প্রগতিসংহার
Stories
এই কলেজে ছেলেমেয়েদের মেলামেশা বরঞ্চ কিছু বাড়াবাড়ি ছিল। এরা প্রায় সবাই ধনী ঘরের--এরা পয়সার ফেলাছড়া করতে ভালোবাসে। নানা রকম বাজে খরচ করে মেয়েদের কাছে দরাজ হাতের নাম কিনত। মেয়েদের মনে ঢেউ তুলত, তারা বুক ফুলিয়ে বলত--'আমাদেরই কলেজের ছেলে এরা'। সরস্বতী পুজো তারা এমনি ধূম করে করত যে, বাজারে গাঁদা ফুলের আকাল পড়ে যেত। এ ছাড়া চোখটেপাটেপি ঠাট্টা তামাসা চলেইছে। এই তাদের মাঝখানে একটা সংঘ তেড়েফুঁড়ে উঠে মেলামেশা ছারখার করে দেবার জো করলে।
সংঘের হাল ধরে ছিল সুরীতি। নাম দিল 'নারীপ্রগতিসংঘ'। সেখানে পুরুষের ঢোকবার দরজা ছিল বন্ধ। সুরীতির মনের জোরের ধাক্কায় এক সময়ে যেন পুরুষ-বিদ্রোহের একটা হাওয়া উঠল। পুরুষরা যেন বেজাত, তাদের সঙ্গে জলচল বন্ধ। কদর্য তাদের ব্যায়ভার।
আরো দেখুন
ব্যবধান
Stories
সম্পর্ক মিলাইয়া দেখিতে গেলে বনমালী এবং হিমাংশুমালী উভয়ে মামাতো পিসতুতো ভাই; সেও অনেক হিসাব করিয়া দেখিলে তবে মেলে। কিন্তু ইহাদের দুই পরিবার বহুকাল হইতে প্রতিবেশী, মাঝে কেবল একটা বাগানের ব্যবধান, এইজন্য ইহাদের সম্পর্ক নিতান্ত নিকট না হইলেও ঘনিষ্ঠতার অভাব নাই।
বনমালী হিমাংশুর চেয়ে অনেক বড়ো। হিমাংশুর যখন দন্ত এবং বাক্যস্ফূর্তি হয় নাই, তখন বনমালী তাহাকে কোলে করিয়া এই বাগানে সকালে সন্ধ্যায় হাওয়া খাওয়াইয়াছে, খেলা করিয়াছে, কান্না থামাইয়াছে, ঘুম পাড়াইয়াছে এবং শিশুর মনোরঞ্জন করিবার জন্য পরিণতবুদ্ধি বয়স্ক লোকদিগকে সবেগে শিরশ্চালন, তারস্বরে প্রলাপভাষণ প্রভৃতি যে-সকল বয়সানুচিত চাপল্য এবং উৎকট উদ্যম প্রকাশ করিতে হয়, বনমালী তাহাও করিতে ত্রুটি করে নাই।
আরো দেখুন
দৃষ্টিদান
Stories
শুনিয়াছি, আজকাল অনেক বাঙালির মেয়েকে নিজের চেষ্টায় স্বামী সংগ্রহ করিতে হয়। আমিও তাই করিয়াছি, কিন্তু দেবতার সহায়তায়। আমি ছেলেবেলা হইতে অনেক ব্রত এবং অনেক শিবপূজা করিয়াছিলাম।
আমার আটবৎসর বয়স উত্তীর্ণ না হইতেই বিবাহ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু পূর্বজন্মের পাপবশত আমি আমার এমন স্বামী পাইয়াও সম্পূর্ণ পাইলাম না। মা ত্রিনয়নী আমার দুইচক্ষু লইলেন। জীবনের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত স্বামীকে দেখিয়া লইবার সুখ দিলেন না।
আরো দেখুন
তার অন্ত নাই গো
Songs
তার         অন্ত নাই গো যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ।
তার         অণু-পরমাণু পেল কত আলোর সঙ্গ,
              ও তার   অন্ত নাই গো নাই।
তারে   মোহনমন্ত্র দিয়ে গেছে কত ফুলের গন্ধ,
তারে   দোলা দিয়ে দুলিয়ে গেছে কত ঢেউয়ের ছন্দ,
              ও তার   অন্ত নাই গো নাই।
আছে   কত সুরের সোহাগ যে তার স্তরে স্তরে লগ্ন,
সে যে   কত রঙের রসধারায় কতই হল মগ্ন,
              ও তার   অন্ত নাই গো নাই।
কত         শুকতারা যে স্বপ্নে তাহার রেখে গেছে স্পর্শ,
কত         বসন্ত যে ঢেলেছে তায় অকারণের হর্ষ,
              ও তার   অন্ত নাই গো নাই।
সে যে   প্রাণ পেয়েছে পান করে যুগ-যুগান্তরের স্তন্য--
ভুবন   কত তীর্থজলের ধারায় করেছে তায় ধন্য,
              ও তার   অন্ত নাই গো নাই।
সে যে   সঙ্গিনী মোর, আমারে সে দিয়েছে বরমাল্য।
আমি    ধন্য, সে মোর অঙ্গনে যে কত প্রদীপ জ্বালল--
              ও তার   অন্ত নাই গো নাই ॥
আরো দেখুন
অনুগ্রহ
Verses
                   এই-যে জগৎ হেরি আমি,
                   মহাশক্তি জগতের স্বামী,
                   এ কি হে তোমার অনুগ্রহ?
