শাস্তি
Stories
দুখিরাম রুই এবং ছিদাম রুই দুই ভাই সকালে যখন দা হাতে লইয়া জন খাটিতে বাহির হইল তখন তাহাদের দুই স্ত্রীর মধ্যে বকাবকি চেঁচামেচি চলিতেছে। কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য নানাবিধ নিত্য কলরবের ন্যায় এই কলহ-কোলাহলও পাড়াসুদ্ধ লোকের অভ্যাস হইয়া গেছে। তীব্র কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র লোকে পরস্পরকে বলে--'ওই রে বাধিয়া গিয়াছে,' অর্থাৎ যেমনটি আশা করা যায় ঠিক তেমনিটি ঘটিয়াছে, আজও স্বভাবের নিয়মের কোনোরূপ ব্যত্যয় হয় নাই। প্রভাতে পূর্বদিকে সূর্য উঠিলে যেমন কেহ তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করে না, তেমনি এই কুরিদের বাড়িতে দুই জায়ের মধ্যে যখন একটা হৈ-হৈ পড়িয়া যায় তখন তাহার কারণ নির্ণয়ের জন্য কাহারও কোনোরূপ কৌতূহলের উদ্রেক হয় না।
অবশ্য এই কোন্দল আন্দোলন প্রতিবেশীদের অপেক্ষা দুই স্বামীকে বেশি স্পর্শ করিত সন্দেহ নাই, কিন্তু সেটা তাহারা কোনোরূপ অসুবিধার মধ্যে গণ্য করিত না। তাহারা দুই ভাই যেন দীর্ঘ সংসারপথ একটা এক্কাগাড়িতে করিয়া চলিয়াছে, দুই দিকের দুই স্প্রিংবিহীন চাকার অবিশ্রাম ছড়ছড় খড়খড় শব্দটাকে জীবনরথযাত্রার একটা বিধিবিহিত নিয়মের মধ্যেই ধরিয়া লইয়াছে।
আরো দেখুন
মাস্টারমশায়
Stories
রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তাহার পাশে একটি কোট-হ্যাট-পরা বাঙালি বিলাতফের্তা যুবা সম্মুখের আসনে দুই পা তুলিয়া দিয়া একটু মদমত্ত অবস্থায় ঘাড় নামাইয়া ঘুমাইতেছিল। এই যুবকটি নূতন বিলাত হইতে আসিয়াছে। ইহারই অভ্যর্থনা উপলক্ষে বন্ধুমহলে একটা খানা হইয়া গেছে। সেই খানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্য নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, 'মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।'
মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন।
আরো দেখুন
পট
Stories
যে শহরে অভিরাম দেবদেবীর পট আঁকে, সেখানে কারো কাছে তার পূর্বপরিচয় নেই। সবাই জানে, সে বিদেশী, পট আঁকা তার চিরদিনের ব্যাবসা।
সে মনে ভাবে, 'ধনী ছিলেম, ধন গিয়েছে, হয়েছে ভালো। দিনরাত দেবতার রূপ ভাবি, দেবতার প্রসাদে খাই, আর ঘরে ঘরে দেবতার প্রতিষ্ঠা করি। আমার এই মান কে কাড়তে পারে।'
আরো দেখুন
মাল্যদান
Stories
সকালবেলায় শীত-শীত ছিল। দুপুরবেলায় বাতাসটি অল্প-একটু তাতিয়া উঠিয়া দক্ষিণ দিক হইতে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে।
যতীন যে বারান্দায় বসিয়া ছিল সেখান হইতে বাগানের এক কোণে এক দিকে একটি কাঁঠাল ও আর-এক দিকে একটি শিরীষগাছের মাঝখানের ফাঁক দিয়া বাহিরের মাঠ চোখে পড়ে। সেই শূন্য মাঠ ফাল্গুনের রৌদ্রে ধুধু করিতেছিল। তাহারই একপ্রান্ত দিয়া কাঁচা পথ চলিয়া গেছে -- সেই পথ বাহিয়া বোঝাই-খালাস গোরুর গাড়ি মন্দগমনে গ্রামের দিকে ফিরিয়া চলিয়াছে, গাড়োয়ান মাথায় গামছা ফেলিয়া অত্যন্ত বেকারভাবে গান গহিতেছে।
আরো দেখুন
সে
Stories
সুহৃদ্বর শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য
করতলযুগলেষু
আরো দেখুন
ওই অমল হাতে রজনী প্রাতে
Verses
ওই          অমল হাতে  রজনী প্রাতে
               আপনি জ্বাল'
          এই তো আলো--
                   এই তো আলো।
          এই তো প্রভাত, এই তো আকাশ,
          এই তো পূজার পুষ্পবিকাশ,
          এই তো বিমল, এই তো মধুর,
                   এই তো ভালো--
         এই তো আলো--
                   এই তো আলো।
          আঁধার মেঘের বক্ষে জেগে
                         আপনি জ্বাল'
          এই তো আলো--
                   এই তো আলো।
          এই তো ঝঞ্ঝা তড়িৎ-জ্বালা,
          এই তো দুখের অগ্নিমালা,
          এই তো মুক্তি, এই তো দীপ্তি,
                   এই তো ভালো--
          এই তো আলো--
                   এই তো আলো।
আরো দেখুন
নিঃশেষ
Verses
শরৎবেলার বিত্তবিহীন মেঘ
          হারায়েছে তার ধারাবর্ষণ-বেগ;
ক্লান্তি-আলসে যাত্রার পথে দিগন্ত আছে চুমি,
          অঞ্জলি তব বৃথা তুলিয়াছ হে তরুণী বনভূমি।
শান্ত হয়েছে দিক্‌হারা তার ঝড়ের মত্ত লীলা,
          বিদ্যুৎপ্রিয়া স্মৃতির গভীরে হল অন্তঃশীলা
সময় এসেছে, নির্জনগিরিশিরে
          কালিমা ঘুচায়ে শুভ্র তুষারে মিশে যাবে ধীরে ধীরে।
অস্তসাগরপশ্চিমপারে সন্ধ্যা নামিবে যবে
          সপ্তঋষির নীরব বীণার রাগিণীতে লীন হবে।
                 তবু যদি চাও শেষদান তার পেতে,
ওই দেখো ভরা খেতে
                 পাকা ফসলের দোদুল্য অঞ্চলে
          নিঃশেষে তার সোনার অর্ঘ্য রেখে গেছে ধরাতলে।
                 সে কথা স্মরিয়ো, চলে যেতে দিয়ো তারে--
          লজ্জা দিয়ো না নিঃস্ব দিনের নিঠুর রিক্ততারে।
আরো দেখুন
কৃষ্ণকলি আমি তারেই
Songs
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,   কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে   কালো মেঘের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,   মুক্তবেণী পিঠের 'পরে লোটে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,   দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
   
ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে   ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই,
শ্যামা মেয়ে ব্যস্ত ব্যাকুল পদে   কুটির হতে ত্রস্ত এল তাই।
আকাশ-পানে হানি যুগল ভুরু   শুনলে বারেক মেঘের গুরুগুরু।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,   দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
   
পূবে বাতাস এল হঠাৎ ধেয়ে,   ধানের ক্ষেতে খেলিয়ে গেল ঢেউ।
আলের ধারে দাঁড়িয়েছিলেম একা,   মাঠের মাঝে আর ছিল না কেউ।
আমার পানে দেখলে কি না চেয়ে   আমি জানি আর জানে সেই মেয়ে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,   দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
   
এমনি করে কালো কাজল মেঘ   জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া   আষাঢ় মাসে নামে তমাল-বনে।
এমনি করে শ্রাবণ-রজনীতে   হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,   দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ।
   
কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি,   আর যা বলে বলুক অন্য লোক।
দেখেছিলেম ময়নাপাড়ার মাঠে   কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
মাথার 'পরে দেয় নি তুলে বাস,   লজ্জা পাবার পায় নি অবকাশ।
কালো? তা সে যতই কালো হোক,   দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ॥
আরো দেখুন
পয়লা নম্বর
Stories
আমি তামাকটা পর্যন্ত খাই নে। আমার এক অভ্রভেদী নেশা আছে, তারই আওতায় অন্য সকল নেশা একেবারে শিকড় পর্যন্ত শুকিয়ে মরে গেছে। সে আমার বই-পড়ার নেশা। আমার জীবনের মন্ত্রটা ছিল এই--
              যাবজ্জীবেৎ নাই-বা জীবেৎ
আরো দেখুন