১৪

নারীর বচনে মধু, হৃদয়েতে হলাহল।

অধরে পিয়ায় সুধা, চিত্তে জ্বালে দাবানল।

 

                        ১৫

শাস্ত্রং সুচিন্তিতমপি প্রতিচিন্তনীয়ং

স্বারাধিতোহপি নৃপতিঃ পরিশঙ্কনীয়ঃ।

অঙ্কে স্থিতাপি যুবতিঃ পরিরক্ষণীয়া

শাস্ত্রে নৃপে চ যুবতৌ চ কুতো বশিত্বম্‌॥

                                 --বানর্যষ্টক, ২

 

                ১৫

যত চিন্তা কর শাস্ত্র, চিন্তা আরো বাড়ে।

যত পূজা কর ভূপে, ভয় নাহি ছাড়ে।

কোলে থাকিলেও নারী, রেখো সাবধানে।--

শাস্ত্র নৃপ নারী কভু বশ নাহি মানে।

 

                 ১৬

যা স্বসদ্মনি পদ্মেহপি সন্ধ্যাবধি বিজৃম্ভতে

ইন্দিরা মন্দিরেহন্যেষাং কথং তিষ্ঠতি সা চিরম্‌॥

                                --শার্‌ঙ্গধরপদ্ধতি, ৪৭১

 

                ১৬

যে পদ্মে লক্ষ্মীর বাস, দিন-অবসানে

সেই পদ্ম মুদে দল সকলেই জানে।

গৃহ যার ফুটে আর মুদে পুনঃপুনঃ

সে লক্ষ্মীরে ত্যাগ করো, শুন, মূঢ়, শুন।

 

                 ১৭

আশা নাম মনুষ্যাণাং কাচিদাশ্চর্যশৃঙ্খলা।

যয়া বদ্ধাঃ প্রধাবন্তি মুক্তাস্তিষ্ঠন্তি পঙ্গুবৎ॥

                 --ভর্তৃহরিসুভাষিতসংগ্রহ, ৪০৫

 

                ১৭

শৃঙ্খল বাঁধিয়া রাখে এই জানি সবে,

আশার শৃঙ্খল কিন্তু অদ্ভুত এ ভবে।  

সে যাহারে বাঁধে সেই ঘুরে মরে পাকে,

সে বন্ধন ছাড়ে যবে স্থির হয়ে থাকে।

 

                 ১৮

মেঘৈর্মেদুরমম্বরং বনভুবঃ শ্যামাস্তমালদ্রুমৈর্‌-

নক্তং ভীরুরয়ং ত্বমেব তদিমং রাধে গৃহং প্রাপয়।

                                 --জয়দেব : গীতগোবিন্দ, ১| ১

 

                ১৮

অম্বর অম্বুদে স্নিগ্ধ,

      তমালে তমিস্র বনভূমি,

তিমিরশর্বরী, এ যে

      শঙ্কাকুল-- সঙ্গে লহো তুমি।

 

      পাঠান্তর

মেঘলা গগন, তমাল-কানন

      সবুজ ছায়া মেলে--

আঁধার রাতে লও গো সাথে

      তরাস-পাওয়া ছেলে।

 

            ১৯

পততি পতত্রে বিচলতি পত্রে

            শঙ্কিতভবদুপযানম্‌।

রচয়তি শয়নং সচকিতনয়নং

            পশ্যতি তব পন্থানম্‌॥

                          --জয়দেব : গীতগোবিন্দ, ৫| ১০

 

            ১৯

কাঁপিলে পাতা নড়িলে পাখি,

      চমকি উঠে চকিত আঁখি।

 

            ২০

বদসি যদি কিঞ্চিদপি দন্তরুচিকৌমুদী

      হরতি দরতিমিরমতিঘোরম্‌।

                          --জয়দেব : গীতগোবিন্দ, ১০| ২

 

            ২০

বচন যদি কহ গো দুটি

         দশনরুচি উঠিবে ফুটি,

      ঘুচাবে মোর মনের ঘোর তামসী।

 

            ২১

অলিন্দে কালিন্দীকমলসুরভৌ কুঞ্জবসতের্‌-

বসন্তীং বাসন্তীনবপরিমলোদ্‌গারচিকুরাম্‌।

ত্বদুৎসঙ্গে লীনাং মদমুকুলিতাক্ষীং পুনরিমাং

কদাহং সেবিষ্যে কিসলয়কলাপব্যজনিনী॥

                          --রূপগোস্বামী : হংসদূত, ১১৫

 

            ২১

কুঞ্জকুটিরের স্নিগ্ধ অলিন্দের 'পর

কালিন্দীকমলগন্ধ ছুটিবে সুন্দর,

লীনা রবে মদিরাক্ষী তব অঙ্কতলে--

বহিবে বাসন্তীবাস ব্যাকুল কুন্তলে।

তাঁহারে করিব সেবা, কবে হবে হায়--

কিসলয়পাখাখানি দোলাইব গায়?

