ঘরে বাইরে
Novels
মা গো, আজ মনে পড়ছে তোমার সেই সিঁথের সিঁদুর, চওড়া সেই লাল-পেড়ে শাড়ি, সেই তোমার দুটি চোখ-- শান্ত, স্নিগ্ধ, গভীর। সে যে দেখেছি আমার চিত্তাকাশে ভোরবেলাকার অরুণরাগরেখার মতো। আমার জীবনের দিন যে সেই সোনার পাথেয় নিয়ে যাত্রা করে বেরিয়েছিল। তার পরে? পথে কালো মেঘ কি ডাকাতের মতো ছুটে এল? সেই আমার আলোর সম্বল কি এক কণাও রাখল না? কিন্তু জীবনের ব্রাহ্মমুহূর্তে সেই-যে উষাসতীর দান, দুর্যোগে সে ঢাকা পড়ে, তবু সে কি নষ্ট হবার?
আমাদের দেশে তাকেই বলে সুন্দর যার বর্ণ গৌর। কিন্তু যে আকাশ আলো দেয় সে যে নীল। আমার মায়ের বর্ণ ছিল শামলা, তাঁর দীপ্তি ছিল পুণ্যের। তাঁর রূপ রূপের গর্বকে লজ্জা দিত।
এসো পাপ, এসো সুন্দরী!
তব চুম্বন-অগ্নি-মদিরা রক্তে ফিরুক সঞ্চরি।
অকল্যাণের বাজুক শঙ্খ,
ললাটে, লেপিয়া দাও কলঙ্ক,
নির্লাজ কালো কলুষপঙ্ক
    বুকে দাও প্রলয়ংকরী!
      রাই আমার    চলে যেতে ঢলে পড়ে।
               অগাধ জলের মকর যেমন,
                         ও তার    চিটে চিনি জ্ঞান নেই!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মোর!
বিদ্যাপতি কহে কৈসে গোয়াঁয়বি
হরি বিনে দিনরাতিয়া?
আমার নিকড়িয়া রসের রসিক কানন ঘুরে ঘুরে
      নিকড়িয়া বাঁশের বাঁশি বাজায় মোহন সুরে।
আমার ঘর বলে, তুই কোথায় যাবি,
বাইরে গিয়ে সব খোয়াবি--
আমার প্রাণ বলে, তোর যা আছে সব
যাক-না উড়ে পুড়ে।
ওগো,যায় যদি তো যাক-না চুকে,
সব হারাব হাসিমুখে,
আমি এই চলেছি মরণসুধা
নিতে পরান পূরে।
ওগো, আপন যারা কাছে টানে
এ রস তারা কেই বা জানে,
আমার বাঁকা পথের বাঁকা সে যে
ডাক দিয়েছে দূরে।
এবার বাঁকার টানে সোজার বোঝা
পড়ুক ভেঙে-চুরে।
যখন দেখা দাও নি, রাধা, তখন বেজেছিল বাঁশি।
এখন চোখে চোখে চেয়ে সুর যে আমার গেল ভাসি।
তখন নানা তানের ছলে
ডাক ফিরেছে জলে স্থলে,
এখন আমার সকল কাঁদা রাধার রূপে উঠল হাসি।
বঁধুর লাগি কেশে আমি পরব এমন ফুল
স্বর্গে মর্তে তিন ভুবনে নাইকো যাহার মূল।
বাঁশির ধ্বনি হাওয়ায় ভাসে,
সবার কানে বাজবে না সে--
দেখ্‌ লো চেয়ে যমুনা ওই ছাপিয়ে গেল কূল।
She should never have looked at me,
If she meant I should not love her!
There are plenty... men you call such,
I suppose... she may discover
All her soul to, if she pleases,
And yet leave much as she found them:
But I'm not so, and she knew it
When she fixed me, glancing round them.
আমায় ভালো বাসবে না সে এই যদি তার ছিল জানা,
তবে কি তার উচিত ছিল আমার-পানে দৃষ্টি হানা?
