মনে করো, তুমি থাকবে ঘরে, আমি যেন যাব দেশান্তরে। ঘাটে আমার বাঁধা আছে তরী, জিনিসপত্র নিয়েছি সব ভরি -- ভালো করে দেখ্ তো মনে করি কী এনে মা, দেব তোমার তরে। চাস কি মা, তুই এত এত সোনা -- সোনার দেশে করব আনাগোনা। সোনামতী নদীতীরের কাছে সোনার ফসল মাঠে ফ'লে আছে, সোনার চাঁপা ফোটে সেথায় গাছে -- না কুড়িয়ে আমি তো ফিরব না।
পরতে কি চাস মুক্তো গেঁথে হারে -- জাহাজ বেয়ে যাব সাগর-পারে। সেখানে মা, সকালবেলা হলে ফুলের 'পরে মুক্তোগুলি দোলে, টুপটুপিয়ে পড়ে ঘাসের কোলে -- যত পারি আনব ভারে ভারে। দাদার জন্যে আনব মেঘে-ওড়া পক্ষিরাজের বাচ্ছা দুটি ঘোড়া। বাবার জন্যে আনব আমি তুলি কনক-লতার চারা অনেকগুলি -- তোর তরে মা, দেব কৌটা খুলি সাত-রাজার-ধন মানিক একটি জোড়া।
একদা এ ভারতের কোন্ বনতলে কে তুমি মহান্ প্রাণ, কী আনন্দবলে উচ্চারি উঠিলে উচ্চে-- "শোনো বিশ্বজন, শোনো অমৃতের পুত্র যত দেবগণ দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহারে, মহান্ত পুরুষ যিনি আঁধারের পারে জ্যোতির্ময়। তাঁরে জেনে, তাঁর পানে চাহি মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পারো, অন্য পথ নাহি।' আরবার এ ভারতে কে দিবে গো আনি সে মহা আনন্দমন্ত্র, সে উদাত্তবাণী সঞ্জীবনী, স্বর্গে মর্তে সেই মৃত্যুঞ্জয় পরম ঘোষণা, সেই একান্ত নির্ভয় অনন্ত অমৃতবার্তা। রে মৃত ভারত, শুধু সেই এক আছে, নাহি অন্য পথ।
কেন চুপ করে আছি, কেন কথা নাই, শুধাইছ তাই। কথা দিয়ে ডেকে আনি যারে দেবতারে, বাহির দ্বারের কাছে এসে ফিরে যায় হেসে। মৌনের বিপুল শক্তিপাশে ধরা দিয়ে আপনে সে আসে আসে পরিপূর্ণতায় হৃদয়ের গভীর গুহায়। অধীর আহ্বানে রবাহূত প্রসাদের মূল্য হয় চ্যুত। স্বর্গ হতে বর, সেও আনে অসম্মান ভিক্ষার সমান। ক্ষুব্ধ বাণী যবে শান্ত হয়ে আসে দৈববাণী নামে সেই অবকাশে। নীরব আমার পূজা তাই, স্তবগান নাই; আর্দ্র স্বরে ঊর্ধ্বপানে চেয়ে নাহি ডাকে, স্তব্ধ হয়ে থাকে। হিমাদ্রিশিখরে নিত্য নীরবতা তার ব্যাপ্ত করি রহে চারি ধার; নির্লিপ্ত সে সুদূরতা বাক্যহীন বিশাল আহ্বান আকাশে আকাশে দেয় টান, মেঘপুঞ্জ কোথা থেকে অবারিত অভিষেকে অজস্র সহস্রধারে পুণ্য করে তারে। না-কওয়ার না-চাওয়ার সেই সাধনায় হয়ে লীন সার্থক শন্তিতে যাক দিন।