ইঁদুরের ভোজ
Stories
ছেলেরা বললে, ভারি অন্যায়, আমরা নতুন পণ্ডিতের কাছে কিছুতেই পড়ব না।
নতুন পণ্ডিতমশায় যিনি আসছেন তাঁর নাম কালীকুমার তর্কালঙ্কার।
আরো দেখুন
বালক
Verses
হিরণমাসির প্রধান প্রয়োজন রান্নাঘরে।
      দুটি ঘড়া জল আনতে হয় দিঘি থেকে--
         তার দিঘিটা ওই দুই ঘড়ারই মাপে
                 রান্নাঘরের পিছনে বাঁধা দরকারের বাঁধনে।
এ দিকে তার মা-মরা বোনপো,
    গায়ে যে রাখে না কাপড়,
        মনে যে রাখে না সদুপদেশ,
           প্রয়োজন যার নেই কোনো কিছুতেই,
সমস্ত দিঘির মালেক সেই লক্ষ্মীছাড়াটা।
        যখন খুশি ঝাঁপ দিয়ে পড়ে জলে,
    মুখে জল নিয়ে আকাশে ছিটোতে ছিটোতে সাঁতার কাটে,
ছিনিমিনি খেলে ঘাটে দাঁড়িয়ে,
      কঞ্চি নিয়ে করে মাছ-ধরা খেলা,
         ডাঙায় গাছে উঠে পাড়ে জামরুল--
             খায় যত ছড়ায় তার বেশি।
      দশ-আনির টাক-পড়া মোটা জমিদার,
         লোকে বলে দিঘির স্বত্ব তারই--
বেলা দশটায় সে চাপড়ে চাপড়ে তেল মাখে বুকে পিঠে,
             ঝপ্‌ করে দুটো ডুব দিয়ে নেয়,
বাঁশবনের তলা দিয়ে দুর্গা নাম করতে করতে চলে ঘরে--
             সময় নেই, জরুরি মকর্দমা।
         দিঘিটা আছে তার দলিলে, নেই তার জগতে।
আর ছেলেটার দরকার নেই কিছুতেই,
             তাই সমস্ত বন-বাদাড় খাল-বিল তারই--
      নদীর ধার, পোড়ো জমি, ডুবো নৌকা, ভাঙা মন্দির,
             তেঁতুল গাছের সবার উঁচু ডালটা।
জামবাগানের তলায় চরে ধোবাদের গাধা,
         ছেলেটা তার পিঠে চড়ে--
             ছড়ি হাতে জমায় ঘোড়দৌড়।
      ধোবাদের গাধাটা আছে কাজের গরজে--
             ছেলেটার নেই কোনো দরকার,
      তাই জন্তুটা তার চার পা নিয়ে সমস্তটা তারই,
             যাই বলুন-না জজসাহেব।
      বাপ মা চায় পড়ে শুনে হবে সে সদর-আলা;
সর্দার পোড়ো ওকে টেনে নামায় গাধার থেকে,
         হেঁচড়ে আনে বাঁশবন দিয়ে,
             হাজির করে পাঠশালায়।
মাঠে ঘাটে হাটে বাটে জলে স্থলে তার স্বরাজ--
         হঠাৎ দেহটাকে ঘিরলে চার দেয়ালে,
             মনটাকে আঠা দিয়ে এঁটে দিলে
                 পুঁথির পাতার গায়ে।
আমিও ছিলেম একদিন ছেলেমানুষ।
         আমার জন্যেও বিধাতা রেখেছিলেন গড়ে
             অকর্মণ্যের অপ্রয়োজনের জল স্থল আকাশ।
তবু ছেলেদের সেই মস্ত বড়ো জগতে
         মিলল না আমার জায়গা।
আমার বাসা অনেক কালের পুরোনো বাড়ির
             কোণের ঘরে--
                 বাইরে যাওয়া মানা।
  সেখানে চাকর পান সাজে, দেয়ালে মোছে হাত,
             গুন গুন ক'রে গায় মধুকানের গান;
