এল বেলা পাতা ঝরাবারে; শীর্ণ বলিত কায়া, আজ শুধু ভাঙা ছায়া মেলে দিতে পারে। একদিন ডাল ছিল ফুলে ফুলে ভরা নানা-রঙ-করা। কুঁড়ি ধরা ফলে কার যেন কী কৌতূহলে উঁকি মেরে আসা খুঁজে নিতে আপনার বাসা। ঋতুতে ঋতুতে আকাশের উৎসবদূতে এনে দিত পল্লবপল্লীতে তার কখনো পা টিপে চলা হালকা হাওয়ার, কখনো-বা ফাল্গুনের অস্থির এলোমেলো চাল জোগাইত নাচনের তাল। জীবনের রস আজ মজ্জায় বহে, বাহিরে প্রকাশ তার নহে। অন্তরবিধাতার সৃষ্টিনির্দেশে যে অতীত পরিচিত সে নূতন বেশে সাজবদলের কাজে ভিতরে লুকালো-- বাহিরে নিবিল দীপ, অন্তরে দেখা যায় আলো। গোধূলির ধূসরতা ক্রমে সন্ধ্যার প্রাঙ্গণে ঘনায় আঁধার। মাঝে-মাঝে জেগে ওঠে তারা, আজ চিনে নিতে হবে তাদের ইশারা। সমুখে অজানা পথ ইঙ্গিত মেলে দেয় দূরে, সেথা যাত্রার কালে যাত্রীর পাত্রটি পুরে সদয় অতীত কিছু সঞ্চয় দান করে তারে পিপাসার গ্লানি মিটাবারে। যত বেড়ে ওঠে রাতি। সত্য যা সেদিনের উজ্জ্বল হয় তার ভাতি। এই কথা ধ্রুব জেনে, নিভৃতে লুকায়ে সারা জীবনের ঋণ একে একে দিতেছি চুকায়ে।
এক যে ছিল চাঁদের কোণায় চরকা-কাটা বুড়ী পুরাণে তার বয়স লেখে সাত-শ হাজার কুড়ি। সাদা সুতোয় জাল বোনে সে হয় না বুনন সারা পণ ছিল তার ধরবে জালে লক্ষ কোটি তারা। হেনকালে কখন আঁখি পড়ল ঘুমে ঢুলে, স্বপনে তার বয়সখানা বেবাক গেল ভুলে। ঘুমের পথে পথ হারিয়ে, মায়ের কোলে এসে পূর্ণ চাঁদের হাসিখানি ছড়িয়ে দিল হেসে। সন্ধ্যেবেলায় আকাশ চেয়ে কী পড়ে তার মনে। চাঁদকে করে ডাকাডাকি, চাঁদ হাসে আর শোনে। যে-পথ দিয়ে এসেছিল স্বপন-সাগর তীরে দু-হাত তুলে সে-পথ দিয়ে চায় সে যেতে ফিরে। হেনকালে মায়ের মুখে যেমনি আঁখি তোলে চাঁদে ফেরার পথখানি যে তক্খনি সে ভোলে। কেউ জানে না কোথায় বাসা, এল কী পথ বেয়ে, কেউ জানে না এই মেয়ে সেই আদ্যিকালের মেয়ে। বয়সখানার খ্যাতি তবু রইল জগৎ জুড়ি-- পাড়ার লোকে যে দেখে সেই ডাকে, "বুড়ী বুড়ী"। সব-চেয়ে যে পুরানো সে, কোন্ মন্ত্রের বলে সব-চেয়ে আজ নতুন হয়ে নামল ধরাতলে।