মহামায়া
Stories
মহামায়া এবং রাজীবলোচন উভয়ে নদীর ধারে একটা ভাঙা মন্দিরে সাক্ষাৎ করিল।
মহামায়া কোনো কথা না বলিয়া তাহার স্বাভাবিক গম্ভীর দৃষ্টি ঈষৎ ভর্ৎসনার ভাবে রাজীবের প্রতি নিক্ষেপ করিল। তাহার মর্ম এই, তুমি কী সাহসে আজ অসময়ে আমাকে এখানে আহ্বান করিয়া আনিয়াছ। আমি এ পর্যন্ত তোমার সকল কথা শুনিয়া আসিতেছি বলিয়াই তোমার এতদূর স্পর্ধা বাড়িয়া উঠিয়াছে?
আরো দেখুন
উৎসর্গ
Stories
শেষ পারানির খেয়ায় তুমি
    দিনশেষের নেয়ে
আরো দেখুন
পরী
Stories
কুসমি বললে, তুমি বড্ড বানিয়ে কথা বল। একটা সত্যিকার গল্প শোনাও-না।
আমি বললুম, জগতে দুরকম পদার্থ আছে। এক হচ্ছে সত্য, আর হচ্ছে--আরও-সত্য। আমার কারবার আরও-সত্যকে নিয়ে।
আরো দেখুন
চার অধ্যায়
Novels
এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে। তার মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার-বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না। বেহিসাবি মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে তিনি যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, শাসন করতেন অন্যায় করে, সন্দেহ করতেন অকারণে। মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ অবিমিশ্র সত্যকথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়। এজন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সব-চেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা তার স্বভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। তার মার কাছে মনে হয়েছে, এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।
একটা কথা সে বাল্যকাল থেকে বুঝেছে যে, দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন। ওদের পরিবারে যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী ছিল, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্পবয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।
প্রহরশেষের আলোয় রাঙা
সেদিন চৈত্রমাস,
তোমার চোখে দেখেছিলাম
আমার সর্বনাশ।"
Upwards
Towards the peaks,
Towards the stars,
Towards the vast silence."
আরো দেখুন
কর্তার ভূত
Stories
বুড়ো কর্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠল, 'তুমি গেলে আমাদের কী দশা হবে।'
শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাবলে, 'আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখবে কে।'
আরো দেখুন
রীতিমত নভেল
Stories
'আল্লা হো আকবর' শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিনসহস্র আর্যসৈন্য। বন্যার মধ্যে একাকী অশ্বত্থবৃক্ষের মতো হিন্দুবীরগণ সমস্ত রাত্রি এবং সমস্ত দিন যুদ্ধ করিয়া অটল দাঁড়াইয়া ছিল কিন্তু এইবার ভাঙিয়া পড়িবে, তাহার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। এবং সেইসঙ্গে ভারতের জয়ধ্বজা ভূমিসাৎ হইবে এবং আজিকার ঐ অস্তাচলবর্তী সহস্ররশ্মির সহিত হিন্দুস্থানের গৌরবসূর্য চিরদিনের মতো অস্তমিত হইবে।
