স্ত্রীর পত্র
Stories
শ্রীচরণকমলেষু
আজ পনেরো বছর আমাদের বিবাহ হয়েছে,আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখি নি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি -- মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি;চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায় নি।
আরো দেখুন
বোষ্টমী
Stories
আমি লিখিয়া থাকি অথচ লোকরঞ্জন আমার কলমের ধর্ম নয়, এইজন্য লোকেও আমাকে সদাসর্বদা যে রঙে রঞ্জিত করিয়া থাকে তাহাতে কালির ভাগই বেশি। আমার সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনিতে হয়; কপালক্রমে সেগুলি হিতকথা নয়, মনোয়ারী তো নহেই।
শরীরে যেখানটায় ঘা পড়িতে থাকে সে জায়গাটা যত তুচ্ছই হোক সমস্ত দেহটাকে বেদনার জোরে সেই ছাড়াইয়া যায়। সে লোক গালি খাইয়া মানুষ হয়, সে আপনার স্বভাবকে যেন ঠেলিয়া একঝোঁকা হইয়া পড়ে। আপনার চারি দিককে ছাড়াইয়া আপনাকেই কেবল তাহার মনে পড়ে-- সেটা আরামও নয়, কল্যাণও নয়। আপনাকে ভোলাটাই তো স্বস্তি।
আরো দেখুন
সিদ্ধি
Stories
স্বর্গের অধিকারে মানুষ বাধা পাবে না, এই তার পণ। তাই, কঠিন সন্ধানে অমর হবার মন্ত্র সে শিখে নিয়েছে। এখন একলা বনের মধ্যে সেই মন্ত্র সে সাধনা করে।
বনের ধারে ছিল এক কাঠকুড়নি মেয়ে। সে মাঝে মাঝে আঁচলে ক'রে তার জন্যে ফল নিয়ে আসে, আর পাতার পাত্রে আনে ঝরনার জল।
আরো দেখুন
ম্যাজিশিয়ান
Stories
কুসমি বললে, আচ্ছা দাদামশায়, শুনেছি এক সময়ে তুমি বড়ো বড়ো কথা নিয়ে খুব বড়ো বড়ো বই লিখেছিলে।
জীবনে অনেক দুষ্কর্ম করেছি, তা কবুল করতে হবে। ভারতচন্দ্র বলেছেন, সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর।
আরো দেখুন
বাসাবদল
Verses
                       যেতেই হবে।
               দিনটা যেন খোঁড়া পায়ের মতো
                             ব্যন্ডেজেতে বাঁধা।
               একটু চলা, একটু থেমে-থাকা,
                        টেবিলটাতে হেলান দিয়ে বসা
                             সিঁড়ির দিকে চেয়ে।
                        আকাশেতে পায়রাগুলো ওড়ে
                             ঘুরে ঘুরে চক্র বেঁধে।
               চেয়ে দেখি দেয়ালে সেই লেখনখানি
                             গেল বছরের,
                        লালরঙা পেন্‌সিলে লেখা--
               "এসেছিলুম; পাই নি দেখা; যাই তা হলে।
                             দোসরা ডিসেম্বরে।'
               এ লেখাটি ধুলো ঝেড়ে রেখেছিলেম তাজা,
                        যাবার সময় মুছে দিয়ে যাব।
                   পুরোনো এক ব্লটিং কাগজ
               চায়ের ভোজে অলস ক্ষণের হিজিবিজি-কাটা,
                      ভাঁজ ক'রে তাই নিলেম জামার নিচে।
                             প্যাক করতে গা লাগে না,
                      মেজের 'পরে বসে আছি পা ছড়িয়ে।
               হাতপাখাটা ক্লান্ত হাতে
                      অন্যমনে দোলাই ধীরে ধীরে।
               ডেস্কে ছিল মেডেন্‌-হেয়ার পাতায় বাঁধা
                             শুকনো গোলাপ,
                   কোলে নিয়ে ভাবছি বসে--
                                  কী ভাবছি কে জানে।
               অবিনাশের ফরিদপুরে বাড়ি,
                   আনুকূল্য তার
                             বিশেষ কাজে লাগে
                                     আমার এ দশাতেই।
               কোথা থেকে আপনি এসে জোটে
                             চাইতে না চাইতেই,
                   কাজ পেলে সে ভাগ্য ব'লেই মানে--
                             খাটে মুটের মতো।
                        জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা,
                   লাগল ক'ষে আস্তিন গুটিয়ে।
          ওডিকোলন মুড়ে নিল পুরোনো এক আনন্দবাজারে।
                   ময়লা মোজায় জড়িয়ে নিল এমোনিয়া।
                        ড্রেসিং কেসে রাখল খোপে খোপে
                   হাত-আয়না, রূপোয় বাঁধা বুরুশ,
                             নখ চাঁচবার উখো,
          সাবানদানি, ক্রিমের কৌটো, ম্যাকাসারের তেল।
                        ছেড়ে-ফেলা শাড়িগুলো
                   নানা দিনের নিমন্ত্রণের
                        ফিকে গন্ধ ছড়িয়ে দিল ঘরে।
                   সেগুলো সব বিছিয়ে দিয়ে চেপে চেপে