তেমন-তেমন অনেক মানুষ আছে তো এই ধরাধামে
(যদিচ ভাই, আমি তাদের গণি নেকো মানুষ নামে)--
যাদের কাছে সে যদি তার খুলে দিত প্রাণের ঢাকা,
তবু তারা রইত খাড়া যেমন ছিল তেমনি ফাঁকা।
আমি তো নই তাদের মতন সে কথা সে জানত মনে
যখন মোরে বাঁধল ধ'রে বিদ্ধ ক'রে নয়নকোণে।
মধুঋতু নিত্য হয়ে রইল তোমার মধুর দেশে।
যাওয়া-আসার কান্নাহাসি হাওয়ায় সেথা বেড়ায় ভেসে।
যার যে জনা সেই শুধু যায়, ফুল ফোটা তো ফুরোয় না হায়--
ঝরবে যে ফুল সেই কেবলি ঝরে পড়ে বেলাশেষে।
যখন আমি ছিলেম কাছে তখন কত দিয়েছি গান;
এখন আমার দূরে যাওয়া, এরও কি গো নাই কোনো দান?
পুষ্পবনের ছায়ায় ঢেকে এই আশা তাই গেলেম রেখে--
আগুন-ভরা ফাগুনকে তোর কাঁদায় যেন আষাঢ় এসে॥
আরো দেখুন
জয়পরাজয়
Stories
রাজকন্যার নাম অপরাজিতা। উদয়নারায়ণের সভাকবি শেখর তাঁহাকে কখনো চক্ষেও দেখেন নাই। কিন্তু যেদিন কোনো নূতন কাব্য রচনা করিয়া সভাতলে বসিয়া রাজাকে শুনাইতেন, সেদিন কণ্ঠস্বর ঠিক এতটা উচ্চ করিয়া পড়িতেন যাহাতে তাহা সেই সমুচ্চ গৃহের উপরিতলের বাতায়নবর্তিনী অদৃশ্য শ্রোত্রীগণের কর্ণপথে প্রবেশ করিতে পারে। যেন তিনি কোনো-এক অগম্য নক্ষত্রলোকের উদ্দেশে আপনার সংগীতোচ্ছ্বাস প্রেরণ করিতেন যেখানে জ্যোতিষ্ক-মণ্ডলীর মধ্যে তাঁহার জীবনের একটি অপরিচিত শুভগ্রহ অদৃশ্য মহিমায় বিরাজ করিতেছেন।
কখনো ছায়ার মতন দেখিতে পাইতেন, কখনো নূপুরশিঞ্জনের মতন শুনা যাইত; বসিয়া বসিয়া মনে মনে ভাবিতেন, সে কেমন দুইখানি চরণ যাহাতে সেই সোনার নূপুর বাঁধা থাকিয়া তালে তালে গান গাহিতেছে। সেই দুইখানি রক্তিম শুভ্র কোমল চরণতল প্রতি পদক্ষেপে কী সৌভাগ্য কী অনুগ্রহ কী করুণার মতো করিয়া পৃথিবীকে স্পর্শ করে। মনের মধ্যে সেই চরণদুটি প্রতিষ্ঠা করিয়া কবি অবসরকালে সেইখানে আসিয়া লুটাইয়া পড়িত এবং সেই নূপুরশিঞ্জনের সুরে আপনার গান বাঁধিত।
আরো দেখুন
বোষ্টমী
Stories
আমি লিখিয়া থাকি অথচ লোকরঞ্জন আমার কলমের ধর্ম নয়, এইজন্য লোকেও আমাকে সদাসর্বদা যে রঙে রঞ্জিত করিয়া থাকে তাহাতে কালির ভাগই বেশি। আমার সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনিতে হয়; কপালক্রমে সেগুলি হিতকথা নয়, মনোয়ারী তো নহেই।
শরীরে যেখানটায় ঘা পড়িতে থাকে সে জায়গাটা যত তুচ্ছই হোক সমস্ত দেহটাকে বেদনার জোরে সেই ছাড়াইয়া যায়। সে লোক গালি খাইয়া মানুষ হয়, সে আপনার স্বভাবকে যেন ঠেলিয়া একঝোঁকা হইয়া পড়ে। আপনার চারি দিককে ছাড়াইয়া আপনাকেই কেবল তাহার মনে পড়ে-- সেটা আরামও নয়, কল্যাণও নয়। আপনাকে ভোলাটাই তো স্বস্তি।
আরো দেখুন
দেনাপাওনা
Stories
পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জন্মিল তখন বাপমায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিল নিরুপমা। এ গোষ্ঠীতে এমন শৌখিন নাম ইতিপূর্বে কখনো শোনা যায় নাই। প্রায় ঠাকুরদেবতার নামই প্রচলিত ছিল-- গণেশ, কার্তিক, পার্বতী, তাহার উদাহরণ।
এখন নিরুপমার বিবাহের প্রস্তাব চলিতেছে। তাহার পিতা রামসুন্দর মিত্র অনেক খোঁজ করেন কিন্তু পাত্র কিছুতেই মনের মতন হয় না। অবশেষে মস্ত এক রায়বাহাদুরের ঘরের একমাত্র ছেলেকে সন্ধান করিয়া বাহির করিয়াছেন। উক্ত রায়বাহাদুরের পৈতৃক বিষয়-আশয় যদিও অনেক হ্রাস হইয়া আসিয়াছে কিন্তু বনেদি ঘর বটে।
আরো দেখুন
পাত্র ও পাত্রী
Stories
ইতিপূর্বে প্রজাপতি কখনো আমার কপালে বসেন নি বটে, কিন্তু একবার আমার মানসপদ্মে বসেছিলেন। তখন আমার বয়স ষোলো। তার পরে কাঁচা ঘুমে চমক লাগিয়ে দিলে যেমন ঘুম আর আসতে চায় না, আমার সেই দশা হল। আমার বন্ধুবান্ধবরা কেউ কেউ দারপরিগ্রহ ব্যাপারে দ্বিতীয়, এমন-কি তৃতীয় পক্ষে প্রোমোশন পেলেন; আমি কৌমার্যের লাস্ট বেঞ্চিতে বসে শূন্য সংসারের কড়িকাঠ গণনা করে কাটিয়ে দিলুম।
আমি চোদ্দ বছর বয়সে এনট্রেন্স পাস করেছিলুম। তখন বিবাহ কিম্বা এনট্রেন্স পরীক্ষায় বয়সবিচার ছিল না। আমি কোনোদিন পড়ার বই গিলি নি, সেইজন্যে শারীরিক বা মানসিক অজীর্ণ রোগে আমাকে ভুগতে হয় নি। ইঁদুর যেমন দাঁত বসাবার জিনিস পেলেই সেটাকে কেটে-কুটে ফেলে, তা সেটা খাদ্যই হোক আর অখাদ্যই হোক, শিশুকাল থেকেই তেমনি ছাপার বই দেখলেই সেটা পড়ে ফেলা আমার স্বভাব ছিল। সংসারে পড়ার বইয়ের চেয়ে না-পড়ার বইয়ের সংখ্যা ঢের বেশি, এইজন্য আমার পুঁথির সৌরজগতে স্কুল-পাঠ্য পৃথিবীর চেয়ে বেস্কুল-পাঠ্য সূর্য চোদ্দ লক্ষগুণে বড়ো ছিল। তবু, আমার সংস্কৃত-পণ্ডিতমশায়ের নিদারুণ ভবিষ্যদ্‌বাণী সত্ত্বেও, আমি পরীক্ষায় পাস করেছিলুম।
আরো দেখুন
কর্তার ভূত
Stories
বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠল, 'তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে।'
শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাবলে, 'আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে।'
আরো দেখুন
একটি দিন
Stories
মনে পড়ছে সেই দুপুরবেলাটি। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টিধারা ক্লান্ত হয়ে আসে, আবার দমকা হাওয়া তাকে মাতিয়ে তোলে।
ঘরে অন্ধকার, কাজে মন যায় না। যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বর্ষার গানে মল্লারের সুর লাগালেম।
আরো দেখুন
98
Verses
MY LOVE OF to-day finds no home
in the nest deserted by yesterday's love.
