রাজপথের কথা
Stories
আমি রাজপথ। অহল্যা যেমন মুনির শাপে পাষাণ হইয়া পড়িয়া ছিল, আমিও যেন তেমনি কাহার শাপে চিরনিদ্রিত সুদীর্ঘ অজগর সর্পের ন্যায় অরণ্যপর্বতের মধ্য দিয়া, বৃক্ষশ্রেণীর ছায়া দিয়া, সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরের বক্ষের উপর দিয়া দেশদেশান্তর বেষ্টন করিয়া বহুদিন ধরিয়া জড়শয়নে শয়ান রহিয়াছি। অসীম ধৈর্যের সহিত ধুলায় লুটাইয়া শাপান্তকালের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া আছি। আমি চিরদিন স্থির অবিচল, চিরদিন একই ভাবে শুইয়া আছি, কিন্তু তবুও আমার এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রাম নাই। এতটুকু বিশ্রাম নাই যে, আমার এই কঠিন শুষ্ক শয্যার উপরে একটিমাত্র কচি স্নিগ্ধ শ্যামল ঘাস উঠাইতে পারি; এতটুকু সময় নাই যে, আমার শিয়রের কাছে অতি ক্ষুদ্র একটি নীলবর্ণের বনফুল ফুটাইতে পারি। কথা কহিতে পারি না, অথচ অন্ধভাবে সকলই অনুভব করিতেছি। রাত্রিদিন পদশব্দ; কেবলই পদশব্দ। আমার এই গভীর জড়-নিদ্রার মধ্যে লক্ষ লক্ষ চরণের শব্দ অহর্নিশ দুঃস্বপ্নের ন্যায় আবর্তিত হইতেছে। আমি চরণের স্পর্শে হৃদয় পাঠ করিতে পারি। আমি বুঝিতে পারি, কে গৃহে যাইতেছে, কে বিদেশে যাইতেছে, কে কাজে যাইতেছে, কে বিশ্রামে যাইতেছে, কে উৎসবে যাইতেছে, কে শ্মশানে যাইতেছে। যাহার সুখের সংসার আছে, স্নেহের ছায়া আছে, সে প্রতি পদক্ষেপে সুখের ছবি আঁকিয়া আঁকিয়া চলে; সে প্রতি পদক্ষেপে মাটিতে আশার বীজ রোপিয়া রোপিয়া যায়, মনে হয় যেখানে যেখানে তাহার পা পড়িয়াছে, সেখানে যেন মুহূর্তের মধ্যে এক-একটি করিয়া লতা অঙ্কুরিত পুষ্পিত হইয়া উঠিবে। যাহার গৃহ নাই আশ্রয় নাই, তাহার পদক্ষেপের মধ্যে আশা নাই অর্থ নাই, তাহার পদক্ষেপের দক্ষিণ নাই, বাম নাই, তাহার চরণ যেন বলিতে থাকে, আমি চলিই বা কেন থামিই বা কেন, তাহার পদক্ষেপে আমার শুষ্ক ধূলি যেন আরো শুকাইয়া যায়।
পৃথিবীর কোনো কাহিনী আমি সম্পূর্ণ শুনিতে পাই না। আজ শত শত বৎসর ধরিয়া আমি কত লক্ষ লোকের কত হাসি কত গান কত কথা শুনিয়া আসিতেছি; কিন্তু কেবল খানিকটা মাত্র শুনিতে পাই। বাকিটুকু শুনিবার জন্য যখন আমি কান পাতিয়া থাকি, তখন দেখি সে লোক আর নাই। এমন কত বৎসরের কত ভাঙা কথা ভাঙা গান আমার ধূলির সহিত ধূলি হইয়া গেছে, আমার ধূলির সহিত উড়িয়া বেড়ায়, তাহা কি কেহ জানিতে পায়। ঐ শুন, একজন গাহিল, 'তারে বলি বলি আর বলা হল না।' -- আহা, একটু দাঁড়াও, গানটা শেষ করিয়া যাও, সব কথাটা শুনি। কই আর দাঁড়াইল। গাহিতে গাহিতে কোথায় চলিয়া গেল, শেষটা শোনা গেল না। ঐ একটিমাত্র পদ অর্ধেক রাত্রি ধরিয়া আমার কানে ধ্বনিত হইতে থাকিবে। মনে মনে ভাবিব, ও কে গেল। কোথায় যাইতেছে না জানি। যে কথাটা বলা হইল না, তাহাই কি আবার বলিতে যাইতেছে। এবার যখন পথে আবার দেখা হইবে, সে যখন মুখ তুলিয়া ইহার মুখের দিকে চাহিবে, তখন বলি বলি করিয়া আবার যদি বলা না হয়। তখন নত শির করিয়া মুখ ফিরাইয়া অতি ধীরে ধীরে ফিরিয়া আসিবার সময় আবার যদি গায় 'তারে বলি বলি আর বলা হল না'।
আরো দেখুন
অতিথি
Stories
কাঁঠালিয়ার জমিদার মতিলালবাবু নৌকা করিয়া সপরিবারে স্বদেশে যাইতেছিলেন। পথের মধ্যে মধ্যাহ্নে নদীতীরের এক গঞ্জের নিকট নৌকা বাঁধিয়া পাকের আয়োজন করিতেছেন এমন সময় এক ব্রাহ্মণবালক আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, 'বাবু, তোমরা যাচ্ছ কোথায়?'
