প্রথম শোক
Stories
বনের ছায়াতে যে পথটি ছিল সে আজ ঘাসে ঢাকা।
সেই নির্জনে হঠাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠল, 'আমাকে চিনতে পার না?'
আরো দেখুন
আগমন
Verses
    তখন রাত্রি আঁধার হল,
           সাঙ্গ হল কাজ--
    আমরা মনে ভেবেছিলেম
           আসবে না কেউ আজ।
               মোদের গ্রামে দুয়ার যত
               রুদ্ধ হল রাতের মতো,
               দু-এক জনে বলেছিল,
                     "আসবে মহারাজ।'
               আমরা হেসে বলেছিলেম,
                     "আসবে না কেউ আজ।'
    দ্বারে যেন আঘাত হল
           শুনেছিলেম সবে,
    আমরা তখন বলেছিলেম,
           "বাতাস বুঝি হবে।'
               নিবিয়ে প্রদীপ ঘরে ঘরে
               শুয়েছিলেম আলসভরে,
               দু-এক জনে বলেছিল,
                        "দূত এল-বা তবে।'
               আমরা হেসে বলেছিলেম,
                    "বাতাস বুঝি হবে।'
    নিশীথরাতে শোনা গেল
           কিসের যেন ধ্বনি।
    ঘুমের ঘোরে ভেবেছিলেম
           মেঘের গরজনি।
               ক্ষণে ক্ষণে চেতন করি
               কাঁপল ধরা থরহরি,
               দু-এক জনে বলেছিল,
                     "চাকার ঝনঝনি।'
               ঘুমের ঘোরে কহি মোরা,
                     "মেঘের গরজনি।'
           তখনো রাত আঁধার আছে,
                  বেজে উঠল ভেরী,
           কে ফুকারে, "জাগো সবাই,
                  আর কোরো না দেরি।'
                         বক্ষ'পরে দু হাত চেপে
                         আমরা ভয়ে উঠি কেঁপে,
           দু-এক জনে কহে কানে,
               "রাজার ধ্বজা হেরি।'
           আমরা জেগে উঠে বলি,
               "আর তবে নয় দেরি।'
           কোথায় আলো, কোথায় মাল্য
               কোথায় আয়োজন।
           রাজা আমার দেশে এল
               কোথায় সিংহাসন।
                     হায় রে ভাগ্য, হায় রে লজ্জা,
                     কোথায় সভা, কোথায় সজ্জা।
                     দু-এক জনে কহে কানে,
                           "বৃথা এ ক্রন্দন--
                     রিক্তকরে শূন্যঘরে
                           করো অভ্যর্থন।'
    ওরে, দুয়ার খুলে দে রে,
           বাজা, শঙ্খ বাজা!
    গভীর রাতে এসেছে আজ
           আঁধার ঘরের রাজা।
                বজ্র ডাকে শূন্যতলে,
                বিদ্যুতেরই ঝিলিক ঝলে,
                ছিন্ন শয়ন টেনে এনে
                       আঙিনা তোর সাজা।
                ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল
                       দুঃখরাতের রাজা।
আরো দেখুন
সুখী প্রাণ
Verses
জান না তো নির্ঝরিণী,  আসিয়াছ কোথা হতে,
          কোথায় যে করিছ প্রয়াণ,
মাতিয়া চলেছ তবু                আপন আনন্দে পূর্ণ,
          আনন্দ করিছ সবে দান।
বিজন-অরণ্য-ভূমি                 দেখিছে তোমার খেলা
