যবনিকা-অন্তরালে মর্ত্য পৃথিবীতে ঢাকাপড়া এই মন। আভাসে ইঙ্গিতে প্রমাণে ও অনুমানে আলোতে আঁধারে ভাঙা খণ্ড জুড়ে সে যে দেখেছে আমারে মিলায়ে তাহার সাথে নিজ অভিরুচি আশা তৃষা। বার বার ফেলেছিল মুছি রেখা তার; মাঝে-মাঝে করিয়া সংস্কার দেখেছে নূতন করে মোরে। কতবার ঘটেছে সংশয়। এই-যে সত্যে ও ভুলে রচিত আমার মূর্তি, সংসারের কূলে এ নিয়ে সে এতদিন কাটায়েছে বেলা। এরে ভালোবেসেছিল, এরে নিয়ে খেলা সাঙ্গ করে চলে গেছে। বসে একা ঘরে মনে-মনে ভাবিতেছি আজ, -- লোকান্তরে যদি তার দিব্য আঁখি মায়ামুক্ত হয় অকস্মাৎ, পাবে যার নব পরিচয় সে কি আমি। স্পষ্ট তারে জানুক যতই তবু যে অস্পষ্ট ছিল তাহারি মতোই এরে কি আপনি রচি বাসিবে সে ভালো। হায় রে মানুষ এ যে। পরিপূর্ণ আলো সে তো প্রলয়ের তরে, সৃষ্টির চাতুরী ছায়াতে আলোতে নিত্য করে লুকোচুরি। সে মায়াতে বেঁধেছিনু মর্ত্যে মোরা দোঁহে আমাদের খেলাঘর, অপূর্ণের মোহে মুগ্ধ ছিনু, মর্ত্যপাত্রে পেয়েছি অমৃত। পূর্ণতা নির্মম সে যে স্তব্ধ অনাবৃত।
একদিন মুখে এল নূতন এ নাম-- চৈতালিপূর্ণিমা ব'লে কেন যে তোমারে ডাকিলাম সে কথা শুধাও যবে মোরে স্পষ্ট ক'রে তোমারে বুঝাই হেন সাধ্য নাই। রসনায় রসিয়েছে, আর কোনো মানে কী আছে কে জানে। জীবনের যে সীমায় এসেছ গম্ভীর মহিমায় সেথা অপ্রমত্ত তুমি, পেরিয়েছ ফাল্গুনের ভাঙাভাণ্ড উচ্ছিষ্টের ভুমি, পৌঁছিয়াছ তপঃশুচি নিরাসক্ত বৈশাখের পাশে, এ কথাই বুঝি মনে আসে না ভাবিয়া আগুপিছু। কিংবা এ ধ্বনির মাঝে অজ্ঞাত কুহক আছে কিছু। হয়তো মুকুল-ঝরা মাসে পরিণতফলনম্র অপ্রগল্ভ যে মর্যাদা আসে আম্রডালে, দেখেছি তোমার ভালে সে পূর্ণতা স্তব্ধতামন্থর-- তার মৌন-মাঝে বাজে অরণ্যের চরম মর্মর। অবসন্ন বসন্তের অবশিষ্ট অন্তিম চাঁপায় মৌমাছির ডানারে কাঁপায় নিকুঞ্জের ম্লান মৃদু ঘ্রাণে, সেই ঘ্রাণ একদিন পাঠায়েছ প্রাণে, তাই মোর উৎকণ্ঠিত বাণী জাগায়ে দিয়েছে নামখানি। সেই নাম থেকে থেকে ফিরে ফিরে তোমারে গুঞ্জন করি ঘিরে চারি দিকে, ধ্বনিলিপি দিয়ে তার বিদায়স্বাক্ষর দেয় লিখে। তুমি যেন রজনীর জ্যোতিষ্কের শেষ পরিচয় শুকতারা, তোমার উদয় অস্তের খেয়ায় চ'ড়ে আসা, মিলনের সাথে বহি বিদায়ের ভাষা। তাই বসে একা প্রথম দেখার ছন্দে ভরি লই সব-শেষ দেখা। সেই দেখা মম পরিস্ফুটতম। বসন্তের শেষমাসে শেষ শুক্লতিথি তুমি এলে তাহার অতিথি, উজাড় করিয়া শেষ দানে ভাবের দাক্ষিণ্য মোর অন্ত নাহি জানে। ফাল্গুনের অতিতৃপ্তি ক্লান্ত হয়ে যায়, চৈত্রে সে বিরলরসে নিবিড়তা পায়, চৈত্রের সে ঘন দিন