একটা আষাঢ়ে গল্প
Stories
দূর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ। সেখানে কেবল তাসের সাহেব, তাসের বিবি, টেক্কা এবং গোলামের বাস। দুরি তিরি হইতে নহলা-দহলা পর্যন্ত আরো অনেক-ঘর গৃহস্থ আছে কিন্তু তাহারা উচ্চজাতীয় নহে।
টেক্কা সাহেব গোলাম এই তিনটেই প্রধান বর্ণ, নহলা-দহলারা অন্ত্যজ-- তাহাদের সহিত এক পঙ্‌ক্তিতে বসিবার যোগ্য নহে।
আরো দেখুন
পান্নালাল
Stories
দাদামশায়, তোমার পাগলের দলের মধ্যে পান্নালাল ছিল খুব নতুন রকমের।
জান, দিদি? তোমার পাগলরা প্রত্যেকেই নতুন, কারও সঙ্গে কারও মিল হয় না। যেমন তোমার দাদামশায়। বিধাতার নতুন পরীক্ষা। ছাঁচ তিনি ভেঙে ফেলেন। সাধারণ লোকের বুদ্ধিতে মিল হয়, অসাধারণ পাগলের মিল হয় না। তোমাকে একটা উদাহরণ দেখাই--
আরো দেখুন
রীতিমত নভেল
Stories
'আল্লা হো আকবর' শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিনসহস্র আর্যসৈন্য। বন্যার মধ্যে একাকী অশ্বত্থবৃক্ষের মতো হিন্দুবীরগণ সমস্ত রাত্রি এবং সমস্ত দিন যুদ্ধ করিয়া অটল দাঁড়াইয়া ছিল কিন্তু এইবার ভাঙিয়া পড়িবে, তাহার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। এবং সেইসঙ্গে ভারতের জয়ধ্বজা ভূমিসাৎ হইবে এবং আজিকার ঐ অস্তাচলবর্তী সহস্ররশ্মির সহিত হিন্দুস্থানের গৌরবসূর্য চিরদিনের মতো অস্তমিত হইবে।
হর হর বোম্‌ বোম্‌! পাঠক বলিতে পার, কে ঐ দৃপ্ত যুবা পঁয়ত্রিশজন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করনিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রুসৈন্যের উপরে আসিয়া পতিত হইল? বলিতে পার, কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবনসৈন্য প্রচণ্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল?-- কাহার বজ্রমন্দ্রিত 'হর হর বোম্‌ বোম্‌' শব্দে তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের 'আল্লা হো আকবর' ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল? কাহার উদ্যত অসির সম্মুখে ব্যাঘ্র-আক্রান্ত মেষষুথের ন্যায় শত্রুসৈন্য মুহূর্তের মধ্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়নপর হইল? বলিতে পার, সেদিনকার আর্যস্থানের সূর্যদেব সহস্ররক্তকরস্পর্শে কাহার রক্তাক্ত তরবারিকে আশীর্বাদ করিয়া অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে গেলেন? বলিতে পার কি পাঠক।
আরো দেখুন
বিরহ
Verses
     আমি     নিশি নিশি কত রচিব শয়ন
                   আকুলনয়ন রে!
     কত      নিতি নিতি বনে করিব যতনে
                   কুসুমচয়ন রে!
     কত      শারদ যামিনী হইবে বিফল,
                   বসন্ত যাবে চলিয়া!
     কত      উদিবে তপন আশার স্বপন,
                   প্রভাতে যাইবে ছলিয়া!
     এই      যৌবন কত রাখিব বাঁধিয়া,
                   মরিব কাঁদিয়া রে!
     সেই     চরণ পাইলে মরণ মাগিব
                   সাধিয়া সাধিয়া রে।
     আমি     কার পথ চাহি এ জনম বাহি,
                   কার দরশন যাচি রে!
     যেন     আসিবে বলিয়া কে গেছে চলিয়া,
                   তাই আমি বসে আছি রে।
     তাই     মালাটি  গাঁথিয়া পরেছি মাথায়
                   নীলবাসে তনু ঢাকিয়া,
     তাই     বিজন আলয়ে প্রদীপ জ্বালায়ে
                   একেলা রয়েছি জাগিয়া।
     ওগো    তাই কত নিশি চাঁদ ওঠে হাসি,
                   তাই কেঁদে যায় প্রভাতে।
     ওগো    তাই ফুলবনে মধু সমীরণে
                   ফুটে ফুল কত শোভাতে!
     ওই      বাঁশিস্বর তার আসে বার বার,
                   সেই  শুধু কেন আসে না!
     এই      হৃদয়-আসন শূন্য যে থাকে,
                   কেঁদে মরে শুধু বাসনা।
     মিছে    পরশিয়া কায় বায়ু বহে যায়,
                   বহে যমুনার লহরী,
     কেন     কুহু কুহু পিক কুহরিয়া ওঠে--
                   যামিনী যে ওঠে শিহরি।
     ওগো    যদি নিশিশেষে আসে হেসে হেসে
                   মোর হাসি আর রবে কি!
