আণ্ডেস জাহাজ,  ২১ অক্টোবর, ১৯২৪


 

সমুদ্র


হে সমুদ্র, স্তব্ধচিত্তে শুনেছিনু গর্জন তোমার

রাত্রিবেলা; মনে হল গাঢ় নীল নিঃসীম নিদ্রার

স্বপ্ন ওঠে কেঁদে কেঁদে। নাই, নাই তোমার সান্ত্বনা;

যুগ যুগান্তর ধরি নিরন্তর সৃষ্টির যন্ত্রণা

তোমার রহস্য-গর্ভে ছিন্ন করি কৃষ্ণ আবরণ

প্রকাশ সন্ধান করে। কত মহাদ্বীপ মহাবন

এ তরল রঙ্গশালে রূপে প্রাণে কত নৃত্যে গানে

দেখা দিয়ে কিছুকাল, ডুবে গেছে নেপথ্যের পানে

নিঃশব্দ গভীরে। হারানো সে চিহ্নহারা যুগগুলি

মূর্তিহীন ব্যর্থতায় নিত্য অন্ধ আন্দোলন তুলি

হানিছে তরঙ্গ তব। সব রূপ সব নৃত্য তার

ফেনিল তোমার নীলে বিলীন দুলিছে একাকার।

স্থলে তুমি নানা গান উৎক্ষেপে করেছ আবর্জন,

জলে তব এক গান -- অব্যক্তের অস্থির গর্জন।

 

হে সমুদ্র, একা আমি মধ্যরাতে নিদ্রাহীন চোখে

কল্লোলমরুর মধ্যে দাঁড়াইয়া স্তব্ধ ঊর্ধ্বলোকে

চাহিলাম; শুনিলাম নক্ষত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাজে

আকাশের বিপুল ক্রন্দন; দেখিলাম শূন্যমাঝে

আঁধারের আলোকব্যগ্রতা। কত শত মন্বন্তরে

কত জ্যোতির্লোক গূঢ় বহ্নিময় বেদনার ভরে

অস্ফুটের আচ্ছাদন দীর্ণ করি তীক্ষ্ন রশ্মিঘাতে

কালের বক্ষের মাঝে পেল স্থান প্রোজ্বল প্রভাতে

প্রকাশ-উৎসবদিনে। যুগসন্ধ্যা কবে এল তার,

ডুবে গেল অলক্ষ্যে অতলে। রূপনিঃস্ব হাহাকার

অদৃশ্য বুভুক্ষু ভিক্ষু ফিরিছে বিশ্বের তীরে তীরে,

ধুলায় ধুলায় তার আঘাত লাগিছে ফিরে ফিরে।

ছিল যা প্রদীপ্তরূপে নানা ছন্দে বিচিত্র চঞ্চল

আজ অন্ধ তরঙ্গের কম্পনে হানিছে শূন্যতল।

 

হে সমুদ্র, চাহিলাম আপন গহন চিত্তপানে;

কোথায় সঞ্চয় তার, অন্ত তার কোথায় কে জানে।

ওই শোনো সংখ্যাহীন সংজ্ঞাহীন অজানা ক্রন্দন

অমূর্ত আঁধারে ফিরে, অকারণে জাগায় স্পন্দন

বক্ষতলে। এক কালে ছিল রূপ, ছিল বুঝি ভাষা;

বিশ্বগীতিনির্ঝরের তীরে তীরে বুঝি কত বাসা

বেঁধেছিল কোন্‌ জন্মে - দুঃখে সুখে নানা বর্ণে রাঙি

তাহাদের রঙ্গমঞ্চ হঠাৎ পড়িল কবে ভাঙি

অতৃপ্ত আশার ধূলিস্তূপে। আকার হারালো তারা,

আবাস তাদের নাহি। খ্যাতিহারা সেই স্মৃতিহারা

সৃষ্টিছাড়া ব্যর্থ ব্যথা প্রাণের নিভৃত লীলাঘরে

কোণে কোণে ঘোরে শুধু মূর্তি-তরে, আশ্রয়ের তরে।

রাগে অনুরাগে যারা বিচিত্র আছিল কত রূপে,

আজ শূন্য দীর্ঘশ্বাস আঁধারে ফিরিছে চুপে চুপে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •