Home > Plays > চিরকুমার-সভা > চিরকুমার সভা
Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | SINGLE PAGE

চিরকুমার সভা    

গান

 

যারে       মরণদশায় ধরে

সে যে শতবার করে মরে।

   পোড়া পতঙ্গ যত পোড়ে তত

       আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

 

 

প্রথম অঙ্ক


প্রথম দৃশ্য


অক্ষয়ের বৈঠকখানা

 

অক্ষয় ও পুরবালা

 

পুরবালা।

তোমার নিজের বোন হলে দেখতুম কেমন চুপ করে বসে থাকতে। এত দিনে এক-একটির তিনটি-চারটি করে পাত্র জুটিয়ে আনতে। ওরা আমার বোন কিনা--

 

অক্ষয়।

মানবচরিত্রের কিছুই তোমার কাছে লুকোনো নেই। নিজের বোনে এবং স্ত্রীর বোনে যে কত প্রভেদ তা এই কাঁচা বয়সেই বুঝে নিয়েছ। তা ভাই, শ্বশুরের কোনো কন্যাটিকেই পরের হাতে সমর্পণ করতে কিছুতেই মন সরে না-- এ বিষয়ে আমার ঔদার্যের অভাব আছে তা স্বীকার করতে হবে।

 

পুরবালা।

দেখো, তোমার সঙ্গে আমার একটা বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে।

 

অক্ষয়।

একটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত তো মন্ত্র পড়ে বিবাহের দিনেই হয়ে গেছে, আবার আর একটা!

 

পুরবালা।

ওগো, এটা তত ভয়ানক নয়। এটা হয়তো তেমন অসহ্য না হতেও পারে।

 

অক্ষয়।

সখী, তবে খুলে বলো।

 

গান

 

কী জানি কী ভেবেছ মনে

খুলে বলো ললনে।

কী কথা হায় ভেসে যায় ওই

ছলছল নয়নে।

 

 

পুরবালা।

ওস্তাদজি, থামো। আমার প্রস্তাব এই যে দিনের মধ্যে একটা সময় ঠিক করো যখন তোমার ঠাট্টা বন্ধ থাকবে, যখন তোমার সঙ্গে দুটো-একটা কাজের কথা হতে পারবে।

 

অক্ষয়।

গরিবের ছেলে, স্ত্রীকে কথা বলতে দিতে ভরসা হয় না, পাছে খপ্‌ করে বাজুবন্ধ চেয়ে বসে।

 

গান

 

পাছে    চেয়ে বসে আমার মন

আমি    তাই ভয়ে ভয়ে থাকি।

পাছে    চোখে চোখে পড়ে বাঁধা

আমি   তাই তো তুলি নে আঁখি।

 

 

পুরবালা।

তবে যাও।

 

অক্ষয়।

না না, রাগারাগি না। আচ্ছা, যা বল তাই শুনব। খাতায় নাম লিখিয়ে তোমার ঠাট্টানিবারণী সভার সভ্য হব। তোমার সামনে কোনো রকমের বেয়াদবি করব না। তা, কী কথা হচ্ছিল। শ্যালীদের বিবাহ। উত্তম প্রস্তাব।

 

পুরবালা।

দেখো, এখন বাবা নেই। মা তোমারই মুখ চেয়ে আছেন। তোমারই কথা শুনে এখনো তিনি বেশি বয়স পর্যন্ত মেয়েদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। এখন যদি সৎপাত্র না জুটিয়ে দিতে পার তা হলে কী অন্যায় হবে ভেবে দেখো দেখি।

 

অক্ষয়।

আমি তো তোমাকে বলেইছি তোমরা কোনো ভাবনা কোরো না। আমার শ্যালীপতিরা গোকুলে বাড়ছেন।

 

পুরবালা।

গোকুলটি কোথায়।

 

অক্ষয়।

যেখান থেকে এই হতভাগ্যকে তোমার গোষ্ঠে ভর্তি করেছ। আমাদের সেই চিরকুমার-সভা।

 

পুরবালা।

প্রজাপতির সঙ্গে তাদের যে লড়াই।

 

অক্ষয়।

দেবতার সঙ্গে লড়াই করে পারবে কেন। তাঁকে কেবল চটিয়ে দেয় মাত্র। সেইজন্যে ভগবান প্রজাপতির বিশেষ ঝোঁক ঐ সভাটার উপরেই। সরা-চাপা হাঁড়ির মধ্যে মাংস যেমন গুমে গুমে সিদ্ধ হতে থাকে প্রতিজ্ঞার মধ্যে চাপা থেকে সভ্যগুলিও একেবারে হাড়ের কাছ পর্যন্ত নরম হয়ে উঠেছেন, দিব্যি বিবাহযোগ্য হয়ে এসেছেন-- এখন পাতে দিলেই হয়। আমিও তো এক কালে ঐ সভার সভাপতি ছিলুম।

 

পুরবালা।

তোমার কী রকম দশাটা হয়েছিল।

 

অক্ষয়।

সে আর কী বলব। প্রতিজ্ঞা ছিল স্ত্রী শব্দ পর্যন্ত মুখে উচ্চারণ করব না, কিন্তু শেষকালে এমনি হল যে মনে হত শ্রীকৃষ্ণের ষোলো-শো গোপিনী যদি বা সম্প্রতি দুষ্প#f হন অন্তত মহাকালীর চৌষট্টি হাজার যোগিনীর সন্ধান পেলেও একবার পেট ভরে প্রেমালাপটা করে নিই-- ঠিক সেই সময়টাতেই তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হল আর-কি!

 

পুরবালা।

চৌষট্টি হাজারের শখ মিটল?

 

অক্ষয়।

সে আর তোমার মুখের সামনে বলব না। জাঁক হবে। তবে ইশারায় বলতে পারি, মা কালী দয়া করেছেন বটে।

 

পুরবালা।

তবে আমিও বলি, বাবা ভোলানাথের নন্দীভৃঙ্গীর অভাব ছিল না, আমাকে বুঝি তিনি দয়া করেছিলেন।

 

অক্ষয়।

তা হতে পারে, সেইজন্যেই কার্তিকটি পেয়েছ।

 

পুরবালা।

আবার ঠাট্টা শুরু হল?

 

অক্ষয়।

কার্তিকের কথাটা বুঝি ঠাট্টা? গা ছুঁয়ে বলছি, ওটা আমার অন্তরের বিশ্বাস।

 

শৈলবালার প্রবেশ

 

শৈলবালা।

মুখুজ্জেমশায়, এইবার তোমার ছোটো দুটি শ্যালীকে রক্ষা করো।

 

অক্ষয়।

যদি অরক্ষণীয়া হয়ে থাকেন তো আমি আছি। ব্যাপারটা কী।

 

শৈলবালা।

মার কাছে তাড়া খেয়ে রসিকদাদা কোথা থেকে একজোড়া কুলীনের ছেলে এনে হাজির করেছেন, মা স্থির করেছেন তাদের সঙ্গেই তাঁর দুই মেয়ের বিবাহ দেবেন।

 

অক্ষয়।

ওরে বাস রে। একেবারে বিয়ের এপিডেমিক। প্লেগের মতো। এক বাড়িতে একসঙ্গে দুই কন্যেকে আক্রমণ। ভয় হয় পাছে আমাকেও ধরে!

