মাস্টারমশায়
Stories
রাত্রি তখন প্রায় দুটা। কলিকাতার নিস্তব্ধ শব্দসমুদ্রে একটুখানি ঢেউ তুলিয়া একটা বড়ো জুড়িগাড়ি ভবানীপুরের দিক হইতে আসিয়া বির্জিতলাওয়ের মোড়ের কাছে থামিল। সেখানে একটা ঠিকাগাড়ি দেখিয়া, আরোহী বাবু তাহাকে ডাকিয়া আনাইলেন। তাহার পাশে একটি কোট-হ্যাট-পরা বাঙালি বিলাতফের্তা যুবা সম্মুখের আসনে দুই পা তুলিয়া দিয়া একটু মদমত্ত অবস্থায় ঘাড় নামাইয়া ঘুমাইতেছিল। এই যুবকটি নূতন বিলাত হইতে আসিয়াছে। ইহারই অভ্যর্থনা উপলক্ষে বন্ধুমহলে একটা খানা হইয়া গেছে। সেই খানা হইতে ফিরিবার পথে একজন বন্ধু তাহাকে কিছুদূর অগ্রসর করিবার জন্য নিজের গাড়িতে তুলিয়া লইয়াছেন। তিনি ইহাকে দু-তিনবার ঠেলা দিয়া জাগাইয়া কহিলেন, 'মজুমদার, গাড়ি পাওয়া গেছে, বাড়ি যাও।'
মজুমদার সচকিত হইয়া একটা বিলাতি দিব্য গালিয়া ভাড়াটে গাড়িতে উঠিয়া পড়িল। তাহার গাড়োয়ানকে ভালো করিয়া ঠিকানা বাতলাইয়া দিয়া ব্রুহাম গাড়ির আরোহী নিজের গম্যপথে চলিয়া গেলেন।
আরো দেখুন
জীবিত ও মৃত
Stories
রানীহাটের জমিদার শারদাশংকরবাবুদের বাড়ির বিধবা বধূটির পিতৃকুলে কেহ ছিল না; সকলেই একে একে মারা গিয়াছে। পতিকুলেও ঠিক আপনার বলিতে কেহ নাই, পতিও নাই পুত্রও নাই। একটি ভাশুরপো, শারদাশংকরের ছোটো ছেলেটি, সেই তাহার চক্ষের মণি। সে জন্মিবার পর তাহার মাতার বহুকাল ধরিয়া শক্ত পীড়া হইয়াছিল, সেইজন্য এই বিধবা কাকি কাদম্বিনীই তাহাকে মানুষ করিয়াছে। পরের ছেলে মানুষ করিলে তাহার প্রতি প্রাণের টান আরো যেন বেশি হয়, কারণ তাহার উপরে অধিকার থাকে না; তাহার উপরে কোনো সামাজিক দাবি নাই, কেবল স্নেহের দাবি-- কিন্তু কেবলমাত্র স্নেহ সমাজের সমক্ষে আপনার দাবি কোনো দলিল অনুসারে সপ্রমাণ করিতে পারে না এবং চাহেও না, কেবল অনিশ্চিত প্রাণের ধনটিকে দ্বিগুণ ব্যাকুলতার সহিত ভালোবাসে।
বিধবার সমস্ত রুদ্ধ প্রীতি এই ছেলেটির প্রতি সিঞ্চন করিয়া একদিন শ্রাবণের রাত্রে কাদম্বিনীর অকস্মাৎ মৃত্যু হইল। হঠাৎ কী কারণে তাহার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হইয়া গেল-- সময় জগতের আর-সর্বত্রই চলিতে লাগিল, কেবল সেই স্নেহকাতর ক্ষুদ্র কোমল বক্ষটির ভিতর সময়ের ঘড়ির কল চিরকালের মতো বন্ধ হইয়া গেল।
আরো দেখুন
রীতিমত নভেল
Stories
'আল্লা হো আকবর' শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে তিনলক্ষ যবনসেনা, অন্যদিকে তিনসহস্র আর্যসৈন্য। বন্যার মধ্যে একাকী অশ্বত্থবৃক্ষের মতো হিন্দুবীরগণ সমস্ত রাত্রি এবং সমস্ত দিন যুদ্ধ করিয়া অটল দাঁড়াইয়া ছিল কিন্তু এইবার ভাঙিয়া পড়িবে, তাহার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। এবং সেইসঙ্গে ভারতের জয়ধ্বজা ভূমিসাৎ হইবে এবং আজিকার ঐ অস্তাচলবর্তী সহস্ররশ্মির সহিত হিন্দুস্থানের গৌরবসূর্য চিরদিনের মতো অস্তমিত হইবে।
