পথহারা তুমি পথিক
Songs
    পথহারা তুমি পথিক যেন গো    সুখের কাননে
                ওগো যাও, কোথা যাও।
    সুখে ঢলঢল বিবশ বিভল    পাগল নয়নে
                তুমি চাও, কারে চাও।
কোথা গেছে তব উদাস হৃদয়,    কোথা পড়ে আছে ধরণী।
মায়ার তরণী বাহিয়া যেন গো    মায়াপুরী-পানে ধাও--
        কোন্‌    মায়াপুরী পানে ধাও॥
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন
শেষ কথা
Stories
জীবনের প্রবহমান ঘোলা রঙের হ-য-ব-র-লর মধ্যে হঠাৎ যেখানে গল্পটা আপন রূপ ধ'রে সদ্য দেখা দেয়, তার অনেক পূর্ব থেকেই নায়কনায়িকারা আপন পরিচয়ের সূত্র গেঁথে আনে। পিছন থেকে সেই প্রাক্‌গাল্পিক ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করতেই হয়। তাই কিছু সময় নেব, আমি যে কে সেই কথাটাকে পরিষ্কার করবার জন্যে। কিন্তু নামধান ভাঁড়াতে হবে। নইলে জানাশোনা মহলের জবাবদিহী সামলাতে পারব না। কী নাম নেব তাই ভাবছি, রোম্যাণ্টিক নামকরণের দ্বারা গোড়া থেকেই গল্পটাকে বসন্তরাগে পঞ্চমসুরে বাঁধতে চাই নে। নবীনমাধব নামটা বোধ হয় চলে যেতে পারবে, ওর বাস্তবের শাম্‌লা রঙটা ধুয়ে ফেলে করা যেতে পারত নবারুণ সেনগুপ্ত; কিন্তু তা হলে খাঁটি শোনাত না, গল্পটা নামের বড়াই ক'রে লোকের বিশ্বাস হারাত, লোকে মনে করত ধার-করা জামিয়ার প'রে সাহিত্যসভায় বাবুয়ানা করতে এসেছে।
আমি বাংলাদেশের বিপ্লবীদলের একজন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহাকর্ষশক্তি আণ্ডামানতীরের খুব কাছাকাছি টান মেরেছিল। নানা বাঁকা পথে সি.আই.ডি.-র ফাঁস এড়িয়ে এড়িয়ে গিয়েছিলুম আফগানিস্থান পর্যন্ত। অবশেষে পৌঁচেছি আমেরিকায় খালাসির কাজ নিয়ে। পূর্ববঙ্গীয় জেদ ছিল মজ্জায়, একদিনও ভুলি নি যে, ভারতবর্ষের হাতপায়ের শিকলে উখো ঘষতে হবে দিনরাত যতদিন বেঁচে থাকি। কিন্তু বিদেশে কিছুদিন থাকতেই একটা কথা নিশ্চিত বুঝেছিলুম, আমরা যে প্রণালীতে বিপ্লবের পালা শুরু করেছিলুম, সে যেন আতশবাজিতে পটকা ছোঁড়ার মতো, তাতে নিজের পোড়াকপাল পুড়িয়েছি অনেকবার, দাগ পড়ে নি ব্রিটিশ রাজতক্তে। আগুনের উপর পতঙ্গের অন্ধ আসক্তি। যখন সদর্পে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলুম তখন বুঝতে পারি নি, সেটাতে ইতিহাসের যজ্ঞানল জ্বালানো হচ্ছে না, জ্বালাচ্ছি নিজেদের খুব ছোটো ছোটো চিতানল। ইতিমধ্যে য়ুরোপীয় মহাসমরের ভীষণ প্রলয়রূপ তার অতি বিপুল আয়োজন সমেত চোখের সামনে দেখা দিয়েছিল-- এই যুগান্তরসাধিনী সর্বনাশাকে আমাদের খোড়োঘরের চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে সে দুরাশা মন থেকে লুপ্ত হয়ে গেল; সমারোহ ক'রে আত্মহত্যা করবার মতোও আয়োজন ঘরে নেই। তখন ঠিক করলুম, ন্যাশনাল দুর্গের গোড়া পাকা করতে হবে। স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলুম, বাঁচতে যদি চাই আদিম যুগের হাত দুখানায় যে কটা নখ আছে তা দিয়ে লড়াই করা চলবে না। এ যুগে যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের দিতে হবে পাল্লা; যেমন-তেমন করে মরা সহজ, কিন্তু বিশ্বকর্মার চেলাগিরি করা সহজ নয়। অধীর হয়ে ফল নেই, গোড়া থেকেই কাজ শুরু করতে হবে-- পথ দীর্ঘ, সাধনা কঠিন।