 

গান

 

বড়ো থাকি কাছাকাছি,

তাই ভয়ে ভয়ে আছি।

নয়ন বচন কোথায় কখন বাজিলে বাঁচি না-বাঁচি।

 

 

শৈলবালা।

এই কি তোমার গান গাবার সময় হল।

 

অক্ষয়।

কী করব ভাই। রোশনচৌকি বাজাতে শিখি নি, তা হলে ধরতুম। বল কী। শুভকর্ম! দুই শ্যালীর উদ্‌বাহবন্ধন! কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কেন।

 

শৈলবালা।

বৈশাখ মাসের পর আসছে বছরে অকাল পড়বে, আর বিয়ের দিন নেই।

 

পুরবালা।

তোরা আগে থাকতে ভাবিস কেন শৈল, পাত্র আগে দেখা যাক তো।

 

জগত্তারিণীর প্রবেশ

 

জগত্তারিণী।

বাবা অক্ষয়।

 

অক্ষয়।

কী মা।

 

জগত্তারিণী।

তোমার কথা শুনে আর তো মেয়েদের রাখতে পারি নে।

 

শৈলবালা।

মেয়েদের রাখতে পার না বলেই কি মেয়েদের ফেলে দেবে মা।

 

জগত্তারিণী।

ঐ তো। তোদের কথা শুনলে গায়ে জ্বর আসে। বাবা অক্ষয়, শৈল বিধবা মেয়ে, ওকে এত পড়িয়ে, পাস করিয়ে, কী হবে বলো দেখি। ওর এত বিদ্যের দরকার কী।

 

অক্ষয়।

মা, শাস্ত্রে লিখেছে, মেয়েমানুষের একটা-না-একটা কিছু উৎপাত থাকা চাই-- হয় স্বামী, নয় বিদ্যে, নয় হিস্টিরিয়া। দেখো-না, লক্ষ্মীর আছেন বিষ্ণু, তাঁর আর বিদ্যের দরকার হয় নি, তাই স্বামীটিকে এবং পেঁচাটিকে নিয়েই আছেন; আর সরস্বতীর স্বামী নেই, কাজেই তাঁকে বিদ্যে নিয়ে থাকতে হয়।

 

জগত্তারিণী।

তা, যা বল বাবা, আসছে বৈশাখে মেয়েদের বিয়ে দেবই।

 

পুরবালা।

হাঁ মা, আমারও সেই মত। মেয়েমানুষের সকাল সকাল বিয়ে হওয়াই ভালো।

 

অক্ষয়।

(জনান্তিকে) তা তো বটেই। বিশেষত যখন একাধিক স্বামী শাস্ত্রে নিষেধ তখন সকাল সকাল বিয়ে করে সময়ে পুষিয়ে নেওয়া চাই।

 

পুরবালা।

আঃ কী বকছ। মা শুনতে পাবেন।

 

জগত্তারিণী।

রসিককাকা আজ পাত্র দেখাতে আসবেন। তা, চল্‌ মা পুরি, তাদের জলখাবার ঠিক করে রাখিগে।

 

[ জগত্তারিণী ও পুরবালার প্রস্থান

 

শৈলবালা।

আর তো দেরি করা যায় না মুখুজ্জেমশায়। এইবার তোমার সেই চিরকুমার-সভার বিপিনবাবু শ্রীশবাবুকে বিশেষ একটু তাড়া না দিলে চলছে না। আহা, ছেলে দুটি চমৎকার। আমাদের নেপো আর নীরর সঙ্গে দিব্যি মানায়। তুমি তো চৈত্রমাস যেতে না-যেতে আপিস ঘাড়ে করে সিমলে যাবে, এবারে মাকে ঠেকিয়ে রাখা শক্ত হবে।

 

অক্ষয়।

কিন্তু, তাই ব'লে সভাটিকে হঠাৎ অসময়ে তাড়া লাগালে যে চমকে যাবে। ডিমের খোলা ভেঙে ফেললেই কিছু পাখি বেরোয় না। যথোচিত তা দিতে হবে, তাতে সময় লাগে।

 

শৈলবালা।

বেশ তো, তা দেবার ভার আমি নেব মুখুজ্জেমশায়।

 

অক্ষয়।

আর-একটু খোলসা করে বলতে হচ্ছে।

 

শৈলবালা।

ঐ তো দশ নম্বরে ওদের সভা? আমাদের ছাদের উপর দিয়ে দেখন-হাসির বাড়ি পেরিয়ে ওখানে ঠিক যাওয়া যাবে। আমি পুরুষবেশে ওদের সভার সভ্য হব, তার পরে সভা কতদিন টেঁকে আমি দেখে নেব।

 

অক্ষয়।

তা হলে জন্মটা বদলে নিয়ে আর-একবার সভ্য হব। একবার তোমার দিদির হাতে নাকাল হয়েছি, এবার তোমার হাতে। কুমার হবার সুখটাই ঐ-- কটাক্ষবাণগুলোকে লক্ষ্যভেদ করবার সুযোগ দেওয়া যায়।

 

শৈলবালা।

ছি মুখুজ্জেমশায়, তুমি সেকেলে হয়ে যাচ্ছ। ঐ-সব নয়নবাণ-টান-গুলোর এখন কি আর চলন আছে। যুদ্ধবিদ্যার যে এখন অনেক বদল হয়ে গেছে।

 

নৃপবালা ও নীরবালার প্রবেশ

 

নৃপ শান্ত স্নিগ্ধ, নীর তাহার বিপরীত-- কৌতুকে এবং চাঞ্চল্যে সে সর্বদাই আন্দোলিত

 

নীরবালা।

(শৈলকে জড়াইয়া ধরিয়া) মেজদিদিভাই, আজ কারা আসবে বল্‌ তো।

 

নৃপবালা।

মুখুজ্জেমশায়, আজ কি তোমার বন্ধুদের নিমন্ত্রণ আছে। জলখাবারের আয়োজন হচ্ছে কেন।

 

অক্ষয়।

ঐ তো! বই পড়ে পড়ে চোখ কানা করলে-- পৃথিবীর আকর্ষণে উল্কাপাত কী করে ঘটে সে-সমস্ত লাখ-দুলাখ ক্রোশের খবর রাখ, আর আজ ১৮ নম্বর মধুমিস্ত্রির গলিতে কার আকর্ষণে কে এসে পড়ছে সেটা অনুমান করতেও পারলে না?

 

নীরবালা।

বুঝেছি ভাই সেজদিদি। তোর বর আসছে ভাই, তাই সকালবেলা আমার বাঁ চোখ নাচছিল।

 

নৃপবালা।

তোর বাঁ চোখ নাচলে আমার বর আসবে কেন।

 

নীরবালা।

তা ভাই, আমার বাঁ চোখটা নাহয় তোর বরের জন্যে নেচে নিলে, তাতে আমি দুঃখিত নই। কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, জলখাবার তো দুটি লোকের জন্যে দেখলুম, সেজদিদি কি স্বয়ম্বরা হবে নাকি।

 

অক্ষয়।

আমাদের ছোড়দিদিও বঞ্চিত হবেন না।

 

নীরবালা।

আহা মুখুজ্জেমশায়, কী সুসংবাদ শোনালে। তোমাকে কী বকশিশ দেব। এই নাও আমার গলার হার, আমার দু হাতের বালা।

 

শৈলবালা।

আঃ ছি, হাত খালি করিস নে।

 

নীরবালা।

আজ আমাদের বরের অনারে পড়ার ছুটি দিতে হবে মুখুজ্জেমশায়।

 

নৃপবালা।

আঃ, কী বর বর করছিস। দেখো তো ভাই মেজদিদি।

 

অক্ষয়।

ওকে ঐজন্যেই তো বর্বরা নাম দিয়েছি। অয়ি বর্বরে, ভগবান তোমাদের কটি সহোদরাকে এই একটি অক্ষয় বর দিয়ে রেখেছেন, তবু তৃপ্তি নেই?

 

নীরবালা।

সেইজন্যেই তো লোভ বেড়ে গেছে।

 

নৃপ তাহাকে টানিয়া লইয়া চলিল

 

(চলিতে চলিতে) এলে খবর দিয়ো মুখুজ্জেমশায়, ফাঁকি দিয়ো না। দেখছ তো সেজদিদি কিরকম চঞ্চল হয়ে উঠেছে।--

 

গান

 

না ব'লে যায় পাছে সে

   আঁখি মোর ঘুম না জানে।

 

 

অক্ষয়।

ভয় নেই, ভয় নেই। একটা যায় তো আর-একটা আসবে। যে বিধাতা আগুন সৃষ্টি করেছেন পতঙ্গও তিনিই জুটিয়ে দেবেন। এখন গানটা চলুক।

 

নীরবালা।

কাছে তার রই, তবুও

        ব্যথা যে রয় পরানে।

 

 

অক্ষয়।

নীরু, এটা তো আগন্তুকদের লক্ষ্য করে তৈরি হয় নি। কাছের মানুষটি কে বলো তো।

 

নীরবালা।

যে পথিক পথের ভুলে

এল মোর প্রাণের কূলে

পাছে তার ভুল ভেঙে যায়

             চলে যায় কোন্‌ উজানে,

              আঁখি মোর ঘুম না জানে।

 

 