          পাট করতে অবিনাশের যে-সময়টা গেল
                             নেহাত সেটা বেশি।
               বারে বারে ঘুরিয়ে আমার চটিজোড়া
                        কোঁচা দিয়ে যত্নে দিল মুছে,
               ফুঁ দিয়ে সে উড়িয়ে দিল ধুলোটা কাল্পনিক
                        মুখের কাছে ধ'রে।
               দেয়াল থেকে খসিয়ে নিল ছবিগুলো,
                        একটা বিশেষ ফোটো
               মুছল আপন আস্তিনেতে অকারণে।
                        একটা চিঠির খাম
                   হঠাৎ দেখি লুকিয়ে নিল
                        বুকের পকেটেতে।
               দেখে যেমন হাসি পেল, পড়ল দীর্ঘশ্বাস।
          কার্পেটটা গুটিয়ে দিল দেয়াল ঘেঁষে--
                             জন্মদিনের পাওয়া,
                                   হল বছর-সাতেক।
               অবসাদের ভারে অলস মন,
                   চুল বাঁধতে গা লাগে নাই সারা সকালবেলা,
               আলগা আঁচল অন্যমনে বাঁধি নি ব্রোচ দিয়ে।
                   কুটিকুটি ছিঁড়তেছিলেম একে-একে
                                  পুরোনো সব চিঠি--
               ছড়িয়ে রইল মেঝের 'পরে, ঝাঁট দেবে না কেউ
                   বোশেখমাসের শুকনো হাওয়া ছাড়া।
                        ডাক আনল পাড়ার পিয়ন বুড়ো,
               দিলেম সেটা কাঁপা হাতে রিডাইরেক্টেড ক'রে।
                   রাস্তা দিয়ে চলে গেল তপসি-মাছের হাঁক,
                             চমকে উঠে হঠাৎ পড়ল মনে--
                                      নাই কোনো দরকার।
               মোটর-গাড়ির চেনা শব্দ কখন দূরে মিলিয়ে গেছে
                             সাড়ে-দশটা বেলায়
                   পেরিয়ে গিয়ে হাজরা রোডের মোড়।
                             উজাড় হল ঘর,
          দেয়ালগুলো অবুঝ-পারা তাকিয়ে থাকে ফ্যাকাশে দৃষ্টিতে
                             যেখানে কেউ নেই।
                   সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছে দিল অবিনাশ
                             ট্যাক্সিগাড়ি-'পরে।
                   এই দরোজায় শেষ বিদায়ের বাণী
                             শোনা গেল ঐ ভক্তের মুখে--
                   বললে, "আমায় চিঠি লিখো।'
                             রাগ হল তাই শুনে
                                  কেন জানি বিনা কারণেই।
আরো দেখুন
প্রতিবেশিনী
Stories
আমার প্রতিবেশিনী বালবিধবা। যেন শরতের শিশিরাশ্রুপ্লুত শেফালির মতো বৃন্তচ্যুত; কোনো বাসরগৃহের ফুলশয্যার জন্য সে নহে, সে কেবল দেবপূজার জন্যই উৎসর্গ-করা।
তাহাকে আমি মনে মনে পূজা করিতাম। তাহার প্রতি আমার মনের ভাবটা যে কী ছিল পূজা ছাড়া তাহা অন্য কোনো সহজ ভাষায় প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করি না -- পরের কাছে তো নয়ই, নিজের কাছেও না।
আরো দেখুন
হালদারগোষ্ঠী
Stories
এই পরিবারটির মধ্যে কোনোরকমের গোল বাধিবার কোনো সংগত কারণ ছিল না। অবস্থাও সচ্ছল, মানুষগুলিও কেহই মন্দ নহে, কিন্তু তবুও গোল বাধিল।
কেননা, সংগত কারণেই যদি মানুষের সব-কিছু ঘটিত তবে তো লোকালয়টা একটা অঙ্কের খাতার মতো হইত, একটু সাবধানে চলিলেই হিসাবে কোথাও কোনো ভুল ঘটিত না; যদি বা ঘটিত সেটাকে রবার দিয়া মুছিয়া সংশোধন করিলেই চলিয়া যাইত।
আরো দেখুন
একরাত্রি
Stories
সুরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়াছি, বউ-বউ খেলিয়াছি। তাহাদের বাড়িতে গেলে সুরবালার মা আমাকে বড় যত্ন করিতেন এবং আমাদের দুইজনকে একত্র করিয়া  আপনা-আপনি বলাবলি করিতেন,'আহা দুটিতে বেশ মানায়।'
ছোট ছিলাম কিন্তু কথাটার অর্থ একরকম বুঝতে পারিতাম। সুরবালার প্রতি যে সর্বসাধারণের অপেক্ষা আমার কিছু বিশেষ দাবি ছিল, সে ধারণা আমার মনে বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছিল। সেই অধিকারমদে মত্ত হইয়া তাহার প্রতি যে আমি শাসন এবং উপদ্রব না করিতাম তাহা নহে। সেও সহিষ্ণুভাবে আমার সকলরকম  ফরমাশ খাটিত এবং শাস্তি বহন করিত। পাড়ায় তাহার রূপের প্রশংসা ছিল, কিন্তু বর্বর বালকের চক্ষে সে সৌন্দর্যের কোনো গৌরব ছিল না-- আমি কেবল জানিতাম, সুরবালা আমারই প্রভুত্ব স্বীকার করিবার জন্য পিতৃগৃহে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, এইজন্য সে আমার বিশেষরূপ অবহেলার পাত্র।
আরো দেখুন