একটা আষাঢ়ে গল্প
Stories
দূর সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপ। সেখানে কেবল তাসের সাহেব, তাসের বিবি, টেক্কা এবং গোলামের বাস। দুরি তিরি হইতে নহলা-দহলা পর্যন্ত আরো অনেক-ঘর গৃহস্থ আছে কিন্তু তাহারা উচ্চজাতীয় নহে।
টেক্কা সাহেব গোলাম এই তিনটেই প্রধান বর্ণ, নহলা-দহলারা অন্ত্যজ-- তাহাদের সহিত এক পঙ্‌ক্তিতে বসিবার যোগ্য নহে।
আরো দেখুন
উজ্জ্বল করো হে
Songs
উজ্জ্বল করো হে আজি এ আনন্দরাতি
     বিকাশিয়া তোমার আনন্দমুখভাতি।
সভা-মাঝে তুমি আজ   বিরাজো হে রাজরাজ,
     আনন্দে রেখেছি তব সিংহাসন পাতি॥
          সুন্দর করো, হে প্রভু, জীবন যৌবন
              তোমারি মাধুরীসুধা করি বরিষন।
     লহো তুমি লহো তুলে   তোমারি চরণমূলে
          নবীন মিলনমালা প্রেমসূত্রে গাঁথি॥
          মঙ্গল করো হে, আজি মঙ্গলবন্ধন
          তব শুভ আশীর্বাদ করি বিতরণ।
     বরিষ হে ধ্রুবতারা, কল্যাণকিরণধারা--
     দুর্দিনে সুদিনে তুমি থাকো চিরসাথী॥
আরো দেখুন
মোরা জলে স্থলে কত ছলে
Songs
(মোরা) জলে স্থলে কত ছলে মায়াজাল গাঁথি।
(মোরা) স্বপন রচনা করি অলস নয়ন ভরি।
গোপনে হৃদয়ে পশি কুহক-আসন পাতি।
(মোরা) মদির-তরঙ্গ তুলি বসন্ত-সমীরে!
দুরাশা জাগায় প্রাণে প্রাণে, আধো-তানে ভাঙা গানে,
ভ্রমরগুঞ্জরাকুল বকুলের পাঁতি!
মোরা মায়াজাল গাঁথি।
নরনারী-হিয়া মোরা বাঁধি মায়াপাশে।
কত ভুল করে তারা,কত কাঁদে হাসে।
মায়া করে ছায়া ফেলি মিলনের মাঝে,
আনি মান-অভিমান।
বিরহী স্বপনে পায় মিলনের সাথী।
মোরা মায়াজাল গাঁথি।
চলো সখী, চলো।
কুহক-স্বপন-খেলা খেলাবে চলো।
নবীন হৃদয়ে রচি নব প্রেম-ছল,
প্রমোদে কাটাব নব বসন্তের রাতি।
মোরা মায়াজাল গাঁথি।
আরো দেখুন
দুর্দিন
Verses
এতদিন পরে প্রভাতে এসেছ
            কী জানি কী ভাবি মনে।
ঝড় হয়ে গেছে কাল রজনীতে
            রজনীগন্ধাবনে।
কাননের পথ ভেসে গেছে জলে,        
বেড়াগুলি ভেঙে পড়েছে ভূতলে,
নব ফুটন্ত ফুলের দণ্ড
            লুটায় তৃণের সনে।
এতদিন পরে তুমি যে এসেছ
            কী জানি কী ভাবি মনে।
হেরো গো আজিও প্রভাত অরুণ
            মেঘের আড়ালে হারা,
রহি রহি আজো ঘনায়ে ঘনায়ে
            ঝরিছে বাদলধারা।
মাতাল বাতাস আজো থাকি থাকি
চেতিয়া চেতিয়া উঠে ডাকি ডাকি,
জড়িত পাতায় সিক্ত শাখায়
            দোয়েল দেয় না সাড়া।
আজিও আঁধার প্রভাতে অরুণ
            মেঘের আড়ালে হারা।
এ ভরা বাদলে আর্দ্র আঁচলে
            একেলা এসেছ আজি,
এনেছ বহিয়া রিক্ত তোমার
            পূজার ফুলের সাজি।
এত মধুমাস গেছে বার বার--
ফুলের অভাব ঘটে নি তোমার,
বন আলো করি ফুটেছিল যবে
           রজনীগন্ধারাজি।
এ ভরা বাদলে আর্দ্র আঁচলে
          একেলা এসেছ আজি।
আজি তরুতলে দাঁড়ায়েছে জল,
            কোথা বসিবার ঠাঁই?