     এই      জাগরণে ক্ষীণ বদন মলিন
                   আমারে হেরিয়া কবে কী!
     আমি     সারা রজনীর গাঁথা ফুলমালা
                   প্রভাতে চরণে ঝরিব,
     ওগো    আছে সুশীতল যমুনার জল--
                   দেখে তারে আমি মরিব।
আরো দেখুন
আহ্বান
Verses
আমার তরে পথের 'পরে কোথায় তুমি থাক
           সে-কথা আমি শুধাই বারে বারে।
কোথায় জানি আসনখানি সাজিয়ে তুমি রাখ
           আমার লাগি নিভৃতে একধারে।
বাতাস বেয়ে ইশারা পেয়ে গেছি মিলন-আশে
শিশিরধোয়া আলোতে-ছোঁয়া শিউলিছাওয়া ঘাসে,
খুঁজেছি দিশা বিলোল জল-কাকলিকলভাসে
         অধীরধারা নদীর পারে পারে।
আকাশকোণে মেঘের রঙে মায়ার যেথা মেলা,
তটের তলে স্বচ্ছ জলে ছায়ার যেথা খেলা,
অশথশাখে কপোত ডাকে, সেথায় সারাবেলা
       তোমার বাঁশি শুনেছি বারে বারে।
কেমনে বুঝি আমারে খুঁজি কোথায় তুমি ডাক,
        বাজিয়া উঠে ভীষণ তব ভেরি।
শরম লাগে, মন না জাগে, ছুটিয়া চলি নাকো,
        দ্বিধার ভরে দুয়ারে করি দেরি।
ডেকেছ তুমি মানুষ যেথা পীড়িত অপমানে,
আলোক যেথা নিবিয়া আসে শঙ্কাতুর প্রাণে,
আমারে চাহি ডঙ্কা তব বেজেছে সেইখানে
       বন্দী যেথা কাঁদিছে কারাগারে।
পাষাণ ভিত টলিছে যেথা ক্ষিতির বুক ফাটি
ধুলায়-চাপা অনলশিখা কাঁপায়ে তোলে মাটি,
নিমেষ আসি বহুযুগের বাঁধন ফেলে কাটি,
       সেথায় ভেরি বাজাও বারে বারে।
আরো দেখুন
দেনাপাওনা
Stories
পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জন্মিল তখন বাপমায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিল নিরুপমা। এ গোষ্ঠীতে এমন শৌখিন নাম ইতিপূর্বে কখনো শোনা যায় নাই। প্রায় ঠাকুরদেবতার নামই প্রচলিত ছিল-- গণেশ, কার্তিক, পার্বতী, তাহার উদাহরণ।
এখন নিরুপমার বিবাহের প্রস্তাব চলিতেছে। তাহার পিতা রামসুন্দর মিত্র অনেক খোঁজ করেন কিন্তু পাত্র কিছুতেই মনের মতন হয় না। অবশেষে মস্ত এক রায়বাহাদুরের ঘরের একমাত্র ছেলেকে সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছেন। উক্ত রায়বাহাদুরের পৈতৃক বিষয়-আশয় যদিও অনেক হ্রাস হইয়া আসিয়াছে কিন্তু বনেদি ঘর বটে।
আরো দেখুন
সমস্যাপূরণ
Stories
ঝিঁকড়কোটার কৃষ্ণগোপাল সরকার জ্যেষ্ঠপুত্রের প্রতি জমিদারি এবং সংসারের ভার দিয়া কাশী চলিয়া গেলেন। দেশের যত অনাথ দরিদ্র লোক তাঁহার জন্য হাহাকার করিয়া কাঁদিতে লাগিল। এমন বদান্যতা, এমন ধর্মনিষ্ঠতা কলিযুগে দেখা যায় না, এই কথা সকলেই বলিতে লাগিল।
তাঁহার পুত্র বিপিনবিহারী আজকালকার একজন সুশিক্ষিত বি-এ। দাড়ি রাখেন, চশমা পরেন, কাহারও সহিত বড়ো একটা মিশেন না। অতিশয় সচ্চরিত্র-- এমন কি, তামাকটি পর্যন্ত খান না, তাস পর্যন্ত খেলেন না। অত্যন্ত ভালোমানুষের মতো চেহারা, কিন্তু লোকটা ভারি কড়াক্কড়।
আরো দেখুন
গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে
Verses
                 ১
   গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে,
   নিভৃত নিরালা ঠাঁই, লেশমাত্র আলো নাই,
   লুকানো এ প্রেমসাধ গোপনে নিবসে,
   শুদ্ধ যবে ভালোবাসা নয়নে তোমার,
   ঈষৎ প্রদীপ্ত হয়, উচ্ছ্বসয়ে এ-হৃদয়,
   ভয়ে ভয়ে জড়সড় তখনি আবার।
               ২
   শূন্য এই মরমের সমাধি-গহ্বরে,
   জ্বলিছে এ প্রেমশিখা চিরকাল-তরে,
   কেহ না দেখিতে পায়, থেকেও না থাকা প্রায়,
   নিভিবারও নাম নাই নিরাশার ঘোরে।
               ৩
   যা হবার হইয়াছে-- কিন্তু প্রাণনাথ!
