সন্ধ্যা হল গো-- ওমা, সন্ধ্যা হল, বুকে ধরো। অতল কালো স্নেহের মাঝে ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ করো। ফিরিয়ে নে মা, ফিরিয়ে নে গো, সব যে কোথায় হারিয়েছে গো, ছড়ানো এই জীবন, তোমার আঁধারমাঝে হোক-না জড়ো। আর আমারে বাইরে তোমার কোথাও যেন না যায় দেখা। তোমার রাতে মিলাক আমার জীবন-সাঁজের রশ্মিরেখা। আমায় ঘিরি আমায় চুমি কেবল তুমি, কেবল তুমি। আমার ব'লে যা আছে মা, তোমার ক'রে সকল হরো।
তোমার আমার মাঝে ঘন হল কাঁটার বেড়া এ কখন সহসা রাতারাতি-- স্বদেশের অশ্রুজলে তারেই কি তুলিবে বাড়ায়ে ওরে মূঢ়, ওরে আত্মঘাতী? ওই সর্বনাশটাকে ধর্মের দামেতে কর দামী, ঈশ্বরের কর অপমান-- আঙিনা করিয়া ভাগ দুই পাশে তুমি আর আমি পূজা করি কোন্ শয়তান! ও কাঁটা দলিতে গেলে দুই দিকে ধর্মধ্বজী দলে ধিক্কারিবে তাহে ভয় নাই-- এ পাপ আড়ালখানা উপাড়ি ফেলিব ধূলিতলে, জানিব আমরা দোঁহে ভাই। দুই হাত মেলে নাই এত কাল ধরে তাই বার বার বিধাতার দান ব্যর্থ হল--অবশেষে আশীর্বাদ কাছে এসে অভিশাপে হল অবসান। তবুও মানবদ্রোহে স্পর্ধাভরে সমারোহে চল যদি অন্ধতার পথে, এই কথা জেনে যেয়ো বাঁচাবে যে মূঢ়কেও হেন শক্তি নাই এ জগতে।
বাণীর মুরতি গড়ি একমনে নির্জন প্রাঙ্গণে পিণ্ড পিণ্ড মাটি তার যায় ছড়াছড়ি, অসমাপ্ত মূক শূন্যে চেয়ে থাকে নিরুৎসুক। গর্বিত মূর্তির পদানত মাথা ক'রে থাকে নিচু, কেন আছে উত্তর না দিতে পারে কিছু। বহুগুণে শোচনীয় হায় তার চেয়ে এক কালে যাহা রূপ পেয়ে কালে কালে অর্থহীনতায় ক্রমশ মিলায়। নিমন্ত্রণ ছিল কোথা, শুধাইলে তারে উত্তর কিছু না দিতে পারে-- কোন্ স্বপ্ন বাঁধিবারে বহিয়া ধূলির ঋণ দেখা দিল মানবের দ্বারে। বিস্মৃত স্বর্গের কোন্ উর্বশীর ছবি ধরণীর চিত্তপটে বাঁধিতে চাহিয়াছিল কবি, তোমারে বাহনরূপে ডেকেছিল, চিত্রশালে যত্নে রেখেছিল, কখন সে অন্যমনে গেছে ভুলি-- আদিম আত্মীয় তব ধূলি, অসীম বৈরাগ্যে তার দিক্বিহীন পথে তুলি নিল বাণীহীন রথে। এই ভালো, বিশ্বব্যাপী ধূসর সম্মানে আজ পঙ্গু আবর্জনা নিয়ত গঞ্জনা কালের চরণক্ষেপে পদে পদে বাধা দিতে জানে, পদাঘাতে পদাঘাতে জীর্ণ অপমানে শান্তি পায় শেষে আবার ধূলিতে যবে মেশে।