Home > Verses > সেঁজুতি >       জন্মদিন

      জন্মদিন    


আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে

ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে

মরণের ছাড়পত্র নিয়ে। মনে হতেছে কী জানি

পুরাতন বৎসরের গ্রন্থিবাঁধা জীর্ণ মালাখানি

সেথা গেছে ছিন্ন হয়ে; নবসূত্রে পড়ে আজি গাঁথা

নব জন্মদিন। জন্মোৎসবে এই-যে আসন পাতা

হেথা আমি যাত্রী শুধু, অপেক্ষা করিব, লব টিকা

মৃত্যুর দক্ষিণ হস্ত হতে, নূতন অরুণলিখা

যবে দিবে যাত্রার ইঙ্গিত।

                    আজ আসিয়াছে কাছে

জন্মদিন মৃত্যুদিন, একাসনে দোঁহে বসিয়াছে,

দুই আলো মুখোমুখি মিলিছে জীবনপ্রান্তে মম

রজনীর চন্দ্র আর প্রত্যুষের শুকতারাসম--

এক মন্ত্রে দোঁহে অভ্যর্থনা।

                    প্রাচীন অতীত, তুমি

নামাও তোমার অর্ঘ্য; অরূপ প্রাণের জন্মভূমি,

উদয়শিখরে তার দেখো আদিজ্যোতি। করো মোরে

আশীর্বাদ, মিলাইয়া যাক তৃষাতপ্ত দিগন্তরে

মায়াবিনী মরীচিকা। ভরেছিনু আসক্তির ডালি

কাঙালের মতো; অশুচি সঞ্চয়পাত্র করো খালি,

ভিক্ষামুষ্টি ধূলায় ফিরায়ে লও, যাত্রাতরী বেয়ে

পিছু ফিরে আর্ত চক্ষে যেন নাহি দেখি চেয়ে চেয়ে

জীবনভোজের শেষ উচ্ছিষ্টের পানে।

                    হে বসুধা,

নিত্য নিত্য বুঝায়ে দিতেছ মোরে-- যে তৃষ্ণা, যে ক্ষুধা

তোমার সংসাররথে সহস্রের সাথে বাঁধি মোরে

টানায়েছে রাত্রিদিন স্থুল সূক্ষ্ম নানাবিধ ডোরে

নানা দিকে নানা পথে, আজ তার অর্থ গেল কমে

ছুটির গোধূলিবেলা তন্দ্রালু আলোকে। তাই ক্রমে

ফিরায়ে নিতেছ শক্তি, হে কৃপণা, চক্ষুকর্ণ থেকে

আড়াল করিছ স্বচ্ছ আলো; দিনে দিনে টানিছে কে

নিষ্প্রভ নেপথ্যপানে। আমাতে তোমার প্রায়োজন

শিথিল হয়েছে, তাই মূল্য মোর করিছ হরণ,

দিতেছ ললাটপটে বর্জনের ছাপ। কিন্তু জানি,

তোমার অবজ্ঞা মোরে পারে না ফেলিতে দূরে টানি।

তব প্রয়োজন হতে অতিরিক্ত যে মানুষ তারে

দিতে হবে চরম সম্মান তব শেষ নমস্কারে।

যদি মোরে পঙ্গু কর, যদি মোরে কর অন্ধপ্রায়,

যদি বা প্রচ্ছন্ন কর নিঃশক্তির প্রদোষচ্ছায়ায়,

বাঁধ বার্ধক্যের জালে, তবু ভাঙা মন্দিরবেদীতে

প্রতিমা অক্ষুণ্ন রবে সগৌরবে; তারে কেড়ে নিতে

শক্তি নাই তব।

                    ভাঙো ভাঙো, উচ্চ করো ভগ্নস্তূপ,

জীর্ণতার অন্তরালে জানি মোর আনন্দস্বরূপ

রয়েছে উজ্জ্বল হয়ে। সুধা তারে দিয়েছিল আনি

প্রতিদিন চতুর্দিকে রসপূর্ণ আকাশের বাণী;

