বিজন রাতে যদি রে তোর সাহস থাকে দিনশেষের দোসর যে জন মিলবে তাকে। ঘনায় যবে আঁধার ছেয়ে অভয় মনে থাকিস চেয়ে-- আসবে দ্বারে আলোর দূতী নীরব ডাকে। যখন ঘরে আসনখানি শূন্য হবে দূরের পথে পায়ের ধ্বনি শুনবি তবে। কাটল প্রহর যাদের আশায় তারা যখন ফিরবে বাসায়, সাহানাগান বাজবে তখন ভিড়ের ফাঁকে।
অনেক চাওয়া ফিরলি চেয়ে আশায় ভুলি, আজ যদি তোর শূন্য হল ভিক্ষা-ঝুলি চমক তবে লাগুক তোরে, অধরা ধন দিক সে ভরে গোপন বঁধু, দেখতে কভু পাস নি যাকে। অভিসারের পথ বেড়ে যায় চলিস যত-- পথের মাঝে মায়ার ছায়া অনেক-মতো। বসবি যবে ক্লান্তিভরে আঁচল পেতে ধুলার 'পরে, হঠাৎ পাশে আসবে সে যে পথের বাঁকে। এবার তবে করিস সারা কাঙাল-পনা-- সমস্তদিন কাণাকড়ির হিসাব-গণা। শান্ত হলে মিলবে চাবি, অন্তরেতে দেখতে পাবি সবার শেষে তার পরে যে অশেষ থাকে। দূর বাঁশিতে যে সুর বাজে তাহার সাথে মিলিয়ে নিয়ে বাজাস বাঁশি বিদায়-রাতে। সহজ মনে যাত্রাশেষে যাস রে চলে সহজ হেসে, দিস নে ধরা অবসাদের জটিল পাকে।
১ গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে, নিভৃত নিরালা ঠাঁই, লেশমাত্র আলো নাই, লুকানো এ প্রেমসাধ গোপনে নিবসে, শুদ্ধ যবে ভালোবাসা নয়নে তোমার, ঈষৎ প্রদীপ্ত হয়, উচ্ছ্বসয়ে এ-হৃদয়, ভয়ে ভয়ে জড়সড় তখনি আবার। ২ শূন্য এই মরমের সমাধি-গহ্বরে, জ্বলিছে এ প্রেমশিখা চিরকাল-তরে, কেহ না দেখিতে পায়, থেকেও না থাকা প্রায়, নিভিবারও নাম নাই নিরাশার ঘোরে। ৩ যা হবার হইয়াছে-- কিন্তু প্রাণনাথ! নিতান্ত হইবে যবে এ শরীরপাত, আমার সমাধি-স্থানে কোরো নাথ কোরো মনে, রয়েছে এ এক দুঃখিনী হয়ে ধরাসাৎ। ৪ যত যাতনা আছে দলুক আমায়, সহজে সহিতে নাথ সব পারা যায়, কিন্তু হে তুমি-যে মোরে, ভুলে যাবে একেবারে সে কথা করিতে মনে হৃদি ফেটে যায়। ৫ রেখো তবে এই মাত্র কথাটি আমার, এই কথা শেষ কথা, কথা নাহি আর, (এ দেহ হইলে পাত, যদি তুমি প্রাণনাথ, প্রকাশো আমার তরে তিলমাত্র শোক, ধর্মত হবে না দোষী দোষিবে না লোক-- কাতরে বিনয়ে তাই, এই মাত্র ভিক্ষা চাই, কখনো চাহি নে আরো কোনো ভিক্ষা আর) যবে আমি যাব ম'রে, চির এ দুঃখিনী তরে, বিন্দুমাত্র অশ্রুজল ফেলো একবার-- আজন্ম এত যে ভালোবেসেছি তোমায়, সে প্রেমের প্রতিদান একমাত্র প্রতিদান, তা বই কিছুই আর দিয়ো না আমায়।
স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে, মনেও হয়নি তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা। তুমিও মূল্য করনি দাবি। দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত, দিলে ডালি উজাড় ক'রে। আড়চোখে চেয়ে আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে; পরদিনে মনে রইল না। নববসন্তের মাধবী যোগ দিয়েছিল তোমার দানের সঙ্গে, শরতের পূর্ণিমা দিয়েছিল তারে স্পর্শ। তোমার কালো চুলের বন্যায় আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে "তোমাকে যা দিই তোমার রাজকর তার চেয়ে অনেক বেশি; আরো দেওয়া হল না আরো যে আমার নেই।" বলতে বলতে তোমার চোখ এল ছলছলিয়ে। আজ তুমি গেছ চলে, দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত, তুমি আস না। এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে দেখছি তোমার রত্নমালা, নিয়েছি তুলে বুকে। যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা। তোমার প্রেমের দাম দেওয়া হল বেদনায়, হারিয়ে তাই পেলেম তোমায় পূর্ণ ক'রে।