    শান-বাঁধানো মেজে, খড়্‌খড়ে-দেওয়া জানলা।
নীচে ঘাট-বাঁধানো পুকুর, পাঁচিল ঘেঁষে নারকেল গাছ।
    জটাধারী বুড়ো বট মোটা মোটা শিকড়ে
               আঁকড়ে ধরেছে পুব ধারটা।
        সকাল থেকে নাইতে আসে পাড়ার লোকে,
           বিকেলের পড়ন্ত রোদে ঝিকিমিকি জলে
               ভেসে বেড়ায় পাতিহাঁসগুলো,
                   পাখা সাফ করে ঠোঁট দিয়ে মেজে।
প্রহরের পর কাটে প্রহর।
        আকাশে ওড়ে চিল,
    থালা বাজিয়ে যায় পুরোনো কাপড়ওয়ালা,
        বাঁধানো নালা দিয়ে গঙ্গার জল এসে পড়ে পুকুরে।
    পৃথিবীতে ছেলেরা যে খোলা জগতের যুবরাজ
               আমি সেখানে জন্মেছি গরিব হয়ে।
                       শুধু কেবল
    আমার খেলা ছিল মনের ক্ষুধায়, চোখের দেখায়,
           পুকুরের জলে, বটের শিকড়-জড়ানো ছায়ায়,
নারকেলের দোদুল ডালে, দূর বাড়ির রোদ-পোহানো ছাদে।
               অশোকবনে এসেছিল হনুমান,
    সেদিন সীতা পেয়েছিলেন নবদূর্বাদলশ্যাম রামচন্দ্রের খবর।
আমার হনুমান আসত বছরে বছরে আষাঢ় মাসে
           আকাশ কালো করে
                   সজল নবনীল মেঘে।
        আনত তার মেদুর কণ্ঠে দূরের বার্তা,
               যে দূরের অধিকার থেকে আমি নির্বাসিত।
        ইমারত-ঘেরা ক্লিষ্ট যে আকাশটুকু
               তাকিয়ে থাকত একদৃষ্টে আমার মুখে,
        বাদলের দিনে গুরুগুরু ক'রে তার বুক উঠত দুলে।
বট গাছের মাথা পেরিয়ে কেশর ফুলিয়ে দলে দলে
               মেঘ জুটত ডানাওয়ালা কালো সিংহের মতো।
    নারকেল-ডালের সবুজ হত নিবিড়,
               পুকুরের জল উঠত শিউরে শিউরে।
        যে চাঞ্চল্য শিশুর জীবনে রুদ্ধ ছিল
               সেই চাঞ্চল্য বাতাসে বাতাসে, বনে বনে।
পুব দিকের ও পার থেকে বিরাট এক ছেলেমানুষ ছাড়া পেয়েছে আকাশে,
               আমার সঙ্গে সে সাথি পাতালে।
        বৃষ্টি পড়ে ঝমাঝম। একে একে
পুকুরের পৈঁঠা যায় জলে ডুবে।
        আরো বৃষ্টি, আরো বৃষ্টি, আরো বৃষ্টি।
রাত্তির হয়ে আসে, শুতে যাই বিছানায়,
        খোলা জানলা দিয়ে গন্ধ পাই ভিজে জঙ্গলের।
               উঠোনে একহাঁটু জল,
ছাদের নালার মুখ থেকে জলে পড়ছে জল মোটা ধারায়।
           ভোরবেলায় ছুটেছি দক্ষিণের জানলায়,
                   পুকুর গেছে ভেসে;
        জল বেরিয়ে চলেছে কল্‌কল্‌ করে বাগানের উপর দিয়ে,
    জলের উপর বেলগাছগুলোর ঝাঁকড়া মাথা জেগে থাকে।
পাড়ার লোকে হৈ হৈ করে এসেছে
        গামছা দিয়ে ধুতির কোঁচা দিয়ে মাছ ধরতে।
           কাল পর্যন্ত পুকুরটা ছিল আমারি মতো বাঁধা,
