Home > Verses > পূরবী > সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত    


বর্ষার নবীন মেঘ এল ধরণীর পূর্বদ্বারে,

বাজাইল বজ্রভেরী। হে কবি, দিবে না সাড়া তারে

তোমার নবীন ছন্দে? আজিকার কাজরি গাথায়

ঝুলনের দোলা লাগে ডালে ডালে পাতায় পাতায়;

বর্ষে বর্ষে এ দোলায় দিত তাল তোমার যে বাণী

বিদ্যুৎ-নাচন গানে, সে আজি ললাটে কর হানি

বিধবার বেশে কেন নিঃশব্দে লুটায় ধূলি-'পরে?

আশ্বিনে উৎসব-সাজে শরৎ সুন্দর শুভ্র করে

শেফালির সাজি নিয়ে দেখা দিবে তোমার অঙ্গনে;

প্রতি বর্ষে দিত সে যে শুক্লরাতে জ্যোৎস্নার চন্দনে

ভালে তব বরণের টিকা; কবি, আজ হতে সে কি

বারে বারে আসি তব শূন্যকক্ষে তোমারে না দেখি

উদ্দেশে ঝরায়ে যাবে শিশিরসিঞ্চিত পুষ্পগুলি

নীরবসংগীত তব দ্বারে?

 

                            জানি তুমি প্রাণ খুলি

এ সুন্দরী ধরণীরে ভালোবেসেছিলে। তাই তারে

সাজায়েছ দিনে দিনে নিত্য নব সংগীতের হারে।

অন্যায় অসত্য যত, যত কিছু অত্যাচার পাপ

কুটিল কুৎসিত ক্রূর, তার 'পরে তব অভিশাপ

বর্ষিয়াছ ক্ষিপ্রবেগে অর্জুনের অগ্নিবাণ-সম;

তুমি সত্যবীর, তুমি সুকঠোর, নির্মল, নির্মম,

করুণ, কোমল। তুমি বঙ্গভারতীর তন্ত্রী-'পরে

একটি অপূর্ব তন্ত্র এসেছিলে পরাবার তরে।

সে তন্ত্র হয়েছে বাঁধা; আজ হতে বাণীর উৎসবে

তোমার আপন সুর কখনো ধ্বনিবে মন্দ্ররবে,

কখনো মঞ্জুল গুঞ্জরণে। বঙ্গের অঙ্গনতলে

বর্ষা-বসন্তের নৃত্যে বর্ষে বর্ষে উল্লাস উথলে;

সেথা তুমি এঁকে গেলে বর্ণে বর্ণে বিচিত্র রেখায়

আলিম্পন; কোকিলের কুহুরবে, শিখীর কেকায়

দিয়ে গেলে তোমার সংগীত; কাননের পল্লবে কুসুমে

রেখে গেলে আনন্দের হিল্লোল তোমার। বঙ্গভূমে

যে তরুণ যাত্রিদল রুদ্ধদ্বার-রাত্রি-অবসানে

নিঃশঙ্কে বাহির হবে নবজীবনের অভিযানে

নব নব সংকটের পথে পথে, তাহাদের লাগি

অন্ধকার নিশীথিনী তুমি, কবি, কাটাইলে জাগি

জয়মাল্য বিরচিয়া, রেখে গেলে গানের পাথেয়

বহ্নিতেজে পূর্ণ করি; অনাগত যুগের সাথেও

ছন্দে ছন্দে নানাসূত্রে বেঁধে গেলে বন্ধুত্বের ডোর,

গ্রন্থি দিলে চিন্ময় বন্ধনে, হে তরুণ বন্ধু মোর,

সত্যের পূজারি।

 

                 আজো যারা জন্মে নাই তব দেশে,

দেখে নাই যাহারা তোমারে, তুমি তাদের উদ্দেশে

দেখার অতীত রূপে আপনারে করে গেলে দান

দূরকালে। তাহাদের কাছে তুমি নিত্য-গাওয়া গান

মূর্তিহীন। কিন্তু যারা পেয়েছিল প্রত্যক্ষ তোমায়

অনুক্ষণ তারা যা হারাল তার সন্ধান কোথায়,

কোথায় সান্ত্বনা? বন্ধুমিলনের দিনে বারম্বার

উৎসব-রসের পাত্র পূর্ণ তুমি করেছ আমার

প্রাণে তব, গানে তব, প্রেমে তব, সৌজন্যে, শ্রদ্ধায়,

আনন্দের দানে ও গ্রহণে। সখা, আজ হতে হায়,

জানি মনে, ক্ষণে ক্ষণে চমকি উঠিবে মোর হিয়া

তুমি আস নাই বলে, অকস্মাৎ রহিয়া রহিয়া

করুণ স্মৃতির ছায়া ম্লান করি দিবে সভাতলে

আলাপ আলোক হাস্য প্রচ্ছন্ন গভীর অশ্রুজলে।

 