          জুড়াইছে তাহার নয়ান।
মেষ-শাবকের মতো               তরুদের ছায়ে ছায়ে
          রচিয়াছ খেলিবার স্থান।
গভীর ভাবনা কিছু                 আসে না তোমার কাছে,
          দিনরাত্রি গাও শুধু গান।
বুঝি নরনারী মাঝে                এমনি বিমল হিয়া
          আছে কেহ তোমারি সমান।
চাহে না চাহে না তারা  ধরণীর আড়ম্বর,
          সন্তোষে কাটাতে চায় প্রাণ,
নিজের আনন্দ হতে                আনন্দ বিতরে তারা
          গায় তারা বিশ্বের কল্যাণ।
আরো দেখুন
অসম্ভব কথা
Stories
এক যে ছিল রাজা।
তখন ইহার বেশি কিছু জানিবার আবশ্যক ছিল না। কোথাকার রাজা, রাজার নাম কী, এ সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া গল্পের প্রবাহ রোধ করিতাম না। রাজার নাম শিলাদিত্য কি শালিবাহন, কাশী কাঞ্চি কনোজ কোশল অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের মধ্যে ঠিক কোন্‌খানটিতে তাঁহার রাজত্ব, এ সকল ইতিহাস-ভূগোলের তর্ক আমাদের কাছে নিতান্তই তুচ্ছ ছিল,-- আসল যে-কথাটি শুনিলে অন্তর পুলকিত হইয়া উঠিত এবং সমস্ত হৃদয় একমুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুদ্বেগে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট হইত সেটি হইতেছে-- এক যে ছিল রাজা।
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
বউ-ঠাকুরানীর হাট
Novels
অন্তর্বিষয়ী ভাবের কবিত্ব থেকে বহির্বিষয়ী কল্পনালোকে একসময়ে মন যে প্রবেশ করলে, ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল, এ বোধ হয় কৌতূহল থেকে।
প্রাচীর-ঘেরা মন বেরিয়ে পড়ল বাইরে, তখন সংসারের বিচিত্র পথে তার যাতায়াত আরম্ভ হয়েছে। এই সময়টাতে তার লেখনী গদ্যরাজ্যে নূতন ছবি নূতন নূতন অভিজ্ঞতা খুঁজতে চাইলে। তারই প্রথম প্রয়াস দেখা দিল বউ-ঠাকুরানীর হাট গল্পে-- একটা রোমান্টিক ভূমিকায় মানবচরিত্র নিয়ে খেলার ব্যাপারে, সেও অল্পবয়সেরই খেলা। চরিত্রগুলির মধ্যে যেটুকু জীবনের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে সেটা পুতুলের ধর্ম ছাড়িয়ে উঠতে পারে নি। তারা আপন চরিত্রবলে অনিবার্য পরিণামে চালিত নয়, তারা সাজানো জিনিস একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে। আজও হয়তো এই গল্পটার দিকে ফিরে চাওয়া যেতে পারে। এ যেন অশিক্ষিত আঙুলের আঁকা ছবি; সুনিশ্চিত মনের পাকা হাতের চিহ্ন পড়ে নি তাতে। কিন্তু আর্টের খেলাঘরে ছেলেমানুষিরও একটা মূল্য আছে। বুদ্ধির বাধাহীন পথে তার খেয়াল যা-তা কাণ্ড করতে বসে, তার থেকে প্রাথমিক মনের একটা কিছু কারিগরি বেরিয়ে পড়ে।
"বঁধুয়া অসময়ে কেন হে প্রকাশ?
সকলি যে স্বপ্ন বলে হতেছে বিশ্বাস।
চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে ছিলে,      সেথায় তো আদর মিলে?
এরি মধ্যে মিটিল কি প্রণয়েরি আশ?
এখনো তো রয়েছে রাত      এখনো হয় নি প্রভাত,
এখনো এ রাধিকার ফুরায় নি তো অশ্রুপাত।
চন্দ্রাবলীর কুসুমসাজ       এখনি কি শুকাল আজ?
চকোর হে, মিলাল কি সে চন্দ্রমুখের মধুর হাস?"
"আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেক দিনের পরে।
ভয় নাইকো সুখে থাকো,
অধিক ক্ষণ থাকব নাকো।
আসিয়াছি দুদণ্ডেরি তরে।
দেখব শুধু মুখখানি
শুনব দুটি মধুর বাণী
আড়াল থেকে হাসি দেখে চলে যাব দেশান্তরে।"
"মলিন মুখে ফুটুক হাসি জুড়াক দু-নয়ন।"
"মলিন মুখে ফুটুক হাসি, জুড়াক দু-নয়ন।
মলিন বসন ছাড়ো সখী, পরো আভরণ।"
হাসিরে পায়ে ধরে রাখিবি কেমন করে,
হাসির সে প্রাণের সাধ ও অধরে খেলা করে।
"সারা বরষ দেখি নে মা, মা তুই আমার কেমনধারা,
নয়নতারা হারিয়ে আমার অন্ধ হল নয়নতারা।
এলি কি পাষাণী ওরে
দেখব তোরে আঁখি ভরে
কিছুতেই থামে না যে মা, পোড়া এ নয়নের ধারা।"
"কবরীতে ফুল শুকাল, কাননের ফুল ফুটল বনে,
দিনের আলো প্রকাশিল, মনের সাধ রহিল মনে।"
"ওরে, যেতে হবে, আর দেরি নাই,
পিছিয়ে পড়ে রবি কত, সঙ্গীরা তোর গেল সবাই।
আয় রে ভবের খেলা সেরে, আঁধার করে এসেছে রে,
(ওরে) পিছন ফিরে বারে বারে কাহার পানে চাহিস রে ভাই।
খেলতে এল ভবের নাটে, নতুন লোকে নতুন খেলা,
হেথা হতে আয় রে সরে, নইলে তোরে মারবে ঢেলা,
নামিয়ে দে রে প্রাণের বোঝা, আর এক দেশে চল্‌ রে সোজা,
(সেথা) নতুন করে বাঁধবি বাসা, নতুন খেলা খেলবি সে ঠাঁই।"
"আমার যাবার সময় হল,
আমায় কেন রাখিস ধরে,
চোখের জলের বাঁধন দিয়ে
বাঁধিস নে আর মায়াডোরে।
ফুরিয়েছে জীবনের ছুটি,
ফিরিয়ে নে তোর নয়ন দুটি,
নাম ধরে আর ডাকসি নে ভাই,
যেতে হবে ত্বরা করে।"
"ভিক্ষা যদি দিবে রাই,
(আমার) সোনা রুপায় কাজ নাই,
(আমি) প্রাণের দায়ে এসেছি হে,
মান রতন ভিক্ষা চাই।
আমিই শুধু রইনু বাকি।
যা ছিল তা গেল চলে, রইল যা তা কেবল ফাঁকি
আমার ব'লে ছিল যারা
আর তো তারা দেয় না সাড়া,
কোথায় তারা, কোথায় তারা? কেঁদে কেঁদে কারে ডাকি।
বল্‌ দেখি মা, শুধাই তোরে,
আমার কিছু রাখলি নে রে?
আমি কেবল আমায় নিয়ে কোন্‌ প্রাণেতে বেঁচে থাকি।
আমি শুধু রইনু বাকি।
যা ছিল তা গেল চলে,
রইল যা তা কেবল ফাঁকি।"
তাজবে তাজ নওবে নও।
আমি শুধু রইনু বাকি।
আর কি আমি ছাড়ব তোরে।
মন দিয়ে মন            নাই বা পেলেম
জোর করে রাখিব ধরে।
শূন্য করে হৃদয়-পুরী       প্রাণ যদি করিলে চুরি
তুমিই তবে থাকো সেথায়
শূন্য হৃদয় পূর্ণ করে।
আরো দেখুন
যোগী
Verses
পশ্চিমে ডুবেছে ইন্দু,              সম্মুখে উদার সিন্ধু,
             শিরোপরি অনন্ত আকাশ,
লম্বমান জটাটুটে,                যোগিবর করপুটে
             দেখিছেন সূর্যের প্রকাশ।
উলঙ্গ সুদীর্ঘকায়,                   বিশাল ললাট ভায়,
             মুখে তাঁর শান্তির বিকাশ।
শূন্যে আঁখি চেয়ে আছে,          উদার বুকের কাছে
             খেলা করে সমুদ্রবাতাস।
চৌদিকে দিগন্ত মুক্ত,               বিশ্বচরাচর সুপ্ত,
             তারি মাঝে যোগী মহাকায়।
ভয়ে ভয়ে ঢেউগুলি             নিয়ে যায় পদধূলি,
             ধীরে আসে, ধীরে চলে যায়।
মহা স্তব্ধ সব ঠাঁই,               বিশ্বে আর শব্দ নাই
             কেবল সিন্ধুর মহা তান--
যেন সিন্ধু ভক্তিভরে              জলদগম্ভীর স্বরে
