খুলে আজ বলি, ওগো নব্য, নও তুমি পুরোপুরি সভ্য। জগৎটা যত লও চিনে ভদ্র হতেছ দিনে দিনে। বলি তবু সত্য এ কথা-- বারো-আনা অভদ্রতা কাপড়ে-চোপড়ে ঢাক' তারে, ধরা তবু পড়ে বারে বারে, কথা যেই বার হয় মুখে সন্দেহ যায় সেই চুকে। ডেস্কেতে দেখিলাম, মাতা রেখেছেন অটোগ্রাফ-খাতা। আধুনিক রীতিটার ভানে যেন সে তোমারই দাবি আনে। এ ঠকানো তোমার যে নয় মনে মোর নাই সংশয়। সংসারে যারে বলে নাম তার যে একটু নেই দাম সে কথা কি কিছু ঢাকা আছে শিশু ফিলজফারের কাছে। খোকা বলে, বোকা বলে কেউ-- তা নিয়ে কাঁদ না ভেউ-ভেউ। নাম-ভোলা খুশি নিয়ে আছ, নামের আদর নাহি যাচ। খাতাখানা মন্দ এ না গো পাতা-ছেঁড়া কাজে যদি লাগ। আমার নামের অক্ষর চোখে তব দেবে ঠোক্কর। ভাববে, এ বুড়োটার খেলা, আঁচড়-পাঁচড় কাটে মেলা। লজঞ্জুসের যত মূল্য নাম মোর নহে তার তুল্য। তাই তো নিজেরে বলি, ধিক্, তোমারই হিসাব-জ্ঞান ঠিক। বস্তু-অবস্তুর সেন্স্ খাঁটি তব, তার ডিফারেন্স্ পষ্ট তোমার কাছে খুবই-- তাই, হে লজঞ্জুস-লুভি, মতলব করি মনে মনে, খাতা থাক্ টেবিলের কোণে। বনমালী কো-অপেতে গেলে টফি-চকোলেট যদি মেলে কোনোমতে তবে অন্তত মান রবে আজকের মতো। ছ বছর পরে নিয়ো খাতা, পোকায় না কাটে যদি পাতা।
এবারের মতো করো শেষ প্রাণে যদি পেয়ে থাকো চরমের পরম উদ্দেশ; যদি অবসান সুমধুর আপন বীণার তারে সকল বেসুর সুরে বেঁধে তুলে থাকে; অস্তরবি যদি তোরে ডাকে দিনেরে মাভৈঃ বলে যেমন সে ডেকে নিয়ে যায় অন্ধকার অজানায়; সুন্দরের শেষ অর্চনায় আপনার রশ্মিচ্ছটা সম্পূর্ণ করিয়া দেয় সারা; যদি সন্ধ্যাতারা অসীমের বাতায়নতলে শান্তির প্রদীপশিখা দেখায় কেমন করে জ্বলে; যদি রাত্রি তার খুলে দেয় নীরবের দ্বার, নিয়ে যায় নিঃশব্দ সংকেতে ধীরে ধীরে সকল বাণীর শেষ সাগরসংগম-তীর্থ-তীরে; সেই শতদল হতে যদি গন্ধ পেয়ে থাকো তার মানসসরসে যাহা শেষ অর্ঘ্য, শেষ নমস্কার।
চতুর্দশী এল নেমে পূর্ণিমার প্রান্তে এসে গেল থেমে। অপূর্ণের ঈষৎ আভাসে আপন বলিতে তারে মর্তভূমি শঙ্কা নাহি বাসে। এ ধরার নির্বাসনে কুণ্ঠার গুণ্ঠন নাই, ভীরুতা নাইকো তার মনে, সংসারজনতা-মাঝে আপনাতে আপনি বিরাজে। দুঃখে শোকে অবিচল, ধৈর্য তার প্রফুল্লতা-ভরা, সকল উদ্বেগভারহরা। রোগ যদি আসে রুখে সকরুণ শান্ত হাসি লেগে থাকে গ্লানিহীন মুখে। দুর্যোগ মেঘের মতো নীচে দিয়ে বহে যায় কত বারে বারে, প্রভা তার মুছিতে না পারে। তবু তার মহিমায় কিছু আছে বাকি, সেইখানে রাখে ঢাকি অশ্রুজল বিষাদ-ইঙ্গিতে-ছোঁওয়া ঈষৎ বিহ্বল। কণামাত্র সে-ক্ষীণতা নাহি কহে কথা, কেহ না দেখিতে পায় নিত্য যারা ফিরে আছে তায়। অমরার অসীমতা মাটিতে নিয়েছে সীমা-- নাম কি প্রতিমা।