তোমার প্রেম যে বইতে পারি এমন সাধ্য নাই। এ সংসারে তোমার আমার মাঝখানেতে তাই কৃপা করে রেখেছ নাথ অনেক ব্যবধান-- দুঃখসুখের অনেক বেড়া ধনজনমান। আড়াল থেকে ক্ষণে ক্ষণে আভাসে দাও দেখা-- কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে রবির মৃদু রেখা। শক্তি যারে দাও বহিতে অসীম প্রেমের ভার একেবারে সকল পর্দা ঘুচায়ে দাও তার। না রাখ তার ঘরের আড়াল না রাখ তার ধন, পথে এনে নিঃশেষে তায় কর অকিঞ্চন। না থাকে তার মান অপমান, লজ্জা শরম ভয়, একলা তুমি সমস্ত তার বিশ্বভুবনময়। এমন করে মুখোমুখি সামনে তোমার থাকা, কেবলমাত্র তোমাতে প্রাণ পূর্ণ করে রাখা, এ দয়া যে পেয়েছে তার লোভের সীমা নাই-- সকল লোভে সে সরিয়ে ফেলে তোমায় দিতে ঠাঁই।
অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। অমন সুধা করুণ সুরে গেয়ো না। সকালবেলা সকল কাজে আসিতে যেতে পথের মাঝে আমারি এই আঙিনা দিয়ে যেয়ো না। অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। মনের কথা রেখেছি মনে যতনে, ফিরিছ মিছে মাগিয়া সেই রতনে। তুচ্ছ অতি, কিছু সে নয়, দু চারি ফোঁটা অশ্রু ময় একটি শুধু শোণিত-রাঙা বেদনা। অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। কাহার আশে দুয়ারে কর হানিছ? না জানি তুমি কী মোরে মনে মানিছ! রয়েছি হেথা লুকাতে লাজ, নাহিকো মোর রানীর সাজ, পরিয়া আছি জীর্ণচীর বাসনা। অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। কী ধন তুমি এনেছ ভরি দু হাতে। অমন করি যেয়ো না ফেলি ধুলাতে। এ ঋণ যদি শুধিতে চাই কী আছে হেন, কোথায় পাই-- জনম-তরে বিকাতে হবে আপনা। অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। ভেবেছি মনে, ঘরের কোণে রহিব। গোপন দুখ আপন বুকে বহিব। কিসের লাগি করিব আশা, বলিতে চাহি, নাহিকো ভাষা-- রয়েছে সাধ, না জানি তার সাধনা। অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। যে-সুর তুমি ভরেছ তব বাঁশিতে উহার সাথে আমি কি পারি গাহিতে? গাহিতে গেলে ভাঙিয়া গান উছলি উঠে সকল প্রাণ, না মানে রোধ অতি অবোধ রোদনা। অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। এসেছ তুমি গলায় মালা ধরিয়া-- নবীন বেশ, শোভন ভূষা পরিয়া। হেথায় কোথা কনক-থালা, কোথায় ফুল, কোথায় মালা-- বাসরসেবা করিবে কে বা রচনা? অমন দীননয়নে তুমি চেয়ো না। ভুলিয়া পথ এসেছ, সখা, এ ঘরে। অন্ধকারে মালা-বদল কে করে! সন্ধ্যা হতে কঠিন ভুঁয়ে একাকী আমি রয়েছি শুয়ে, নিবায়ে দীপ জীবননিশি যাপনা! অমন দীননয়নে আর চেয়ো না।
নিভৃত এ চিত্তমাঝে নিমেষে নিমেষে বাজে জগতের তরঙ্গ-আঘাত, ধ্বনিত হৃদয়ে তাই মুহূর্ত বিরাম নাই নিদ্রাহীন সারা দিন রাত। সুখ দুঃখ গীতস্বর ফুটিতেছে নিরন্তর-- ধ্বনি শুধু, সাথে নাই ভাষা। বিচিত্র সে কলরোলে ব্যাকুল করিয়া তোলে জাগাইয়া বিচিত্র দুরাশা। এ চিরজীবন তাই আর কিছু কাজ নাই রচি শুধু অসীমের সীমা। আশা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, তাহে ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলি মানসী-প্রতিমা। বাহিরে পাঠায় বিশ্ব কত গন্ধ গান দৃশ্য সঙ্গীহারা সৌন্দর্যের বেশে, বিরহী সে ঘুরে ঘুরে ব্যথাভরা কত সুরে কাঁদে হৃদয়ের দ্বারে এসে। সেই মোহমন্ত্র-গানে কবির গভীর প্রাণে জেগে ওঠে বিরহী ভাবনা, ছাড়ি অন্তঃপুরবাসে সলজ্জ চরণে আসে মূর্তিমতী মর্মের কামনা। অন্তরে বাহিরে সেই ব্যাকুলিত মিলনেই কবির একান্ত সুখোচ্ছ্বাস। সেই আনন্দমুহূর্তগুলি তব করে দিনু তুলি সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণের প্রকাশ।