পতিসর, সন্ধ্যা, ৯ ফাল্গুন ১৩০০


 

সন্ধ্যা


ক্ষান্ত হও, ধীরে কও কথা। ওরে মন,

নত করো শির। দিবা হল সমাপন,

সন্ধ্যা আসে শান্তিময়ী। তিমিরের তীরে

অসংখ্য-প্রদীপ-জ্বালা এ বিশ্বমন্দিরে

এল আরতির বেলা। ওই শুন বাজে

নিঃশব্দ গম্ভীর মন্দ্রে অনন্তের মাঝে

শঙ্খঘণ্টাধ্বনি। ধীরে নামাইয়া আনো

বিদ্রোহের উচ্চ কণ্ঠ পূরবীর ম্লান-

মন্দ স্বরে। রাখো রাখো অভিযোগ তব,

মৌন করো বাসনার নিত্য নব নব

নিষ্ফল বিলাপ। হেরো মৌন নভস্তল,

ছায়াচ্ছন্ন মৌন বন, মৌন জলস্থল

স্তম্ভিত বিষাদে নম্র। নির্বাক্‌ নীরব

দাঁড়াইয়া সন্ধ্যাসতী-- নয়নপল্লব

নত হয়ে ঢাকে তার নয়নযুগল,

অনন্ত আকাশপূর্ণ অশ্রু-ছলছল

করিয়া গোপন। বিষাদের মহাশান্তি

ক্লান্ত ভুবনের ভালে করিছে একান্তে

 

সান্ত্বনা-পরশ। আজি এই শুভক্ষণে,

শান্ত মনে, সন্ধি করো অনন্তের সনে

সন্ধ্যার আলোকে। বিন্দু দুই অশ্রুজলে

দাও উপহার-- অসীমের পদতলে

জীবনের স্মৃতি। অন্তরের যত কথা

শান্ত হয়ে গিয়ে, মর্মান্তিক নীরবতা

করুক বিস্তার।

 

        হেরো ক্ষুদ্র নদীতীরে

সুপ্তপ্রায় গ্রাম। পক্ষীরা গিয়েছে নীড়ে,

শিশুরা খেলে না; শূন্য মাঠ জনহীন;

ঘরে-ফেরা শ্রান্ত গাভী গুটি দুই-তিন

কুটির-অঙ্গনে বাঁধা, ছবির মতন

স্তব্ধপ্রায়। গৃহকার্য হল সমাপন--

কে ওই গ্রামের বধূ ধরি বেড়াখানি

সম্মুখে দেখিছে চাহি, ভাবিছে কী জানি

ধূসর সন্ধ্যায়।

 

           অমনি নিস্তব্ধপ্রাণে

বসুন্ধরা, দিবসের কর্ম-অবসানে,

দিনান্তের বেড়াটি ধরিয়া আছে চাহি

দিগন্তের পানে। ধীরে যেতেছে প্রবাহি

সম্মুখে আলোকস্রোত অনন্ত অম্বরে

নিঃশব্দ চরণে; আকাশের দূরান্তরে

একে একে অন্ধকারে হতেছে বাহির

একেকটি দীপ্ত তারা, সুদূর পল্লীর

প্রদীপের মতো। ধীরে যেন উঠে ভেসে

ম্লানচ্ছবি ধরণীর নয়ননিমেষে

কত যুগ-যুগান্তের অতীত আভাস,

কত জীবজীবনের জীর্ণ ইতিহাস।

 

যেন মনে পড়ে সেই বাল্যনীহারিকা;

তার পরে প্রজ্বলন্ত যৌবনের শিখা;

তার পরে স্নিগ্ধশ্যাম অন্নপূর্ণালয়ে

জীবধাত্রী জননীর কাজ বক্ষে লয়ে

লক্ষ কোটি জীব-- কত দুঃখ, কত ক্লেশ,

কত যুদ্ধ, কত মৃত্যু, নাহি তার শেষ।

 

ক্রমে ঘনতর হয়ে নামে অন্ধকার,

গাঢ়তর নীরবতা-- বিশ্বপরিবার

সুপ্ত নিশ্চেতন। নিঃসঙ্গিনী ধরণীর

বিশাল অন্তর হতে উঠে সুগম্ভীর

একটি ব্যথিত প্রশ্ন, ক্লিষ্ট ক্লান্ত সুর,

শূন্যপানে-- "আরো কোথা? আরো কত দূর?"

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •