সৃষ্টিকর্তা
Verses
জানি আমি মোর কাব্য ভালোবেসেছেন মোর বিধি,
ফিরে যে পেলেন তিনি দ্বিগুণ আপন-দেওয়া নিধি।
তাঁর বসন্তের ফুল বাতাসে কেমন বলে বাণী
সে যে তিনি মোর গানে বারম্বার নিয়েছেন জানি।
আমি শুনায়েছি তাঁরে শ্রাবণরাত্রির বৃষ্টিধারা
কী অনাদি বিচ্ছেদের জাগায় বেদন সঙ্গীহারা।
যেদিন পূর্ণিমা-রাতে পুষ্পিত শালের বনে বনে
শরীরী ছায়ার মতো একা ফিরি আপনার মনে
গুঞ্জরিয়া অসমাপ্ত সুর, শালের মঞ্জরী যত
কী যেন শুনিতে চাহে ব্যগ্রতায় করি শির নত,
ছায়াতে তিনিও সাথে ফেরেন নিঃশব্দ পদচারে
বাঁশির উত্তর তাঁর আমার বাঁশিতে শুনিবারে।
যেদিন প্রিয়ার কালো চক্ষুর সজল করুণায়
রাত্রির প্রহর-মাঝে অন্ধকারে নিবিড় ঘনায়
নিঃশব্দ বেদনা, তার দুটি হাতে মোর হাত রাখি
স্তিমিত প্রদীপালোকে মুখে তার স্তব্ধ চেয়ে থাকি,
তখন আঁধারে বসি আকাশের তারকার মাঝে
অপেক্ষা করেন তিনি, শুনিতে কখন বীণা বাজে
যে সুরে আপনি তিনি উন্মাদিনী অভিসারিণীরে
ডাকিছেন সর্বহারা মিলনের প্রলয়তিমিরে।
আরো দেখুন
ঘাটের কথা
Stories
পাষাণে ঘটনা যদি অঙ্কিত হইত তবে কতদিনকার কত কথা আমার সোপানে সোপানে পাঠ করিতে পারিতে। পুরাতন কথা যদি শুনিতে চাও, তবে আমার এই ধাপে বইস; মনোযোগ দিয়া জলকল্লোলে কান পাতিয়া থাকো, বহুদিনকার কত বিস্মৃত কথা শুনিতে পাইবে।
আমার আর-একদিনের কথা মনে পড়িতেছে। সেও ঠিক এইরূপ দিন। আশ্বিন মাস পড়িতে আর দুই-চারি দিন বাকি আছে। ভোরের বেলায় অতি ঈষৎ মধুর নবীন শীতের বাতাস নিদ্রোত্থিতের দেহে নূতন প্রাণ আনিয়া দিতেছে। তরু-পল্লব অমনি একটু একটু শিহরিয়া উঠিতেছে।
আরো দেখুন
পাত্র ও পাত্রী
Stories
ইতিপূর্বে প্রজাপতি কখনো আমার কপালে বসেন নি বটে, কিন্তু একবার আমার মানসপদ্মে বসেছিলেন। তখন আমার বয়স ষোলো। তার পরে কাঁচা ঘুমে চমক লাগিয়ে দিলে যেমন ঘুম আর আসতে চায় না, আমার সেই দশা হল। আমার বন্ধুবান্ধবরা কেউ কেউ দারপরিগ্রহ ব্যাপারে দ্বিতীয়, এমন-কি তৃতীয় পক্ষে প্রোমোশন পেলেন; আমি কৌমার্যের লাস্ট বেঞ্চিতে বসে শূন্য সংসারের কড়িকাঠ গণনা করে কাটিয়ে দিলুম।
আমি চোদ্দ বছর বয়সে এনট্রেন্স পাস করেছিলুম। তখন বিবাহ কিম্বা এনট্রেন্স পরীক্ষায় বয়সবিচার ছিল না। আমি কোনোদিন পড়ার বই গিলি নি, সেইজন্যে শারীরিক বা মানসিক অজীর্ণ রোগে আমাকে ভুগতে হয় নি। ইঁদুর যেমন দাঁত বসাবার জিনিস পেলেই সেটাকে কেটে-কুটে ফেলে, তা সেটা খাদ্যই হোক আর অখাদ্যই হোক, শিশুকাল থেকেই তেমনি ছাপার বই দেখলেই সেটা পড়ে ফেলা আমার স্বভাব ছিল। সংসারে পড়ার বইয়ের চেয়ে না-পড়ার বইয়ের সংখ্যা ঢের বেশি, এইজন্য আমার পুঁথির সৌরজগতে স্কুল-পাঠ্য পৃথিবীর চেয়ে বেস্কুল-পাঠ্য সূর্য চোদ্দ লক্ষগুণে বড়ো ছিল। তবু, আমার সংস্কৃত-পণ্ডিতমশায়ের নিদারুণ ভবিষ্যদ্‌বাণী সত্ত্বেও, আমি পরীক্ষায় পাস করেছিলুম।
আরো দেখুন
শিশির
Verses
                   শিশির কাঁদিয়া শুধু বলে,
"কেন মোর হেন ক্ষুদ্র প্রাণ--
                   শিশুটির কল্পনার মতো
                   জনমি অমনি অবসান?
