রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে পরাও যারে মণিরতন-হার-- খেলাধুলা আনন্দ তার সকলি যায় ঘুরে, বসন-ভুষণ হয় যে বিষম ভার। ছেঁড়ে পাছে আঘাত লাগি, পাছে ধুলায় হয় সে দাগি, আপনাকে তাই সরিয়ে রাখে সবার হতে দূরে, চলতে গেলে ভাবনা ধরে তার-- রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে, পরাও যারে মণিরতন-হার। কী হবে মা অমনতরো রাজার মতো সাজে, কী হবে ওই মণিরতন-হারে। দুয়ার খুলে দাও যদি তো ছুটি পথের মাঝে রৌদ্রবায়ু-ধুলাকাদার পাড়ে। যেথায় বিশ্বজনের মেলা সমস্ত দিন নানান খেলা, চারি দিকে বিরাট গাথা বাজে হাজার সুরে, সেথায় সে যে পায় না অধিকার, রাজার মতো বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে, পরাও যারে মণিরতন-হার।
দুজন সখীরে দূর হতে দেখেছিনু অজানার তীরে। জানি নে কাদের ঘর; দ্বার খোলা আকাশের পানে, দিনান্তে কহিতেছিল কী কথা কে জানে। এক নিমিষেতে অপরিচয়ের দেখা চলে যেতে যেতে উপরের দিকে চেয়ে। দুটি মেয়ে যেন দুটি আলোকণা আমার মনের পথে ছায়াতলে করিল রচনা ক্ষণতরে আকাশের বাণী, অর্থ তার নাহি জানি। যাহারা ওদের চেনে, নাম জানে, কাছে লয় টেনে, একসাথে দিন যাপে, প্রত্যহের বিচিত্র আলাপে ওদের বেঁধেছে তারা ছোটো করে পরিচয়ডোরে। সত্য নয় ঘরের ভিত্তিতে ঘেরা সেই পরিচয়। যাবে দিন, সে জানা কোথায় হবে লীন। বন্ধহীন অনন্তের বক্ষতলে উঠিয়াছে জেগে কী নিশ্বাসবেগে যুগলতরঙ্গসম। অসীম কালের মাঝে ওরা অনুপম, ওরা অনুদ্দেশ, কোথায় ওদের শেষ ঘরের মানুষ জানে সে কি? নিত্যের চিত্তের পটে ক্ষণিকের চিত্র গেনু দেখি-- আশ্চর্য সে লেখা, সে তুলির রেখা যুগযুগান্তর-মাঝে একবার দেখা দিল নিজে-- জানি নে তাহার পরে কী যে।
হয় কি না হয় দেখা, ফিরি কি না ফিরি, দূরে গেলে এই মনে হয়; দুজনার মাঝখানে অন্ধকারে ঘিরি জেগে থাকে সতত সংশয়। এত লোক, এত জন, এত পথ, গলি, এমন বিপুল এ সংসার-- ভয়ে ভয়ে হাতে হাতে বেঁধে বেঁধে চলি ছাড়া পেলে কে আর কাহার। তারায় তারায় সদা থাকে চোখে চোখে অন্ধকারে অসীম গগনে। ভয়ে ভয়ে অনিমেষে কম্পিত আলোকে বাঁধা থাকে নয়নে নয়নে। চৌদিকে অটল স্তব্ধ সুগভীর রাত্রি, তরুহীন মরুময় ব্যোম-- মুখে মুখে চেয়ে তাই চলে যত যাত্রী চলে গ্রহ রবি তারা সোম। নিমেষের অন্তরালে কী আছে কে জানে, নিমেষে অসীম পড়ে ঢাকা-- অন্ধ কাল তুরঙ্গম রাশ নাহি মানে বেগে ধায় অদৃষ্টের চাকা। কাছে কাছে পাছে পাছে চলিবারে চাই, জেগে জেগে দিতেছি পাহারা, একটু এসেছে ঘুম--চমকি তাকাই গেছে চলে কোথায় কাহারা! ছাড়িয়ে চলিয়া গেলে কাঁদি তাই একা বিরহের সমুদ্রের তীরে। অনন্তের মাঝখানে দুদন্ডের দেখা তাও কেন রাহু এসে ঘিরে। মৃত্যু যেন মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যায়, পাঠায় সে বিরহের চর। সকলেই চলে যাবে, পড়ে রবে হায় ধরণীর শূন্য খেলাঘর। গ্রহ তারা ধূমকেতু কত রবি শশী, শূন্য ঘেরি জগতের ভিড়, তারি মাঝে যদি ভাঙে, যদি যায় খসি আমাদের দুদন্ডের নীড়-- কোথায় কে হারাইব--কোন্ রাত্রিবেলা কে কোথায় হইব অতিথি। তখন কি মনে রবে দুদিনের খেলা, দরশের পরশের স্মৃতি! তাই মনে ক'রে কি রে চোখে জল আসে একটুকু চোখের আড়ালে! প্রাণ যারে প্রাণের অধিক ভালোবাসে সেও কি রবে না এক কালে! আশা নিয়ে এ কি শুধু খেলাই কেবল-- সুখ দুঃখ মনের বিকার! ভালোবাসা কাঁদে, হাসে, মোছে অশ্রুজল, চায়, পায়, হারায় আবার।