প্রাণমন
Stories
আমার জানলার সামনে রাঙা মাটির রাস্তা।
ওখান দিয়ে বোঝাই নিয়ে গোরুর গাড়ি চলে; সাঁওতাল মেয়ে খড়ের আঁটি মাথায় করে হাটে যায়, সন্ধ্যাবেলায় কলহাস্যে ঘরে ফেরে।
আরো দেখুন
হঠাৎ দেখা
Verses
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
                 ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।
      আগে ওকে বারবার দেখেছি
            লালরঙের শাড়িতে
                 দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
                 আঁচল তুলেছে মাথায়
      দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।
            মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
                     ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
                 যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
                      শালবনের নীলাঞ্জনে।
                     থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;
      চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।
            হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
                     আমাকে করলে নমস্কার।
            সমাজবিধির পথ গেল খুলে,
                      আলাপ করলেম শুরু --
            কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার
                             ইত্যাদি।
      সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।
      দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,
            কোনোটা বা দিলেই না।
      বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় --
            কেন এ-সব কথা,
      এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা।
                 আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
                       ওর সাথিদের সঙ্গে।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।
            মনে হল কম সাহস নয়;
                 বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
                         বললে মৃদুস্বরে,
                 "কিছু মনে কোরো না,
            সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
      আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
               দূরে যাবে তুমি,
      দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
    তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
      শুনব তোমার মুখে।
            সত্য করে বলবে তো?
আমি বললেম, "বলব।"
      বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,
"আমাদের গেছে যে দিন
      একেবারেই কি গেছে,
            কিছুই কি নেই বাকি।"
একটুকু রইলেম চুপ করে;
      তারপর বললেম,
      "রাতের সব তারাই আছে
              দিনের আলোর গভীরে।"
খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।
    ও বললে, "থাক্‌, এখন যাও ও দিকে।"
           সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে;
                          আমি চললেম একা।
আরো দেখুন
কর্মফল
Stories