                   ঘুম-ভাঙা উষা-মেয়েটির
                   একটি সুখের অশ্রু হায়,
                   হাসি তার ফুরাতে ফুরাতে
                   এ অশ্রুটি শুকাইয়া যায়।
                   টুকটুকে মুখখানি নিয়ে
                   গোলাপ হাসিছে মুচকিয়ে,  
                   বকুল প্রাণের সুধা দিয়ে,
                   বায়ুর মাতাল করি তুলে--
                   প্রজাপতি ভাবিয়া না পায়
                   কাহারে তাহার প্রাণ চায়,
                   তুলিয়া অলস পাখা দুটি
                   ভ্রমিতেছে ফুল হতে ফুলে--
                   সেই হাসি-রাশির মাঝারে
                   আমি কেন থাকিতে না পাই!
                   যেমনি নয়ন মেলি, হায়,
                   সুখের নিমেষটির প্রায়,
                   অতৃপ্ত হাসিটি মুখে লয়ে
                   অমনি কেন গো মরে যাই।"
                   শুয়ে শুয়ে অশোক-পাতায়
                   মুমূর্ষু শিশির বলে,"হায়,
                   কোনো সুখ ফুরায় নি যার
                   তার কেন জীবন ফুরায়?"
                   "আমি কেন হই নি শিশির?"
                   কহে কবি নিশ্বাস ফেলিয়া।  
                   "প্রভাতেই যেতেম শুকায়ে
                   প্রভাতেই নয়ন মেলিয়া।
                   হে বিধাতা, শিশিরের মতো
                   গড়েছ আমার এই প্রাণ,
                   শিশিরের মরণটি কেন
                   আমারে কর নি তবে দান?"
আরো দেখুন
মায়া
Verses
        বৃথা এ বিড়ম্বনা!
কিসের লাগিয়া          এতই তিয়াষ,
        কেন এত যন্ত্রণা!
ছায়ার মতন             ভেসে চলে যায়
        দরশন পরশন--
এই যদি পাই            এই ভুলে যাই,
        তৃপ্তি না মানে মন।
কত বার আসে,        কত বার ভাসে,
        মিশে যায় কত বার--
পেলেও যেমন           না পেলে তেমন
        শুধু থাকে হাহাকার।
সন্ধ্যাপবনে                      কুঞ্জভবনে
        নির্জন নদীতীরে
ছায়ার মতন                    হৃদয়বেদন
        ছায়ার লাগিয়া ফিরে।
কত দেখাশোনা         কত আনাগোনা
        চারি দিকে অবিরত,
শুধু তারি মাঝে        একটি কে আছে
        তারি তরে ব্যথা কত!
চিরদিন ধ'রে               এমনি চলিছে,
        যুগ-যুগ গেছে চ'লে!
মানবের মেলা               করে গেছে খেলা
        এই ধরণীর কোলে!
এই ছায়া লাগি          কত নিশি জাগি
        কাঁদায়েছে কাঁদিয়াছে--
মহাসুখ মানি            প্রিয়তনুখানি
        বাহুপাশে বাঁধিয়াছে!
নিশিদিন কত               ভেবেছে সতত
        নিয়ে কার হাসিকথা!
কোথা তারা আজ,         সুখ দুখ লাজ,
        কোথা তাহাদের ব্যথা?
কোথা সেদিনের             অতুলরূপসী
        হৃদরপ্রেয়সীচয়?
নিখিলের প্রাণে         ছিল যে জাগিয়া,
        আজ সে স্বপনও নয়!
ছিল সে নয়নে               অধরের কোণে
        জীবন মরণ কত--
বিকচ সরস                      তনুর পরশ
        কোমল প্রেমের মতো।
এত সুখ দুখ                    তীব্র কামনা
        জাগরণ হাহুতাশ
যে রূপজ্যোতিরে                 সদা ছিল ঘিরে
        কোথা তার ইতিহাস?
