Home > Verses > প্রহাসিনী > আধুনিকা

আধুনিকা    


চিঠি তব পড়িলাম, বলিবার নাই মোর,

তাপ কিছু আছে তাহে, সন্তাপ তাই মোর।

কবিগিরি ফলাবার উৎসাহ-বন্যায়

আধুনিকাদের 'পরে করিয়াছি অন্যায়

যদি সন্দেহ কর এত বড়ো অবিনয়,

চুপ ক'রে যে সহিবে সে কখনো কবি নয়।

বলিব দু-চার কথা, ভালো মনে শুনো তা;

পূরণ করিয়া নিয়ো প্রকাশের ন্যূনতা।

পাঁজিতে যে আঁক টানে গ্রহ-নক্ষত্তর

আমি তো তদনুসারে পেরিয়েছি সত্তর।

আয়ুর তবিল মোর কুষ্ঠির হিসাবে

অতি অল্প দিনেই শূন্যেতে মিশাবে।

চলিতে চলিতে পথে আজকাল হর্‌দম

বুকে লাগে যমরথচক্রের কর্দম।

তবু মোর নাম আজো পারিবে না ওঠাতে

প্রাত্নিক তত্ত্বের গবেষণা-কোঠাতে।

জীর্ণ জীবনে আজ রঙ নাই, মধু নাই--

মনে রেখো, তবু আমি জন্মেছি অধুনাই।

সাড়ে আঠারো শতক এ| ডি|, সে যে বি| সি| নয়;

মোর যারা মেয়ে-বোন নারদের পিসি নয়।

আধুনিকা যারে বল তারে আমি চিনি যে,

কবিযশে তারি কাছে বারো-আনা ঋণী যে।

তারি হাতে চিরদিন যৎপরোনাস্তি

পেয়েছি পুরস্কার, পেয়েছিও শাস্তি।

প্রমাণ গিয়েছি রেখে, এ-কালিনী রমণীর

রমণীয় তালে বাঁধা ছন্দ এ ধমনীর।

কাছে পাই হারাই-বা তবু তারি স্মৃতিতে

সুরসৌরভ জাগে আজো মোর গীতিতে।

মনোলোকে দূতী যারা মাধুরীনিকুঞ্জে

গুঞ্জন করিয়াছি তাহাদেরি গুণ যে।

সেকালেও কালিদাস-বররুচি-আদিরা

পুরসুন্দরীদের প্রশস্তিবাদীরা

যাদের মহিমাগানে জাগালেন বীণারে

তারাও সবাই ছিল অধুনার কিনারে।

আধুনিকা ছিল নাকো হেন কাল ছিল না,

তাহাদেরি কল্যাণে কাব্যানুশীলনা।

পুরুষ কবির ভালে আছে কোনো সুগ্রহ,

চিরকাল তাই তারে এত মহানুগ্রহ।

জুতা-পায়ে খালি-পায়ে স্লিপারে বা নূপুরে

নবীনারা যুগে যুগে এল দিনে দুপুরে,

যেখা স্বপনের পাড়া সেথা যায় আগিয়ে,

প্রাণটাকে নাড়া দিয়ে গান যায় জাগিয়ে।

তবু কবি-রচনায় যদি কোনো ললনা

দেখ অকৃতজ্ঞতা, জেনো সেটা ছলনা।

মিঠে আর কটু মিলে, মিছে আর সত্যি,

ঠোকাঠুকি ক'রে হয় রস-উৎপত্তি।

মিষ্ট-কটুর মাঝে কোন্‌টা যে মিথ্যে

সে কথাটা চাপা থাক্‌ কবির সাহিত্যে।

ওই দেখো, ওটা বুঝি হল শ্লেষবাক্য।

এরকম বাঁকা কথা ঢাকা দিয়ে রাখ্য।

প্রলোভনরূপে আসে পরিহাসপটুতা,

সামলানো নাহি যায় অকারণ কটুতা।

বারে বারে এইমতো করি অত্যুক্তি

ক্ষমা করে কোরো সেই অপরাধমুক্তি।

আর যা-ই বলি নাকো এ কথাটা বলিবই,

তোমাদের দ্বারে মোরা ভিক্ষার থলি বই।

অন্ন ভরিয়া দাও সুধা তাহে লুকিয়ে,

মূল্য তাহারি আমি কিছু যাই চুকিয়ে।

অনেক গেয়েছি গান মুগ্ধ এ প্রাণ দিয়ে--

তোমরা তো শুনেছ তা, অন্তত কান দিয়ে।

পুরুষ পরুষ ভাষে করে সমালোচনা,

সে অকালে তোমাদেরি বাণী হয় রোচনা।

করুণায় ব'লে থাক, "আহা, মন্দ বা কী।"

