ফুলদানি হতে একে একে আয়ুক্ষীণ গোলাপের পাপড়ি পড়িল ঝরে ঝরে। ফুলের জগতে মৃত্যুর বিকৃতি নাহি দেখি। শেষ ব্যঙ্গ নাহি হানে জীবনের পানে অসুন্দর। যে মাটির কাছে ঋণী আপনার ঘৃণা দিয়ে অশুচি করে না তারে ফুল, রূপে গন্ধে ফিরে দেয় ম্লান অবশেষ। বিদায়ের সকরুণ স্পর্শ আছে তাহে; নাইকো ভর্ৎসনা। জন্মদিনে মৃত্যুদিনে দোঁহে যবে করে মুখোমুখি দেখি যেন সে মিলনে পূর্বাচলে অস্তাচলে অবসন্ন দিবসের দৃষ্টিবিনিময়-- সমুজ্জ্বল গৌরবের প্রণত সুন্দর অবসান।
বুঝি রে, চাঁদের কিরণ পান ক'রে ওর ঢুলু ঢুলু দুটি আঁখি, কাছে ওর যেয়ো না, কথাটি শুধায়ো না, ফুলের গন্ধে মাতাল হয়ে বসে আছে একাকী। ঘুমের মতো মেয়েগুলি চোখের কাছে দুলি দুলি বেড়ায় শুধু নূপুর রনরনি। আধেক মুদি আঁখির পাতা, কার সাথে যে কচ্ছে কথা, শুনছে কাহার মৃদু মধুর ধ্বনি। অতি সুদূর পরীর দেশে-- সেখান থেকে বাতাস এসে কানের কাছে কাহিনী শুনায়। কত কী যে মোহের মায়া, কত কী যে আলোক ছায়া, প্রাণের কাছে স্বপন ঘনায়। কাছে ওর যেয়ো না, কথাটি শুধায়ো না, ঘুমের মেয়ে তরাস পেয়ে যাবে, মৃদু প্রাণে প্রমাদ গণি নূপুরগুলি রনরনি চাঁদের আলোয় কোথায় কে লুকাবে। চলো দূরে নদীর তীরে, বসে সেথায় ধীরে ধীরে একটি শুধু বাঁশরি বাজাও। আকাশেতে হাসবে বিধু, মধুকন্ঠে মৃদু মৃদু একটি শুধু সুখেরই গান গাও। দূর হতে আসিয়া কানে পশিবে সে প্রাণের প্রাণে স্বপনেতে স্বপন ঢালিয়ে। ছায়াময়ী মেয়েগুলি গানের স্রোতে দুলি দুলি, বসে রবে গালে হাত দিয়ে। গাহিতে গাহিতে তুমি বালা গেঁথে রাখো মালতীর মালা। ও যখন ঘুমাইবে, গলায় পরায়ে দিবে স্বপনে মিশিবে ফুলবাস। ঘুমন্ত মুখের 'পরে চেয়ে থেকো প্রেমভরে মুখেতে ফুটিবে মৃদু হাস।
জানি আমি, ছোটো আমার ঠাঁই-- তাহার বেশি কিছুই চাহি নাই। দিয়ো আমায় সবার চেয়ে অল্প তোমার দান, নিজের হাতে দাও তুলে তো রইবে অফুরান। আমি তো নই কাঙাল পরদেশী, পথে পথে খোঁজ করে যে যা পায় তারো বেশি। সকলটুকুই চায় সে পেতে হাতে, পুরিয়ে নিতে পারে না সে আপন দানের সাথে। তুমি শুনে বললে আমায় হেসে, বললে ভালোবেসে, "আশ মিটিবে এইটুকুতেই তবে?" আমি বলি, "তার বেশি কী হবে। যে-দানে ভার থাকে বস্তু দিয়ে পথ সে কেবল আটক করে রাখে। যে-দান কেবল বাহুর পরশ তব তারে আমি বীণার মতো বক্ষে তুলে লব। সুরে সুরে উঠবে বেজে, যেটুকু সে তাহার চেয়ে অনেক বেশি সে যে। লোভীর মতো তোমার দ্বারে যাহার আসা-যাওয়া তাহার চাওয়া-পাওয়া তোমায় নিত্য খর্ব করে আনে আপন ক্ষুধার পানে। ভালোবাসার বর্বরতা, মলিন করে তোমারি সম্মান পৃথুল তার বিপুল পরিমাণ। তাই তো বলি, প্রিয়ে, হাসিমুখে বিদায় কোরো স্বল্প কিছু দিয়ে; সন্ধ্যা যেমন সন্ধ্যাতারাটিরে আনিয়া দেয় ধীরে সূর্য-ডোবার শেষ সোপানের ভিতে সলজ্জ তার গোপন থালিটিতে।"