                   হে বিধাতা কহো মোরে কহো।
          ওই-যে সমুখে সিন্ধু,              এ কি অনুগ্রহবিন্দু?
          ওই-যে আকাশে শোভে চন্দ্র সূর্য গ্রহ,
                   ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তব অনুগ্রহ?
                   ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্র একজন
                   আমারে যে করেছ সৃজন,
                   এ কি শুধু অনুগ্রহ করে
                   ঋণপাশে বাঁধিবারে মোরে?
                   করিতে করিতে যেন খেলা
                   কটাক্ষে করিয়া অবহেলা,
          হেসে ক্ষমতার হাসি অসীম ক্ষমতা হতে
                   ব্যয় কয়িয়াছ এক রতি
                   অনুগ্রহ করে মোর প্রতি?
          শুভ্র শুভ্র জুঁই দুটি          ওই-যে রয়েছে ফুটি
          ও কি তব অতি শুভ্র ভালোবাসা নয়?
                   বলো মোরে, মহাশক্তিময়,
ওই-যে জোছনা-হাসি   ওই-যে তারকারাশি,
              আকাশে হাসিয়া ফুটে রয়,
ও কি তব ভালোবাসা নয়?
ও কি তব অনুগ্রহ-হাসি
কঠোর পাষাণ লৌহময়?
তবে হে হৃদয়হীন দেব,  
জগতের রাজ-অধিরাজ,
হানো তব হাসিময় বাজ,
মহা অনুগ্রহ হতে তব
মুছে তুমি ফেলহ আমারে--
চাহি না থাকিতে এ সংসারে।
ভালোবাসি আপনা ভুলিয়া,
গান গাহি হৃদয় খুলিয়া,
ভক্তি করি পৃথিবীর মতো,
স্নেহ করি আকাশের প্রায়।
আপনারে দিয়েছি ফেলিয়া
আপনারে গিয়েছি ভুলিয়া
যারে ভালোবাসি তার কাছে
প্রাণ শুধু ভালোবাসা চায়।
              সাক্ষী আছ তুমি অন্তর্যামী
              কতখানি ভালোবাসি আমি,
          দেখি যবে তার মুখ      হৃদয়ে দারুণ সুখ
             ভেঙে ফেলে হৃদয়ের দ্বার,
             বলে, "এ কী ঘোর কারাগার!"
             প্রাণ বলে, "পারি নে সহিতে,
             এ দুরন্ত সুখেরে বহিতে।"
          আকাশে হেরিলে শশী আনন্দে উথলি উঠি
    দেয় যথা মহাপারাবার
             অসীম আনন্দ উপহার,  
          তেমনি সমুদ্র-ভরা আনন্দ তাহারে দিই
             হৃদয় যাহারে ভালোবাসে,
          হৃদয়ের প্রতি ঢেউ উথলি গাহিয়া উঠে
             আকাশ পুরিয়া গীতোচ্ছ্বাসে।
          ভেঙে ফেলি উপকূল   পৃথিবী ডুবাতে চাহে,
             আকাশে উঠিতে চায় প্রাণ--
          আপনারে ভুলে গিয়ে হৃদয় হইতে চাহে
                   একটি জগতব্যাপী গান।
                   তাহারে কবির অশ্রু হাসি
                   দিয়েছি কত-না রাশি রাশি,  
তাহারি কিরণে ফুটিতেছে
হৃদয়ের আশা ও ভরসা
তাহারি হাসি ও অশ্রুজল
এ প্রাণের বসন্ত বরষা।
ভালোবাসি, আর গান গাই--
কবি হয়ে জন্মেছি ধরায়
রাত্রি এত ভালো নাহি বাসে,
উষা এত গান নাহি গায়।
ভালোবাসা স্বাধীন মহান,
ভালোবাসা পর্বতসমান।
ভিক্ষাবৃত্তি করে না তপন
পৃথিবীরে চাহে সে যখন--
সে চাহে উজ্জ্বল করিবারে,
সে চাহে উর্বর করিবারে,
জীবন করিতে প্রবাহিত,
কুসুম করিতে বিকশিত।
চাহে সে বাসিতে শুধু ভালো
চাহে সে করিতে শুধু আলো
স্বপ্নেও কি ভাবে কভু ধরা,  
তপনেরে অনুগ্রহ করা?