তোমার লাবণ্যে মূর্তি ধরে; মিলে যায় সারঙের বৈরাগ্যরাগের শান্তস্বরে, প্রৌঢ় যৌবনের পূর্ণ পর্যাপ্ত মহিমা লাভ করে গৌরবের সীমা। হয়তো এ-সব ব্যাখ্যা স্বপ্ন-অন্তে চিন্তা ক'রে বলা, দাম্ভিক বুদ্ধিরে শুধু ছলা-- বুঝি এর কোনো অর্থ নাইকো কিছুই। জ্যৈষ্ঠ-অবসানদিনে আকস্মিক জুঁই যেমন চমকি জেগে উঠে সেইমতো অকারণে উঠেছিল ফুটে, সেই চিত্রে পড়েছিল তার লেখা বাক্যের তুলিকা যেথা স্পর্শ করে অব্যক্তের রেখা। পুরুষ যে রূপকার, আপনার সৃষ্টি দিয়ে নিজেরে উদ্ভ্রান্ত করিবার অপূর্ব উপকরণ বিশ্বের রহস্যলোকে করে অন্বেষণ। সেই রহস্যই নারী-- নাম দিয়ে ভাব দিয়ে মনগড়া মূর্তি রচে তারি; যাহা পায় তার সাথে যাহা নাহি পায় তাহারে মিলায়। উপমা তুলনা যত ভিড় করে আসে ছন্দের কেন্দ্রের চারি পাশে, কুমোরের ঘুরখাওয়া চাকার সংবেগে যেমন বিচিত্র রূপ উঠে জেগে জেগে। বসন্তে নাগকেশরের সুগন্ধে মাতাল বিশ্বের জাদুর মঞ্চে রচে সে আপন ইন্দ্রজাল। বনতলে মর্মরিয়া কাঁপে সোনাঝুরি; চাঁদের আলোর পথে খেলা করে ছায়ার চাতুরী; গভীর চৈতন্যলোকে রাঙা নিমন্ত্রণলিপি দেয় লিখি কিংশুকে অশোকে; হাওয়ায় বুলায় দেহে অনামীর অদৃশ্য উত্তরী, শিরায় সেতার উঠে গুঞ্জরি গুঞ্জরি। এই যারে মায়ারথে পুরুষের চিত্ত ডেকে আনে সে কি নিজে সত্য করে জানে সত্য মিথ্যা আপনার, কোথা হতে আসে মন্ত্র এই সাধনার। রক্তস্রোত-আন্দোলনে জেগে ধ্বনি উচ্ছ্বসিয়া উঠে অর্থহীন বেগে; প্রচ্ছন্ন নিকুঞ্জ হতে অকস্মাৎ ঝঞ্ঝায় আহত ছিন্ন মঞ্জরীর মতো নাম এল ঘূর্ণিবায়ে ঘুরি ঘুরি, চাঁপার গন্ধের সাথে অন্তরেতে ছড়াল মাধুরী।
অলস মনের আকাশেতে প্রদোষ যখন নামে, কর্মরথের ঘড়্ঘড়ানি যে-মুহূর্তে থামে, এলোমেলো ছিন্নচেতন টুকরো কথার ঝাঁক জানি নে কোন্ স্বপ্নরাজের শুনতে যে পায় ডাক, ছেড়ে আসে কোথা থেকে দিনের বেলার গর্ত-- কারো আছে ভাবের আভাস কারো বা নেই অর্থ-- ঘোলা মনের এই যে সৃষ্টি, আপন অনিয়মে ঝিঁঝির ডাকে অকারণের আসর তাহার জমে। একটুখানি দীপের আলো শিখা যখন কাঁপায় চার দিকে তার হঠাৎ এসে কথার ফড়িং ঝাঁপায়। পষ্ট আলোর সৃষ্টি-পানে যখন চেয়ে দেখি মনের মধ্যে সন্দেহ হয় হঠাৎ মাতন এ কি। বাইরে থেকে দেখি একটা নিয়ম-ঘেরা মানে, ভিতরে তার রহস্য কী কেউ তা নাহি জানে। খেয়াল-স্রোতের ধারায় কী সব ডুবছে এবং ভাসছে-- ওরা কী-যে দেয় না জবাব, কোথা থেকে আসছে। আছে ওরা এই তো জানি, বাকিটা সব আঁধার-- চলছে খেলা একের সঙ্গে আর-একটাকে বাঁধার। বাঁধনটাকেই অর্থ বলি, বাঁধন ছিঁড়লে তারা কেবল পাগল বস্তুর দল শূন্যেতে দিক্হারা।