আরো দেখুন
ফেল
Stories
ল্যাজা এবং মুড়া, রাহু এবং কেতু, পরস্পরের সঙ্গে আড়াআড়ি করিলে যেমন দেখিতে হইত এও ঠিক সেইরকম। প্রাচীন হালদার বংশ দুই খণ্ডে পৃথক হইয়া প্রকাণ্ড বসত-বাড়ির মাঝখানে এক ভিত্তি তুলিয়া পরস্পর পিঠাপিঠি করিয়া বসিয়া আছে; কেহ কাহারো মুখদর্শন করে না।
নবগোপালের ছেলে নলিন এবং ননীগোপালের ছেলে নন্দ একবংশজাত, একবয়সি, এক ইস্কুলে যায় এবং পারিবারিক বিদ্বেষ ও রেষারেষিতেও উভয়ের মধ্যে সম্পূর্ণ ঐক্য।
আরো দেখুন
ভর্ৎসনা
Verses
মিথ্যা আমায় কেন শরম দিলে
            চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে!
আমি তোমার পাড়ার প্রান্ত দিয়ে
            চলেছিলেম আপন গৃহদ্বারে
যেথা আমার বাঁধা ঘাটের কাছে
দুটি চাঁপায় ছায়া করে আছে,
জামের শাখা ফলে-আঁধার-করা
            স্বচ্ছগভীর পদ্মদিঘির ধারে।
তুমি আমায় কেন শরম দিলে
       চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে!
আজ তো আমি মাটির পানে চেয়ে
            দীনবেশে যাই নি তোমার ঘরে।
অতিথ হয়ে দিই নি দ্বারে সাড়া,
            ভিক্ষাপাত্র নিই নি কাতর-করে।
আমি আমার পথে যেতে যেতে
তোমার ঘরের দ্বারের বাহিরেতে
ঘনশ্যামল তমাল-তরুমূলে
দাঁড়িয়েছি এই দণ্ড-দুয়ের তরে।
নতশিরে দুখানি হাত জুড়ি
            দীনবেশে যাই নি তোমার ঘরে।
আমি তোমার ফুল্ল পুষ্পবনে
            তুলি নাই তো যূথীর একটি দল।
আমি তোমার ফলের শাখা হতে
            ক্ষুধাভরে ছিঁড়ি নাই তো ফল।
আছি শুধু পথের প্রান্তদেশে
দাঁড়ায় যেথা সকল পান্থ এসে,
নিয়েছি এই শুধু গাছের ছায়া--
            পেয়েছি এই তরুণ তৃণতল।
আমি তোমার ফুল্ল পুষ্পবনে
            তুলি নাই তো যূথীর একটি দল।
শ্রান্ত বটে আছে চরণ মম,
            পথের পঙ্ক লেগেছে দুই পায়।
আষাঢ়-মেঘে হঠাৎ এল ধারা
            আকাশ-ভাঙা বিপুল বরষায়।
ঝোড়ো হাওয়ার এলোমেলো তালে
উঠল নৃত্য বাঁশের ডালে ডালে,
ছুটল বেগে ঘন মেঘের শ্রেণী
            ভগ্নরণে ছিন্নকেতুর প্রায়।
শ্রান্ত বটে আছে চরণ মম,
            পথের পঙ্ক লেগেছে দুই পায়।
কেমন করে জানব মনে আমি
            কী যে আমায় ভাবলে মনে মনে।
কাহার লাগি একলা ছিলে বসে
            মুক্তকেশে আপন বাতায়নে।
তড়িৎশিখা ক্ষণিক দীপ্তালোকে
হানতেছিল চমক তোমার চোখে,
জানত কে বা দেখতে পাবে তুমি
            আছি আমি কোথায় যে কোন্‌ কোণে।
কেমন করে জানব মনে আমি
            আমায় কী যে ভাবলে মনে মনে।
বুঝি গো দিন ফুরিয়ে গেল আজি,
            এখনো মেঘ আছে আকাশ ভরে।
থেমে এল বাতাস বেণুবনে,
            মাঠের 'পরে বৃষ্টি এল ধরে।
তোমার ছায়া দিলেম তবে ছাড়ি,
লও গো তোমার ভূমি-আসন কাড়ি,
সন্ধ্যা হল-- দুয়ার করো রোধ,
            যাব আমি আপন পথ-'পরে।
বুঝি গো দিন ফুরিয়ে গেল আজি,
            এখনো মেঘ আছে আকাশ ভরে।
মিথ্যা আমায় কেন শরম দিলে
            চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে!
