মাস্টারমশায়
Stories
রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তাহার পাশে একটি কোট-হ্যাট-পরা বাঙালি বিলাতফের্তা যুবা সম্মুখের আসনে দুই পা তুলিয়া দিয়া একটু মদমত্ত অবস্থায় ঘাড় নামাইয়া ঘুমাইতেছিল। এই যুবকটি নূতন বিলাত হইতে আসিয়াছে। ইহারই অভ্যর্থনা উপলক্ষে বন্ধুমহলে একটা খানা হইয়া গেছে। সেই খানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্য নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, 'মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।'
মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন।
আরো দেখুন
প্রাণমন
Stories
আমার জানলার সামনে রাঙা মাটির রাস্তা।
ওখান দিয়ে বোঝাই নিয়ে গোরুর গাড়ি চলে; সাঁওতাল মেয়ে খড়ের আঁটি মাথায় করে হাটে যায়, সন্ধ্যাবেলায় কলহাস্যে ঘরে ফেরে।
আরো দেখুন
আমি এলেম তারি
Songs
আমি    এলেম তারি দ্বারে,    ডাক দিলেম অন্ধকারে    হা রে॥
     আগল ধরে দিলেম নাড়া--  প্রহরে গেল, পাই নি সাড়া,
          দেখতে পেলেম না যে তা রে   হা রে॥
তবে    যাবার আগে এখান থেকে    এই    লিখনখানি যাব রেখে--
     দেখা তোমার পাই বা না পাই    দেখতে এলেম জেনো গো তাই,
          ফিরে যাই সুদূরের পারে  হা রে॥
আরো দেখুন
স্বপ্ন
Verses
দূরে বহুদূরে
        স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে
খুঁজিতে গেছিনু কবে শিপ্রানদীপারে
মোর পূর্বজনমের প্রথমা প্রিয়ারে।
মুখে তার লোধ্ররেণু লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি কুরুবক মাথে,
তনু দেহে রক্তাম্বর নীবিবন্ধে বাঁধা,
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা আধা।
                বসন্তের দিনে
ফিরেছিনু বহুদূরে পথ চিনে চিনে।
       মহাকাল মন্দিরের মাঝে
তখন গম্ভীর মন্দ্রে সন্ধ্যারতি বাজে।
জনশূন্য পণ্যবীথি, ঊর্ধ্বে যায় দেখা
অন্ধকার হর্ম্য-'পরে সন্ধ্যারশ্মিরেখা।
              প্রিয়ার ভবন
বঙ্কিম সংকীর্ণ পথে দুর্গম নির্জন।
দ্বারে আঁকা শঙ্খ চক্র, তারি দুই ধারে
দুটি শিশু নীপতরু পুত্রস্নেহে বাড়ে।
       তোরণের স্বেতস্তম্ভ-'পরে
সিংহের গম্ভীর মূর্তি বসি দম্ভভরে।
প্রিয়ার কপোতগুলি ফিরে এল ঘরে,
ময়ূর নিদ্রায় মগ্ন স্বর্ণদণ্ড-'পরে।
       হেনকালে হাতে দীপশিখা
ধীরে ধীরে নামি এল মোর মালবিকা।
দেখা দিল দ্বারপ্রান্তে সোপানের-'পরে
সন্ধ্যার লক্ষ্মীর মতো সন্ধ্যাতারা করে।
অঙ্গের কুঙ্কুমগন্ধ কেশধূপবাস
ফেলিল সর্বাঙ্গে মোর উতলা নিশ্বাস।
প্রকাশিল অর্ধচ্যুত বসন-অন্তরে
চন্দনের পত্রলেখা বাম পয়োধরে।
       দাঁড়াইল প্রতিমার প্রায়
নগরগুঞ্জনক্ষান্ত নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়।
          মোরে হেরি প্রিয়া
ধীরে ধীরে দীপখানি দ্বারে নামাইয়া
আইল সম্মুখে--মোর হস্তে হস্ত রাখি
নীরবে শুধাল শুধু, সকরুণ আঁখি,
"হে বন্ধু আছ তো ভালো?' মুখে তার চাহি
কথা বলিবারে গেনু, কথা আর নাহি।
সে ভাষা ভুলিয়া গেছি, নাম দোঁহাকার
দুজনে ভাবিনু কত--মনে নাহি আর।
দুজনে ভাবিনু কত চাহি দোঁহা-পানে,
অঝোরে ঝরিল অশ্রু নিস্পন্দ নয়ানে।
দুজনে ভাবিনু কত দ্বারতরুতলে!