কাল যাহা ছিল সে ছায়া সে আলো
            সে গন্ধগান নাই।
তবু ক্ষণকাল রহ ত্বরাহীন,
ছিন্ন কুসুম পঙ্কে মলিন
ভূতল হইতে যতনে তুলিয়া
            ধুয়ে ধুয়ে দিব তাই।
আজি তরুতলে দাঁড়ায়েছে জল,
            কোথা বসিবার ঠাঁই?
এত দিন পরে তুমি যে এসেছ
            কী জানি কী ভাবি মনে।
প্রভাত আজিকে অরুণবিহীন,
            কুসুম লুটায় বনে।
যাহা আছে লও প্রসন্ন করে,
ও সাজি তোমার ভরে কি না ভরে
ওই যে আবার নামে বারিধার
                 ঝরঝর বরষনে।
এতদিন পরে তুমি যে এসেছ
            কী জানি কী ভাবি মনে।
আরো দেখুন
উলুখড়ের বিপদ
Stories
বাবুদের নায়েব গিরিশ বসুর অন্তঃপুরে প্যারী বলিয়া একটি নূতন দাসী নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহার বয়স অল্প; চরিত্র ভালো। দূর বিদেশ হইতে আসিয়া কিছুদিন  কাজ করার পরেই একদিন সে বৃদ্ধ নায়েবের অনুরাগদৃষ্টি হইতে আত্মরক্ষার জন্য গৃহিণীর নিকট কাঁদিয়া গিয়া পড়িল। গৃহিণী কহিলেন, "বাছা, তুমি অন্য কোথাও যাও; তুমি ভালোমানুষের মেয়ে, এখানে থাকিলে তোমার সুবিধা হইবে না।" বলিয়া গোপনে কিছু অর্থ দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন।
কিন্তু পালানো সহজ ব্যাপার নহে, হাতে পথ-খরচও সামান্য, সেইজন্য প্যারী গ্রামে হরিহর ভট্টাচার্য মহাশয়ের নিকটে গিয়া আশ্রয় লইল। বিবেচক ছেলেরা কহিল, "বাবা, কেন বিপদ ঘরে আনিতেছেন।" হরিহর কহিলেন, "বিপদ স্বয়ং আসিয়া আশ্রয় প্রার্থনা করিলে তাহাকে ফিরাইতে পারি না।"
গিরিশ বসু সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া কহিল, "ভট্টাচার্যমহাশয়, আপনি আমার ঝি ভাঙাইয়া আনিলেন কেন। ঘরে কাজের ভারি অসুবিধা হইতেছে।" ইহার উত্তরে হরিহর    দু-চারটে সত্য কথা খুব শক্ত করিয়াই বলিলেন। তিনি মানী লোক ছিলেন, কাহারো খাতিরে কোনো কথা ঘুরাইয়া বলিতে জানিতেন না। নায়েব মনে মনে উদ্‌গতপক্ষ পিপীলিকার সহিত তাঁহার তুলনা করিয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময় খুব ঘটা করিয়া পায়ের ধুলা লইল। দুই-চারি দিনের মধ্যেই ভট্টাচার্যের বাড়িতে পুলিসের সমাগম হইল। গৃহিণীঠাকুরানীর বালিশের নীচে হইতে নায়েবের স্ত্রীর একজোড়া ইয়ারিং বাহির হইল। ঝি প্যারী চোর সাব্যস্ত হইয়া জেলে গেল। ভট্টাচার্যমহাশয় দেশবিখ্যাত প্রতিপত্তির জোরে চোরাই-মাল রক্ষার অভিযোগ হইতে নিষ্কৃতি পাইলেন। নায়েব পুনশ্চ ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল। ব্রাহ্মণ বুঝিলেন, হতভাগিনীকে তিনি আশ্রয় দেওয়াতেই প্যারীর সর্বনাশ ঘটিল। তাঁহার মনে শেল বিঁধিয়া রহিল। ছেলেরা কহিল, "জমিজমা বেচিয়া কলিকাতায় যাওয়া যাক, এখানে বড়ো মুশকিল দেখিতেছি।" হরিহর কহিলেন, "পৈতৃক ভিটা ছাড়িতে পারিব না, অদৃষ্টে থাকিলে বিপদ কোথায় না ঘটে।"