দর্পহরণ
Stories
কী করিয়া গল্প লিখিতে হয়, তাহা সম্প্রতি শিখিয়াছি। বঙ্কিমবাবু এবং সার্‌ ওয়াল্‌টার স্কট পড়িয়া আমার বিশেষ ফল হয় নাই। ফল কোথা হইতে কেমন করিয়া হইল, আমার এই প্রথম গল্পেই সেই কথাটা লিখিতে বসিলাম।
আমার পিতার মতামত অনেকরকম ছিল; কিন্তু বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে কোনো মত তিনি কেতাব বা স্বাধীনবুদ্ধি হইতে গড়িয়া তোলেন নাই। আমার বিবাহ যখন হয় তখন সতেরো উত্তীর্ণ হইয়া আঠারোয় পা দিয়াছি; তখন আমি কলেজে থার্ডইয়ারে পড়ি-- এবং তখন আমার চিত্তক্ষেত্রে যৌবনের প্রথম দক্ষিণবাতাস বহিতে আরম্ভ করিয়া কত অলক্ষ্য দিক হইতে কত অনির্বচনীয় গীতে এবং গন্ধে, কম্পনে এবং মর্মরে আমার তরুণ জীবনকে উৎসুক করিয়া তুলিতেছিল, তাহা এখনো মনে হইলে বুকের ভিতরে দীর্ঘনিশ্বাস ভরিয়া উঠে।
আরো দেখুন
প্রগতিসংহার
Stories
এই কলেজে ছেলেমেয়েদের মেলামেশা বরঞ্চ কিছু বাড়াবাড়ি ছিল। এরা প্রায় সবাই ধনী ঘরের--এরা পয়সার ফেলাছড়া করতে ভালোবাসে। নানা রকম বাজে খরচ করে মেয়েদের কাছে দরাজ হাতের নাম কিনত। মেয়েদের মনে ঢেউ তুলত, তারা বুক ফুলিয়ে বলত--'আমাদেরই কলেজের ছেলে এরা'। সরস্বতী পুজো তারা এমনি ধূম করে করত যে, বাজারে গাঁদা ফুলের আকাল পড়ে যেত। এ ছাড়া চোখটেপাটেপি ঠাট্টা তামাসা চলেইছে। এই তাদের মাঝখানে একটা সংঘ তেড়েফুঁড়ে উঠে মেলামেশা ছারখার করে দেবার জো করলে।
সংঘের হাল ধরে ছিল সুরীতি। নাম দিল 'নারীপ্রগতিসংঘ'। সেখানে পুরুষের ঢোকবার দরজা ছিল বন্ধ। সুরীতির মনের জোরের ধাক্কায় এক সময়ে যেন পুরুষ-বিদ্রোহের একটা হাওয়া উঠল। পুরুষরা যেন বেজাত, তাদের সঙ্গে জলচল বন্ধ। কদর্য তাদের ব্যায়ভার।
আরো দেখুন
দানপ্রতিদান
Stories
বড়োগিন্নি যে কথাগুলা বলিয়া গেলেন, তাহার ধার যেমন তাহার বিষও তেমনি। যে-হতভাগিনীর উপর প্রয়োগ করিয়া গেলেন, তাহার চিত্তপুত্তলি একেবারে জ্বলিয়া জ্বলিয়া লুটিতে লাগিল।
বিশেষত, কথাগুলা তাহার স্বামীর উপর লক্ষ্য করিয়া বলা-- এবং স্বামী রাধামুকুন্দ তখন রাত্রের আহার সমাপন করিয়া অনতিদূরে বসিয়া তাম্বুলের সহিত তাম্রকূটধূম সংযোগ করিয়া খাদ্যপরিপাকে প্রবৃত্ত ছিলেন। কথাগুলো শ্রুতিপথে প্রবেশ করিয়া তাঁহার পরিপাকের যে বিশেষ ব্যাঘাত করিল, এমন বোধ হইল না। অবিচলিত গাম্ভীর্যের সহিত তাম্রকূট নিঃশেষ করিয়া অভ্যাসমত যথাকালে শয়ন করিতে গেলেন।
আরো দেখুন
পণরক্ষা
Stories
বংশীবদন তাহার ভাই রসিককে যেমন ভালোবাসিত এমন করিয়া সচরাচর মাও ছেলেকে ভালোবাসিতে পারে না। পাঠশালা হইতে রসিকের আসিতে যদি কিছু বিলম্ব হইত তবে সকল কাজ ফেলিয়া সে তাহার সন্ধানে ছুটিত। তাহাকে না খাওয়াইয়া সে নিজে খাইতে পারিত না। রসিকের অল্প কিছু অসুখবিসুখ হইলেই বংশীর দুই চোখ দিয়া ঝর্‌ঝর্‌ করিয়া জল ঝরিতে থাকিত।
