রাসমণির ছেলে
Stories
কালীপদর মা ছিলেন রাসমণি-- কিন্তু তাঁহাকে দায়ে পড়িয়া বাপের পদ গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। কারণ, বাপ মা উভয়েই মা হইয়া উঠিলে ছেলের পক্ষে সুবিধা হয় না। তাঁহার স্বামী ভবানীচরণ ছেলেকে একেবারেই শাসন করিতে পারেন না।
তিনি কেন এত বেশি আদর দেন তাহা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি যে উত্তর দিয়া থাকেন তাহা বুঝিতে হইলে পূর্ব ইতিহাস জানা চাই।
আরো দেখুন
হালদারগোষ্ঠী
Stories
এই পরিবারটির মধ্যে কোনোরকমের গোল বাধিবার কোনো সংগত কারণ ছিল না। অবস্থাও সচ্ছল, মানুষগুলিও কেহই মন্দ নহে, কিন্তু তবুও গোল বাধিল।
কেননা, সংগত কারণেই যদি মানুষের সব-কিছু ঘটিত তবে তো লোকালয়টা একটা অঙ্কের খাতার মতো হইত, একটু সাবধানে চলিলেই হিসাবে কোথাও কোনো ভুল ঘটিত না; যদি বা ঘটিত সেটাকে রবার দিয়া মুছিয়া সংশোধন করিলেই চলিয়া যাইত।
আরো দেখুন
অতিথি
Stories
কাঁঠালিয়ার জমিদার মতিলালবাবু নৌকা করিয়া সপরিবারে স্বদেশে যাইতেছিলেন। পথের মধ্যে মধ্যাহ্নে নদীতীরের এক গঞ্জের নিকট নৌকা বাঁধিয়া পাকের আয়োজন করিতেছেন এমন সময় এক ব্রাহ্মণবালক আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'বাবু, তোমরা যাচ্ছ কোথায়?'
প্রশ্নকর্তার বয়স পনেরো-ষোলোর অধিক হইবে না।
আরো দেখুন
ক্ষণিক মিলন
Verses
আকাশের দুই দিক হতে          দুইখানি মেঘ এল ভেসে,
দুইখানি দিশাহারা মেঘ--         কে জানে এসেছে কোথা হতে
সহসা থামিল থমকিয়া             আকাশের মাঝখানে এসে,
দোঁহাপানে চাহিল দু-জনে        চতুর্থীর চাঁদের আলোতে।
ক্ষীণালোকে বুঝি মনে পড়ে      দুই অচেনার চেনাশোনা,
মনে পড়ে কোন্‌ ছায়া-দ্বীপে,     কোন্‌ কুহেলিকা-ঘের দেশে,
কোন্‌ সন্ধ্যা-সাগরের কূলে       দু-জনের ছিল আনাগোনা।
মেলে দোঁহে তবুও মেলে না     তিলেক বিরহ রহে মাঝে,
চেনা বলে মিলিবারে চায়,        অচেনা বলিয়া মরে লাজে।
মিলনের বাসনার মাঝে            আধখানি চাঁদের বিকাশ,--
দুটি চুম্বনের ছোঁয়াছুয়ি,          মাঝে যেন শরমের হাস,
দুখানি অলস আঁখিপাতা,        মাঝে সুখস্বপন-আভাস।
দোঁহার পরশ লয়ে দোঁহে         ভেসে গেল, কহিল না কথা,
বলে গেল সন্ধ্যার কাহিনী,        লয়ে গেল উষার বারতা॥
আরো দেখুন
মানভঞ্জন
Stories
রমানাথ শীলের ত্রিতল অট্টালিকায় সর্ব্বোচ্চ তলের ঘরে গোপীনাথ শীলের স্ত্রী গিরিবালা বাস করে। শয়নকক্ষের দক্ষিণ দ্বারের সম্মুখে ফুলের টবে গুটিকতক বেলফুল এবং গোলাপফুলের গাছ; ছাতটি উচ্চ প্রাচীর দিয়া ঘেরা-- বহিরদৃশ্য দেখিবার জন্য প্রাচীরের মাঝে মাঝে একটি করিয়া ইট ফাঁক দেওয়া আছে। শোবার ঘরে নানা বেশ এবং বিবেশ-বিশিষ্ট বিলাতি নারীমূর্তির বাঁধানো এন্‌গ্রেভিং টাঙানো রহিয়াছে; কিন্তু প্রবেশদ্বারের সম্মুখবর্তী বৃহৎ আয়নার উপরে ষোড়শী গৃহস্বামিনীর যে প্রতিবিম্বটি পড়ে তাহা দেয়ালের কোনো ছবি অপেক্ষা সৌন্দর্যে ন্যূন নহে।
গিরিবালার সৌন্দর্য অকস্মাৎ আলোকরশ্মির ন্যায়, বিস্ময়ের ন্যায়, নিদ্রাভঙ্গে চেতনার ন্যায়, একেবারে চকিতে আসিয়া আঘাত করে এবং এক আঘাতে অভিভূত করিয়া দিতে পারে। তাহাকে দেখিলে মনে হয়, ইহাকে দেখিবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না; চারি দিকে এবং চিরকাল যেরূপ দেখিয়া আসিতেছি এ একেবারে হঠাৎ তাহা হইতে অনেক স্বতন্ত্র।
আরো দেখুন
বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি
Verses
       বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি,
              সে কি সহজ গান।
       সেই সুরেতে জাগব আমি
              দাও মোরে সেই কান।
                                  ভুলব না আর সহজেতে,
                                  সেই প্রাণে মন উঠবে মেতে
                                  মৃত্যুমাঝে ঢাকা আছে
                                         যে অন্তহীন প্রাণ।
       সে ঝড় যেন সই আনন্দে
              চিত্তবীণার তারে
       সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত
              নাচাও যে ঝংকারে।
                                  আরাম হতে ছিন্ন ক'রে
                                  সেই গভীরে লও গো মোরে
                                  অশান্তির অন্তরে যেথায়
                                         শান্তি সুমহান।
আরো দেখুন
সংস্কার
Stories
চিত্রগুপ্ত এমন অনেক পাপের হিসাব বড়ো অক্ষরে তাঁর খাতায় জমা করেন যা থাকে পাপীর নিজের অগোচরে। তেমনি এমন পাপও ঘটে যাকে আমিই চিনি পাপ বলে, আর-কেউ না। যেটার কথা লিখতে বসেছি সেটা সেই জাতের। চিত্রগুপ্তের কাছে জবাবদিহি করবার পূর্বে আগে-ভাগে কবুল করলে অপরাধের মাত্রাটা হাল্‌কা হবে।
ব্যাপারটা ঘটেছিল কাল শনিবার দিনে। সেদিন আমাদের পাড়ায় জৈনদের মহলে কী একটা পরব ছিল। আমার স্ত্রী কলিকাকে নিয়ে মোটরে করে বেরিয়েছিলুম-- চায়ের নিমন্ত্রণ ছিল বন্ধু নয়নমোহনের বাড়িতে।
আরো দেখুন
Giribala
Stories
GIRIBALA is overflowing with exuberance of youth that seems spilling over in spray all around her,—in the folds of her soft dress, the turning of her neck, the motion of her hands, in the rhythm of her steps, now quick now languid, in her tinkling anklets and ringing laughter, in her voice and glances. She would often been seen, wrapt in a blue silk, walking on her terrace, in an impulse of unaccountable restlessness. Her limbs seem eager to dance to the time of an inner music unceasing and unheard. She takes pleasure in merely moving her body, causing ripples to break out in the flood of her young life. She would suddenly pluck a leaf from a plant in the flower-pot and throw it up in the sky, and her bangles would give a sudden tinkle, and the careless grace of her hand, like a bird freed from its cage, would fly unseen in the air. With her swift fingers she would brush away from her dress a mere nothing; standing on tiptoe she would peep over her terrace walls for no cause whatever, and then with a rapid motion turn round to go to another direction, swinging her bunch of keys tied to a corner of her garment. She would loosen her hair in an untimely caprice, sitting before her mirror to do it up again, and then in a fit of laziness would fling herself upon her bed, like a line of stray moonlight slipping through some opening of the leaves, idling in the shadow.
She has no children and, having been married in a wealthy family, has very little work to do. Thus she seems to be daily accumulating her own self without expenditure, till the vessel is brimming over with the seething surplus. She has her husband, but not under her control. She has grown up from a girl into a woman, yet escaping, through familiarity, her husband's notice.