ইতিমধ্যে নায়েব গ্রামে অতিমাত্রায় খাজনা বৃদ্ধির চেষ্টা করায় প্রজারা বিদ্রোহী হইল। হরিহরের সমস্ত ব্রহ্মোত্তর জমা, জমিদারের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ নাই। নায়েব তাহার প্রভুকে জানাইল, হরিহরই প্রজাদিগকে প্রশ্রয় দিয়া বিদ্রোহী করিয়া তুলিয়াছে। জমিদার কহিলেন, "যেমন করিয়া পার ভট্টাচার্যকে শাসন করো।" নায়েব ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া কহিল,  "সামনের ঐ জমিটা পরগনার ভিটার মধ্যে পড়িতেছে; ওটা তো ছাড়িয়া দিতে হয়।" হরিহর কহিলেন, "সে কী কথা। ও যে আমার বহুকালের ব্রহ্মত্র।" হরিহরের গৃহপ্রাঙ্গণের সংলগ্ন পৈতৃক জমি জমিদারের পরগনার অন্তর্গত বলিয়া নালিশ রুজু হইল। হরিহর বলিলেন,"এ জমিটা তো তবে ছাড়িয়া দিতে হয়, আমি তো  বৃদ্ধ বয়সে আদালতে সাক্ষী দিতে পারিব না।" ছেলেরা বলিল, "বাড়ির সংলগ্ন জমিটাই যদি ছাড়িয়া দিতে হয় তবে ভিটায় টিঁকিব কী করিয়া।"
প্রাণাধিক পৈতৃক ভিটার মায়ায় বৃদ্ধ কম্পিতপদে আদালতের সাক্ষ্যমঞ্চে গিয়া দাঁড়াইলেন। মুন্সেফ নবগোপালবাবু তাঁহার সাক্ষ্যই প্রামাণ্য করিয়া মকদ্দমা ডিস্‌মিস্‌ করিয়া দিলেন। ভট্টাচার্যের খাস প্রজারা ইহা লইয়া গ্রামে ভারি উৎসবসমারোহ আরম্ভ করিয়া দিল। হরিহর তাড়াতাড়ি তাহাদিগকে থামাইয়া দিলেন। নায়েব আসিয়া পরম আড়ম্বরে ভট্টাচার্যের পদধূলি লইয়া গায়ে মাথায় মাখিল এবং আপিল রুজু করিল। উকিলরা হরিহরের নিকট হইতে টাকা লন না। তাঁহারা ব্রাহ্মণকে বারম্বার আশ্বাস দিলেন, এ মকদ্দমায় হারিবার কোনো সম্ভাবনা নাই। দিন কি কখনো রাত হইতে পারে। শুনিয়া হরিহর নিশ্চিন্ত হইয়া ঘরে বসিয়া রহিলেন।
একদিন জমিদারি কাছারিতে ঢাকঢোল বাজিয়া উঠিল, পাঁঠা কাটিয়া নায়েবের বাসায় কালীপূজা হইবে। ব্যাপারখানা কী। ভট্টাচার্য খবর পাইলেন, আপিলে তাঁহার হার হইয়াছে।
ভট্টাচার্য মাথা চাপড়াইয়া উকিলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, বসন্তবাবু, করিলেন কী। আমার কী দশা হইবে।"
দিন যে কেমন করিয়া রাত হইল, বসন্তবাবু তাহার নিগূঢ় বৃত্তান্ত বলিলেন, "সম্প্রতি যিনি নূতন অ৻াডিশনাল জজ হইয়া আসিয়াছেন তিনি মুন্সেফ থাকা কালে মুন্সেফ নবগোপালবাবুর সহিত তাঁহার ভারি খিটিমিটি বাধিয়াছিল। তখন কিছু করিয়া উঠিতে পারেন নাই; আজ জজের আসনে বসিয়া নবগোপালবাবুর রায় পাইবামাত্র উলটাইয়া দিতেছেন; আপনি হারিলেন সেইজন্য।"  ব্যাকুল হরিহর কহিলেন, "হাইকোর্টে ইহার কোনো আপিল নাই?" বসন্ত কহিলেন, জজবাবু আপিলেফল পাইবার সম্ভাবনা মাত্র রাখেন নাই। তিনি আপনাদের সাক্ষীকে সন্দেহ করিয়া বিরুদ্ধ পক্ষের সাক্ষীকেই বিশ্বাস করিয়া গিয়াছেন। হাইকোর্টে তো সাক্ষীর বিচার হইবে না।"
বৃদ্ধ সাশ্রুনেত্রে কহিলেন, "তবে আমার উপায়?"