হর হর বোম্‌ বোম্‌! পাঠক বলিতে পার, কে ঐ দৃপ্ত যুবা পঁয়ত্রিশজন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করনিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রুসৈন্যের উপরে আসিয়া পতিত হইল? বলিতে পার, কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবনসৈন্য প্রচণ্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল?-- কাহার বজ্রমন্দ্রিত 'হর হর বোম্‌ বোম্‌' শব্দে তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের 'আল্লা হো আকবর' ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল? কাহার উদ্যত অসির সম্মুখে ব্যাঘ্র-আক্রান্ত মেষষুথের ন্যায় শত্রুসৈন্য মুহূর্তের মধ্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়নপর হইল? বলিতে পার, সেদিনকার আর্যস্থানের সূর্যদেব সহস্ররক্তকরস্পর্শে কাহার রক্তাক্ত তরবারিকে আশীর্বাদ করিয়া অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে গেলেন? বলিতে পার কি পাঠক।
আরো দেখুন
ভালোমানুষ
Stories
ছিঃ, আমি নেহাত ভালোমানুষ।
কুসমি বললে, কী যে তুমি বল তার ঠিক নেই। তুমি যে ভালোমানুষ সেও কি বলতে হবে। কে না জানে, তুমি ও পাড়ার লোটনগুণ্ডার দলের সর্দার নও। ভালোমানুষ তুমি বল কাকে।
আরো দেখুন
নদী
Verses
ওরে         তোরা কি জানিস কেউ
জলে         কেন ওঠে এত ঢেউ।
ওরা         দিবস-রজনী নাচে,
তাহা        শিখেছে কাহার কাছে।
শোন্‌        চলচল্‌  ছলছল্‌
সদাই        গাহিয়া চলেছে জল।
ওরা         কারে ডাকে বাহু তুলে,
ওরা         কার কোলে ব'সে দুলে।
সদা         হেসে করে লুটোপুটি,
চলে        কোন্‌খানে ছুটোছুটি।
ওরা         সকলের মন তুষি
আছে       আপনার মনে খুশি।
আমি       বসে বসে তাই ভাবি,
নদী        কোথা হতে এল নাবি।
কোথায়   পাহাড় সে কোন্‌খানে,
তাহার     নাম কি কেহই জানে।
কেহ       যেতে পারে তার কাছে,
সেথায়     মানুষ কি কেউ আছে।
সেথা       নাহি তরু নাহি ঘাস,
নাহি       পশুপাখিদের বাস,
সেথা      শবদ কিছু না শুনি,
পাহাড়     বসে আছে মহামুনি।
তাহার     মাথার উপরে শুধু
সাদা        বরফ করিছে ধু ধু।
সেথা       রাশি রাশি মেঘ যত
থাকে      ঘরের ছেলের মতো।
শুধু        হিমের মতন হাওয়া
সেথায়     করে সদা আসা-যাওয়া,
শুধু        সারা রাত তারাগুলি
তারে      চেয়ে দেখে আঁখি খুলি।
শুধু        ভোরের কিরণ এসে
তারে      মুকুট পরায় হেসে।
সেই       নীল আকাশের পায়ে
সেথা      কোমল মেঘের গায়ে
সেথা      সাদা বরফের বুকে
নদী       ঘুমায় স্বপনসুখে।
কবে      মুখে তার রোদ লেগে
নদী       আপনি উঠিল জেগে,
কবে      একদা রোদের বেলা
তাহার    মনে পড়ে গেল খেলা।
সেখায়    একা ছিল দিনরাতি,
কেহই     ছিল না খেলার সাথি।
সেথায়     কথা নাহি কারো ঘরে,
সেথায়     গান কেহ নাহি করে।
তাই       ঝুরু ঝুরু ঝিরি ঝিরি।
নদী        বাহিরিল ধীরি ধীরি।
মনে        ভাবিল, যা আছে ভবে
সবই       দেখিয়া লইতে হবে।