হর হর বোম্‌ বোম্‌! পাঠক বলিতে পার, কে ঐ দৃপ্ত যুবা পঁয়ত্রিশজন মাত্র অনুচর লইয়া মুক্ত অসি হস্তে অশ্বারোহণে ভারতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর করনিক্ষিপ্ত দীপ্ত বজ্রের ন্যায় শত্রুসৈন্যের উপরে আসিয়া পতিত হইল? বলিতে পার, কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবনসৈন্য প্রচণ্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল?-- কাহার বজ্রমন্দ্রিত 'হর হর বোম্‌ বোম্‌' শব্দে তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের 'আল্লা হো আকবর' ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল? কাহার উদ্যত অসির সম্মুখে ব্যাঘ্র-আক্রান্ত মেষষুথের ন্যায় শত্রুসৈন্য মুহূর্তের মধ্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে পলায়নপর হইল? বলিতে পার, সেদিনকার আর্যস্থানের সূর্যদেব সহস্ররক্তকরস্পর্শে কাহার রক্তাক্ত তরবারিকে আশীর্বাদ করিয়া অস্তাচলে বিশ্রাম করিতে গেলেন? বলিতে পার কি পাঠক।
আরো দেখুন
আসন্ন রাতি
Verses
          এল আহ্বান, ওরে তুই ত্বরা কর্‌।
          শীতের সন্ধ্যা সাজায় বাসরঘর।
                   কালপুরুষের বিপুল মহাঙ্গন
                      বিছালো আলিম্পন,
                         অন্তরে তোর আসন্ন রাতি
                            জাগায় শঙ্খরব--
                               অস্তশৈলপাদমূলে তার
                                  প্রসারিল অনুভব।
                   বিরহশয়ন বিছানো হেথায়,
          কে যেন আসিল চোখে দেখা নাহি যায়।
                   অতীত দিনের বনের স্মরণ আনে
                      ম্রিয়মাণ মৃদু সৌরভটুকু প্রাণে।
                         গাঁথা হয়েছিল যে মাধবীহার
                             মধুপূর্ণিমারাতে
                              কণ্ঠ জড়ালো পরশবিহীন
                                 নির্বাক বেদনাতে।
                   মিলনদিনের প্রদীপের মালা
          পুলকিত রাতে যত হয়েছিল জ্বালা,
                   আজি আঁধারের অতল গহনে হারা
                      স্বপ্ন রচিছে তারা।
                         ফাল্গুনবনমর্মর-সনে
                            মিলিত যে কানাকানি
                              আজি হৃদয়ের স্পন্দনে কাঁপে
                                 তাহার স্তব্ধ বাণী।
                   কী নামে ডাকিব, কোন্‌ কথা কব,
          হে বধূ, ধেয়ানে আঁকিব কী ছবি তব।
                   চিরজীবনের পুঞ্জিত সুখদুখ
                      কেন আজি উৎসুক!