আরো দেখুন
ছিন্ন পত্র
Verses
          কর্ম যখন দেবতা হয়ে জুড়ে বসে পূজার বেদী,
               মন্দিরে তার পাষাণ-প্রাচীর অভ্রভেদী
                   চতুর্দিকেই থাকে ঘিরে;
          তারি মধ্যে জীবন যখন শুকিয়ে আসে ধীরে ধীরে
পায় না আলো, পায় না বাতাস, পায় না ফাঁকা, পায় না কোনো রস,
                   কেবল টাকা, কেবল সে পায় যশ,
                   তখন সে কোন্‌ মোহের পাকে
          মরণদশা ঘটেছে তার, সেই কথাটাই ভুলে থাকে।
          আমি ছিলেম জড়িয়ে পড়ে সেই বিপাকের ফাঁসে;
                             বৃহৎ সর্বনাশে
                   হারিয়েছিলেম বিশ্বজগৎখানি।
                   নীল আকাশের সোনার বাণী
           সকাল-সাঁঝের বীণার তারে
           পৌঁছত না মোর বাতায়ন-দ্বারে।
ঋতুর পরে আসত ঋতু শুধু কেবল পঞ্জিকারই পাতে,
                   আমার আঙিনাতে
     আনত না তার রঙিন পাতার ফুলের নিমন্ত্রণ।
     অন্তরে মোর লুকিয়ে ছিল কী যে সে ক্রন্দন
          জানব এমন পাই নি অবকাশ।
               প্রাণের উপবাস
          সংগোপনে বহন করে কর্মরথে
     সমারোহে চলতেছিলেম নিষ্ফলতার মরুপথে।
     তিনটে চারটে সভা ছিল জুড়ে আমার কাঁধ;
দৈনিকে আর সাপ্তাহিকে ছাড়তে হত নকল সিংহনাদ;
     বীডন কুঞ্জে মীটিং হলে আমি হতেম বক্তা;
          রিপোর্ট লিখতে হত তক্তা তক্তা;
               যুদ্ধ হত সেনেট-সিন্ডিকেটে,
তার উপরে আপিস আছে, এমনি করে কেবল খেটে খেটে
               দিনরাত্রি যেত কোথায় দিয়ে।
               বন্ধুরা সব বলত, "করছ কী এ।
                   মারা যাবে শেষে!"
                   আমি বলতেম হেসে,
               "কী করি ভাই, খাটতে কি হয় সাধে।
               একটু যদি ঢিল দিয়েছি অমনি গলদ বাধে,
                   কাজ বেড়ে যায় আরো--
               কী করি তার উপায় বলতে পার?"