আরো দেখুন
সুধিয়া
Verses
গয়লা ছিল শিউনন্দন, বিখ্যাত তার নাম,
গোয়ালবাড়ি ছিল যেন একটা গোটা গ্রাম।
গোরু-চরার প্রকাণ্ড খেত, নদীর ওপার চরে,
কলাই শুধু ছিটিয়ে দিত পলি জমির 'পরে।
জেগে উঠত চারা তারই, গজিয়ে উঠত ঘাস,
ধেনুদলের ভোজ চলত মাসের পরে মাস।
মাঠটা জুড়ে বাঁধা হত বিশ-পঞ্চাশ চালা,
জমত রাখাল ছেলেগুলোর মহোৎসবের পালা।
গোপাষ্টমীর পর্বদিনে প্রচুর হত দান,
গুরুঠাকুর গা ডুবিয়ে দুধে করত স্নান।
তার থেকে সর ক্ষীর নবনী তৈরি হত কত,
প্রসাদ পেত গাঁয়ে গাঁয়ে গয়লা ছিল যত।
বছর তিনেক অনাবৃষ্টি, এল মন্বন্তর;
শ্রাবণ মাসে শোণনদীতে বান এল তারপর।
ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে গর্জি ছুটল ধারা,
ধরণী চায় শূন্য-পানে সীমার চিহ্নহারা।
ভেসে চলল গোরু বাছুর, টান লাগল গাছে;
মানুষে আর সাপে মিলে শাখা আঁকড়ে আছে।
বন্যা যখন নেমে গেল বৃষ্টি গেল থামি,
আকাশজুড়ে দৈত্যে-দেবের ঘুচল সে পাগলামি।
শিউনন্দন দাঁড়ালো তার শূন্য ভিটেয় এসে--
তিনটে শিশুর ঠিকানা নেই, স্ত্রী গেছে তার ভেসে।
চুপ করে সে রইল বসে, বুদ্ধি পায় না খুঁজি;
মনে হল, সব কথা তার হারিয়ে গেল বুঝি।
ছেলেটা তার ভীষণ জোয়ান, সামরু বলে তাকে;
  এক-গলা এই জলে-ডোবা সকল পাড়াটাকে
  মথন করে ফিরে ফিরে তিনটে গোরু নিয়ে
  ঘরে এসে দেখলে, দু হাত চোখে ঢাকা দিয়ে
  ইষ্টদেবকে স্মরণ ক'রে নড়ছে বাপের মুখ;
  তাই দেখে ওর একেবারে জ্বলে উঠল বুক--
  বলে উঠল, "দেবতাকে তোর কেন মরিস ডাকি।
  তার দয়াটা বাঁচিয়ে যেটুক আজও রইল বাকি
  ভার নেব তার নিজের 'পরেই, ঘটুক-নাকো যাই আর,
  এর বাড়া তো সর্বনাশের সম্ভাবনা নাই আর।"
  এই বলে সে বাড়ি ছেড়ে পাঁকের পথে ঘুরে
  চিহ্ন-দেওয়া নিজের গোরু অনেক দূরে দূরে
  গোটা পাঁচেক খোঁজ পেয়ে তার আনলে তাদের কেড়ে,
  মাথা ভাঙবে ভয় দেখাতেই সবাই দিল ছেড়ে।
  ব্যাবসাটা ফের শুরু করল নেহাত গরিব চালে,
  আশা রইল উঠবে জেগে আবার কোনোকালে।
  এদিকেতে প্রকাণ্ড এক দেনার অজগরে
  একে একে গ্রাস করছে যা আছে তার ঘরে।
  একটু যদি এগোয় আবার পিছন দিকে ঠেলে,
  দেনা পাওনা দিনরাত্রি জোয়ার-ভাঁটা খেলে।
  মাল তদন্ত করতে এল দুনিয়াচাঁদ বেনে,
  দশবছরের ছেলেটাকে সঙ্গে করে এনে।
  ছেলেটা ওর জেদ ধরেছে-- ঐ সুধিয়া গাই
  পুষবে ঘরে আপন ক'রে ওইটে নেহাত চাই।
সামরু বলে, "তোমার ঘরে কী ধন আছে কত
আমাদের এই সুধিয়াকে কিনে নেবার মতো
ও যে আমার মানিক, আমার সাত রাজার ঐ ধন,
আর যা আমার যায় সবই যাক, দুঃখিত নয় মন।
মৃত্যুপারের থেকে ও যে ফিরেছে মোর কাছে,
এমন বন্ধু তিন ভুবনে আর কি আমার আছে।"
বাপের কানে কী বললে সেই দুনিচাঁদের ছেলে,
জেদ বেড়ে তার গেল বুঝি যেমনি বাধা পেলে।
শেঠজি বলে মাথা নেড়ে, "দুই চারিমাস যেতেই
ঐ সুধিয়ার গতি হবে আমার গোয়ালেতেই।"