                         উৎসবহীন কৃষ্ণপক্ষে
                            আমার বক্ষোমাঝে
                              শুনিতেছে কে সে কার উদ্দেশে
                                 সাহানায় বাঁশি বাজে।
                   আজ বুঝি তোর ঘরে, ওরে মন,
          গত বসন্তরজনীর আগমন।
                   বিপরীত পথে উত্তর বায়ু বেয়ে
                      এল সে তোমারে চেয়ে।
                         অবগুণ্ঠিত নিরলংকার
                            তাহার মূর্তিখানি
হৃদয়ে ছোঁয়াল শেষ পরশের
                                 তুষারশীতল পাণি।
আরো দেখুন
বারো
Verses
বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে
                   শেষধাপের কাছটাতে ।
            কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে পা ডুবিয়ে দিয়ে ।
   জীবনের পরিত্যক্ত ভোজের ক্ষেত্র পড়ে আছে পিছন দিকে
            অনেক দিনের ছড়ানো উচ্ছিষ্ট নিয়ে ।
মনে পড়ছে ভোগের আয়োজনে
                   ফাঁক পড়েছে বারম্বার ।
কতদিন যখন মূল্য ছিল হাতে
                   হাট জমে নি তখনো,
           বোঝাই নৌকো লাগল যখন ডাঙায়
তখন ঘণ্টা গিয়েছে বেজে,
            ফুরিয়েছে বেচাকেনার প্রহর ।
    অকালবসন্তে জেগেছিল ভোরের কোকিল;
       সেদিন তার চড়িয়েছি সেতারে,
                     গানে বসিয়েছি সুর ।
                           যাকে শোনাব তার চুল যখন হল বাঁধা,
                      বুকে উঠল জাফরানি রঙের আঁচল
                                তখন ঝিকিমিকি বেলা,
                    করুণ ক্লান্তি লেগেছে মূলতানে ।
                      ক্রমে ধূসর আলোর উপরে কালো মরচে পড়ে এল ।
                   থেমে-যাওয়া গানখানি নিভে-যাওয়া প্রদীপের ভেলার মতো
                 ডুবল বুঝি কোন্‌ একজনের মনের তলায়,
                           উঠল বুঝি তার দীর্ঘনিশ্বাস,
                               কিন্তু জ্বালানো হল না আলো ।
এ নিয়ে আজ নালিশ নেই আমার ।
                         বিরহের কালোগুহা ক্ষুধিত গহ্বর থেকে
             ঢেলে দিয়েছে ক্ষুভিত সুরের ঝর্না রাত্রিদিন ।
          সাত রঙের ছটা খেলেছে তার নাচের উড়নিতে
                             সারাদিনের সূর্যালোকে,
              নিশীথরাত্রের জপমন্ত্র ছন্দ পেয়েছে
                            তার তিমিরপুঞ্জ কলোচ্ছল ধারায় ।
আমার তপ্ত মধ্যাহ্নের শূন্যতা থেকে উচ্ছ্বসিত
              গৌড়-সারঙের আলাপ ।
   আজ বঞ্চিত জীবনকে বলি সার্থক --
           নিঃশেষ হয়ে এল তার দুঃখের সঞ্চয়
    মৃত্যুর অর্ঘ্যপাত্রে,
           তার দক্ষিণা রয়ে গেল কালের বেদিপ্রান্তে ।
জীবনের পথে মানুষ যাত্রা করে
নিজেকে খুঁজে পাবার জন্যে ।
গান যে মানুষ গায়, দিয়েছে সে ধরা,আমার অন্তরে;
যে মানুষ দেয় প্রাণ দেখা মেলে নি তার ।
          দেখেছি শুধু আপনার নিভৃত রূপ
                       ছায়ায় পরিকীর্ণ,
     যেন পাহাড়তলিতে একখানা অনুত্তরঙ্গ সরোবর ।
                    তীরের গাছ থেকে
                      সেখানে বসন্তশেষের ফুল পড়ে ঝ'রে,
                               ছেলেরা ভাসায় খেলার নৌকো,
                    কলস ভরে নেয় তরুণীরা
                                 বুদ্‌বুদফেনিল গর্গরধ্বনিতে ।
          নববর্ষার গম্ভীর বিরাট শ্যামমহিমা
                    তার বক্ষতলে পায় লীলাচঞ্চল দোসরটিকে ।
