এমন দিনে তারে
Songs
     এমন দিনে তারে বলা যায়
     এমন ঘনঘোর বরিষায়।
     এমন দিনে মন খোলা যায়--
এমন মেঘস্বরে       বাদল-ঝরোঝরে
     তপনহীন ঘন তমসায়॥
     সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
     নিভৃত নির্জন চারি ধার।
দুজনে মুখোমুখি         গভীর দুখে দুখি,
     আকাশে জল ঝরে অনিবার--
     জগতে কেহ যেন নাহি আর॥
     সমাজ সংসার মিছে সব,
     মিছে এ জীবনের কলরব।
কেবল আঁখি দিয়ে   আঁখির সুধা পিয়ে
     হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব--
     আঁধারে মিশে গেছে আর সব॥
     তাহাতে এ জগতে ক্ষতি কার
     নামাতে পারি যদি মনোভার।
শ্রাবণবরিষনে         একদা গৃহকোণে
     দু কথা বলি যদি কাছে তার
     তাহাতে আসে যাবে কিবা কার॥
     ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায়,
     বিজুলি থেকে থেকে চমকায়।
যে কথা এ জীবনে   রহিয়া গেল মনে
     সে কথা আজি যেন বলা যায়--
     এমন ঘনঘোর বরিষায়॥
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
মুক্তি
Stories
বিরহিণী তার ফুলবাগানের এক ধারে বেদী সাজিয়ে তার উপর মূর্তি গড়তে বসল। তার মনের মধ্যে যে মানুষটি ছিল বাইরে তারই প্রতিরূপ প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে, আর চেয়ে চেয়ে দেখে, আর ভাবে, আর চোখ দিয়ে জল পড়ে।
কিন্তু, যে রূপটি একদিন তার চিত্তপটে স্পষ্ট ছিল তার উপরে ক্রমে যেন ছায়া পড়ে আসছে। রাতের বেলাকার পদ্মের মতো স্মৃতির পাপড়িগুলি অল্প অল্প করে যেন মুদে এল।
আরো দেখুন
পুরোনো বাড়ি
Stories
অনেক কালের ধনী গরিব হয়ে গেছে, তাদেরই ঐ বাড়ি।
দিনে দিনে ওর উপরে দুঃসময়ের আঁচড় পড়ছে।
আরো দেখুন
উৎসর্গ
Stories
শেষ পারানির খেয়ায় তুমি
    দিনশেষের নেয়ে
আরো দেখুন
মাঝি
Verses
আমার যেতে ইচ্ছে করে
     নদীটির ওই পারে --
     যেথায় ধারে ধারে
বাঁশের খোঁটায় ডিঙি নৌকো
     বাঁধা সারে সারে।
কৃষাণেরা পার হয়ে যায়
     লাঙল কাঁধে ফেলে;
     জাল টেনে নেয় জেলে,
গোরু মহিষ সাঁৎরে নিয়ে
     যায় রাখালের ছেলে।
সন্ধে হলে যেখান থেকে
     সবাই ফেরে ঘরে
     শুধু রাতদুপরে
শেয়ালগুলো ডেকে ওঠে
     ঝাউডাঙাটার 'পরে।
     মা, যদি হও রাজি,
বড়ো হলে আমি হব
     খেয়াঘাটের মাঝি।
শুনেছি ওর ভিতর দিকে
     আছে জলার মতো।
     বর্ষা হলে গত
ঝাঁকে ঝাঁকে আসে সেথায়
     চখাচখী যত।
তারি ধারে ঘন হয়ে
     জন্মেছে সব শর;
     মানিক-জোড়ের ঘর,
কাদাখোঁচা পায়ের চিহ্ন
     আঁকে পাঁকের 'পর।
সন্ধ্যা হলে কত দিন মা,
     দাঁড়িয়ে ছাদের কোণে
     দেখেছি একমনে --
চাঁদের আলো লুটিয়ে পড়ে
     সাদা কাশের বনে।
     মা, যদি হও রাজি,
বড়ো হলে আমি হব
     খেয়াঘাটের মাঝি।
এ-পার ও-পার দুই পারেতেই
     যাব নৌকো বেয়ে।
     যত ছেলেমেয়ে
স্নানের ঘাটে থেকে আমায়
     দেখবে চেয়ে চেয়ে।
সূর্য যখন উঠবে মাথায়
     অনেক বেলা হলে --
     আসব তখন চলে
"বড়ো খিদে পেয়েছে গো --
     খেতে দাও মা' বলে।
আবার আমি আসব ফিরে
     আঁধার হলে সাঁঝে
     তোমার ঘরের মাঝে।
বাবার মতো যাব না মা,
     বিদেশে কোন্‌ কাজে।
     মা, যদি হও রাজি,
বড়ো হলে আমি হব
     খেয়াঘাটের মাঝি।
আরো দেখুন
গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে
Verses
                 ১
   গভীর গভীরতম হৃদয়প্রদেশে,
   নিভৃত নিরালা ঠাঁই, লেশমাত্র আলো নাই,
   লুকানো এ প্রেমসাধ গোপনে নিবসে,
   শুদ্ধ যবে ভালোবাসা নয়নে তোমার,
   ঈষৎ প্রদীপ্ত হয়, উচ্ছ্বসয়ে এ-হৃদয়,
   ভয়ে ভয়ে জড়সড় তখনি আবার।
               ২
   শূন্য এই মরমের সমাধি-গহ্বরে,
   জ্বলিছে এ প্রেমশিখা চিরকাল-তরে,
   কেহ না দেখিতে পায়, থেকেও না থাকা প্রায়,
   নিভিবারও নাম নাই নিরাশার ঘোরে।
               ৩
   যা হবার হইয়াছে-- কিন্তু প্রাণনাথ!