উকিল কহিলেন, "উপায় কিছুই দেখি না।"
গিরিশ বসু পরদিন লোকজন সঙ্গে লইয়া ঘটা করিয়া ব্রাহ্মণের পদধূলি লইয়া গেল এবং বিদায়কালে উচ্ছ্বসিত দীর্ঘনিশ্বাসে কহিল, "প্রভু, তোমারই ইচ্ছা।"
আরো দেখুন
দুরাশা
Stories
দার্জিলিঙে গিয়া দেখিলাম, মেঘে বৃষ্টিতে দশ দিক আচ্ছন্ন। ঘরের বাহির হইতে ইচ্ছা হয় না, ঘরের মধ্যে থাকিতে আরো অনিচ্ছা জন্মে।
হোটেলে প্রাতঃকালের আহার সমাধা করিয়া পায়ে মোটা বুট এবং আপাদমস্তক ম্যাকিন্টশ পরিয়া বেড়াইতে বাহির হইয়াছি। ক্ষণে ক্ষণে টিপ্‌ টিপ্‌ করিয়া বৃষ্টি পড়িতেছে এবং সর্বত্র ঘন মেঘের কুজ্ঝটিকায় মনে হইতেছে, যেন বিধাতা হিমালয়পর্বতসুদ্ধ সমস্ত বিশ্বচিত্র রবার দিয়া ঘষিয়া ঘষিয়া মুছিয়া ফেলিবার উপক্রম করিয়াছেন।
আরো দেখুন
পরিশিষ্ট
Stories
(ছোটো গল্প)
সাহিত্যে বড়ো গল্প ব'লে যে-সব প্রগল্‌ভ বাণীবাহন দেখা যায় তারা প্রাক্‌ভূতাত্ত্বিক যুগের প্রাণীদের মতো-- তাদের প্রাণের পরিমাণ যত দেহের পরিমাণ তার চার গুণ, তাদের লেজটা কলেবরের অত্যুক্তি।
আরো দেখুন
বোষ্টমী
Stories
আমি লিখিয়া থাকি অথচ লোকরঞ্জন আমার কলমের ধর্ম নয়, এইজন্য লোকেও আমাকে সদাসর্বদা যে রঙে রঞ্জিত করিয়া থাকে তাহাতে কালির ভাগই বেশি। আমার সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনিতে হয়; কপালক্রমে সেগুলি হিতকথা নয়, মনোয়ারী তো নহেই।
শরীরে যেখানটায় ঘা পড়িতে থাকে সে জায়গাটা যত তুচ্ছই হোক সমস্ত দেহটাকে বেদনার জোরে সেই ছাড়াইয়া যায়। সে লোক গালি খাইয়া মানুষ হয়, সে আপনার স্বভাবকে যেন ঠেলিয়া একঝোঁকা হইয়া পড়ে। আপনার চারি দিককে ছাড়াইয়া আপনাকেই কেবল তাহার মনে পড়ে-- সেটা আরামও নয়, কল্যাণও নয়। আপনাকে ভোলাটাই তো স্বস্তি।
আরো দেখুন
212
Verses
THE LOTUS offers its beauty to the heaven
the grass its service to the earth.
আরো দেখুন
করুণা
Stories
গ্রামের মধ্যে অনুপকুমারের ন্যায় ধনবান আর কেহই ছিল না। অতিথিশালানির্মাণ, দেবালয়প্রতিষ্ঠা, পুষ্করিণীখনন প্রভৃতি নানা সৎকর্মে তিনি ধনব্যয় করিতেন। তাঁহার সিন্ধুক-পূর্ণ টাকা ছিল, দেশবিখ্যাত যশ ছিল ও রূপবতী কন্যা ছিল। সমস্ত যৌবনকাল ধন উপার্জন করিয়া অনুপ বৃদ্ধ বয়সে বিশ্রাম করিতেছিলেন। এখন কেবল তাঁহার একমাত্র ভাবনা ছিল যে, কন্যার বিবাহ দিবেন কোথায়। সৎপাত্র পান নাই ও বৃদ্ধ বয়সে একমাত্র আশ্রয়স্থল কন্যাকে পরগৃহে পাঠাইতে ইচ্ছা নাই--তজ্জন্যও আজ কাল করিয়া আর তাঁহার দুহিতার বিবাহ হইতেছে না।
সঙ্গিনী-অভাবে করুণার কিছুমাত্র কষ্ট হইত না। সে এমন কাল্পনিক ছিল, কল্পনার স্বপ্নে সে সমস্ত দিন-রাত্রি এমন সুখে কাটাইয়া দিত যে, মুহূর্তমাত্রও তাহাকে কষ্ট অনুভব করিতে হয় নাই। তাহার একটি পাখি ছিল, সেই পাখিটি হাতে করিয়া অন্তঃপুরের পুষ্করিণীর পাড়ে কল্পনার রাজ্য নির্মাণ করিত। কাঠবিড়ালির পশ্চাতে পশ্চাতে ছুটাছুটি করিয়া, জলে ফুল ভাসাইয়া, মাটির শিব গড়িয়া, সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটাইয়া দিত। এক-একটি গাছকে আপনার সঙ্গিনী ভগ্নী কন্যা বা পুত্র কল্পনা করিয়া তাহাদের সত্য-সত্যই সেইরূপ যত্ন করিত, তাহাদিগকে খাবার আনিয়া দিত, মালা পরাইয়া দিত, নানাপ্রকার আদর করিত এবং তাদের পাতা শুকাইলে, ফুল ঝরিয়া পড়িলে, অতিশয় ব্যথিত হইত। সন্ধ্যাবেলা পিতার নিকট যা-কিছু গল্প শুনিত, বাগানে পাখিটিকে তাহাই শুনানো হইত। এইরূপে করুণা তাহার জীবনের প্রত্যুষকাল অতিশয় সুখে আরম্ভ করিয়াছিল। তাহার পিতা ও প্রতিবাসীরা মনে করিতেন যে, চিরকালই বুঝি ইহার এইরূপে কাটিয়া যাইবে।
আরো দেখুন
শেষের কবিতা
Novels
অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ছাঁদে রায় পদবী "রয়" ও "রে" রূপান্তর যখন ধারণ করলে তখন তার শ্রী গেল ঘুচে কিন্তু সংখ্যা হল বৃদ্ধি। এই কারণে, নামের অসামান্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানালে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে তার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল-- অমিট রায়ে।
অমিতর বাপ ছিলেন দিগ্‌বিজয়ী ব্যারিস্টার। যে পরিমাণ টাকা তিনি জমিয়ে গেছেন সেটা অধস্তন তিন পুরুষকে অধঃপাতে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তির সাংঘাতিক সংঘাতেও অমিত বিনা বিপত্তিতে এ যাত্রা টিঁকে গেল।
                         আনিলাম
               অপরিচিতের নাম
                                   ধরণীতে,
               পরিচিত জনতার সরণীতে।
                                   আমি আগন্তুক,
               আমি জনগণেশের প্রচণ্ড কৌতুক।
                                   খোলো দ্বার,
               বার্তা আনিয়াছি বিধাতার।
                         মহাকালেশ্বর
               পাঠায়েছে দুর্লক্ষ্য অক্ষর,
                         বল্‌ দুঃসাহসী কে কে
                         মৃত্যু পণ রেখে
               দিবি তার দুরূহ উত্তর।
               শুনিবে না।
                         মূঢ়তার সেনা
                                   করে পথরোধ।
                             ব্যর্থ ক্রোধ
                         হুংকারিয়া পড়ে বুকে,
                                   তরঙ্গের নিষ্ফলতা
                                            নিত্য যথা
                                   মরে মাথা ঠুকে
                                   শৈলতট-'পরে
                                            আত্মঘাতী দম্ভভরে।