আজ সতীশের মাসি সুকুমারী এবং মেসোমশায় শশধরবাবু আসিয়াছেন-- সতীশের মা বিধুমুখী ব্যস্তসমস্তভাবে তাঁহাদের অভ্যর্থনায় নিযুক্ত। 'এসো দিদি, বোসো। আজ কোন্‌ পুণ্যে রায়মশায়ের দেখা পাওয়া গেল! দিদি না আসলে তোমার আর দেখা পাবার জো নেই।'
শশধর। এতেই বুঝবে তোমার দিদির শাসন কিরকম কড়া। দিনরাত্রি চোখে চোখে রাখেন।
আরো দেখুন
রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা
Stories
যাহারা বলে, গুরুচরণের মৃত্যুকালে তাঁহার দ্বিতীয় পক্ষের সংসারটি অন্তঃপুরে বসিয়া তাস খেলিতেছিলেন, তাহারা বিশ্বনিন্দুক, তাহারা তিলকে তাল করিয়া তোলে। আসলে গৃহিণী তখন এক পায়ের উপর বসিয়া দ্বিতীয় পায়ের হাঁটু চিবুক পর্যন্ত উত্থিত করিয়া কাঁচা তেঁতুল, কাঁচা লঙ্কা এবং চিংড়িমাছের ঝালচচ্চড়ি দিয়া অত্যন্ত মনোযোগের সহিত পান্তাভাত খাইতেছিলেন। বাহির হইতে যখন ডাক পড়িল, তখন স্তূপাকৃতি চর্বিত ডাঁটা এবং নিঃশেষিত অন্নপাত্রটি ফেলিয়া গম্ভীরমুখে কহিলেন, "দুটো পান্তাভাত-যে মুখে দেব, তারও সময় পাওয়া যায় না।"
এ দিকে ডাক্তার যখন জবাব দিয়া গেল তখন গুরুচরণের ভাই রামকানাই রোগীর পার্শ্বে বসিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, "দাদা, যদি তোমার উইল করিবার ইচ্ছা থাকে তো বলো!" গুরুচরণ ক্ষীণস্বরে বলিলেন, "আমি বলি, তুমি লিখিয়া লও।" রামকানাই কাগজকলম লইয়া প্রস্তুত হইলেন। গুরুচরণ বলিয়া গেলেন, "আমার স্থাবর অস্থাবর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি আমার ধর্মপত্নী শ্রীমতী বরদাসুন্দরীকে দান করিলাম।" রামকানাই লিখিলেন- কিন্তু লিখিতে তাঁহার কলম সরিতেছিল না। তাঁহার বড়ো আশা ছিল, তাঁহার একমাত্র পুত্র নবদ্বীপ অপুত্রক জ্যাঠামহাশয়ের সমস্ত বিষয়সম্পত্তির অধিকারী হইবে। যদিও দুই ভাইয়ে পৃথগন্ন ছিলেন, তথাপি এই আশায় নবদ্বীপের মা নবদ্বীপকে কিছুতেই চাকরি করিতে দেন নাই-- এবং সকাল-সকাল বিবাহ দিয়াছিলেন, এবং শত্রুর মুখে ভস্ম নিক্ষেপ করিয়া বিবাহ নিষ্ফল হয় নাই। কিন্তু তথাপি রামকানাই লিখিলেন এবং সই করিবার জন্য কলমটা দাদার হাতে দিলেন। গুরুচরণ নির্জীব হস্তে যাহা সই করিলেন, তাহা কতকগুলা কম্পিত বক্ররেখা কি তাঁহার নাম, বুঝা দুঃসাধ্য।
আরো দেখুন
হে মাধবী, দ্বিধা কেন
Songs
হে মাধবী, দ্বিধা কেন, আসিবে কি ফিরিবে কি--
আঙিনাতে বাহিরিতে মন কেন গেল ঠেকি॥
বাতাসে লুকায়ে থেকে   কে যে তোরে গেছে ডেকে,
পাতায় পাতায় তোরে পত্র সে যে গেছে লেখি॥
কখন্‌ দখিন হতে কে দিল দুয়ার ঠেলি,
চমকি উঠিল জাগি চামেলি নয়ন মেলি।
বকুল পেয়েছে ছাড়া,   করবী দিয়েছে সাড়া,
শিরীষ শিহরি উঠে দূর হতে কারে দেখি॥
আরো দেখুন
আমার মালার ফুলের দলে
Songs
                       আমার মালার ফুলের দলে আছে লেখা
                                বসন্তের মন্ত্রলিপি।
                       এর মাধুর্যে আছে যৌবনের আমন্ত্রণ।
                       সাহানা রাগিণী এর
                              রাঙা রঙে রঞ্জিত,
                       মধুকরের ক্ষুধা অশ্রুত ছন্দে
                              গন্ধে তার গুঞ্জরে।
                   আন্‌ গো ডালা, গাঁথ্‌ গো মালা,
                   আন্‌ মাধবী মালতী অশোকমঞ্জরী,
                            আয় তোরা আয়।
                   আন্‌ করবী রঙ্গন কাঞ্চন রজনীগন্ধা
                              প্রফুল্ল মল্লিকা,
                            আয় তোরা আয়।
                   মালা পর্‌ গো মালা পর্‌ সুন্দরী,
