পান্নালাল
Stories
দাদামশায়, তোমার পাগলের দলের মধ্যে পান্নালাল ছিল খুব নতুন রকমের।
জান, দিদি? তোমার পাগলরা প্রত্যেকেই নতুন, কারও সঙ্গে কারও মিল হয় না। যেমন তোমার দাদামশায়। বিধাতার নতুন পরীক্ষা। ছাঁচ তিনি ভেঙে ফেলেন। সাধারণ লোকের বুদ্ধিতে মিল হয়, অসাধারণ পাগলের মিল হয় না। তোমাকে একটা উদাহরণ দেখাই--
আরো দেখুন
রাজপথের কথা
Stories
আমি রাজপথ। অহল্যা যেমন মুনির শাপে পাষাণ হইয়া পড়িয়া ছিল, আমিও যেন তেমনি কাহার শাপে চিরনিদ্রিত সুদীর্ঘ অজগর সর্পের ন্যায় অরণ্যপর্বতের মধ্য দিয়া, বৃক্ষশ্রেণীর ছায়া দিয়া, সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরের বক্ষের উপর দিয়া দেশদেশান্তর বেষ্টন করিয়া বহুদিন ধরিয়া জড়শয়নে শয়ান রহিয়াছি। অসীম ধৈর্যের সহিত ধুলায় লুটাইয়া শাপান্তকালের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া আছি। আমি চিরদিন স্থির অবিচল, চিরদিন একই ভাবে শুইয়া আছি, কিন্তু তবুও আমার এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নাই। এতটুকু বিশ্রাম নাই যে, আমার এই কঠিন শুষ্ক শয্যার উপরে একটিমাত্র কচি স্নিগ্ধ শ্যামল ঘাস উঠাইতে পারি; এতটুকু সময় নাই যে, আমার শিয়রের কাছে অতি ক্ষুদ্র একটি নীলবর্ণের বনফুল ফুটাইতে পারি। কথা কহিতে পারি না, অথচ অন্ধভাবে সকলই অনুভব করিতেছি। রাত্রিদিন পদশব্দ; কেবলই পদশব্দ। আমার এই গভীর জড়-নিদ্রার মধ্যে লক্ষ লক্ষ চরণের শব্দ অহর্নিশ দুঃস্বপ্নের ন্যায় আবর্তিত হইতেছে। আমি চরণের স্পর্শে হৃদয় পাঠ করিতে পারি। আমি বুঝিতে পারি, কে গৃহে যাইতেছে, কে বিদেশে যাইতেছে, কে কাজে যাইতেছে, কে বিশ্রামে যাইতেছে, কে উৎসবে যাইতেছে, কে শ্মশানে যাইতেছে। যাহার সুখের সংসার আছে, স্নেহের ছায়া আছে, সে প্রতি পদক্ষেপে সুখের ছবি আঁকিয়া আঁকিয়া চলে; সে প্রতি পদক্ষেপে মাটিতে আশার বীজ রোপিয়া রোপিয়া যায়, মনে হয় যেখানে যেখানে তাহার পা পড়িয়াছে, সেখানে যেন মুহূর্তের মধ্যে এক-একটি করিয়া লতা অঙ্কুরিত পুষ্পিত হইয়া উঠিবে। যাহার গৃহ নাই আশ্রয় নাই, তাহার পদক্ষেপের মধ্যে আশা নাই অর্থ নাই, তাহার পদক্ষেপের দক্ষিণ নাই, বাম নাই, তাহার চরণ যেন বলিতে থাকে, আমি চলিই বা কেন থামিই বা কেন, তাহার পদক্ষেপে আমার শুষ্ক ধূলি যেন আরো শুকাইয়া যায়।
পৃথিবীর কোনো কাহিনী আমি সম্পূর্ণ শুনিতে পাই না। আজ শত শত বৎসর ধরিয়া আমি কত লক্ষ লোকের কত হাসি কত গান কত কথা শুনিয়া আসিতেছি; কিন্তু কেবল খানিকটা মাত্র শুনিতে পাই। বাকিটুকু শুনিবার জন্য যখন আমি কান পাতিয়া থাকি, তখন দেখি সে লোক আর নাই। এমন কত বৎসরের কত ভাঙা কথা ভাঙা গান আমার ধূলির সহিত ধূলি হইয়া গেছে, আমার ধূলির সহিত উড়িয়া বেড়ায়, তাহা কি কেহ জানিতে পায়। ঐ শুন, একজন গাহিল, 'তারে বলি বলি আর বলা হল না।' -- আহা, একটু দাঁড়াও, গানটা শেষ করিয়া যাও, সব কথাটা শুনি। কই আর দাঁড়াইল। গাহিতে গাহিতে কোথায় চলিয়া গেল, শেষটা শোনা গেল না। ঐ একটিমাত্র পদ অর্ধেক রাত্রি ধরিয়া আমার কানে ধ্বনিত হইতে থাকিবে। মনে মনে ভাবিব, ও কে গেল। কোথায় যাইতেছে না জানি। যে কথাটা বলা হইল না, তাহাই কি আবার বলিতে যাইতেছে। এবার যখন পথে আবার দেখা হইবে, সে যখন মুখ তুলিয়া ইহার মুখের দিকে চাহিবে, তখন বলি বলি করিয়া আবার যদি বলা না হয়। তখন নত শির করিয়া মুখ ফিরাইয়া অতি ধীরে ধীরে ফিরিয়া আসিবার সময় আবার যদি গায় 'তারে বলি বলি আর বলা হল না'।
আরো দেখুন
এই কথাটি মনে রেখো
Songs
     এই কথাটি মনে রেখো,    তোমাদের এই হাসিখেলায়
          আমি যে গান গেয়েছিলেম    জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়।
              শুকনো ঘাসে শূন্য বনে    আপন-মনে
                   অনাদরে অবহেলায়
          আমি যে গান গেয়েছিলেম     জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়॥
     দিনের পথিক মনে রেখো,    আমি চলেছিলেম রাতে
              সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে হাতে।