       কালবৈশাখী হঠাৎ মারে পাখার ঝাপট,
                         স্থির জলে আনে অশান্তির উন্মন্থন,
           অধৈর্যের আঘাত হানে তটবেষ্টনের স্থাবরতায়;
               হঠাৎ বুঝি তার মনে হয় --
                       গিরিশিখরের পাগলা-ঝোরা পোষ মেনেছে
                             গিরিপদতলের বোবা জলরাশিতে --
    বন্দী ভুলেছে আপনার উদ্‌বেলকে,উদ্দামকে--
  পাথর ডিঙিয়ে আপন সীমানা চূর্ণ করতে করতে নিরুদ্দেশের পথে
                   অজানার সংঘাতে বাঁকে বাঁকে
                      গর্জিত করল না সে আপন অবরুদ্ধ বাণী,
                             আবর্তে আবর্তে উৎক্ষিপ্ত করল না
                                                অন্তর্গূঢ়কে ।
       মৃত্যুর গ্রন্থি থেকে ছিনিয়ে ছিনিয়ে
                                যে উদ্ধার করে জীবনকে
সেই রুদ্র মানবের আত্মপরিচয়ে বঞ্চিত
                                       ক্ষীণ পাণ্ডুর আমি
   অপরিস্ফুটতার অসন্মান নিয়ে যাচ্ছি চলে ।
দুর্গম ভীষণের ওপারে
          অন্ধকারে অপেক্ষা করছে জ্ঞানের বরদাত্রী;
মানবের অভ্রভেদী বন্ধনশালা
           তুলেছে কালো পাথরে গাঁথা উদ্ধত চূড়া
                                      সূর্যোদয়ের পথে;
           বহু শতাব্দীর ব্যথিত ক্ষত মুষ্টি
                       রক্তলাঞ্ছিত বিদ্রোহের ছাপ
                   লেপে দিয়ে যায় তার দ্বারফলকে;
ইতিহাসবিধাতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ
                   দৈত্যের লৌহদুর্গে প্রচ্ছন্ন;
   আকাশে দেবসেনাপতির কন্ঠ শোনা যায় ----
                       "এসো মৃত্যুবিজয়ী' ।
                               বাজল ভেরী,
          তবু জাগল না রণদুর্মদ
            এই নিরাপদ নিশ্চেষ্ট জীবনে;
ব্যূহ ভেদ ক'রে
স্থান নিই নি যুধ্যমান দেবলোকের সংগ্রাম-সহকারিতায় ।
                   কেবল স্বপ্নে শুনেছি ডমরুর গুরুগুরু,
           কেবল সমরযাত্রীর পদপাতকম্পন
                   মিলেছে হৃৎস্পন্দনে বাহিরের পথ থেকে ।
যুগে যুগে যে মানুষের সৃষ্টি প্রলয়ের ক্ষেত্রে
            সেই শ্মশানচারী ভৈরবের পরিচয়জ্যোতি
                             ম্লান হয়ে রইল আমার সত্তায়;
শুধু রেখে গেলেম নতমস্তকের প্রণাম
            মানবের হৃদয়াসীন সেই বীরের উদ্দেশে --
মর্তের অমরাবতী যাঁর সৃষ্টি
          মৃত্যুর মূল্যে, দুঃখের দীপ্তিতে ।
আরো দেখুন
দীন দান
Verses
নিবেদিল রাজভৃত্য, "মহারাজ, বহু অনুনয়ে
সাধুশ্রেষ্ঠ নরোত্তম তোমার সোনার দেবালয়ে
না লয়ে আশ্রয় আজি পথপ্রান্তে তরুচ্ছায়াতলে
করিছেন নামসংকীর্তন। ভক্তবৃন্দ দলে দলে
ঘেরি তাঁরে দরদর-উদ্‌বেলিত আনন্দধারায়
ধৌত ধন্য করিছেন ধরণীর ধূলি। শূন্যপ্রায়
দেবাঙ্গন; ভৃঙ্গ যথা স্বর্ণময় মধুভান্ড ফেলি
সহসা কমলগন্ধে মত্ত হয়ে দ্রুত পক্ষ মেলি
ছুটে যায় গুঞ্জরিয়া উন্মীলিত পদ্ম-উপবনে
উন্মুখ পিপাসাভরে, সেইমতো নরনারীগণে
সোনার দেউল-পানে না তাকায়ে চলিয়াছে ছুটি
যেথায় পথের প্রান্তে ভক্তের হৃদয়পদ্ম ফুটি
বিতরিছে স্বর্গের সৌরভ। রত্নবেদিকার 'পরে
একা দেব রিক্ত দেবালয়ে।'
                             শুনি রাজা ক্ষোভভরে
সিংহাসন হতে নামি গেলা চলি যেথা তরুচ্ছায়ে
সাধু বসি তৃণাসনে; কহিলেন নমি তাঁর পায়ে,
"হেরো প্রভু, স্বর্ণশীর্ষ নৃপতিনির্মিত নিকেতন
অভ্রভেদী দেবালয়, তারে কেন করিয়া বর্জন
দেবতার স্তবগান গাহিতেছ পথপ্রান্তে বসে?'