       নাহি জানি কখন কি ছলে
সুকোমল হাতখানি লুকাইল আসি
আমার দক্ষিণ করে কুলায়প্রত্যাশী
সন্ধ্যার পাখির মতো, মুখখানি তার
নতবৃন্তপদ্মসম এ বক্ষে আমার
নমিয়া পড়িল ধীরে, ব্যাকুল উদাস
নিঃশব্দে মিলিল আসি নিশ্বাসে নিশ্বাস।
          রজনীর অন্ধকার
উজ্জয়িনী করি দিল লুপ্ত একাকার।
          দীপ দ্বারপাশে
কখন নিবিয়া গেল দুরন্ত বাতাসে।
           শিপ্রানদীতীরে
আরতি থামিয়া গেল শিবের মন্দিরে।
আরো দেখুন
ডিটেকটিভ
Stories
আমি পুলিসের ডিটেকটিভ কর্মচারী।  আমার জীবনের দুটিমাত্র লক্ষ্য ছিল-- আমার স্ত্রী এবং আমার ব্যবসায়। পূর্বে একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে ছিলাম, সেখানে আমার স্ত্রীর প্রতি সমাদরের অভাব হওয়াতেই আমি দাদার সঙ্গে ঝগড়া করিয়া বাহির হইয়া আসি। দাদাই উপার্জন করিয়া আমাকে পালন করিতেছিলেন, অতএব সহসা সস্ত্রীক তাঁহার আশ্রয় ত্যাগ করিয়া আসা আমার পক্ষে দুঃসাহসের কাজ হইয়াছিল।
কিন্তু কখনো নিজের উপরে আমার বিশ্বাসের ত্রুটি ছিল না। আমি নিশ্চয় জানিতাম, সুন্দরী স্ত্রীকে যেমন বশ করিয়াছি বিমুখ অদৃষ্টলক্ষ্মীকেও তেমনি বশ করিতে পারিব। মহিমচন্দ্র এ সংসারে পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না।
আরো দেখুন
যাও রে অনন্তধামে
Songs
       যাও রে অনন্তধামে মোহ মায়া পাশরি
             দুঃখ আঁধার যেথা কিছুই নাহি।
       জরা নাহি, মরণ নাহি, শোক নাহি যে লোকে,
             কেবলি আনন্দস্রোত চলিছে প্রবাহি!
       যাও রে অনন্তধামে, অমৃতনিকেতনে,
             অমরগণ লইবে তোমা উদারপ্রাণে!
       দেব-ঋষি, রাজ-ঋষি, ব্রহ্ম-ঋষি যে লোকে
             ধ্যানভরে গান করে এক তানে!
       যাও রে অনন্তধামে জ্যোতির্ময় আলয়ে,
             শুভ্র সেই চিরবিমল পুণ্য কিরণে--
       যায় যেথা দানব্রত, সত্যব্রত, পুণ্যবান,
             যাও বৎস, যাও সেই দেবসদনে!