    এ বেলা ও বেলা তার উপরে পড়ত গাছের ছায়া,
           উড়ো মেঘ জলে বুলিয়ে যেত ক্ষণিকের ছায়াতুলি,
    বটের ডালের ভিতর দিয়ে যেন সোনার পিচকারিতে
           ছিটকে পড়ত তার উপরে আলো--
    পুকুরটা চেয়ে থাকত আকাশে ছল্‌ছলে দৃষ্টিতে।
           আজ তার ছুটি, কোথায় সে চলল খ্যাপা
                   গেরুয়া-পরা বাউল যেন।
পুকুরের কোণে নৌকোটি
    দাদারা চড়ে বসল ভাসিয়ে দিয়ে,
        গেল পুকুর থেকে গলির মধ্যে,
           গলির থেকে সদর রাস্তায়--
তার পরে কোথায় জানি নে। বসে বসে ভাবি।
           বেলা বাড়ে।
    দিনান্তের ছায়া মেশে মেঘের ছায়ায়,
           তার সঙ্গে মেশে পুকুরের জলে বটের ছায়ার কালিমা।
                   সন্ধে হয়ে এল।
    বাতি জ্বলল ঝাপসা আলোয় রাস্তার ধারে ধারে,
           ঘরে জ্বলেছে কাঁচের সেজে মিট্‌মিটে শিখা,
ঘোর অন্ধকারে একটু একটু দেখা যায়
           দুলছে নারকেলের ডাল,
                   ভূতের ইশারা যেন।
গলির পারে বড়ো বাড়িতে সব দরজা বন্ধ,
        আলো মিট্‌ মিট্‌ করে দুই-একটা জানলা দিয়ে
           চেয়ে-থাকা ঘুমন্ত চোখের মতো।
        তার পরে কখন আসে ঘুম।
    রাত দুটোর সময় স্বরূপ সর্দার নিষুত রাতে
           বারান্দায় বারান্দায় হাঁক দিয়ে যায় চলে।
বাদলের দিনগুলো বছরে বছরে তোলপাড় করেছে আমার মন;
        আজ তারা বছরে বছরে নাড়া দেয় আমার গানের সুরকে।
    শালের পাতায় পাতায় কোলাহল,
        তালের ডালে ডালে করতালি,
               বাঁশের দোলাদুলি বনে বনে--
    ছাতিম গাছের থেকে মালতীলতা
               ঝরিয়ে দেয় ফুল।
আর সেদিনকার আমারি মতো অনেক ছেলে আছে ঘরে ঘরে,
        লাঠাইয়ের সুতোয় মাখাচ্ছে আঠা,
               তাদের মনের কথা তারাই জানে।
আরো দেখুন
রাজপথের কথা
Stories
আমি রাজপথ। অহল্যা যেমন মুনির শাপে পাষাণ হইয়া পড়িয়া ছিল, আমিও যেন তেমনি কাহার শাপে চিরনিদ্রিত সুদীর্ঘ অজগর সর্পের ন্যায় অরণ্যপর্বতের মধ্য দিয়া, বৃক্ষশ্রেণীর ছায়া দিয়া, সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরের বক্ষের উপর দিয়া দেশদেশান্তর বেষ্টন করিয়া বহুদিন ধরিয়া জড়শয়নে শয়ান রহিয়াছি। অসীম ধৈর্যের সহিত ধুলায় লুটাইয়া শাপান্তকালের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া আছি। আমি চিরদিন স্থির অবিচল, চিরদিন একই ভাবে শুইয়া আছি, কিন্তু তবুও আমার এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নাই। এতটুকু বিশ্রাম নাই যে, আমার এই কঠিন শুষ্ক শয্যার উপরে একটিমাত্র