প্রত্যুত্তরে নানা ছন্দে গেয়েছে সে "ভালোবাসিয়াছি'।

সেই ভালোবাসা মোরে তুলেছে স্বর্গের কাছাকাছি

ছাড়ায়ে তোমার অধিকার। আমার সে ভালোবাসা

সব ক্ষয়ক্ষতিশেষে অবশিষ্ট রবে; তার ভাষা

হয়তো হারাবে দীপ্তি অভ্যাসের ম্লানস্পর্শ লেগে,

তবু সে অমৃতরূপ সঙ্গে রবে যদি উঠি জেগে

মৃত্যুপরপারে। তারি অঙ্গে এঁকেছিল পত্রলিখা

আম্রমঞ্জরীর রেণু, এঁকেছে পেলব শেফালিকা

সুগন্ধি শিশিরকণিকায়; তারি সূক্ষ্ম উত্তরীতে

গেঁথেছিল শিল্পকারু প্রভাতের দোয়েলের গীতে

চকিত কাকলিসূত্রে; প্রিয়ার বিহ্বল স্পর্শখানি

সৃষ্টি করিয়াছে তার সর্বদেহে রোমাঞ্চিত বাণী,

নিত্য তাহা রয়েছে সঞ্চিত। যেথা তব কর্মশালা

সেথা বাতায়ন হতে কে জানি পরায়ে দিত মালা

আমার ললাট ঘেরি সহসা ক্ষণিক অবকাশে,

সে নহে ভৃত্যের পুরস্কার; কী ইঙ্গিতে কী আভাসে

মুহূর্তে জানায়ে চলে যেত অসীমের আত্মীয়তা

অধরা অদেখা দূত, বলে যেত ভাষাতীত কথা

অপ্রয়োজনের মানুষেরে।

                    সে মানুষ, হে ধরণী,

তোমার আশ্রয় ছেড়ে যাবে যবে, নিয়ো তুমি গণি

যা-কিছু দিয়েছ তারে, তোমার কর্মীর যত সাজ,

তোমার পথের যে পাথেয়, তাহে সে পাবে না লাজ;

রিক্ততায় দৈন্য নহে। তবু জেনো অবজ্ঞা করি নি

তোমার মাটির দান, আমি সে মাটির কাছে ঋণী--

জানায়েছি বারংবার, তাহারি বেড়ার প্রান্ত হতে

অমূর্তের পেয়েছি সন্ধান। যবে আলোতে আলোতে

লীন হত দড়যবনিকা, পুষ্পে পুষ্পে তৃণে তৃণে

রূপে রসে সেই ক্ষণে যে গূঢ় রহস্য দিনে দিনে

হত নিঃশ্বসিত, আজি মর্তের অপর তীরে বুঝি

চলিতে ফিরানু মুখ তাহারি চরম অর্থ খুঁজি।

যবে শান্ত নিরাসক্ত গিয়েছি তোমার নিমন্ত্রণে

তোমার অমরাবতী সুপ্রসন্ন সেই শুভক্ষণে

মুক্তদ্বার; বুভুক্ষুর লালসারে করে সে বঞ্চিত;

তাহার মাটির পাত্রে যে অমৃত রয়েছে সঞ্চিত

নহে তাহা দীন ভিক্ষু লালায়িত লোলুপের লাগি।

ইন্দ্রের ঐশ্বর্য নিয়ে হে ধরিত্রী, আছ তুমি জাগি

ত্যাগীরে প্রত্যাশা করি, নির্লোভেরে সঁপিতে সম্মান,

দুর্গমের পথিকেরে আতিথ্য করিতে তব দান

বৈরাগ্যের শুভ্র সিংহাসনে। ক্ষুব্ধযারা, লুব্ধ যারা,

মাংসগন্ধে মুগ্ধ যারা, একান্ত আত্মার দৃষ্টিহারা

শ্মশানের প্রান্তচর, আবর্জনাকুণ্ড তব ঘেরি

বীভৎস চীৎকারে তারা রাত্রিদিন করে ফেরাফেরি,

নির্লজ্জ হিংসায় করে হানাহানি।

                    শুনি তাই আজি

মানুষ-জন্তুর হুহুংকার দিকে দিকে উঠে বাজি।

তবু যেন হেসে যাই যেমন হেসেছি বারে বারে

পণ্ডিতের মূঢ়তায়, ধনীর দৈন্যের অত্যাচারে,

সজ্জিতের রূপের বিদ্রূপে। মানুষের দেবতারে

ব্যঙ্গ করে যে অপদেবতা বর্বর মুখবিকারে

তারে হাস্য হেনে যাব, বলে যাব, "এ প্রহসনের

মধ্য-অঙ্কে অকস্মাৎ হবে লোপ দুষ্ট স্বপনের;

নাট্যের কবররূপে বাকি শুধু রবে ভস্মরাশি

দগ্ধশেষ মশালের, আর অদৃষ্টের অট্টহাসি।'

বলে যাব, "দ্যূতচ্ছলে দানবের মূঢ় অপব্যয়

গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিবৃত্তে শাশ্বত অধ্যায়।'

বৃথা বাক্য থাক্‌। তব দেহলিতে শুনি ঘন্টা বাজে,

শেষপ্রহরের ঘন্টা; সেই সঙ্গে ক্লান্ত বক্ষোমাঝে

শুনি বিদায়ের দ্বার খুলিবার শব্দ সে অদূরে

ধ্বনিতেছে সূর্যাস্তের রঙে রাঙা পূরবীর সুরে।

জীবনের স্মৃতিদীপে আজিও দিতেছে যারা জ্যোতি

সেই ক'টি বাতি দিয়ে রচিব তোমার সন্ধ্যারতি

সপ্তর্ষির দৃষ্টির সম্মুখে; দিনান্তের শেষ পলে

রবে মোর মৌন বীণা মূর্ছিয়া তোমার পদতলে।

আর রবে পশ্চাতে আমার, নাগকেশরের চারা

ফুল যার ধরে নাই, আর রবে খেয়াতরীহারা

এ পারের ভালোবাসা-- বিরহস্মৃতির অভিমানে

ক্লান্ত হয়ে রাত্রিশেষে ফিরিবে সে পশ্চাতের পানে।

 

 

  গৌরীপুর-ভবন। কালিম্পং, ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৫