                            ত্বরা কর্‌ গো ত্বরা কর্‌।
                   আজি পূর্ণিমা রাতে জাগিছে চন্দ্রমা,
                             বকুলকুঞ্জ
                   দক্ষিণবাতাসে দুলিছে কাঁপিছে
                             থরথর মৃদু মর্মরি।
                   নৃত্যপরা বনাঙ্গনা বনাঙ্গনে সঞ্চরে,
                   চঞ্চলিত চরণ ঘেরি মঞ্জীর তার গুঞ্জরে।
                   দিস নে মধুরাতি বৃথা বহিয়ে
                             উদাসিনী, হায় রে।
                   শুভলগন গেলে চলে ফিরে দেবে না ধরা,
                             সুধাপসরা
                   ধুলায় দেবে শূন্য করি,
                             শুকাবে বঞ্জুলমঞ্জরী।
                   চন্দ্রকরে অভিষিক্ত নিশীথে ঝিল্লিমুখর বনছায়ে
                   তন্দ্রাহারা পিক-বিরহকাকলি-কূজিত দক্ষিণবায়ে
                   মালঞ্চ মোর ভরল ফুলে ফুলে ফুলে গো,
                   কিংশুকশাখা চঞ্চল হল দুলে দুলে গো॥
আরো দেখুন
তারাপ্রসন্নের কীর্তি
Stories
লেখকজাতির প্রকৃতি অনুসারে তারাপ্রসন্ন কিছু লাজুক এবং মুখচোরা ছিলেন। লোকের কাছে বাহির হইতে গেলে তাঁহার সর্বনাশ উপস্থিত হইত। ঘরে বসিয়া কলম চালাইয়া তাঁহার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, পিঠ একটু কুঁজা, সংসারের অভিজ্ঞতা অতি অল্প। লৌকিকতার বাঁধি বোলসকল সহজে তাঁহার মুখে আসিত না, এইজন্য গৃহদুর্গের বাহিরে তিনি আপনাকে কিছুতেই নিরাপদ মনে করিতেন না।
লোকেও তাঁহাকে একটা উজবুক রকমের মনে করিত এবং লোকেরও দোষ দেওয়া যায় না। মনে করো, প্রথম পরিচয়ে একটি পরম ভদ্রলোক উচ্ছ্বসিত কন্ঠে তারাপ্রসন্নকে বলিলেন, "মহাশয়ের সহিত সাক্ষাৎ হয়ে যে কী পর্যন্ত আনন্দ লাভ করা গেল, তা একমুখে বলতে পারি নে"-- তারাপ্রসন্ন নিরুত্তর হইয়া নিজের দক্ষিণ করতল বিশেষ মনোযোগপূর্বক নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। হঠাৎ সে নীরবতার অর্থ এইরূপ মনে হয়, "তা, তোমার আনন্দ হয়েছে সেটা খুব সম্ভব বটে, কিন্তু আমার-যে আনন্দ হয়েছে এমন মিথ্যা কথাটা কী করে মুখে উচ্চারণ করব তাই ভাবছি।"
আরো দেখুন
ঘরে বাইরে
Novels
মা গো, আজ মনে পড়ছে তোমার সেই সিঁথের সিঁদুর, চওড়া সেই লাল-পেড়ে শাড়ি, সেই তোমার দুটি চোখ-- শান্ত, স্নিগ্ধ, গভীর। সে যে দেখেছি আমার চিত্তাকাশে ভোরবেলাকার অরুণরাগরেখার মতো। আমার জীবনের দিন যে সেই সোনার পাথেয় নিয়ে যাত্রা করে বেরিয়েছিল। তার পরে? পথে কালো মেঘ কি ডাকাতের মতো ছুটে এল? সেই আমার আলোর সম্বল কি এক কণাও রাখল না? কিন্তু জীবনের ব্রাহ্মমুহূর্তে সেই-যে উষাসতীর দান, দুর্যোগে সে ঢাকা পড়ে, তবু সে কি নষ্ট হবার?
আমাদের দেশে তাকেই বলে সুন্দর যার বর্ণ গৌর। কিন্তু যে আকাশ আলো দেয় সে যে নীল। আমার মায়ের বর্ণ ছিল শামলা, তাঁর দীপ্তি ছিল পুণ্যের। তাঁর রূপ রূপের গর্বকে লজ্জা দিত।
এসো পাপ, এসো সুন্দরী!
তব চুম্বন-অগ্নি-মদিরা রক্তে ফিরুক সঞ্চরি।
অকল্যাণের বাজুক শঙ্খ,
ললাটে, লেপিয়া দাও কলঙ্ক,
নির্লাজ কালো কলুষপঙ্ক
    বুকে দাও প্রলয়ংকরী!
      রাই আমার    চলে যেতে ঢলে পড়ে।
               অগাধ জলের মকর যেমন,
                         ও তার    চিটে চিনি জ্ঞান নেই!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
বিদ্যাপতি কহে কৈসে গোয়াঁয়বি
হরি বিনে দিনরাতিয়া?