"সে মন্দিরে দেব নাই' কহে সাধু।
                             রাজা কহে রোষে,
"দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মতো কথা কহ।
রত্নসিংহাসন-'পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ--
শূন্য তাহা?'
          "শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ' সাধু কহে,
"আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।'
ভ্রূ কুঞ্চিয়া কহে রাজা, "বিংশ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিয়া
রচিয়াছি অনিন্দিত যে মন্দির অম্বর ভেদিয়া,
পূজামন্ত্রে নিবেদিয়া দেবতারে করিয়াছি দান,
তুমি কহ সে মন্দিরে দেবতার নাহি কোনো স্থান!'
শান্ত মুখে কহে সাধু, "যে বৎসর বহ্নিদাহে দীন
বিংশতি সহস্র প্রজা গৃহহীন অন্নবস্ত্রহীন
দাঁড়াইল দ্বারে তব, কেঁদে গেল ব্যর্থ প্রার্থনায়
অরণ্যে, গুহার গর্ভে, পথপ্রান্তে তরুর ছায়ায়,
অশ্বত্থবিদীর্ণ জীর্ণ মন্দিরপ্রাঙ্গণে, সে বৎসর
বিংশ লক্ষ মুদ্রা দিয়া রচি তব স্বর্ণদীপ্ত ঘর
দেবতারে সমর্পিলে। সে দিন কহিলা ভগবান--
"আমার অনাদি ঘরে অগণ্য আলোক দীপ্যমান
অনন্তনীলিমা-মাঝে; মোর ঘরে ভিত্তি চিরন্তন
সত্য, শান্তি, দয়া, প্রেম। দীনশক্তি যে ক্ষুদ্র কৃপণ
নাহি পারে গৃহ দিতে গৃহহীন নিজ প্রজাগণে
সে আমারে গৃহ করে দান!' চলি গেলা সেই ক্ষণে
পথপ্রান্তে তরুতলে দীন-সাথে দীনের আশ্রয়।
অগাধ সমুদ্র-মাঝে স্ফীত ফেন যথা শূন্যময়
তেমনি পরম শূন্য তোমার মন্দির বিশ্বতলে,
স্বর্ণ আর দর্পের বুদ্‌বুদ্‌!'
                   রাজা জ্বলি রোষানলে,
কহিলেন, "রে ভন্ড পামর, মোর রাজ্য ত্যাগ করে
এ মুহূর্তে চলি যাও।'
                   সন্ন্যাসী কহিলা শান্ত স্বরে,
"ভক্তবৎসলেরে তুমি যেথায় পাঠালে নির্বাসনে
সেইখানে, মহারাজ, নির্বাসিত কর ভক্তজনে।'
আরো দেখুন
আগমনী
Stories
আয়োজন চলেইছে। তার মাঝে একটুও ফাঁক পাওয়া যায় না যে ভেবে দেখি, কিসের আয়োজন।
তবুও কাজের ভিড়ের মধ্যে মনকে এক-একবার ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞাসা করি, 'কেউ আসবে বুঝি?'