অক্ষয়।

এ তো আমার সঙ্গে মিলছে। কিন্তু ভাই, জেনেশুনেই পথ ভুলেছি, সুতরাং সে ভুল ভাঙবার রাস্তা রাখি নি।

 

নীরবালা।

এল যেই এল আমার আগল টুটে,

খোলা দ্বার দিয়ে আবার যাবে ছুটে।

খেয়ালের হাওয়া লেগে

যে খেপা ওঠে জেগে  

   সে কি আর সেই অবেলায়

         মিনতির বাধা মানে।

             আঁখি মোর ঘুম না জানে।

 

 

অক্ষয়।

গান

 

না, না গো, না

কোরো না ভাবনা--

যদি বা নিশি যায় যাব না, যাব না।

যখনি চলে যাই

আসিব বলে যাই,

আলো ছায়ার পথে করি আনাগোনা।

দোলাতে দোলে মন মিলনে বিরহে।

বারে বারেই জানি তুমি তো চির হে।

ক্ষণিক আড়ালে

বারেক দাঁড়ালে

মরি ভয়ে ভয়ে পাব কি পাব না।

 

 

নীরবালা।

বড়ো নিশ্চিন্ত হলুম। তা হলে ঘুমোতে পারি।

 

অক্ষয়।

নির্ভয়ে।

 

[ নৃপবালা ও নীরবালার প্রস্থান

 

শৈলবালা।

মুখুজ্জেমশায়, আমি ঠাট্টা করছি নে-- আমি চিরকুমার-সভার সভ্য হব। কিন্তু আমার সঙ্গে পরিচিত একজন কাউকে চাই তো। তোমার বুঝি আর সভ্য হবার জো নেই?

 

অক্ষয়।

না, আমি পাপ করেছি। তোমার দিদি আমার তপস্যা ভঙ্গ করে আমাকে স্বর্গ হতে বঞ্চিত করেছেন।

 

শৈলবালা।

তা হলে রসিকদাদাকে ধরতে হচ্ছে। তিনি তো কোনো সভার সভ্য না হয়েও চিরকুমার-ব্রত রক্ষা করেছেন।

 

অক্ষয়।

সভ্য হলেই এই বুড়োবয়সে ব্রতটি খোয়াবেন। ইলিশমাছ অমনি দিব্যি থাকে, ধরলেই মারা যায়; প্রতিজ্ঞাও ঠিক তাই, তাকে বাঁধলেই তার সর্বনাশ।

 

রসিকের প্রবেশ

 

রসিকদাদার সম্মুখের মাথায় টাক, গোঁফ পাকা, গৌরবর্ণ, দীর্ঘাকৃতি

 

অক্ষয়।

ওরে পাষণ্ড, ভণ্ড, অকালকুষ্মাণ্ড।

 

রসিক।

কেন হে মত্তমন্থর কুঞ্জকুঞ্জর পুঞ্জঅঞ্জনবর্ণ।

 

অক্ষয়।

তুমি আমার শ্যালী-পুষ্পবনে দাবানল আনতে চাও?

 

শৈলবালা।

রসিকদাদা, তোমারই বা তাতে কী লাভ।

 

রসিক।

ভাই, সইতে পারলুম না, কী করি। বছরে বছরেই তোর বোনদের বয়স বাড়ছে, বড়োমা আমারই দোষ দেন কেন। বলেন, দুবেলা বসে বসে কেবল খাচ্ছ, মেয়েদের জন্যে দুটো বর দেখে দিতে পার না। আচ্ছা ভাই, আমি না খেতে রাজি আছি, তা হলেই বর জুটবে, না তোর বোনদের বয়স কমতে থাকবে? এ দিকে যে-দুটির বর জুটছে না তাঁরা তো দিব্যি খাচ্ছেন দাচ্ছেন। শৈলভাই, কুমারসম্ভবে পড়েছিস, মনে আছে তো?--

 

স্বয়ং বিশীর্ণদ্রুমপর্ণবৃত্তিতা

পরা হি কাষ্ঠা তপসস্তয়া পুনঃ।

তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং

বদন্ত্যপর্ণেতি চ তাং পুরাবিদঃ।

 

 

তা ভাই, দুর্গা নিজের বর খুঁজতে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে তপস্যা করেছিলেন; কিন্তু নাতনীদের বর জুটছে না বলে আমি বুড়োমানুষ খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেব, বড়োমার এ কী বিচার। আহা শৈল, ওটা মনে আছে তো? তদপ্যপাকীর্ণমতঃ প্রিয়ংবদাং--

 

শৈলবালা।

মনে আছে দাদা, কিন্তু কালিদাস এখন ভালো লাগছে না।

 

রসিক।

তা হলে তো অত্যন্ত দুঃসময় বলতে হবে।

 

শৈলবালা।

তাই তোমার সঙ্গে পরামর্শ আছে।

 

রসিক।

তা, রাজি আছি ভাই। যেরকম পরামর্শ চাও তাই দেব। যদি হাঁ বলাতে চাও হাঁ বলব, না বলাতে চাও না বলব। আমার এই গুণটি আছে। আমি সকলের মতের সঙ্গে মত দিয়ে যাই বলেই সবাই আমাকে প্রায় নিজের মতোই বুদ্ধিমান ভাবে।

 

অক্ষয়।

তুমি অনেক কৌশলে তোমার পসার বাঁচিয়ে রেখেছ, তার মধ্যে তোমার এই টাক একটি।

 

রসিক।

আর- একটি হচ্ছে "যাবৎ কিঞ্চিন্ন ভাষতে'-- তা, আমি বাইরের লোকের কাছে বেশি কথা কই নে।

 

শৈলবালা।

সেইটে বুঝি আমাদের কাছে পুষিয়ে নাও?

 

রসিক।

তোদের কাছে যে ধরা পড়েছি।

 

শৈলবালা।

ধরা যদি পড়ে থাক তো চলো, যা বলি তাই করতে হবে।

 

রসিক।

ভয় নেই দিদি। এমন দুটি কুলীনের ছেলে জোগাড় করেছি কন্যাদায়ের দুঃখের চেয়েও যারা হাজারগুণ অসহ্য। তাদের দেখলে বড়োমা তাঁর মেয়েদের জন্য এ বাড়িতে চিরকুমারী-সভা স্থাপন করবেন। যাই, তিনি ডেকে পাঠিয়েছেন। [ প্রস্থান

 

শৈলবালা।

মুখুজ্জেমশায়।

 

অক্ষয়।

আজ্ঞা করো।

 

শৈলবালা।

কুলীনের ছেলে দুটোকে কোনো ফিকিরে তাড়াতে হবে।

 

অক্ষয়।

তা তো হবেই।--

 

গান

 

দেখব কে তোর কাছে আসে--

তুই রবি একেশ্বরী, একলা আমি রইব পাশে।

 

 

শৈলবালা।

(হাসিয়া) একেশ্বরী?

 

অক্ষয়।

নাহয় তোমরা চার ঈশ্বরীই হলে, শাস্ত্রে আছে : অধিকন্তু ন দোষায়।

 

শৈলবালা।

আর, তুমিই একলা থাকবে? ওখানে বুঝি অধিকন্তু খাটে না?

 

অক্ষয়।

ওখানে শাস্ত্রের আর-একটা পবিত্র বচন আছে সর্বমত্যন্তগর্হিতং।

 

শৈলবালা।

কিন্তু মুখুজ্জেমশায়, ও পবিত্র বচনটা তো বরাবর খাটবে না। আরো সঙ্গী জুটবে।

 

অক্ষয়।

তোমাদের এই একটি শালার জায়গায় দশশালা বন্দোবস্ত হবে? তখন আবার নূতন কার্যবিধি দেখা যাবে। ততদিন কুলীনের ছেলেটেলেগুলোকে ঘেঁষতে দিচ্ছি নে।

 

চাকরের প্রবেশ

 

চাকর।

দুটি বাবু এসেছে।

 

[ প্রস্থান

 

শৈলবালা।

ঐ বুঝি তারা এল। দিদি আর মা ভাঁড়ারে ব্যস্ত আছেন, তাঁদের অবকাশ হবার পূর্বেই ওদের কোনোমতে বিদায় করে দিয়ো।

 

অক্ষয়।

কী বকশিশ মিলবে।

 

শৈলবালা।

আমরা তোমার সব শালীরা মিলে তোমাকে "শালীবাহন রাজা' খেতাব দেব।

 

অক্ষয়।

শালীবাহন দি সেকেণ্ড্‌?