আছে আমার নতুন-ছাওয়া ঘর
            পাড়ার পরে পদ্মদিঘির ধারে।
কুটিরতলে দিবস হলে গত
জ্বলে প্রদীপ ধ্রুবতারার মতো,
আমি কারো চাই নে কোনো দান
            কাঙালবেশে কোনো ঘরের দ্বারে।
মিথ্যা আমায় কেন শরম দিলে
            চোখের চাওয়া নীরব তিরস্কারে!
আরো দেখুন
পান্নালাল
Stories
দাদামশায়, তোমার পাগলের দলের মধ্যে পান্নালাল ছিল খুব নতুন রকমের।
জান, দিদি? তোমার পাগলরা প্রত্যেকেই নতুন, কারও সঙ্গে কারও মিল হয় না। যেমন তোমার দাদামশায়। বিধাতার নতুন পরীক্ষা। ছাঁচ তিনি ভেঙে ফেলেন। সাধারণ লোকের বুদ্ধিতে মিল হয়, অসাধারণ পাগলের মিল হয় না। তোমাকে একটা উদাহরণ দেখাই--
আরো দেখুন
সওগাত
Stories
পুজোর পরব কাছে। ভাণ্ডার নানা সামগ্রীতে ভরা। কত বেনারসি কাপড়, কত সোনার অলংকার; আর ভাণ্ড ভ'রে ক্ষীর দই, পাত্র ভ'রে মিষ্টান্ন।
মা সওগাত পাঠাচ্ছেন।
আরো দেখুন
প্রায়শ্চিত্ত
Stories
স্বর্গ ও মর্তের মাঝখানে একটা অনির্দেশ্য অরাজক স্থান আছে যেখানে ত্রিশঙ্কু রাজা ভাসিয়া বেড়াইতেছেন, যেখানে আকাশকুসুমের অজস্র আবাদ হইয়া থাকে। সেই বায়ুদুর্গবেষ্টিত মহাদেশের নাম 'হইলে-হইতে-পারিত'। যাঁহারা মহৎ কার্য করিয়া অমরতা লাভ করিয়াছেন তাঁহারা ধন্য হইয়াছেন, যাঁহারা সামান্য ক্ষমতা লইয়া সাধারণ মানবের মধ্যে সাধারণভাবে সংসারের প্রাত্যহিক কর্তব্যসাধনে সহায়তা করিতেছেন তাঁহারাও ধন্য; কিন্তু যাঁহারা অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হঠাৎ দুয়ের মাঝখানে পড়িয়াছেন তাঁহাদের আর কোনো উপায় নাই। তাঁহারা একটা কিছু হইলে হইতে পারিতেন কিন্তু সেই কারণেই তাঁহাদের পক্ষে কিছু-একটা হওয়া সর্বাপেক্ষা অসম্ভব।
আমাদের অনাথবন্ধু সেই মধ্যদেশবিলম্বিত বিধিবিড়ম্বিত যুবক। সকলেরই বিশ্বাস, তিনি ইচ্ছা করিলে সকল বিষয়েই কৃতকার্য হইতে পারিতেন। কিন্তু কোনো কালে তিনি ইচ্ছাও করিলেন না এবং কোনো বিষয়ে তিনি কৃতকার্যও হইলেন না, এবং সকলের বিশ্বাস তাঁহার প্রতি অটল রহিয়া গেল। সকলে বলিল, তিনি পরীক্ষায় ফার্‌স্ট্‌ হইবেন; তিনি আর পরীক্ষা দিলেন না। সকলের বিশ্বাস চাকরিতে প্রবিষ্ট হইলে যে কোনো ডিপার্টমেন্টের উচ্চতম স্থান তিনি অনায়াসে গ্রহণ করিতে পারিবেন; তিনি কোনো চাকরিই গ্রহণ করিলেন না। সাধারণ লোকের প্রতি তাঁহার বিশেষ অবজ্ঞা, কারণ তাহারা অত্যন্ত সামান্য; অসাধারণ লোকের প্রতি তাঁহার কিছুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না, কারণ মনে করিলেই তিনি তাহাদের অপেক্ষা অসাধারণতর হইতে পারিতেন।
আরো দেখুন
লিপি
Verses
          হে ধরণী, কেন প্রতিদিন
                             তৃপ্তিহীন
                   একই লিপি পড় ফিরে ফিরে?