                         পুষ্পমাল্য নাহি মোর, রিক্ত বক্ষতল,
                                   নাহি বর্ম অঙ্গদ কুণ্ডল।
                         শূন্য এ ললাটপট্টে লিখা।
                                   গূঢ় জয়টিকা।
                         ছিন্ন কন্থা দরিদ্রের বেশ।
                                   করিব নিঃশেষ
                                            তোমার ভাণ্ডার।
                                   খোলো খোলো দ্বার।
                                                অকস্মাৎ
                                   বাড়ায়েছি হাত,
                                            যা দিবার দাও অচিরাৎ।
                                  বক্ষ তব কেঁপে উঠে, কম্পিত অর্গল,
                                            পৃথ্বী টলমল।
                         ভয়ে আর্ত উঠিছে চীৎকারি
                                   দিগন্ত বিদারি,
                                            "ফিরে যা এখনি,
                                   রে দুর্দান্ত দুরন্ত ভিখারি,
                                            তোর কণ্ঠধ্বনি
                                   ঘুরি ঘুরি
                         নিশীথনিদ্রার বক্ষে হানে তীব্র ছুরি।"
                                   অস্ত্র আনো।
                         ঝঞ্ঝনিয়া আমার পঞ্জরে হানো।
                                   মৃত্যুরে মারুক মৃত্যু, অক্ষয় এ প্রাণ
                                            করি যাব দান।
                                          শৃঙ্খল জড়াও তবে,
                                   বাঁধো মোরে, খণ্ড খণ্ড হবে,
                                          মুহূর্তে চকিতে,
                                   মুক্তি তব আমারি মুক্তিতে।
                                            শাস্ত্র আনো।
                                        হানো মোরে, হানো।
                                            পণ্ডিতে পণ্ডিতে
                         ঊর্ধ্বস্বরে চাহিব খণ্ডিতে
                                            দিব্য বাণী।
                                            জানি জানি
                                            তর্কবাণ
                                   হয়ে যাবে খান খান।
                         মুক্ত হবে জীর্ণ বাক্যে আচ্ছন্ন দু চোখ--
                                   হেরিবে আলোক।
                                            অগ্নি জ্বালো।
                         আজিকার যাহা ভালো
                                   কল্য যদি হয় তাহা কালো,
                                    যদি তাহা ভস্ম হয়
                                           বিশ্বময়,
                                   ভস্ম হোক।
                                 দূর করো শোক।
                               মোর অগ্নিপরীক্ষায়
                         ধন্য হোক বিশ্বলোক অপূর্ব দীক্ষায়।
                                   আমার দুর্বোধ বাণী
                                 বিরুদ্ধ বুদ্ধির 'পরে মুষ্টি হানি
                                   করিবে তাহারে উচ্চকিত,
                                            আতঙ্কিত।
                                   উন্মাদ আমার ছন্দ
                                             দিবে ধন্দ
                                   শান্তিলুব্ধ মুমুক্ষুরে,
                                   ভিক্ষাজীর্ণ বুভুক্ষুরে।
                                      শিরে হস্ত হেনে
                                   একে একে নিবে মেনে
                                            ক্রোধে ক্ষোভে ভয়ে
                                                      লোকালয়ে
                                            অপরিচিতের জয়,
                                            অপরিচিতের পরিচয়--
                                                যে অপরিচিত
                                বৈশাখের রুদ্র ঝড়ে বসুন্ধরা করে আন্দোলিত,
                                              হানি বজ্রমুঠি
                                            মেঘের কার্পণ্য টুটি
                                            সংগোপন বর্ষণসঞ্চয়
                                   ছিন্ন ক'রে মুক্ত করে সর্বজগন্ময়॥
               পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
               আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।
                         রঙিন নিমেষ ধুলার দুলাল
                         পরানে ছড়ায় আবীর গুলাল,
                                   ওড়না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
                                       দিগঙ্গনার নৃত্য;
                         হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
                                ঝলমল করে চিত্ত।
               নাই আমাদের কনক-চাঁপার কুঞ্জ,
               বনবীথিকায় কীর্ণ বকুলপুঞ্জ।
                         হঠাৎ কখন সন্ধেবেলায়
