লিসবন বন্দর। আণ্ডেস জাহাজ,  ২০ অক্টোবর, ১৯২৪


 

স্বপ্ন


তোমায় আমি দেখি নাকো, শুধু তোমার স্বপ্ন দেখি --

তুমি আমায় বারে বারে শুধাও, "ওগো, সত্য সে কি?'

            কী জানি গো, হয়তো বুঝি

            তোমার মাঝে কেবল খুঁজি

এই জনমের রূপের তলে আর-জনমের ভাবের স্মৃতি।

            হয়তো হেরি তোমার চোখে

            আদিযুগের ইন্দ্রলোকে

শিশুচাঁদের পথ-ভোলানো পারিজাতের ছায়াবীথি।

এই কূলেতে ডাকি যখন সাড়া যে দাও সেই ওপারে,

পরশ তোমার ছাড়িয়ে কায়া বাজে মায়ার বীণার তারে।

            হয়তো হবে সত্য তাই,

হয়তো তোমার স্বপন, আমার আপন মনের মত্ততাই।

 

আমি বলি স্বপ্ন যাহা তার চেয়ে কি সত্য আছে।

যে তুমি মোর দূরের মানুষ সেই তুমি মোর কাছের কাছে।

            সেই তুমি আর নও তো বাঁধন,

            স্বপ্নরূপে মুক্তিসাধন,

ফুলের সাথে তারার সাথে তোমার সাথে সেথায় মেলা।

            নিত্যকালের  বিদেশিনী,

            তোমায় চিনি, নাই বা চিনি,

তোমার লীলায় ঢেউ তুলে যায় কভু সোহাগ, কভু হেলা।

চিত্তে তোমার মূর্তি নিয়ে ভাবসাগরের খেয়ায় চড়ি।

বিধির মনের কল্পনারে আপন মনে নতুন গড়ি।

            আমার কাছে সত্য তাই,

মন-ভরানো পাওয়ায় ভরা বাইরে-পাওয়ার ব্যর্থতাই।

 

আপনি তুমি দেখেছ কি আপন-মাঝে সত্য কী যে।

দিতে যদি চাও তা কারে, দিতে কি তাই পারো নিজে।

            হয়তো তারে দুঃখদিনে

            অগ্নি-আলোয় পাবে চিনে,

তখন তোমার নিবিড় বেদন নিবেদনের জ্বালবে শিখা।

            অমৃত যে হয় নি মথন,

            তাই তোমাতে এই অযতন;

তাই তোমারে ঘিরে আছে ছলন-ছায়ার কুহেলিকা।

নিত্যকালের আপন তোমায় লুকিয়ে বেড়ায় মিথ্যা সাজে,

ক্ষণে ক্ষণে ধরা পড়ে শুধু আমার স্বপন-মাঝে।

            আমি জানি সত্য তাই --

মরণ-দুঃখে অমর জাগে, অমৃতেরই তত্ত্ব তাই।

 

পুষ্পমালার গ্রন্থিখানা অনাদরে পড়ুক ছিঁড়ে,

ফুরাক বেলা, জীর্ণ খেলা হারাক হেলাফেলার ভিড়ে।

            ছল করে যা পিছু ডাকে

            পিছন ফিরে চাস নে তাকে,

ডাকে না যে যাবার বেলায় যাস নে তাহার পিছে পিছে।

            যাওয়া- আসা-পথের ধুলায়

            চপল পায়ের চিহ্নগুলায়

গ'নে গ'নে আপন মনে কাটাস নে দিন মিছে মিছে।

কী হবে তোর বোঝাই করে ব্যর্থ দিনের আবর্জনা;

স্বপ্ন শুধুই মর্তে অমর, আর সকলই বিড়ম্বনা।

            নিত্য প্রাণের সত্য তাই --

প্রাণ দিয়ে তুই রচিস যারে, অসীম পথের পথ্য তাই।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •