নামঞ্জুর গল্প
Stories
আমাদের আসর জমেছিল পোলিটিক্যাল লঙ্কাকাণ্ডের পালায়। হাল আমলের উত্তরকাণ্ডে আমরা সম্পূর্ণ ছুটি পাই নি বটে, কিন্তু গলা ভেঙেছে; তা ছাড়া সেই অগ্নিদাহের খেলা বন্ধ।
বঙ্গভঙ্গের রঙ্গভূমিতে বিদ্রোহীর অভিনয় শুরু হল। সবাই জানেন, এই নাট্যের পঞ্চম অঙ্কের দৃশ্য আলিপুর পেরিয়ে পৌঁছল আণ্ডামানের সমুদ্রকূলে। পারানির পাথেয় আমার যথেষ্ট ছিল, তবু গ্রহের গুণে এপারের হাজতেই আমার ভোগসমাপ্তি। সহযোগীদের মধ্যে ফাঁসিকাঠ পর্যন্ত যাদের সর্বোচ্চ প্রোমোশন হয়েছিল, তাদের প্রণাম করে আমি পশ্চিমের এক শহরের কোণে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় পসার জমিয়ে তুললেম।
আরো দেখুন
ভিখারিনী
Stories
কাশ্মীরের দিগন্তব্যাপী জলদস্পর্শী শৈলমালার মধ্যে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম আছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুটিরগুলি আঁধার আঁধার ঝোপঝাপের মধ্যে প্রচ্ছন্ন। এখানে সেখানে শ্রেণীবদ্ধ বৃক্ষচ্ছায়ার মধ্য দিয়া একটি-দুইটি শীর্ণকায় চঞ্চল ক্রীড়াশীল নির্ঝর গ্রাম্য কুটিরের চরণ সিক্ত করিয়া, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপলগুলির উপর দ্রুত পদক্ষেপ করিয়া এবং বৃক্ষচ্যুত ফুল ও পত্রগুলিকে তরঙ্গে তরঙ্গে উলটপালট করিয়া, নিকটস্থ সরোবরে লুটাইয়া পড়িতেছে। দূরব্যাপী নিস্তরঙ্গ সরসী--লাজুক উষার রক্তরাগে, সূর্যের হেমময় কিরণে, সন্ধ্যার স্তরবিন্যস্ত মেঘমালার প্রতিবিম্বে, পূর্ণিমার বিগলিত জ্যোৎস্নাধারায় বিভাসিত হইয়া শৈললক্ষ্মীর বিমল দর্পণের ন্যায় সমস্ত দিনরাত্রি হাস্য করিতেছে। ঘনবৃক্ষবেষ্টিত অন্ধকার গ্রামটি শৈলমালার বিজন ক্রোড়ে আঁধারের অবগুণ্ঠন পরিয়া পৃথিবীর কোলাহল হইতে একাকী লুকাইয়া আছে। দূরে দূরে হরিৎ শস্যময় ক্ষেত্রে গাভী চরিতেছে, গ্রাম্য বালিকারা সরসী হইতে জল তুলিতেছে, গ্রামের আঁধার কুঞ্জে বসিয়া অরণ্যের ম্রিয়মাণ কবি বউকথাকও মর্মের বিষণ্ন গান গাহিতেছে। সমস্ত গ্রামটি যেন একটি কবির স্বপ্ন।
এই গ্রামে দুইটি বালক-বালিকার বড়োই প্রণয় ছিল। দুইটিতে হাত ধরাধরি করিয়া গ্রাম্যশ্রীর ক্রোড়ে খেলিয়া বেড়াইত; বকুলের কুঞ্জে কুঞ্জে দুইটি অঞ্চল ভরিয়া ফুল তুলিত; শুকতারা আকাশে ডুবিতে না ডুবিতে, উষার জলদমালা লোহিত না হইতে হইতেই সরসীর বক্ষে তরঙ্গ তুলিয়া ছিন্ন কমলদুটির ন্যায় পাশাপাশি সাঁতার দিয়া বেড়াইত। নীরব মধ্যাহ্নে স্নিগ্ধতরুচ্ছায় শৈলের সর্বোচ্চ শিখরে বসিয়া ষোড়শবর্ষীয় অমরসিংহ ধীর মৃদুলস্বরে রামায়ণ পাঠ করিত, দুর্দান্ত রাবণ-কর্তৃক সীতাহরণ পাঠ করিয়া ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিত। দশমবর্ষীয়া কমলদেবী তাহার মুখের পানে স্থির হরিণনেত্র তুলিয়া নীরবে শুনিত, অশোকবনে সীতার বিলাপকাহিনী শুনিয়া পক্ষ্ণরেখা অশ্রুসলিলে সিক্ত করিত। ক্রমে গগনের বিশাল প্রাঙ্গণে তারকার দীপ জ্বলিলে, সন্ধ্যার অন্ধকার-অঞ্চলে জোনাকি ফুটিয়া উঠিলে, দুইটিতে হাত ধরাধরি করিয়া