রসিক বংশীর চেয়ে ষোলো বছরের ছোটো। মাঝে যে কয়টি ভাইবোন জন্মিয়াছিল সবগুলিই মারা গিয়াছে। কেবল এই সব-শেষেরটিকে রাখিয়া, যখন রসিকের এক বছর বয়স, তখন তাহার মা মারা গেল এবং রসিক যখন তিন বছরের ছেলে তখন সে পিতৃহীন হইল। এখন রসিককে মানুষ করিবার ভার একা এই বংশীর উপর।
আরো দেখুন
আপদ
Stories
সন্ধ্যার দিকে ঝড় ক্রমশ প্রবল হইতে লাগিল। বৃষ্টির ঝাপট, বজ্রের শব্দ এবং বিদ্যুতের ঝিকমিকিতে আকাশে যেন সুরাসুরের যুদ্ধ বাধিয়া গেল। কালো কালো মেঘগুলো মহাপ্রলয়ের জয়পতাকার মতো দিগ্‌বিদিকে উড়িতে আরম্ভ করিল, গঙ্গার এপারে ওপারে বিদ্রোহী ঢেউগুলো কলশব্দে নৃত্য জুড়িয়া দিল, এবং বাগানের বড়ো বড়ো গাছগুলো সমস্ত শাখা ঝট্‌পট্‌ করিয়া হাহুতাশ সহকারে দক্ষিণে বামে লুটোপুটি করিতে লাগিল।
তখন চন্দননগরের বাগানবাড়িতে একটি দীপালোকিত রুদ্ধকক্ষে খাটের সম্মুখবর্তী নীচের বিছানায় বসিয়া স্ত্রী-পুরুষে কথাবার্তা চলিতেছিল।
আরো দেখুন
বাণী
Stories
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে, মাটির কাছে ধরা দেবে ব'লে। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।
তাদের জন্য অল্প জায়গার জগৎ, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই-- আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।
আরো দেখুন
অসম্ভব
Verses
পূর্ণ হয়েছে বিচ্ছেদ, যবে ভাবিনু মনে,
একা একা কোথা চলিতেছিলাম নিষ্কারণে।
শ্রাবণের মেঘ কালো হয়ে নামে বনের শিরে,
খর বিদ্যুৎ রাতের বক্ষ দিতেছে চিরে,
দূর হতে শুনি বারুণী নদীর তরল রব--
মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব।
এমনি রাত্রে কতবার, মোর বাহুতে মাথা,
শুনেছিল সে যে কবির ছন্দে কাজরি-গাথা।
রিমিঝিমি ঘন বর্ষণে বন রোমাঞ্চিত,
দেহে আর মনে এক হয়ে গেছে যে-বাঞ্ছিত
এল সেই রাতিবহি শ্রাবণের সে-বৈভব--
মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব।
দূরে চলে যাই নিবিড় রাতের অন্ধকারে,
আকাশের সুর বাজিছে শিরায় বৃষ্টিধারে।
যূথীবন হতে বাতাসেতে আসে সুধার স্বাদ,
বেণীবাঁধনের মালায় পেতেম যে-সংবাদ
এই তো জেগেছে নবমালতীর সে সৌরভ--
মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব।
ভাবনার ভুলে কোথা চলে যাই অন্যমনে
পথসংকেত কত জানায়েছে যে-বাতায়নে।
শুনিতে পেলেম সেতারে বাজিছে সুরের দান
অশ্রুজলের আভাসে জড়িত আমারি গান।
কবিরে ত্যজিয়া রেখেছে কবির এ গৌরব--
মন শুধু বলে, অসম্ভব এ অসম্ভব।
আরো দেখুন
নিমন্ত্রণ
Verses
মনে পড়ে, যেন এককালে লিখিতাম
          চিঠিতে তোমারে প্রেয়সী অথবা প্রিয়ে।
একালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম--