প্রশ্নকর্তার বয়স পনেরো-ষোলোর অধিক হইবে না।
আরো দেখুন
চার অধ্যায়
Novels
এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে। তার মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার-বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না। বেহিসাবি মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে তিনি যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, শাসন করতেন অন্যায় করে, সন্দেহ করতেন অকারণে। মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ অবিমিশ্র সত্যকথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়। এজন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সব-চেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা তার স্বভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। তার মার কাছে মনে হয়েছে, এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।
একটা কথা সে বাল্যকাল থেকে বুঝেছে যে, দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন। ওদের পরিবারে যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী ছিল, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্পবয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।
প্রহরশেষের আলোয় রাঙা
সেদিন চৈত্রমাস,
তোমার চোখে দেখেছিলাম
আমার সর্বনাশ।"
Upwards
Towards the peaks,
Towards the stars,
Towards the vast silence."
আরো দেখুন
প্রায়শ্চিত্ত
Stories
স্বর্গ ও মর্তের মাঝখানে একটা অনির্দেশ্য অরাজক স্থান আছে যেখানে ত্রিশঙ্কু রাজা ভাসিয়া বেড়াইতেছেন, যেখানে আকাশকুসুমের অজস্র আবাদ হইয়া থাকে। সেই বায়ুদুর্গবেষ্টিত মহাদেশের নাম 'হইলে-হইতে-পারিত'। যাঁহারা মহৎ কার্য করিয়া অমরতা লাভ করিয়াছেন তাঁহারা ধন্য হইয়াছেন, যাঁহারা সামান্য ক্ষমতা লইয়া সাধারণ মানবের মধ্যে সাধারণভাবে সংসারের প্রাত্যহিক কর্তব্যসাধনে সহায়তা করিতেছেন তাঁহারাও ধন্য; কিন্তু যাঁহারা অদৃষ্টের ভ্রমক্রমে হঠাৎ দুয়ের মাঝখানে পড়িয়াছেন তাঁহাদের আর কোনো উপায় নাই। তাঁহারা একটা কিছু হইলে হইতে পারিতেন কিন্তু সেই কারণেই তাঁহাদের পক্ষে কিছু-একটা হওয়া সর্বাপেক্ষা অসম্ভব।
আমাদের অনাথবন্ধু সেই মধ্যদেশবিলম্বিত বিধিবিড়ম্বিত যুবক। সকলেরই বিশ্বাস, তিনি ইচ্ছা করিলে সকল বিষয়েই কৃতকার্য হইতে পারিতেন। কিন্তু কোনো কালে তিনি ইচ্ছাও করিলেন না এবং কোনো বিষয়ে তিনি কৃতকার্যও হইলেন না, এবং সকলের বিশ্বাস তাঁহার প্রতি অটল রহিয়া গেল। সকলে বলিল, তিনি পরীক্ষায় ফার্‌স্ট্‌ হইবেন; তিনি আর পরীক্ষা দিলেন না। সকলের বিশ্বাস চাকরিতে প্রবিষ্ট হইলে যে কোনো ডিপার্টমেন্টের উচ্চতম স্থান তিনি অনায়াসে গ্রহণ করিতে পারিবেন; তিনি কোনো চাকরিই গ্রহণ করিলেন না। সাধারণ লোকের প্রতি তাঁহার বিশেষ অবজ্ঞা, কারণ তাহারা অত্যন্ত সামান্য; অসাধারণ লোকের প্রতি তাঁহার কিছুমাত্র শ্রদ্ধা ছিল না, কারণ মনে করিলেই তিনি তাহাদের অপেক্ষা অসাধারণতর হইতে পারিতেন।
আরো দেখুন
গর্ব করে নিই নে ও নাম
Verses
       গর্ব করে নিই নে ও নাম, জান অন্তর্যামী,
              আমার মুখে তোমার নাম কি সাজে।
       যখন সবাই উপহাসে তখন ভাবি আমি
              আমার কণ্ঠে তোমার নাম কি বাজে।
                    তোমা হতে অনেক দূরে থাকি
                    সে যেন মোর জানতে না রয় বাকি,
       নামগানের এই ছদ্মবেশে দিই পরিচয় পাছে
              মনে মনে মরি যে সেই লাজে।
       অহংকারের মিথ্যা হতে বাঁচাও দয়া করে
              রাখো আমায় যেথা আমার স্থান।
       আর-সকলের দৃষ্টি হতে সরিয়ে দিয়ে মোরে