 

            পাঠান্তর

কুঞ্জকুটিরের স্নিগ্ধ অলিন্দের 'পর

কালিন্দীকমলগন্ধ বহিবে সুন্দর,

মুদিতনয়না লীনা তব অঙ্কতলে,

বাসন্তী সুবাস উঠে এলানো কুন্তলে--

তাঁহার করিব সেবা সেদিন কি হবে

কিসলয়-পাখাখানি দোলাইব যবে?

 

            ২২

বীথীষু বীথীষু বিলাসিনীনাং

মুখানি সংবীক্ষ্য শুচিস্মিতানি।

জালেষু জালেষু করং প্রসার্য

লাবণ্যভিক্ষামটতীব চন্দ্রঃ॥

                                 --সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার

 

            ২২

কুঞ্জ-পথে পথে চাঁদ উঁকি দেয় আসি,

দেখে বিলাসিনীদের মুখভরা হাসি।

কর প্রসারণ করি ফিরে সে জাগিয়া

বাতায়নে বাতায়নে লাবণ্য মাগিয়া।

 

            ২৩

বরমসৌ দিবসো ন পুনর্নিশা

ননু নিশৈব বরং ন পুনর্দিনম্‌ [৮]।

উভয়মেতদুপৈত্বথবা ক্ষয়ং

প্রিয়জনেন ন যত্র সমাগমঃ॥

                           --অমরুক : অমরুশতক, ৬০

 

            ২৩

আসে তো আসুক রাতি, আসুক বা দিবা,

      যায় যদি যাক্‌ নিরবধি।

তাহাদের যাতায়াতে আসে যায় কিবা

      প্রিয় মোর নাহি আসে যদি।

 

            ২৪

মন্দং নিধেহি চরণৌ পরিধেহি নীলং

বাসঃ পিধেহি বলয়াবলিমঞ্চলেন।

মা জল্প সাহসিনি শারদচন্দ্রকান্ত-

দন্তাংশবস্তব তমাংসি সমাপয়ন্তি॥

                           --সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার

 

            ২৪

ধীরে ধীরে চলো তন্বী, পরো নীলাম্বর,

অঞ্চলে বাঁধিয়া রাখো কঙ্কণ মুখর,

কথাটি কোয়ো না-- তব দন্ত-অংশু-রুচি

পথের তিমিররাশি পাছে ফেলে মুছি।

 

            ২৫

অপসরতি ন চক্ষুষো মৃগাক্ষী

      রজনিরিয়ং চ ন যাতি নৈতি নিদ্রা।

                        --ত্রিবিক্রমভট্ট : নলচম্পূ, ৭| ৪৯

 

            ২৫

চক্ষু'পরে মৃগাক্ষীর চিত্রখানি ভাসে--

রজনীও নাহি যায়, নিদ্রাও না আসে!

 

            ২৬

নিঃসীমশোভাসৌভাগ্যং নতাঙ্গ্যা নয়নদ্বয়ম্‌

অন্যোহন্যালোকনানন্দবিরহাদিব চঞ্চলম্‌॥

                --জগন্নাথপণ্ডিত : ভামিনীবিলাস, শৃ, ৪৬

 

            ২৬

আনতাঙ্গী বালিকার

      শোভাসৌভাগ্যের সার

            নয়নযুগল,

[৯] না দেখিয়া পরস্পরে

      তাই কি বিরহভরে

            হয়েছে চঞ্চল?