যবে আমি যাই তার কাছে
সে কি মনে ভাবে গো তখন
অনুগ্রহ ভিক্ষা মাগিবারে
এসেছে ভিক্ষুক একজন?
অনুগ্রহ পাষাণমমতা
করুণার কঙ্কাল কেবল,
ভাবহীন বজ্রে গড়া হাসি--
স্ফটিককঠিন অশ্রু-জল।
অনুগ্রহ বিলাসী গবিত,
অনুগ্রহ দয়ালু-কৃপণ--
বহু কষ্টে অশ্রুবিন্দু দেয়
শুষ্ক আঁখি করিয়া মন্থন।
নীচ হীন দীন অনুগ্রহ
কাছে যবে আসিবারে চায়
প্রণয় বিলাপ করি উঠে--
গীতগান ঘৃণায় পলায়।
হে দেবতা, অনুগ্রহ হতে
রক্ষা করো অভাগা কবিরে,
অপযশ অপমান দাও--
দুঃখ জ্বালা বহিব এ শিরে।
                   সম্পদের স্বর্ণকারাগারে,
গরবের অন্ধকার-মাঝ,
অনুগ্রহ রাজার মতন
চিরকাল করুক বিরাজ।
সোনার শৃঙ্খল ঝংকারিয়া
গরবের স্ফীত দেহ লয়ে
অনুগ্রহ আসে নাকো যেন
আমাদের স্বাধীন আলয়ে।
গান আসে ব'লে গান গাই,
ভালোবাসি ব'লে ভালোবাসি,
কেহ ,যেন মনে নাহি করে
মোরা কারো কৃপার প্রয়াসী।
নাহয় শুনো না মোর গান,
ভালেবাসা ঢাকা রবে মনে।
অনুগ্রহ করে এই কোরো--
অনুগ্রহ কোরো না এ জনে।
আরো দেখুন
মুনশি
Stories
আচ্ছা দাদামশায়, তোমাদের সেই মুনশিজি এখন কোথায় আছেন।
এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব তার সময়টা বুঝি কাছে এসেছে, তবু হয়তো কিছুদিন সবুর করতে হবে।
আরো দেখুন
বাণী
Stories
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব'লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।
তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই-- আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।
আরো দেখুন
রাজটিকা
Stories
নবেন্দুশেখরের সহিত অরুণলেখার যখন বিবাহ হইল, তখন হোমধূমের অন্তরাল হইতে ভগবান প্রজাপতি ঈষৎ একটু হাস্য করিলেন। হায়, প্রজাপতির পক্ষে যাহা খেলা আমাদের পক্ষে তাহা সকল সময়ে কৌতুকের নহে।
নবেন্দুশেখরের পিতা পূর্ণেন্দুশেখর ইংরাজরাজ-সরকারে বিখ্যাত। তিনি এই ভবসমুদ্রে কেবলমাত্র দ্রুতবেগে সেলাম-চালনা দ্বারা রায়বাহাদুর পদবীর উৎতুঙ্গ মরুকূলে উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন; আরো দুর্গমতর সম্মানপথের পাথেয় তাঁহার ছিল, কিন্তু পঞ্চান্ন বৎসর বয়ঃক্রমকালে অনতিদূরবর্তী রাজখেতাবের কুহেলিকাচ্ছন্ন গিরিচূড়ার প্রতি করুণ লোলুপ দৃষ্টি স্থিরনিবদ্ধ করিয়া এই রাজানুগৃহীত ব্যাক্তি অকস্মাৎ খেতাববর্জিত লোকে গমন করিলেন এবং তাঁহার বহু-সেলাম-শিথিল গ্রীবাগ্রন্থি শ্মশানশয্যায় বিশ্রাম লাভ করিল।
আরো দেখুন
মাস্টারমশায়
Stories
রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তাহার পাশে একটি কোট-হ্যাট-পরা বাঙালি বিলাতফের্তা যুবা সম্মুখের আসনে দুই পা তুলিয়া দিয়া একটু মদমত্ত অবস্থায় ঘাড় নামাইয়া ঘুমাইতেছিল। এই যুবকটি নূতন বিলাত হইতে আসিয়াছে। ইহারই অভ্যর্থনা উপলক্ষে বন্ধুমহলে একটা খানা হইয়া গেছে। সেই খানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্য নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, 'মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।'
মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন।
আরো দেখুন