আমার নিকড়িয়া রসের রসিক কানন ঘুরে ঘুরে
      নিকড়িয়া বাঁশের বাঁশি বাজায় মোহন সুরে।
আমার ঘর বলে, তুই কোথায় যাবি,
বাইরে গিয়ে সব খোয়াবি--
আমার প্রাণ বলে, তোর যা আছে সব
যাক-না উড়ে পুড়ে।
ওগো,যায় যদি তো যাক-না চুকে,
সব হারাব হাসিমুখে,
আমি এই চলেছি মরণসুধা
নিতে পরান পূরে।
ওগো, আপন যারা কাছে টানে
এ রস তারা কেই বা জানে,
আমার বাঁকা পথের বাঁকা সে যে
ডাক দিয়েছে দূরে।
এবার বাঁকার টানে সোজার বোঝা
পড়ুক ভেঙে-চুরে।
যখন দেখা দাও নি, রাধা, তখন বেজেছিল বাঁশি।
এখন চোখে চোখে চেয়ে সুর যে আমার গেল ভাসি।
তখন নানা তানের ছলে
ডাক ফিরেছে জলে স্থলে,
এখন আমার সকল কাঁদা রাধার রূপে উঠল হাসি।
বঁধুর লাগি কেশে আমি পরব এমন ফুল
স্বর্গে মর্তে তিন ভুবনে নাইকো যাহার মূল।
বাঁশির ধ্বনি হাওয়ায় ভাসে,
সবার কানে বাজবে না সে--
দেখ্‌ লো চেয়ে যমুনা ওই ছাপিয়ে গেল কূল।
She should never have looked at me,
If she meant I should not love her!
There are plenty... men you call such,
I suppose... she may discover
All her soul to, if she pleases,
And yet leave much as she found them:
But I'm not so, and she knew it
When she fixed me, glancing round them.
আমায় ভালো বাসবে না সে এই যদি তার ছিল জানা,
তবে কি তার উচিত ছিল আমার-পানে দৃষ্টি হানা?
তেমন-তেমন অনেক মানুষ আছে তো এই ধরাধামে
(যদিচ ভাই, আমি তাদের গণি নেকো মানুষ নামে)--
যাদের কাছে সে যদি তার খুলে দিত প্রাণের ঢাকা,
তবু তারা রইত খাড়া যেমন ছিল তেমনি ফাঁকা।
আমি তো নই তাদের মতন সে কথা সে জানত মনে
যখন মোরে বাঁধল ধ'রে বিদ্ধ ক'রে নয়নকোণে।
মধুঋতু নিত্য হয়ে রইল তোমার মধুর দেশে।
যাওয়া-আসার কান্নাহাসি হাওয়ায় সেথা বেড়ায় ভেসে।
যার যে জনা সেই শুধু যায়, ফুল ফোটা তো ফুরোয় না হায়--
ঝরবে যে ফুল সেই কেবলি ঝরে পড়ে বেলাশেষে।
যখন আমি ছিলেম কাছে তখন কত দিয়েছি গান;
এখন আমার দূরে যাওয়া, এরও কি গো নাই কোনো দান?
পুষ্পবনের ছায়ায় ঢেকে এই আশা তাই গেলেম রেখে--
আগুন-ভরা ফাগুনকে তোর কাঁদায় যেন আষাঢ় এসে॥
আরো দেখুন
অতিথি
Stories
কাঁঠালিয়ার জমিদার মতিলালবাবু নৌকা করিয়া সপরিবারে স্বদেশে যাইতেছিলেন। পথের মধ্যে মধ্যাহ্নে নদীতীরের এক গঞ্জের নিকট নৌকা বাঁধিয়া পাকের আয়োজন করিতেছেন এমন সময় এক ব্রাহ্মণবালক আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'বাবু, তোমরা যাচ্ছ কোথায়?'
প্রশ্নকর্তার বয়স পনেরো-ষোলোর অধিক হইবে না।
আরো দেখুন