বিশ্বকর্মার সদর আপিস ছিল যেন আমার 'পরেই ন্যস্ত,
          অহোরাত্রি এমনি আমার ভাবটা ব্যতিব্যস্ত।
               সেদিন তখন দু-তিন রাত্রি ধরে
          গত সনের রিপোর্টখানা লিখেছি খুব জোরে।
               বাছাই হবে নতুন সনের সেক্রেটারি
          হপ্তা তিনেক মরতে হবে ভোট কুড়োতে তারি।
               শীতের দিনে যেমন পত্রভার
          খসিয়ে ফেলে গাছগুলো সব কেবল শাখা-সার,
               আমার হল তেমনি দশা;
          সকাল হতে সন্ধ্যা-নাগাদ এক টেবিলেই বসা;
               কেবল পত্র রওনা করা,
               কেবল শুকিয়ে মরা।
          খবর আসে "খাবার তৈরি", নিই নে কথা কানে,
                     আবার যদি খবর আনে,
                        বলি ক্রোধের ভরে
          "মরি এমন নেই অবসর, খাওয়া তো থাক পরে।"
               বেলা যখন আড়াইটে প্রায়, নিঝুম হল পাড়া,
          আর-সকলে স্তব্ধ কেবল গোটাপাঁচেক চড়ুই পাখি ছাড়া;
                   এমন সময় বেহারাটা ডাকের পত্র নিয়ে
                        হাতে গেল  দিয়ে।
               জরুরি কোন্‌ কাজের চিঠি ভেবে
          খুলে দিখি বাঁকা লাইন, কাঁচা আখর চলছে উঠে নেবে,
                   নাইকো দাঁড়ি-কমা,
   শেষ লাইনে নাম লেখা তার মনোরমা।
          আর হল না পড়া,
মনে হল কোন্‌ বিধবার ভিক্ষাপত্র মিথ্যা কথায় গড়া,
     চিঠিখানা ছিঁড়ে ফেলে আবার লাগি কাজে।
          এমনি করে কোন্‌ অতলের মাঝে
             হপ্তা তিনেক গেল ডুবে।
             সূর্য ওঠে পশ্চিমে কি পুবে,
     সেই কথাটাই ভুলে গেছি, চলছি এমন চোটে।
এমন সময় ভোটে
                    আমার হল হার,
                শত্রুদলে আসন আমার করলে অধিকার;
                             তাহার পরে খালি
                   কাগজপত্রে চলল গালাগালি।
               কাজের মাঝে অনেকটা ফাঁক হঠাৎ পড়ল হাতে,
          সেটা নিয়ে কী করব তাই ভাবছি বসে আরামকেদারাতে;
                   এমন সময় হঠাৎ দখিন-পবনভরে
          ছেঁড়া চিঠির টুকরো এসে পড়ল আমার কোলের 'পরে।
               অন্যমনে হাতে তুলে
এই কথাটা পড়ল চোখে, "মনুরে কি গেছ এখন ভুলে।"
মনু? আমার মনোরমা? ছেলেবেলার সেই মনু কি এই।
          অমনি হঠাৎ এক নিমেষেই
              সকল শূন্য ভ'রে,
হারিয়ে-যাওয়া বসন্ত মোর বন্যা হয়ে ডুবিয়ে দিল মোরে।
     সেই তো আমার অনেক কালের পড়োশিনী,
          পায়ে পায়ে বাজাত মল রিনিঝিনি।
     সেই তো আমার এই জনমের ভোর-গগনের তারা
          অসীম হতে এসেছে পথহারা;
     সেই তো আমার শিশু কালের শিউলিফুলের কোলে
                   শুভ্রশিশির দোলে;
          সেই তো আমার মুগ্ধ চোখের প্রথম আলো,
          এই ভুবনের সকল ভালোর প্রথম ভালো।
     মনে পড়ে, ঘুমের থেকে যেমনি জেগে ওঠা
          অমনি ওদের বাড়ির পানে ছোটা।
     ওরি সঙ্গে শুরু হত দিনের প্রথম খেলা;
          মনে পড়ে, পিঠের 'পরে চুলটি মেলা
