সম্পত্তি-সমর্পণ
Stories
বৃন্দাবন কুণ্ড মহা ক্রুদ্ধ হইয়া আসিয়া তাহার বাপকে কহিল, "আমি এখনই চলিলাম।"
বাপ যজ্ঞনাথ কুণ্ড কহিলেন, "বেটা অকৃতজ্ঞ, ছেলেবেলা হইতে তোকে খাওয়াইতে পরাইতে যে ব্যয় হইয়াছে তাহার পরিশোধ করিবার নাম নাই, আবার তেজ দেখোনা।"
আরো দেখুন
অমর্ত
Verses
আমার মনে একটুও নেই বৈকুন্ঠের আশা।--
                   ওইখানে মোর বাসা
                   যে মাটিতে শিউরে ওঠে ঘাস,
          যার 'পরে ওই মন্ত্র পড়ে দক্ষিনে বাতাস।
চিরদিনের আলোক-জ্বালা নীল আকাশের নীচে
          যাত্রা আমার নৃত্যপাগল নটরাজের পিছে।
ফুল ফোটাবার যে রাগিণী বকুল শাখায় সাধা,
          নিষ্কারণে ওড়ার আবেগ চিলের পাখায় বাঁধা,
                   সেই দিয়েছে রক্তে আমার ঢেউয়ের দোলাদুলি;
স্বপ্নলোকে সেই উড়েছে সুরের পাখনা তুলি।
                             দায়-ভোলা মোর মন
                   মন্দে-ভালোয় সাদায়-কালোয় অঙ্কিত প্রাঙ্গণ
                                      ছাড়িয়ে গেছে দূর দিগন্ত-পানে
                   আপন বাঁশির পথ-ভোলানো তানে।
দেখা দিল দেহের অতীত কোন্‌ দেহ এই মোর
                   ছিন্ন করি বস্তুবাঁধন-ডোর।
                   শুধু কেবল বিপুল অনুভূতি,
          গভীর হতে বিচ্ছুরিত আনন্দময় দ্যুতি,
                   শুধু কেবল গানেই ভাষা যার,
          পুষ্পিত ফাল্গুনের ছন্দে গন্ধে একাকার;
          নিমেষহারা চেয়ে-থাকার দূর অপারের মাঝে
                             ইঙ্গিত যার বাজে।
                   যে দেহেতে মিলিয়ে আছে অনেক ভোরের আলো,
          নাম-না-জানা অপূর্বেরে যার লেগেছে ভালো,
                   যে দেহেতে রূপ নিয়েছে অনির্বচনীয়
                             সকল প্রিয়ের মাঝখানে যে প্রিয়,
                   পেরিয়ে মরণ সে মোর সঙ্গে যাবে--
          কেবল রসে, কেবল সুরে, কেবল অনুভাবে।
আরো দেখুন
মুক্তির উপায়
Stories
ফকিরচাঁদ বাল্যকাল হইতেই গম্ভীর প্রকৃতি। বৃদ্ধসমাজে তাহাকে কখনোই বেমানান দেখাইত না। ঠাণ্ডা জল, হিম, এবং হাস্যপরিহাস তাহার একেবারে সহ্য হইত না। একে গম্ভীর, তাহাতে বৎসরের মধ্যে অধিকাংশ সময়েই মুখমণ্ডলের চারি দিকে কালো পশমের গলাবন্ধ জড়াইয়া থাকাতে তাহাকে ভয়ংকর উঁচু দরের লোক বলিয়া বোধ হইত। ইহার উপরে, অতি অল্প বয়সেই তাহার ওষ্ঠাধর এবং গণ্ডস্থল প্রচুর গোঁফ-দাড়িতে আচ্ছন্ন হওয়াতে সমস্ত মুখের মধ্যে হাস্যবিকাশের স্থান আর তিলমাত্র অবশিষ্ট রহিল না।
স্ত্রী হৈমবতীর বয়স অল্প এবং তাহার মন পার্থিব বিষয়ে সম্পূর্ণ নিবিষ্ট। সে বঙ্কিমবাবুর নভেল পড়িতে চায় এবং স্বামীকে ঠিক দেবতার ভাবে পূজা করিয়া তাহার তৃপ্তি হয় না। সে একটুখানি হাসিখুশি ভালোবাসে, এবং বিকচোন্মুখ পুষ্প যেমন বায়ুর আন্দোলন এবং প্রভাতের আলোকের জন্য ব্যাকুল হয় সেও তেমনি এই নবযৌবনের সময় স্বামীর নিকট হইতে আদর এবং হাস্যামোদ যথাপরিমাণে প্রত্যাশা করিয়া থাকে। কিন্তু, স্বামী তাহাকে অবসর পাইলেই ভাগবত পড়ায়, সন্ধ্যাবেলায় ভগবদ্‌গীতা শুনায়, এবং তাহার আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশে মাঝে মাঝে শারীরিক শাসন করিতেও ত্রুটি করে না। যেদিন হৈমবতীর বালিশের নীচে হইতে কৃষ্ণকান্তের উইল বাহির হয় সেদিন উক্ত লঘুপ্রকৃতি যুবতীকে সমস্ত রাত্রি অশ্রুপাত করাইয়া তবে ফকির ক্ষান্ত হয়। একে নভেল-পাঠ, তাহাতে আবার পতিদেবকে প্রতারণা। যাহা হউক, অবিশ্রান্ত আদেশ অনুদেশ উপদেশ ধর্মনীতি এবং দণ্ডনীতির দ্বারা অবশেষে হৈমবতীর মুখের হাসি, মনের সুখ এবং যৌবনের আবেগ একেবারে নিষ্কর্ষণ করিয়া ফেলিতে স্বামীদেবতা সম্পূর্ণ কৃতকার্য হইয়াছিলেন।
আরো দেখুন
তুমি যে কাজ করছ
Verses
          তুমি যে কাজ করছ, আমায়
                  সেই কাজে কি লাগাবে না।
          কাজের দিনে আমায় তুমি
                  আপন হাতে জাগাবে না?