                         নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
                         প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
                                   অরুণ মেঘেরে তুচ্ছ
                   উদ্ধত যত শাখার শিখরে
                         রডোডেনড্রনগুচ্ছ।
               নাই আমাদের সঞ্চিত ধনরত্ন,
               নাই রে ঘরের লালন ললিত যত্ন।
                         পথপাশে পাখি পুচ্ছ নাচায়,
                         বন্ধন তারে করি না খাঁচায়,
                                   ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
                                           কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
                             আমরা চকিত অভাবনীয়ের
                                   ক্কচিৎ-কিরণে দীপ্ত।
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্‌।
                         ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।"
               রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী করে,
                         যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?
                                   কোন্‌ অন্ধক্ষণে
                                বিজড়িত তন্দ্রা-জাগরণে
                           রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
                                   মুখ দেখিলাম তোর।
               চক্ষু'পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সংগোপনে
                           আছ আত্মবিস্মৃতির কোণে।
                                   তোর সাথে চেনা
                                   সহজে হবে না--
                              কানে কানে মৃদুকণ্ঠে নয়।
                                   করে নেব জয়
                              সংশয়কুণ্ঠিত তোর বাণী--
                                   দৃপ্ত বলে লব টানি
                              শঙ্কা হতে, লজ্জা হতে, দ্বিধা দ্বন্দ্ব হতে
                                   নির্দয় আলোতে।
                              জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
                              মুহূর্তে চিনিবি আপনারে,
                                   ছিন্ন হবে ডোর--
                               তোর মুক্তি দিয়ে তবে মুক্তি হবে মোর।
                                   "হে অচেনা,
                             দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় রবে না,
                                   তীব্র আকস্মিক
                                বাধা বন্ধ ছিন্ন করি দিক,
                         তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক উজ্জ্বলি,
                                  দিব তাহে জীবন অঞ্জলি।"
                         হে মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,
                         আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা।"
"For Gods sake, hold your tongue
        and let me love! "
                         "ঝরনা, তোমার স্ফটিক জলের
                                   স্বচ্ছ ধারা--
                         তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
                                   সূর্য তারা।
               "আজি মাঝে মাঝে আমার ছায়ারে
               দুলায়ে খেলায়ো তারি এক ধারে,
               সে ছায়ারি সাথে হাসিয়া মিলায়ো
                         কলধ্বনি--
               দিয়ো তারে বাণী যে বাণী তোমার
                         চিরন্তনী।
               "আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
                         মিলিত ছবি,
               তাই নিয়ে আজি পরানে আমার
                         মেতেছে কবি।
               পদে পদে তব আলোর ঝলকে
               ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
               মোর বাণীরূপ দেখিলাম আজি,
                         নির্ঝরিণী।
               তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
                         নিজেরে চিনি।"
                         পূর্ণপ্রাণে চাবার যাহা
                         রিক্ত হাতে চাস নে তারে;
                         সিক্ত চোখে যাস নে দ্বারে।
                         রত্নমালা আনবি যবে
                         মাল্যবদল তখন হবে,
                         পাতবি কি তোর দেবীর আসন
                         শূন্য ধুলায় পথের ধারে।
                         পুষ্প-উদার চৈত্রবনে
                         বক্ষে ধরিস নিত্যধনে
                         লক্ষ শিখায় জ্বলবে যখন
                         দীপ্ত প্রদীপ অন্ধকারে।
For we are bound where mariner has not yet dared to go,
And we will risk the ship, ourselves and all।
            আমরা যাব যেখানে কোনো
                যায় নি নেয়ে সাহস করি,
            ডুবি যদি তো ডুবি-না কেন--
                ডুবুক সবই, ডুবুক তরী।
                        O, what is this?