কুটিরে ফিরিয়া আসিত। কমলদেবী বড়ো অভিমানিনী ছিল; কেহ তাহাকে কিছু বলিলে সে অমরসিংহের বক্ষে মুখ লুকাইয়া কাঁদিত। অমর তাহাকে সান্ত্বনা দিলে, তাহারঅশ্রুজল মুছাইয়া দিলে, আদর করিয়া তাহার অশ্রুসিক্ত কপোল চুম্বন করিলে, বালিকার সকল যন্ত্রণা নিভিয়া যাইত। পৃথিবীর মধ্যে তাহার আর কেহই ছিল না; কেবল একটি বিধবা মাতা ছিল আর স্নেহময় অমরসিংহ ছিল, তাহারাই বালিকাটির অভিমান সান্ত্বনা ও ক্রীড়ার স্থল।
আরো দেখুন
44
Verses
WHEN IN YOUR death you died to all that was outside me, vanishing from the thousand things of the world, to be fully reborn in my sorrow, I felt that my life had grown perfect, the man and the woman becoming one in me for ever.
আরো দেখুন
ভাইফোঁটা
Stories
শ্রাবণ মাসটা আজ যেন এক রাত্রে একেবারে দেউলে হইয়া গেছে। সমস্ত আকাশে কোথাও একটা ছেঁড়া মেঘের টুকরোও নাই।
আশ্চর্য এই যে, আমার সকালটা আজ এমন করিয়া কাটিতেছে। আমার বাগানের মেহেদি-বেড়ার প্রান্তে শিরীষগাছের পাতাগুলো ঝল্‌মল্‌ করিয়া উঠিতেছে, আমি তাহা তাকাইয়া দেখিতেছি। সর্বনাশের যে মাঝ-দরিয়ায় আসিয়া পৌঁছিয়াছি এটা যখন দূরে ছিল তখন ইহার কথা কল্পনা করিয়া কত শীতের রাত্রে সর্বাঙ্গে ঘাম দিয়াছে,কত গ্রীষ্মের দিনে হাত-পায়ের তেলো ঠাণ্ডা হিম হইয়া গেছে। কিন্তু আজ সমস্ত ভয়ভাবনা হইতে এমনি ছুটি পাইয়াছি যে, ঐ যে আতাগাছের ডালে একটা গিরগিটি স্থির হইয়া শিকার লক্ষ্য করিতেছে,সেটার দিকেও আমার চোখ রহিয়াছে।
আরো দেখুন
অভিমানিনী
Verses
ও আমার    অভিমানী মেয়ে
          ওরে কেউ কিছু বোলো না।
ও       আমার কাছে এসেছে,
ও       আমায় ভালো বেসেছে,
         ওরে কেউ কিছু বোলো না।
এলোথেলো চুলগুলি ছড়িয়ে
    ওই দেখো সে দাঁড়িয়ে রয়েছে,
নিমেষহারা আঁখির পাতা দুটি
    চোখের জলে ভরে এয়েছে।
গ্রীবাখানি ঈষৎ বাঁকানো,
    দুটি হাতে মুঠি আছে চাপি,
ছোটো ছোটো রাঙা রাঙা ঠোঁট
    ফুলে ফুলে উঠিতেছে কাঁপি।
সাধিলে ও কথা কবে না,
    ডাকিলে ও আসিবে না কাছে,
ও সবার 'পরে অভিমান করে
    আপ্‌না নিয়ে দাঁড়িয়ে শুধু আছে।
কী হয়েছে কী হয়েছে বলে
    বাতাস এসে চুলিগুলি দোলায়;
রাঙা ওই কপোলখানিতে
    রবির হাসি হেসে চুমো খায়।
কচি হাতে ফুল দুখানি ছিল
    রাগ করে ঐ ফেলে দিয়েছে-
পায়ের কাছে পড়ে পড়ে তারা
    মুখের পানে চেয়ে রয়েছে।
আয় বাছা, তুই কোলে ব'সে বল্‌
    কী কথা তোর বলিবার আছে,
অভিমানে রাঙা মুখখানি
    আন দেখি তুই এ বুকের কাছে।
ধীরে ধীরে আধো আধো বল্‌
    কেঁদে কেঁদে ভাঙা ভাঙা কথা,
আমায় যদি না বলিবি তুই
    কে শুনিবে শিশু-প্রাণের ব্যথা।
আরো দেখুন
মহুয়া
Verses
বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব দেখি।
          নাহি ঘুচিবে কি
অশোকের অতিখ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান।
          ক্লান্ত কি হবে না কবিগান
          মালতীর মল্লিকার
          অভ্যর্থনা রচি বারম্বার?
রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘু ধ্বনি তার,
          উচ্চশিরে তবু রাজকুলবনিতার
          গৌরব রাখিস ঊর্ধ্বে ধরে।
              আমি তো দেখেছি তোরে
          বনস্পতিগোষ্ঠী-মাঝে অরণ্যসভায়
              অকুণ্ঠিত মর্যাদায়
                   আছিস দাঁড়ায়ে;
              শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে
শাল তাল সপ্তপর্ণ অশ্বত্থের সাথে
          প্রথম প্রভাতে
সূর্য-অভিনন্দনের তুলেছিস গম্ভীর বন্দন।
অপ্রসন্ন আকাশের ভ্রূভঙ্গে যখন
     অরণ্য উদ্‌বিগ্ন করি তোলে,
সেই কালবৈশাখীর ক্রুদ্ধ কলরোলে
          শাখাব্যূহে ঘিরে
আশ্বাস করিস দান শঙ্কিত বিহঙ্গ অতিথিরে।
     অনাবৃষ্টিক্লিষ্ট দিনে,
          বিশীর্ণ বিপিনে,
     বন্যবুভুক্ষুর দল ফেরে রিক্ত পথে,
দুর্ভিক্ষের ভিক্ষাঞ্জলি ভরে তারা তোর সদাব্রতে।
বহুদীর্ঘ সাধনায় সুদৃঢ় উন্নত
          তপস্বীর মতো
     বিলাসের চাঞ্চল্যবিহীন,
সুগম্ভীর সেই তোরে দেখিয়াছি অন্যদিন
          অন্তরে অধীরা
ফাল্গুনের ফুলদোলে কোথা হতে জোগাস মদিরা
          পুষ্পপুটে;
বনে বনে মৌমাছিরা চঞ্চলিয়া উঠে।
     তোর সুরাপাত্র হতে বন্যনারী
সম্বল সংগ্রহ করে পূর্ণিমার নৃত্যমত্ততারই।
          রে অটল, রে কঠিন,
     কেমনে গোপনে রাত্রিদিন
তরল যৌবনবহ্নি মজ্জায় রাখিয়াছিলি ভরে।
          কানে কানে কহি তোরে--
বধূরে যেদিন পাব, ডাকিব "মহুয়া' নাম ধরে।
আরো দেখুন
যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ
Stories
এক সময় যজ্ঞেশ্বরের অবস্থা ভালোই ছিল। এখন প্রাচীন ভাঙা কোঠাবাড়িটাকে সাপব্যাঙ-বাদুড়ের হস্তে সমর্পণ করিয়া খোড়ো ঘরে ভগবদগীতা লইয়া কালযাপন করিতেছেন।
এগারো বৎসর পূর্বে তাঁহার মেয়েটি যখন জন্মিয়াছিল তখন বংশের সৌভাগ্যশশী কৃষ্ণপক্ষের শেষকলায় আসিয়া ঠেকিয়াছে। সেইজন্য সাধ করিয়া মেয়ের নাম রাখিয়াছিলেন কমলা। ভাবিয়াছিলেন, যদি এই কৌশলে ফাঁকি দিয়া চঞ্চলা লক্ষ্মীকে কন্যারূপে ঘরে ধরিয়া রাখিতে পারেন। লক্ষ্মী সে ফন্দিতে ধরা দিলেন না, কিন্তু মেয়েটির মুখে নিজের শ্রী রাখিয়া গেলেন। বড়ো সুন্দরী মেয়ে।
আরো দেখুন
জগতে আনন্দযজ্ঞে
Songs
      জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।
        ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন॥
নয়ন আমার রূপের পুরে    সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,
      শ্রবণ আমার গভীর সুরে হয়েছে মগন॥
    তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার, বাজাই আমি বাঁশি--
    গানে গানে গেঁথে বেড়াই প্রাণের কান্নাহাসি।
এখন সময় হয়েছে কি?      সভায় গিয়ে তোমায় দেখি
    জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব এ মোর নিবেদন॥
আরো দেখুন