          থাক্‌ সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে।
তুমি দাবি কর কবিতা আমার কাছে
          মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে লেখা,
আমার কাব্য তোমার দুয়ারে যাচে
          নম্র চোখের কম্প্র কাজলরেখা।
সহজ ভাষায় কথাটা বলাই শ্রেয়--
          যে-কোনো ছুতায় চলে এসো মোর ডাকে,
সময় ফুরালে আবার ফিরিয়া যেয়ো,
          বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে।
গৌরবরন তোমার চরণমূলে
          ফল্‌সাবরন শাড়িটি ঘেরিবে ভালো;
বসনপ্রান্ত সীমন্তে রেখো তুলে,
          কপোলপ্রান্তে সরু পাড় ঘন কালো।
          
একগুছি চুল বায়ু-উচ্ছ্বাসে কাঁপা
          ললাটের ধারে থাকে যেন অশাসনে।
ডাহিন অলকে একটি দোলনচাঁপা
          দুলিয়া উঠুক গ্রীবাভঙ্গির সনে।
বৈকালে গাঁথা যূথীমুকুলের মালা
          কণ্ঠের তাপে ফুটিয়া উঠিবে সাঁঝে;
দূরে থাকিতেই গোপনগন্ধে-ঢালা
          সুখসংবাদ মেলিবে হৃদয়মাঝে।
এই সুযোগেতে একটুকু দিই খোঁটা--
          আমারই দেওয়া সেই ছোট্ট চুনির দুল,
রক্তে জমানো যেন সে অশ্রুর ফোঁটা,
          কতদিন সেটা পরিতে করেছ ভুল।
আরেকটা কথা বলে রাখি এইখানে,
          কাব্যে সে কথা হবে না মানানসই,
সুর দিয়ে সেটা গাহিব না কোনো গানে--
          তুচ্ছ শোনাবে, তবু সে তুচ্ছ কই।
একালে চলে না সোনার প্রদীপ আনা,
সোনার বীণাও নহে আয়ত্তগত।
          বেতের ডালায় রেশমি-রুমাল-টানা
                   অরুণবরন আম এনো গোটাকত।
গদ্য জাতীয় ভোজ্যও কিছু দিয়ো,
          পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।
তা হোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়;
          জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।
ওই দেখো, ওটা আধুনিকতার ভূত
          মুখেতে জোগায় স্থূলতার জয়ভাষা;
জানি, অমরার পথহারা কোনো দূত
          জঠরগুহায় নাহি করে যাওয়া-আসা।
          তথাপি পষ্ট বলিতে নাহি তো দোষ
                   যে কথা কবির গভীর মনের কথা--
উদরবিভাগে দৈহিক পরিতোষ
          সঙ্গী জোটায় মানসিক মধুরতা।
শোভন হাতের সন্দেশ, পানতোয়া,
          মাছমাংসের পোলাও ইত্যাদিও
যবে দেখা দেয় শোভামাধুর্যে-ছোঁওয়া
          তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়!
বুঝি অনুমানে, চোখে কৌতুক ঝলে;
          ভাবিছ বসিয়া সহাস ওষ্ঠাধরা,
এ সমস্তই কবিতার কৌশলে
          মৃদুসংকেতে মোটা ফরমাশ করা।
আচ্ছা, নাহয় ইঙ্গিত শুনে হেসো;
          বরদানে, দেবী, নাহয় হইবে বাম;
খালি হাতে যদি আস তবে তাই এসো,
          সে দুটি হাতেরও কিছু কম নহে দাম!