কালোয় সাদায় মিশোল বরন, চিকন নধর দেহ,
সর্ব অঙ্গে ব্যাপ্ত যেন রাশীকৃত স্নেহ।
আকাল এখন, সামরু নিজে দুইবেলা আধ-পেটা;
সুধিয়াকে খাওয়ানো চাই যখনি পায় যেটা।
দিনের কাজের অবসানে গোয়ালঘরে ঢুকে
ব'কে যায় সে গাভীর কানে যা আসে তার মুখে।
কারো 'পরে রাগ সে জানায়, কখনো সাবধানে
গোপন খবর থাকলে কিছু জানায় কানে কানে।
সুধিয়া সব দাঁড়িয়ে শোনে কানটা খাড়া ক'রে,
বুঝি কেবল ধ্বনির সুখে মন ওঠে তার ভরে।
সামরু যখন ছোটো ছিল পালোয়ানের পেশা
ইচ্ছা করেছিল নিতে, ঐ ছিল তার নেশা।
খবর পেল, নবাববাড়ি কুস্তিগিরের দল
পাল্লা দেবে-- সামরু শুনে অসহ্য চঞ্চল।
বাপকে ব'লে গেল ছেলে, "কথা দিচ্ছি শোনো,
এক হপ্তার বেশি দেরি হবে না কখ্‌খোনো।"
ফিরে এসে দেখতে পেলে, সুধিয়া তার গাই
শেঠ নিয়েছে ছলে বলে গোয়ালঘরে নাই।
যেমনি শোনা অমনি ছুটল, ভোজালি তার হাতে,
দুনিচাঁদের গদি যেথায় নাজির মহল্লাতে।
"কী রে সামরু, ব্যাপারটা কী" শেঠজি শুধায় তাকে।
সামরু বলে "ফিরিয়ে নিতে এলুম সুধিয়াকে।"
শেঠ বললে, "পাগল নাকি, ফিরিয়ে দেব তোরে,
পরশু ওকে নিয়ে এলুম ডিক্রিজারি করে।"
"সুধিয়া রে" "সুধিয়া রে" সামরু দিল হাঁক,
পাড়ার আকাশ পেরিয়ে গেল বজ্রমন্দ্র ডাক।
চেনা সুরের হাম্বা ধ্বনি কোথায় জেগে উঠে,
দড়ি ছিঁড়ে সুধিয়া ঐ হঠাৎ এল ছুটে।
দু চোখ বেয়ে ঝরছে বারি, অঙ্গটি তার রোগা,
অন্নপানে দেয়নি সে মুখ, অনশনে-ভোগা।
সামরু ধরল জড়িয়ে গলা, বললে, "নাই রে ভয়,
আমি থাকতে দেখব এখন কে তোরে আর লয়।--
তোমার টাকায় দুনিয়া কেনা, শেঠ দুনিচাঁদ, তবু
এই সুধিয়া একলা নিজের, আর কারো নয় কভু।
আপন ইচ্ছামতে যদি তোমার ঘরে থাকে
তবে আমি এই মুহূর্তে রেখে যাব তাকে।"
চোখ পাকিয়ে কয় দুনিচাঁদ, "পশুর আবার ইচ্ছে!
গয়লা তুমি, তোমার কাছে কে উপদেশ নিচ্ছে।
গোল কর তো ডাকব পুলিশ।" সামরু বললে, "ডেকো।
ফাঁসি আমি ভয় করিনে, এইটে মনে রেখো।
দশবছরের জেল খাটব, ফিরব তো তারপর,
সেই কথাটাই ভেবো বসে, আমি চললেম ঘর।"
আরো দেখুন
সম্পত্তি-সমর্পণ
Stories
বৃন্দাবন কুণ্ড মহা ক্রুদ্ধ হইয়া আসিয়া তাহার বাপকে কহিল, "আমি এখনই চলিলাম।"
বাপ যজ্ঞনাথ কুণ্ড কহিলেন, "বেটা অকৃতজ্ঞ, ছেলেবেলা হইতে তোকে খাওয়াইতে পরাইতে যে ব্যয় হইয়াছে তাহার পরিশোধ করিবার নাম নাই, আবার তেজ দেখোনা।"
আরো দেখুন
মেঘলা দিনে
Stories
রোজই থাকে সমস্তদিন কাজ, আর চার দিকে লোকজন। রোজই মনে হয়, সেদিনকার কাজে, সেদিনকার আলাপে সেদিনকার সব কথা দিনের শেষে বুঝি একেবারে শেষ করে দেওয়া হয়। ভিতরে কোন্‌ কথাটি যে বাকি রয়ে গেল তা বুঝে নেবার সময় পাওয়া যায় না।
আজ সকালবেলা মেঘের স্তবকে স্তবকে আকাশের বুক ভরে উঠেছে। আজও সমস্ত দিনের কাজ আছে সামনে, আর লোক আছে চার দিকে। কিন্তু, আজ মনে হচ্ছে, ভিতরে যা-কিছু আছে বাইরে তা সমস্ত শেষ করে দেওয়া যায় না।
আরো দেখুন