যমুনার ঢেউ                    সন্ধ্যারঙিন
        মেঘখানি ভালোবাসে
এও চলে যায়,          সেও চলে যায়,
        অদৃষ্ট বসে হাসে।
আরো দেখুন
2
Verses
              আমার এ ঘরে আপনার করে
                        গৃহদীপখানি জ্বালো।
সব দুখশোক সার্থক হোক
              লভিয়া তোমারি আলো।
কোণে কোণে যত লুকানো আঁধার
       মরুক ধন্য হয়ে,
তোমারি পুণ্য আলোকে বসিয়া
       প্রিয়জনে বাসি ভালো।
              আমার এ ঘরে আপনার করে
                        গৃহদীপখানি জ্বালো।
পরশমণির প্রদীপ তোমার
       অচপল তার জ্যোতি,
সোনা করে নিক পলকে আমার
       সব কলঙ্ক কালো।
                        আমার এ ঘরে আপনার করে
                                গৃহদীপখানি জ্বালো।
আমি যত দীপ জ্বালি শুধু তার
       জ্বালা আর শুধু কালি,
আমার ঘরে দুয়ারে শিয়রে
       তোমারি কিরণ ঢালো।
                        আমার এ ঘরে আপনার করে
                                গৃহদীপখানি জ্বালো।
আরো দেখুন
স্বর্গ-মর্ত
Stories
গান
মাটির প্রদীপখানি আছে
আরো দেখুন
সিদ্ধি
Stories
স্বর্গের অধিকারে মানুষ বাধা পাবে না, এই তার পণ। তাই, কঠিন সন্ধানে অমর হবার মন্ত্র সে শিখে নিয়েছে। এখন একলা বনের মধ্যে সেই মন্ত্র সে সাধনা করে।
বনের ধারে ছিল এক কাঠকুড়নি মেয়ে। সে মাঝে মাঝে আঁচলে ক'রে তার জন্যে ফল নিয়ে আসে, আর পাতার পাত্রে আনে ঝরনার জল।
আরো দেখুন
সে
Stories
সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য
করতলযুগলেষু
আরো দেখুন
যজ্ঞেশ্বরের যজ্ঞ
Stories
এক সময় যজ্ঞেশ্বরের অবস্থা ভালোই ছিল। এখন প্রাচীন ভাঙা কোঠাবাড়িটাকে সাপব্যাঙ-বাদুড়ের হস্তে সমর্পণ করিয়া খোড়ো ঘরে ভগবদগীতা লইয়া কালযাপন করিতেছেন।
এগারো বৎসর পূর্বে তাঁহার মেয়েটি যখন জন্মিয়াছিল তখন বংশের সৌভাগ্যশশী কৃষ্ণপক্ষের শেষকলায় আসিয়া ঠেকিয়াছে। সেইজন্য সাধ করিয়া মেয়ের নাম রাখিয়াছিলেন কমলা। ভাবিয়াছিলেন, যদি এই কৌশলে ফাঁকি দিয়া চঞ্চলা লক্ষ্মীকে কন্যারূপে ঘরে ধরিয়া রাখিতে পারেন। লক্ষ্মী সে ফন্দিতে ধরা দিলেন না, কিন্তু মেয়েটির মুখে নিজের শ্রী রাখিয়া গেলেন। বড়ো সুন্দরী মেয়ে।
আরো দেখুন
বদনাম
Stories
ক্রিং ক্রিং ক্রিং সাইকেলের আওয়াজ; সদর দরজার কাছে লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন ইন্‌স্‌পেক্টার বিজয়বাবু। গায়ে ছাঁটা কোর্তা, কোমরে কোমরবন্ধ, হাফ-প্যাণ্টপরা, চলনে কেজো লোকের দাপট। দরজার কড়া নাড়া দিতেই গিন্নি এসে খুলে দিলেন।
ইন্‌স্‌পেক্টার ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝংকার দিয়ে উঠলেন--'এমন করে তো আর পারি নে, রাত্তিরের পর রাত্তির খাবার আগলে রাখি! তুমি কত চোর ডাকাত ধরলে, সাধু সজ্জনও বাদ গেল না, আর ঐ একটা লোক অনিল মিত্তিরের পিছন পিছন তাড়া করে বেড়াচ্ছ, সে থেকে থেকে তোমার সামনে এসে নাকের উপর বুড়ো আঙুল নাড়া দিয়ে কোথায় দৌড় মারে তার ঠিকানা নেই। দেশসুদ্ধ লোক তোমার এই দশা দেখে হেসে খুন, এ যেন সার্কাসের খেলা হচ্ছে।'
আরো দেখুন