 

শৈলবালা।

সেকেণ্ড হতে যাবে কেন। সে শালীবাহনের নাম ইতিহাস থেকে একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তুমি হবে শালীবাহন দি গ্রেট।

 

অক্ষয়।

বল কী। আমার রাজ্যকাল থেকে জগতে নূতন সাল প্রচলিত হবে?

 

গান

 

[ শৈলবালার প্রস্থান

 

মৃত্যুঞ্জয় ও দারুকেশ্বরের প্রবেশ

 

একটি বিসদৃশ লম্বা, রোগা, বুটজুতা-পরা, ধুতি প্রায় হাঁটুর কাছে উঠিয়াছে, চোখের নীচে কালি

 

পড়া, ম্যালেরিয়া রোগীর চেহারা, বয়স বাইশ হইতে বত্রিশ পর্যন্ত যেটা খুশি হইতে পারে।

 

আর-একটি বেঁটে খাটো, অত্যন্ত দাড়ি-গোঁফ-সংকুল, নাকটি বটিকাকার, কপালটি

 

ঢিবি, কালোকোলো, গোলগাল

 

অক্ষয়।

(অত্যন্ত সৌহার্দ্য-সহকারে উঠিয়া প্রবলবেগে শেক্‌হ্যাণ্ড করিয়া) আসুন মিস্টার ন্যাথানিয়াল, আসুন মিস্টার জেরেমায়া, বসুন বসুন। ওরে, বরফ-জল নিয়ে আয় রে, তামাক দে--

 

মৃত্যুঞ্জয়।

(সহসা বিজাতীয় সম্ভাষণে সংকুচিত হইয়া মৃদুস্বরে) আজ্ঞে আমার নাম মৃত্যুঞ্জয় গাঙ্গুলি।

 

দারুকেশ্বর।

আমার নাম শ্রীদারুকেশ্বর মুখোপাধ্যায়।

 

অক্ষয়।

ছি মশায়। ও নামগুলো এখনো ব্যবহার করেন বুঝি? আপনাদের ক্রিশ্চান নাম? (আগন্তুকদিগকে হতবুদ্ধি নিরুত্তর দেখিয়া) এখনো বুঝি নামকরণ হয় নি? তা, তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না, ঢের সময় আছে।

 

অক্ষয়ের গুড়গুড়ির নল মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে প্রদান। সে লোকটা ইতস্তত করিতেছে দেখিয়া

 

বিলক্ষণ! আমার সামনে আবার লজ্জা। সাত বছর বয়স থেকে লুকিয়ে তামাক খেয়ে পেকে উঠেছি। ধোঁয়া লেগে লেগে বুদ্ধিতে ঝুল পড়ে গেল। লজ্জা যদি করতে হয় তা হলে আমার তো আর ভদ্রসমাজে মুখ দেখাবার জো থাকে না।

 

তখন সাহস পাইয়া দারুকেশ্বর মৃত্যুঞ্জয়ের হাত হইতে ফস করিয়া নল কাড়িয়া লইয়া ফড়্‌ ফড়্‌ শব্দে টানিতে আরম্ভ করিল। অক্ষয় পকেট হইতে কড়া বর্মার চুরোট বাহির করিয়া মৃত্যুঞ্জয়ের হাতে দিলেন। যদিচ তাহার চুরোট অভ্যাস ছিল না, তবু সে সদ্যস্থাপিত ইয়ার্কির খাতিরে প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করিয়া মৃদুমন্দ টান দিতে লাগিল এবং কোনো গতিকে কাশি চাপিয়া রাখিল

 

অক্ষয়।

এখন কাজের কথাটা শুরু করা যাক। কী বলেন।

 

দারুকেশ্বর।

তা নয় তো কী। শুভস্য শীঘ্রং।

 

অক্ষয়।

(গম্ভীর হইয়া) মুর্গি না মটন?

 

মৃত্যুঞ্জয় অবাক হইয়া মাথা চুলকাইতে লাগিল

 

দারুকেশ্বর কিছু না বুঝিয়া অপরিমিত হাসিতে আরম্ভ করিল

 

আরে মশায়, নাম শুনেই হাসি। তা হলে তো গন্ধে অজ্ঞান এবং পাতে পড়লে মারাই যাবেন। তা, যেটা হয় মনস্থির করে বলুন-- মুর্গি হবে না মটন হবে।

 

তখন দুজনে বুঝিল আহারের কথা হইতেছে। ভীরু মৃত্যুঞ্জয় নিরুত্তর হইয়া ভাবিতে লাগিল দারুকেশ্বর লালায়িত রসনায় একবার চারি দিকে চাহিয়া দেখিল

 

ভয় কিসের মশায়। নাচতে বসে ঘোমটা?

 

দারুকেশ্বর।

(দুই হাতে দুই পা চাপড়াইয়া, হাসিয়া) তা মুর্গিই ভালো, কট্‌লেট, কী বলেন।

 

মৃত্যুঞ্জয়।

(সাহস পাইয়া) মটনটাই বা মন্দ কী ভাই। চপ!

 

অক্ষয়।

ভয় কী দাদা, দু'ই হবে। দোমনা করে খেয়ে সুখ হয় না। (চাকরকে ডাকিয়া) ওরে, মোড়ের মাথায় যে হোটেল আছে সেখান থেকে কলিমদ্দি খানসামাকে ডেকে আন্‌ দেখি। (বুড়ো আঙুল দিয়া মৃত্যুঞ্জয়ের গা টিপিয়া মৃদুস্বরে) বিয়ার না শেরি?

 

মৃত্যুঞ্জয় লজ্জিত হইয়া মুখ বাঁকাইল

 

দারুকেশ্বর।

হুইস্কির বন্দোবস্ত নেই বুঝি?

 

অক্ষয়।

(পিঠ চাপড়াইয়া) নেই তো কী। বেঁচে আছি কী করে।

 

গান

 

ক্ষীণপ্রকৃতি মৃত্যুঞ্জয়ও প্রাণপণে হাস্য করা কর্তব্য বোধ করিল

 

এবং দারুকেশ্বর ফস করিয়া একটা বই টানিয়া লইয়া টপাটপ বাজাইতে আরম্ভ করিল

 

দারুকেশ্বর।

দাদা, ওটা শেষ করে ফেলো।

 

গান

 

অভয় দাও তো বলি আমার wishকী--

 

 

অক্ষয়।

(মৃত্যুঞ্জয়কে ঠেলা দিয়া) ধরো- না হে, তুমিও ধরো।

 

সলজ্জ মৃত্যুঞ্জয় নিজের প্রতিপত্তি রক্ষার জন্য মৃদুস্বরে যোগ দিল

 

অক্ষয় ডেস্ক চাপড়াইয়া বাজাইতে লাগিলেন-- এক জায়গায় হঠাৎ থামিয়া, গম্ভীর হইয়া

 

হাঁ, হাঁ, আসল কথাটা জিজ্ঞাসা করা হয় নি। এ দিকে তো সব ঠিক, এখন আপনারা কী হলে রাজি হন।

 

দারুকেশ্বর।

আমাদের বিলেতে পাঠাতে হবে।

 

অক্ষয়।

সে তো হবেই। তার না কাটলে কি শ্যাম্পেনের ছিপি খোলে। দেশে আপনাদের মতো লোকের বিদ্যেবুদ্ধি চাপা থাকে, বাঁধন কাটলেই একেবারে নাকে মুখে চোখে উছলে উঠবে।

 

দারুকেশ্বর।

(্‌অত্যন্ত খুশি হইয়া অক্ষয়ের হাত চাপিয়া ধরিয়া) দাদা, এইটে তোমাকে করে দিতেই হচ্ছে। বুঝলে?

 

অক্ষয়।

সে কিছু শক্ত নয়। কিন্তু ব্যাপ্‌টাইজ্‌ আজই তো হবেন?

