শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে পড়ুক ঝরে তোমারি সুরটি আমার মুখের 'পরে বুকের 'পরে। পুরবের আলোর সাথে পড়ুক প্রাতে দুই নয়ানে- নিশীথের অন্ধকারে গভীর ধারে পড়ুক প্রাণে, নিশিদিন এই জীবনের সুখের 'পরে দুঃখের 'পরে শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে পড়ুক ঝরে। যে শাখায় ফুল ফোটে না ফল ধরে না একেবারে তোমার ওই বাদল-বায়ে দিক জাগায়ে সেই শাখারে। যা-কিছু জীর্ণ আমার দীর্ণ আমার জীবনহারা তাহারি স্তরে স্তরে পড়ুক ঝরে সুরের ধারা। নিশিদিন এই জীবনের তৃষার 'পরে ভুখের 'পরে শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে পড়ুক ঝরে।
যখন রব না আমি মর্তকায়ায় তখন স্মরিতে যদি হয় মন তবে তুমি এসো হেথা নিভৃত ছায়ায় যেখা এই চৈত্রের শালবন। হেথায় যে মঞ্জরী দোলে শাখে শাখে, পুচ্ছ নাচায়ে যত পাখি গায়, ওরা মোর নাম ধরে কভু নাহি ডাকে, মনে নাহি করে বসি নিরালায়। কত যাওয়া কত আসা এই ছায়াতলে আনমনে নেয় ওরা সহজেই, মিলায় নিমেষে কত প্রতি পলে পলে হিসাব কোথাও তার কিছু নেই। ওদের এনেছে ডেকে আদিসমীরণে ইতিহাসলিপিহারা যেই কাল আমারে সে ডেকেছিল কভু খনে খনে, রক্তে বাজায়েছিল তারি তাল। সেদিন ভুলিয়াছিনু কীর্তি ও খ্যাতি, বিনা পথে চলেছিল ভোলা মন; চারি দিকে নামহারা ক্ষণিকের জ্ঞাতি আপনারে করেছিল নিবেদন। সেদিন ভাবনা ছিল মেঘের মতন, কিছু নাহি ছিল ধরে রাখিবার; সেদিন আকাশে ছিল রূপের স্বপন, রঙ ছিল উড়ো ছবি আঁকিবার। সেদিনের কোনো দানে ছোটো বড়ো কাজে স্বাক্ষর দিয়ে দাবি করি নাই; যা লিখেছি যা মুছেছি শূন্যের মাঝে মিলায়েছে, দাম তার ধরি নাই। সেদিনের হারা আমি-- চিহ্নবিহীন পথ বেয়ে কোরো তার সন্ধান, হারাতে হারাতে যেথা চলে যায় দিন, ভরিতে ভরিতে ডালি অবসান। মাঝে মাঝে পেয়েছিল আহ্বান-পাঁতি যেখানে কালের সীমারেখা নেই-- খেলা করে চলে যায় খেলিবার সাথি গিয়েছিল দায়হীন সেখানেই। দিন নাই, চাই নাই, রাখি নি কিছুই ভালো মন্দের কোনো জঞ্জাল; চলে-যাওয়া ফাগুনের ঝরা ফুলে ভুঁই আসন পেতেছে মোর ক্ষণকাল। সেইখানে মাঝে মাঝে এল যারা পাশে কথা তারা ফেলে গেছে কোন্ ঠাঁই; সংসার তাহাদের ভোলে অনায়াসে, সভাঘরে তাহাদের স্থান নাই। বাসা যার ছিল ঢাকা জনতার পারে, ভাষাহারাদের সাথে মিল যার, যে আমি চায় নি কারে ঋণী করিবারে, রাখিয়া যে যায় নাই ঋণভার, সে আমারে কে চিনেছ মর্তকায়ায়, কখনো স্মরিতে যদি হয় মন, ডেকো না ডেকো না সভা-- এসো এ ছায়ায় যেথা এই চৈত্রের শালবন।
আজ হল রবিবার, খুব মোটা বহরের কগজের এডিশন; যত আছে শহরের কানাকানি, যত আছে আজগবি সংবাদ, যায় নিকো কোনোটার একটুও রঙ বাদ। "বার্তাকু' লিখে দিল, গুজরানওয়ালায় দলে দলে জোট করে পাঞ্জাবি গোয়ালায়। বলে তারা, গোরু পোষা গ্রাম্য এ কারবার প্রগতির যুগ আজ দিন এল ছাড়বার। আজ থেকে প্রত্যহ রাত্তির পোয়ালেই বসবে প্রেপরিটরি ক্লাস এই গোয়ালেই। স্তূপ রচা দুই বেলা খড়-ভুষি-ঘাসটার ছেড়ে দিয়ে হবে ওরা ইস্কুলমাস্টার। হম্বাধ্বনি যাহা গো-শিশু গো-বৃদ্ধের অন্তর্ভূত হবে বই-গেলা বিদ্যের। যত অভ্যেস আছে লেজ ম'লে পিটোনো ছেলেদের পিঠে হবে পেট ভ'রে মিটোনো। "গদাধরে' রেগে লেখে, এ কেমন ঠাট্টা-- বার্তাকু পরে পরে সাতটা কি আটটা যা লিখেছে সব কটা সমাজের বিরোধী, মতগুলো প্রগতির দ্বার আছে নিরোধি। সেদিন সে লিখেছিল, ঘুঁটে চাই চালানো, শহরের ঘরে ঘরে ঘুঁটে হোক জ্বালানো। কয়লা ঘুঁটেতে যেন সাপে আর নেউলে, ঝড়িয়াকে করে দিক একদম দেউলে। সেনেট হাউস আদি বড়ো বড়ো দেয়ালী শহরের বুক জুরে আছে যেন হেঁয়ালি। ঘুঁটে দিয়ে ভরা হোক, এই এক ফতোয়ায় এক দিনে শহরের বেড়ে যাবে কত আয়। গোয়ালারা চোনা যদি জমা করে গামলায় কত টাকা বাঁচে তবে জল-দেওয়া মামলায়। বার্তাকু কাগজের ব্যঙ্গে যে গা জ্বলে, সুন্দর মুখ পেলে লেপে ওরা কাজলে। এ-সকল বিদ্রূপে বুদ্ধি যে খেলো হয়, এ দেশের আবহাওয়া ভারি এলোমেলো হয়। গদাধর কাগজের ধমকানি থামল, হেসে উঠে বার্তাকু যুদ্ধেতে নামল। বলে, ভায়া, এ জগতে ঠাট্টা সে ঠাট্টাই-- গদাধর, গদা রেখে লও সেই পাঠটাই। মাস্টার না হয়ে যে হলে তুমি এডিটর এ লাগি তোমার কাছে দেশটাই ক্রেডিটর। এডুকেশনের পথে হয় নি যে মতি তব, এই পুণ্যেই হবে গোকুলেই গতি তব। অবশেষে এ দুখানা কাগজের আসরে বচসার ঝাঁজ দেখে ভয়ে কথা না সরে।