     সেই আনন্দমূর্তিখানি স্নিগ্ধ ডাগর আঁখি,
          কণ্ঠ তাহার সুধায় মাখামাখি।
অসীম ধৈর্যে সইত সে মোর হাজার অত্যাচার,
          সকল কথায় মানত মনু হার।
     উঠে গাছের আগডালেতে দোলা খেতেম জোরে,
          ভয় দেখাতেম পড়ি-পড়ি ক'রে,
       কাঁদো-কাঁদো কণ্ঠে তাহার করুণ মিনতি সে,
               ভুলতে পারি কি সে।
          মনে পড়ে নীরব ব্যথা তার,
          বাবার কাছে যখন খেতেম মার;
          ফেলেছে সে কত চোখের  জল,
       মোর অপরাধ ঢাকা দিতে খুঁজত কত ছল।
               আরো কিছু বড়ো হলে
       আমার কাছে নিত সে তার বাংলা পড়া ব'লে।
          নামতাটা তার কেবল যেত বেধে,
তাই নিয়ে মোর একটু হাসি সইত না সে, উঠত লাজে কেঁদে।
          আমার হাতে মোটা মোটা ইংরেজি বই দেখে
          ভাবত মনে, গেছে যেন কোন্‌ আকাশে ঠেকে
               রাশীকৃত মোর বিদ্যার বোঝা।
যা-কিছু সব বিষম কঠিন, আমার কাছে যেন নেহাত সোজা।
                   হেনকালে হঠাৎ সেবার,
               দশমীতে দ্বারিগ্রামে ঠাকুর ভাসান দেবার
               রাস্তা নিয়ে দুই পক্ষের চাকর-দরোয়ানে
             বকাবকি লাঠালাঠি বেধে গেল গলির মধ্যখানে।
     তাই নিয়ে শেষ বাবার সঙ্গে মনুর বাবার বাধল মকদ্দমা,
          কেউ কাহারে করলে না আর ক্ষমা।
               দুয়ার মোদের বন্ধ হল,
          আকাশ যেন কালো মেঘে অন্ধ হল,
       হঠাৎ এল কোন্‌ দশমী সঙ্গে নিয়ে ঝঞ্ঝার গর্জন,
               মোর প্রতিমার  হল বিসর্জন।
          দেখাশোনা ঘুচল যখন এলেম যখন দূরে,
     তখন প্রথম শুনতে পেলেম কোন্‌ প্রভাতী সুরে
           প্রাণের বীণা বেজেছিল কাহার হাতে।
                      নিবিড় বেদনাতে
মুখখানি তার উঠল ফুটে আঁধার পটে সন্ধ্যাতারার মতো;
          একই সঙ্গে জানিয়ে দিলে সে যে আমার কত,
                 সে যে আমার কতখানিই নয়!
প্রেমের শিখা জ্বলল তখন, নিবল যখন চোখের পরিচয়।
                   কত বছর গেল চলে
       আবার গ্রামে গিয়েছিলেম পরীক্ষা পাস হলে।
গিয়ে দেখি, ওদের বাড়ি কিনেছে কোন্‌ পাটের কুঠিয়াল,
                   হল অনেক কাল।
                   বিয়ে করে মনুর স্বামী
কোন্‌ দেশে যে নিয়ে গেছে, ঠিকানা তার খুঁজে না পাই আমি।
          সেই মনু আজ এতকালের অজ্ঞাতবাস টুটে
             কোন্‌ কথাটি পাঠাল তার পত্রপুটে।
             কোন্‌ বেদনা দিল তারে নিষ্ঠুর সংসার--
      মৃত্যু সে কি। ক্ষতি সে কি। সে কি অত্যাচার।
           কেবল কি তার বাল্যসখার কাছে
           হৃদয়ব্যথার সান্ত্বনা তার আছে।
                   ছিন্ন চিঠির বাকি
     বিশ্বমাঝে কোথায় আছে খুঁজে পাব নাকি।
               "মনুরে কি গেছ ভুলে।"
     এ প্রশ্ন কি অনন্ত কাল রইবে দুলে
       মোর জগতের চোখের পাতায় একটি ফোঁটা চোখের জলের মতো।
             কত চিঠির জবাব লিখব কত,
এই কথাটির জবাব শুধু নিত্য বুকে জ্বলবে বহ্নিশিখা
          অক্ষরেতে হবে না আর লিখা।
আরো দেখুন