 

দারুকেশ্বর।

(হাসিতে হাসিতে) সেটা কিরকম।

 

অক্ষয়।

(কিঞ্চিৎ বিস্ময়ের ভাবে), কেন, কথাই তো আছে, রেভারেণ্ড্‌ বিশ্বাস আজ রাত্রেই আসছেন। ব্যাপটিজ্‌ম্‌ না হলে তো ক্রিশ্চান মতে বিবাহ হতে পারে না।

 

মৃত্যুঞ্জয়।

(অত্যন্ত ভীত হইয়া) ক্রিশ্চান মতে কী মশায়।

 

অক্ষয়।

আপনি যে আকাশ থেকে পড়লেন। সে হচ্ছে না-- ব্যাপ্‌টাইজ্‌ যেমন করে হোক, আজ রাত্রেই সারতে হচ্ছে। কিছুতেই ছাড়ব না।

 

মৃত্যুঞ্জয়।

আপনারা ক্রিশ্চান নাকি।

 

অক্ষয়।

মশায়, ন্যাকামি রাখুন। যেন কিছুই জানেন না।

 

মৃত্যুঞ্জয়।

(অত্যন্ত ভীতভাবে) মশায়, আমরা হিঁদু, ব্রাহ্মণের ছেলে, জাত খোয়াতে পারব না।

 

অক্ষয়।

(হঠাৎ অত্যন্ত উদ্ধতস্বরে) জাত কিসের মশায়। এ দিকে কলিমদ্দির হাতে মুর্গি খাবেন, বিলেত যাবেন, আবার জাত?

 

মৃত্যুঞ্জয়।

(ব্যস্তসমস্ত হইয়া) চুপ, চুপ, চুপ করুন। কে কোথা থেকে শুনতে পাবে।

 

দারুকেশ্বর।

ব্যস্ত হবেন না মশায়, একটু পরামর্শ করে দেখি।

 

(মৃত্যুঞ্জয়কে একটু অন্তরালে ডাকিয়া লইয়া) বিলেত থেকে ফিরে সেই তো একবার প্রায়শ্চিত্ত করতেই হবে-- তখন ডবল প্রায়শ্চিত্ত করে একেবারে ধর্মে ওঠা যাবে। এ সুযোগটা ছাড়লে আর বিলেত যাওয়াটা ঘটে উঠবে না। দেখলি তো কোনো শ্বশুরই রাজি হল না। আর ভাই, ক্রিশ্চানের হুঁকোয় তামাকই যখন খেলুম তখন ক্রিশ্চান হতে আর বাকি কী রইল।

 

(অক্ষয়ের কাছে আসিয়া) বিলেত যাওয়াটা তো নিশ্চয় পাকা? তা হলে ক্রিশ্চান হতে রাজি আছি।

 

মৃত্যুঞ্জয়।

কিন্তু আজ রাতটা থাক্‌।

 

দারুকেশ্বর।

হতে হয় তো চট্‌পট্‌ সেরে ফেলে পাড়ি দেওয়াই ভালো; গোড়াতেই বলেছি, শুভস্য শীঘ্রং।

 

ইতিমধ্যে অন্তরালে রমণীগণের সমাগম

 

দুই-থালা ফল মিষ্টান্ন লুচি ও বরফ-জল লইয়া ভৃত্যের প্রবেশ

 

দারুকেশ্বর।

কই মশায়, অভাগার অদৃষ্টে মুর্গি বেটা উড়েই গেল না কি। কট্‌লেট কোথায়।

 

অক্ষয়।

(মৃদুস্বরে) আজকের মতো এইটেই চলুক।

 

দারুকেশ্বর।

সে কি হয় মশায়। আশা দিয়ে নৈরাশ? শ্বশুরবাড়ি এসে মটন চপ খেতে পাব না? আর, এ-যে বরফ-জল মশায়, আমার আবার সর্দির ধাত, সাদা জল সহ্য হয় না। (গান জুড়িয়া) অভয় দাও তো বলি আমার wishকী--

 

অক্ষয়।

(মৃত্যুঞ্জয়কে টিপিয়া) ধরো-না হে, তুমিও ধরো-না-- চুপচাপ কেন। (গানের উচ্ছ্বাস থামিলে আহার-পাত্র দেখাইয়া) নিতান্তই কি এটা চলবে না।

 

দারুকেশ্বর।

(ব্যস্ত হইয়া) না মশায়, ও-সব রোগীর পথ্যি চলবে না। মুর্গি না খেয়েই তো ভারতবর্ষ গেল।

 

অক্ষয়।

(কানের কাছে আসিয়া লক্ষ্নৌ ঠুংরিতে গান)

 

কত কাল রবে বলো ভারত রে

শুধু ডাল ভাত জল পথ্য করে।

 

 

দারুকেশ্বর উৎসাহ-সহকারে গানটা ধরিল এবং মৃত্যুঞ্জয়ও অক্ষয়ের গোপন ঠেলা খাইয়া

 

সলজ্জভাবে মৃদু মৃদু যোগ দিতে লাগিল

 

অক্ষয়।

(আবার কানে কানে ধরাইয়া দিয়া)--

 

দেশে অন্নজলের হল ঘোর অনটন,

ধরো হুইস্কি সোডা আর মুর্গি-মটন।

 

 

দারুকেশ্বর মাতিয়া উঠিয়া ঊর্ধ্বস্বরে ঐ পদটা ধরিল এবং অক্ষয়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের প্রবল উৎসাহে

 

মৃত্যুঞ্জয়ও কোনোমতে সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিয়া গেল

 

পুরবালার প্রবেশ

 

গান

 

চির-পুরানো চাঁদ,

চিরদিবস এমনি থেকো আমার এই সাধ।

পুরানো হাসি পুরানো সুধা   মিটায় মম পুরানো ক্ষুধা,

নূতন কোনো চকোর যেন পায় না পরসাদ।

 

 

[ পুরবালার প্রস্থান

 

শৈলবালাকে আশ্বাস দিয়া

 

ভয় নেই! রাগটা হয়ে গেলেই মনটা পরিষ্কার হবে-- একটু অনুতাপও হবে-- সেইটেই সুযোগের সময়।

 

রসিক।

কোপো যত্র ভ্রুকুটিরচনা নিগ্রহো যত্র মৌনং

যত্রান্যোন্যস্মিতমনুনয়ো যত্র দৃষ্টিঃ প্রসাদঃ।

 

 

শৈলবালা।

রসিকদাদা, তুমি তো দিব্যি শ্লোক আউড়ে চলেছ-- কোপ জিনিসটা কী, তা মুখুজ্জেমশায় টের পাবেন।

 

রসিক।

আরে ভাই, বদল করতে রাজি আছি। মুখুজ্জেমশায় যদি শ্লোক আওড়াতেন আর আমার উপরেই যদি কোপ পড়ত তা হলে এই পোড়া কপালকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখতুম।

 

শৈলবালা।

মুখুজ্জেমশায়।

 

অক্ষয়।

(অত্যন্ত ত্রস্তভাবে) আবার মুখুজ্জেমশায়! এই বালখিল্য মুনিদের ধ্যানভঙ্গ ব্যাপারের মধ্যে আমি নেই।

 

শৈলবালা।

ধ্যানভঙ্গ আমরা করব। কেবল মুনিকুমারগুলিকে এই বাড়িতে আনা চাই।

 

অক্ষয়।

সভাসুদ্ধ এইখানে উৎপাটিত করে আনতে হবে? যত দুঃসাধ্য কাজ সব এই একটিমাত্র মুখুজ্জেমশায়কে দিয়ে?

 

শৈলবালা।

(হাসিয়া) মহাবীর হবার ঐ তো মুশকিল। যখন গন্ধমাদনের প্রয়োজন হয়েছিল তখন নল নীল অঙ্গদকে তো কেউ পৌঁছেও নি।

 

অক্ষয়।

ওরে পোড়ারমুখী, ত্রেতাযুগের পোড়ারমুখোকে ছাড়া আর কোনো উপমাও তোর মনে উদয় হল না? এত প্রেম!

 

শৈলবালা।

হাঁ গো, এত প্রেম!