               Mysterious and uncapturable bliss
               That I have known, yet seems to be
               Simple as breath and easy as a smile,
                      And older than the earth।
                  একি রহস্য, একি আনন্দরাশি!
               জেনেছি তাহারে, পাই নি তবুও পেয়ে।
                    তবু সে সহজে প্রাণে উঠে নিশ্বাসি,
                    তবু সে সরল যেন রে সরল হাসি,
                         পুরানো সে যেন এই ধরণীর চেয়ে।
                    বিদ্যাপতি কহে, কৈসে গোঙায়বি
                        হরি বিনে দিন রাতিয়া।
                         চলি যবে গেলা যমপুরে
                         অকালে!
           "Blow gently over my garden
                     Wind of the southern sea
           In the hour my love cometh
                     And calleth me।
           চুমিয়া যেও তুমি
           আমার বনভূমি
                 দখিন-সাগরের সমীরণ,
           যে শুভখনে মম
           আসিবে প্রিয়তম,
                 ডাকিবে নাম ধরে অকারণ।"
         "মিতা, ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং,
                   ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্‌।"
               ছাদের উপরে বহিয়ো নীরবে
               ওগো দক্ষিণ-হাওয়া
               প্রেয়সীর সাথে যে নিমেষে হবে
               চারি চক্ষুতে চাওয়া।
                 "তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি
                 রজনীর শুভ্র অবসানে। কিছু আর নাই বাকি,
                 নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি,
                 নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্ব-হাসি,
                 নাই পিছু ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি
                 ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।"
                 সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া
                           এনেছ  অশ্রুজল।
                 এনেছ তোমার বক্ষে ধরিয়া
                          দুঃসহ হোমানল।
                 দুঃখ যে তার উজ্জ্বল হয়ে উঠে,
                 মুগ্ধ প্রাণের আবেশ-বন্ধ টুটে।
                 এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া
                            বিচ্ছেদশতদল।"
                 "সুন্দরী তুমি শুকতারা
                       সুদূর শৈলশিখরান্তে,
                 শর্বরী যবে হবে সারা
                       দর্শন দিয়ো দিক্‌ভ্রান্তে।
                     ধরা যেথা অম্বরে মেশে
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     আঁধারের বক্ষের 'পরে
                          আধেক আলোক-রেখা-রন্ধ্র।
                     আমার আসন রাখে পেতে
                          নিদ্রাগহন মহাশূন্য।
                     তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে
                          তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ণ।
                     মন্দচরণে চলি পারে,
                          যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ।
                     সুর থেমে আসে বারে বারে,
                          ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।
                     সুন্দরী ওগো শুকতারা,
                          রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ
                     স্বপ্নে যে বাণী হল হারা
                          জাগরণে করো তারে পূর্ণ।
                     নিশীথের তল হতে তুলি
                          লহো তারে প্রভাতের জন্য।
                     আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি,
                          আলোকে তাহারে করো ধন্য।
                     যেখানে সুপ্তি হল লীনা,
                          যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,
                     অর্পিনু সেথা মোর বীণা
                          আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।
                     "কত ধৈর্য ধরি
                 ছিলে কাছে দিবসশর্বরী।
                     তব পদ-অঙ্কনগুলিরে
                 কতবার দিয়ে গেছ মোর ভাগ্যপথের ধূলিরে।
                       আজ যবে
                 দূরে যেতে হবে
                     তোমারে করিয়া যাব দান
                       তব জয়গান।
                 কতবার ব্যর্থ আয়োজনে
                     এ জীবনে
                 হোমাগ্নি উঠে নি জ্বলি,
                     শূন্যে গেছে চলি
                 হতাশ্বাস ধূমের কুণ্ডলী।
                 কতবার ক্ষণিকের শিখা
                       আঁকিয়াছে ক্ষীণ টিকা
                     নিশ্চেতন নিশীথের ভালে।
                 লুপ্ত হয়ে গেছে তাহা চিহ্নহীন কালে।
                     এবার তোমার আগমন
                          হোমহুতাশন
                              জ্বেলেছে গৌরবে।
                          যজ্ঞ মোর ধন্য হবে।
                     আমার আহুতি দিনশেষে
                 করিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে।
                          লহো এ প্রণাম
                     জীবনের পূর্ণপরিণাম।
                              এ প্রণতি'পরে
                          স্পর্শ রাখো স্নেহভরে,
                     তোমার ঐশ্বর্য-মাঝে
                       সিংহাসন যেথায় বিরাজে
                          করিয়ো আহ্বান,
                       সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান।"
       তোমারে ছাড়িয়া যেতে হবে
          রাত্রি যবে
     উঠিবে উন্মনা হয়ে প্রভাতের রথচক্ররবে।
          হায় রে বাসরঘর,
    বিরাট বাহির সে যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ংকর।
