মণিহারা
Stories
সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল। তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে।
বোটের ছাদের উপরে মাঝি নমাজ পড়িতেছে। পশ্চিমের জ্বলন্ত আকাশপটে তাহার নীরব উপাসনা ক্ষণে ক্ষণে ছবির মতো আঁকা পড়িতেছিল। স্থির রেখাহীন নদীর জলের উপর ভাষাতীত অসংখ্য বর্ণচ্ছটা দেখিতে দেখিতে ফিকা হইতে গাঢ় লেখায়, সোনার রঙ হইতে ইস্পাতের রঙে, এক আভা হইতে আর-এক আভায় মিলাইয়া আসিতেছিল।
আরো দেখুন
মুনশি
Stories
আচ্ছা দাদামশায়, তোমাদের সেই মুনশিজি এখন কোথায় আছেন।
এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব তার সময়টা বুঝি কাছে এসেছে, তবু হয়তো কিছুদিন সবুর করতে হবে।
আরো দেখুন
কর্মফল
Stories
আজ সতীশের মাসি সুকুমারী এবং মেসোমশায় শশধরবাবু আসিয়াছেন-- সতীশের মা বিধুমুখী ব্যস্তসমস্তভাবে তাঁহাদের অভ্যর্থনায় নিযুক্ত। 'এসো দিদি, বোসো। আজ কোন্‌ পুণ্যে রায়মশায়ের দেখা পাওয়া গেল! দিদি না আসলে তোমার আর দেখা পাবার জো নেই।'
শশধর। এতেই বুঝবে তোমার দিদির শাসন কিরকম কড়া। দিনরাত্রি চোখে চোখে রাখেন।
আরো দেখুন
ঘরেতে ভ্রমর এল
Songs
    ঘরেতে       ভ্রমর এল গুন্‌গুনিয়ে।
    আমারে      কার কথা সে যায় শুনিয়ে॥
আলোতে   কোন্‌ গগনে       মাধবী   জাগল বনে,
এল সেই     ফুল-জাগানোর খবর নিয়ে।
সারাদিন     সেই কথা সে যায় শুনিয়ে।
কেমনে   রহি ঘরে,       মন যে   কেমন করে,
কেমনে     কাটে যে দিন দিন গুনিয়ে।
কী মায়া   দেয় বুলায়ে,     দিল সব    কাজ ভুলায়ে,
বেলা যায় গানের সুরে জাল বুনিয়ে।
আমারে      কার কথা সে যায় শুনিয়ে॥
আরো দেখুন
ভুল স্বর্গ
Stories
লোকটি নেহাত বেকার ছিল।
তার কোনো কাজ ছিল না, কেবল শখ ছিল নানা রকমের।
আরো দেখুন
প্রলয়-নাচন নাচলে যখন
Songs
    প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে
হে নটরাজ, জটার বাঁধন পড়ল খুলে॥
        জাহ্নবী তাই মুক্তধারায়    উন্মাদিনী দিশা হারায়,
            সঙ্গীতে তার তরঙ্গদল উঠল দুলে॥
    রবির আলো সাড়া দিল আকাশ-পারে।
শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর-ছাড়ারে।
        আপন স্রোতে আপনি মাতে,    সাথি হল আপন-সাথে,
            সব-হারা সে সব পেল তার কূলে কূলে॥
আরো দেখুন
প্রথম চিঠি
Stories
বধূর সঙ্গে তার প্রথম মিলন, আর তার পরেই সে এই প্রথম এসেছে প্রবাসে।
চলে যখন আসে তখন বধূর লুকিয়ে কান্নাটি ঘরের আয়নার মধ্যে দিয়ে চকিতে ওর চোখে পড়ল।
আরো দেখুন
ললাটের লিখন
Stories
ছেলেবেলায় পৃথ্বীশের ডান দিকের কপালে চোট লেগেছিল ভুরুর মাঝখান থেকে উপর পর্যন্ত। সেই আঘাতে ডান চোখটাও সংকুচিত। পৃথ্বীশকে ভালো দেখতে কি না সেই প্রশ্নের উত্তরটা কাটা দাগের অবিচারে সম্পূর্ণ হতে পারল না। অদৃষ্টের এই লাঞ্ছনাকে এত দিন থেকে প্রকাশ্যে পৃথ্বীশ বহন করে আসছে তবুও দাগও যেমন মেলায় নি তেমনি ঘোচে নি তার সংকোচ। নতুন কারো সঙ্গে পরিচয় হবার উপলক্ষে প্রত্যেকবার ধিক্‌কারটা জেগে ওঠে মনে। কিন্তু বিধাতাকে গাল দেবার অধিকার তার নেই। তার রচনার ঐশ্বর্যকে বন্ধুরা স্বীকার করছে প্রচুর প্রশংসায়, শত্রুরা নিন্দাবাক্যের নিরন্তর কটুক্তিতে। লেখার চারি দিকে ভিড় জমছে। দু