 

অক্ষয়।

গান

 

পোড়া মনে শুধু পোড়া মুখখানি জাগে রে।

এত আছে লোক, তবু পোড়া চোখে

আর কেহ নাহি লাগে রে।

 
অক্ষয়

আচ্ছা, তাই হবে। পঙ্গপাল ক'টাকে শিখার কাছে তাড়িয়ে নিয়ে আসব। তা হলে চট করে আমাকে একটা পান এনে দাও। তোমার স্বহস্তের রচনা।

 

শৈলবালা

কেন, দিদির হস্তের--

 

অক্ষয়

আরে, দিদির হস্ত তো জোগাড় করেইছি, নইলে পাণিগ্রহণ কী জন্যে। এখন অন্য পদ্মহস্তগুলির প্রতি দৃষ্টি দেবার অবকাশ পাওয়া গেছে।

 

শৈলবালা

আচ্ছা গো মশায়। পদ্মহস্ত তোমার পানে এমনি চুন মাখিয়ে দেবে যে, পোড়ারমুখ আবার পুড়বে।

 

অক্ষয়

--

 

শৈলবালা।

মুখুজ্জেমশায়, ও কাগজের গোলটা কিসের।

 

অক্ষয়।

তোমাদের সেই সভ্য হবার আবেদনপত্র এবং প্রবেশিকার দশ টাকার নোট পকেটে ছিল, ধোবা বেটা কেচে এমনি পরিষ্কার করে দিয়েছে একটা অক্ষরও দেখতে পাচ্ছি নে। ও বেটা বোধ হয় স্ত্রীস্বাধীনতার ঘোরতর বিরোধী, তাই তোমার ঐ পত্রটা একেবারে আগাগোড়া সংশোধন করে দিয়েছে।

 

শৈলবালা।

এই বুঝি!

 

অক্ষয়।

চারটিতে মিলে স্মরণশক্তি জুড়ে বসে আছ, আর কিছু কি মনে রাখতে দিলে?--

 

গান

 

[ শৈল ও রসিকের প্রস্থান

 

পুরবালার প্রবেশ

 

অক্ষয়।

স্বামীই স্ত্রীর একমাত্র তীর্থ। মান কি না।

 

পুরবালা।

আমি কি পণ্ডিতমশায়ের কাছে শাস্ত্রের বিধান নিতে এসেছি। আমি মার সঙ্গে আজ কাশী চলেছি এই খবরটি দিয়ে গেলুম।

 

অক্ষয়।

খবরটি সুখবর নয়-- শোনবামাত্র তোমাকে শাল-দোশালা বকশিশ দিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে না।

 

পুরবালা।

ইস, হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে? না? সহ্য করতে পারছ না?

 

অক্ষয়।

আমি কেবল উপস্থিত বিচ্ছেদটার কথা ভাবছি নে। এখন তুমি দু দিন না রইলে, আরো কজন রয়েছেন, একরকম করে এই হতভাগ্যের চলে যাবে। কিন্তু এর পরে কী হবে। দেখো, ধর্মে-কর্মে স্বামীকে এগিয়ে যেয়ো না; স্বর্গে তুমি যখন ডবল প্রমোশন পেতে থাকবে আমি তখন পিছিয়ে থাকব-- তোমাকে বিষ্ণুদূতে রথে চড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর আমাকে যমদূতে কানে ধরে হাঁটিয়ে দৌড় করাবে।

 

গান

 

স্বর্গে তোমায় নিয়ে যাবে উড়িয়ে,

পিছে পিছে আমি চলব খুঁড়িয়ে,

ইচ্ছা হবে টিকির ডগা ধরে

বিষ্ণুদূতের মাথাটা দিই গুঁড়িয়ে।

 

 

পুরবালা।

আচ্ছা আচ্ছা, থামো।

 

অক্ষয়।

আমি থামব, কেবল তুমিই চলবে? ঊনবিংশ শতাব্দীর এই বন্দোবস্ত? নিতান্তই চললে?

 

পুরবালা।

চললুম।

 

অক্ষয়।

আমাকে কার হাতে সমর্পণ করে গেলে।

 

পুরবালা।

রসিকদাদার হাতে।

 

অক্ষয়।

মেয়েমানুষ, হস্তান্তর করবার আইন কিছুই জান না। সেইজন্যেই তো বিরহাবস্থায় উপযুক্ত হাত নিজেই খুঁজে নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়।

 

পুরবালা।

তোমাকে তো বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হবে না।

 

অক্ষয়।

তা হবে না।--

 

গান

 

পুরবালা।

রক্ষে করো, ও মিলটা ঐখানেই শেষ করো!

 

অক্ষয়।

দুঃখের সময় আমি থামতে পারি নে, কাব্য আপনি বেরোতে থাকে। মিল ভালো না বাস অমিত্রাক্ষর আছে, তুমি যখন বিদেশে থাকবে আমি "আর্তনাদ-বধ কাব্য' বলে একটা কাব্য লিখব। সখী, তার আরম্ভটা শোনো--

 

(সাড়ম্বরে)                 বাষ্পীয় শকটে চড়ি নারীচূড়ামণি

                       পুরবালা চলি যবে গেলা কাশীধামে

                       বিকালে, কহ হে দেবী অমৃতভাষিণী

                       কোন্‌ বরাঙ্গনে বরি বরমাল্যদানে

                       যাপিলা বিচ্ছেদমাস শ্যালীত্রয়ীশালী

                       শ্রীঅক্ষয়!

 

 

পুরবালা।

(সগর্বে) আমার মাথা খাও, ঠাট্টা নয়, তুমি একটা সত্যিকার কাব্য লেখো-না।

 

অক্ষয়।

মাথা খাওয়ার কথা যদি বললে, আমি নিজের মাথাটি খেয়ে অবধি বুঝেছি ওটা সুখাদ্যের মধ্যে গণ্য নয়। আর ঐ কাব্য লেখা, ও কার্যটাও সুসাধ্য বলে জ্ঞান করি নে। বুদ্ধিতে আমার এক জায়গায় ফুটো আছে, কাব্য জমতে পারে না-- ফস্‌ ফস্‌ করে বেরিয়ে পড়ে।

 

তুমি জান আমার গাছে ফল কেন না ফলে--

        যেমনি ফুলটি ফুটে ওঠে আনি চরণতলে।

 

 

কিন্তু, আমার প্রশ্নের তো কোনো উত্তর পেলুম না? কৌতূহলে মরে যাচ্ছি। কাশীতে যে চলেছ, উৎসাহটা কিসের জন্যে। আপাতত সেই বিষ্ণুদূতটাকে মনে মনে ক্ষমা করলুম, কিন্তু ভগবান ভূতনাথ ভবানীপতির অনুচরগুলোর উপর ভারি সন্দেহ হচ্ছে। শুনেছি নন্দী ও ভৃঙ্গী অনেক বিষয়ে আমাকেও জেতে, ফিরে এসে হয়তো এই ভৃত্যটিকে পছন্দ না হতেও পারে।

 

পুরবালা।

আমি কাশী যাব না।

 

অক্ষয়।

সে কী কথা। ভূতভাবনের যে ভৃত্যগুলি একবার মরে ভূত হয়েছে তারা যে দ্বিতীয়বার মরবে।

 

রসিকের প্রবেশ

 

পুরবালা।

আজ যে রসিকদার মুখ ভারি প্রফুল্ল দেখাচ্ছে।

 

রসিক।

ভাই, তোর রসিকদার মুখের ঐ রোগটা কিছুতেই ঘুচল না। কথা নেই বার্তা নেই প্রফুল্ল হয়েই আছে-- বিবাহিত লোকেরা দেখে মনে মনে রাগ করে।

 

পুরবালা।

শুনলে তো বিবাহিত লোক? এর একটা উপযুক্ত জবাব দিয়ে যাও।

 

অক্ষয়।

আমাদের প্রফুল্লতার খবর ও বৃদ্ধ কোথা থেকে জানবে? সে এত রহস্যময় যে তা উদ্ভেদ করতে আজ পর্যন্ত কেউ পারলে না, সে এত গভীর যে আমরাই হাতড়ে খুঁজে পাই নে-- হঠাৎ সন্দেহ হয় আছে কি না।

 

পুরবালা।

এই বুঝি!