              করো তোমার নত নয়ন দান।
                    আমার পূজা দয়া পাবার তরে,
                    মান যেন সে না পায় করো ঘরে,
       নিত্য তোমায় ডাকি আমি ধুলার 'পরে বসে
              নিত্যনূতন অপরাধের মাঝে।
আরো দেখুন
ম্যানেজারবাবু
Stories
আজ তোমাকে যে গল্পটা বলব মনে করেছি সেটা তোমার ভালো লাগবে না।
তুমি বললেও ভালো লাগবে না কেন।
আরো দেখুন
অন্তরতম
Verses
আমি যে তোমায় জানি, সে তো কেউ   জানে না।
তুমি মোর পানে চাও, সে তো কেউ    মানে না।
        মোর মুখে পেলে তোমার আভাস
        কত জনে কত করে পরিহাস,
               পাছে সে না পারি সহিতে
         নানা ছলে তাই ডাকি যে তোমায়--
                কেহ কিছু নারে কহিতে।
         তোমার পথ যে তুমি চিনায়েছ
                সে কথা বলি নে কাহারে।
         সবাই ঘুমালে জনহীন রাতে
                একা আসি তব দুয়ারে।
         স্তব্ধ তোমার উদার আলয়,
         বীণাটি বাজাতে মনে করি ভয়,
                চেয়ে থাকি শুধু নীরবে।
         চকিতে তোমার ছায়া দেখি যদি
                ফিরে আসি তব গরবে।
         প্রভাত না হতে কখন আবার
                গৃহকোণ-মাঝে আসিয়া
         বাতায়নে বসি বিহ্বল বীণা
                বিজনে বাজাই হাসিয়া।
         পথ দিয়ে যে বা আসে যে বা যায়
         সহসা থমকি চমকিয়া চায়,
                মনে করে তারে ডেকেছি--
         জানে না তো কেহ কত নাম দিয়ে
                এক নামখানি ঢেকেছি।
         ভোরের গোলাপ সে গানে সহসা
                সাড়া দেয় ফুলকাননে,
         ভোরের তারাটি সে গানে জাগিয়া
                চেয়ে দেখে মোর আননে।
         সব সংসার কাছে আসে ঘিরে,
         প্রিয়জন সুখে ভাসে আঁখিনীরে,
                হাসি জেগে ওঠে ভবনে।
         যে নামে যে ছলে বীণাটি বাজাই
                সাড়া পাই সারা ভুবনে।
         নিশীথে নিশীথে বিপুল প্রাসাদে
                তোমার মহলে মহলে
         হাজার হাজার সোনার প্রদীপ
                জ্বলে অচপল অনলে।
         মোর দীপে জ্বেলে তাহারি আলোক
         পথ দিয়ে আসি, হাসে কত লোক,
               দূরে যেতে হয় পালায়ে--
         তাই তো শিখা সে ভবনশিখরে
               পারি নে রাখিতে জ্বালায়ে।
         বলি নে তো কারে, সকালে বিকালে
               তোমার পথের মাঝেতে
         বাঁশি বুকে লয়ে বিনা কাজে আসি
               বেড়াই ছদ্মসাজেতে।
         যাহা মুখে আসে গাই সেই গান
         নানা রাগিণীতে দিয়ে নানা তান,
               এক গান রাখি গোপনে।
         নানা মুখপানে আঁখি মেলি চাই,
               তোমা-পানে চাই স্বপনে।
আরো দেখুন
প্রথম চিঠি
Stories
বধূর সঙ্গে তার প্রথম মিলন, আর তার পরেই সে এই প্রথম এসেছে প্রবাসে।
চলে যখন আসে তখন বধূর লুকিয়ে কান্নাটি ঘরের আয়নার মধ্যে দিয়ে চকিতে ওর চোখে পড়ল।
আরো দেখুন
শুনি ক্ষণে ক্ষণে
Songs
শুনি      ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে    অতল জলের আহ্বান।
মন       রয় না, রয় না, রয় না ঘরে,    চঞ্চল প্রাণ॥
          ভাসায়ে দিব আপনারে,    ভরা জোয়ারে,
          সকল-ভাবনা-ডুবানো ধারায়    করিব স্নান--
               ব্যর্থ বাসনার দাহ হবে নির্বাণ॥
                    ঢেউ দিয়েছে জলে।
          ঢেউ দিল, ঢেউ দিল,    ঢেউ দিল আমার মর্মতলে।
          এ কী ব্যাকুলতা আজি আকাশে,    এই বাতাসে,
          যেন উতলা অপ্সরীর উত্তরীয়    করে রোমাঞ্চদান--
               দূর সিন্ধুতীরে কার মঞ্জীরে    গুঞ্জরতান॥
আরো দেখুন