            প্রত্যুষে গোপনে ধীরে ধীরে
    আঁধারের খুলিয়া পেটিকা,
                             স্বর্ণবর্ণে লিখা
                         প্রভাতের মর্মবাণী
                         বক্ষে টেনে আনি
             গুঞ্জরিয়া কত সুরে আবৃত্তি কর যে মুগ্ধমনে।
                   বহুযুগ হয়ে গেল কোন্‌ শুভক্ষণে
              বাষ্পের গুণ্ঠনখানি প্রথম পড়িল যবে খুলে,
                   আকাশে চাহিলে মুখ তুলে।
            অমর জ্যোতির মূর্তি দেখা দিল আঁখির সম্মুখে।
                         রোমাঞ্চিত বুকে
                   পরম বিস্ময় তব জাগিল তখনি।
                       নিঃশব্দ বরণ-মন্ত্রধ্বনি
                      উচ্ছ্বসিল পর্বতের শিখরে শিখরে।
             কলোল্লাসে উদ্‌ঘোষিল নৃত্যমত্ত সাগরে সাগরে
                         "জয়, জয়, জয়।'
                   ঝঞ্ঝা তার বন্ধ টুটে ছুটে ছুটে কয়
                      "জাগো রে, জাগো রে'
                       বনে বনান্তরে।
              প্রথম সে দর্শনের অসীম বিস্ময়
                    এখনো যে কাঁপে বক্ষোময়।
           তলে তলে আন্দোলিয়া উঠে তব ধূলি,
                    তৃণে তৃণে কণ্ঠ তুলি
                         ঊর্ধ্বে চেয়ে কয় --
                            "জয়, জয়, জয়।'
           সে বিস্ময় পুষ্পে পর্ণে গন্ধে বর্ণে ফেটে ফেটে পড়ে;
                                 প্রাণের দুরন্ত ঝড়ে,
                       রূপের উন্মত্ত নৃত্যে, বিশ্বময়
                     ছড়ায় দক্ষিণে বামে সৃজন প্রলয়;
                   সে বিস্ময় সুখে দুঃখে গর্জি উঠি কয় --
                             "জয়, জয়, জয়।'
           তোমাদের মাঝখানে আকাশ অনন্ত ব্যবধান;
                     ঊর্ধ্ব হতে তাই নামে গান।
                  চিরবিরহের নীল পত্রখানি-'পরে
                তাই লিপি লেখা হয় অগ্নির অক্ষরে।
                       বক্ষে তারে রাখো,
                     শ্যাম আচ্ছাদনে ঢাকো;
                             বাক্যগুলি
                     পুষ্পদলে রেখে দাও তুলি --
                   মধুবিন্দু হয়ে থাকে নিভৃত গোপনে;
                      পদ্মের রেণুর মাঝে গন্ধের স্বপনে
                             বন্দী কর তারে;
              তরুণীর প্রেমাবিষ্ট আঁখির ঘনিষ্ঠ অন্ধকারে
                                 রাখ তারে ভরি;
              সিন্ধুর কল্লোলে মিলি, নারিকেলপল্লবে মর্মরি,
                     সে বাণী ধ্বনিতে থাকে তোমার অন্তরে;
              মধ্যাহ্নে শোনো সে বাণী অরণ্যের নির্জন নির্ঝরে।
              বিরহিণী, সে লিপির যে উত্তর লিখিতে উন্মনা
                         আজও তাহা সাঙ্গ হইল না।
              যুগে যুগে বারম্বার লিখে লিখে
            বারম্বার মুছে ফেল; তাই দিকে দিকে
                     সে ছিন্ন কথার চিহ্ন পুঞ্জ হয়ে থাকে;
            অবশেষে একদিন জ্বলজ্জটা ভীষণ বৈশাখে
                         উন্মত্ত ধূলির ঘূর্ণিপাকে
                             সব দাও ফেলে
                                 অবহেলে,
                         আত্মবিদ্রোহের অসন্তোষে।
                       তার পরে আরবার বসে বসে
                     নূতন আগ্রহে লেখ নূতন ভাষায়।