             তপনের করে স্তবগান।
আজি সমুদ্রের কূলে,               নীরবে সমুদ্র দুলে
             হৃদয়ের অতল গভীরে।
অনন্ত সে পারাবার                  ডুবাইছে চারি ধার,
             ঢেউ লাগে জগতের তীরে।
যোগী যেন চিত্রে লিখা,            উঠিছে রবির শিখা
             মুখে তারি পড়িছে কিরণ,
পশ্চাতে ব্যাপিয়া দিশি,            তামসী তাপসী নিশি
             ধ্যান করে মুদিয়া নয়ন।
শিবের জটার 'পরে                  যথা সুরধুনী ঝরে
             তারাচূর্ণ রজতের স্রোতে,
তেমনি কিরণ লুটে                 সন্ন্যাসীর জটাজুটে
             পূরব-আকাশ-সীমা হতে।
বিমল আলোক হেন            ব্রহ্মলোক হতে যেন
             ঝরে তাঁর ললাটের কাছে,
মর্ত্যের তামসী নিশি        পশ্চাতে যেতেছে মিশি
             নীরবে নিস্তব্ধ চেয়ে আছে।
সুদূর সমুদ্রনীরে                অসীম আঁধার-তীরে
             একটুকু কনকের রেখা,
কী মহা রহস্যময়,                        সমুদ্রে অরুণোদয়
             আভাসের মতো যায় দেখা।
চরাচর ব্যগ্র প্রাণে                     পুরবের পথ-পানে
             নেহারিছে সমুদ্র অতল--
দেখো চেয়ে মরি মরি,              কিরণ-মৃণাল 'পরি
             জ্যোতির্ময় কনককমল।
দেখো চেয়ে দেখো পুবে           কিরণে গিয়েছে ডুবে
             গগনের উদার ললাট--
সহসা সে ঋষিবর                আকাশে তুলিয়া কর
             গাহিয়া উঠিল বেদ-পাঠ।
আরো দেখুন
মেঘদূত
Stories
মিলনের প্রথম দিনে বাঁশি কী বলেছিল।
সে বলেছিল, 'সেই মানুষ আমার কাছে এল যে মানুষ আমার দূরের।'
আরো দেখুন
বদনাম
Stories
ক্রিং ক্রিং ক্রিং সাইকেলের আওয়াজ; সদর দরজার কাছে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন ইন্‌স্‌পেক্টার বিজয়বাবু। গায়ে ছাঁটা কোর্তা, কোমরে কোমরবন্ধ, হাফ-প্যাণ্টপরা, চলনে কেজো লোকের দাপট। দরজার কড়া নাড়া দিতেই গিন্নি এসে খুলে দিলেন।
ইন্‌স্‌পেক্টার ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝংকার দিয়ে উঠলেন--'এমন করে তো আর পারি নে, রাত্তিরের পর রাত্তির খাবার আগলে রাখি! তুমি কত চোর ডাকাত ধরলে, সাধু সজ্জনও বাদ গেল না, আর ঐ একটা লোক অনিল মিত্তিরের পিছন পিছন তাড়া করে বেড়াচ্ছ, সে থেকে থেকে তোমার সামনে এসে নাকের উপর বুড়ো আঙুল নাড়া দিয়ে কোথায় দৌড় মারে তার ঠিকানা নেই। দেশসুদ্ধ লোক তোমার এই দশা দেখে হেসে খুন, এ যেন সার্কাসের খেলা হচ্ছে।'
আরো দেখুন
ওরে মাঝি, ওরে
Songs
ওরে মাঝি, ওরে আমার মানবজন্মতরীর মাঝি,
শুনতে কি পাস দূরের থেকে পারের বাঁশি উঠছে বাজি॥
     তরী কি তোর দিনের শেষে   ঠেকবে এবার ঘাটে এসে।
     সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে দেয় কি দেখা প্রদীপরাজি॥
যেন আমার লাগে মনে   মন্দ-মধুর এই পবনে
সিন্ধুপারের হাসিটি কার আঁধার বেয়ে আসছে আজি।
     আসার বেলায় কুসুমগুলি   কিছু এনেছিলেম তুলি,
     যেগুলি তার নবীন আছে এই বেলা নে সাজিয়ে সাজি॥
আরো দেখুন