 

[ রাগ করিয়া চলিয়া যাইবার উপক্রম

 

অক্ষয়।

(তাহাকে ফিরাইয়া) দোহাই তোমার, এ লোকটির সামনে রাগারাগি কোরো না-- তা হলে ওর আস্পর্ধা আরো বেড়ে যাবে। দেখো দাম্পত্যতত্ত্বানভিজ্ঞ বৃদ্ধ, আমরা যখন রাগ করি তখন স্বভাবত আমাদের কণ্ঠস্বর প্রবল হয়ে ওঠে, সেইটেই তোমাদের কর্ণগোচর হয়; আর অনুরাগে যখন আমাদের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে, কানের কাছে মুখ আনতে গিয়ে মুখ বারম্বার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়তে থাকে-- তখন তো খবর পাও না।

 

পুরবালা।

আঃ, চুপ করো।

 

অক্ষয়।

যখন গয়নার ফর্দ হয় তখন বাড়ির সরকার থেকে সেক্‌রা পর্যন্ত সেটা কারো অবিদিত থাকে না, কিন্তু বসন্তনিশীথে যখন প্রেয়সী--

 

পুরবালা।

আঃ, থামো।

 

অক্ষয়।

বসন্তনিশীথে প্রেয়সী--

 

পুরবালা।

আঃ, কী বকছ তার ঠিক নেই।

 

অক্ষয়।

বসন্তনিশীথে যখন প্রেয়সী গর্জন করে বলেন "আমি কালই বাপের বাড়ি চলে যাব, আমার একদণ্ড এখানে থাকতে ইচ্ছে নেই-- আমার হাড় কালি হল--আমার--

 

পুরবালা।

হাঁগো মশায়, কবে তোমার প্রেয়সী বাপের বাড়ি যাব ব'লে বসন্ত-নিশীথে গর্জন করেছে।

 

অক্ষয়।

ইতিহাসের পরীক্ষা? কেবল ঘটনা রচনা করে নিষ্কৃতি নেই? আবার সন তারিখ সুদ্ধ মুখে মুখে বানিয়ে দিতে হবে? আমি কি এতবড়ো প্রতিভাশালী।

 

রসিক।

(পুরবালার প্রতি) বুঝেছ ভাই, সোজা করে ও তোমার কথা বলতে পারে না-- ওর এত ক্ষমতাই নেই-- তাই উল্টে বলে; আদরে না কুলোলে গাল দিয়ে আদর করতে হয়।

 

পুরবালা।

আচ্ছা মল্লিনাথজি, তোমার আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। মা যে শেষকালে তোমাকেই কাশী নিয়ে যাবেন স্থির করেছেন।

 

রসিক।

তা, বেশ তো, এতে আর ভয়ের কথাটা কী। তীর্থে যাবার তো বয়সই হয়েছে। এখন তোমাদের লোলকটাক্ষে এ বৃদ্ধের কিছুই করতে পারবে না-- এখন চিত্ত চন্দ্রচূড়ের চরণে--

 

মুগ্ধস্নিগ্ধবিদগ্ধলুব্ধমধুরৈর্লোলৈঃ কটাক্ষৈরলং

চেতঃ সম্প্রতি চন্দ্রচূড়চরণধ্যানামৃতে বর্ততে।

 

 

পুরবালা।

সে তো খুব ভালো কথা, তোমার উপরে আর কটাক্ষের অপব্যয় করতে চাই নে, এখন চন্দ্রচূড়চরণে চলো-- তা হলে মাকে ডাকি।

 

রসিক।

(করজোড়ে) বড়দিদিভাই, তোমার মা আমাকে সংশোধনের বিস্তর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু একটু অসময়ে সংস্কারকার্য আরম্ভ করেছেন-- এখন তাঁর শাসনে কোনো ফল হবে না। বরঞ্চ এখনো নষ্ট হবার বয়স আছে, সে বয়সটা বিধাতার কৃপায় বরাবরই থাকে, লোল কটাক্ষটা শেষকাল পর্যন্ত খাটে, কিন্তু উদ্ধারের বয়স আর নেই। তিনি এখন কাশী যাচ্ছেন, কিছুদিন এই বৃদ্ধ শিশুর বুদ্ধিবৃত্তির উন্নতিসাধনের দুরাশা পরিত্যাগ করে শান্তিতে থাকুন-- কেন তোরা তাঁকে কষ্ট দিবি।

 

জগত্তারিণীর প্রবেশ

 

জগত্তারিণী।

বাবা, তা হলে আসি।

 

অক্ষয়।

চললে নাকি মা? রসিকদাদা যে এতক্ষণ দুঃখ করছিলেন যে তুমি--

 

রসিক।

(ব্যাকুলভাবে) দাদার সকল কথাতেই ঠাট্টা। মা, আমার কোনো দুঃখ নেই, আমি কেন দুঃখ করতে যাব।

 

অক্ষয়।

বলছিলে না যে "বড়োমা একলাই কাশী যাচ্ছেন, আমাকে সঙ্গে নিলেন না'?

 

রসিক।

হাঁ, সে তো ঠিক কথা। মনে তো লাগতেই পারে, তবে কিনা মা যদি নিতান্তই--

 

জগত্তারিণী।

না বাপু, বিদেশে তোমার রসিকদাদাকে সামলাবে কে। ওঁকে নিয়ে পথ চলতে পারব না।

 

পুরবালা।

কেন মা, রসিকদাদাকে নিয়ে গেলে উনি তোমাকে দেখতে-শুনতে পারতেন।

 

জগত্তারিণী।

রক্ষে করো, আমাকে আর দেখে-শুনে কাজ নেই। তোমার রসিকদাদার বুদ্ধির পরিচয় ঢের পেয়েছি।

 

রসিক।

(টাকে হাত বুলাইতে বুলাইতে) তা, মা, যেটুকু বুদ্ধি আছে তার পরিচয় সর্বদাই দিচ্ছি, ও তো চেপে রাখবার জো নেই-- ধরা পড়তেই হবে। ভাঙা চাকাটাই সব চেয়ে খড়্‌ খড়্‌ করে, তিনি যে ভাঙা সেটা পাড়াসুদ্ধ খবর পায়। সেইজন্যেই বড়োমা, চুপচাপ করে থাকতেই চাই, কিন্তু তুমি যে আবার চালাতেও ছাড় না।

 

জগত্তারিণী।

আমি তা হলে হারানের বাড়ি চললুম, একেবারে তাদের সঙ্গে গাড়িতে উঠব; এর পরে আর যাত্রার সময় নেই। পুরো, তোরা তো দিন ক্ষণ মানিস নে, ঠিক সময়ে ইস্টেশনে যাস।

 

পুরবালা।

মা, আমি কাশী যাব না।

 

হঠাৎ তাহার অসম্মতিতে বিপন্ন হইয়া জগত্তারিণী তাঁহার জামাতার মুখের দিকে চাহিলেন

 

অক্ষয়।

(শাশুড়ির মনের ভাব বুঝিয়া) সে কি হয়। তুমি মার সঙ্গে না গেলে ওঁর অসুবিধে হবে। আচ্ছা মা, তুমি এগোও, আমি ওকে ঠিক সময়ে স্টেশনে নিয়ে যাব।

 

জগত্তারিণী নিশ্চিন্ত হইয়া প্রস্থান করিলেন। রসিকদাদা টাকে হাত বুলাইতে বুলাইতে

 

বিদায়কালীন বিমর্ষতা মুখে আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন

 

পুরুষবেশধারী শৈলের প্রবেশ

 

অক্ষয়।

কে মশায়। আপনি কে?

 

শৈলবালা।

আজ্ঞে মশায়, আপনার সহধর্মিণীর সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ আছে। (অক্ষয়ের সঙ্গে শেকহ্যাণ্ড্‌) মুখুজ্জেমশায়, চিনতে তো পারলে না?

 

পুরবালা।

অবাক করলি। লজ্জা করছে না?

 

শৈলবালা।

দিদি, লজ্জা যে স্ত্রীলোকের ভূষণ-- পুরুষের বেশ ধরতে গেলেই সেটা পরিত্যাগ করতে হয়। তেমনি আবার মুখুজ্জেমশায় যদি মেয়ে সাজেন উনি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। রসিকদাদা, চুপ করে রইল যে?