খুঁটে বের কর না তো কোনো ছন্দ-ফাঁকি।

এইটুকু যা মিলেছে তাই পায় কজনা,

এত লোক করেছে তো ভারতীর ভজনা।

এর পর বাঁশি যবে ফেলে যাব ধুলিতে

তখন আমারে ভুলো পার যদি ভুলিতে।

সেদিন নূতন কবি দক্ষিণপবনে

মধু ঋতু মুখরিবে তোমাদের স্তবনে--

তখন আমার কোনো কীটে-কাটা পাতাতে

একটা লাইনও যদি পারে মন মাতাতে

তা হলে হঠাৎ বুক উঠিবে যে কাঁপিয়া

বৈতরণীতে যবে যাব খেয়া চাপিয়া।

এ কী গেরো। কাজ কী এ কল্পনাবিহারে,

সেণ্টিমেণ্টালিটি বলে লোকে ইহারে।

ম'রে তবু বাঁচিবার আবদার খোকামি,

সংসারে এর চেয়ে নেই ঘোর বোকামি।

এটা তো আধুনিকার সহিবে না কিছুতেই;

এস্‌টিমেশনে তার পড়ে যাব নিচুতেই।

অতএব, মন, তোর কলসি ও দড়ি আন্‌,

অতলে মারিস ডুব মিড্‌-ভিক্‌টোরিয়ান।

কোনো ফল ফলিবে না আঁখিজল-সিচনে;

শুকনো হাসিটা তবে রেখে যাই পিছনে।

গদ্‌গদ সুর কেন বিদায়ের পাঠটায়,

শেষ বেলা কেটে যাক ঠাট্টায় ঠাট্টায়।

তোমাদের মুখে থাক্‌ হাস্যের রোশনাই--

কিছু সীরিয়াস কথা বলি তবু, দোষ নাই।

কখনো দিয়েছে দেখা হেন প্রভাবশালিনী

শুধু এ-কালিনী নয়, যারা চিরকালিনী।

এ কথাটা ব'লে যাব মোর কন্‌ফেশানেই

তাদের মিলনে কোনো ক্ষণিকের নেশা নেই।

জীবনের সন্ধ্যায় তাহাদেরি বরণে

শেষ রবিরেখা রবে সোনা-আঁকা স্মরণে।

সুর-সুরধুনীধারে যে অমৃত উথলে

মাঝে মাঝে কিছু তার ঝ'রে পড়ে ভূতলে,

এ জনমে সে কথা জানার সম্ভাবনা

কেমনে ঘটিবে যদি সাক্ষাৎ পাব না।

আমাদের কত ত্রুটি আসনে ও শয়নে,

ক্ষমা ছিল চিরদিন তাহাদের নয়নে।

প্রেমদীপ জ্বেলেছিল পুণ্যের আলোকে,

মধুর করেছে তারা যত কিছু ভালোকে।

নানারূপে ভোগসুধা যা করেছে বরষন

তারে শুচি করেছিল সুকুমার পরশন।

দামি যাহা মিলিয়াছে জীবনের এ পারে

মরণের তীরে তারে নিয়ে যেতে কে পারে।

তবু মনে আশা করি মৃত্যুর রাতেও

তাহাদেরি প্রেম যেন নিতে পারি পাথেয়।

আর বেশি কাজ নেই, গেছে কেটে তিনকাল,

যে কালে এসেছি আজ সে কালটা সিনিকাল!

কিছু আছে যার লাগি সুগভীর নিশ্বাস

জেগে ওঠে-- ঢাকা থাক্‌ তার প্রতি বিশ্বাস।

একটু সবুর করো, আরো কিছু বলে যাই,

কথার চরম পারে তার পরে চলে যাই।

যে গিয়েছে তার লাগি খুঁচিয়ো না চেতনা,

ছায়ারে অতিথি ক'রে আসনটা পেতো না।

বৎসরে বৎসরে শোক করা রীতিটার।

মিথ্যার ধাক্কায় ভিত ভাঙে স্মৃতিটার।

ভিড় ক'রে ঘটা-করা ধরা-বাঁধা বিলাপে

পাছে কোনো অপরাধ ঘটে প্রথা-খিলাপে,

ভারতে ছিল না লেশ এই-সব খেয়ালের--

কবি-'পরে ভার ছিল নিজ মেমোরিয়ালের।

"ভুলিব না, ভুলিব না" এই ব'লে চীৎকার

বিধি না শোনেন কভু, বলো তাহে হিত কার।

যে ভোলা সহজ ভোলা নিজের অলক্ষ্যে

সে-ই ভালো হৃদয়ের স্বাস্থ্যের পক্ষে।

শুষ্ক উৎস খুঁজে মরুমাটি খোঁড়াটা,

তেলহীন দীপ লাগি দেশালাই পোড়াটা,

যে-মোষ কোথাও নেই সেই মোষ তাড়ানো,

কাজে লাগিবে না যাহা সেই কাজ বাড়ানো--

শক্তির বাজে ব্যয় এরে কয় জেনো হে,

উৎসাহ দেখাবার সদুপায় এ নহে।

মনে জেনো, জীবনটা মরণেরই যজ্ঞ--

স্থায়ী যাহা, আর যাহা থাকার অযোগ্য,

সকলি আহুতিরূপে পড়ে তারি শিখাতে,

টিঁকে না যা কথা দিয়ে কে পারিবে টিঁকাতে।

ছাই হয়ে গিয়ে তবু বাকি যাহা রহিবে

আপনার কথা সে তো আপনিই কহিবে।

 

 

  লাহোর, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৫