আজিকে একেলা বসি শোকের প্রদোষ-অন্ধকারে,

মৃত্যুতরঙ্গিণীধারা-মুখরিত ভাঙনের ধারে

তোমারে শুধাই-- আজি বাধা কি গো ঘুচিল চোখের,

সুন্দর কি ধরা দিল অনিন্দিত নন্দনলোকের

আলোকে সম্মুখে তব, উদয়শৈলের তলে আজি

নবসূর্যবন্দনায় কোথায় ভরিলে তব সাজি

নব ছন্দে, নূতন আনন্দগানে। সে গানের সুর

লাগিছে আমার কানে অশ্রুসাথে মিলিত মধুর

প্রভাত-আলোকে আজি; আছে তাহে সমাপ্তির ব্যথা

আছে তাহে নবতন আরম্ভের মঙ্গল-বারতা;

আছে তাহে ভৈরবীতে বিদায়ের বিষণ্ণ মূর্ছনা,

আছে ভৈরবের সুরে মিলনের আসন্ন অর্চনা।

 

যে খেয়ার কর্ণধার তোমারে নিয়েছে সিন্ধুপারে

আষাঢ়ের সজল ছায়ায়, তার সাথে বারে বারে

হয়েছে আমার চেনা; কতবার তারি সারিগানে

নিশান্তের নিদ্রা ভেঙে ব্যথায় বেজেছে মোর প্রাণে

অজানা পথের ডাক, সূর্যাস্তপারের স্বর্ণরেখা

ইঙ্গিত করেছে মোরে। পুনঃ আজ তার সাথে দেখা

মেঘে-ভরা বৃষ্টিঝরা দিনে। সেই মোরে দিল আনি

ঝরে-পড়া কদম্বের কেশর-সুগন্ধি লিপিখানি

তব শেষ-বিদায়ের। নিয়ে যাব ইহার উত্তর

নিজ হাতে করে আমি ওই খেয়া-'পরে করি ভর--

না জানি সে কোন্‌ শান্ত শিউলি-ঝরার শুক্লরাতে,

দক্ষিণের দোলা-লাগা পাখি-জাগা বসন্তপ্রভাতে,

নবমল্লিকার কোন্‌ আমন্ত্রণ-দিনে, শ্রাবণের

ঝিল্লিমন্দ্রসঘন সন্ধ্যায়, মুখরিত প্লাবনের

অশান্ত নিশীথ রাত্রে, হেমন্তের দিনান্তবেলায়

কুহেলীগুণ্ঠনতলে।

 

                       ধরণীতে প্রাণের খেলায়

সংসারের যাত্রাপথে এসেছি তোমার বহু আগে,

সুখে দুঃখে চলেছি আপন মনে; তুমি অনুরাগে

এসেছিলে আমার পশ্চাতে, বাঁশিখানি লয়ে হাতে

মুক্ত মনে, দীপ্ত তেজে, ভারতীর বরমাল্য মাথে।

আজ তুমি গেলে আগে; ধরিত্রীর রাত্রি আর দিন

তোমা হতে গেল খসি, সর্ব আবরণ করি লীন

চিরন্তন হলে তুমি, মর্ত কবি, মুহূর্তের মাঝে।

গেলে সেই বিশ্বচিত্তলোকে, যেথা সুগম্ভীর বাজে

অনন্তের বীণা, যার শব্দহীন সংগীতধারায়

ছুটেছে রূপের বন্যা গ্রহে সূর্যে তারায় তারায়।

সেথা তুমি অগ্রজ আমার; যদি কভু দেখা হয়,

পাব তবে সেথা তব কোন্‌ অপরূপ পরিচয়

কোন্‌ ছন্দে, কোন্‌ রূপে? যেমনি অপূর্ব হোক নাকো,

তবু আশা করি যেন মনের একটি কোণে রাখ

ধরণীর ধূলির স্মরণ, লাজে ভয়ে দুঃখে সুখে

বিজড়িত-- আশা করি, মর্তজন্মে ছিল তব মুখে

যে বিনম্র স্নিগ্ধ হাস্য, যে স্বচ্ছ সতেজ সরলতা,

সহজ সত্যের প্রভা, বিরল সংযত শান্ত কথা,

তাই দিয়ে আরবার পাই যেন তব অভ্যর্থনা

অমর্ত্যলোকের দ্বারে-- ব্যর্থ নাহি হোক এ কামনা।

 

 

  আষাঢ় ১৩২৯