নীচে      পাহাড়ের বুক জুড়ে
গাছ       উঠেছে আকাশ ফুঁড়ে।
তারা      বুড়ো বুড়ো তরু যত
তাদের    বয়স কে জানে কত।
তাদের    খোপে খোপে গাঁঠে গাঁঠে
পাখি       বাসা বাঁধে কুটো-কাঠে।
তারা       ডাল তুলে কালো কালো
আড়াল     করেছে রবির আলো।
তাদের     শাখায় জটার মতো
ঝুলে      পড়েছে শেওলা যত।
তারা       মিলায়ে মিলায়ে কাঁধ
যেন        পেতেছে আঁধার-ফাঁদ।
তাদের     তলে তলে নিরিবিলি
নদী        হেসে চলে খিলিখিলি।
তারে      কে পারে রাখিতে ধরে,
সে যে     ছুটোছুটি যায় সরে।
সে যে      সদা খেলে লুকোচুরি,
তাহার    পায়ে পায়ে বাজে নুড়ি।
পথে       শিলা আছে রাশি রাশি,
তাহা      ঠেলে চলে হাসি হাসি।
পাহাড়     যদি থাকে পথ জুড়ে  
নদী        হেসে যায় বেঁকেচুরে।
সেথায়    বাস করে শিং-তোলা
যত       বুনো ছাগ দাড়ি-ঝোলা।
সেথায়    হরিণ রোঁয়ায় ভরা
তারা      কারেও দেয় না ধরা।
সেথায়     মানুষ নূতনতর,
তাদের     শরীর কঠিন বড়ো।
তাদের     চোখ দুটো নয় সোজা,
তাদের     কথা নাহি যায় বোঝা।
তারা       পাহাড়ের ছেলেমেয়ে
সদাই       কাজ করে গান গেয়ে।
তারা       সারা দিনমান খেটে
আনে      বোঝাভরা কাঠ কেটে।
তারা       চড়িয়া শিখর-'পরে
বনের      হরিণ শিকার করে।
নদী         যত আগে আগে চলে
ততই      সাথি জোটে দলে দলে।
তারা       তারি মতো, ঘর হতে
সবাই       বাহির হয়েছে পথে।
পায়ে       ঠুনু ঠুনু বাজে নুড়ি,
যেন        বাজিতেছে মল চুড়ি।
গায়ে       আলো করে ঝিকিঝিক,
যেন        পরেছে হীরার চিক।
মুখে       কলকল কত ভাষে
এত        কথা কোথা হতে আসে।
শেষে       সখীতে সখীতে মেলি
হেসে       গায়ে গায়ে হেলাহেলি।
শেষে       কোলাকুলি কলরবে
তারা       এক হয়ে যায় সবে।
তখন       কলকল ছুটে জল--
কাঁপে       টলমল ধরাতল,
কোথাও    নীচে পড়ে ঝরঝর--
পাথর       কেঁপে ওঠে থরথর,
শিলা        খান্‌ খান্‌ যায় টুটে--
নদী         চলে পথ কেটে কুটে।
ধারে        গাছগুলো বড়ো বড়ো
তারা        হয়ে পড়ে পড়ো-পড়ো।
কত        বড়ো পাথরের চাপ
জলে       খসে পড়ে ঝুপঝাপ।
তখন      মাটি-গোলা ঘোলা জলে
ফেনা      ভেসে যায় দলে দলে।
জলে       পাক ঘুরে ঘুরে ওঠে,
যেন       পাগলের মতো ছোটে।
শেষে      পাহাড় ছাড়িয়ে এসে
নদী        পড়ে বাহিরের দেশে।
হেথা       যেখানে চাহিয়া দেখে
চোখে      সকলি নূতন ঠেকে।
হেথা       চারি দিকে খোলা মাঠ,
হেথা       সমতল পথঘাট।
কোথাও    চাষিরা করিছে চাষ,
কোথাও    গোরুতে খেতেছে ঘাস।
কোথাও    বৃহৎ অশথ গাছে
পাখি        শিস দিয়ে দিয়ে নাচে।
কোথাও     রাখাল ছেলের দলে
খেলা        করিছে গাছের তলে।
কোথাও     নিকটে গ্রামের মাঝে
লোকে      ফিরিছে নানান কাজে।
কোথাও     বাধা কিছু নাহি পথে,
নদী          চলেছে আপন মতে।
পথে        বরষার জলধারা
আসে       চারি দিক হতে তারা,
নদী         দেখিতে দেখিতে বাড়ে,
এখন       কে রাখে ধরিয়া তারে।
তাহার      দুই কূলে উঠে ঘাস,
সেথায়     যতেক বকের বাস।