আরো দেখুন
তপস্বিনী
Stories
বৈশাখ প্রায় শেষ হইয়া আসিল। প্রথমরাত্রে গুমট গেছে, বাঁশগাছের পাতাটা পর্যন্ত নড়ে না, আকাশের তারাগুলো যেন মাথা-ধরার বেদনার মতো দব্‌ দব্‌ করিতেছে। রাত্রি তিনটের সময় ঝির্‌ঝির্‌ করিয়া একটুখানি বাতাস উঠিল। ষোড়শী শূন্য মেঝের উপর খোলা জানলার নীচে শুইয়া আছে, একটা কাপড়ে-মোড়া টিনের বাক্স তার মাথার বালিশ। বেশ বোঝা যায়, খুব উৎসাহের সঙ্গে সে কৃচ্ছসাধন করিতেছে।
প্রতিদিন ভোর চারটের সময় উঠিয়া স্নান সারিয়া ষোড়শী ঠাকুরঘরে গিয়া বসে। আহ্নিক করিতে বেলা হইয়া যায়। তার পরে বিদ্যারত্নমশায় আসেন; সেই ঘরে বসিয়াই তাঁর কাছে সে গীতা পড়ে। সংস্কৃত সে কিছু কিছু শিখিয়াছে। শঙ্করের বেদান্তভাষ্য এবং পাতঞ্জলদর্শন মূল গ্রন্থ হইতে পড়িবে, এই তার পণ। বয়স তার তেইশ হইবে।
আরো দেখুন
ভুল স্বর্গ
Stories
লোকটি নেহাত বেকার ছিল।
তার কোনো কাজ ছিল না, কেবল শখ ছিল নানা রকমের।
আরো দেখুন
চার অধ্যায়
Novels
এলার মনে পড়ে তার জীবনের প্রথম সূচনা বিদ্রোহের মধ্যে। তার মা মায়াময়ীর ছিল বাতিকের ধাত, তাঁর ব্যবহারটা বিচার-বিবেচনার প্রশস্ত পথ ধরে চলতে পারত না। বেহিসাবি মেজাজের অসংযত ঝাপটায় সংসারকে তিনি যখন-তখন ক্ষুব্ধ করে তুলতেন, শাসন করতেন অন্যায় করে, সন্দেহ করতেন অকারণে। মেয়ে যখন অপরাধ অস্বীকার করত, ফস করে বলতেন, মিথ্যে কথা বলছিস। অথচ অবিমিশ্র সত্যকথা বলা মেয়ের একটা ব্যসন বললেই হয়। এজন্যেই সে শাস্তি পেয়েছে সব-চেয়ে বেশি। সকল রকম অবিচারের বিরুদ্ধে অসহিষ্ণুতা তার স্বভাবে প্রবল হয়ে উঠেছে। তার মার কাছে মনে হয়েছে, এইটেই স্ত্রীধর্মনীতির বিরুদ্ধ।
একটা কথা সে বাল্যকাল থেকে বুঝেছে যে, দুর্বলতা অত্যাচারের প্রধান বাহন। ওদের পরিবারে যে-সকল আশ্রিত অন্নজীবী ছিল, যারা পরের অনুগ্রহ-নিগ্রহের সংকীর্ণ বেড়া-দেওয়া ক্ষেত্রের মধ্যে নিঃসহায়ভাবে আবদ্ধ তারাই কলুষিত করেছে ওদের পরিবারের আবহাওয়াকে, তারাই ওর মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চাকে বাধাবিহীন করে তুলেছে। এই অস্বাস্থ্যকর অবস্থার প্রতিক্রিয়ারূপেই ওর মনে অল্পবয়স থেকেই স্বাধীনতার আকাঙক্ষা এত দুর্দাম হয়ে উঠেছিল।
প্রহরশেষের আলোয় রাঙা
সেদিন চৈত্রমাস,
তোমার চোখে দেখেছিলাম
আমার সর্বনাশ।"
Upwards
Towards the peaks,
Towards the stars,
Towards the vast silence."
আরো দেখুন
বোষ্টমী
Stories
আমি লিখিয়া থাকি অথচ লোকরঞ্জন আমার কলমের ধর্ম নয়, এইজন্য লোকেও আমাকে সদাসর্বদা যে রঙে রঞ্জিত করিয়া থাকে তাহাতে কালির ভাগই বেশি। আমার সম্বন্ধে অনেক কথাই শুনিতে হয়; কপালক্রমে সেগুলি হিতকথা নয়, মনোয়ারী তো নহেই।
শরীরে যেখানটায় ঘা পড়িতে থাকে সে জায়গাটা যত তুচ্ছই হোক সমস্ত দেহটাকে বেদনার জোরে সেই ছাড়াইয়া যায়। সে লোক গালি খাইয়া মানুষ হয়, সে আপনার স্বভাবকে যেন ঠেলিয়া একঝোঁকা হইয়া পড়ে। আপনার চারি দিককে ছাড়াইয়া আপনাকেই কেবল তাহার মনে পড়ে-- সেটা আরামও নয়, কল্যাণও নয়। আপনাকে ভোলাটাই তো স্বস্তি।
আরো দেখুন