সেই কথা ভালো, তুমি চলে এসো একা,
          বাতাসে তোমার আভাস যেন গো থাকে;
স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা,
          সন্ধ্যাতারাটি শিরীষডালের ফাঁকে।
তার পরে যদি ফিরে যাও ধীরে ধীরে
          ভুলে ফেলে যেও তোমার যূথীর মালা;
ইমন বাজিবে বক্ষের শিরে শিরে,
          তার পরে হবে কাব্য লেখার পালা।
যত লিখে যাই ততই ভাবনা আসে,
          লেফাফার 'পরে কার নাম দিতে হবে;
মনে মনে ভাবি গভীর দীর্ঘশ্বাসে,
          কোন্‌ দূর যুগে তারিখ ইহার কবে।
          মনে ছবি আসে-- ঝিকিমিকি বেলা হল,
                   বাগানের ঘাটে গা ধুয়েছ তাড়াতাড়ি;
কচি মুখখানি, বয়স তখন ষোলো;
          তনু দেহখানি ঘেরিয়াছে ডুরে শাড়ি।
কুঙ্কুমফোঁটা ভুরুসংগমে কিবা,
          শ্বেতকরবীর গুচ্ছ কর্ণমূলে;
পিছন হইতে দেখিনু কোমল গ্রীবা
          লোভন হয়েছে রেশমচিকন চুলে।
তাম্রথালায় গোড়ে মালাখানি গেঁথে
          সিক্ত রুমালে যত্নে রেখেছ ঢাকি;
ছায়া-হেলা ছাদে মাদুর দিয়েছ পেতে--
          কার কথা ভেবে বসে আছ জানি না কি!
আজি এই চিঠি লিখিছে তো সেই কবি;
          গোধূলির ছায়া ঘনায় বিজন ঘরে,
দেয়ালে ঝুলিছে সেদিনের ছায়াছবি--
শব্দটি নেই, ঘড়ি টিক্‌টিক্‌ করে।
ওই তো তোমার হিসাবের ছেঁড়া পাতা,
          দেরাজের কোণে পড়ে আছে আধুলিটি।
কতদিন হল গিয়েছ, ভাবিব না তা,
          শুধু রচি বসে নিমন্ত্রণের চিঠি।
মনে আসে, তুমি পুব-জানালার ধারে
          পশমের গুটি কোলে নিয়ে আছ বসে;
উৎসুক চোখে বুঝি আশা কর কারে,
          আলগা আঁচল মাটিতে পড়েছে খসে।
অর্ধেক ছাদে রৌদ্র নেমেছে বেঁকে,
          বাকি অর্ধেক ছায়াখানি দিয়ে ছাওয়া;
পাঁচিলের গায়ে চীনের টবের থেকে
          চামেলি ফুলের গন্ধ আনিছে হাওয়া।
এ চিঠির নেই জবাব দেবার দায়,
          আপাতত এটি দেরাজে দিলেম রেখে।
পার যদি এসো শব্দবিহীন পায়,
          চোখ টিপে ধোরো হঠাৎ পিছন থেকে।
আকাশে চুলের গন্ধটি দিয়ো পাতি,
          এনো সচকিত কাঁকনের রিনিরিন,
আনিয়ো মধুর স্বপ্নসঘন রাতি,
          আনিয়ো গভীর আলস্যঘন দিন।
তোমাতে আমাতে মিলিত নিবিড় একা--
          স্থির আনন্দ, মৌন মাধুরীধারা,
মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা,
          তব করতল মোর করতলে হারা।
আরো দেখুন
Giribala
Stories
GIRIBALA is overflowing with exuberance of youth that seems spilling over in spray all around her,—in the folds of her soft dress, the turning of her neck, the motion of her hands, in the rhythm of her steps, now quick now languid, in her tinkling anklets and ringing laughter, in her voice and glances. She would often been seen, wrapt in a blue silk, walking on her terrace, in an impulse of unaccountable restlessness. Her limbs seem eager to dance to the time of an inner music unceasing and unheard. She takes pleasure in merely moving her body, causing ripples to break out in the flood of her young life. She would suddenly pluck a leaf from a plant in the flower-pot and throw it up in the sky, and her bangles would give a sudden tinkle, and the careless grace of her hand, like a bird freed from its cage, would fly unseen in the air. With her swift fingers she would brush away from her dress a mere nothing; standing on tiptoe she would peep over her terrace walls for no cause whatever, and then with a rapid motion turn round to go to another direction, swinging her bunch of keys tied to a corner of her garment. She would loosen her hair in an untimely caprice, sitting before her mirror to do it up again, and then in a fit of laziness would fling herself upon her bed, like a line of stray moonlight slipping through some opening of the leaves, idling in the shadow.
She has no children and, having been married in a wealthy family, has very little work to do. Thus she seems to be daily accumulating her own self without expenditure, till the vessel is brimming over with the seething surplus. She has her husband, but not under her control. She has grown up from a girl into a woman, yet escaping, through familiarity, her husband's notice.
আরো দেখুন