সেথা        মহিষের দল থাকে,
তারা        লুটায় নদীর পাঁকে।
যত         বুনো বরা সেথা ফেরে
তারা        দাঁত দিয়ে মাটি চেরে।
সেথা       শেয়াল লুকায়ে থাকে,
রাতে       হুয়া হুয়া করে ডাকে।
দেখে        এইমতো কত দেশ,
কে বা       গনিয়া করিবে শেষ।
কোথাও    কেবল বালির ডাঙা,
কোথাও    মাটিগুলো রাঙা রাঙা,
কোথাও    ধারে ধারে উঠে বেত,
কোথাও    দুধারে গমের খেত।
কোথাও    ছোটোখাটো গ্রামখানি,
কোথাও    মাথা তোলে রাজধানী--
সেথায়      নবাবের বড়ো কোঠা,
তারি       পাথরের থাম মোটা।
তারি        ঘাটের সোপান যত,
জলে        নামিয়াছে শত শত।
কোথাও     সাদা পাথরের পুলে
নদী          বাঁধিয়াছে দুই কূলে।
কোথাও     লোহার সাঁকোয় গাড়ি
চলে          ধকো ধকো ডাক ছাড়ি।
নদী          এইমতো অবশেষে
এল          নরম মাটির দেশে।
হেথা        যেথায় মোদের বাড়ি
নদী         আসিল দুয়ারে তারি।
হেথায়      নদী নালা বিল খালে
দেশ        ঘিরেছে জলের জালে।
কত        মেয়েরা নাহিছে ঘাটে,
কত        ছেলেরা সাঁতার কাটে;
কত        জেলেরা ফেলিছে জাল,
কত        মাঝিরা ধরেছে হাল,
সুখে        সারিগান গায় দাঁড়ি,
কত        খেয়া-তরী দেয় পাড়ি।
কোথাও    পুরাতন শিবালয়
তীরে       সারি সারি জেগে রয়।
সেথায়      দু-বেলা সকালে সাঁঝে
পূজার      কাঁসর-ঘণ্টা বাজে।
কত         জটাধারী ছাইমাখা
ঘাটে        বসে আছে যেন আঁকা।
তীরে       কোথাও বসেছে হাট,
নৌকা       ভরিয়া রয়েছে ঘাট।
মাঠে        কলাই সরিষা ধান,
তাহার      কে করিবে পরিমাণ।
কোথাও    নিবিড় আখের বনে
শালিক      চরিছে আপন মনে।
কোথাও    ধু ধু করে বালুচর
সেথায়      গাঙশালিকের ঘর।
সেথায়      কাছিম বালির তলে
আপন      ডিম পেড়ে আসে চলে।
সেথায়      শীতকালে বুনো হাঁস
কত        ঝাঁকে ঝাঁকে করে বাস।
সেথায়     দলে দলে চখাচখী
করে       সারাদিন বকাবকি।
সেথায়     কাদাখোঁচা তীরে তীরে
কাদায়      খোঁচা দিয়ে দিয়ে ফিরে।
কোথাও   ধানের খেতের ধারে
ঘন        কলাবন বাঁশঝাঁড়ে
ঘন        আম-কাঁঠালের বনে
গ্রাম       দেখা যায় এক কোণে।
সেথা      আছে ধান গোলাভরা,
সেথা      খড়গুলা রাশ-করা।
সেথা      গোয়ালেতে গোরু বাঁধা
কত       কালো পাটকিলে সাদা।
কোথাও   কলুদের কুঁড়েখানি,
সেথায়     ক্যাঁ কোঁ ক'রে ঘোরে ঘানি।
কোথাও   কুমারের ঘরে চাক,
দেয়        সারাদিন ধরে পাক।
মুদি        দোকানেতে সারাখন  
বসে        পড়িতেছে রামায়ণ।
কোথাও    বসি পাঠশালা-ঘরে
যত        ছেলেরা চেঁচিয়ে পড়ে,
বড়ো       বেতখানি লয়ে কোলে
ঘুমে       গুরুমহাশয় ঢোলে।
হেথায়     এঁকে বেঁকে ভেঙে চুরে
গ্রামের     পথ গেছে বহু দূরে।
সেথায়     বোঝাই গোরুর গাড়ি
ধীরে       চলিয়াছে ডাক ছাড়ি।
রোগা      গ্রামের কুকুরগুলো
ক্ষুধায়     শুঁকিয়া বেড়ায় ধুলো।
যেদিন     পুরনিমা রাতি আসে
চাঁদ        আকাশ জুড়িয়া হাসে।
বনে        ও পারে আঁধার কালো,
জলে       ঝিকিমিকি করে আলো।