আরো দেখুন
পান্নালাল
Stories
দাদামশায়, তোমার পাগলের দলের মধ্যে পান্নালাল ছিল খুব নতুন রকমের।
জান, দিদি? তোমার পাগলরা প্রত্যেকেই নতুন, কারও সঙ্গে কারও মিল হয় না। যেমন তোমার দাদামশায়। বিধাতার নতুন পরীক্ষা। ছাঁচ তিনি ভেঙে ফেলেন। সাধারণ লোকের বুদ্ধিতে মিল হয়, অসাধারণ পাগলের মিল হয় না। তোমাকে একটা উদাহরণ দেখাই--
আরো দেখুন
গৃহশত্রু
Verses
আমি      একাকিনী যবে চলি রাজপথে
               নব অভিসারসাজে,
     নিশীথে নীরব নিখিল ভুবন,
     না গাহে বিহগ, না চলে পবন,
     মৌন সকল পৌর ভবন
               সুপ্তনগরমাঝে--
শুধু      আমার নূপুর আমারি চরণে
             বিমরি বিমরি বাজে।
     অধীর মুখর শুনিয়া সে স্বর
             পদে পদে মরি লাজে।
আমি      চরণশব্দ শুনিব বলিয়া
               বসি বাতায়নকাছে--
     অনিমেষ তারা নিবিড় নিশায়,
     লহরীর লেশ নাহি যমুনায়,
     জনহীন পথ আঁধারে মিশায়,
               পাতাটি কাঁপে না গাছে--
শুধু      আমারি উরসে আমারি হৃদয়
               উলসি বিলসি নাচে।
     উতলা পাগল করে কলরোল,
               বাঁধন টুটিলে বাঁচে।
আমি      কুসুমশয়নে মিলাই শরমে,
               মধুর মিলনরাতি--
     স্তব্ধ যামিনী ঢাকে চারিধার,
     নির্বাণ দীপ, রুদ্ধ দুয়ার,
     শ্রাবণগগন করে হাহাকার
               তিমিরশয়ন পাতি--
শুধু      আমার মানিক আমারি বক্ষে
               জ্বালায়ে রেখেছে বাতি।
     কোথায় লুকাই, কেমনে নিবাই
               নিলাজ ভূষণভাতি।
আমি      আমার গোপন মরমের কথা
               রেখেছি মরমতলে।
     মলয় কহিছে আপন কাহিনী,
     কোকিল গাহিছে আপন রাগিণী,
     নদী বহি চলে কাঁদি একাকিনী
               আপনার কলকলে--
শুধু      আমার কোলের আমারি বীণাটি
               গীতঝংকারছলে
     যে কথা যখন করিব গোপন
               সে কথা তখনি বলে।
আরো দেখুন
খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
Stories
রাইচরণ যখন বাবুদের বাড়ি প্রথম চাকরি করিতে আসে তখন তাহার বয়স বারো। যশোহর জিলায় বাড়ি, লম্বা চুল, বড়ো বড়ো চোখ, শ্যামচিক্কণ ছিপ্‌ছিপে বালক। জাতিতে কায়স্থ। তাহার প্রভুরাও কায়স্থ। বাবুদের এক-বৎসর-বয়স্ক একটি শিশুর রক্ষণ ও পালন-কার্যে সহায়তা করা তাহার প্রধান কর্তব্য ছিল।
সেই শিশুটি কালক্রমে রাইচরণের কক্ষ ছাড়িয়া স্কুলে, স্কুল ছাড়িয়া কলেজে, অবশেষে কলেজ ছাড়িয়া মুন্‌সেফিতে প্রবেশ করিয়াছে। রাইচরণ এখনো তাঁহার ভৃত্য।
আরো দেখুন
সংগীত
Verses
কেমন সুন্দর আহা ঘুমায়ে রয়েছে
চাঁদের জোছনা এই সমুদ্রবেলায়!
এসো প্রিয়ে এইখানে বসি কিছুকাল;
গীতস্বর মৃদু মৃদু পশুক শ্রবণে!
সুকুমার নিস্তব্ধতা আর নিশীথিনী--
সাজে ভালো মর্ম-ছোঁয়া সুধা-সংগীতেরে।
বইস জেসিকা, দেখো, গগন-প্রাঙ্গণ
জলৎ কাঞ্চন-পাতে খচিত কেমন!
এমন একটি নাই তারকামণ্ডল
দিব্য গীত যে না গায় প্রতি পদক্ষেপে!
অমর আত্মাতে হয় এমনি সংগীত।
কিন্তু ধূলিময় এই মর্ত্য-আবরণ
যতদিন রাখে তারে আচ্ছন্ন করিয়া
ততদিন সে সংগীত পাই না শুনিতে।
আরো দেখুন