        তবু সে যতই ভাঙে-চোরে,
     মালাবদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন করে,
         তুমি আছ ক্ষয়হীন
           অনুদিন;
          তোমার উৎসব
      বিচ্ছিন্ন না হয় কভু, না হয় নীরব।
      কে বলে তোমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল
         শূন্য করি তব শয্যাতল।
         যায় নাই, যায় নাই,
     নব নব যাত্রী-মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তারাই
          তোমার আহ্বানে
        উদার তোমার দ্বার-পানে।
           হে বাসরঘর,
       বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর।
              Tender is the night
And haply the queen moon is on her throne।
           তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।
           অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার অন্তিম আগমন।
               লভিয়াছি চিরস্পর্শমণি;
           আমার শূন্যতা তুমি পূর্ণ করি গিয়েছ আপনি।
           জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান
           সন্ধ্যার দেউলদীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান।
               বিচ্ছেদের হোমবহ্নি হতে
           পূজামূর্তি ধরি প্রেম দেখা দিল দুঃখের আলোতে।
                                                            মিতা।
      কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
             তারি রথ নিত্যই উধাও
         জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
      চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন।
                 ওগো বন্ধু,
             সেই ধাবমান কাল
      জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল--
             তুলে নিল দ্রুতরথে
      দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
         তোমা হতে বহু দূরে।
             মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে
         পার হয়ে আসিলাম
      আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়--
         রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
             আমার পুরানো নাম।
         ফিরিবার পথ নাহি;
             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                 পারিবে না চিনিতে আমায়।
                         হে বন্ধু, বিদায়।
      কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে
             বসন্তবাতাসে
      অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
             ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
      সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--কিছু মোর পিছে রহিল সে
             তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে
                 হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
      হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি।
                 তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
      সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                 সে আমার প্রেম।
         তারে আমি রাখিয়া এলেম
      অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
         পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
             কালের যাত্রায়।
                 হে বন্ধু, বিদায়।
                  তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
   মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি
           যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
             হোক তব সন্ধ্যাবেলা,
                 পূজার সে খেলা
      ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
             তৃষার্ত আবেগ-বেগে
      ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
             তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
      যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
             তার সাথে দিব না মিশায়ে
      যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
             আজো তুমি নিজে
             হয়তো-বা করিবে রচন
      মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
      ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
             হে বন্ধু, বিদায়।
             মোর লাগি করিয়ো না শোক,
      আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
             মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই--
      শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
      উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
             সেই ধন্য করিবে আমাকে।
             শুক্লপক্ষ হতে আনি
             রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                      যে পারে সাজাতে
             অর্ঘ্যথালা  কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
             যে আমারে দেখিবারে পায়
                 অসীম ক্ষমায়
             ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি,
      এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                 তোমারে যা দিয়েছিনু তার
                 পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                 হেথা মোর তিলে তিলে দান,
      করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
             হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
                 ওগো তুমি নিরুপম,
                       হে ঐশ্বর্যবান,
             তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান--
                 গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                       হে বন্ধু, বিদায়।
                                          বন্যা
আরো দেখুন