বালি       চিকিচিকি করে চরে,
ছায়া       ঝোপে বসি থাকে ডরে।
সবাই      ঘুমায় কুটিরতলে,
তরী       একটিও নাহি চলে।
গাছে       পাতাটিও নাহি নড়ে,
জলে       ঢেউ নাহি ওঠে পড়ে।
কভু       ঘুম যদি যায় ছুটে
কোকিল   কুহু কুহু গেয়ে উঠে,
কভু       ও পারে চরের পাখি
রাতে      স্বপনে উঠিছে ডাকি।
নদী        চলেছে ডাহিনে বামে,
কভু       কোথাও সে নাহি থামে।
সেথায়     গহন গভীর বন,
তীরে      নাহি লোক নাহি জন।
শুধু        কুমির নদীর ধারে
সুখে       রোদ পোহাইছে পাড়ে।
বাঘ        ফিরিতেছে ঝোপে ঝাপে,
ঘাড়ে       পড়ে আসি এক লাফে।
কোথাও   দেখা যায় চিতাবাঘ,
তাহার     গায়ে চাকা চাকা দাগ।
রাতে      চুপিচুপি আসে ঘাটে,
জল        চকো চকো করি চাটে।
হেথায়     যখন জোয়ার ছোটে,
নদী        ফুলিয়ে ঘুলিয়ে ওঠে।
তখন      কানায় কানায় জল,
কত       ভেসে আসে ফুল ফল।
ঢেউ       হেসে ওঠে খলখল,
তরী       করি ওঠে টলমল।
নদী        অজগরসম ফুলে
গিলে       খেতে চায় দুই কূলে।
আবার     ক্রমে আসে ভাঁটা পড়ে,
তখন      জল যায় সরে সরে।
তখন      নদী রোগা হয়ে আসে,
কাদা       দেখা দেয় দুই পাশে।
বেরোয়    ঘাটের সোপান যত
যেন        বুকের হাড়ের মতো।
নদী        চলে যায় যত দূরে
ততই      জল ওঠে পুরে পুরে।
শেষে      দেখা নাহি যায় কূল,
চোখে      দিক হয়ে যায় ভুল।
নীল        হয়ে আসে জলধারা,
মুখে       লাগে যেন নুন-পারা।
ক্রমে       নীচে নাহি পাই তল,
ক্রমে       আকাশে মিশায় জল,
ডাঙা       কোন্‌খানে পড়ে রয়--
শুধু        জলে জলে জলময়।
ওরে       একি শুনি কোলাহল,
হেরি       একি ঘন নীল জল।
ওই         বুঝি রে সাগর হোথা,
উহার      কিনারা কে জানে কোথা।
ওই         লাখো লাখো ঢেউ উঠে
সদাই       মরিতেছে মাথা কুটে।
ওঠে        সাদা সাদা ফেনা যত
যেন        বিষম রাগের মতো।
জল        গরজি গরজি ধায়,
যেন        আকাশ কাড়িতে চায়।
বায়ু        কোথা হতে আসে ছুটে,
ঢেউয়ে    হাহা করে পড়ে লুটে।
যেন        পাঠশালা-ছাড়া ছেলে
ছুটে        লাফায়ে বেড়ায় খেলে।
হেথা       যতদূর পানে চাই
কোথাও   কিছু নাই, কিছু নাই।
শুধু        আকাশ বাতাস জল,
শুধুই      কলকল কোলাহল,
শুধু        ফেনা আর শুধু ঢেউ--
আর       নাহি কিছু নাহি কেউ।
হেথায়    ফুরাইল সব দেশ,
নদীর      ভ্রমণ হইল শেষ।
হেথা      সারাদিন সারাবেলা
তাহার    ফুরাবে না আর খেলা।
তাহার    সারাদিন নাচ গান
কভু      হবে নাকো অবসান।
এখন      কোথাও হবে না যেতে,
সাগর     নিল তারে বুক পেতে।
তারে     নীল বিছানায় থুয়ে
তাহার    কাদামাটি দিবে ধুয়ে।
তারে     ফেনার কাপড়ে ঢেকে,
তারে     ঢেউয়ের দোলায় রেখে,
তার      কানে কানে গেয়ে সুর
তার      শ্রম করি দিবে দূর।
নদী       চিরদিন চিরনিশি
রবে       অতল আদরে মিশি।
আরো দেখুন
পাত্রখানা যায় যদি
Songs
                   পাত্রখানা যায় যদি যাক ভেঙেচুরে--
আছে             অঞ্জলি মোর, প্রসাদ দিয়ে দাও-না পুরে ॥