 

রসিক।

আহা, শৈল যেন কিশোর কন্দর্প। যেন সাক্ষাৎ কুমার, ভবানীর কোল থেকে উঠে এল। ওকে বরাবর শৈল বলে দেখে আসছি, চোখের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল; ও সুন্দরী কি মাঝারি কি চলনসই সে কথা কখনো মনেও ওঠে নি-- আজ ঐ বেশটি বদল করেছে বলেই তো ওর রূপখানি ধরা দিলে। পুরোদিদি, লজ্জার কথা কী বলছিস, আমার ইচ্ছে করছে ওকে টেনে নিয়ে ওর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করি।

 

অক্ষয়।

(স্নেহাভিষিক্ত গাম্ভীর্যের সহিত ছদ্মবেশিনীকে ক্ষণকাল নিরীক্ষণ করিয়া) সত্যি বলছি শৈল, তুমি যদি আমার শ্যালী না হয়ে আমার ছোটো ভাই হতে তা হলেও আমি আপত্তি করতুম না।

 

শৈলবালা।

(ঈষৎ বিচলিত হইয়া) আমিও না মুখুজ্জেমশায়।

 

পুরবালা।

(শৈলকে বুকের কাছে টানিয়া) এই বেশে তুই কুমার-সভার সভ্য হতে যাচ্ছিস?

 

শৈলবালা।

অন্য বেশে হতে গেলে যে ব্যাকরণের দোষ হয় দিদি। কী বল রসিকদাদা।

 

রসিক।

তা তো বটেই, ব্যাকরণ বাঁচিয়ে তো চলতেই হবে। ভগবান পাণিনি বোপদেব এঁরা কী জন্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ভাই, শ্রীমতী শৈলবালার উত্তর চাপকান প্রত্যয় করলেই কি ব্যাকরণ রক্ষে হয়।

 

অক্ষয়।

নতুন মুগ্ধবোধে তাই লেখে। আমি লিখেপ'ড়ে দিতে পারি, চিরকুমার-সভার মুগ্ধদের কাছে শৈল যেমন প্রত্যয় করাবে তাঁরা তেমনি প্রত্যয় যাবেন। কুমারদের ধাতু আমি জানি কিনা।

 

পুরবালা।

(একটুখানি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) তোর মুখুজ্জেমশায়কে আর এই বুড়ো সমবয়সীটিকে নিয়ে তোর খেলা তুই আরম্ভ কর-- আমি মার সঙ্গে কাশী চললুম।

 

পুরবালা জিনিসপত্র গুছাইতে গেল, এমন সময় নৃপবালা ও নীরবালা ঘরে প্রবেশ

 

করিয়াই পলায়নোদ্যত হইল। নীর দরজার আড়াল হইতে আর-একবার ভালো করিয়া তাকাইয়া

 

"মেজদিদি' বলিয়া ছুটিয়া আসিল

 

নীরবালা।

মেজদিদি, তোমাকে ভাই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ঐ চাপকানে বাধছে। মনে হচ্ছে তুমি যেন কোন্‌ রূপকথার রাজপুত্র, তেপান্তর মাঠ পেরিয়ে আমাদের উদ্ধার করতে এসেছ।

 

নীরর সমুচ্চ কণ্ঠস্বরে আশ্বস্ত হইয়া নৃপও ঘরে প্রবেশ করিয়া মুগ্ধনেত্রে চাহিয়া রহিল।

 

নীরবালা।

(তাহাকে টানিয়া লইয়া) অমন করে লোভীর মতো তাকিয়ে আছিস কেন। যা মনে করছিস তা নয়, ও তোর দুষ্মন্ত নয়-- ও আমাদের মেজদিদি।

 

রসিক।

--

 

ইয়মধিকমনোজ্ঞা চাপকানেনাপি তন্বীকিমিব হি মধুরাণাং মণ্ডনং নাকৃতীনাম্‌।

 

অক্ষয়।

মূঢ়ে, তোরা কেবল চাপকানটা দেখেই মুগ্ধ। গিল্‌টির এত আদর? এ দিকে যে খাঁটি সোনা দাঁড়িয়ে হাহাকার করছে।

 

নীরবালা।

আজকাল খাঁটি সোনার দর যে বড়ো বেশি, আমাদের এই গিল্‌টিই ভালো। কী বল ভাই মেজদিদি।

 

শৈলর কৃত্রিম গোঁফটা একটু পাকাইয়া দিল

 

রসিক।

(নিজেকে দেখাইয়া) এই খাঁটি সোনাটি খুব সস্তায় যাচ্ছে ভাই, এখনো কোনো ট্যাঁকশালে গিয়ে কোনো মহারানীর ছাপটি পর্যন্ত পড়ে নি।

 

নীরবালা।

আচ্ছা বেশ, সেজদিদিকে দান করলুম। (রসিকদাদার হাত ধরিয়া নৃপর হাতে সমর্পণ করিল) রাজি আছিস তো ভাই?

 

নৃপবালা।

তা আমি রাজি আছি।

 

রসিকদাদাকে একটা চৌকিতে বসাইয়া সে তাঁহার মাথার পাকা চুল তুলিয়া দিতে লাগিল

 

নীর শৈলর কৃত্রিম গোঁফে তা দিয়া পাকাইয়া তুলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল

 

শৈলবালা।

আঃ, কী করছিস, আমার গোঁফ পড়ে যাবে।

 

রসিক।

কাজ কী, এ দিকে আয়-না ভাই, এ গোঁফ কিছুতেই পড়বে না।

 

নীরবালা।

আবার! ফের! সেজদিদির হাতে সঁপে দিলুম কী করতে। আচ্ছা রসিকদাদা, তোমার মাথার দুটো-একটা চুল কাঁচা আছে, কিন্তু গোঁফ আগাগোড়া পাকালে কী করে।

 

রসিক।

কারো কারো মাথা পাকবার আগে মুখটা পাকে।

 

অক্ষয়।

তা হলে আমি একবার চিরকুমার-সভার মাথায় হাত বুলিয়ে আসি।

 

নীরবালা।

-- গান

 

জয়যাত্রায় যাও গো,      ওঠো ওঠো জয়রথে তব।

মোরা জয়মালা গেঁথে     আশা চেয়ে বসে রব।

আঁচল বিছায়ে রাখি         পথধুলা দিব ঢাকি--

    ফিরে এলে হে বিজয়ী,  হৃদয়ে বরিয়া লব।

 

 

অক্ষয়।

রথ প্রস্তুত, এখন কী আনব বলো।

 

নীরবালা।

                   আঁকিয়ো হাসির রেখা    সজল আঁখির কোণে--

                             নববসন্তশোভা এনো এ শূন্যবনে।

                   সোনার প্রদীপে জ্বালো    আঁধার ঘরের আলো,

                          পরাও রাতের ভালে চাঁদের তিলক নব।

 

 

অক্ষয়।

আর সব ভালো, কেবল তোমার ফর্দের মধ্যে সোনার প্রদীপটাই আক্‌কারা ঠেকছে। চেষ্টার ত্রুটি হবে না।

 

নীরবালা।

দিদিদের সভাটা কোন্‌ ঘরে বসবে মুখুজ্জেমশায়।

 

অক্ষয়।

আমার বসবার ঘরে।

 

নীরবালা।

তা হলে সে ঘরটা একটু সাজিয়ে-গুজিয়ে দিইগে।

 

অক্ষয়।

যতদিন আমি সে ঘরটা ব্যবহার করছি একদিনও সাজাতে ইচ্ছে হয় নি বুঝি?

 

নীরবালা।

তোমার জন্যে ঝড়ু বেহারা আছে, তবু বুঝি আশা মিটল না?

 

পুরবালার প্রবেশ

 

পুরবালা।

কী হচ্ছে তোমাদের।

 

নীরবালা।

মুখুজ্জেমশায়ের কাছে পড়া বলে নিতে এসেছি দিদি। তা, উনি বলছেন ওঁর বাইরের ঘরটা ভালো করে ঝেড়ে সাজিয়ে না দিলে উনি পড়াবেন না। তাই সেজদিদিতে আমাতে ওঁর ঘর সাজাতে যাচ্ছি। আয় ভাই।

 

নৃপবালা।

তোর ইচ্ছে হয়েছে তুই ঘর সাজাতে যা-না-- আমি যাব না।

 

নীরবালা।

বাঃ, আমি একা খেটে মরব, আর তুমি-সুদ্ধ তার ফল পাবে সে হবে না।

 

নৃপকে গ্রেপ্তার করিয়া লইয়া নীর চলিয়া গেল

 

পুরবালা।

সব গুছিয়ে নিয়েছি। এখনো ট্রেন যাবার দেরি আছে বোধ হয়।

 

অক্ষয়।

যদি মিস করতে চাও তা হলে ঢের দেরি আছে।

 


Acts: FRONT PAGE  | 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | SINGLE PAGE