 

            ২৭

হত্বা লোচনবিশিখৈর্গত্বা কতিচিৎ পদানি পদ্মাক্ষী

জীবতি যুবা ন বা কিং ভূয়ো ভূয়ো বিলোকয়তি॥

                                --সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার

 

            ২৭

বিঁধিয়া দিয়া আঁখিবাণে

      যায় সে চলি গৃহপানে,

            জনমে অনুশোচনা--

বাঁচিল কিনা দেখিবারে

      চায় সে ফিরে বারে বারে

            কমলবরলোচনা।

 

            ২৮

লোচনে হরিণগর্বমোচনে

মা বিদূষয় নতাঙ্গি কজ্জলৈঃ।

সায়কঃ সপদি জীবহারকঃ

কিং পুনর্হি গরলেন লেপিতঃ॥

                                --সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার

 

            ২৮

হরিণগর্বমোচন লোচনে

      কাজল দিয়ো না সরলে!

এমনি তো বাণ নাশ করে প্রাণ,

      কী কাজ লেপিয়া গরলে!

 

            ২৯

গতং তদ্‌গাম্ভীর্যং

তটমপি চিতং জালিকশতৈঃ।

সখে হংসোত্তিষ্ঠ

ত্বরিতমমুতো গচ্ছ সরসঃ।

                      --বল্লভদেব : সুভাষিতাবলি, ৭০৭

 

            ২৯

সে গাম্ভীর্য গেল কোথা!

      নদীতট হেরো হোথা

জালিকেরা জালে ফেলে ঘিরে--

      সখে হংস, ওঠো, ওঠো,

            সময় থাকিতে ছোটো

         হেথা হতে মানসের তীরে।

 

            ৩০

অলিরসৌ নলিনীবনবল্লভঃ

কুমুদিনীকুলকেলিকলারসঃ

বিধিবশেন বিদেশমুপাগতঃ

কুটজপুষ্পরসং বহু মন্যতে॥

                       --ভ্রমরাষ্টক, ৯

 

            ৩০

ভ্রমর একদা ছিল পদ্মবনপ্রিয়,

      ছিল প্রীতি কুমুদিনী-পানে।

সহসা বিদেশে আসি, হায়, আজ কি ও

      কুটজেও বহু বলি মানে!

 

            ৩১

অসম্ভাব্যং ন বক্তব্যং

      প্রত্যক্ষমপি দৃশ্যতে

শিলা তরতি পানীয়ং

      গীতং গায়তি বানরঃ॥

                      --চাণক্য : চাণক্যশতক, ৮৯

 

            ৩১

অসম্ভাব্য না কহিবে,    মনে মনে রাখি দিবে

      প্রত্যক্ষ যদিও তাহা হয়।

"শিলা জলে ভেসে যায়    বানরে সংগীত গায়

      দেখিলেও না হয় প্রত্যয়।' [১০]

 

            ৩২

দানং প্রিয়বাক্‌সহিতং জ্ঞানমগর্বং ক্ষমান্বিতং শৌর্যম্‌।

বিত্তং ত্যাগনিযুক্তং দুর্লভমেতচ্চতুর্ভদ্রম্‌॥ [১১]

                                   --নারায়ণ পণ্ডিত : হিতোপদেশ

 

            ৩২

প্রিয়বাক্য-সহ দান, জ্ঞান গর্বহীন,

      দান-সহ ধন,

শৌর্য-সহ ক্ষমাগুণ --জগতে এ চারি

      দুর্লভ মিলন।

 

            ৩৩

পয়সা কমলং কমলেন পয়ঃ

পয়সা কমলেন বিভাতি সরঃ।

মণিনা বলয়ং বলয়েন মণির্‌-

মণিনা বলয়েন বিভাতি করঃ।

শশিনা চ নিশা নিশয়া চ শশী।

শশিনা নিশয়া চ বিভাতি নভঃ।

কবিনা চ বিভুর্বিভুনা চ কবিঃ

কবিনা বিভুনা চ বিভাতি সভা।

                                  --নবরত্নমালা

 

            ৩৩

জলেতে কমল, জল কমলে,

শোভয়ে সরসী কমলে জলে।

মণিতে বলয়, বলয়ে মণি,

মণি বলয়েতে শোভয়ে পাণি।

নিশিতে শশী, শশীতে নিশি,

আকাশের শোভা উভয়ে মিশি।

কবিতে নৃপতি, নৃপেতে কবি,

নৃপ-কবি-যোগে সভার ছবি।

 

            ৩৪

যথৈকেন ন হস্তেন তালিকা সংপ্রপদ্যতে

তথোদ্যমপরিত্যক্তং কর্ম নোৎপাদয়েৎ ফলম্‌।

                                        --নবরত্নমালা

 