                            যুগযুগান্তর চলে যায়।
                কত শিল্পী, কত কবি তোমার সে লিপির লিখনে
                               বসে গেছে একমনে।
                             শিখিতে চাহিছে তব ভাষা,
                 বুঝিতে চাহিছে তব অন্তরের আশা।
                   তোমার মনের কথা আমারি মনের কথা টানে,
                              চাও মোর পানে।
                     চকিত ইঙ্গিত তব, বসনপ্রান্তের ভঙ্গিখানি
                         অঙ্কিত করুক মোর বাণী।
                             শরতে দিগন্ততলে
                                 ছলছলে
                         তোমার যে অশ্রুর আভাস,
                     আমার সংগীতে তারি পড়ুক নিশ্বাস।
                         অকারণ চাঞ্চল্যের দোলা লেগে
                             ক্ষণে ক্ষণে ওঠে জেগে
                         কটিতটে যে কলকিঙ্কিণী,
                     মোর ছন্দে দাও ঢেলে তারি রিনিরিনি
                                  ওগো বিরহিণী।
                দূর হতে আলোকের বরমাল্য এসে
                     খসিয়া পড়িল তব কেশে,
                   স্পর্শে তারি কভু হাসি কভু অশ্রুজলে
                         উৎকন্ঠিত আকাঙক্ষায় বক্ষতলে
                                 ওঠে যে ক্রন্দন,
              মোর ছন্দে চিরদিন দোলে যেন তাহারি স্পন্দন।
                         স্বর্গ হতে মিলনের সুধা
              মর্তের বিচ্ছেদপাত্রে সংগোপনে রেখেছ, বসুধা;
                         তারি লাগি নিত্যক্ষুধা,
                             বিরহিণী অয়ি,
                     মোর সুরে হোক জ্বালাময়ী।
আরো দেখুন
চিত্রকর
Stories
ময়মনসিংহ ইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আমাদের গোবিন্দ এল কলকাতায়। বিধবা মায়ের অল্প কিছু সম্বল ছিল। কিন্তু, সব-চেয়ে তার বড়ো সম্বল ছিল নিজের অবিচলিত সংকল্পের মধ্যে। সে ঠিক করেছিল, 'পয়সা' করবই, সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে।' সর্বদাই তার ভাষায় ধনকে সে উল্লেখ করত 'পয়সা' বলে। অর্থাৎ, তার মনে খুব একটা দর্শন স্পর্শন ঘ্রাণের যোগ্য প্রত্যক্ষ পদার্থ ছিল; তার মধ্যে বড়ো নামের মোহ ছিল না; অত্যন্ত সাধারণ পয়সা, হাটে হাটে হাতে হাতে ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে যাওয়া, মলিন হয়ে যাওয়া পয়সা, তাম্রগন্ধী পয়সা, কুবেরের আদিম স্বরূপ, যা রুপোয় সোনায় কাগজে দলিলে নানা মূর্তি পরিগ্রহ করে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
নানা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে নানা পঙ্কে আবিল হতে হতে আজ গোবিন্দ তার পয়সাপ্রবাহিণীর প্রশস্তধারার পাকা বাঁধানো ঘাটে এসে পৌঁচেছে। গানিব্যাগ্‌ওয়ালা বড়োসাহেব ম্যাক্‌ডুগালের বড়োবাবুর আসনে তার ধ্রুব প্রতিষ্ঠা। সবাই তাকে নাম দিয়েছিল ম্যাক্‌দুলাল।
আরো দেখুন
দিদি
Stories
পল্লীবাসিনী কোনো-এক হতভাগিনীর অন্যায়কারী অত্যাচারী স্বামীর দুষ্কৃতিসকল সবিস্তারে বর্ণনপূর্বক প্রতিবেশিনী তারা অত্যন্ত সংক্ষেপে নিজের রায় প্রকাশ করিয়া কহিল, 'এমন স্বামীর মুখে আগুন।'
শুনিয়া জয়গোপালবাবুর স্ত্রী শশী অত্যন্ত পীড়া অনুভব করিলেন-- স্বামীজাতির মুখে চুরটের আগুন ছাড়া অন্য কোনো প্রকার আগুন কোনো অবস্থাতেই কামনা করা স্ত্রীজাতিকে শোভা পায় না।
আরো দেখুন