কচি স্নিগ্ধ শ্যামল ঘাস উঠাইতে পারি; এতটুকু সময় নাই যে, আমার শিয়রের কাছে অতি ক্ষুদ্র একটি নীলবর্ণের বনফুল ফুটাইতে পারি। কথা কহিতে পারি না, অথচ অন্ধভাবে সকলই অনুভব করিতেছি। রাত্রিদিন পদশব্দ; কেবলই পদশব্দ। আমার এই গভীর জড়-নিদ্রার মধ্যে লক্ষ লক্ষ চরণের শব্দ অহর্নিশ দুঃস্বপ্নের ন্যায় আবর্তিত হইতেছে। আমি চরণের স্পর্শে হৃদয় পাঠ করিতে পারি। আমি বুঝিতে পারি, কে গৃহে যাইতেছে, কে বিদেশে যাইতেছে, কে কাজে যাইতেছে, কে বিশ্রামে যাইতেছে, কে উৎসবে যাইতেছে, কে শ্মশানে যাইতেছে। যাহার সুখের সংসার আছে, স্নেহের ছায়া আছে, সে প্রতি পদক্ষেপে সুখের ছবি আঁকিয়া আঁকিয়া চলে; সে প্রতি পদক্ষেপে মাটিতে আশার বীজ রোপিয়া রোপিয়া যায়, মনে হয় যেখানে যেখানে তাহার পা পড়িয়াছে, সেখানে যেন মুহূর্তের মধ্যে এক-একটি করিয়া লতা অঙ্কুরিত পুষ্পিত হইয়া উঠিবে। যাহার গৃহ নাই আশ্রয় নাই, তাহার পদক্ষেপের মধ্যে আশা নাই অর্থ নাই, তাহার পদক্ষেপের দক্ষিণ নাই, বাম নাই, তাহার চরণ যেন বলিতে থাকে, আমি চলিই বা কেন থামিই বা কেন, তাহার পদক্ষেপে আমার শুষ্ক ধূলি যেন আরো শুকাইয়া যায়।
পৃথিবীর কোনো কাহিনী আমি সম্পূর্ণ শুনিতে পাই না। আজ শত শত বৎসর ধরিয়া আমি কত লক্ষ লোকের কত হাসি কত গান কত কথা শুনিয়া আসিতেছি; কিন্তু কেবল খানিকটা মাত্র শুনিতে পাই। বাকিটুকু শুনিবার জন্য যখন আমি কান পাতিয়া থাকি, তখন দেখি সে লোক আর নাই। এমন কত বৎসরের কত ভাঙা কথা ভাঙা গান আমার ধূলির সহিত ধূলি হইয়া গেছে, আমার ধূলির সহিত উড়িয়া বেড়ায়, তাহা কি কেহ জানিতে পায়। ঐ শুন, একজন গাহিল, 'তারে বলি বলি আর বলা হল না।' -- আহা, একটু দাঁড়াও, গানটা শেষ করিয়া যাও, সব কথাটা শুনি। কই আর দাঁড়াইল। গাহিতে গাহিতে কোথায় চলিয়া গেল, শেষটা শোনা গেল না। ঐ একটিমাত্র পদ অর্ধেক রাত্রি ধরিয়া আমার কানে ধ্বনিত হইতে থাকিবে। মনে মনে ভাবিব, ও কে গেল। কোথায় যাইতেছে না জানি। যে কথাটা বলা হইল না, তাহাই কি আবার বলিতে যাইতেছে। এবার যখন পথে আবার দেখা হইবে, সে যখন মুখ তুলিয়া ইহার মুখের দিকে চাহিবে, তখন বলি বলি করিয়া আবার যদি বলা না হয়। তখন নত শির করিয়া মুখ ফিরাইয়া অতি ধীরে ধীরে ফিরিয়া আসিবার সময় আবার যদি গায় 'তারে বলি বলি আর বলা হল না'।
আরো দেখুন
চোখ যে ওদের
Songs
            চোখ যে ওদের ছুটে চলে গো --
ধনের বাটে, মানের বাটে, রূপের হাটে,    দলে দলে গো॥
দেখবে ব'লে করেছে পণ,    দেখবে কারে জানে না মন--
প্রেমের দেখা দেখে যখন    চোখ ভেসে যায় চোখের জলে গো॥
            আমায় তোরা ডাকিস না রে--