            ৩৪

এক হাতে তালি নাহি বাজে,

      যে কাজ উদ্যমহীন

            ফলোদয় না হয় সে কাজে।

 

টীকা :

পাঠান্তর :

      ১    "ইতরতাপশতানি', "ইতরকর্মফলানি' নানা পাঠান্তর আছে। অন্যত্র "যদৃচ্ছা', "বিতর' স্থলে "বিলিখ', "অরসিকেষু' স্থলে "অরসিকে তু', "রসস্য' স্থলে "রহস্য' বা "কবিত্ব'।

      ২    কাব্যসংগ্রহে প্রথম চরণ : কাকস্য চঞ্চুর্যদি স্বর্ণযুক্তা

      ৩    তাঁরি

      ৪    পরে করিবেক

      ৫    পরকে বিস্মরি

      ৬    কিছুতে

      ৭    কাব্যসংগ্রহ-ধৃত পাঠান্তর দ্রষ্টব্য : ষড়্‌রত্ন, ১

      ৮    কাব্যসংগ্রহ-ধৃত পাঠ : পুনর্দিবা

      ৯    গ্রন্থপরিচয় দ্রষ্টব্য।

      ১০  উদধৃতি-চিহ্নিত অংশ ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর হইতে গৃহীত।

            পাঠান্তর : "ভেসে' স্থলে "ভাসি'।

      ১১   নবরত্নমালা গ্রন্থে সামান্য পাঠভেদ আছে।

॥ মন্তব্য ॥  সংকলিত সংস্কৃত শ্লোকাবলির পাঠ নানা আধারগ্রন্থে নানারূপ, কদাচিৎ রচয়িতা সম্পর্কেও মতভেদ আছে। রবীন্দ্রনাথ-ধৃত পাঠ অথবা যে পাঠ তিনি ব্যবহার করিয়াছেন জানা যায়, তাহাই এ স্থলে সংকলিত।

   ২-৯, ১১-১৫, ১৮-২১, ২৩, ৩০ ও ৩১ -সংখ্যক শ্লোক "শ্রীডাক্তরযোহন-হেবর্‌লিন'-কর্তৃক সমাহৃত ও মুদ্রাঙ্কিত কাব্যসংগ্রহ (১৮৪৭, পরবর্তী পরিবর্ধিত সংস্করণ : ১৮১৬-৬২ খৃস্টাব্দ) গ্রন্থে দেখা যায়। উপরে পাঠভেদগুলি নির্দেশ করা হইয়াছে; তাহা ছাড়া ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, দ্বাদশ শ্লোকের পাঠ প্রমাদপূর্ণ মনে হওয়াতেই নবরত্নমালা বা সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার-ধৃত পাঠ গৃহীত।

   ১০, ১২, ১৬, ১৭, ২২-২৯ ও ৩২ -সংখ্যক সুভাষিতরত্নভাণ্ডাগার গ্রন্থে যথাযথ পাওয়া যায়, কেবল চতুর্বিংশ শ্লোকের একাংশে "নীলং। বাসঃ' পাঠ শার্‌ঙ্গধর-পদ্ধতি (১৮৮০) গ্রন্থের প্রামাণ্যে প্রচলিত সংস্করণে "বাসো। নীলং' করা হইয়াছে।

   বহু স্থলে রবীন্দ্রনাথ মর্মানুবাদ মাত্র করিয়াছেন। চতুর্দশ শ্লোকের শেষাংশ নাটকের প্রয়োজনেই পরিবর্তিত হইয়া থাকিতে পারে; কিন্তু ইহা উল্লেখযোগ্য যে, ভর্তৃহরি-রচিত মূল কাব্যে পরবর্তী শ্লোকের সূচনাতেই আছে : অপসর সখে দূরমস্মাৎ কটাক্ষ বি শি খা ন লা ৎ। সপ্তদশ, বিশেষতঃ ষোড়শ শ্লোকের রূপান্তরে বহুশঃ পরিবর্তনও ফাল্গুনী নাট্যকাব্যেরই প্রয়োজনোপযোগী।

   সর্বশেষ শ্লোকের অনুরূপ একটি শ্লোক পাওয়া যায় যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতিতে; সুভাষিত-রত্নভাণ্ডাগার-ধৃত পাঠ--

               যথ হ্যৈকেন চক্রেণ ন রথস্য গতির্ভবেৎ

               এবং পুরুষকারেণ বিনা দৈবং ন সিদ্ধ্বতি॥