যখন আমার ও-পার থেকে    গেল ডেকে    ভেসেছিলেম ভাঙা ভেলায়।
     আমি যে গান গেয়েছিলেম    জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়॥
আরো দেখুন
আরম্ভ ও শেষ
Verses
শেষ কহে, একদিন সব শেষ হবে,
হে আরম্ভ, বৃথা তব অহংকার তবে।
আরম্ভ কহিল ভাই, যেথা শেষ হয়
সেইখানে পুনরায় আরম্ভ-উদয়।
আরো দেখুন
সংস্কার
Stories
চিত্রগুপ্ত এমন অনেক পাপের হিসাব বড়ো অক্ষরে তাঁর খাতায় জমা করেন যা থাকে পাপীর নিজের অগোচরে। তেমনি এমন পাপও ঘটে যাকে আমিই চিনি পাপ বলে, আর-কেউ না। যেটার কথা লিখতে বসেছি সেটা সেই জাতের। চিত্রগুপ্তের কাছে জবাবদিহি করবার পূর্বে আগে-ভাগে কবুল করলে অপরাধের মাত্রাটা হাল্‌কা হবে।
ব্যাপারটা ঘটেছিল কাল শনিবার দিনে। সেদিন আমাদের পাড়ায় জৈনদের মহলে কী একটা পরব ছিল। আমার স্ত্রী কলিকাকে নিয়ে মোটরে করে বেরিয়েছিলুম-- চায়ের নিমন্ত্রণ ছিল বন্ধু নয়নমোহনের বাড়িতে।
আরো দেখুন
তোমার সুরের ধারা
Songs
তোমার  সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে
           দেবে কি গো বাসা আমায় একটি ধারে?।
           আমি     শুনব ধ্বনি কানে,
           আমি     ভরব ধ্বনি প্রাণে,
           সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে ॥
আমার    নীরব বেলা সেই তোমারি সুরে সুরে
           ফুলের ভিতর মধুর মতো উঠবে পুরে।
           আমার    দিন ফুরাবে যবে,
           যখন      রাত্রি আঁধার হবে,
           হৃদয়ে মোর গানের তারা উঠবে ফুটে সারে সারে ॥
আরো দেখুন
পুপুদিদির জন্মদিনে
Verses
যে ছিল মোর ছেলেমানুষ
                     হারিয়ে গেল কোথা--
         পথ ভুলে সে পেরিয়েছিল
                     মরা নদীর সোঁতা।
         হায়, বুড়োমির পাঁচিল তারে
                      আড়াল করল আজ--
         জানি নে কোন্‌ লুকিয়ে-ফেরা
                     বয়স-চোরার কাজ।
         হঠাৎ তোমার জন্মদিনের
                     আঘাত লাগল দ্বারে,
         ডাক দিল সে দূর সেকালের
                     খ্যাপা বালকটারে।
               ছেলেমানুষ আমি
         ডাক শুনে সে এগিয়ে এসে
                     হঠাৎ গেল থামি।
         বললে, শোনো ওগো কিশোরিকা,
               "রবীন্দ্র' নাম কুষ্ঠিতে যার লিখা,
         নামটা সত্য--সত্য শুধু
                     তারিখটা মাত্তর--
         তাই বলে তো বয়সখানা
                     নয়কো ছিয়াত্তর।
         কাঁচা প্রাণের দৃষ্টি যে তার,
                     জগৎটা তার কাঁচা।
         বাঁধে নি তায় খেতাব-লাভের
                     বিষয়-লোভের খাঁচা।
         মনটাতে তার সবুজ রঙে
                     সোনার বরন মেশা।
         বক্ষে রসের তরঙ্গ তার,
                     চক্ষে রূপের নেশা।
         ফাগুন-দিনের হাওয়ার খ্যাপামি যে
               পরানে তার স্বপন বোনে
                     রঙিন মায়ার বীজে।
               ভরসা যদি মেলে
         তোমার লীলার আঙিনাতে
                     ফিরবে হেসে খেলে।
         এই ভুবনের ভোর-বেলাকার গান
               পূর্ণ করে রেখেছে তার প্রাণ।
                     সেই গানেরই সুর
               তোমার নবীন জীবনখানি
                     করবে সুমধুর।
আরো দেখুন
মেঘ ও রৌদ্র
Stories
পূর্বদিনে বৃষ্টি হইয়া গিয়াছে। আজ ক্ষান্তবর্ষণ প্রাতঃকালে ম্লান রৌদ্র ও খণ্ড মেঘে মিলিয়া পরিপক্কপ্রায় আউশ ধানের ক্ষেত্রের উপর পর্যায়ক্রমে আপন আপন সুদীর্ঘ তুলি বুলাইয়া যাইতেছিল; সুবিস্তৃত শ্যাম চিত্রপট একবার আলোকের স্পর্শে উজ্জ্বল পাণ্ডুবর্ণ ধারণ করিতেছিল আবার পরক্ষণেই ছায়াপ্রলেপে গাঢ় স্নিগ্ধতায় অঙ্কিত হইতেছিল।
যখন সমস্ত আকাশরঙ্গভূমিতে মেঘ এবং রৌদ্র, দুইটি মাত্র অভিনেতা, আপন আপন অংশ অভিনয় করিতেছিল তখন নিম্নে সংসাররঙ্গভূমিতে কত স্থানে কত অভিনয় চলিতেছিল তাহার আর সংখ্যা নাই।
আরো দেখুন