টাকা আড়াই টাকা দামের বইগুলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। সম্পাদকরা তার কলমের প্রসাদ ছুটোছাঁটা যা-ই পায় কিছুই ছাড়ে না। পাঠিকারা বলে, পৃথ্বীশবাবু মেয়েদের মন ও চরিত্র যেমন আশ্চর্য বোঝেন ও বর্ণনা করেন এমন সাধ্য নেই আর কোনো লেখকের। পুরুষ-বন্ধুরা বলে, ওর লেখায় মেয়েদের এত-যে স্তুতিবাদ সে কেবল হতভাগার ভাঙা কপালের দোষে। মুখশ্রী যদি অক্ষুণ্ন হত তা হলে মেয়েদের সম্বন্ধে সত্য কথা বাধত না মুখে। মুখের চেহারা বিপক্ষতা করায় মুখের অত্যুক্তিকে সহায় করেছে মনোহরণের অধ্যবসায়।
শ্রীমতী বাঁশরি সরকার ব্যারিস্টারি চক্রের মেয়ে-- বাপ ব্যারিস্টার, ভাইরা ব্যারিস্টার। দু বার গেছে য়ুরোপে ছুটি উপলক্ষে। সাজে সজ্জায় ভাষায় ভঙ্গিতে আছে আধুনিক যুগের সুনিপুণ উদ্দামতা। রূপসী বলতে যা বোঝায় তা নয়, কিন্তু আকৃতিটা যেন ফ্রেঞ্চ পালিশ দিয়ে ঝকঝকে করা।
আরো দেখুন
নামঞ্জুর গল্প
Stories
আমাদের আসর জমেছিল পোলিটিক্যাল লঙ্কাকাণ্ডের পালায়। হাল আমলের উত্তরকাণ্ডে আমরা সম্পূর্ণ ছুটি পাই নি বটে, কিন্তু গলা ভেঙেছে; তা ছাড়া সেই অগ্নিদাহের খেলা বন্ধ।
বঙ্গভঙ্গের রঙ্গভূমিতে বিদ্রোহীর অভিনয় শুরু হল। সবাই জানেন, এই নাট্যের পঞ্চম অঙ্কের দৃশ্য আলিপুর পেরিয়ে পৌঁছল আণ্ডামানের সমুদ্রকূলে। পারানির পাথেয় আমার যথেষ্ট ছিল, তবু গ্রহের গুণে এপারের হাজতেই আমার ভোগসমাপ্তি। সহযোগীদের মধ্যে ফাঁসিকাঠ পর্যন্ত যাদের সর্বোচ্চ প্রোমোশন হয়েছিল, তাদের প্রণাম করে আমি পশ্চিমের এক শহরের কোণে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় পসার জমিয়ে তুললেম।
আরো দেখুন
গরঠিকানি
Verses
বেঠিকানা তব
        আলাপ শব্দভেদী
দিল এ বিজনে
        আমার মৌন ছেদি।
দাদুর পদবী
        পেয়েছি, তাহার দায়
কোনো ছুতো করে
        কভু কি ঠেকানো যায়!
স্পর্ধা করিয়া
        ছন্দে লিখেছ চিঠি;
ছন্দেই তার
        জবাবটা যাক মিটি।
নিশ্চিত তুমি
        জানিতে মনের মধ্যে--
গর্ব আমার
        খর্ব হবে না গদ্যে।
লেখনীটা ছিল
        শক্ত জাতেরই ঘোড়া;
বয়সের দোষে
        কিছু তো হয়েছে খোঁড়া।
তোমাদের কাছে
        সেই লজ্জাটা ঢেকে
মনে সাধ, যেন
        যেতে পারি মান রেখে।
তোমার কলম
        চলে যে হালকা চালে,
আমারো কলম
        চালাব সে ঝাঁপতালে;
হাঁপ ধরে, তবু
        এই সংকল্পটা
টেনে রাখি, পাছে
        দাও বয়সের খোঁটা।
ভিতরে ভিতরে
        তবু জাগ্রত রয়
দর্পহরণ
        মধুসূদনের ভয়।
বয়স হলেই
        বৃদ্ধ হয়ে যে মরে
বড়ো ঘৃণা মোর
        সেই অভাগার 'পরে।
প্রাণ বেরোলেও
        তোমাদের কাছে তবু
তাই তো ক্লান্তি
        প্রকাশ করি নে কভু।
কিন্তু একটা
        কথায় লেগেছে ধোঁকা,
কবি বলেই কি
        আমারে পেয়েছ বোকা।
নানা উৎপাত
        করে বটে নানা লোকে,
সহ্য তো করি
        পষ্ট দেখেছ চোখে--
সেই কারণেই
        তুমি থাক দূরে দূরে,
বলেছ সে কথা
        অতি সকরুণ সুরে।
বেশ জানি, তুমি
        জান এটা নিশ্চয়--
উৎপাত সে যে
        নানা রকমের হয়।
কবিদের 'পরে
        দয়া করেছেন বিধি--
মিষ্টি মুখের
        উৎপাত আনে দিদি।
চাটু বচনের
        মিষ্টি রচন জানে;
