বলাই
Stories
মানুষের জীবনটা পৃথিবীর নানা জীবের ইতিহাসের নানা পরিচ্ছেদের উপসংহারে, এমন একটা কথা আছে। লোকালয়ে মানুষের মধ্যে আমরা নানা জীবজন্তুর প্রচ্ছন্ন পরিচয় পেয়ে থাকি, সে কথা জানা। বস্তুত আমরা মানুষ বলি সেই পদার্থকে যেটা আমাদের ভিতরকার সব জীবজন্তুকে মিলিয়ে এক করে নিয়েছে-- আমাদের বাঘ-গোরুকে এক খোঁয়াড়ে দিয়েছে পুরে, অহি-নকুলকে এক খাঁচায় ধরে রেখেছে। যেমন রাগিনী বলি তাকেই যা আপনার ভিতরকার সমুদয় সা-রে-গা-মা-গুলোকে সংগীত করে তোলে, তার পর থেকে তাদের আর গোলমাল করবার সাধ্য থাকে না। কিন্তু, সংগীতের ভিতরে এক-একটি সুর অন্য সকল সুরকে ছাড়িয়ে বিশেষ হয়ে ওঠে-- কোনোটাতে মধ্যম, কোনোটাতে কোমলগান্ধার, কোনোটাতে পঞ্চম।
আমার ভাইপো বলাই-- তার প্রকৃতিতে কেমন করে গাছপালার মূল সুরগুলোই হয়েছে প্রবল। ছেলেবেলা থেকেই চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখাই তার অভ্যাস, নড়ে-চড়ে বেড়ানো নয়। পুবদিকের আকাশে কালো মেঘ স্তরে স্তরে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়ায়, ওর সমস্ত মনটাতে ভিজে হাওয়া যেন শ্রাবণ-অরণ্যের গন্ধ নিয়ে ঘনিয়ে ওঠে; ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ে, ওর সমস্ত গা যেন শুনতে পায় সেই বৃষ্টির শব্দ। ছাদের উপর বিকেল-বেলাকার রোদ্‌দুর পড়ে আসে, গা খুলে বেড়ায়; সমস্ত আকাশ থেকে যেন কী একটা সংগ্রহ করে নেয়। মাঘের শেষে আমের বোল ধরে, তার একটা নিবিড় আনন্দ জেগে ওঠে ওর রক্তের মধ্যে, একটা কিসের অব্যক্ত স্মৃতিতে; ফাল্গুনে পুষ্পিত শালবনের মতোই ওর অন্তর-প্রকৃতিটা চার দিকে বিস্তৃত হয়ে ওঠে, ভরে ওঠে, তাতে একটা ঘন রঙ লাগে। তখন ওর একলা বসে বসে আপন মনে কথা কইতে ইচ্ছে করে, যা-কিছু গল্প শুনেছে সব নিয়ে জোড়াতাড়া দিয়ে; অতি পুরানো বটের কোটরে বাসা বেঁধে আছে যে একজোড়া অতি পুরানো পাখি, বেঙ্গমা বেঙ্গমী, তাদের গল্প। ওই ড্যাবা-ড্যাবা-চোখ-মেলে-সর্বদা-তাকিয়ে-থাকা ছেলেটা বেশি কথা কইতে পারে না। তাই ওকে মনে মনে অনেক বেশি ভাবতে হয়। ওকে একবার পাহাড়ে নিয়ে গিয়েছিলুম। আমাদের বাড়ির সামনে ঘন সবুজ ঘাস পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে পর্যন্ত নেবে গিয়েছে, সেইটে দেখে আর ওর মন ভারি খুশি হয়ে ওঠে। ঘাসের আস্তরণটা একটা স্থির পদার্থ তা ওর মনে হয় না; ওর বোধ হয়, যেন ওই ঘাসের পুঞ্জ একটা গড়িয়ে-চলা খেলা, কেবলই গড়াচ্ছে; প্রায়ই তারই সেই ঢালু বেয়ে ও নিজেও গড়াত-- সমস্ত দেহ দিয়ে ঘাস হয়ে উঠত-- গড়াতে গড়াতে ঘাসের আগায় ওর ঘাড়ের কাছে সুড়সুড়ি লাগত আর ও খিলখিল করে হেসে উঠত।