   নিতান্ত হইবে যবে এ শরীরপাত,
   আমার সমাধি-স্থানে কোরো নাথ কোরো মনে,
   রয়েছে এ এক দুঃখিনী হয়ে ধরাসাৎ।
               ৪
   যত যাতনা আছে দলুক আমায়,
   সহজে সহিতে নাথ সব পারা যায়,
   কিন্তু হে তুমি-যে মোরে, ভুলে যাবে একেবারে
   সে কথা করিতে মনে হৃদি ফেটে যায়।
               ৫
   রেখো তবে এই মাত্র কথাটি আমার,
   এই কথা শেষ কথা, কথা নাহি আর,
   (এ দেহ হইলে পাত, যদি তুমি প্রাণনাথ,
   প্রকাশো আমার তরে তিলমাত্র শোক,
   ধর্মত হবে না দোষী দোষিবে না লোক--
   কাতরে বিনয়ে তাই, এই মাত্র ভিক্ষা চাই,
   কখনো চাহি নে আরো কোনো ভিক্ষা আর)
   যবে আমি যাব ম'রে, চির এ দুঃখিনী তরে,
   বিন্দুমাত্র অশ্রুজল ফেলো একবার--
   আজন্ম এত যে ভালোবেসেছি তোমায়,
   সে প্রেমের প্রতিদান একমাত্র প্রতিদান,
   তা বই কিছুই আর দিয়ো না আমায়।
আরো দেখুন
11
Verses
পলাশ আনন্দমূর্তি জীবনের ফাগুনদিনের,
আজ এই সম্মানহীনের
দরিদ্র বেলায় দিলে দেখা
যেথা আমি সাথিহীন একা
উৎসবের প্রাঙ্গণ-বাহিরে
শস্যহীন মরুময় তীরে।
যেখানে এ ধরণীর প্রফুল্ল প্রাণের কুঞ্জ হতে
অনাদৃত দিন মোর নিরুদ্দেশ স্রোতে
ছিন্নবৃন্ত চলিয়াছে ভেসে
বসন্তের শেষে।
তবুও তো কৃপণতা নাই তব দানে,
যৌবনের পূর্ণ মূল্য দিলে মোর দীপ্তিহীন প্রাণে,
অদৃষ্টের অবজ্ঞারে কর নি স্বীকার --
ঘুচাইলে অবসাদ তার;
জানাইলে চিত্তে মোর লভি অনুক্ষণ
সুন্দরের অভ্যর্থনা, নবীনের আসে নিমন্ত্রণ।
আরো দেখুন
তোমার মোহন রূপে
Songs
তোমার   মোহন রূপে কে রয় ভুলে।
জানি না কি মরণ নাচে, নাচে গো ওই চরণমূলে॥
     শরৎ-আলোর আঁচল টুটে   কিসের ঝলক নেচে উঠে,
                   ঝড় এনেছ এলোচুলে॥
              কাঁপন ধরে বাতাসেতে--
পাকা ধানের তরাস লাগে, শিউরে ওঠে ভরা ক্ষেতে।
     জানি গো আজ হাহারবে   তোমার পূজা সারা হবে
                   নিখিল অশ্রু-সাগর কূলে॥
আরো দেখুন
একরাত্রি
Stories
সুরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়াছি, বউ-বউ খেলিয়াছি। তাহাদের বাড়িতে গেলে সুরবালার মা আমাকে বড় যত্ন করিতেন এবং আমাদের দুইজনকে একত্র করিয়া  আপনা-আপনি বলাবলি করিতেন,'আহা দুটিতে বেশ মানায়।'
ছোট ছিলাম কিন্তু কথাটার অর্থ একরকম বুঝতে পারিতাম। সুরবালার প্রতি যে সর্বসাধারণের অপেক্ষা আমার কিছু বিশেষ দাবি ছিল, সে ধারণা আমার মনে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল। সেই অধিকারমদে মত্ত হইয়া তাহার প্রতি যে আমি শাসন এবং উপদ্রব না করিতাম তাহা নহে। সেও সহিষ্ণুভাবে আমার সকলরকম  ফরমাশ খাটিত এবং শাস্তি বহন করিত। পাড়ায় তাহার রূপের প্রশংসা ছিল, কিন্তু বর্বর বালকের চক্ষে সে সৌন্দর্যের কোনো গৌরব ছিল না-- আমি কেবল জানিতাম, সুরবালা আমারই প্রভুত্ব স্বীকার করিবার জন্য পিতৃগৃহে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, এইজন্য সে আমার বিশেষরূপ অবহেলার পাত্র।
আরো দেখুন