                   সহজ সুখের সুধা তাহার মূল্য তো নাই,
                   ছড়াছড়ি যায় সে-যে ওই যেখানে চাই--
                   বড়ো-আপন কাছের জিনিস রইল দূরে।
                   হৃদয় আমার সহজ সুধায় দাও-না পুরে ॥
বারে বারে চাইব না আর মিথ্যা টানে
ভাঙন-ধরা আঁধার-করা পিছন-পানে।
          বাসা বাঁধার বাঁধনখানা যাক-না টুটে,
          অবাধ পথের শূন্যে আমি চলব ছুটে।
                   শূন্য-ভরা তোমার বাঁশির সুরে সুরে
                   হৃদয় আমার সহজ সুধায় দাও-না পুরে ॥
আরো দেখুন
বিচারক
Stories
অনেক অবস্থান্তরের পর অবশেষে গতযৌবনা ক্ষীরোদা যে পুরুষের আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়াছিল সেও যখন তাহাকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া গেল, তখন অন্নমুষ্টির জন্য দ্বিতীয় আশ্রয় অন্বেষণের চেষ্টা করিতে তাহার অত্যন্ত ধিক্‌কার বোধ হইল।
যৌবনের শেষে শুভ্র শরৎকালের ন্যায় একটি গভীর প্রশান্ত প্রগাঢ় সুন্দর বয়স আসে যখন জীবনের ফল ফলিবার এবং শস্য পাকিবার সময়। তখন আর উদ্দাম যৌবনের বসন্তচঞ্চলতা শোভা পায় না। ততদিনে সংসারের মাঝখানে আমাদের ঘর বাঁধা একপ্রকার সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে; অনেক ভালোমন্দ, অনেক সুখদুঃখ, জীবনের মধ্যে পরিপাক প্রাপ্ত হইয়া অন্তরের মানুষটিকে পরিণত করিয়া তুলিয়াছে; আমাদের আয়ত্তের অতীত কুহকিনী দুরাশার কল্পনালোক হইতে সমস্ত উদ্‌ভ্রান্ত বাসনাকে প্রত্যাহরণ করিয়া আপন ক্ষুদ্র ক্ষমতার গৃহপ্রাচীরমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি; তখন নূতন প্রণয়ের মুগ্ধদৃষ্টি আর আকর্ষণ করা যায় না, কিন্তু পুরাতন লোকের কাছে মানুষ আরো প্রিয়তর হইয়া উঠে। তখন যৌবনলাবণ্য অল্পে অল্পে বিশীর্ণ হইয়া আসিতে থাকে, কিন্তু জরাবিহীন অন্তরপ্রকৃতি বহুকালের সহবাসক্রমে মুখে চক্ষে যেন স্ফুটতর রূপে অঙ্কিত হইয়া যায়, হাসিটি দৃষ্টিপাতটি কণ্ঠস্বরটি ভিতরকার মানুষটির দ্বারা ওতপ্রোত হইয়া উঠে। যাহা-কিছু পাই নাই তাহার আশা ছাড়িয়া, যাহারা ত্যাগ করিয়া গিয়াছে তাহাদের জন্য শোক সমাপ্ত করিয়া, যাহারা বঞ্চনা করিয়াছে তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া-- যাহারা কাছে আসিয়াছে, ভালোবাসিয়াছে, সংসারের সমস্ত ঝড়ঝঞ্ঝা শোকতাপ বিচ্ছেদের মধ্যে যে কয়টি প্রাণী নিকটে অবশিষ্ট রহিয়াছে তাহাদিগকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া সুনিশ্চিত সুপরীক্ষিত চিরপরিচিতগণের প্রীতিপরিবেষ্টনের মধ্যে নিরাপদ নীড় রচনা করিয়া তাহারই মধ্যে সমস্ত চেষ্টার অবসান এবং সমস্ত আকাঙক্ষার পরিতৃপ্তি লাভ করা যায়। যৌবনের সেই স্নিগ্ধ সায়াহ্নে জীবনের সেই শান্তিপর্বেও যাহাকে নূতন সঞ্চয়, নূতন পরিচয়, নূতন বন্ধনের বৃথা আশ্বাসে নূতন চেষ্টায় ধাবিত হইতে হয়-- তখনো যাহার বিশ্রামের জন্য শয্যা রচিত হয় নাই, যাহার গৃহপ্রত্যাবর্তনের জন্য সন্ধ্যাদীপ প্রজ্জ্বলিত হয় নাই, সংসারে তাহার মতো শোচনীয় আর কেহ নাই।
আরো দেখুন