আরো দেখুন
আরো-সত্য
Stories
দাদামশায়, সেদিন তুমি যে আরও-সত্যির কথা বলছিলে, সে কি কেবল পরীস্থানেই দেখা যায়।
আমি বললুম, তা নয় গো, এ পৃথিবীতেও তার অভাব নেই। তাকিয়ে দেখলেই হয়। তবে কিনা সেই দেখার চাউনি থাকা চাই।
আরো দেখুন
একটি ক্ষুদ্র পুরাতন গল্প
Stories
গল্প বলিতে হইবে। কিন্তু আর তো পারি না। এখন এই পরিশ্রান্ত অক্ষম ব্যক্তিটিকে ছুটি দিতে হইবে।
এ পদ আমাকে কে দিল বলা কঠিন। ক্রমে ক্রমে একে একে তোমরা পাঁচজন আসিয়া আমার চারিদিকে কখন জড়ো হইলে, এবং কেন যে তোমরা আমাকে এত অনুগ্রহ করিলে এবং আমার কাছে এত প্রত্যাশা করিলে, তাহা বলা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য। অবশ্যই সে তোমাদের নিজগুণে; শুভাদৃষ্টক্রমে আমার প্রতি সহসা তোমাদের অনুগ্রহ উদয় হইয়াছিল। এবং যাহাতে সে অনুগ্রহ রক্ষা হয় সাধ্যমতো সে চেষ্টার ত্রুটি হয় নাই।
আরো দেখুন
অনুমান
Verses
  পাছে    দেখি তুমি আস নি, তাই
            আধেক আঁখি মুদিয়ে চাই,
                     ভয়ে চাই নে ফিরে।
  আমি    দেখি যেন আপন-মনে
            পথের শেষে দূরের বনে
                     আসছ তুমি ধীরে।
  যেন     চিনতে পারি সেই অশান্ত
            তোমার উত্তরীয়ের প্রান্ত
                     ওড়ে হাওয়ার 'পরে।
  আমি    একলা বসে মনে গণি
            শুনছি তোমার পদধ্বনি
                     মর্মরে মর্মরে।
  ভোরে নয়ন মেলে অরুণরাগে
            যখন আমার প্রাণে জাগে
                     অকারণের হাসি,
  যখন    নবীন তৃণে লতায় গাছে
            কোন্‌ জোয়ারের স্রোতে নাচে
                     সবুজ সুধারাশি--
  যখন    নব মেঘের সজল ছায়া
            যেন রে কার মিলন-মায়া
                     ঘনায় বিশ্ব জুড়ে,
  যখন    পুলকে নীল শৈল ঘেরি
            বেজে ওঠে কাহার ভেরী,
                     ধ্বজা কাহার উড়ে--
  তখন   মিথ্যা সত্য কেই-বা জানে,
            সন্দেহ আর কেই-বা মানে,
                     ভুল যদি হয় হোক!
  ওগো, জানি না কি আমার হিয়া
            কে ভুলালো পরশ দিয়া,
                     কে জুড়ালো চোখ।
  সে কি তখন আমি ছিলেম একা,
            কেউ কি মোরে দেয় নি দেখা।
                     কেউ আসে নাই পিছে?