                                  ভালোমন্দ ওঠাপড়ায়
                                  বিশ্বশালার ভাঙাগড়ায়
                                  তোমার পাশে দাঁড়িয়ে যেন
                                         তোমার সাথে হয় গো চেনা।
       ভেবেছিলেম বিজন ছায়ায়
              নাই যেখানে আনাগোনা,
       সন্ধ্যাবেলায় তোমায় আমায়
              সেথায় হবে জানাশোনা।
                           অন্ধকারে একা একা
                           সে দেখা যে স্বপ্ন দেখা,
                           ডাকো তোমার হাটের মাঝে
                                  চলছে যেথায় বেচাকেনা।
আরো দেখুন
মাল্যদান
Stories
সকালবেলায় শীত-শীত ছিল। দুপুরবেলায় বাতাসটি অল্প-একটু তাতিয়া উঠিয়া দক্ষিণ দিক হইতে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যতীন যে বারান্দায় বসিয়া ছিল সেখান হইতে বাগানের এক কোণে এক দিকে একটি কাঁঠাল ও আর-এক দিকে একটি শিরীষগাছের মাঝখানের ফাঁক দিয়া বাহিরের মাঠ চোখে পড়ে। সেই শূন্য মাঠ ফাল্গুনের রৌদ্রে ধুধু করিতেছিল। তাহারই একপ্রান্ত দিয়া কাঁচা পথ চলিয়া গেছে -- সেই পথ বাহিয়া বোঝাই-খালাস গোরুর গাড়ি মন্দগমনে গ্রামের দিকে ফিরিয়া চলিয়াছে, গাড়োয়ান মাথায় গামছা ফেলিয়া অত্যন্ত বেকারভাবে গান গহিতেছে।
আরো দেখুন
চোরাই ধন
Stories
মহাকাব্যের যুগে স্ত্রীকে পেতে হত পৌরুষের জোরে; যে অধিকারী সেই লাভ করত রমণীরত্ন। আমি লাভ করেছি কাপুরুষতা দিয়ে, সে-কথা আমার স্ত্রীর জানতে বিলম্ব ঘটেছিল। কিন্তু, সাধনা করেছি বিবাহের পরে; যাকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে পেয়েছি তার মূল্য দিয়েছি দিনে দিনে।
দাম্পত্যের স্বত্ব সাব্যস্ত করতে হয় প্রতিদিনই নতুন করে, অধিকাংশ পুরুষ ভুলে থাকে এই কথাটা। তারা গোড়াতেই কাস্টম্‌ হৌসে মাল খালাস করে নিয়েছে সমাজের ছাড়চিঠি দেখিয়ে, তার পর থেকে আছে বেপরোয়া। যেন পেয়েছে পাহারাওয়ালার সরকারি প্রতাপ, উপরওয়ালার দেওয়া তকমার জোরে; উর্দিটা খুলে নিলেই অতি অভাজন তারা।
আরো দেখুন
প্রতিবেশিনী
Stories
আমার প্রতিবেশিনী বালবিধবা। যেন শরতের শিশিরাশ্রুপ্লুত শেফালির মতো বৃন্তচ্যুত; কোনো বাসরগৃহের ফুলশয্যার জন্য সে নহে, সে কেবল দেবপূজার জন্যই উৎসর্গ-করা।
তাহাকে আমি মনে মনে পূজা করিতাম। তাহার প্রতি আমার মনের ভাবটা যে কী ছিল পূজা ছাড়া তাহা অন্য কোনো সহজ ভাষায় প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করি না -- পরের কাছে তো নয়ই, নিজের কাছেও না।
আরো দেখুন