   নিতান্ত হইবে যবে এ শরীরপাত,
   আমার সমাধি-স্থানে কোরো নাথ কোরো মনে,
   রয়েছে এ এক দুঃখিনী হয়ে ধরাসাৎ।
               ৪
   যত যাতনা আছে দলুক আমায়,
   সহজে সহিতে নাথ সব পারা যায়,
   কিন্তু হে তুমি-যে মোরে, ভুলে যাবে একেবারে
   সে কথা করিতে মনে হৃদি ফেটে যায়।
               ৫
   রেখো তবে এই মাত্র কথাটি আমার,
   এই কথা শেষ কথা, কথা নাহি আর,
   (এ দেহ হইলে পাত, যদি তুমি প্রাণনাথ,
   প্রকাশো আমার তরে তিলমাত্র শোক,
   ধর্মত হবে না দোষী দোষিবে না লোক--
   কাতরে বিনয়ে তাই, এই মাত্র ভিক্ষা চাই,
   কখনো চাহি নে আরো কোনো ভিক্ষা আর)
   যবে আমি যাব ম'রে, চির এ দুঃখিনী তরে,
   বিন্দুমাত্র অশ্রুজল ফেলো একবার--
   আজন্ম এত যে ভালোবেসেছি তোমায়,
   সে প্রেমের প্রতিদান একমাত্র প্রতিদান,
   তা বই কিছুই আর দিয়ো না আমায়।
আরো দেখুন
মাল্যদান
Stories
সকালবেলায় শীত-শীত ছিল। দুপুরবেলায় বাতাসটি অল্প-একটু তাতিয়া উঠিয়া দক্ষিণ দিক হইতে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যতীন যে বারান্দায় বসিয়া ছিল সেখান হইতে বাগানের এক কোণে এক দিকে একটি কাঁঠাল ও আর-এক দিকে একটি শিরীষগাছের মাঝখানের ফাঁক দিয়া বাহিরের মাঠ চোখে পড়ে। সেই শূন্য মাঠ ফাল্গুনের রৌদ্রে ধুধু করিতেছিল। তাহারই একপ্রান্ত দিয়া কাঁচা পথ চলিয়া গেছে -- সেই পথ বাহিয়া বোঝাই-খালাস গোরুর গাড়ি মন্দগমনে গ্রামের দিকে ফিরিয়া চলিয়াছে, গাড়োয়ান মাথায় গামছা ফেলিয়া অত্যন্ত বেকারভাবে গান গহিতেছে।
আরো দেখুন
ল্যাবরেটরি
Stories
নন্দকিশোর ছিলেন লণ্ডন য়ুনিভার্সিটি থেকে পাস করা এঞ্জিনীয়ার। যাকে সাধুভাষায় বলা যেতে পারে দেদীপ্যমান ছাত্র অর্থাৎ ব্রিলিয়ান্ট, তিনি ছিলেন তাই। স্কুল থেকে আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার তোরণে তোরণে ছিলেন পয়লা শ্রেণীর সওয়ারী।
ওঁর বুদ্ধি ছিল ফলাও, ওঁর প্রয়োজন ছিল দরাজ, কিন্তু ওঁর অর্থসম্বল ছিল আঁটমাপের।
আরো দেখুন
খবর পেলেম কল্য
Verses
     খবর পেলেম কল্য,
তাঞ্জামেতে চ'ড়ে রাজা
     গাঞ্জামেতে চলল।
সময়টা তার জলদি কাটে;
পৌঁছল যেই হলদিঘাটে
   একটা ঘোড়া রইল বাকি,
        তিনটে ঘোড়া মরল।
   গরানহাটায় পৌঁছে সেটা
        মুটের ঘাড়ে চড়ল।
আরো দেখুন
রীতিমত নভেল
Stories
'আল্লা হো আকবর' শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিনসহস্র আর্যসৈন্য। বন্যার মধ্যে একাকী অশ্বত্থবৃক্ষের মতো হিন্দুবীরগণ সমস্ত রাত্রি এবং সমস্ত দিন যুদ্ধ করিয়া অটল দাঁড়াইয়া ছিল কিন্তু এইবার ভাঙিয়া পড়িবে, তাহার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। এবং সেইসঙ্গে ভারতের জয়ধ্বজা ভূমিসাৎ হইবে এবং আজিকার ঐ অস্তাচলবর্তী সহস্ররশ্মির সহিত হিন্দুস্থানের গৌরবসূর্য চিরদিনের মতো অস্তমিত হইবে।
হর হর বোম্‌ বোম্‌! পাঠক বলিতে পার, কে ঐ দৃপ্ত যুবা পঁয়ত্রিশজন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করনিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রুসৈন্যের উপরে আসিয়া পতিত হইল? বলিতে পার, কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবনসৈন্য প্রচণ্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল?-- কাহার বজ্রমন্দ্রিত 'হর হর বোম্‌ বোম্‌' শব্দে তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের 'আল্লা হো আকবর' ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল? কাহার উদ্যত অসির সম্মুখে ব্যাঘ্র-আক্রান্ত মেষষুথের ন্যায় শত্রুসৈন্য মুহূর্তের মধ্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়নপর হইল? বলিতে পার, সেদিনকার আর্যস্থানের সূর্যদেব সহস্ররক্তকরস্পর্শে কাহার রক্তাক্ত তরবারিকে আশীর্বাদ করিয়া অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে গেলেন? বলিতে পার কি পাঠক।
আরো দেখুন