  তখন   আড়াল হতে সহাস আঁখি
            আমার মুখে চায় নি নাকি।
                     এ কি এমন মিছে।
আরো দেখুন
নামঞ্জুর গল্প
Stories
আমাদের আসর জমেছিল পোলিটিক্যাল লঙ্কাকাণ্ডের পালায়। হাল আমলের উত্তরকাণ্ডে আমরা সম্পূর্ণ ছুটি পাই নি বটে, কিন্তু গলা ভেঙেছে; তা ছাড়া সেই অগ্নিদাহের খেলা বন্ধ।
বঙ্গভঙ্গের রঙ্গভূমিতে বিদ্রোহীর অভিনয় শুরু হল। সবাই জানেন, এই নাট্যের পঞ্চম অঙ্কের দৃশ্য আলিপুর পেরিয়ে পৌঁছল আণ্ডামানের সমুদ্রকূলে। পারানির পাথেয় আমার যথেষ্ট ছিল, তবু গ্রহের গুণে এপারের হাজতেই আমার ভোগসমাপ্তি। সহযোগীদের মধ্যে ফাঁসিকাঠ পর্যন্ত যাদের সর্বোচ্চ প্রোমোশন হয়েছিল, তাদের প্রণাম করে আমি পশ্চিমের এক শহরের কোণে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় পসার জমিয়ে তুললেম।
আরো দেখুন
সমাপ্তি
Stories
অপূর্বকৃষ্ণ বি. এ. পাস করিয়া কলিকাতা হইতে দেশে ফিরিয়া আসিতেছেন।
নদীটি ক্ষুদ্র। বর্ষা অন্তে প্রায় শুকাইয়া যায়। এখন শ্রাবণের শেষে জলে ভরিয়া উঠিয়া একেবারে গ্রামের বেড়া ও বাঁশঝাড়ের তলদেশ চুম্বন করিয়া চলিয়াছে।
আরো দেখুন
শীতের বনে কোন্
Songs
শীতের বনে কোন্‌ সে কঠিন আসবে ব'লে
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে॥
আম্‌লকি-ডাল সাজল কাঙাল,   খসিয়ে দিল পল্লবজাল,
কাশের হাসি হাওয়ায় ভাসি যায় সে চলে॥
সইবে না সে পাতায় ঘাসে চঞ্চলতা
তাই তো আপন রঙ ঘুচালো ঝুম্‌কোলতা।
উত্তরবায় জানায় শাসন,   পাতল তপের শুষ্ক আসন,
সাজ-খসাবার হায় এই লীলা কার অট্টরোলে॥
আরো দেখুন
অপরিচিতা
Stories
আজ আমার বয়স সাতাশ মাত্র। এ জীবনটা না দৈর্ঘ্যের হিসাবে বড়ো, না গুণের হিসাবে। তবু ইহার একটু বিশেষ মূল্য আছে। ইহা সেই ফুলের মতো যাহার বুকের উপরে ভ্রমর আসিয়া বসিয়াছিল, এবং সেই পদক্ষেপের ইতিহাস তাহার জীবনের মাঝখানে ফলের মতো গুটি ধরিয়া উঠিয়াছে।
সেই ইতিহাসটুকু আকারে ছোটো, তাহাকে ছোটো করিয়াই লিখিব। ছোটোকে যাঁহারা সামান্য বলিয়া ভুল করেন না তাঁহারা ইহার রস বুঝিবেন।
আরো দেখুন
ওই সাগরের ঢেউয়ে
Songs
ওই সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে বাজল ভেরী, বাজল ভেরী।
কখন্‌ আমার খুলবে দুয়ার-- নাইকো দেরি, নাইকো দেরি॥
        তোমার তো নয় ঘরের মেলা, কোণের খেলা গো--
        তোমার সঙ্গে বিষম রঙ্গে জগৎ জুড়ে ফেরাফেরি॥
মরণ তোমার পারের তরী, কাঁদন তোমার পালের হাওয়া--
তোমার বীণা বাজায় প্রাণে বেরিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া।
        ভাঙল যাহা পড়ল ধুলায়    যাক্‌-না চুলায় গো--
        ভরল যা তাই দেখ্‌-না, রে ভাই, বাতাস ঘেরি, আকাশ ঘেরি॥
আরো দেখুন
ওগো ভাগ্যদেবী পিতামহী
Songs
              ওগো   ভাগ্যদেবী পিতামহী, মিটল আমার আশ--
          এখন তবে আজ্ঞা করো, বিদায় হবে দাস।
জীবনের এই বাসরবাতি   পোহায় বুঝি, নেবে বাতি--
              বধূর দেখা নাইকো, শুধু প্রচুর পরিহাস।
          এখন থেমে গেল বাঁশি,   শুকিয়ে এল পুষ্পরাশি,
উঠল তোমার অট্টহাসি কাঁপায়ে আকাশ।
          ছিলেন যাঁরা আমায় ঘিরে   গেছেন যে যার ঘরে ফিরে,
              আছ বৃদ্ধা ঠাকুরানী মুখে টানি বাস॥
আরো দেখুন
আইলো শান্ত সন্ধ্যা
Songs
           আইল শান্ত সন্ধ্যা,   গেল অস্তাচলে শ্রান্ত তপন।।
                নমো স্নেহময়ী মাতা,   নমো সুপ্তিদাতা,
                        নমো অতন্দ্র জাগ্রত মহাশান্তি।।
আরো দেখুন