আমি যাব খেয়ার ঘাটে অরূপ-রসের পারাবারে।
উদাস হাওয়া লাগে পালে, পারের পানে যাবার কালে
চোখদুটোরে ডুবিয়ে যাব অকূল সুধা-সাগর তলে গো॥
আরো দেখুন
রাত্রি
Verses
অভিভূত ধরণীর দীপ-নেভা তোরণদুয়ারে
               আসে রাত্রি,
          আধা অন্ধ, আধা বোবা,
               বিরাট অস্পষ্ট মূর্তি,
যুগারম্ভসৃষ্টিশালে অসমাপ্তি পুঞ্জীভূত যেন
               নিদ্রার মায়ায়।
হয় নি নিশ্চিত ভাগ সত্যের মিথ্যার,
          ভালোমন্দ-যাচাইয়ের তুলাদণ্ডে
                   বাটখারা ভুলের ওজনে।
কামনার যে পাত্রটি দিনে ছিল আলোয় লুকানো
          আঁধার তাহারে টেনে আনে--
     ভরে দেয় সুরা দিয়ে
          রজনীগন্ধার গন্ধে,
               ঝিমিঝিমি ঝিল্লির ঝননে,
          আধ-দেখা কটাক্ষে ইঙ্গিতে।
ছায়া করে আনাগোনা সংশয়ের মুখোশ-পরানো,
     মোহ আসে কালো মূর্তি লালরঙে এঁকে,
               তপস্বীরে করে সে বিদ্রূপ।
বেড়াজাল হাতে নিয়ে সঞ্চরে আদিম মায়াবিনী
     যবে গুপ্ত গুহা হতে গোধূলির ধূসর প্রান্তরে
          দস্যু এসে দিবসের রাজদণ্ড কেড়ে নিয়ে যায়।
বিশ্বনাট্যে প্রথম অঙ্কের
     অনিশ্চিত প্রকাশের যবনিকা
          ছিন্ন করে এসেছিল দিন,
     নির্বারিত করেছিল বিশ্বের চেতনা
          আপনার নিঃসংশয় পরিচয়।
     আবার সে আচ্ছাদন
মাঝে-মাঝে নেমে আসে স্বপ্নের সংকেতে।
     আবিল বুদ্ধির স্রোতে ক্ষণিকের মতো
          মেতে ওঠে ফেনার নর্তন।
     প্রবৃত্তির হালে ব'সে কর্ণধার করে
          উদ্‌ভ্রান্ত চালনা তন্দ্রাবিষ্ট চোখে।
নিজেরে ধিক্কার দিয়ে মন ব'লে ওঠে,
     "নহি নহি আমি নহি অপূর্ণ সৃষ্টির
          সমুদ্রের পঙ্কলোকে অন্ধ তলচর
অর্ধস্ফুট শক্তি যার বিহ্বলতা-বিলাসী মাতাল
          তরলে নিমগ্ন অনুক্ষণ।
আমি কর্তা, আমি মুক্ত, দিবসের আলোকে দীক্ষিত,
     কঠিন মাটির 'পরে
          প্রতি পদক্ষেপ যার
               আপনারে জয় করে চলা।"
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
উদ্ধার
Stories
গৌরী প্রাচীন ধনীবংশের পরমাদরে পালিতা সুন্দরী কন্যা। স্বামী পরেশ হীনাবস্থা হইতে সম্প্রতি নিজের উপার্জনে কিঞ্চিৎ অবস্থার উন্নতি করিয়াছে; যতদিন তাঁহার দৈন্য ছিল ততদিন কন্যার কষ্ট হইবে ভয়ে শ্বশুর শাশুড়ি স্ত্রীকে তাঁহার বাড়িতে পাঠান নাই। গৌরী বেশ-একটু বয়স্থা হইয়াই পতিগৃহে আসিয়াছিল।
বোধ করি এই-সকল কারণেই পরেশ সুন্দরী যুবতী স্ত্রীকে সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তগম্য বলিয়া বোধ করিতেন না এবং বোধ করি সন্দিগ্ধ স্বভাব তাঁহার একটা ব্যাধির মধ্যে।
আরো দেখুন