ক্ষীরে সরে কেউ
        মিষ্টি বানিয়ে আনে।
কোকিলকণ্ঠে
        কেউ বা কলহ করে;
কেউ বা ভোলায়
        গানের তানের স্বরে।
তাই ভাবি, বিধি
        যদি দরদের ভুলে
এ উৎপাতের
        বরাদ্দ দেন তুলে,
শুকনো প্রাণটা
        মহা উৎপাত হবে।
উপমা লাগিয়ে
        কথাটা বোঝাই তবে।--
সামনে দেখো-না
        পাহাড়, শাবল ঠুকে
ইলেক্‌ট্রিকের
        খোঁটা পোঁতে তার বুকে;
সন্ধেবেলার
        মসৃণ অন্ধকারে
এখানে সেখানে
        চোখে আলো খোঁচা মারে।
তা দেখে চাঁদের
        ব্যথা যদি লাগে প্রাণে,
বার্তা পাঠায়
        শৈলশিখর-পানে--
বলে, "আজ হতে
        জ্যোৎস্নার উৎপাতে
আলোর আঘাত
        লাগাব না আর রাতে"--
ভেবে দেখো, তবে
        কথাটা কি হবে ভালো।
তাপের জ্বলন
        আনে কি সবারই আলো।
এখানেই চিঠি
        শেষ ক'রে যাই চলে--
ভেবো না যে তাহা
        শক্তি কমেছে ব'লে;
বুদ্ধি বেড়েছে
        তাহারই প্রমাণ এটা;
বুঝেছি, বেদম
        বাণীর হাতুড়ি পেটা
কথারে চওড়া
        করে বকুনির জোরে,
তেমনি যে তাকে
        দেয় চ্যাপটাও ক'রে।
বেশি যাহা তাই
        কম, এ কথাটা মানি--
চেঁচিয়ে বলার
        চেয়ে ভালো কানাকানি।
বাঙালি এ কথা
        জানে না ব'লেই ঠকে;
দাম যায় আর
        দম যায় যত বকে।
চেঁচানির চোটে
        তাই বাংলার হাওয়া
রাতদিন যেন
        হিস্‌টিরিয়ায় পাওয়া।
তারে বলে আর্ট
        না-বলা যাহার কথা;
ঢাকা খুলে বলা
        সে কেবল বাচালতা।
এই তো দেখো-না
        নাম-ঢাকা তব নাম;
নামজাদা খ্যাতি
        ছাপিয়ে যে ওর দাম।
এই দেখো দেখি,
        ভারতীর ছল কী এ।
বকা ভালো নয়,
        এ কথা বোঝাতে গিয়ে
খাতাখানা জুড়ে
        বকুনি যা হল জমা
আর্টের দেবী
        করিবে কি তারে ক্ষমা।
সত্য কথাটা
        উচিত কবুল করা--
রব যে উঠেছে
        রবিরে ধরেছে জরা,
তারই প্রতিবাদ
        করি এই তাল ঠুকে;
তাই ব'কে যাই
        যত কথা আসে মুখে।
এ যেন কলপ
        চুলে লাগাবার কাজ--
ভিতরেতে পাকা,
        বাহিরে কাঁচার সাজ।
ক্ষীণ কণ্ঠেতে
        জোর দিয়ে তাই দেখাই,
বকবে কি শুধু
        নাতনিজনেরা একাই।
মানব না হার
        কোনো মুখরার কাছে,
সেই গুমোরের
        আজো ঢের বাকি আছে।
আরো দেখুন
শেষের রাত্রি
Stories
'মাসি !'
'ঘুমোও,যতীন,রাত হল যে ।'
আরো দেখুন
দর্পহরণ
Stories
কী করিয়া গল্প লিখিতে হয়, তাহা সম্প্রতি শিখিয়াছি। বঙ্কিমবাবু এবং সার্‌ ওয়াল্‌টার স্কট পড়িয়া আমার বিশেষ ফল হয় নাই। ফল কোথা হইতে কেমন করিয়া হইল, আমার এই প্রথম গল্পেই সেই কথাটা লিখিতে বসিলাম।
আমার পিতার মতামত অনেকরকম ছিল; কিন্তু বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কোনো মত তিনি কেতাব বা স্বাধীনবুদ্ধি হইতে গড়িয়া তোলেন নাই। আমার বিবাহ যখন হয় তখন সতেরো উত্তীর্ণ হইয়া আঠারোয় পা দিয়াছি; তখন আমি কলেজে থার্ডইয়ারে পড়ি-- এবং তখন আমার চিত্তক্ষেত্রে যৌবনের প্রথম দক্ষিণবাতাস বহিতে আরম্ভ করিয়া কত অলক্ষ্য দিক হইতে কত অনির্বচনীয় গীতে এবং গন্ধে, কম্পনে এবং মর্মরে আমার তরুণ জীবনকে উৎসুক করিয়া তুলিতেছিল, তাহা এখনো মনে হইলে বুকের ভিতরে দীর্ঘনিশ্বাস ভরিয়া উঠে।
আরো দেখুন