জোড়াসাঁকো ১৭ বৈশাখ, ১৩০৪


 

বর্ষামঙ্গল


ঐ আসে ঐ  অতি ভৈরব  হরষে

জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভরভসে

     ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা

         শ্যামগম্ভীর সরসা।

গুরুগর্জনে নীল অরণ্য শিহরে,

উতলা কলাপী কেকাকলরবে বিহরে।

         নিখিলচিত্তহরষা

ঘনগৌরবে আসিছে মত্ত বরষা।

 

কোথা তোরা অয়ি তরুণী পথিকললনা,

জনপদবধূ তড়িৎচকিতনয়না,

     মালতীমালিনী কোথা প্রিয়পরিচারিকা,

         কোথা তোরা অভিসারিকা!

ঘনবনতলে এসো ঘননীলবসনা,

ললিত নৃত্যে বাজুক স্বর্ণরশনা,

         আনো বীণা মনোহারিকা।

     কোথা বিরহিণী, কোথা তোরা অভিসারিকা!

 

আনো মৃদঙ্গ, মুরজ, মুরলী মধুরা,

বাজাও শঙ্খ, হুলুরব করো বধূরা--

     এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী,

         ওগো প্রিয়সুখভাগিনী!

কুঞ্জকুটিরে, অয়ি ভাবাকুললোচনা,

ভূর্জপাতায় নব গীত করো রচনা

         মেঘমল্লার-রাগিণী।

     এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিণী!

 

কেতকীকেশরে কেশপাশ করো সুরভি,

ক্ষীণ কটিতটে গাঁথি লয়ে পরো করবী,

     কদম্বরেণু বিছাইয়া দাও শয়নে,

         অঞ্জন আঁকো নয়নে।

তালে তালে দুটি কঙ্কণ কনকনিয়া

ভবনশিখীরে নাচাও গনিয়া গনিয়া

         স্মিতবিকশিত বয়নে,

কদম্বরেণু বিছাইয়া ফুলশয়নে।

 

স্নিগ্ধসজল মেঘকজ্জল দিবসে

বিবশ প্রহর অচল অলস আবেশে,

     শশীতারাহীনা অন্ধতামসী যামিনী--

         কোথা তোরা পুরকামিনী!

আজিকে দুয়ার রুদ্ধ ভবনে ভবনে,

জনহীন পথ কাঁদিছে ক্ষুব্ধ পবনে,

         চমকে দীপ্ত দামিনী--

     শূন্যশয়নে কোথা জাগে পুরকামিনী!

 

যূথীপরিমল আসিছে সজল সমীরে,

ডাকিছে দাদুরী তমালকুঞ্জতিমিরে,

     জাগো সহচরী, আজিকার নিশি ভুলো না--

         নীপশাখে বাঁধো ঝুলনা।

কুসুমপরাগ ঝরিবে ঝলকে ঝলকে,

অধরে অধরে মিলন অলকে অলকে--

         কোথা পুলকের তুলনা।

নীপশাখে সখী ফুলডোরে বাঁধো ঝুলনা।

 

এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,

গগন ভরিয়া এসেছে ভুবনভরসা--

     দুলিছে পবনে সনসন বনবীথিকা,

         গীতিময় তরুলতিকা।

শতেক যুগের কবিদলে মিলি আকাশে

ধ্বনিয়া তুলিছে মত্তমদির বাতাসে

         শতেক যুগের গীতিকা--

     শতশতগীতমুখরিত বনবীথিকা।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •